Home মূল কাগজ সদ্য সমাপ্ত ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে পোস্টার থেকেই ২৫’শ টন প্লাস্টিক বর্জ্য!

সদ্য সমাপ্ত ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে পোস্টার থেকেই ২৫’শ টন প্লাস্টিক বর্জ্য!

0 65

কারিকা প্রতিবেদক

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা তখন তুঙ্গে। ঠিক সে সময়ই বেসরকারি সংস্থা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো) ‘বাংলাদেশে লেমিনেটেড পোস্টার, লিফলেট, স্টিকার ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে ‘থার্মাল লেমিনেশন ফিল্মস : অ্যান ইনসিজিং হেল্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট হ্যাভক অব ঢাকা সিটি’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদনের ফল প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরুর পর প্রায় ১২ দিনের মধ্যে ২ হাজার ৪৭২ টন লেমিনেটেড প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়েছে। সংস্থাটি ধারণা করেছে, পুরো নির্বাচনে শুধু পোস্টার থেকেই ২ হাজার ৫০০ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়েছে। নির্বাচনী পোস্টারসহ অন্যসব প্রচার সামগ্রী মিলিয়ে ২০১৯ সাল জুড়ে সমগ্র ঢাকায় ১০ হাজার টন লেমিনেটেড পোস্টার বর্জ্য তৈরি হয়েছে।
এসডোর গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর পরিবেশবাদী থেকে শুরু করে নগরবাসীর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। এমনিতেই নানা রকম দূষণে জর্জরিত ঢাকা। তার ওপর নির্বাচনী পোস্টার থেকে উৎপন্ন ২৫’শ টন বর্জ্য ঢাকার পরিবেশকে আরও ভারাক্রান্ত করে তুলবে- এমন আশঙ্কাই জেঁকে বসেছিল সবার মনে।
অথচ নির্বাচনী প্রচারণায় নেমে ‘গ্রিন ঢাকা’র স্বপ্ন দেখানো স্বপ্নবাজরাই ঢাকা ঢেকেছিলেন পলিথিনের পোস্টারে। পরিবেশবাদীরা বলছেন, যাদের হাতে পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগরী গড়ার দায়িত্ব, তারাই যদি নগরীর পরিবেশের ক্ষতিকর কার্যক্রমে জড়িয়ে যান, তাহলে এ নগরী রক্ষা করবে কে, পরিচ্ছন্ন রাখবে কে?
সিটি নির্বাচনসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে অবৈধ পলিথিন দিয়ে তৈরি লেমিনেটেড পোস্টারের যথেচ্ছ ব্যবহারের বিষয়টি হাইকোর্টের নজরেও এসেছে। সিটি নির্বাচনে লেমিনেটেড পোস্টারের ব্যবহার বন্ধে গত ২২ জানুয়ারি নিষেধাজ্ঞা জারি করেন হাইকোর্ট। সিটি নির্বাচনের প্রচারণা চলাকালীন এই নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। এ ছাড়া লেমিনেটেড পোস্টার লাগানো কেন বেআইনি নয়- তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের এ রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
সিটি নির্বাচনের প্রায় সপ্তাহখানেক আগে হাইকোর্ট লেমিনেটেড পোস্টার নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেও প্রচারণার বাকি দিনগুলোতে লেমিনেটেড পোস্টার ব্যবহারের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশন কার্যত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। নির্বাচনী আচরণবিধি তদারকির জন্য নিয়োগকৃত ম্যাজিস্ট্রেট লেমিনেটেড পোস্টার ব্যবহারের বিষয়টি তদারকি করেননি। লেমিনেটেড পোস্টার ব্যবহারের অভিযোগে কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। তবে ঢাকা উত্তরের রিটার্নিং অফিসার আবুল কাশেম সাংবাদিকদের বলেন, ‘সিটি করপোরেশন (নির্বাচনী আচরণ) বিধিমালায় পলিথিন মোড়ানো পোস্টার ব্যবহার বিষয়ে কিছু বলা নেই। সে জন্য এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা এখনো নেওয়া হয়নি।’
এসডো বলছে, ঢাকা শহরে প্রতি বছর বিভিন্ন উৎস থেকে গড়ে প্রায় ১০ হাজার টনের ওপর লেমিনেটেড প্লাস্টিকের বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যা মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। গবেষণামতে, ২০১৯ সালে ৭ হাজার ১৪৫ দশমিক ২ টন লেমিনেটেড প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়েছে। ২০২০ সালে আনুমানিক ১০ হাজার ৪৩৮ টন বর্জ্য উৎপন্ন হবে, যেগুলো পূর্ণ প্রক্রিয়াজাতকরণ (রিসাইক্লিং) সম্ভব নয়। বিশেষ করে অমর একুশে বইমেলা ও অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রদর্শনীতে লেমিনেটেড পোস্টার, লিফলেট এবং স্টিকার বিতরণ নিষিদ্ধ করতে কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হয়।
এসডোর মহাসচিব ড. শাহরিয়ার হোসেন বলেন, প্রাথমিক ব্যবহারের পরে ফেলে দেয়া এ বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য প্লাস্টিক দূষণের অংশীদার হবে। এসব একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক-বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে, পরিবেশ বিপর্যয় ঘটবে। এ ছাড়া বায়ু ও পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

