Home বাজার দর অন্যান্য রাজধানীতে জলাবদ্ধতার জন্য দায়ী ওয়াসার ড্রেন!

রাজধানীতে জলাবদ্ধতার জন্য দায়ী ওয়াসার ড্রেন!

কারিকা প্রতিবেদক
ঢাকাকে তিলোত্তমা রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলতে বরাবরই চেষ্টা ছিল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। বর্তমান সময়েও নিয়মিত চলছে উন্নয়নযজ্ঞ। কিন্তু প্রায় দুই কোটি মানুষের এ শহরে বৃষ্টি-বিলাসের সুযোগ নেই বললেই চলে। ঢাকায় বৃষ্টি যেন এক আতঙ্কের নাম। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমের বৃষ্টি এ নগরের বাসিন্দাদের জন্য যতটা না আশীর্বাদ, তার চেয়ে বেশি অভিশাপ। সামান্য একটু বৃষ্টিতেই জলমগ্ন হয়ে পড়ে রাজধানীর সড়কগুলো। তৈরি হয় তীব্র যানজট। ছোট-বড় দুর্ঘটনাও ঘটে। পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ থাকায় জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে অধিকাংশ এলাকা। বৃষ্টির দিনে উৎকণ্ঠা আর দুর্ভাবনায় পড়তে হয় রাজধানীর বাসিন্দাদের।
চলতি বৃষ্টি মৌসুমেও চিরচেনা জলাবদ্ধতার রূপ দেখেছে ঢাকাবাসী। ভয়াবহ জলাবদ্ধতার পেছনে রয়েছে অসংখ্য কারণ। নগরবিদরা বলছেন, নদী ভরাট রোধ, দখল হওয়া খাল উদ্ধার, পলিথিনের অবাধ ব্যবহার বন্ধ, অপরিকল্পিত বক্স কালভার্ট ও কার্যকর ড্রেনেজ সিস্টেম চালু করতে পারলে বহুলাংশে এ সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। এজন্য সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতাও জরুরি।
ঢাকা শহরের চারদিক বেষ্টন করে আছে তুরাগ, বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদ-নদী। শহরের ভেতরে শিরা-উপশিরার মতো ছড়িয়ে আছে ৬৫টি খাল। কিন্তু বেপরোয়া দখলদারিত্বে ভরাট হয়ে যাচ্ছে নদী ও খাল। রাজধানীর আশপাশে কয়েকটি খাল মৃতপ্রায় অবস্থায় থাকলেও অধিকাংশ খালের অস্তিত্বই এখন আর নেই। এসব নদী ও খাল এক সময় পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক পথ হিসেবে ব্যবহার হতো। ঢাকা ওয়াসার তৈরি বিভিন্ন ড্রেন ও বক্স কালভার্টও ময়লা-আবর্জনায় ভরপুর। ফলে বৃষ্টির পানি সরতে বাধাগ্রস্ত হয়। এসব ড্রেন ও কালভার্ট নিয়মিত পরিষ্কারে গড়িমসি দেখা যায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকায় ময়লা ফেলার জন্য অসচেতন নাগরিকরা বেছে নেয় রাস্তাঘাট। নিষিদ্ধ পলিথিনও ফেলা হচ্ছে। পলিথিন মাটির পানি শোষণক্ষমতা নষ্টের পাশাপাশি নিষ্কাশনের পথও বন্ধ করে দেয়। এছাড়া বিভিন্ন উন্নয়নকাজে ব্যবহারের পর ফেলে রাখা জিনিসপত্র বৃষ্টি বা বিভিন্নভাবে গিয়ে ঠাঁই নেয় ড্রেনে। এতে ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় পানিপ্রবাহ। এছাড়া রাজধানীতে কমে গেছে উন্মুক্ত মাটি। ভবন বা রাস্তা দিয়ে ঢেকে ফেলা হয়েছে অধিকাংশ জায়গা। গত কয়েক বছরে ঢাকা শহরের খোলা জায়গা ভরাট করে অপরিকল্পিতভাবে বিপুল পরিমাণ ভবন গড়ে উঠেছে। আরও নতুন ভবন নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে। এসব নির্মীয়মাণ ভবনের কাজে ব্যবহৃত মাটি বৃষ্টির ঢলের সঙ্গে গিয়ে জমা হয়েছে ড্রেনে। ফলে মাটি জমে অকেজো হয়ে পড়েছে ড্রেনেজ-ব্যবস্থা।
