Home মূল কাগজ প্রচ্ছদ সবুজে সাজবে ঢাকার পাশের চার নদীতীর

সবুজে সাজবে ঢাকার পাশের চার নদীতীর

ধকল কাটবে দূষণ-দখলের

মির্জা মাহমুদ আহমেদ
দূষণে-দখলে বিপর্যস্ত ঢাকার চারপাশের নদী রক্ষা ও এর সৌন্দর্যবর্ধনে মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর তীরভূমিতে পিলার স্থাপন, তীররক্ষা, ওয়াকওয়ে, জেটিসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণে একটি প্রকল্প বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন আছে।
বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার চারপাশে নদীতীর রক্ষা ও সৌন্দর্যবর্ধনের এই প্রকল্প বাস্তবায়নে চলতি (২০১৮-১৯) অর্থবছরে ৮৪৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে প্রকল্পের খসড়া নকশা প্রণয়ন শুরু করা হয়েছে।
ঐতিহাসিক আহসান মঞ্জিলকে কেন্দ্র করে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে গড়ে তোলা হবে দৃষ্টিনন্দন এলাকা। ঢাকার চারটি নদীকে কেন্দ্র করে নির্মাণ করা হবে সবুজে ঘেরা তিনটি ইকোপার্ক। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু আর শীতলক্ষ্যার তীরে নির্মাণ করা হবে ২২০ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে। নদীতীরের বিভিন্ন স্থানে নির্মাণ করা হবে ১০০টিরও বেশি ঝুলন্ত সিঁড়ি। থাকবে ৪০৯টি বসার স্থান। পণ্য ওঠানামার জন্য নির্মিত হবে ১৯টি আধুনিক আরসিসি জেটি। বাবুবাজার থেকে সদরঘাট এলাকার নদীর পাড় দখলমুক্ত করে সেখানে নদীর পর্যবেক্ষণ ডেক এবং দৃষ্টিনন্দন দোকান নির্মাণ করা হবে। সংস্কৃতি চর্চার জন্য থাকবে উন্মুক্ত অপেরা হাউজ। নদীতীরের চারদিক থাকবে সবুজে ঘেরা। শিশুদের জন্য থাকবে আলাদা শিশু কর্নার। মনজুড়ানো আলোকসজ্জায় পাল্টে যাবে বুড়িগঙ্গাসহ চার নদীর রাতের দৃশ্য।
বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর দূষণ রোধ, দখল প্রতিরোধ ও সৌন্দর্যবর্ধনে ধাপে ধাপে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২২-এর জুন মাস নাগাদ এই প্রকল্পের কাজ শেষ হতে পারে।
নদীতীর দখল ঠেকাতে প্রায় ১০ হাজার সীমানা পিলার বসানো হবে। প্রতিটি সীমানা পিলারের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে সাড়ে তিন লাখ টাকা। যার স্থায়িত্ব হবে ন্যূনতম ১০০ বছর। আরসিসি ঢালাই করা সীমানা পিলারের ৩০ থেকে ৩৫ ফুট থাকবে মাটির নিচে এবং পিলারের ওপরে ১৬ ফুট দৃশ্যমান থাকবে।
এই প্রকল্পের উপপরিচালক প্রকৌশলী এএসএম আশরাফুজ্জামান বলেন, ইতোমধ্যে সরাসরি নিয়োগযোগ্য জনবল ও আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগের কাজ শেষ হয়েছে। পরামর্শক সেবা গ্রহণের জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বেশকিছু এক্সক্যাভেটর ও পন্টুন কেনার জন্য চুক্তি হয়েছে। এছাড়া প্রকল্পের আওতায় ঢাকা নদীবন্দর এলাকায় ২ হাজার ৬টি সীমানা পিলার নির্মাণের দরপত্র আহবান করা হয়েছে। পাশাপাশি রামচন্দ্রপুর থেকে বছিলা ও রায়েরবাজার খাল থেকে কামরাঙ্গীর চর পর্যন্ত ওয়াকওয়ে, কিওয়াল, ওয়ানওয়ে অন পাইল ইত্যাদি স্থাপনা নির্মাণের দরপত্র আহবান করা হয়েছে। সব মিলিয়ে গত এক বছরে প্রকল্পের ১০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
