Home মূল কাগজ সবুজের মাঝে একখন্ড ‘মাটির ঘর’

সবুজের মাঝে একখন্ড ‘মাটির ঘর’

সাবরিনা মিলি


চাকচিক্যময় রেস্টুরেন্ট বলতে যা বোঝায় এখানে তার অনেকটাই অনুপস্থিত। তবে যে জিনিসটির প্রাচুর্যতা আছে, তা হলো সবুজ। রয়েছে নান্দনিকতার ছোঁয়া।
মোট তিন বিঘা জমিতে গড়ে উঠেছে ‘মাটির ঘর’। কিন্তু অবাক করার বিষয়, মোট জায়গার এক তৃতীয়াংশেরও কম জায়গা জুড়ে রয়েছে রেস্টুরেন্টটি। বাকিটা সবুজঘেরা। বসার জন্য বাঁশের তৈরি কয়েকটা বেঞ্চ রয়েছে মাঝে মাঝে। রেস্টুরেন্টটির গেট দিয়ে ঢুকতেই নজরে পড়বে ছনের ছাউনি দেয়া গোলাকৃতি ঘর। চারপাশ খোলা এবং পুরো এলাকা সবুজঘেরা বলে প্রচন্ড গরমেও বেশ প্রশান্তি মেলে এখানে। ছনের ঘরটি ধরে এগোলে একপাশে পার্কিং। অন্যপাশে রেস্টুরেন্টটি। পার্কিংয়ের সামনেই রয়েছে একটি পাকা ঘর। রেস্টুরেন্টের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখা হয় ঘরটিতে। সেখানে রয়েছে রেস্টুরেন্ট-কর্মীদের থাকার জায়গাও। ঘরটির পেছনে রয়েছে খানিকটা ইট বিছানো পাকা জায়গা ও বড় বড় কয়েকটি গাছ। এই গাছের সঙ্গেই রশি দিয়ে গাড়ির টায়ার বেঁধে বানানো হয়েছে দোলনা। বসার জন্য চেয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে গাছের গুড়ি। ছনের গোল ঘর ধরে রেস্টুরেন্টের দিকে যেতে চাইলে প্রথমে পড়বে একটি ছোট্ট জলাশয়, যেটা পেরোলেই রেস্টুরেন্ট। ভেতরে ঢুকলেই অন্যরকম এক আবহ। মাটির ঘরে মাটির পাত্রে চলছে খাওয়া-দাওয়া।

‘মাটির ঘর’ বলতে সাধারণত আমরা যে-রকম বুঝি ছোট ছোট জানালা, বৃষ্টির দিনে ভেতরটা স্যাঁতস্যাঁতে, আলো-বাতাসের অপর্যাপ্ততা। কিন্তু সে ধারণা নিমিষেই উবে যাবে। বড় বড় জানালার পাল্লায় বিভিন্ন ধরনের চিত্রকর্ম। আসবাব হিসেবে নজরে পড়বে রেন্ডি গাছের একহারা তক্তা, যা টেবিল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। অন্যদিকে চেয়ার হিসেবে রেন্ডি গাছের গুড়ি। বৈদ্যুতিক পাখা এবং লাইটের পাশাপাশি রয়েছে হ্যারিকেনের ব্যবস্থাও। সব জায়গায়ই রয়েছে দক্ষ শিল্পীর নিপুন হাতের ছোঁয়া। সব মিলিয়ে রেস্টুরেন্টটিকে বলা যায় প্রকৃতির মাঝে একখন্ড মাটির ঘর। পুরো ডিজাইনটি করেছেন রেস্টুরেন্টের কর্র্ণধার জাকারিয়া আকন্দ বিপ্লব। তিনি বলেন, ‘এটির ডিজাইনারও আমি আবার মাঝে মাঝে মিস্ত্রির কাজও আমাকে দেখিয়ে দিতে হয়েছে।’
রেস্টুরেন্টটি চালু হয়েছে মাত্র বছরখানেক। কিন্তু প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল বেশ ক’বছর আগে। প্রায় আড়াই বছর লেগেছে মাটির ঘরটি নির্মাণ করতেই।
জাকারিয়া আকন্দ বিপ্লব জানান, এটি আসলে তার দাদার বাড়ি। ছোটবেলা থেকেই এই জায়গার প্রতি তার প্রচণ্ড টান ছিল। সেই টান থেকেই এখানে কিছু একটা করার তাগিদ অনুভব করেন। সেটা যে রেস্টুরেন্ট হবে, তেমনটা না ভাবলেও ‘মাটির ঘর’ বানাবেন এ স্বপ্ন ছিল অনেক আগে থেকেই।
খাবার নিয়ে সাধারণত এরা তিন ধরনের বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রথমত রেস্টুরেন্টের কর্ণধারের পছন্দ, দ্বিতীয়ত এখানে কর্মরত বাবুর্চিদের পছন্দ এবং তৃতীয়ত যারা আসেন তাদের চাহিদা ও পছন্দ।
জাকারিয়া আকন্দ বিপ্লব বলেন, ‘আমাদের চাওয়া ছিল গ্রামের যে খাবারগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে সেগুলোর পাশাপাশি এখনো যে খাবারগুলো মানুষ গ্রামে বা নিজের বাড়িতে খেতে পছন্দ করেন সেসব আয়োজন রাখা। এখনও পুরোপুরি সফল না হলেও আমরা ছোট ছোট আকারে ইতোমধ্যেই শুরু করতে পেরেছি। যেমন হারিয়ে যাওয়া খাবারের তালিকায় আছে কাঞ্জি বা কাজির ভাত। এই ভাতের চাউল প্রস্তুত করতে হয় এক সপ্তাহ আগে থেকে। এই ভাত একেক এলাকায় একেক রকমভাবে পরিচিত। রান্নার মধ্যেও আমি অনেক পার্থক্য পেয়েছি। কাঞ্জির ভাত করাটা বেশ কঠিন কাজ। এর জন্য এমন একটি চুলা দরকার যেখানে প্রতিদিন রান্নাবান্না হয়। চালের হাঁড়ি চুলার কাছাকাছিই থাকবে যাতে চুলার আঁচ এসে পানি দেওয়া চালে লাগে। এক সপ্তাহ পরে এসে এই চাল রান্না করতে হবে। রান্না শেষে একটা টক-স্বাদ গন্ধ আসে যা অনেকের খুব পছন্দ। এটি শুধু একটি রেস্টুরেন্টই নয়, আমার স্বপ্ন পূরণের প্রথম পদক্ষেপ।’

