Home অন্তর্জাতিক লোটাস টেম্পল : পদ্মফুলের অপূর্ব এক স্থাপত্য

লোটাস টেম্পল : পদ্মফুলের অপূর্ব এক স্থাপত্য

আবুল হোসেন আসাদ


কিছুটা দূর থেকে তাকাতেই চোখ ধাঁধিয়ে যায় পদ্মফুলাকৃতির শুভ্র-সফেদ স্থাপত্যের সৌন্দর্যে। এ যেন মার্বেল, ইট, বালু, পাথর আর সিমেন্টের সমন্বয়ে পৃথিবীর বুকে পদ্মফুলের এক অপার্থিব সুন্দরের সূচনা। হঠাৎ মনে হতে পারে এটি বুঝি সিডনির অপেরা হাউজ। কিন্তু পরক্ষণেই সবুজ প্রান্তরে চোখ পড়লে ভুল ভেঙে যায়, সঙ্গে ভরে যায় নয়নও। সবুজ প্রান্তরের মাঝখানে পদ্মফুলের বিশাল বিশাল সাদা রঙের পাপড়িগুলোর অপরূপ শোভা নিমিষেই সৌন্দর্য পিপাসুর মনে জ্বালা ধরিয়ে দেয়। এই পদ্মফুল-সদৃশ স্থাপত্যটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আধ্যাত্মিক ও আত্মিক এক সম্পর্কের কথা; জড়িয়ে আছে এক ধর্ম-বিশ্বাসের কথা। সেটি হলো বাহাই ধর্ম-বিশ্বাস। পদ্মফুল স্থাপত্যটি মূলত একটি মন্দির বা টেম্পল, যা বাহাই সম্প্রদায়ের উপাসনালয়। বাহাই সম্প্রদায়ের লোকেরা এই মন্দির নির্মাণ করেছে। ফারিবোর্জ সাহাবা এই টেম্পলের প্রধান স্থপতি। ২৪ ডিসেম্বর ১৯৮৬ সাল, এই স্থাপত্যটি টেম্পল হিসেবে উপাসনার জন্য খুলে দেয়া হয়। পদ্মফুল-সদৃশ দেখতে বলে স্থাপত্যশিল্পটির নাম হয়েছে পদ্ম মন্দির বা লোটাস টেম্পল।
বাহাই বিশ্বাস হচ্ছে এক ঈশ্বরবাদী বিশ্বাস। বর্তমানকালের ইরান অর্থাৎ তৎকালীন পারস্য দেশে ঊনবিংশ শতাব্দীতে এই ধর্মের উৎপত্তি ঘটে। বাহাউল্লাহ (নভেম্বর ১২, ১৮১৭ মে ২৯, ১৮৯২) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ধর্ম-বিশ্বাসই হলো বাহাই বিশ্বাস বা বাহাই ধর্ম। বাহাই ধর্ম পৃথিবীর একটি নবীনতম ধর্ম। যে ধর্ম সব ধর্মের মানুষকে স্বাগত জানায়। সব ধর্মের মানুষ একযোগে এখানে ধর্মচর্চা করতে পারে কেবল ধ্যানের মাধ্যমে। বাহাই ধর্ম-বিশ্বাসকে এক অর্থে বলা চলে আধ্যাত্মিকতার আন্দোলন বা ধ্যানের একটি ভিন্নমাত্রা। ঐক্যবদ্ধতা সম্পর্কেও বাহাই ধর্মে আলোচনা করা হয়।
পদ্মফুল বা লোটাস নকশার মাধ্যমে বাহাই ধর্মের সরলতা তুলে ধরার জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল এই টেম্পল। কিন্তু নকশাটি এখন তার নিজস্ব স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যেই বেশি দ্যুতি ছড়াচ্ছে। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুভূতি প্রতিফলিত করার জন্য ভারতীয় স্থাপত্যশৈলীর দিক খেয়াল রেখেই পদ্মফুল নকশার প্রণয়ন করা হয়েছিল। কারণ টেম্পল দেখতে আসার সময় ভারতীয়রা যাতে তাদের সুপরিচিত ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িত বিষয়ের মিল খুঁজে পায় এবং একই সঙ্গে লোটাস টেম্পলের শৈলী, প্রতীক চিত্র ও দৃশ্যায়ন যাতে বাহাই ধর্ম-বিশ্বাস সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণা দেয়। পদ্মফুল ভারতীয়দের কাছে খুবই সুপরিচিত ও পবিত্র একটি ফুল। পঙ্কজ নামে পদ্মফুল নানা ভারতীয় ভাষায় রয়েছে, যা পঙ্কিল জল বা পা’কে জন্মে কিন্তু নিষ্কলুষিত ও বিশুদ্ধ থাকে। ব্রহ্মা বা ঈশ্বরের আসনস্থান হচ্ছে পদ্মফুল যেটি রয়েছে পুরাণে এবং গৌতম বুদ্ধের জীবনীতেও ব্যাপকভাবে রয়েছে এই পদ্মফুল। এ ছাড়াও পদ্মফুলের মোটিফে রয়েছে পার্সি স্থাপত্যশিল্পের বৈশিষ্ট্য।

