Home মূল কাগজ ইন্টেরিয়ার শুরু থেকেই অফিস-ফার্নিচারের জন্য অটবি জনপ্রিয়

শুরু থেকেই অফিস-ফার্নিচারের জন্য অটবি জনপ্রিয়

কারিকা ডেক্স


অনিমেশ কুন্ডু
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, অটবি

আমার বাবা নিতুন কুন্ডু, অনেকটা আনকনভেশনাল ওয়েতেই ইন্ডাস্ট্রিতে আসেন। আনইউজুয়াল জিনিসপত্র বানানোর জন্য তিনি একটা স্টুডিও বানিয়েছিলেন। বাবার একটা অস্বাভাবিক দক্ষতা ছিল। বই পড়ে কোনোকিছু শিখে ফেলতে পারতেন। বাবা কিন্তু কোনোদিন ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলে যান নি। আর্কিটেকচারাল স্কুলেও যান নি। বাবা কতগুলো বইপত্র জোগাড় করেছিলেন, সেগুলো ঘেঁটেই তিনি শিখতেন। শিখে তিনি হাতে-কলমে কাজে লেগে যেতেন। বাবা চারুকলার ছাত্র ছিলেন, তবুও নিজের আগ্রহ থেকে স্কাল্পটিং শিখেছেন বই পড়ে আর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে।
কলকাতা বিশ্ববিদ্য্যালয়ের অধীনে যে চারুকলা, সেখানে চিন্তামনি কর নামে একজন নামকরা স্কাল্পটার ছিলেন। বাবা তাকে মাস্টারমশাই ডাকতেন। যদিও তিনি বাবার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন না। বাবা তাকে কিছু গাইডলাইন নিয়ে দিলেন। বললেন, আমি এভাবে কাজ করছি। পরে কাজটা যদি একটু দেখে দিতেন আর কি। তিনি বললেন, ‘তোমার কাজ রাম কিঙ্কর বেইজকেও ছাড়িয়ে গেছে।’ উল্লেখ্য, ভারতের নামকরা স্কাল্পটার রাম কিঙ্কর বেইজ।

বাবার স্টুডিওতে আনকমন কাজ করা হতো। যেগুলো সাধারণত বাংলাদেশে কেউ করে না। শুরুতে কোটপিন, ক্রেস্ট, কার্ড বানাতেন। সোনা দিয়ে কাজ করা; ক্রেস্ট বানানো বা ট্রফি বানানো কঠিন। তাও তিনি করেছেন। সেগুলো করতে করতেই হঠাৎ একবার বিদেশি একটা কোম্পানির ফার্নিচার দরকার হলো। ওই সময়কার সবচেয়ে আধুনিক যে চেয়ার, সেই ডিজাইনের। বাবা বললেন, আমি একটা চেয়ার বানাই? ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বললেন, চেয়ার বানাবেন! কিন্তু আপনি তো এই কাজের লোক নন। আপনার তো এমন কোনো কারখানা বা স্টুডিও নেই। বাবা বললেন, আমি বানাই। তারপর আপনি দেখেন।

বাবার কনফিডেন্স ছিল এ কারণে, তিনি যেহেতু ১২ বছর ইউএস কালচারাল সেন্টারে কাজ করেছেন, এ ধরনের ডিজাইন খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তখন থেকেই বাবা প্রোডাকশনগুলো কৌতুহল নিয়ে দেখতেন। বুঝতেন। শিখতেন।

বাবা তার স্টুডিওতেই চেয়ার বানালেন। যারা কিনল, তারা তো খুব খুশি। এত ভালো প্রোডাক্ট বাংলাদেশে কী করে তৈরি হয়! এরপর ওরা টেবিলসহ অন্যান্য ফার্নিচারও বানিয়ে দিতে বলে। বাবা তাও করলেন। তারা খুশি হলেন। বাবার যেহেতু প্রচুর বন্ধু-বান্ধব ছিল, তারা জানল। সেভাবেই তখন কাজ বাড়তে থাকল। একজন হয়তো বলল, অমুককে বানিয়ে দিয়েছেন আমাকেও বানিয়ে দিন। আস্তে আস্তে বাবার নাম ছড়াতে থাকল। অবশ্য তখন ‘অটবি’ নামটা ছিল না। ওই স্টুডিও থেকেই কাজ হতো।

