Home ফিচার বিলীনের পথে পুরনো ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপত্য নিদর্শন

বিলীনের পথে পুরনো ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপত্য নিদর্শন

0 142

সংরক্ষণে নেই কোনো উদ্যোগ

মির্জা মাহমুদ আহমেদ
রাজধানী ঢাকা তার গৌরবোজ্জ্বল ৪০০ বছর অতিক্রম করে এসেছে। ৪০০ বছরের এই পথপরিক্রমায় ঢাকা শাসন করেছে সুলতান, বার ভূইয়া, মোগল ও ব্রিটিশ। এসব শাসনামলের নিদর্শন হিসেবে প্রাচীন স্থাপত্যগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ঢাকাজুড়ে। প্রাচীন রাজধানী হিসেবে যেসব স্থাপত্য নিদর্শন ঢাকার গৌরব প্রকাশ করে, তার অনেকগুলো এখন দখল আর সংস্কারের অভাবে বিলীনপ্রায়। মোগল আমলে নির্মিত ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য নিদর্শন বড় কাটরা, ছোট কাটরা, ফরাশগঞ্জের রূপলাল হাউজ এর মধ্যে অন্যতম।
মধ্য এশিয়ার ক্যারাভাট সরাইয়ের ঐতিহ্য অনুসারে নির্মিত বড় কাটরা। এ ধরনের স্থাপত্য নিদর্শন সারা বিশ্বে এখন খুব কমই টিকে আছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, সম্রাট শাহজাহানের পুত্র শাহ সুজার নির্দেশে ১৬৪১ খ্রিস্টাব্দে বুুড়িগঙ্গা তীরে বড় কাটরা নির্মাণ করা হয়। কাটরা শব্দের অর্থ মঞ্চ বা ঘর।
মোগল সাম্রাজ্যের মীর-ই-ইমারত আবুল কাসেম ইমারতটি নির্মাণ করেন। শাহ সুজার এ ভবনটিতে বসবাস করার কথা থাকলেও পরে এটি মুসাফিরখানা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
একসময় নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীর কারণে বড় কাটরার সুনাম থাকলেও দখল আর সংরক্ষণের অভাবে বড় কাটরা তার প্রাচীন সৌন্দর্য হারিয়েছে বহু আগেই। মূল স্থাপনা বিলীন হয়ে বড় কাটরার ভাঙা ফটক এখনো দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। চকবাজারের বিকিকিনির ব্যস্ততায় আলাদাভাবে খেয়াল না করলে বড় কাটরার ভাঙা ফটকটিও পথিকের চোখ এড়িয়ে যায়।
বড় কাটরার বেশিরভাগ জায়গাজুড়ে রয়েছে বড় কাটরা মাদ্রাসা। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ নিজেদের মতো করে এই প্রাচীন স্থাপত্যের পরিবর্তন ও সংস্কার করেছে। বড় কাটারার মূল ফটকের দুইপাশে রয়েছে অনেক দোকান। যেগুলো এখন ব্যবহৃত হচ্ছে ফটোকপি, জুতার কারখানা আর হোটেল হিসেবে। দখল আর সংরক্ষণের অভাবে প্রাচীন এ স্থাপত্যটির ইট-সুরকি বেরিয়ে এসেছে। অনেক স্থানে বাসা বেঁধেছে পরগাছা। হেরিটেজ আইন অনুযায়ী সংরক্ষিত এসব স্থাপনার ২৫০ মিটারের মধ্যে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করার নিয়ম না থাকলেও বড় কাটরার আশপাশে অপরিকল্পিত বহুতল ভবন নির্মাণ করে প্রাচীন এ স্থাপনাটিকে ঘিরে ফেলা হয়েছে।
মোগল আমলে নির্মিত আরেক স্থাপত্যশৈলী ছোট কাটরা। বড় কাটরার মতো ছোট কাটরাও একই পরিণতি বরণ করেছে। দখল আর সংরক্ষণের অভাবে মোগল আমলে নির্মিত স্থাপনাটি এখন বিলীনের পথে।