ঢাকার চারপাশের নদীতীর উন্নয়নে গৃহীত মহাপরিকল্পনা প্রসঙ্গে স্থপতি ইকবাল হাবীব কারিকাকে বলেন, প্রথমত, নদীর পাড়জুড়ে যে ধরনের পরিকল্পনাই নেয়া হোক না কেন তার পরিবেশগত এবং সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন করে দেখা দরকার। এ প্রকল্পে যে ব্যয় হবে তার ফিন্যান্সিয়াল রিটার্ন ক্যালকুলেশন করে দেখতে হবে। এই প্রাক সমীক্ষাগুলো অতন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের বৃহৎ প্রকল্পগুলোতে পরিবেশগত সামাজিক এবং অর্থনৈতিক প্রাক সমীক্ষার গুরুত্ব আইনগতভাবেই রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সমীক্ষা না করে যেন প্রকল্পটি শুরু করা না হয়। দ্বিতীয়ত নদীর পাড় উদ্ধারের পাশাপাশি উদ্ধারকৃত জায়গা সুনির্দিষ্ট করে সংরক্ষণের প্রক্রিয়া যদি না শুরু করা হয়, তাহলে সমীক্ষানির্ভর কার্যক্রম শেষ হয়ে আসতে আসতে তা আবার বেদখল হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে আমরা বলেছিলাম, প্রয়োজন হলে ডিজিটাল পদ্ধতিতে অর্থাৎ আইওটি বেজ ডিজিটাল পদ্ধতিতে জমির সীমা চিহ্নিতকরণ এবং দখলী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সেই কার্যক্রমগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। নদীপাড়ের যেসব এলাকায় সৌন্দর্যবর্ধন ও উন্নয়নকাজ করা হবে, সেসব এলাকায় ভূমির মূল্য বেড়ে যাবে। নাগরিকদের বসবাসের হারও বেড়ে যাবে। সেজন্য ওইসব অঞ্চলে অবকাঠামোগত সুবিধা ও ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমও পরিকল্পনার মধ্যে আনতে হবে। তা করা না হলে প্রকল্প বাস্তবায়নের পর সেখানে খাবার পানির সংকট এবং নানারকম নাগরিক সমস্যা দেখা দেবে। ট্রাফিক কনজাকশন সৃষ্টি হবে। ঢাকার চার নদী দিয়ে পুরো ঢাকা শহরের কঠিন ও তরল বর্জ্য প্রবাহিত হয়। সেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। নদীতীর রক্ষা ও উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে তরল ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও এই প্রকল্পের সঙ্গে অর্ন্তভুক্ত করে সেটার কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে। সেটা করা না হলে জনসাধারণ এই বৃহৎ প্রকল্পের সুফল পাবে না।
বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমডোর এম মাহবুব উল ইসলাম বলেন, যেভাবে উন্নয়নমূলক কাজ করার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে, তা টেকসই হবে। চলতি বছরের মধ্যেই খুঁটি বসানোর কাজ শুরু হবে। বাকি কাজ দ্রুত সময়ে শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর তীরভূমিতে পিলার স্থাপন, তীররক্ষা, ওয়াকওয়ে, জেটিসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণ (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্পের অংশ হিসেবে গত ২৯ জানুয়ারি থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকার চারপাশে নদ-নদী তীরে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে ৩ হাজার ৫৭৫টি স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে বিআইডব্লিউটিএ। ৩৬ দিনের এই অভিযানে ৯১ একর জমি উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযান চলাকালে জব্দ করা বালু, মাটি ও পাথর নিলামে তুলে ৫ কোটি ২ লাখ ২৬ হাজার টাকা বিক্রি করা হয়েছে। জরিমানা করা হয়েছে ৫ লাখ ৮৫ হাজার টাকা।

NO COMMENTS

Leave a Reply