Home মূল কাগজ শহর একটা জীবন্ত সত্তা

শহর একটা জীবন্ত সত্তা

0 305

মাহমুদুল আনোয়ার রিয়াদ
আর্কিটেক্ট পার্টনার, ডি ডব্লিউ ফোর আর্কিটেক্টস

সাক্ষাৎকার : মির্জা মাহমুদ আহমেদ

আপনার বেড়ে ওঠা এবং স্থপতি হওয়ার গল্পটা কেমন ছিল?
আমি গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলে পড়েছি। এইচএসসি ঢাকা কলেজে। তারপর বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগে। স্কুলে থাকতেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম স্থপতি হব। ছবি আঁকতাম, লোগো, ব্লক দিয়ে জিনিসপত্র বানানোর ঝোঁক ছিল। স্থাপত্য পড়ার আগ্রহটা সেখান থেকেই এসেছে। আমাদের সময়ে শুধু বুয়েটেই স্থাপত্য বিষয়ে পড়াশোনা করা যেত। বুয়েটে চান্স না পেলে আমি হয়তো বিদেশে পড়তে যেতাম। আমি শুধু বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগেই ভর্তি-পরীক্ষা দিয়েছিলাম।
আমার বেড়ে ওঠাটা ধানমন্ডি এলাকায়। ওই এলাকায় আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ, জার্মান কালচারাল সেন্টার, রাশিয়ান কালচারাল সেন্টার, ইন্ডিয়ান কালচারাল সেন্টার এবং আমেরিকান কালচারাল সেন্টার ছিল। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ছিল ব্রিটিশ কাউন্সিল। তখন কালচারাল সেন্টারগুলোতে নিয়মিত যেতাম। সেই সুবাদে দু-চারটা ভালো সিনেমা দেখার সুযোগ হয়েছে, বই পড়ার সুযোগ হয়েছে। পরবর্তী সময়ে যা আমার মনোজগৎ তৈরিতে দারুণভাবে সহায়তা করেছে। আমার আব্বা ব্যবসায়ী হলেও ভীষণ শিল্পমনস্ক মানুষ ছিলেন। যার ছাপ কিছুটা হলেও আমার ওপর পড়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে কী কাজ করছেন?
সম্প্রতি গ্রামীণ টেলিকম ট্রাস্টের হেডকোয়ার্টারের কাজ শেষ করলাম। এ ছাড়াও প্রাইম ব্যাংকের হেডকোয়ার্টারের কাজ করছি। যৌথভাবে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের হেডকোয়ার্টারের কাজও করছি। একই সঙ্গে ছোট-বড় মিলিয়ে বেশকিছু কাজ করছি।
বর্তমানে পৃথিবীর বিখ্যাত একজন স্থপতির সঙ্গে ঢাকায় একটা বড় প্রজেক্টে আমরা লোকাল পার্টনার হিসেবে কাজ করছি। প্রজেক্টটা তেজগাঁওয়ে হবে আশা করি। ডিজাইনের মাঝপথে আছে প্রকল্পটি। এই কাজটি আমাদের জন্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।
আমেরিকার একজন স্থপতির সঙ্গে আমরা আড়ংয়ের ইন্টেরিয়র ডিজাইন করছি। ধানমন্ডির ২ নং রোডে আড়ং একটা বড় আউটলেট করতে যাচ্ছে। কাজটি খুব ইন্টারেস্টিং হবে বলে আশা করছি। এছাড়া ঢাকার বাইরেও কিছু কাজ করছি।
সেইলর, আড়ং, কিউরিয়াস ব্র্যান্ডের আউটলেটের ইন্টেরিয়র ডিজাইন আমরা করে থাকি। সম্প্রতি আমরা পিএমজি গ্যালারি নামে একটি বিল্ডিং ফিনিশড ম্যাটারিয়ালের শোরুমের কাজ করেছি। ওখানে টাইলস, বেসিন, কমোড ইত্যাদি পাওয়া যায়। আমরা একটা পুরনো ভাঙা ফ্যাক্টরিকে শোরুমে পরিণত করেছি। পিএমজি গ্যালারির কাজটা খুব ইন্টারেস্টিং। একটা পুরনো বিল্ডিংকে পুরোটা চেঞ্জ না করে সফেসটিকেটেড শোরুমে পরিণত করা হয়েছে।