ইরানে বাহাউল্লাহর জন্ম হলেও তার সমাধি রয়েছে ইসরায়েলে। বাহাই ধর্মের অনুসারীরা রয়েছে সারা পৃথিবীজুড়ে প্রায় ৬০ লাখ। লোটাস টেম্পল দেখতে প্রতি বছর প্রায় ৪০ হাজার লোক এখানে আসে। এটি ভারতের রাজধানী নতুন দিল্লির নেহরু প্যালেসের পাশঘেঁষা বিস্তৃত জায়গার সবুজ গাছপালার মাঝে অবস্থিত। দূর থেকে দেখলেও লোটাস টেম্পলকে এক কাব্যিক স্থাপত্যশিল্পই মনে হয়। পদ্মফুলের মোট ২৭টি পাপড়ি রয়েছে পরিকাঠামোতে। নয়টি করে পদ্ম-পাপড়ি মোট তিনটি স্তরে সাজানো। বাইরের পাপড়িগুলোর ফাঁক গলে আকাশের দিক সূর্যের আলো টেম্পলের মাঝে ঢোকে এবং এই আলো মৃদুভাবে ছড়িয়ে পড়ে টেম্পলজুড়ে। নয়টি পুকুর লোটাস টেম্পলকে বুকে আগলে রেখেছে পানির ওপর। যাতে মনে হয় সত্যিকারের একটি পদ্মফুল বিরাজ ইট-পাথরের পাষাণ প্রাচীর উপেক্ষা করে। পাপড়ির বাইরের অংশ মার্বেল দ্বারা আবৃত। গ্রিসের পেন্টেলি পর্বত থেকে এই মার্বেলগুলো আনা হয়েছিল।
টেম্পলের ভেতরের সুবিশাল জায়গাটিকে নির্মাণকালীন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা করা আর্থিকভাবে সম্ভবপর না হওয়ায় তখন প্রাকৃতিকভাবে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা এখনো অটুট। দিনের বেলায় সূর্যের আলো পদ্ম পাপড়ির ফাঁক গলে মৃদুভাবে টেম্পলের ভেতরে প্রবেশ করে, মেঘাচ্ছন্ন দিন বা সূর্যের আলো না থাকলেও যাতে টেম্পলের ভেতরে মৃদু আলো থাকে তার বিকল্প ব্যবস্থাও রয়েছে। গোলাকার টেম্পলটির ভেতরে সুবিশাল ফাঁকা জায়গায় বেঞ্চি পাতা রয়েছে। বেঞ্চিগুলোর সামনের দিক অর্থাৎ পশ্চিম দিকে রয়েছে একটি স্টেজ। স্টেজে ভাষণ দেয়ার জন্য রয়েছে একটি ডায়াস। বেঞ্চগুলো পাতা হয়েছে কায়মনে বসে ধ্যান করার জন্য। টেম্পলে ঢোকার সময় গাইড বলে দেয়, যার যার স্রষ্টার কাছে কায়মনে প্রার্থনা করার জন্য এবং চুপচাপ কিছুক্ষণ ধ্যান করার জন্য। প্রায় এক হাজার তিনশ লোক একসঙ্গে টেম্পলের ভেতরে প্রার্থনা করতে পারে। লোটাস টেম্পলের ভেতরে চিৎকার করলে বা জোরে কথা বললে পাপড়িসদৃশ দেয়ালে কথাগুলো প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। জুতা খুলতে হয় টেম্পলে প্রবেশের আগেই। অবশ্য সেজন্য টেম্পলের পক্ষ থেকেই জুতা রাখার জন্য ব্যাগও দেয়া হয়। বাহাই ধর্ম-বিশ্বাস সম্পর্কে এবং টেম্পলে প্রবেশের যাবতীয় নিয়ম-কানুন গাইডরা আগেভাগেই কয়েকটি ভাষায় জানিয়ে দেয়। লোটাস টেম্পলে প্রবেশের জন্য কোনো টিকিট লাগে না বা টাকা-পয়সার বিষয় জড়িত নেই। সবচেয়ে বড় কথা হলো, টেম্পল-প্রাঙ্গণটি পরিচ্ছন্ন, নির্মল ও সবুজে সবুজে আচ্ছাদিত। অপূর্ব এই স্থাপত্যটিকে বাইরে থেকে কৃত্রিম উজ্জ্বল আলোকছটায় উদ্ভাসিত করা হয় রাতের বেলায়। পাপড়ির বাইরের প্রান্তগুলোয় তখন উজ্জ্বল আলোর বর্ণালিতে অসাধারণ এক রূপের সৃষ্টি হয় নিকষ গাঢ় অন্ধকারের মাঝে।

লেখক : সাইক্লিস্ট ও বিশ্ব-অভিযাত্রী

NO COMMENTS

Leave a Reply