Home ফিচার রাইড শেয়ারিং সেবা নিয়ে বাড়ছে অভিযোগ

রাইড শেয়ারিং সেবা নিয়ে বাড়ছে অভিযোগ

0 110

কারিকা প্রতিবেদক
চৈত্রের বিকেলে কাল বৈশাখীর হানা। যানজট ও গণপরিবহন স্বল্পতার এ নগরীতে অফিস ছুটির সময়ে আসা কাল বৈশাখী ঝড় যেন আরেকদফা দুর্ভোগ বাড়িয়ে দিয়ে গেল। বেসরকারি চাকরীজীবী মাহমুদউল­াহ রিয়াদ তাই অফিস শেষে বাড়ি ফেরা নিয়ে খানিকটা চিন্তিত। স্বাচ্ছন্দে বাড়ি ফিরতে তিনি অ্যাপস ভিত্তিক রাইড শেয়ারিং সেবার দ্বারস্থ হলেন।
তিন থেকে চারবার চেস্টা করেও মাহমুদুল­াহ তার কাঙ্খিত গন্তব্য মিরপুর যেতে কোন গাড়ি পেলেন না। প্রত্যোক চালক-ই রাইড অনুরোধ গ্রহন করে নিয়ম ভেঙ্গে গন্তব্য জিজ্ঞাসা করে। গন্তব্য শুনে সেখানে যেতে অনীহা প্রকাশ করে রাইড বাতিল করে দেয়ার অনুরোধ করে অথবা নিজেরাই রাইড বাতিল করে দেয়। অনেকক্ষণ চেষ্টার পর গাড়ি না পেয়ে একপ্রকার হতাশ হয়ে মাহমুদউল­াহ বিকল্প উপায়ে বাড়ি ফেরেন।
গণপরিবহন সংকটের এই নগরীতে সিএনজি অটোরিক্সা চালকদের স্বেচ্ছাচারিতা থেকে খানিকটা মুক্তি দিয়েছিলো অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং সেবা। কিন্তু দিনের পর দিন রাইড শেয়ারিং সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগের পাল­া ভারী হচ্ছে।
রাইড রিকোয়েস্ট গ্রহণ করে গন্তব্যস্থল জানতে চাওয়া, গন্তব্য পছন্দ না হলে যেতে না চাওয়া, রাইড রিকোয়েস্ট গ্রহণ করে যাত্রী না নিয়ে চলে যাওয়া, ব্যস্ত সময়ে অ্যাপে না গিয়ে চুক্তিতে যাওয়া, বেশি ট্রিপের জন্য দ্রুত গতিতে গাড়ি চালানো ছাড়াও যৌন হয়রানি এবং অ্যাপের সাথে চালকের ছবি, যানবাহনের নাম্বার প্লেট না মেলার মতো গুরুতর অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে রাইড শেয়ারিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে। এছাড়াও অদক্ষ চালক দিয়ে রাইড পরিচালনা, যাত্রীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করা, ম্যাপ ব্যবহার করে পিকআপ পয়েন্টে পৌছতে না পারা, ট্রাফিক আইন না মানা, যানবাহনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না রাখা, অ্যাপে প্রর্দশীত রুট ব্যবহার না করে ভিন্নরুট ব্যবহার করা, অ্যাপে দেখানো ভাড়ার থেকে অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করা, অ্যাপসে প্রর্দশীত ভাড়ার চেয়ে যাত্রা শেষে মাত্রাতিরিক্ত ভাড়া আসার মতো পুরনো অভিযোগ তো রয়েছেই।
ইদানীং অপরিস্কার, নিম্নমানের গাড়ি ও বাইক দিয়ে সেবা প্রদানের অভিযোগ করেছেন কোন কোন যাত্রী।
আফিফ সরকার নামে একজন রাইড শেয়ারিং সেবাগ্রহীতা ফেসবুকের ট্রাফিক অ্যালার্ট গ্রুপে অভিযোগ করে লিখেছেন ‘একটি রাইড সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সাধারণ ক্যাটাগরীতে যে ধরনের নিম্নমানের গাড়ি দিয়ে সেবা প্রদান করা হচ্ছে সেটা সত্যিই হতাশাজনক।