পরিত্যক্ত পোস্টারের কাগজে লিখবে সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা, ব্যানার দিয়ে তৈরি হচ্ছে স্কুলব্যাগ
এসডোর গবেষণা প্রতিবেদনের ফলাফল পরিবেশবাদী ও নগরবাসীর কপালে যতটা চিন্তার ভাঁজ ফেলেছিল, পরিত্যক্ত পোস্টারের কাগজে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য খাতা তৈরির খবর ততটাই স্বস্তি জুগিয়েছে। নির্বাচনের পর এসব পোস্টার কী হবে-তা নিয়ে নানা আলোচনার মধ্যে ‘বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন’ পোস্টার দিয়ে শিক্ষা উপকরণ বানানোর ঘোষণা দেয়। তাদের স্লোগান ছিল : আপনার কাছে যা বর্জ্য, অন্যের জন্য তা সম্পদ।
ভোটের পর সংগ্রহ করা প্রায় ২০ টন পোস্টার, ব্যানার ও লিফলেটে এসব উপকরণ তৈরির কর্মযজ্ঞ চালাচ্ছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন। ইতিমধ্যে কিছু খাতা শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে।
পোস্টার সংগ্রহ করতে গিয়ে মেয়রসহ অনেক কাউন্সিলর প্রার্থীর কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পেয়েছেন বলে জানালেন বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাকর্মী সালমান ইয়াসির। তিনি বলেন, ‘মানুষের সাড়া ছিল প্রত্যাশার চেয়ে বেশি। অনেক প্রার্থী, সাধারণ মানুষ নিজেদের উদ্যোগে পোস্টার পৌঁছে দিয়ে গেছেন। আমরা চিন্তায় ছিলাম মানুষের সাড়া পাব কি না। কিন্তু আমরা প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সাড়া পেয়েছি।’
সালমান জানান, সব পোস্টার দিয়ে খাতা বানানো যাবে না। বাকিগুলো দিয়ে খাবারের প্যাকেটসহ অন্যান্য শিক্ষা উপকরণ, ব্যানার দিয়ে স্কুলব্যাগ, বাজারের ব্যাগ এবং কলম- পেন্সিল রাখার ব্যাগ তৈরি হবে।
পোস্টার দিয়ে শিক্ষা উপকরণ তৈরির কর্মসূচির ফলে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক থেকে অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে পোস্টার সরে গেছে।
উল্লেখ্য, এবার ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে উত্তর ও দক্ষিণ মিলিয়ে ১৩ মেয়র ও সাড়ে সাত’শ কাউন্সিলর প্রার্থী ছিলেন। মেয়র প্রার্থীদের প্রত্যেকে গড়ে ৪ লাখের বেশি পোস্টার ছাপিয়েছেন। কাউন্সিলর প্রার্থীরা ছেপেছেন ৫ থেকে ১০ হাজার করে।
বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সিটি নির্বাচনে পরিত্যক্ত, অব্যবহৃত পোস্টার, ব্যানার, লেমিনেটিংয়ের কাজে ব্যবহৃত পলিথিন জনহিতকর কাজে ব্যবহার করায় পরিবেশবাদী সংগঠন, জনপ্রতিনিধি, নগরবাসীসহ সকলেই স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।
ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে লেমিনেটেড পোস্টারের ব্যবহার আর মাত্রাতিরিক্ত শব্দদূষণের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচনে লেমিনেটেড পোস্টার নিষিদ্ধ এবং মাইকের ব্যবহার সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এই সিদ্ধান্তে উপনির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ছয় প্রার্থী সম্মত হয়েছেন।

NO COMMENTS

Leave a Reply