Home মূল কাগজ যেভাবে সাজাবেন একটি পরিবেশবান্ধব বাড়ি

যেভাবে সাজাবেন একটি পরিবেশবান্ধব বাড়ি

আবিদুল ইসলাম চৌধুরী


সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিবেশ সচেতনতার বিষয়টি বেশ হইচই ফেলে দিয়েছে। দিন দিন মানুষ সচেতন হচ্ছেন। মানুষের চাল-চলন ও জীবনধারা কীভাবে পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলছে, সে ব্যাপারেও তাদের ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পরিবেশ রক্ষার বা সবুজায়নের এই প্রবণতা ফুটে উঠতে দেখা যায় তাদের ঘর-বাড়ি নির্মাণ-কৌশল ও তার ডিজাইনে। আর এই নির্মাণ-কৌশল ও ডিজাইনে রয়েছে নানা প্রকারভেদ, যেটা নির্ভর করে নির্মাণ-উপকরণ ও অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জার কুশলতার ওপর।

পরিবেশবান্ধব নির্মাণ-সামগ্রী
পরিবেশবান্ধব বাড়ির নকশা বা নির্মাণ করবেন? তাহলে শুরুটা হতে হবে সেই অনুযায়ী নির্মাণ-সামগ্রী ব্যবহারের মধ্য দিয়ে। আর তাই বাণিজ্যিক বা আবাসিক ভবন উভয় ক্ষেত্রে টেকসই নির্মাণ-সামগ্রীর জনপ্রিয়তা বেড়েই চলেছে।

দেয়ালনির্ভর বাড়ি
যেকোনো বাড়ির কাঠামোতে যেকোনো আবহাওয়ায় একটি স্থিতিশীল দেয়ালের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। যখন আপনি পরিবেশবান্ধব বাড়ি নির্মাণ করতে চাইবেন তখন দেয়ালগুলোও সেভাবে নির্মাণ করতে হবে। আর সেটা এমনভাবে হতে হবে যেন সময়ের সঙ্গে যায় এবং দীর্ঘদিন আপনাকে সুরক্ষা দিতে পারে। একটি পরিবেশবান্ধব বাড়ির দেয়াল থেকে বহুমুখী সুবিধা পাওয়া যায়। এজন্য দেয়াল নির্মাণ-সামগ্রী বাছাই করার কাজটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশবান্ধব দেয়াল শুধু বাড়ির কাঠামোই দাঁড় করায় না, এটা বাইরের পরিবেশ থেকে অভ্যন্তরীণ সুরক্ষার ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী সমাধানও বটে।

কৌব (চাঙ্গের ঘর)
টিকে থাকার নিজস্ব ব্যবস্থাপনার কারণে চাঙ্গের তৈরি ঘরগুলো আকারে ছোট হয়। মূলত এই চাঙ্গ জিনিসটি হলো মাটি, বালু আর খড়ের এক বিশেষ মিশ্রণ, যা প্রতিটি আলগা উপকরণগুলোকে জমাটবদ্ধ করে টেকসই কাঠামো প্রদান করে। হয়তো ভাবছেন এই মিশ্রণটি ভেঙে পড়বে যেকোনো সময়! জেনে রাখুন, চাঙ্গের মিশ্রণটির স্থায়িত্ব ৫০০ বছরের বেশি। কারণ হলো এর নান্দনিক কাঠামোর ছাদ ও মেঝে। অত্যন্ত সুনিপুণ কৌশলে বাঁশ-কাঠের ত্রিভুজাকৃতির কাঠামোতে খড়ের আস্তরণ দ্বারা তৈরি হয় এর ছাদ। ঘরের মেঝেতে ব্যবহৃত পাথুরে উঁচু আস্তরণের কারণে বাড়তি আর্দ্রতা তৈরি হয় না। ফলে দেয়াল থাকে অক্ষুণœ। তাছাড়া এই পরিবেশবান্ধব ঘর যেমন হয় অদাহ্য, তেমনি পোকামাকড়মুক্ত।

