Home মূল কাগজ নগরোদ্যান সঙ্কটাপন্ন বলধা গার্ডেন, মোকারম হোসেন।

সঙ্কটাপন্ন বলধা গার্ডেন, মোকারম হোসেন।

কারিকা প্রতিবেদকঃ


১৯০৯ সাল। ঢাকা তখন রাজধানী, নতুন প্রদেশ পূর্ববঙ্গের। বিচিত্র গাছপালায় সুশোভিত করতে হবে ঢাকার পথঘাট, উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ। এই গুরুদায়িত্ব নিয়েই তখন ঢাকায় আসেন লন্ডনের কিউ বোটানিক গার্ডেনের অন্যতম কর্মী রবার্ট লুইস প্রাউডলক। বলধার প্রকৃতিপ্রেমিক জমিদার নরেন্দ্রনারায়ণ রায়ও ঠিক একই সময়েই শুরু করেন তাঁর অমর সৃষ্টি ‘সাইকি’ বাগানের কাজ। নিজেই ছিলেন সাইকির স্থপতি, শিল্পী ও বিশেষজ্ঞ। সাইকি ছিলেন গ্রিক পৌরাণিক উপাখ্যানের প্রেমের দেবতা ‘কিউপিডের’ পরমা সুন্দরী স্ত্রীর নাম। সাইকি মানে আত্মা, যা দেবরাজ ‘জুপিটার’ কর্তৃক অমরত্ব লাভ করেছিল। নরেন্দ্রনারায়ণ রায় প্রায় ২৭ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে ১৯৩৬ সালে সাইকি বাগানের কাজ শেষ করেন। তারপর সিবিলিও গড়ে তোলেন। কিন্তু বৃক্ষপ্রেমী এই জমিদারের মৃত্যুর পর থেকেই বাগানটির ক্রান্তিকাল শুরু হয়। প্রায় ১০০ বছরের ব্যবধানে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে বাগানটির জৌলুস আর কমতে থাকে বাগানের সমৃদ্ধ উদ্ভিদপ্রজাতির সংগ্রহ।

আমরা জানি, নানা কারণে আজ বলধা গার্ডেন বিপন্ন। অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং অযত্ন -অবহেলা ও অদূরদর্শিতা এ বাগানের দুস্প্রপ্য উদ্ভিদগুলো হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। ইতোমধ্যেই অনেক দুর্লভ বৃক্ষ হারিয়ে গেছে। গত কয়েক বছরে এই সংখ্যা আরও অনেক বেড়েছে। দেশের প্রকৃতিপ্রেমিক লেখক ও বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে বলধা গার্ডেন সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে আসছে। গুরুত্বপূর্ণ এই বাগানের চারপাশে অনেক সুউচ্চ স্থাপনা তৈরি হওয়ায় সেখানকার উদ্ভিদবৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। পাশাপাশি বর্ষায় সুয়ারেজের উপচেপড়া ময়লা পানিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার কারণেও প্রতি বছর অনেক গাছপালার মৃত্যু হচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে এখানকার বিলুপ্ত গাছের তালিকা প্রতিনিয়তই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অচিরেই এই বাগান ধ্বংস হবে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
দেশের উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও নিসর্গীদের মতে, মূল গাছগুলো অক্ষত রেখে এবং বর্তমান বাগানকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করে চারাকলমের মাধ্যমে বাগানের গাছগুলো অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে বলধা গার্ডেনের আদলে আরেকটি বাগান তৈরি করা উচিত। তাহলে বাগানটি নিশ্চিত বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে। হারিয়ে যাবে না বাগানের দুস্প্রাপ্য গাছগুলো।
আমরা মনে করি, দেশের কোনো সুবিধাজনক স্থানে এ বাগানের সব উদ্ভিদপ্রজাতি নিয়ে হুবহু আরেকটি বাগান তৈরি করে দেশের শত বছরের ঐহিত্য এই বাগানটি রক্ষা করা সম্ভব। এজন্য উপযুক্ত স্থান হতে পারে ঢাকার অদূরে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান বা সংলগ্ন এলাকা। সেখানে বলধা বাগানের জন্য পরিমাণমতো জায়গা নিয়ে বিদ্যমান নকশায় সৃজন করা যায় আরেকটি নতুন বলধা গার্ডেন। এর জন্য প্রয়োজন হবে একটি বিশেষ নার্সারি এবং কয়েকজন সুদক্ষ মালি। তবে খেয়াল রাখতে হবে কোনোভাবেই যেন উদ্যানের পুরনো নকশার বিকৃতি না ঘটে, আদি উদ্যানও অবহেলার শিকার না হয়। কারণ সংরক্ষণের নামে বাগানের নাম ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পরিবর্তন বাঞ্ছনীয় নয়।