বাংলাদেশে স্থাপত্যচর্চায় প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির জায়গাগুলো কী?
প্রায় ২৫ বছর ধরে স্থাপত্যচর্চা করছি। এর মধ্যে বাংলাদেশের স্থাপত্যের মান, অবস্থান অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আমরা যখন ’৯৫ সালে এই পেশায় আসি, তখন এ রকম ছিল না। বনানীতে একটা গ্যারেজের ভেতর আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠান শুরু করি। তখনও ভাবতাম না বাংলাদেশে এত মানুষ আর্কিটেকচার পড়বে, এত বিল্ডিং তৈরি হবে, এত আর্কিটেক্ট কাজ করবে। আমরা কোনো কিছু না বুঝেই প্যাশন থেকে স্থাপত্যপেশায় এসেছি। তখন কেউ জানতও না এই পেশার ভবিষ্যৎ কী হবে।
এই পেশাটা যখন দাঁড়িয়ে গেল তখন সবাই চিনল। অনেকেই এখন আর্কিটেক্ট হতে চায়। আমাদের সময়ে কোন বিষয়ে পড়ছি, সেটাই সাধারণ মানুষ বুঝত না। আমাদের আগের প্রজন্ম আরও বড় সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। এখনকার সমস্যাটা ভিন্ন। এখন অনেক বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থী আর্কিটেকচার পাস করে বেরোয়। কে যে ফ্ল্যারিশ করবে, কে যে কাজ করতে পারবে- কোনো ঠিক নেই। তার আগে আমরা বসে আছি জায়গা দখল করে। এছাড়া আমাদের এখানে কাজের ভলিউম বাড়ছে। বিদেশিদের অংশগ্রহণ বাড়বে। তাদের সঙ্গে কীভাবে প্রতিযোগিতা হবে? আমরা কি ওইরকম পরিশ্রম করতে প্রস্তুত? বিদেশিদের সঙ্গে কাজ করতে হলে বা প্রতিযোগিতা করতে হলে যথেষ্ট প্রস্তুতি নিতে হবে। ওই প্রস্তুতি-পর্ব যদি উপভোগ না করা যায়, তাহলে লোকাল আর্কিটেকচারে একটা ধস নামবে। বাংলাদেশের আর্কিটেকচার খারাপ- এটা কোনোদিন কেউ বলেনি। আমাদের যথাযথ পরিকল্পনার অভাব, রাস্তাঘাট খারাপ, অবকাঠামো খারাপ। তবে আপনি যদি ইন্ডিভিজ্যুয়াল বিল্ডিংয়ে ফোকাস করেন, দেখবেন অনেক ভালো মানের বিল্ডিং তৈরি হচ্ছে। এই ভালোটা যে সারাজীবন থাকবে, ব্যাপারটা এমনও না। এজন্য প্রত্যেক প্রজন্মকে শ্রম দিতে হবে। আমাদের দেশে এখনও আবাসন-ব্যবসায়ীভিত্তিক আর্কিটেকচারেও ডিজাইনের কদর আছে। পৃথিবীর অনেক দেশে এমনটা নেই। আমাদের দেশের গ্রাহকরা ডিজাইনের ব্যাপারে অনেক সচেতন। কোনো ডেভেলপার কোম্পানি যদি ডিজাইনের ব্যাপারে অবহেলা করে, দেখা যায় তারা দীর্ঘ সময় মার্কেটে টিকতে পারে না। এটা একটা ইতিবাচক দিক। এই পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি। আমি মনে করি পরিশ্রম উপভোগ করার প্রজন্মটা আরও কিছুদিন থাকতে হবে। পরিশ্রমের মানসিকতা যত বেশি ধরে রাখা যাবে, ততই আমাদের জন্য মঙ্গল।

আমাদের স্থাপত্য যদি বিশ্বমানের হয়, তাহলে আমরা বিশ্বমানের নগর গড়ে তুলতে পারছি না কেন?
নাগরিক হওয়াটা কঠিন। নাগরিক হতে হলে শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে চলতে হবে। দেখবেন, সকালে যখন ঝাড়ুদার ঝাড়ু দেন, তখন ঢাকা বেশ পরিষ্কারই লাগে। আর সন্ধ্যার দিকে দেখবেন অবস্থা খুবই খারাপ।
প্রতিদিন আমরা এটাকে ডোরম্যাট বা পাপোশের মতো ব্যবহার করছি। এ রকম করলে উন্নতি হবে না, এটা নিশ্চিত। প্রিয় চাদর বা শালের মতো ব্যবহার করলে অন্যরকম ফল হবে। নিজের প্রয়োজনে আমরা ঢাকাকে টিস্যু পেপারের মতো ব্যবহার করছি। আমরা যদি এই শহরের যত্ন নিতে না পারি, তবে ঢাকাকে বাঁচানো যাবে না। শুধু সুউচ্চ ভবন বা ফ্লাইওভার করে কোনো কাজ হবে না।
আমাদের এখানে অন্য জেলা থেকে লোকজন আসে, এসে এটাকে যাচ্ছেতাইভাবে ব্যবহার করে। তার জন্মস্থানকেই সে বাড়ি মনে করে। ঢাকাকে ‘ওউন’ করার ব্যাপারটা থাকে না। শহর বড় একটা জীবন্ত সত্তা। এটাকে দেখভাল করার জন্য খুবই বড় এবং দক্ষ একটা সিস্টেম থাকা দরকার। যেটা আমাদের নেই। সিস্টেম ডেভেলপ না করে আপনি যত কিছুই করেন না কেন, সেটা ফলপ্রসূ হবে না।

NO COMMENTS

Leave a Reply