Home ফিচার লুই আই কানের নকশায় ফিরছে সংসদ ভবন

লুই আই কানের নকশায় ফিরছে সংসদ ভবন

0 119

কারিকা প্রতিবেদক
জাতীয় সংসদ ভবনকে বিশ্বখ্যাত স্থপতি লুই আই কানের মূল নকশায় ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে মূল সংসদ ভবনের শতাধিক অস্থায়ী কক্ষ ভেঙে ফেলার কাজ চলতি মাসেই শুরু করতে যাচ্ছে সংসদ সচিবালয়। অস্থায়ী কক্ষের বর্তমান অফিসগুলো মূল ভবনের বাইরে সচিব হোস্টেলে স্থানান্তর করা হবে। সেখানে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
তবে কতগুলো কক্ষ ভাঙা হবে সে ব্যাপারে এখনও কিছু নিশ্চিত করা যায়নি। এছাড়া সংসদের সীমানায় বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবর এবং স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাসভবনসহ অন্যান্য স্থাপনার বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বিদেশ থেকে মূল নকশা সংগ্রহের পরও জিয়ার কবর সংসদের সীমানায় পড়েছে কিনা, তা এখনও নিশ্চিত করতে পারেনি স্থাপত্য অধিদপ্তর।
মূল নকশায় ফেরার উদ্যোগ সম্পর্কে সংসদ সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব ড. জাফর আহমেদ খান বলেন, ‘মূল ভবনের অভ্যন্তরে অস্থায়ী কক্ষগুলো পর্যায়ক্রমে সরিয়ে নেওয়া হবে। চেষ্টা থাকবে যতদূর সম্ভব লুই আই কানের মূল নকশায় ফিরে যাওয়ার।’ তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজনের তাগিদে সংসদের ভেতরে কাঠের প্রাচীর দিয়ে অস্থায়ী কক্ষগুলো তৈরি করা হয়েছিল। সংসদের কাজে সরাসরি সম্পৃক্ত এমন বিভাগগুলো রেখে বাকিগুলো পর্যায়ক্রমে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।’
তিনি জানান, সচিব হোস্টেলে অবস্থানরতদের সরিয়ে নেওয়া এবং সংসদের অন্যদের আবাসনের জন্য পূর্ত মন্ত্রণালয়ের কাছে ৫০০ ফ্ল্যাট চাওয়া হবে। এসব ফ্ল্যাট পাওয়া গেলে সচিব হোস্টেল খালি করে সেখানেই কিছু অফিস স্থানান্তর করা হবে।
স্থপতি লুই কান প্রকৃতির সঙ্গে সংগতি রেখে এ ভবনের নকশা করেছেন। ভবনের ছাদে ব্যবহার করা হয়েছে কাচের ইট। বাতাস ও সূর্যের আলো যাতে অনায়াসে প্রবেশ করতে পারে, সেজন্য প্রতি ব্লকের চার ভাগের এক ভাগ খালি বা ভয়েড হিসেবে রাখা হয়েছে। যাতে বৈদ্যুতিক আলো ছাড়াই দিনের বেলায় কাজ করা যায়। কিন্তু বর্তমানে সংসদ ভবনে বৈদ্যুতিক আলো ছাড়া কাজ করার সুযোগ নেই। কারণ আলো ও বাতাস ঢোকার বেশিরভাগ পথ বন্ধ হয়ে গেছে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরির ফলে। এমনকি লেকের পাড়ে অবস্থিত কক্ষগুলোর বেশিরভাগেও এখন দিনের বেলা বিদ্যুৎ ছাড়া অন্ধকার থাকে।
৫৮ হাজার ৩২৭ দশমিক ৫৯ বর্গমিটার এলাকায় অবস্থিত সংসদ এলাকার মধ্যে পার্লামেন্ট ভবনের অবস্থান ৩ দশমিক ৪৪ একর জমিতে। পাশাপাশি উত্তর প্লাজা ১ দশমিক ৪৬ একর, দক্ষিণ প্লাজা ৪ দশমিক ৯৮ একর এবং বাকি জমিতে আবাসিক ভবন, হোস্টেল, বাগান, রাস্তা, লেক ইত্যাদি রয়েছে। ভবন কমপ্লেক্সে ৫০টি সোপান, ৩৪০টি শৌচাগার, ১ হাজার ৬৩৫টি দরজা, ৩৩৫টি জানালা, ৩০০টি পার্টিশন দেয়াল, ৩ হাজার ৩৩০ দশমিক ৫৭ বর্গমিটার কাচের শাটার, ৫ হাজার ৪৩৪ দশমিক ৮৩ বর্গমিটার কাঠের শাটার এবং ৩ হাজার ৭৩৮ ঘনমিটার কাঠের প্যানেল রয়েছে। ভবনের সর্বোচ্চ তলাটি বা লেভেল ১০ ব্যবহার্য বিভিন্ন যন্ত্রপাতির জন্য নির্ধারিত।
