Home বাজার দর অন্যান্য রাজধানীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ : সতর্কতা ও করণীয়

রাজধানীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ : সতর্কতা ও করণীয়

কারিকা প্রতিবেদক
রাজধানী ঢাকায় বিগত ২০ বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ বেড়েছে। এবারের ডেঙ্গুর ধরনও ভিন্ন। ইতোমধ্যে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত বেশ ক’জন মারা যাওয়ায় এই নিয়ে চরম ভীতি কাজ করছে মানুষের মধ্যে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এতদিন ব্যবহার করে আসা মশকনিধন ওষুধ পাল্টে নতুন ওষুধের ব্যবহার শুরু করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) কর্তৃপক্ষ। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনও (ডিএসসিসি) মশা নির্মূলে ব্যাপক গুরুত্ব দিচ্ছে। এমতাবস্থায় শুধু সিটি করপোরেশনের দিকে তাকিয়ে না থেকে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো বেশি জরুরি বলে মনে করছেন চিকিৎসকসহ সচেতন মহল।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ছিটানো ওষুধে মশা মরছে না। রাজধানীর মানুষ মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ। এ বছর বর্ষা মৌসুম শুরুর সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক এডিস মশা প্রচলিত কীটনাশক দিয়ে মরছে না। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৮ সালের মার্চের মধ্যে করা গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, ঢাকা শহরের এডিস মশা ওষুধ-প্রতিরোধী।
আইসিডিডিআরবির প্যারাসাইটোলজি ল্যাবরেটরির সহযোগী বিজ্ঞানী ও এই গবেষণা দলের প্রধান মোহাম্মদ শফিউল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আজিমপুর, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, গুলশান, কড়াইল, মিরপুর-১, উত্তরা সেক্টর-৪, মালিবাগ চৌধুরীপাড়া ও খিলগাঁও এলাকা থেকে এডিস মশার ডিম সংগ্রহ করা হয়। পরীক্ষাগারে সেই ডিম থেকে লার্ভা ও পরে মশা তৈরি করা হয়। সেই মশাকে ঢাকা শহরে ব্যবহার করা হচ্ছে-এমন কীটনাশকের সংস্পর্শে আনা হয়। তাতে দেখা যায়, সব মশা মরছে না। কীটনাশকের বিষক্রিয়া সহ্য করেও অনেক মশা বেঁচে থাকছে।’
গবেষণাটির সঙ্গে আইসিডিডিআরবির তিনজন ও যুক্তরাষ্ট্রের দুটি প্রতিষ্ঠানের তিনজন বিজ্ঞানী যুক্ত ছিলেন। গত বছর ২২ মে এই গবেষণার ফলাফল একটি অনুষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তাদের সামনে প্রকাশ করে আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানীরা। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে সরকারের স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের (সিডিসি) পরিচালক অধ্যাপক সোনিয়া তাহমিনা এবং রোগতত্ত¡, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক মিরজাদী সাব্রিনা ফ্লোরা উপস্থিত ছিলেন। দুই সিটির তখনকার প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তারাও ছিলেন।
জানা গেছে, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় মানোত্তীর্ণ নয়, ছিটালে মশা তেমন মরে না-সম্প্রতি মশকনিধনের এমন ওষুধ ব্যবহার বন্ধ করে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে উত্তর সিটি করপোরেশন। তারা নতুন ওষুধ ব্যবহার করছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আগে দ্য লিমিট অ্যাগ্রো প্রডাক্ট লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানের ‘লিমিট লিকুইড ইনসেকটিসাইড’ নামের ওষুধটি ব্যবহার করত দুই সিটি করপোরেশন। উত্তর সিটি করপোরেশন ওই ওষুধ পরীক্ষার জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্ল্যান্ট প্রোটেকশন উইংয়ে (পিপিইউ) পাঠায়। সেখানে পরীক্ষায় ওষুধটি মানোত্তীর্ণ হয়নি। তাই ডিএনসিসিতে ওই ওষুধের ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মশা নিধনে বর্তমানে ডিএনসিসি নকন লিমিটেডের ‘নকন মসকিউটো ইনসেকটিসাইড’ নামের ওষুধটি ব্যবহার করছে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা ও করণীয়
ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও সচেতনতায় বেশকিছু পরামর্শ দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন ও চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ। গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি জানিয়েছেন, ডেঙ্গুর কোনো ভ্যাক্সিন নেই। যেহেতু ডেঙ্গু ভাইরাস চার ধরনের, তাই চারটি ভাইরাস প্রতিরোধে কাজ করে-এমন ভ্যাক্সিন এখনও আবিষ্কৃৃত হয়নি। তাই ডেঙ্গুজ্বর প্রতিরোধের মূলমন্ত্রই হলো এডিস মশার বিস্তার রোধ এবং এই মশা যেন কামড়াতে না পারে-তার ব্যবস্থা করা।
এডিসকে ‘ভদ্র’ মশা আখ্যায়িত করে ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, ‘অভিজাত এলাকায় বড় বড় সুন্দর সুন্দর দালানকোঠায় এরা বসবাস করে থাকে। স্বচ্ছ পানিতে ডিম পাড়ে। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার ডিম পাড়ার উপযোগী স্থানগুলোকে পরিষ্কার রাখতে হবে এবং একই সঙ্গে মশক নিধনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’
তার মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যক্তিগত সতর্কতার গুরুত্ব অপরিসীম। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই চিকিৎসক বলেন, ‘এডিস মশা মূলত দিনের বেলা, সকাল ও সন্ধ্যায় কামড়ায়, তবে রাতে উজ্জ্বল আলোতেও কামড়াতে পারে। দিনের বেলা যথাসম্ভব শরীর ভালোভাবে ঢেকে রাখতে হবে, মশার কামড় থেকে বাঁচার জন্য ঘুমানোর সময় দিনে ও রাতে মশারি ব্যবহার করতে হবে। সম্ভব হলে ঘরের দরজা ও জানালায় নেট লাগানো যেতে পারে। প্রয়োজনে মসকুইটো রিপ্লেন্ট স্প্রে, লোশন বা ক্রিম, কয়েল, ম্যাট ব্যবহার করা যেতে পারে। বাচ্চাদের হাফপ্যান্টের পরিবর্তে ফুলপ্যান্ট বা পায়জামা পরাতে হবে।’
বসতবাড়ির বাইরে মশার বংশ বিস্তার রোধে করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘মাঝে মাঝে বিক্ষিপ্তভাবে বৃষ্টি হওয়ার ফলে ঘরের বাইরে পানি জমতে পারে। যেমন ফুলের টব, প্লাস্টিকের পাত্র, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের ড্রাম, মাটির পাত্র, টিনের কৌটা, ডাবের পরিত্যক্ত খোসা, কন্টেইনার, মটকা, ব্যাটারির শেল, পলিথিন ও চিপসের প্যাকেট ইত্যাদি। এসব জায়গায় জমে থাকা পানি দ্রুত ফেলে দিতে হবে।’
বসতবাড়ির মশা নিধন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সবার আগে ঘরে সাজানো ফুলদানি, অব্যবহৃত কৌটা, বাড়িঘর এবং বাড়ির আশপাশে যেকোনো পাত্র বা জায়গায় জমে থাকা পানি তিন থেকে পাঁচদিন পরপর ফেলে দিলে এডিস মশার লার্ভা মারা যায়। পাত্রের গায়ে লেগে থাকা মশার ডিম অপসারণে পাত্রটি ভালোভাবে ঘষে পরিষ্কার করে নিতে হবে। ঘরের বাথরুমে কোথাও জমানো পানি পাঁচদিনের বেশি যেন না থাকে-সেটা নিশ্চিত করতে হবে। ঘরের অ্যাকুয়ারিয়াম, ফ্রিজ বা এয়ার কন্ডিশনারের নিচে এবং মুখ খোলা পানির ট্যাংকে যেন পানি জমে না থাকে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। বাড়ির ছাদে অনেকেই বাগান করে থাকেন। সেখানে টবে বা পাত্রে যেন কোনো ধরনের পানি পাঁচদিনের বেশি জমে না থাকে, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। বাড়ির আশপাশে ঝোপঝাড়, জঙ্গল, জলাশয় ইত্যাদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।’

NO COMMENTS

Leave a Reply