Home অন্তর্জাতিক লালকিল্লার লালে মিশে আছে অতীত ইতিহাস

লালকিল্লার লালে মিশে আছে অতীত ইতিহাস

আবুল হোসেন আসাদ: বিশ্ব-অভিযাত্রী ও সাইক্লিস্ট


নান্দনিক স্থাপত্যটির সবকিছুই লাল। এ যেন লাল রঙ-রাজ্যের এক নান্দনিক কিল্লা। নাম তার লালকিল্লা। অনুপম নির্মাণশৈলী, অলংকরণ ও শিল্পসত্তার অপূর্ব এক উৎকর্ষের প্রতীক এই লালকিল্লা। পারসিক এবং ভারতীয় স্থাপত্যরীতিতে তৈরি এই কিল্লা মুঘলদের অনবদ্য কীর্তি। লাল বেলেপাথর দিয়ে এই কিল্লা তৈরি হয়েছে বলে এর নাম হয়েছে লালকিল্লা।
কী বিশাল এই কিল্লা। আর ব্যাপক জায়গাজুড়ে এর বিস্তৃতি। কী উঁচু আর সুপ্রশস্ত এই লাল রঙের কিল্লাটি দেখামাত্রই মন ভরে যায়।
যমুনার পাড়ে গড়ে ওঠা কিল্লাটি তিনশ’ বছরেরও আগে হলেও অতীতের ইতিহাস হয়ে আজও লাল রঙে ছড়িয়ে দিচ্ছে আপন মহিমা। যমুনা সরে গেছে আজ দূরে। নেই আর কিল্লার সেই সময়ের রাজকীয় জৌলুস। মুঘল সামাজ্যের গৌরবগাথা নেই সত্য, তবুও সময়ের সাক্ষী হয়ে লালকিল্লার লাল পাথরের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে অতীত ইতিহাস। সেই ইতিহাসের পাতা ধরে জানা যায়, এই লালকিল্লার নির্মাণকাজ শুরু হয় সম্রাট শাহজাহানের আমলে, ১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে। শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষার সব ব্যবস্থাই পাকাপাকি ছিল তখন কিল্লাটিতে। নিরাপত্তার ছিল না কোনো ত্রুটি। কিল্লার বাইরের প্রাচীর নির্মিত হয়েছিল পাষাণের মতো প্রচন্ড কঠিন লাল পাথর দিয়ে। কিল্লার বাইরের দেয়াল পুরো মসৃণ আর খাড়া। শত্রুবাহিনী যাতে কিল্লা দখল করতে না পারে কিংবা কিল্লার কাছে ঘেঁষতে না পারে সেজন্য কিল্লার বাইরের প্রাচীর-দেয়ালের চারদিকে গভীর ও প্রশস্ত পরিখা খনন করা হয়েছিল। যমুনা নদীর পানিতে সে পরিখা পরিপূর্ণ থাকত সবসময়। আর পরিখার পানির ওপর দিয়ে ইট-পাথরের তৈরি সেতু পার হয়ে মিলত কিল্লায় প্রবেশের প্রধান ফটক বা দরজা। দরজাসমেত পুরো গেটটির নির্মাণশৈলী এককথায় অসাধারণ। মূলত গেটটি একটি কমপ্লেক্সের মতো। নাম লাহোরি গেট।