গণপূর্ত বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, লুই কানের নকশায় ভবনের কক্ষের সংখ্যা থাকার কথা ৪০০। কিন্তু এখন আছে ৫০০-এরও বেশি। বড় কক্ষগুলোতে কাঠের বিভাজন দিয়ে অনেক ছোট কক্ষ তৈরি করা হয়েছে। এই ভবনে কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকলেও নকশাবহিভূত এসব কক্ষের জানালার পাশে আলাদা শীতাতপ যন্ত্র লাগানো হয়েছে। এটা করতে গিয়ে অনেক জানালা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পশ্চিম ব্লকে সচিবের কক্ষের সামনের উন্মুক্ত জায়গা কাচ দিয়ে ঘিরে নতুন একটি কক্ষ বানানো হয়েছে। প্রাকৃতিকভাবে আলোকিত এই জায়গাটি এখন প্রায় অন্ধকার।
সংসদের গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ফজলুল হক বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে কতগুলো কক্ষ ভাঙা হবে, তা এখনও যাচাই-বাছাই করা হয়নি। তবে লাইটিং এরিয়া বন্ধ করে বানানো কক্ষগুলো ভাঙার বিষয়ে নির্দেশনা পাওয়া গেছে।’
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর থেকেই সংসদের ভেতরে-বাইরে জিয়ার কবর অপসারণের বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা আলোচনা সামনে আসে। বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে রাজনৈতিক মাঠও গরম করেছেন রাজনীতিবিদরা। জুলাইয়ে শেষ হওয়া সর্বশেষ বাজেট অধিবেশনেও জিয়ার কবর সরিয়ে নেওয়ার দাবি তুলেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক।
২০১৪ সালে এ নিয়ে তুমুল রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনার নির্দেশে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাফেজখানায় সংরক্ষিত মূল নকশা সংগ্রহের উদ্যোগ নেয় সংসদ সচিবালয়। সরকারের পক্ষ থেকেও জানানো হয়, মূল নকশা হাতে পাওয়ার পরই জিয়ার কবর সরানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। গত বছরের ২৮ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী এই নকশা দেখেন। এরপর ওই নকশার কপি ন্যাশনাল আর্কাইভ, স্থাপত্য অধিদপ্তর ও সংসদ সচিবালয়ে সংরক্ষণের জন্য রাখা হয়।
মূল নকশা প্রধানমন্ত্রীকে প্রদর্শনের সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি কাজী গোলাম নাসির। তিনি জানান, সংসদের মূল নকশার কপি তাদের দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে তারা সরকার বা সংসদের কাছ থেকে কোনো লিখিত নির্দেশনা এখনও পাননি। তাই নকশা অনুযায়ী মূল ভবনের মধ্যে বা সংসদের সীমানায় নকশাবহিভূত স্থাপনা কোনটি তা যাচাই-বাছাই করা হয়নি। জিয়ার কবর সংসদের নকশার মধ্যে রয়েছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যাচাই-বাছাই ছাড়া কিছুই বলা সম্ভব নয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, লুই আই কানের মূল নকশার প্রথম ধাপ ছিল ২০৮ একর জায়গার ওপর জাতীয় সংসদ ভবন নির্মাণ। যার সামনে ও পেছনেও বিস্তীর্ণ সবুজ খোলা মাঠ থাকবে। চারদিকে আট লেনের সড়ক, মাঝখানে লেক। দ্বিতীয় ধাপে লেকের পর বিস্তীর্ণ সবুজ। এছাড়া বাকি জায়গায় গড়ে তোলা হবে সচিবালয়, লাইব্রেরি, জাদুঘর, হাসপাতালসহ প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক বলয়।
১৯৬১ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের আমলে বর্তমান সংসদ ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়। তখন স্থপতি মাজহারুল ইসলামকে এই ভবনের স্থপতি নিয়োগ করা হয়। তার প্রস্তাবেই লুই আই কান এই প্রকল্পের প্রধান স্থপতি হিসেবে নিয়োগ পান। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ১৯৮২ সালের ২৮ জানুয়ারি এ ভবনটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়।

NO COMMENTS

Leave a Reply