Home মূল কাগজ মুঠোফোনে ট্যাক্সিসেবা!

মুঠোফোনে ট্যাক্সিসেবা!

0 988

কারিকা প্রতিবেদকঃ


বাজার-সদাই থেকে শুরু করে বিদেশ ভ্রমণ, সংবাদপত্র পাঠ থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি, আবহাওয়ার খবর থেকে শুরু করে খাবারের রেসিপি সবই এখন অ্যাপভিত্তিক। নাগরিক জীবন সহজ করা অ্যাপভিত্তিক সেবায় যুক্ত হয়েছে ট্যাক্সি সার্ভিসও। যাত্রীর অবস্থান নির্ণয় করে দোরগোড়ায় গাড়ি পৌঁছে দেওয়ার অ্যাপভিত্তিক সেবা নাগরিক জীবনে কিছুটা স্বস্তি এনেছে।
ঢাকায় ট্যাক্সি সার্ভিস বলতে ছিল তমা, ট্রাস্টসহ গুটিকয়েক সেবা। মোবাইল ফোনে কল করে এ-ধরনের সেবা নেওয়া যেত। তবে খরচ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় সিএনজি অটোরিকশাই এ খাতের অন্যতম বাহন হয়ে টিকে আছে। প্রথাগত ট্যাক্সিসেবার বাইরে গত বছর ঢাকাবাসী দেখা পায় ‘চলো’ সার্ভিসের। ফোন করে অথবা অ্যাপ ব্যবহার করে নেওয়া যায় এ সার্ভিস। সাধারণ রেন্ট-এ-কারের খরচের তুলনায় ‘চলো’র খরচ কম। নিয়মিত ‘চলো’র সেবা নেন বেসরকারি চাকরিজীবী সামসুদ্দিন বিপ্লব। তিনি বলেন, ‘২-৩ ঘণ্টার জন্য গাড়ি লাগলে বা ঢাকার আশপাশের জন্য অল্প খরচে গাড়ি পাওয়া যায়।’ তিনি জানান, গত শুক্রবার একটা দাওয়াতে যাওয়ার জন্য চার ঘণ্টা গাড়ি নিয়ে তাকে মাত্র ৯৯০ টাকা বিল দিতে হয়েছে।
‘চলো’র নির্বাহী পরিচালক দেওয়ান শুভ কারিকাকে জানান, এখন কেবল ঢাকা নয়, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট, চট্টগ্রাম এবং খুলনাতেও ‘চলো’র বেজ স্টেশন রয়েছে। যার মাধ্যমে প্রায় সারাদেশেই অল্প খরচে গাড়ির সেবা দিচ্ছেন তারা।
গত বছরের নভেম্বর থেকে পরিস্থিতি আরও বদলে গেছে। এখন চাইলেই ঘরে বসে গাড়ি ঠিক করে ফেলা যায়। গাড়ির অবস্থান নির্ণয় করা যায়। যেখানে যেতে চান, সেখানেই যাওয়া যায়। ভাড়া নিয়ে দরাদরির সুযোগ নেই। এ তো গেল যাত্রীর সুবিধা। যিনি ভাড়ায় গাড়ি দিচ্ছেন তিনি নিজেই ট্র্যাক করতে পারছেন গাড়ি কোথায় কতক্ষণ যাচ্ছে। কত টাকায় যাচ্ছে। গাড়ি-চালকের জন্য সুবিধাজনক, কারণ তিনি যেখানেই যাবেন সেখান থেকেই আবার ভাড়ার ব্যবস্থা হয়ে যায়। ফলে বসে থাকতে হবে না এবং সারাদিনে ভালো পরিমাণের আয়ও সম্ভব।
সবার জন্য উইন-উইন-উইন পরিস্থিতির স্রষ্টা একটি অ্যাপ। উবার। বিশে^র ৭৪টি দেশের গণপরিবহন-ব্যবস্থা যার বদৌলতে আক্ষরিক অর্থেই হাতের মুঠোয় চলে এসেছে দূরত্ব। ঢাকায় উবার ২০১৬-এর নভেম্বরে যাত্রা শুরু করে। বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে কেবল উবার স্তুতি মেলে, যা প্রমাণ করে যানবাহনের ফাঁদে আষ্টেপৃষ্ঠে আটকে থাকা নগরবাসীর জন্য উবার অ্যাপটি কী পরিমাণ স্বস্তি নিয়ে এসেছে।
উবারের যাত্রী, চালক এবং একই সঙ্গে উবারের গাড়ির মালিক তিনপক্ষের জন্যই সুবিধাজনক মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে উবার। মোবাইলে উবার অ্যাপের মাধ্যমে যাত্রার স্থান এবং গন্তব্য নির্দিষ্ট করে ৫-২০ মিনিটের মধ্যে গাড়ি পাওয়া যায়। গাড়ির জন্য যাত্রীকে কোথাও যেতে হয় না। যাত্রীর অবস্থান ট্র্যাক করে পৌঁছে যান চালক। আর ভাড়া তো নির্দিষ্ট। এমনকি দূরত্বের কোথায় অবস্থান করছেন তাও পাওয়া যাবে সহজেই।