এদিকে রাজধানীর উন্নয়নে বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও সেবা সংস্থা কাজ করে। একাধিক প্রতিষ্ঠানের কাজ আর দায় এড়ানোও জলাবদ্ধতা তৈরির নিয়ামক! কারণ কোনো সমন্বয় ছাড়াই যে যার মতো উন্নয়নকাজ করে যায়। বিভিন্ন প্রয়োজনে সারাবছরই চলতে থাকে খোঁড়াখুঁড়ি।
কয়েক বছর ধরে চলছে মেট্রোরেল নির্মাণকাজ। বৃষ্টির সময় পাথর ও মাটিতে বন্ধ হয়ে যায় পানিপ্রবাহের ড্রেনগুলো। রাজধানীর গ্রিন রোড, তেজকুনিপাড়া, তেজতুরী বাজার, খিলগাঁও, গোড়ান, বাড্ডা, সবুজবাগ, বাসাবো, বনশ্রী, নয়াপল্টন, কাকরাইল, শান্তিনগর, মৌচাক, মগবাজারের ভেতরের দিকে গলি ও ফার্মগেট থেকে কারওয়ান বাজার এলাকার অধিকাংশ সড়কই পানিতে তলিয়ে যায় অল্প বৃষ্টিতে। ধানমÐি, বনানী ও উত্তরার বিভিন্ন এলাকাও জলমগ্ন হয়ে যায়। এছাড়া কারওয়ান বাজার থেকে এফডিসি রোড, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদসহ আশপাশের এলাকায় পানি জমে যায় স্বল্প সময়ের বৃষ্টিতেই। মিরপুর অঞ্চলের কালশী রোড, কাজীপাড়া, সেনপাড়া, ১৩ নম্বর সেকশন, মিরপুর-৬ নম্বরের একাংশ, ১০ নম্বর গোলচত্বরের সড়কের একাংশেও পানি জমে যায় হালকা বৃষ্টিতেই। রাজধানীর ব্যাংকপাড়াখ্যাত মতিঝিল এলাকাও জলাবদ্ধতা থেকে রেহায় পায় না। বিশেষ করে নটর ডেম কলেজের সামনের সড়ক, ফকিরাপুল, শাপলা চত্বরের অবস্থা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। পুরান ঢাকার প্রায় সর্বত্রই অল্প বৃষ্টিতে পানি জমে যায়।
সূত্র জানায়, রাজধানীর সড়কগুলোতে দুই হাজারের মতো ক্যাচপিট রয়েছে। এর মধ্যে ময়লা-আবর্জনা জমে এক হাজারের বেশি ক্যাচপিট বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টির পানি নেমে যাওয়ার সুযোগ থাকছে না।
নগরের জলাবদ্ধতা ও সার্বিক বিষয় নিয়ে ওয়াসার পরিচালক (কারিগরি) একেএম শহীদ উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে জলাবদ্ধতা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নও করা হয়েছে। ড্রেনগুলো পরিষ্কার করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এ বছর জলাবদ্ধতা তুলনামূলক কম। অনেক জায়গায় ময়লা-আবর্জনা জমা হয়ে ক্যাচপিটগুলো বন্ধ হয়ে যায়, এতে পানি নামতে পারে না। আমাদের কর্মচারীরা সার্বক্ষণিক কাজ করছে।’
বিশিষ্ট নগর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনের ব্যাপারে রাজধানী ঢাকায় কোনো একক সংস্থা নেই। একাধিক সংস্থা কাজ করে। তাদের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। অথচ চাইলে ঢাকার সার্বিক সমস্যা সমাধানে একটা সুপার অথরিটি তৈরি করা যায়। যারা সুশাসন, পরিচালন ও সমন্বয়ের জন্য সর্বোচ্চ ক্ষমতা নিয়ে কাজ করবে। জলাবদ্ধতা নিরসনে কী কী বিষয় প্রাধান্য পেতে পারে-তা এ অথরিটি বসেই ঠিক করতে পারে।

NO COMMENTS

Leave a Reply