বলধা গার্ডেনের বর্তমান হতশ্রী রূপ দেখে খুব সহজেই অনুমান করা যায়, বাগানটি লোকবল ও অর্থ সঙ্কটে ভুগছে। বাগানের সর্বত্র অযত্নের ছাপ। সংরক্ষিত সাইকি অংশের পরিস্থিতিও বেশ নাজুক। স্বল্প সংখ্যক মালি নিয়ে শুধু গাছগুলো বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। চারপাশের উঁচু দালানে প্রায় ঢাকা পড়েছে বাগানটি। দিনের আলোয়ও পেছনের দিকটা বেশ অন্ধকার। সিবিলি অংশে সারাদিনই দর্শনার্থীদের ভিড়। এই দর্শনার্থীরা মূলত অন্য মতলবে এখানে আসেন। অপ্রয়োজনীয় মানুষের বিক্ষিপ্ত পদচারণা বাগানের গাছগুলোকে বিপন্নতর করে তুলছে। প্রশ্ন হলো, বলধা গার্ডেনের মতো এমন স্পর্শকাতর একটি স্থাপনা কেন টিকিটের বিনিময়ে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হলো! তবুও যারা এখানে বেড়াতে আসেন তারা যদি সত্যিকার অর্থে বৃক্ষের সমঝদার হতেন তাহলে কোনো প্রশ্ন ছিল না। উপরন্তু নিত্যদিনের এই অনিয়ন্ত্রিত জনস্রোত উদ্যানের বিপন্ন গাছগুলোর মৃত্যুকেই শুধু ত্বরান্বিত করছে। এই বাগানের অর্জিত অর্থ ছাড়া কি বন বিভাগের চলছিল না? আবার এখানকার অর্জিত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হলেও বাগান রক্ষণাবেক্ষণে তার সিকিভাগও ব্যয় হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা অচিরেই এসব আত্মঘাতী কাজের সমাপ্তি ঘটবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাগানটি বাঁচিয়ে রাখতে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
বিকল্প বলধা গার্ডেন প্রতিষ্ঠায় সরকারি এবং বেসরকারি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে বিষয় সংশ্লিষ্ট গবেষক এবং বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হলে কাঙ্ক্ষিত সফলতা আসবে বলে মনে করি।