‘চলো’, ‘উবার’ ছাড়াও গাড়িসেবায় সম্প্রতি যোগ হয়েছে গাড়িভাড়া, আমার বাইক, ট্যাক্সিওয়ালাসহ আরও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান। তার মধ্যে আমেরিকান প্রতিষ্ঠান উবারের সেবা চালু হওয়ায় এবং উবারের বিনিয়োগ বেশি হওয়ায় অপেক্ষাকৃত কম ভাড়া রাখার ব্যবস্থা করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
এতে দেশীয় উদ্যোক্তাদের চ্যালেঞ্জ বেড়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে ‘চলো’র নির্বাহী পরিচালক দেওয়ান শুভ জানান, ‘মার্কেট অনেক বড়। সুতরাং আলাদা করে কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। বরং এতে আরও গতিশীলতা আসবে।’
তবে নতুন ধরনের এসব ট্যাক্সিসেবাকে নিয়মতান্ত্রিক করার ক্ষেত্রে সক্ষম নয় বিআরটিএ। ফলে রাজধানীতে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক পরিবহনসেবার বৈধ সম্প্রসারণ ঘটছে না। আবার উবার চালু হওয়ার পরপরই তা অবৈধ ঘোষণা করে বিআরটিএ। পরবর্তী সময়ে যদিও শর্তসাপেক্ষে উবারের কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি পায়।
বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, বিআরটিএ তথা সরকারের অনুমোদন ছাড়া কোনো ট্যাক্সিক্যাব সার্ভিস পরিচালনা সম্পূর্ণ বেআইনি, অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ট্যাক্সিক্যাব পরিচালনা হয়ে থাকে ট্যাক্সিক্যাব সার্ভিস গাইডলাইন-২০১০ অনুযায়ী। এ গাইডলাইন তৈরি করা হয়েছিল ২০০৭ সালে প্রণীত ট্যাক্সিক্যাব নীতিমালা অনুসরণ করে। ভাড়ায় চালিত বা রেন্ট-এ-কার হিসেবে পরিচালিত মোটরকার ও মাইক্রোবাস আলাদা সিরিজে নিবন্ধন করতে হয়। এ ছাড়া মোটরযান বিধিমালা অনুযায়ী প্রতিটি মোটরকার ও মাইক্রোবাসের আলাদা রং (কালো বডি ও হলুদ টপ) এবং মোটরযান অধ্যাদেশ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় রুট পারমিট বাধ্যতামূলক।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সভাপতি মোস্তাফা জব্বার এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘বিআরটিএ তাদের নীতিমালা মেনে অবৈধ ঘোষণা করেছেন। তাদের যে নীতিমালা তা পুরনো। ওই নীতিমালা করার সময় প্রযুক্তি নিয়ে তারা চিন্তাভাবনাই করেননি।’ তিনি আরও বলেন, ‘নিরাপত্তা ইস্যুতে বিআরটিএ থেকে নিবন্ধন নেওয়া ভালো। তবে অ্যাপের মাধ্যমে সেবা দেওয়া যাবে না, তা মেনে নেওয়া যায় না। অ্যাপের মাধ্যমে কেমন সেবা দেওয়া যায়, তা এখন স্পষ্ট। ডিজিটালাইজেশনের জন্য এবং যাত্রী-পরিষেবা আরও বৃদ্ধি করার জন্য এ আইন সংশোধন করা উচিত।’
চলো বা উবারের মতো সেবা নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে সন্তুষ্টির পাশাপাশি কিছু অভিযোগও রয়েছে। যেমন প্রয়োজনে এ-ধরনের সেবার অপ্রাপ্যতা, ভাড়া নিয়ে কিছু ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা ইত্যাদি। এ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলেন, এ-ধরনের সেবা আমাদের দেশে একেবারেই নতুন। সবকিছু ঠিক হতে আরও সময় প্রয়োজন।

NO COMMENTS

Leave a Reply