Home মূল কাগজ নগরোদ্যান শিশুদের শৈশব ফিরিয়ে দেয়ার অনন্য প্রচেষ্টা

শিশুদের শৈশব ফিরিয়ে দেয়ার অনন্য প্রচেষ্টা

নগরে বাতিঘর

রুখসানা মিলি
একটা সময় পর্যন্ত কাদা দেখলেই আরিয়ানা লাফ দিয়ে দূরে সরে যেত। আর এখন কাদামাটি নিয়ে মনের আনন্দে খেলায় মেতে ওঠে সে। কাদা দিয়ে ছোট্ট হাঁড়ি, একটা পুতুল বা আরও নানান আকার দিতে এখন আরিয়ানা সানন্দে আগ্রহী।
মেগাসিটি ঢাকার নাগরিক জীবনের চাপে যতকিছু হারিয়ে গেছে, তার মধ্যে অন্যতম শিশুদের খেলাধুলা-সামাজিকতা-প্রকৃতিঘনিষ্ঠ জীবন। আর সে কারণেই বেশিরভাগ শিশুর সময় কাটে ট্যাব অথবা অন্য কোনো প্রযুক্তিপণ্যের সঙ্গে। প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার জন্য স্কুলের বাইরে ঢাকার শিশুদের আলাদা একটা জগৎ আছে এমন সংখ্যা নগণ্য।
এখন স্কুল হোক বা বাসা খেলার মাঠ নেই বললেই চলে। লেখাপড়ার ক্ষেত্রেও কতটা শিখল তা নয়, বেশিরভাগ অভিভাবকই গুরুত্ব দেন কত নম্বর পেল সেটির ওপর। একটি ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ফেরদৌসি আক্তার বলেন, ‘বিজ্ঞান বিষয়ে প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বেশিরভাগ খারাপ করেছে।’ কারণ হিসেবে তিনি জানান, ওদেরকে আমি যখন বেগুন বা নারকেল গাছ বা আমগাছ বলি, অনেক শিশুই তার পুরোপুরি অর্থ বুঝতে পারে না। কারণ প্রকৃতির সঙ্গে ওদের পরিচয় খুব সামান্য। এ কারণেই আমরা অভিভাবকদের উৎসাহিত করি শিশুকে প্রকৃতিঘনিষ্ঠ করতে।
এসব বিষয় উপলব্ধি করেই যাত্রা শুরু করেছে বাতিঘর সাংস্কৃতিক বিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠান। যেখানে আরিয়ানার মতো অনেক শিশুই কাদা দিয়ে খেলার শৈশব ফিরে পেয়েছে।
বাতিঘরের উদ্যোক্তারা জানান, বৈরী সময় আর পরিবেশের ভেতরে থেকেও শিশুদের মন-বুদ্ধি-স্বভাব যেন বিকশিত হতে পারে, তাদের ভেতরে ন্যায়নীতির শুভবোধ, রুচিবোধ আর সৌন্দর্য্যবোধ কিছুটা হলেও যেন জন্মে, তারই প্রয়াস চালানো আমাদের লক্ষ্য।
নাচ-গান-অভিনয়-আবৃত্তি-অংকন এমন নির্দিষ্ট কোনো সাংস্কৃতিক চর্চার বা শিক্ষার আবর্তে বন্দি থাকে না বাতিঘরের শিশুরা।
উদ্যোক্তাদের মতে, শিশুদের শুধু একেকটি চারুবিদ্যায় দক্ষ করে তোলাই নয়, কবিতায়, গানে, অভিনয়ে, ছবি আঁকায়, নাচে আর কথায় তারা যেন নিজেদের প্রকাশ করার আনন্দ পায় সেটাই বাতিঘরের চাওয়া। গতানুগতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো একটি বা দুটি বিষয় শেখানো নয়, বরং অনেকগুলো বিষয়ের সঙ্গে প্রাথমিক পরিচয় করিয়ে দিতে চাই আমরা। যাতে করে সে নিজেই ঠিক করে নিতে পারে তার গতিপথ।
একটা যথাযথ সামাজিক পারিপাশ্বিক অবস্থায় শিশুদের শৈশব শেখার পরিবেশ দিতে এ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে সন্তুষ্ট অভিভাবকরাও। এমনকি নানান সামাজিক অপরাধ সম্পর্কে শিশুকে অবহিত করা এবং সেসব পরিস্থিতিতে কীভাবে নিজেকে সামলে চলতে হবে বা সেখানে কোনটা ঠিক কোনটা ভুল এমন বিষয়গুলো সম্পর্কেও গল্পের ছলে শিশুকে অবহিত করা হয়। প্রতিভা বিকাশের মঞ্চ হিসেবে শিশুদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক উপস্থাপনার কার্যক্রমও পরিচালনা করে প্রতিষ্ঠানটি। বাতিঘরের বাতিদের নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তাসের দেশ নাটকের সফল মঞ্চায়নও হয়েছে।
ছয় বছরে পড়েছে বাতিঘর সাংস্কৃতিক বিদ্যালয়। ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও চট্টগ্রামেও একটি শাখা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
আরিয়ানার মা তাসলিমা সুলতানা বলেন, ‘আরিয়ানা আমাদের একমাত্র সন্তান। আমি ও আমার স্বামী দুজনই চাকরি করি। বাতিঘর আমার সন্তানকে এমন একটা শৈশব এনে দিয়েছে, যেটা আমরা পেয়েছিলাম। খেলার সাথী, খেলা, বই পড়া, গাছের সঙ্গে, ফুলের সঙ্গে, পাখির সঙ্গে বড় হওয়া। বাতিঘর থেকে ওদের গাছ-পাখি-ফুল আলাদা করে চেনানো হয়। আরিয়ানার মতো আরও অনেক শিশু এখানে এসে খুদের ভাত, নানান রকম ফল আর অনেক দেশি খাবারের সঙ্গে প্রথমবার স্বাদ পেয়েছে।’
তাসলিমা আরও বলেন, ‘এখন শিশুদের সময় কাটানোর মাধ্যম হিসেবে ট্যাব বা অন্য ডিভাইস দিয়ে দেয়া হয়। বাতিঘরে বই পড়ার অভ্যাসও গড়ে তোলা হয়। আমরা অনেকেই শিক্ষাজীবনে বা কর্মজীবনে এসে কোনো প্রেজেন্টেশন দিতে গিয়ে নানান সমস্যায় পড়ি। বাতিঘর শিশুদের নিয়মিত উপস্থাপনার আয়োজন করে। ফলে ওদের জড়তা, ভয় দূর হয়ে যায় সহজেই। সব মিলিয়ে কেবল নম্বর আর পরীক্ষা ছাড়াও শিশুরা শিখতে শিখতে যে বড় হতে পারে, সেই জায়গাটুকু তৈরি করতেই আমি আমার সন্তানকে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত রেখেছি।’

NO COMMENTS

Leave a Reply