স্ট্র বেল
এটা এমন এক ধরনের ঘর, যার দেয়াল মূলত খড়ের গাদা দিয়ে তৈরি। তবে এটার ভিত্তি কৌব মডেলে তৈরি ঘরগুলোর মতো। ফলে এই ঘরগুলোতেও আর্দ্রতা হয় কম। পাথুরের ভিত্তির ওপর গড়ে ওঠা এই মডেলের ঘরগুলো প্রধানত দুটি কৌশলে তৈরি করা হয়। প্রথমটা হলো লোড বেয়ারিং টেকনিক। এক্ষেত্রে খড়ের গাদাগুলোকে বক্স আকৃতির খ- খ- বুনটে তৈরি করা হয়। বুনটগুলো হয় খুবই ভারী এবং শক্ত, যা মজবুত দেয়াল হিসেবে কাজ করে। সবশেষে দেয়ালের ওপর আস্তরণ দেয়া হয়। অপরটি হলো নন-লোড বেয়ারিং টেকনিক। মূলত কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরি ফ্রেমে মাঝখানটাতে খড়ের গাদাগুলো ঠেসে বসিয়ে দিয়ে তৈরি করা হয় এর দেয়ালগুলো। তাই ঘরের লোড খড়ের গাদার ওপরে থাকে না। শুধু দেয়াল হিসেবেই কাজ করে এই স্ট্র বেল। প্রকৃতপক্ষে টেকনিক্যাল কারণে নয়, বরং পরিবশেবান্ধব হওয়াতে এই স্ট্র বেল মডেলের ঘর জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

ভূ-গর্ভস্থ বাড়ি
অন্য বাড়িগুলোর চেয়ে বেশি পরিবেশবান্ধব হলো ভূ-গর্ভস্থ বাড়ির ডিজাইন। এই ডিজাইনে একমাত্র দরজা আর কিছু জানালা ছাড়া বাকি কাঠামো থাকে মাটির নিচে। প্রাকৃতিক ঝড়ঝাপটার কারণে বেশির ভাগ ভূ-গর্ভস্থ বাড়িগুলো হয় কংক্রিটের তৈরি। সাধারণত তিন ধরনের হয় ভূ-গর্ভস্থ বাড়ির কাঠামো। প্রথমত, সবচেয়ে বেশি যে নির্মাণশৈলী চোখে পড়ে, তা হলো পাহাড় আবৃত বাড়ি। এ ধরনের বাড়িগুলো হয় পাহাড়ের ঢিবির ভেতর বা ঢালুতে। দরজা-জানালাগুলো বাইরের দিকে রেখে বাকি ঘরটা পাহাড়ের ভেতর গড়ে তোলা হয়। দ্বিতীয়ত, যে নির্মাণশৈলীটি আছে, সেটা হলো কৃত্রিমভাবে নির্মিত পাহাড়ে ঘর বানানো। মাটির ঢিবিতে বা কৃত্রিম ঢালু তৈরি করে তার অভ্যন্তরে তৈরি হয় ঘরগুলো। সম্পূর্ণ ভূমির ওপর নির্মিত হওয়ায় কিছু জায়গায় আবার আলগা মাটির স্তর বসানো হয়। সর্বশেষ শৈলীটিই হলো সত্যিকারের ভূ-গর্ভস্থ বাড়ি। কারণ মাটি খুঁড়ে গর্ত করে পুরো বাড়িটি তৈরি হয় ভূমির নিচে। অবশ্য ছাদ নির্মাণ করা হয় ভূ-পৃষ্ঠের সামান্য ওপরে, যাতে আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে।

পরিবেশবান্ধব ছাদ নির্মাণ
পরিবেশবান্ধব বাড়ি নির্মাণের জন্য পরিবেশবান্ধব দেয়াল তৈরি করেছেন ভালো কথা। তবে ছাদটাও কেন নয়? বরং নানাবিধ ব্যবহার-উপযোগী ছাদ তৈরির মাধ্যমে আপনার বাড়ি হয়ে উঠবে অধিকতর পরিবেশবান্ধব।

