Home মূল কাগজ আপন আবাস মুঠোফোনেই বাড়ি নিয়ন্ত্রণ!

মুঠোফোনেই বাড়ি নিয়ন্ত্রণ!

0 2230

যখন আপনি বাড়ি থেকে বাইরে, অফিসে কিংবা কোনো আড্ডায়Ñ ছোট ছোট কিছু সন্দেহ তখন ভিড় করে আপনার মাথায়। কফি মেকারটা কি বন্ধ করেছিলাম? নিরাপত্তা-ধ্বনি (সিকিউরিটি অ্যালার্ম) কি সেট করে এসেছি? শিশুরা কি তাদের হোমওয়ার্ক করছে নাকি টিভি সেটে তাদের চোখ?

একপলকেই এসব দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলে শান্ত থাকতে পারেন, যদি আপনার হাতে থাকে একটা স্মার্টফোন বা একটা ট্যাবলেট। আর যদি তার সঙ্গে বাড়ির সব যন্ত্রপাতি ও মেশিনের সংযোগ জুড়ে দেওয়া থাকে তাহলে যন্ত্রগুলো নিজেদের মধ্যে এবং আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে ওই স্মার্টফোনের মাধ্যমে।

একটি আধুনিক বাড়িতে নানারকম সিস্টেম থাকে। যেমনÑ ফায়ার সিস্টেম, সেন্ট্রাল হিটিং সিস্টেম, সিকিউরিটি সিস্টেম। হরেক পদের ডিভাইস তো থাকেই। যেমনÑ টিভি, মিউজিক সিস্টেম, লাইট, ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ সরঞ্জাম ইত্যাদি। কিন্তু এসব সিস্টেম ও ডিভাইসগুলো একটি অপরটি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকে। স্মার্টহোমে এসব ডিভাইস এবং সিস্টেম একে অপরের সঙ্গে তথ্য দেওয়া-নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন কাজ সম্পাদন করার জন্য সিগন্যাল পাঠাতে পারে।

স্মার্টফোনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এমন বাড়িঘরকে এখন বলা হচ্ছে স্মার্টহোম। বৈদ্যুতিক সংযোগ আছে এমন যে কোনো ডিভাইসকেই স্মার্টহোমের নেটওয়ার্কের আওতায় আনা যায় এবং আপনার কমান্ড মেনেই চলবে এসব ডিভাইস। কণ্ঠ দিয়ে, রিমোট কন্ট্রোল, ট্যাবলেট কিংবা স্মার্টফোনের মাধ্যমে আপনি কমান্ড করতে পারেন।
হোম অটোমেশনের এই প্রযুক্তির প্রয়োগ তিনটি ক্ষেত্রে বেশিÑ বাতি জ্বালানো (লাইটিং), তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং বাড়ির নিরাপত্তা। এছাড়া পারিবারিক বিনোদনের ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তির প্রয়োগ শুরু হয়েছে।

সিকিউরিটি অ্যালার্ম
স্মার্টহোম সিকিউরিটি অ্যালার্ম প্যানেল নামে মাইক্রোপ্রসেসর যুক্ত ডিভাইস রয়েছে। একে টেলিফোনের মাধ্যমে বাইরে থেকে কিছু নির্দিষ্ট কাজ করার জন্য কমান্ড দেওয়া যায় এবং একই সঙ্গে একে আনসারিং মেশিন হিসেবে ব্যবহার করা যায়। একে কমান্ড দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট একটি পিন নম্বর দিতে হয়, যেটিকে সিকিউরিটি নম্বর বলা হয়। ফলে স্মার্টহোমের ব্যবহারকারী ছাড়া আর কেউ কমান্ড দিতে পারে না।

ধরুন, আপনি বাসায় নেই এমন সময় কোনো অতিথি বাসায় গেলেন। তখন? সিকিউরিটি অ্যালার্ম প্যানেল আপনাকে মোবাইলে ফোন করে কিংবা এসএমএসের মাধ্যমে বিষয়টা জানিয়ে দেবে। আপনি তখন আপনার অতিথির সঙ্গে ফোনে কথা বলে নেবেন, হিসাব করে সময় জানিয়ে দেবেন কখন এলে আপনার দেখা বাসায় পাওয়া যাবে।
বাসায় ফেরার আগেই কমান্ড দিয়ে সেন্ট্রাল হিটিং সিস্টেমও অন করে রাখতে পারবেন এই প্রযুক্তি দিয়ে।

এক সুইচেই এত্তকিছু!
অফিসে যাওয়ার সময় কী কী জিনিস মাথায় রাখতে হয়? বাসার সব লাইট অফ করলাম তো, জানালাগুলো বন্ধ করেছি তো? এ রকম যতসব কাজ আছে, দরজার বাইরে এসে স্মার্টফোনটা হাতে নিন। আর একটা বোতাম চাপুন। ব্যস সবগুলো প্রশ্নের জবাব ‘হ্যাঁ’ হয়ে গেল। পাশাপাশি, নিচতলায় গাড়ির আল্যার্মও অন হয়ে গেল ওই এক সুইচেই! অফিস থেকে বাড়ি ফেরার সময়, একটিমাত্র সুইচেই জানালাগুলো খুলে দিতে পারেন, সব বাতি জ্বালিয়ে দিতে পারেন।