এ প্রসঙ্গে বাহা স্কুলের নাম উল্লেখ করতে হয়। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক থেকে তৃতীয় দশক পর্যন্ত, প্রথমে জার্মানিতে; জার্মানিতে যখন নাৎসিরা চলে আসল, ওরা পারল না তখন আমেরিকায় চলে গেল। এর আগ পর্যন্ত ইউরোপে যে ব্যবহারিক জিনিসপত্র তৈরি হতো, সেগুলোর সবই বড়লোকদের জন্য। সেগুলো অনেক কারুকার্যসম্পন্ন ছিল। শুধুমাত্র বড়লোকরা এফোর্ট করতে পারত। সাধারণ মানুষের জন্য সাধারণ ডিজাইন ছিল। সেভাবেই চিন্তা করে বানানো হতো। সেটারও একটা মাত্রা ছিল। মডার্ন ডিজাইনের যে কনসেপ্ট সেগুলো তখন আসা শুরু করেছে। যেমন আমরা এখন কিছু প্রোডাক্ট ব্যবহার করি, এটার জন্ম কিন্তু প্রায় একশ বছরেরও আগে। যেটা এখন দেখে হয়তো ভাবছি এটা খুবই মডার্ন। আসলে কিন্তু একশ বছর আগে কোনো ডিজাইনার এভাবে প্রথম নিয়ে আসে। বাংলাদেশে অনেক পরে এসেছে বলে হয়তো আমরা মনে করি এটা খুব মডার্ন। আসলে এখন যে ডিজাইন পৃথিবীব্যাপী চলে সেটা পোস্ট-মডার্ন ডিজাইন। বাংলাদেশে এখন আমরা আসলে পোস্ট-মডার্ন ডিজাইন নয়, মডার্ন ডিজাইনই বেশি পছন্দ করি। এই কনসেপ্টটা বাবার মাথায় ছিল।

শুরুর দিকে এক/দুটা প্রোডাক্ট তৈরি হতো। তখন এত চাহিদা ছিল না। ইন্ডাস্ট্রিয়ালি এগোনোর কনসেপ্টও ছিল না। ধীরে ধীরে যখন সবগুলো কম্পোনেন্ট তৈরির চাহিদা ও সক্ষমতা তৈরি হলো, তখন, ১৯৮৩ সালের দিকে তিনি বড় পরিসরে এগোলেন। ঢাকার মিরপুরে প্রথম একটা আধুনিক ফ্যাক্টরি হলো। প্রথম স্টুডিও থেকে যে ডিজাইন কনসেপ্টগুলো বেরুতো, ওই ডিজাইনগুলো যখন একসময় জনপ্রিয় হয়ে উঠল তখন বাবা ভাবলেন এটাকে বড় পরিসরে নিয়ে যেতে হবে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাসেম্বলি লাইন বসাতে হবে। দ্রুত প্রোডাকশনের জন্য মেশিন কিনতে হবে। আপনি একটা কম্পোনেন্ট একটা পার্টিকুলার মেশিনে হয়তো আধাঘণ্টায় বানাতে পারেন, আরেক ধরনেরর মেশিন আছে সেটা হয়ত এক মিনিটে পারে। অন্য একটা মেশিন হয়তো তিরিশ সেকেন্ডে পারে। উনি চিন্তা করলেন কোন মেশিন বসাবেন। মেশিন কেনার সময় আমাদের তেমন পুঁজি ছিল না। অনেক সময় মেশিন কিনতেন না। ধোলাইখাল থেকে যন্ত্রাংশ কিনে নিজে কিছু জোড়াতালি দিয়ে মেশিন বানিয়ে ফেলতেন। সেভাবেই শুরুতে কিছুটা মেশিনের সহায়তায় কিছুটা হাতের সংস্পর্শে নান্দনিক ফার্নিচার তৈরি হতে থাকল।