চ্যানেল ন্টোয়েন্টি ফোরের সংবাদকর্মী মোহাম্মদ তৌহিদ হাসান কারিকাকে বলেন, রাইড শেয়ারিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ একটাই। অফিস যাওয়ার সময় অন্তত দশজনকে গন্তব্যে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করতে হয়। তারপর হয়তো একটা কাঙ্খিত গাড়ির দেখা মেলে। অফিসে টাইমে চাহিদা বেশি থাকায় এই সময় অ্যাপে ভাড়াও দেখায় দ্বিগুন। রাইড শেয়ারিং সেবার শুরুও দিকে যেখানে মোটরবাইকে ৮০-৯০ টাকায় গন্তব্যে যাওয়া যেত, এখন সেখানে সত্তর থেকে আশি শতাংশ ছাড় দেওয়ার পর হয়তো ৯০ টাকায় গন্তব্যে যাওয়া যাচ্ছে এখন। মোটরবাইকে রাইড নেয়ার সময় যে হেলমেট সরবরাহ করা হয় সেটাও খুব নাজুক ও অপরিস্কার। এই ধরনের হালকা হেলমেট দিয়ে নিরাপত্তার ঝুঁকি দুর করা যায় না বলে জানালেন তিনি।
বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আদনান। বন্ধুর বাসা রামপুরায় দাওয়াতে যেতে রাইড শেয়ারিং সেবার দ্বারস্থ হোন। কাঙ্খিত গন্তব্যে যাওয়ার জন্য রাইড পেয়েও যান। কিন্তু অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর চালক পিকআপ পয়েন্টে না আসায় আদনান চালকের মোবাইলে ফোন দেন। চালক ফোন ধরে জানালেন তিনি পরীবাগে আছেন। মিন্টুরোডে যাত্রী নামিয়ে দিয়ে কাওরান বাজারে পিকআপ পয়েন্টে আসবেন। গন্তব্যে যাওয়ার তাড়া থাকায় সেই রাইড বাতিল করে অন্য একটি গাড়ি করে গন্তব্যে পৌছান আদনান।
সম্প্রতি কার্ভাড ভ্যানের ধাক্কায় উবার মোটোর মোটরসাইকেল থেকে পড়ে গিয়ে নিহত হন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাহমিদা হক লাবণ্য।
ওই ঘটনায় শিক্ষার্থীকে বহনকারী ‘উবার মোটো’র চালক নিজের তথ্য গোপন করে রাইড শেয়ারিং অ্যাপে নিবন্ধন করেন বলে জানান, ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার। ২৮ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, উবার চালক সুমন হাসপাতালে যে ঠিকানা দিয়েছিলেন সে ঠিকানা ছিল ভুয়া। এমনকি যে ঠিকানা দিয়ে বিকাশ অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে সেই ঠিকানায়ও তাকে পাওয়া যায়নি।
এছাড়া উবার অফিসে যে ঠিকানা দিয়ে চালক সুমন রেজিস্ট্রেশন করেছিলেন সেটিও ভুয়া। সংবাদ সম্মেলনে বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, উবারের অফিসে ভুয়া ঠিকানা দিয়ে রাইডাররা নিবন্ধন করে কিভাবে সড়কে রাইড শেয়ারিং করার অনুমতি পায় সেটা খতিয়ে দেখা হবে।
রাইড শেয়ারিং সেবা নিয়ে দিন দিন অভিযোগের পাল­া ভারী হলেও এ সংক্রান্ত নীতিমালা চূড়ান্ত না হওয়ায় ব্যবস্থা নিতে পারছেনা বিআরটিএ।
রাইড শেয়ারিং সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরাসরি অভিযোগ জানানোর সুযোগ না থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা। যাত্রীরা বলছেন, অ্যাপে অভিযোগ করার পর অভিযোগের বিপরীতে কোন উত্তর দেয়ার প্রয়োজন মনে করে না রাইড শেয়ারিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো।
আবার যাত্রীর অভিযোগের ভিত্তিতে চালকের বিরুদ্ধে কি ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হলো সেটাও বেশিরভাগ সময় যাত্রীরা জানতে পারেন না। রাইড শেয়ারিং সেবাকে নীতিমালার আওতায় আনার পাশাপাশি অভিযোগ জানানোর জন্য জরুরী হটলাইন নাম্বার চালু করার দাবি জানিয়েছেন রাইড শেয়ারিং সেবা গ্রহীতারা। বিশ্বমানের রাইড শেয়ারিং সেবা রাজধানী ঢাকাতেও যেন বিশ্বমান বজায় রেখে সেবা দিতে পারে এমনটাই প্রত্যাশা তাদের।

NO COMMENTS

Leave a Reply