লালকিল্লায় সেই সময় মুঘল সম্রাটরা সপরিবারে বসবাস করতেন। তাই কিল্লাটিকে আশীর্বাদধন্য বা ‘কিল্লা-ই-মুবারক’ নামে অভিহিত করা হতো প্রথমদিকে। কিল্লাটির প্রতিরক্ষা জোরদারের জন্য ‘সালিমগড় কিল্লা’ নামে অন্য একটি কিল্লার সঙ্গে লালকিল্লার উত্তর-পূর্ব কোণের প্রাচীর যুক্ত ছিল। সালিমগড় কিল্লাটি নির্মাণ করেছিলেন ইসলাম শাহ সুরি, ১৫৪৬ সালে। সম্রাট শাহজাহানের নতুন রাজধানী ছিল শাহজাহানাবাদ। যেটি ছিল দিল্লির সপ্তম নগরী। আর সেটিরই রাজপ্রাসাদ ছিল এই লালকিল্লা। কিল্লাটি ছিল মুঘল সা্ম্রাজ্যের রাজধানী। পরে সম্রাট শাহজাহান এই রাজধানী সরিয়ে নেন আগ্রা শহরে। দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ্ জাফর ছিলেন শেষ মুঘল সম্রাট। ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত তিনিও এই কিল্লাতেই বসবাস করেছেন। সিপাহী বিপ্লবের ব্যর্থতার পর দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ্ জাফর ১৭ সেপ্টেম্বর ১৮৫৭ সালে লালকিল্লা ত্যাগ করেন। পরে আবার লালকিল্লায় ফেরেন তিনি, তবে ব্রিটিশ বন্দি হিসেবে। ততদিনে গঙ্গা-যমুনায় অনেক পানি গড়িয়েছে। ইংরেজরা ২৭ জানুয়ারি ১৮৫৮ সালে বাহাদুর শাহ্ জাফরের বিচার করে এই লালকিল্লাতেই এবং ওই বছরের ৭ অক্টোবর তাকে মিয়ানমারে (বার্মা) নির্বাসন দন্ড দেয় ব্রিটিশরা। তারপর থেকে ব্রিটিশরা লালকিল্লাকে ক্যান্টনমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে, ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত। ভারতের স্বাধীনতাকামী আজাদ হিন্দ ফৌজ ১৯৪৫ সালে পরাজয় বরণ করলে ব্রিটিশরা স্বাধীনতাকামী যুদ্ধবন্দিদের বিচার করে এই লালকিল্লাতে বসে। ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে এই কিল্লা জড়িয়ে আছে নিবিড়ভাবে। তাই প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী লালকিল্লায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। আর ইউনেস্কো এই কিল্লাটিকে বিশ্ব-ঐতিহ্যের স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ২০০৭ সালে। লালকিল্লার বেশিরভাগ জায়গা অর্থাৎ ৭৫ ভাগ স্থান ব্যবহার করছে এখন ভারতীয় সেনাবাহিনী আর বাকি ২৫ ভাগ জায়গা দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে।
লালকিল্লার মূল ফটক বা লাহোরি গেট পেরোলেই সামনে একটি ছোট্ট বাজার। বাজারটি একটি নান্দনিক কমপ্লেক্সের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তার দু’পাশের দেয়াল ঘিরে গড়ে উঠেছে। বাজারটিতে রয়েছে ছোট ছোট স্টলের সাজানো দোকান। এসব দোকানে শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন রাজ্যের পণ্য, শৌখিন হস্তশিল্প এবং স্যুভেনির। কিছুটা এগোলেই দেখা যায় নহবতখানা। যেটি এখন ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের জাদুঘর। এ জাদুঘরের গ্যালারিতে থরে থরে সাজানো রয়েছে পুরনো দিনের তরবারি, বর্ম ও তীর-ধনুক থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রামের