ভূমি-আচ্ছাদিত ছাদ
পরিবেশবান্ধব বাড়ির জন্য ছাদে সবুজায়ন করাটা সর্বাগ্রে সবার মনে আসে। অনেকেই ছাদে বাগান করে থাকেন। তবে এক্ষেত্রে প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা ও কৌশল। যার অভাবে হয়তো বিফল হতে পারে পরিবেশবান্ধব করার প্রচেষ্টা। তাই ছাদ সবুজায়নের জন্য যে কয়েকটি উপায় নির্মাণ-প্রকৌশলীরা বাতলে দেন, তার মধ্যে সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন হলো ভূমি-আচ্ছাদিত ছাদ। বাড়ি নির্মাণের সময় ছাদের কংক্রিট স্তর থেকে ওপরের অংশে মাটির লেয়ার বসানোর স্থায়ী ট্রের কাঠামো তৈরি করা হয়। বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য থাকে কৃত্রিম পরিখা। যেটা পানি নিষ্কাশনের ক্ষেত্রেও কাজে লাগানো যায়। পুরো অবকাঠামোটা সম্পূর্ণ হয়ে গেলে মনে হবে ছাদের ওপর একটি সবুজ মাঠ।

সৌর ছাদ
অনেকেই হয়তো ভাবছেন এটা সিলিকনের প্যানেলগুলোর মতো। প্রকৃতপক্ষে এটা হলো সোলার সিঙ্গলস। যেটা একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে, আবার টাইলসের কাজও করবে। সিআইজিএস প্রযুক্তিতে বসানো এই সোলার সিঙ্গলসগুলোতে বাড়তি কোনো কপার বা অ্যালুমিনিয়াম ফ্রেম ব্যবহার করতে হয় না। ফলে টাইলসগুলো দেখলে বোঝাই যায় না যে এগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজ করে।

পরিবেশবান্ধব ইন্টেরিয়র ডিজাইন
এক্ষেত্রে প্রথমেই বলতে হয় মেঝের কথা। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব ও আরামদায়ক মেঝের ক্ষেত্রে তিন ধরনের উপকরণ দিয়ে মেঝে তৈরি করতে পারবেন। প্রথমটা হতে পারে বাঁশের তৈরি। বাজেট আর নান্দনিকতার জন্য গাছের চেয়ে বাঁশের তৈরি মেঝে এখন জনপ্রিয়। বাঁশের কাঁচামালকে প্রক্রিয়াজাত করে অনেকটা প্লাইউডের আকৃতি তৈরি করা হয়। সুদৃশ্য রঙ এবং বাহারি ডিজাইনের বাঁশের তৈরি মেঝে এখন ইন্টেরিয়র ডিজাইনের অন্যতম উপকরণ।
রান্নাঘর ও ডাইনিংয়ের জন্য সবচেয়ে উপযোগী হলো কর্কের তৈরি মেঝে। তুতগাছের বাকল হলো এর মূল উপকরণ। এটা টেকসই এবং পরিবর্তনযোগ্য। তুলনামূলক নমনীয় এবং পছন্দ অনুযায়ী ডিজাইনে তৈরি কর্কের মেঝে অত্যন্ত পরিবেশবান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত।
এরপর আসে কার্পেট ব্যবহারের বিষয়। পবিবেশবান্ধব ইন্টেরিয়র ডিজাইনে প্রাকৃতিক আঁশ থেকে তৈরি কার্পেট সবার আগে প্রাধান্য পায়। সেক্ষেত্রে প্রধান উপকরণ হলো পাট এবং পশম। পশমকে বিশেষভাবে বুননের মাধ্যমে তৈরি কার্পেট বেশ আরামদায়ক। মেঝেতে পানি ছড়ানো রোধ করতে এটা অনন্য। তাছাড়া সিসল গাছ ও সামুদ্রিক ঘাস থেকে প্রাপ্ত ফাইবার কার্পেট খুবই মনোরম ও টেকসই।
পরিবেশবান্ধব ইন্টেরিয়র ডিজাইন পূর্ণতা পায় বাড়ির ভেতরকার দেয়াল সাজানোর ওপর। দেয়ালের ভেতরকার অংশে গাছের টব রাখাটাকে সবুজবান্ধব সৌখিনতা বলতে পারেন। বিভিন্ন আকৃতির খোপ তৈরি করে গাছের টবগুলো রাখা যায়। ফলে ঘরে যেমন বিশুদ্ধ বায়ুর অভাব হয় না, তেমনি স্থান সংকুলানও হয়।
দেয়ালের রঙ ইন্টেরিয়র ডিজাইনে সবচেয়ে মৌলিক উপকরণ। আর পরিবেশবান্ধব ঘরে দেয়ালের রঙটাও হওয়া চাই ভোলাটাইল অর্গানিক কম্পাউন্ড (ভিওসি) মুক্ত। প্রচলিত রঙগুলো দেয়ালে লাগানোর পর ভিওসিযুক্ত বিষাক্ত কেমিক্যাল ছড়াতে থাকে। তাই পরিবেশবান্ধব বাড়ির ইন্টেরিয়র সাজাতে ‘ইকো-ফ্রেন্ডলি পেইন্টস’ ব্যবহারের বিকল্প নেই।