একটা পর্যায়ে যখন চাহিদা বেড়ে গেল, ১৯৮৩ সালে ফ্যাক্টরি তৈরি করা হয়। যেখানে বিভিন্ন ধরনের ফার্নিচার একইসঙ্গে বেশি পরিমাণে বানানে শুরু হলো। ফ্যাক্টরিতে অ্যাসেম্বলি লাইন প্রোডাকশন ছিল, কম্পোনেন্ট প্রোপারলি বানানো হতো। ১৯৯৪ সালে আমরা আরেকটা ফ্যাক্টরি বানালাম। প্রথমে আমরা শুধু মেটাল দিয়ে ফার্নিচার বানাতাম। পরে বোর্ড আর মেটালের সংমিশ্রনে বানানো শুরু হলো। তারপর কাঠের-প্লাস্টিকের। অনেক কিছু আমরা করেছি। একটা সময় প্লাস্টিক মোল্ড আমরা নিজেরাই বানাতাম। সেটা ছোট পরিসরে।
আমাদের প্রথম শো-রুম করি ১৯৭৭ সালে, এলিফ্যান্ট রোডে। প্রথমে ভাড়া নিয়েছিলাম। পরবর্তীতে সেটা আমরা কিনে নিই। আমরা ওই ফ্লোরটা নেওয়ার আগে ওখানে যারাই যে ব্যবসার শো-রুম করেছে, সবাই লোকসান করেছে। আমরাই টিকে যাই এবং এখন পর্যন্ত আছি। এলিফ্যান্ট রোড কিন্তু তখনো এতটা জমজমাট ছিল না।

শুধু কাঠের (সলিড উড) ফার্নিচার আগে আমাদের ছিল না। আমরা শুধু স্টিল, বোর্ড, প্লাস্টিক ইত্যাদি দিয়ে ফার্নিচার বানাতাম। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর পুরো কাঠের ফার্নিচার বানানো শুরু করি। বাবা মারা যাওয়ার পর (২০০৬ সালে) কাঠের ফার্নিচার বানানোর জন্য আমরা সবচেয়ে বড় ও আধুনিক ফ্যাক্টরিটা বানাই সাভারে, ২০০৭-০৮ এর দিকে। কাঠ তো বিভিন্ন রকমের হয়। একেক রকমের কাঠের প্রকৃতি একেকরকম। কাঠের ফার্নিচার সবসময়ই ইউনিক। মানুষ সেটাকে অন্য চোখে দেখে। কাঠের ফার্নিচারে অনেক বেশি ডিজাইন করার সুযোগ থাকে। এ ধরণের ফার্নিচারের স্থায়িত্বও অনেক বেশি।

শুরু থেকে অফিস ফার্নিচারের জন্য আমরা বিখ্যাত। হাউজহোল্ড ফার্নিচারে আমরা এসেছি অনেক পরে। আমরা যখন কাঠের ফার্নিচার বানানো শুরু করলাম, তখন থেকেই হোম ফার্নিচারের দিকে বিশেষ নজর দেই। কারণ পৃথিবীব্যাপীই মানুষজন বাসা-বাড়িতে কাঠের ফার্নিচার ব্যবহার করা পছন্দ করে। এর আগে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত হোম ফার্নিচার ছিল। এখন অফিস ফার্নিচার এবং হোম ফার্নিচার প্রায় সমান-সমান।

বর্তমানে ফার্নিচারের কনসেপ্ট পরিবর্তন হয়ে গেছে। আগে মানুষ পুরনো দিনের ফার্নিচার ঐতিহ্য হিসেবেই ব্যবহার করত। এখন হয়ত বাস্তবিক কারণেই সেই ট্রেন্ডটা কমে আসছে। কারণ থাকার জায়গা বা অ্যাপার্টমেন্ট ছোট হয়ে আসছে। তাই ফার্নিচারও ছোট হয়ে আসছে।

অটবি এখনো দেশীয় মার্কেটেই বেশি ফোকাস করছে। কারণ বাংলাদেশের মার্কেট এখনো বাড়ছে। দেশের বাইরে ভারত, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এই মার্কেটগুলোকে ফোকাস করছি। আমেরিকা-ইউরোপের মতো মার্কেটগুলো তাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে কিছুটা ধীরগতিসম্পন্ন। সেই মার্কেটগুলোতে আমরা আস্তে আস্তে ঢুকছি। কারণ এই মার্কেটগুলো সহসাই এক্সপেনশন করার সুযোগ নাই।

 

 

NO COMMENTS

Leave a Reply