Home মূল কাগজ ইন্টেরিয়ার রিয়েল এস্টেটে নতুন প্রযুক্তি ভার্চুয়াল রিয়েলিটি

রিয়েল এস্টেটে নতুন প্রযুক্তি ভার্চুয়াল রিয়েলিটি

ফাইজুল ইসলাম
সাম্প্রতিককালে বিশ্বে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি বা সংক্ষেপে ভিআর প্রযুক্তির বিরাট অগ্রগতি হয়েছে। ইংরেজি শব্দগুচ্ছ ভার্চুয়াল রিয়েলিটি অর্থ যা বাস্তব না হলেও বাস্তব বলে গণ্য। আগে ভিআর প্রযুক্তিতে ভারী ভারী সরঞ্জাম ব্যবহৃত হতো। এখন তা বহনযোগ্য ও ব্যয়সাশ্রয়ী। মোবাইল ও হেডসেট ব্যবহার করেই এই প্রযুক্তি থেকে পাওয়া যাচ্ছে এর উপকারিতা। এই কারণে এ ধরনের ডিভাইসের কেনাবেচা ক্রমেই বাড়ছে। এর কনটেন্টও হচ্ছে অধিক মানসমৃদ্ধ ও বাস্তবসম্মত। ভিআর প্রযুক্তির ব্যবহারিক ও বাণিজ্যিক আবেদনও আছে। যেমন- রিয়েল এস্টেটে তথা প্লট, ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট ব্যবসার প্রসারে এই প্রযুক্তির ব্যবহারের কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। রিয়েল এস্টেট এজেন্সিগুলো কাস্টমারদের আকর্ষণে এবং প্রপার্টিগুলো পরিদর্শনের খরচ কমাতে এখন ভিআর প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন অবলীলায়।
২০১৫ সাল থেকে ভিআর প্রযুক্তি রিয়েল এস্টেটসহ বিভিন্ন শিল্পে একটি নতুন মার্কেটিং কৌশল হিসেবে আবিভূত হয়েছে। এজেন্সিগুলো স্যামসাং ভিআর হেডসেটের মাধ্যমে আমেরিকার লসঅ্যাঞ্জেলেস, নিউইয়র্ক ও হামটনসহ অভিজাত শহরের মাল্টিমিলিয়ন ডলার মূল্যের অ্যাপার্টমেন্ট ও বাড়িগুলো তাদের ভিআইপি ক্রেতাদের দেখাতে শুরু করল। তারপর থেকে অসংখ্য ভিআর রিয়েল এস্টেট প্রজেক্ট তৈরি হতে থাকল। ভিআর প্রযুক্তিও বহুমুখী কর্মশক্তিসম্পন্ন ও ডাইনেমিক তথা গতিশীল হলো। বিশেষজ্ঞরা ভবিষ্যদ্বাণী করলেন এই বলে যে, রিয়েল এস্টেটে ভিআর প্রযুক্তির উত্থান হবে অপ্রতিরোধ্য। ২০২৫ সাল নাগাদ এই শিল্পে ভিআর/এআর সফটওয়্যার থেকে মোট আয় হবে ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। তারপরও এই শিল্পে এখনো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। এই চ্যালেঞ্জগুলো হলো হাইকোয়ালিটির কনটেন্ট তৈরি করা, কনটেন্ট তৈরিতে কম সময় নেয়া এবং হেডসেটের মূল্য ক্রয়সীমার মধ্যে রাখা ইত্যাদি।