পরিবেশবান্ধব উপযোগ
শুধু পরিবেশবান্ধব বাড়ি সাজালেই হবে না, বাড়িতে ব্যবহার-উপযোগী মৌলিক উপকরণগুলোও যেন হয় পরিবেশবান্ধব সেদিকে নজর রাখা চাই।

তাপ নিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থা
বাড়িতে দু’ভাবে পবিবেশবান্ধব তাপ নিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থা রাখা যায়। প্রথমত, কম্পিউটার-নিয়ন্ত্রিত থার্মোস্ট্যাটের মাধ্যমে। এটি দিনের তাপ ও আলোর ওপর নির্ভর করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাপ সংরক্ষণ করে। ঘরের ভেতর প্রয়োজন অনুসারে এটা তাপ নিয়ন্ত্রণ করে ঘরকে ঠা-া ও গরম রাখে। দ্বিতীয়ত, জিওথার্মাল অ্যানার্জি সিস্টেমস। এর মাধ্যমে ঘরের মেঝেগুলোর নিচে একটা ফাঁপা অংশ তৈরি করা হয়। জেনারেটরের মাধ্যমে সে অংশে পানি সংরক্ষণ করে তাতে তাপ প্রয়োগ করে ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহার
ছাদে বাগানের জন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের যে ব্যবস্থা আছে, সেটাকে মূল পানির উৎস থেকে আলাদাভাবে সংরক্ষণ করা যায়। সাধারণ ধোয়ামোছার পানিকে প্রাকৃতিকভাবে রি-ট্রিটমেন্ট করে পুনরায় সেই কাজে ব্যবহার-উপযোগী করা যায়। এসব কাজের মূল শক্তির জোগান আসে বিদ্যুৎ থেকে। তাই ছাদে সোলার প্যানেল থেকে প্রাপ্ত বিদ্যুৎকে যথাযথ ব্যবহার করার ব্যবস্থা রাখা জরুরি। এক্ষেত্রে ঘরে স্বল্প ওয়াটের বাল্ব (সিএফএল) ব্যবহার করে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা সম্ভব।
পরিবেশ বাঁচলে মানুষ বাঁচবে। তাই মানুষ পরিবেশবান্ধব নির্মাণে দিন দিন মনোযোগ দিচ্ছে। ফলে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন আসছে পরিবেশবান্ধব বাড়ির ডিজাইনে। সবচেয়ে কম কার্বন নিঃসরণ করে এমন ডিজাইন তৈরির জন্য নির্মাণ-প্রকৌশলীরাও সচেষ্ট, যাতে কম খরচে পরিবেশবান্ধব একটি বাড়ি হতে পারে সবার জন্য।

NO COMMENTS

Leave a Reply