বাগানের উল্লেখযোগ্য সংগ্রহঃ 
বলধা গার্ডেনের সর্বমোট আয়তন শূন্য দশমিক ১ হেক্টর হলেও সাইকি অংশ দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে যথাক্রমে ১০০ ও ৪৫ মিটার। সিবিলি অংশ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হলেও সাইকি সংরক্ষিত। উভয় বাগানে সর্বমোট ৮৭ পরিবারের ৭২০ প্রজাতির ১৭ হাজার উদ্ভিদ ছিল বলে জানা যায়। সাইকি অংশে প্রায় ৪৫০ প্রজাতির উদ্ভিদের বিরলতম সংগ্রহ গড়ে তোলা হয়েছিল। প্রবেশপথের দু’পাশে প্রথমেই শাপলা ও পদ্মপুকুর। সেখানে ১২ প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ রয়েছে। দুর্লভ শাপলার মধ্যে হলুদ শাপলা ও থাই-বেগুনি শাপলা উল্লেখযোগ্য। আরেকটু সামনেই ডানদিকে রোজক্যাকটাস, প্যাপিরাস, কনকসুধা। বাঁ দিকে আছে ঘৃতকুমারী। তারপর ঔষধি গাছ-গাছড়া, আমাজন পদ্ম, পদ্ম, অর্কিড ঘর, হংসলতা, তার পাশেই জমিদারের বাড়ি ও জাদুঘর। তার দক্ষিণ পাশেই জ্যাকুইনিয়া, শারদমল্লিকা, কণ্টকলতা, গুস্তাভা, হিং, শ্বেতচন্দন, সাইকাস, স্বর্ণ অশোক, কুর্চি, ভুর্জপত্র। ডানদিকে ক্যাকটাসের দুর্লভ সংগ্রহ নিয়ে একটি ঘর। এখানে ক্যাকটাস ঘরের সংখ্যা ৩টি, পটিংঘর একটি, ছায়াঘর দুটি, অর্কিডঘর একটি। মাঝখানে আছে চারদিকে তাকসমেত পিরামিড আকৃতির একটা ঘর। তাকগুলোতে থরে থরে সাজানো ক্যাকটাস। একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে ছায়াঘর। সেখানে নানা জাতের ফার্ন, ফার্নঘরের ভেতর কৃত্রিম সুড়ঙ্গের মাধ্যমে চমৎকার পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। স্বর্ণ অশোকের পাশেই সাদা ও গোলাপি রঙের ক্যামেলিয়া, তারপর রাজ অশোক। দক্ষিণ দিকের দেয়ালের পাশে ছোট জাতের কয়েকটি পাম। ছোট-বড় মিলিয়ে সাইকিতে ১৬ প্রজাতির পাম রয়েছে। সাইকির বিরলতম সংগ্রহের মধ্যে আরও আছে লতাচালতা, ক্যানেঙ্গা, ঈশের মূল, নবমল্লিকা, ওলিওপ্রেগরেন্স, জিঙ্গো বাইলোবা, অ্যারোপয়জন, র‌্যাভেনিয়া, আফ্রিকান বকুল, নাগলিঙ্গম, উদয়পদ্ম, রাজ অশোক ইত্যাদি।

সিবিলি বাগানের বিশেষত্ব হচ্ছে এর প্রবেশপথ। কারণ প্রবেশপথের দু’পাশ উদয়পদ্মে সুসজ্জিত। এ পথ একেবারে উত্তরপ্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। এছাড়াও মনোলোভা সব ক্যামেলিয়ার ঘর এ বাগানেই। এখানেও চারপাশে ঘোরানো পথ আছে। বাঁ পাশে পুকুরের কোনায় আছে সুউচ্চ মুচকুন্দ আর ডানপাশে পোর্টল্যান্ডিয়া। আরেকটু এগোলে চোখে পড়বে কলকে, অ্যারোপয়জন, কপসিয়া, হলদু, দেবকাঞ্চন, কনকসুধা, কনকচাঁপা, লতা জবা, স্কারলেট কর্ডিয়া, কাউফল। শঙ্খনিধি পুকুরে নানান জাতের জলজ ফুলের চাষ হয়। সারাবছরই কিছু না কিছু ফুল থাকে। পুকুরের চারপাশে তাক আছে, দু’পাশে আছে শানবাঁধানো ঘাট। পথের শেষ প্রান্তে আছে কয়েকটি দুর্লভ রাজ অশোক, তারপর বাঁ দিকে ঘুরলে আফ্রিকান টিউলিপ (রুদ্রপলাশ), গড়শিঙ্গা, ক্যামেলিয়ার ঘর, দেয়াল লাগোয়া পশ্চিম পাশে আছে একসারি ক্যানেঙ্গা ও ইয়ক্কা, দু’জাতের কেয়া ইত্যাদি। এ বাগানে দুটি ঘর আছে, একটিতে থাকে অর্কিড, অন্যটি চারাগাছের ভান্ডার। শঙ্খনিধি পুকুরের পশ্চিম পাড়ের দোতলা ঘরটি এখন পরিত্যক্ত। এখানে আরও আছে মাধবী, অশোক, লুকলুকি, পান্থপাদপ, শতায়ু উদ্ভিদ, পাখিফুল, কৃষ্ণবট ইত্যাদি। এ বাগানের গোলাপ এক সময় উপমহাদেশে প্রসিদ্ধ ছিল।

NO COMMENTS

Leave a Reply