রিয়েল এস্টেটে ভিআর প্রযুক্তির ব্যবহারিক আবেদন
রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় কয়েকটি ক্ষেত্রে ভিআর প্রযুক্তির প্রায়োগিক আবেদন রয়েছে। যেমন-
১. ভার্চুয়াল ট্যুরসঃ ব্যক্তিগত ব্যবহার বা ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য কোনো প্রপার্টি ক্রয় করা অনেক ঝক্কি-ঝামেলার ব্যাপার। এজন্য সময়ও লাগে অনেক। দিতে হয় সীমাহীন ধৈর্য্যের পরিচয়। যদি প্রপার্টি ও ক্রেতার ভৌগোলিক অবস্থান হয় ভিন্ন ও বেশি দূরত্বের, তাহলে তা ক্রয় করা হয়ে পড়ে আরও কঠিন। এক্ষেত্রে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি সময় ও অর্থ বাঁচাতে সহায়তা করে। রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে প্রজেক্ট এরিয়া ঘুরে আসা যায় কয়েক মুহুর্তের মধ্যে। প্রপার্টি সম্পর্কে প্রিভিউ বা একটি আগাম ধারণা দেওয়াও সম্ভব হয়। এ ধরনের রিয়েল এস্টেট ভার্চুয়াল ট্যুর প্রদর্শনের জন্য যে কোনো আধুনিক ভিআর হেডসেটই যথেষ্ট। সেই ট্যুর হতে পারে ৩৬০-ভিডিও ফরম্যাটে অথবা নৌ বা বিমান যাত্রার মধ্য দিয়েও তা দেখানো যেতে পারে, যা হবে আরো প্রাণবন্ত ও উপভোগ্য।
২. ভার্চুয়াল ভিজ্যুয়ালাইজেশনঃ রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় যেসব প্রপার্টি নির্মাণাধীন রয়েছে, ভিআর প্রযুক্তি তার বিক্রয়ের ক্ষেত্রেও ব্যাপক সহায়তা করতে পারে। মার্কেটিংয়ের কর্মী ও রিয়েল এস্টেট এজেন্টরা এ ধরনের হাউজিংয়ের বিজ্ঞাপনে বহু কষ্ট করে থাকেন। কেননা সেখানে দেখার মতো আসলে বাস্তব জিনিসের অভাব রয়েছে। কিন্তু ভার্চুয়াল ভিজ্যুয়ালাইজেশনের মাধ্যমে তা সহজে দেখানো যায়। স্থাপত্যগত থ্রিডি ভিজ্যুয়ালাইজেশন প্রপার্টির ভবিষ্যৎ চেহারা কেমন হবে তা প্রদর্শন করে অতি সহজে। এর ভেতর ও বাইরের ডিজাইনও প্রদর্শন করে চমৎকারভাবে।
৩. ভার্চুয়াল স্টেজিংঃ ম্লান দেয়াল, ফার্নিচারের অনুপস্থিতি, ডেকোরেশনের অভাব ইত্যাদি ক্ষেত্রে অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির সুযোগ কমে যায়। ১৯৮৫ সালের দিকে রিয়েল এস্টেট এজেন্সিগুলো ইন্টেরিয়র ডিজাইনারদের সহযোগিতা নিতে শুরু করেন। তাদের সাহায্যে প্রপার্টি শো বাড়াতে থাকেন। একেই বলা হয় ভার্চুয়াল স্টেজিং। তারা দেখলেন স্টেজিং করা হাউস বা ফার্নিচার দিয়ে সাজানো-গোছানো অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি হচ্ছে হু হু করে। এতে অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি হতে লাগছে ৮০ ভাগ কম সময়। এই পদ্ধতি ভার্চুয়াল শোকেসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে। তাছাড়া এমন সব উপাদান দিয়ে ভার্চুয়াল স্টেজিং করা হয়, যাতে তেমন একটা খরচ হয় না।
৪. ভি-কমার্সঃ প্রপার্টির স্টেজিংয়ের অন্য এক উপকারিতাও আছে। এতে রিয়েল এস্টেট এজেন্ট ও অ্যাপার্টমেন্ট মালিক উভয়ই একসঙ্গে উপকৃত হন। এজেন্টরা ব্যবসা করেন আর অ্যাপার্টমেন্ট মালিকরা অ্যাপার্টমেন্ট সাজাতে ভালো ধারণা পেয়ে যান। এজন্য ভার্চুয়াল ইন্টেরিয়র ডিজাইন হলো ভি-কমার্সেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

রিয়েল এস্টেটে ভার্চুয়াল রিয়েলিটির উপকারিতা

আমাদের জীবনযাপনকে আরো সহজ ও সুবিধাজনক করে তোলার জন্য আজ ভিআর প্রযুক্তির গুরুত্ব সর্বাধিক। কাজের পরিবেশ আরো টেকসই করতেও এর কোনো জুড়ি নেই। রিয়েল এস্টেটের মতো ব্যবসায় ভার্চুয়াল রিয়েলিটির বেশকিছু সুবিধা রয়েছে, যেমনঃ