বিপ্লব জানান, এখানকার খাবারের তালিকায় মিলবে লাল চালের ভাত। যেমন টেপা এবং বোরো চালের ভাত। যা খুলনা এলাকায় বাশফুল চাল নামে পরিচিত। এই চালের ভাতে খুব সুন্দর একটা ঘ্রাণ হয়। এছাড়াও আছে মানিকগঞ্জের বাউলাদিঘা চাল, টাঙ্গাইল এলাকার গাঞ্জিয়া চাল। বর্তমানে এই তিনটি চালই তারা বেশি ব্যবহার করছেন। এছাড়াও এখানে হিজল দিঘি, আউস, আমন ইত্যাদি চালের ভাতও মাঝে মাঝে পাওয়া যায়।
আরেকটা রয়েছে চালবিরুনী। যার জন্য চালটা প্রথমে মুড়ির মতো করে ভেজে নিতে হয়। তারপর ওই চাল দিয়ে খিচুড়ির মতো রান্না করতে হবে। এই জটিল প্রকার রান্নাগুলো আবার আলাদা স্বাদের হয়। যা অনেকের অনেক পছন্দ আবার অনেকের অপছন্দ। এখানে বউভাত নামে একটা ভাত করা হয়। অঞ্চলভেদে একে বউয়া ভাতও বলে।
জানা যায়, শুক্রবার ও শনিবারসহ অন্য যেকোনো সরকারি ছুটির দিনগুলোতে এখানে বেশি ভিড় থাকে। অনেক সময় খাবারের জন্য আপনাকে এক থেকে দেড় ঘন্টাও অপেক্ষা করতে হতে পারে। তবে ছুটির দিনগুলোতে খাবারের ভিন্নতা থাকে বেশি। এবং এসব দিনে নিয়মিত আইটেমের বাইওে মাটির চুলায় রান্না করা হয়। এদিন ব্যাম্বো চিকেন, কলাপাতার মধ্যে রান্না করা হয় এক ধরনের মাছ। এ ধরনের রান্নার জন্য রয়েছেন পাহাড়ি বাবুর্চি রিন্টু চাকমা।

রিন্টু চাকমার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যেসব সবজি এই এলাকায় চাষ হয়, তার সবগুলোই এখানে ভর্তা হিসেবে মেলে। আলু, বেগুন, ঢেঁড়শ, টমেটো তো আছেই, সঙ্গে আছে সসপাতা, টক পাতা ভর্তা ইত্যাদি। দাম ৪০ টাকা। মাঝে মাঝে কুমড়া ফুলের বড়াও পাওয়া যায়।
শুঁটকির মধ্যে নিয়মিতই থাকে লইট্যা, ফাইস্যা ও ছুরি। দাম ৪০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত। কাটামাছ ভর্তার দাম ৫০ টাকা।
পঞ্চপদি নামে এক ধরনের ডাল পাওয়া যায় এখানে। মুগ, মসুর, খেসারি, মটর ও ছোলা পাঁচ ধরনের ডাল মিশিয়ে এটা রান্না করা হয়। এর সঙ্গে মাঝে মাঝে দেয়া হয় টক, যা আলাদা স্বাদ যুক্ত করে ডালে।
এখানে মিলবে কলাপাতায় রান্না করা গজার মাছ। দাম ২৫০ টাকা। দেশি চিতল/বোয়াল ভুনা ৩৫০ টাকা, ইলিশ ভাজা/ভুনা ২৫০ টাকা এবং চিংড়ি মাছ ভুনা পাওয়া যায় ১৮০ টাকায়।
অন্যদিকে বাঁশের চোঙায় রান্না করা দেশি মুরগির দাম ২৫০ টাকা। দেশি মুরগি-ভুনা ২০০ টাকা, পাতিহাঁস ভুনা ২০০ টাকা এবং মহিষ ভুনা মিলবে ২০০ টাকায়।
পাহাড়ি বিন্নি চালের পায়েস মিলবে ৭০ টাকায়। বগুড়ার শেরপুরের দই ৬০ টাকা এবং দই মালাইয়ের লাচ্ছির দাম ১০০ টাকা। এছাড়াও রয়েছে ফুল পিঠা, পাতা পিঠা, শামুক পিঠা, নিমকি এবং মনেক্কা।
একদিন আগে যোগাযোগ করে পছন্দের তালিকা জানিয়ে দিলেই পরদিন যথাসময়ে পেয়ে যাবেন আপনার কাক্সিক্ষত সুস্বাদু খাবার।

যোগাযোগ : মাটির ঘর, কেটুন, নাগরী, কালীগঞ্জ, গাজীপুর।
মোবাইল : ০১৭১৬-৮৮৩১২০

NO COMMENTS

Leave a Reply