ধরুন, বাড়ি ছেড়ে কয়েকদিনের জন্য ঘুরতে যাচ্ছেন দূরে কোথাও। স্মার্টহোমের সমন্বিত নিরাপত্তা-ব্যবস্থা আপনা থেকেই দিনের বেলায় প্রতিটি ঘরের লাইট বন্ধ রাখবে। আবার রাতে অন করে দেবে, জানালার পর্দা টেনে দেবে, যেন বাইরে থেকে মনে না করেÑ বাড়িতে কেউ নেই।

আগুন লাগলে?
ঘরে যদি আগুন লাগে তাহলে কাজ করবে স্মোক এবং হিট ডিটেক্টর। সঙ্গে সঙ্গে সিকিউরিটি প্যানেল থেকে ফায়ার ব্রিগেডে ফোন চলে যাবে। ঘরের সবগুলো লাইট ফ্ল্যাশ করার সঙ্গে সঙ্গে সাইরেন বাজাতে থাকবে। আর ঘরে যদি কেউ থাকে, তবে সবগুলো দরজা খুলে দেবে যেন দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে যেতে পারে লোকটি।

হারানো গেলে হন্যে হতে হবে না
চাবি, মানিব্যাগ, সানগ্লাস, রিমোটÑ এসব যন্ত্রপাতি হুটহাট হারিয়ে ফেলি আমরা। খোঁজার সময় যেন কোনোমতেই মিলবে না। স্মার্টহোম আপনাকে এই বাড়তি ঝামেলা থেকে মুক্তি দিতে পারে। কীভাবে?

এতে আছে ট্র্যাকিং অ্যান্ড সেন্সিং টেকনোলজি। যেসব জিনিস হারিয়ে যাচ্ছে ওইসব ডিভাইসের সঙ্গে একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস যুক্ত করা থাকবে এই প্রযুক্তিতে। কম ফ্রিকোয়েন্সির বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে স্মার্টহোমের মূল সিস্টেমের প্রতিটি জিনিস আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যায়। কোনো একটি ডিভাইস হারিয়ে গেলে এই তরঙ্গই সন্ধান দেবে।

এই ঘরে গ্রীষ্ম, ওই ঘরে শীত
ঘরের তাপমাত্রা ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণ করার স্বাধীনতা দেবে স্মার্টফোন। ঘরের বাইরে হয়তো প্রচ তাপ, তাতে কী, স্মার্টহোমে তার কোনো ছাপই যেন নেই। শুধু তা-ই নয়, স্মার্টফোনের মাধ্যমে স্মার্টহোমের প্রতিটি ঘরেরই আবহাওয়া আলাদা করা যায়।

কীভাবে এত স্মার্টলি কাজ করে
ধরা যাক, সাধারণ একটি লাইট-সুইচের কথা। সুইচ অন করলেই বিদ্যুৎ প্রবাহ ঘটে, জ্বলে ওঠে বাতি। সুইচ অফ করলে প্রবাহ বন্ধ হয়, নিভে যায় বাতি। কিন্তু স্মার্টহোমে? না, এখানে ঘটনাটা ঘটে একটু ভিন্নভাবে। সুইচের মাধ্যমে বিদ্যুৎপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে একটি সিগন্যাল পাঠানো হয় কমিউনিকেশন নেটওয়ার্কে। কন্ট্রোলার সার্কিট নামের একটি সার্কিট জুড়ে দেওয়া থাকে এক বা একাধিক লাইটের সঙ্গে। সুইচের কাছ থেকে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সিগন্যাল পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা সাড়া দেয়, অন হয় লাইট। কমিউনিকেশন নেটওয়ার্কে একাধিক লাইটের পাশাপাশি অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইসও যুক্ত থাকে। ফলে সুইচ অন করে একাধিক ডিভাইস একই সঙ্গে অন করা যায়।

স্মার্ট, তবু কেন পিছিয়ে
প্রশ্ন উঠতেই পারে, এত্তসব সুবিধা। কত্ত স্মার্ট একটা বাড়ির ধারণা। তাহলে আমাদের শহরে (কিংবা বিদেশি শহরগুলোতেও) এই প্রযুক্তি তেমন বিস্তার লাভ করেনি কেন? সম্ভাব্য কারণগুলো এ রকমÑ এখন পর্যন্ত স্মার্টহোম তৈরির ক্ষেত্রে কোনো স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে কোম্পানিগুলো এ সিস্টেম ইনস্টল এবং ইন্টিগ্রেড করতে সাহস পাচ্ছে না।
স্মার্টহোম অপারেশনকে অনেকেই বেশ জটিল মনে করছেন।
যন্ত্রপাতির দাম বেশ চড়া।

প্রেক্ষাপট বাংলাদেশে
আমাদের দেশে স্মার্টহোমের জন্য রয়েছে সম্ভাবনাময় বাজার। হোম অটোমেশন প্রযুক্তি যদি আমাদের জানা হয়ে যায়, এরপর ছোটখাটো প্রকল্প হাতে নেওয়া যেতে পারে। প্রতিবছরই বিভিন্ন ইউনিভার্সিটি এবং ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে একাধিক প্রজেক্টে শিক্ষার্থীরা পিসির সাহায্যে পুরোপুরি নিজেদের মেধা ও শ্রম দিয়ে হোম অটোমেশনের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প তৈরি করছেন।
বিভিন্ন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা প্রাতিষ্ঠানিক সাহায্য ছাড়াই রিমোট বা মোবাইলের সাহায্যে ঘরের লাইট ও ফ্যান, এমনকি ঘরের নিরাপত্তাও নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছেন।

জাহাঙ্গীর সুর

NO COMMENTS

Leave a Reply