১. সময়ের সাশ্রয়ঃ আমাদের জীবনে সময়ের চেয়ে কোনো কিছুই মূল্যবান নয়। ভার্চুয়াল রিয়েলিটিকে ধন্যবাদ। এতে নতুন সম্পদের অনুসন্ধান ও পর্যালোচনা সম্পন্ন হতে পারে দ্রুত প্রক্রিয়ায়। ভার্চুয়াল ট্যুরের মাধ্যমে দিনের পর দিন ও ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্লট ও ফ্ল্যাট পরিদর্শনের আর দরকার পড়ে না। ক্রেতা ও বিক্রেতা কোনো ঝুট-ঝামেলা ছাড়াই অফিসে বা বাসায় বসে যে কোনো সময় ভিআর হেডসেট ব্যবহার করে তার সমাধান করে ফেলতে পারেন।
২. অর্থের সাশ্রয়ঃ প্রথমে ভিআর প্রযুক্তিকে অনেকে ব্যয়বহুল মনে করতে পারেন। মনে হতে পারে, এটা একটা হাই-টেকনোলজির ব্যাপার। তার কারণ ভার্চুয়াল ট্যুরে লাগে মানসম্মত গ্রাফিকস ও কমার্শিয়াল ফিচার। কিন্তু এটা ব্যয়বহুল হলেও মূল্যবান মুনাফাও এনে দেয়। প্রিন্ট ও অনলাইন মিডিয়ায় বিজ্ঞাপনের পেছনে যে খরচ হয় তা কমিয়ে দেয়। খরচ কমিয়ে দেয় ভার্চুয়াল স্টেজিংয়ের ক্ষেত্রেও। রিয়েল এস্টেটের ইন্টেরিয়র ডিজাইন, ফার্নিচার প্লেসমেন্ট ইত্যাদি থ্রিডি মডেল ব্যবহার করে উপস্থাপন করা যেতে পারে। পৃথক লোকেশনে আবার এটাই পুনঃব্যবহারযোগ্যও বটে।
৩. আবেগ তৈরি করা্রঃ টুডি প্রিন্ট ভিজ্যুয়ালাইজেশনের মতো নয়, ভার্চুয়াল ট্যুরস আসলে মানুষকে এমনভাবে সম্পৃক্ত করে যাতে বাস্তব উপস্থিতির অনুভূতি দেয়। সেখানে কোনো তাড়াহুড়োর প্রয়োজন নেই। একজন দর্শকের জন্য এতে আছে ভ্রমণের মাধ্যমে এক ধরনের আবিষ্কারের অনুভূতি ও মিথস্ক্রিয়ার স্বাধীনতা। বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও দেখার মাধ্যমে অ্যাপার্টমেন্টের এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে খুব সহজেই প্রবেশ করা যায়। এর মাধ্যমে এক ধরনের চেতনা ও আবেগ জাগিয়ে তোলে ভিআর প্রযুক্তি।
৪. পৃথিবীব্যাপী ব্যবসা করা যায়ঃ ভিআর প্রযুক্তি আমাদের দূরত্ব কমিয়ে দেয়। এ কারণে প্রথম ভিআর ট্যুর-ই তাদের ক্লায়েন্ট বাড়াতে শুরু করে। এটা শুধু স্থানীয় পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকে না, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। পৃথিবী আজ অনেক বেশি কসমোপলিটন বা সংকীর্ণতামুক্ত। ক্রমেই বাড়ছে বিশ্বনাগরিকের সংখ্যা। মানুষ আজ একস্থান থেকে আরেক স্থানে যাচ্ছে সহজেই। এমনকি এক গোলার্ধ থেকে অন্য গোলার্ধেও যাচ্ছে। তাই রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় ভার্চুয়াল রিয়েলিটির আবেদনও বিশ্বময়।

রিয়েল এস্টেট ভিআরের উদাহরণ
ভার্চুয়াল স্টেজিং সেবার জন্য রিয়েল এস্টেট এজেন্সিগুলোতে রয়েছে রুমি প্লাটফর্ম। তারা হাউস স্টেজিংকে গুরুত্ব দেন যাতে তা দ্রত ও উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়। এর কল্যাণে শুধু রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীরাই নন, সাধারণ মানুষও তার নিজস্ব অ্যাপার্টমেন্ট বা বাড়ির ইন্টেরিয়র ডিজাইনার হিসেবে আর্বিভূত হতে পারেন।
যেহেতু প্রিন্ট ইমেজ বা ছবি আজ সেকেলে, এমনকি প্রথম যুগের ভার্চুয়াল রিয়েলিটি হোম ট্যুরগুলোও আজ আর যুগোপযোগী নয়, কেননা এটা ৩৬০ ডিগ্রি ক্যামেরা দিয়ে তৈরি, তাই অত্যাধুনিক ভিআর প্রযুক্তি ব্যবহার করাই শ্রেয়। এমন একটি প্রযুক্তির নাম ম্যাটেপোর্ট। এর মাধ্যমে থ্রিডি ক্যামেরার সাহায্যে তৈরি হয় চমৎকার হোম ট্যুর, যা ‘একের মধ্যে সব’ হিসেবে কাজ করে। এই বিশেষ ক্যামেরা ফোর কে রেজল্যুশনে রিয়েল এস্টেটের জন্য ভিআর ট্যুর উৎপাদনে সহায়তা করে।
যেসব প্রপার্টি নির্মাণাধীন, সেখানে বিশেষ করে ‘ভার্চুয়াল এক্সপেরিয়েন্স’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এর মাধ্যমে কনস্ট্রাকশন কোম্পানির জন্য তৈরি হয় ভিআর কনটেন্ট। এটা অসম্পূর্ণ অ্যাপার্টমেন্ট পরিদর্শন করে সুন্দরভাবে। আবার অনলাইন ব্যবহারের জন্য থ্রিডি ভিজ্যুয়ালাইজেশন খুবই সহজলভ্য। কিংবা অকুলাস রিফট ও এইচটিসি ভাইভের মতো ভিআর হেডসেটও পাওয়া যায় সহজেই।

NO COMMENTS

Leave a Reply