চকবাজারের দক্ষিণে সরু গলির ভেতরে অবস্থিত ছোট কাটরার ভগ্নাংশ দেখে এখন আর বোঝার উপায় নেই, মোগল আমলে কী জৌলুস ছড়িয়েছে প্রাচীন এ ইমারতটি। বেদখল হয়ে প্রাচীন এ স্থাপত্যটি এখন জুতার কারখানা, হোটেল এবং বই বাইন্ডিং কারখানা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। নবাবের বংশধর কিংবা লিজসূত্রে প্রাপ্ত দাবি করে দখলদাররা যথেচ্ছভাবে প্রাচীন এ ইমারতটি ব্যবহার করছে। ইমারত আইন অমান্য করে ছোট কাটরার চারদিকে গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিত বহুতল ভবন।
অনেকটা বড় কাটরার আদলে নির্মিত গম্বুজ আকৃতির ছোট কাটরা নির্মিত হয়েছিল সরাইখানা কিংবা প্রশাসনিক কাজে ব্যবহারের জন্য। বড় কাটরার চেয়ে আকারে ছোট হওয়ায় ইমারতটির নামকরণ করা হয়েছিল ছোট কাটরা। আনুমানিক ১৬৬৩ থেকে ১৬৬৪ সালের দিকে শায়েস্তা খান ইমারতটির নির্মাণকাজ শুরু করেন। ১৬৭১ সাল নাগাদ ছোট কাটরার নির্মাণকাজ শেষ হয়। এটির অবস্থান ছিল বড় কাটরার পূর্বদিকে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে। কোম্পানি আমলে ১৮১৬ সালে মিশনারি লিওনার্দ ছোট কাটরায় গড়ে তুলেছিলেন ঢাকার প্রথম ইংরেজি স্কুল।
ঢাকার আরেক প্রাচীন স্থাপত্য নিদর্শন রূপলাল হাউজ। বুড়িগঙ্গার তীরে ফরাশগঞ্জে অবস্থিত ২০০ বছরের প্রাচীন নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীর অনন্য কীর্তি ‘রূপলাল হাউজ’। কালের বিবর্তনে রূপ হারিয়ে এখন মশলার গুদাম ও সরকারি কর্মচারীদের আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে। এক সময় যে বাড়িতে বসত শিল্প-সংস্কৃতির আসর, সে বাড়িতে এখন কেবলই পেঁয়াজ, মরিচ ও রসুনের ঝাঁজ।
১৮৪০ সালে ঢাকার বিখ্যাত আর্মেনীয় জমিদার আরাতুনের কাছ থেকে একটি পুরনো ভবন কিনে নেন অভিজাত ব্যবসায়ী রূপলাল দাস এবং রঘুনাথ দাস। পরে কলকাতার মার্টিন কোম্পানির একজন স্থপতিকে দিয়ে রূপলাল হাউজ তৈরির কাজ শেষ করেন তারা।
জানা যায়, ১৮৮৮ সালে লর্ড ডাফরিনের ঢাকা সফরকালে তার সম্মানে বল রুমে নাচের আয়োজন করা হয়েছিল। আর সেজন্য রূপলাল হাউজের হলঘরটি দু’দিনের জন্য ভাড়া নিয়েছিলেন ইংরেজরা। তখন ঢাকায় শুধু আহসান মঞ্জিল এবং রূপলাল হাউজেই বল নাচের উপযোগী হলঘর ছিল।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় দাস পরিবারের লোকেরা ভারতে পাড়ি জমান। এরপর থেকে একটু একটু করে দখল হতে থাকে প্রাচীন এ স্থাপনাটি।
২০০৯ সালের ২ ফ্রেরুয়ারি ৯৩টি স্থাপনাকে ঢাকার ঐতিহ্য বা হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করেছিল রাজউক। মহানগর ইমারত বিধিমালা অনুযায়ী এসব ঐতিহাসিক স্থাপনার প্রকৃত অবস্থার পরিবর্তন-পরিবর্ধন, সংস্কার-অপসারণ বা পুরোপুরি ধ্বংস করার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এ নিষেধাজ্ঞা কেউ মানছে না। ২০১৭ সালের ১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে হেরিটেজ বা ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবে পরিচিত রাজধানীর ৯৩টি প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও স্থান সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে সরেজমিন ঘুরে এ প্রতিবেদন তৈরির সময় প্রাচীন এ নিদর্শনগুলো সংরক্ষণে কোনো উদ্যোগ দেখা

NO COMMENTS

Leave a Reply