নানা উপকরণ। জাদুঘর থেকে বের হলে চোখে পড়ে সবুজ একটি প্রাঙ্গণ। প্রাঙ্গণ পেরোলেই দেখা মেলে দিওয়ান-ই-আম ভবন। আমজনতা বা সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্রাট দেখা দিতেন এখানে বসেই। তিনি বসতেন ‘ঝরোখা’ নামের অলংকৃত উঁচু সিংহাসনে। সেটি এখন রয়েছে স্বচ্ছ কাচের ভেতরে সংরক্ষিত অবস্থায় এই দিওয়ান-ই-আম ভবনেই। দিওয়ান-ই-আমের নির্মাণশৈলী অপরূপ। এর তিন দিকেই খোলামেলা। দেখতে অনেকটা বৈঠকখানার মতো। দিওয়ান-ই-আমের খিলানগুলো নান্দনিক কারুকার্যময়। সারাটা ভবনজুড়েই রয়েছে তৎকালীন স্থাপত্যশৈলীর চমৎকারিত্ব ও পেশাদারিত্বের ছাপ। সামনের দিকে রয়েছে সবুজ খোলা প্রান্তর।
মমতাজ মহল এখন পরিবর্তিত হয়েছে লালকিল্লা প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরে। মমতাজ মহলের অবস্থান কিল্লার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে। পাথরে খোদাই করা আরবি লেখা, বিভিন্ন আরবি পান্ডুলিপি ও চিত্রকলা থেকে শুরু করে মুঘল সম্রাটদের আদেশনামা, সম্রাটদের ব্যবহার করা নানা জিনিসপত্র ও তরবারি রয়েছে জাদুঘরের গ্যালারিতে। শেষ মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ্ জাফরের পোশাক, চেয়ারসহ নানা উপকরণও বাদ যায়নি জাদুঘরটির সংগ্রহশালা থেকে।
রঙমহল নামটি শুনলেই বোঝা যায় তবলার তা ধিন ধিন সুরেলা আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে নূপুরের ধ্বনি, যা জড়িয়ে রয়েছে ভবনটির সঙ্গে। সে সময় বিনোদনের জন্য বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন হতো বৈঠকখানার মতো এই রঙমহলে। রঙমহল ভবনটির ঠিক সামনে রয়েছে একটি পুকুর। পুকুরটির মাঝে রয়েছে চমৎকার ফোয়ারা।
খাসমহল এর অবস্থান রঙমহলের পাশেই। আর খাসমহলের সঙ্গে রয়েছে দিওয়ান-ই-খাস। এই দিওয়ান-ই-খাস ভবনের স্তম্ভগুলো নির্মিত হয়েছে শ্বেত-পাথরে। সেই স্তম্ভগুলোতে রয়েছে বিচিত্র ও মনোমুগ্ধকর রঙ-বেরঙের চিত্রিত ফুলের নকশা খোদাই করে বসানো। পুরো ভবনটাই শ্বেত-পাথরের তৈরি এবং চারপাশ খোলা।
হাম্মামখানা বা গোসলখানা দিওয়ান-ই-খাসের সঙ্গে লাগোয়া। মতি মসজিদ রয়েছে হাম্মামখানার একটু দূরে, পশ্চিম প্রান্তে। লালকিল্লা নির্মাণের অনেক পর এই মতি মসজিদ নির্মিত হয়েছে। আর সম্পূর্ণ শ্বেত-পাথরে তৈরি ছোট্ট এই মসজিদটিতে রয়েছে তিনটি গম্বুজ। মসজিদটির নির্মাণকাল ১৬৫৯ সাল। ব্যক্তিগত মসজিদ হিসেবে সম্রাট শাহজাহানের ছেলে আওরঙ্গজেব এটি নির্মাণ করেন।
নান্দনিক স্থাপত্যের আরেকটি হলো নহর-ই-বেহেস্ত বা স্বর্গবাগানের জলের ধারা। হায়াত বক্স বাগ বা জীবন-প্রদায়ী উদ্যানও বেশ নজরকাড়া, যা লালকিল্লার ভেতরের সবুজের শোভাকে করেছে সুষমা্মন্ডিত। এছাড়াও লালকিল্লার প্রাঙ্গণে রয়েছে হিরামহল, জাফরমহল, আসাদ বুর্জ, শাহ বুর্জ মিনার, বিশাল জলাধার এবং তার মাঝে থাকা নানান নান্দনিক কক্ষ, যেগুলো লালকিল্লার ভেতরের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণে।

 

NO COMMENTS

Leave a Reply