Home মূল কাগজ প্রচ্ছদ সবুজ-নগরীর স্বপ্ন

সবুজ-নগরীর স্বপ্ন

0 2396

প্রকৃত অর্থে আমাদের দেশে সবুজ-নগরী এখনও অনেকটাই স্বপ্ন। নগরজীবনে সবুজের ছোঁয়াও অনেকটাই অধরা। এখানে সবুজের চর্চা, চাষ বা নির্মাণÑ কোনোটাই হয় না। আছে ইট-পাথরের কোলাহল, সরু, অন্ধকার গলি-ঘুপসির আর্তনাদ। ফুলের সৌরভের পরিবর্তে আছে দুর্গন্ধময় ময়লার ভাগাড়, নর্দমা আর কালো ধোঁয়ার যন্ত্রণা। কিন্তু সবুজে মোড়ানো এই দেশের নগরগুলো এমন হতশ্রী হওয়ার তো কথা নয়। হতে পারত সবুজ নগরের দৃষ্টান্ত। সুদূর অতীত থেকে আমাদের উদ্যান রচনার এই উদাসীনতা নিয়ে ভাবলে অনুমান বা ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ থেকে কিছু কথা বলা যায়। প্রাচীন বাংলার নিরেট পেশাজীবীদের কথা বাদ দিয়ে সৌখিন সম্প্রদায়ের কথা ধরলেও ফলাফলের ক্ষেত্রে হতাশ হতে হয়। সম্ভবত বিষয়টি একেবারেই উপেক্ষিত ছিল। কিংবা প্রকৃতির প্রাণবন্ত উপস্থিতিই আমাদের এই কাজে নিরুৎসাহিত করেছে। বলা যেতে পারে গোটা বাংলাদেশ প্রকৃতির আনুকূল্যে নিজেই একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ উদ্যান। আর তাতেই উপেক্ষিত হয় পরম-কাক্সিক্ষত বিষয়টি। এটাও আমাদের ধারণা। যেসব দেশে প্রকৃতি কঠোর, সেসব দেশের মানুষ আনন্দ সৃষ্টি ও উপভোগের জন্য প্রকৃতির অনুকরণে নিজ আবেষ্টনীকে সৌন্দর্যমি ত ও উপভোগ্য করার জন্য গাছপালা লাগিয়ে উদ্যান বানায়। আমাদের দেশে সেই শূন্যতা সম্ভবত কখনই অনুভূত হয়নি। তবে ‘নেই নেই’ করেও আমাদের উদ্যান-সম্পর্কের ইতিহাস প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো। কিন্তু সাতচল্লিশের পর থেকে এখানে উদ্যান-চর্চা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। শুধু তা-ই নয়, আমাদের ঐতিহ্যবাহী উদ্যানগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বিপন্নও হয়ে পড়ে। কোনো কোনোটি এখন বিলুপ্তির পথেও।

ঢাকায় এই সঙ্কট আরও প্রকট। ব্রিটিশ-ভারতের উদ্যানকর্মী আর এল প্রাউডলক ঢাকায় রমনাগ্রিন নামে সবুজায়নের যে বৃহৎ প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন, পরবর্তীকালে তা অনেকটাই উপেক্ষিত হয়। অথচ ঢাকার নিসর্গ-নির্মাণে রমনা এলাকাটিই অনুসরণীয় হতে পারত। কিন্তু তা হয়নি, বরং ধীরে ধীরে সঙ্কুচিত হয়েছে। ঢাকা হতশ্রী হওয়ার অন্যতম কারণ পরিকল্পনার অভাব। এখানে সবার আগে মানুষ গিয়ে নতুন নতুন উপ-শহর তৈরি করে। তারপর আসে অন্যান্য নাগরিক-সেবা-প্রতিষ্ঠান। ফলে পরিকল্পনা করার আর কোনো সুযোগ থাকে না। এভাবে প্রতিনিয়তই আমাদের শহরগুলো ইট-কাঠের জঞ্জালে পরিণত হচ্ছে। যদি সত্যিকার মনের চোখ দিয়ে দেখা যায়, তাহলে শুধু শহরগুলোর কথা বাদ দিলে আমাদের গোটা দেশটাই অসাধারণ সৌন্দর্যমি ত। অথচ এখানকার নিসর্গের আনুকূল্যে শহরগুলোই সবচেয়ে বেশি প্রকৃতি ও শিল্পের মিশেলে গড়ে উঠতে পারত।

নতুন-পুরনো মিলিয়ে ঢাকার আয়তন এখন আর খুব একটা ছোট নয়। আবার বিশাল জনসংখ্যার বিপরীতে এই আয়তনও যথেষ্ট নয়। তারপরও আমরা মনে করি সব কিছু ঠিকঠাক রেখেই এখনও আবার নতুন করে ঢাকা শহরকে সবুজে ঢেকে দেওয়া সম্ভব। প্রয়োজন শুধু লাগসই পরিকল্পনা ও সদিচ্ছার। কলকাতা শহরেও একইভাবে সবুজায়ন করা হয়েছে। গত চার দশক ধরে নিভৃতে লাগানো গাছগুলোই এখন সেখানে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। কয়েক বছর আগে ঢাকায় স্থপতিদের সংগঠন এ ধরনের একটি উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। অনেক আলোচনাও হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর এগোয়নি। আসলে বিষয়-বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে উদ্যোগটি আগে সরকারকেই নিতে হবে। তার সঙ্গে অন্যরা যুক্ত হলে তা আরও গতিশীল এবং ফলদায়ক হবে।

ঢাকায় রমনা (বর্তমান রমনা পার্ক, বেইলি রোড, হেয়ার রোড) এবং লাগোয়া বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, শেরেবাংলা নগরসহ ধানমি এলাকায় কিছুটা সবুজের আঁকিবুকি চোখে পড়ে। বর্ধিত নতুন ঢাকার বাকি অংশ অনেকটাই নি®প্রাণ, ছায়াহীন। সেখানে খাড়া রোদ বা বৃষ্টিতে আশ্রয়ের জন্য পথের ধারে একটি গাছও খুঁজে পাওয়া যাবে না। প্রায় এক দশক আগে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন উপলক্ষে অনেকটা আকস্মিকভাবেই ঢাকার সড়ক দ্বীপ, পথপাশ এবং সড়ক বিভাজকে গাছ লাগানোর তোড়জোড় শুরু হয়। কাজটি যতটা আকস্মিকভাবে শুরু হয়েছিল, আবার ততটা আকস্মিকভাবেই শেষ হয়। ফলে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ঢাকা ফিরে আসে তার পুরনো, হতশ্রী রূপে। তাছাড়া ঢাকার মতো সড়ক বিভাজকে এমন অপরিকল্পিত বৃক্ষায়ন পৃথিবীর আর কোথাও আছে কি-না জানা নেই। আস্ত বট, বকুল, কৃষ্ণচূড়া লাগানো হয়েছে বিভাজকে। এসব গাছ কতটা বড় হবে, কত দিন বাঁচবেÑ তা না জেনেই কাজটি করা হয়েছে। সবচেয়ে অবিশ্বাস্য বিষয় হচ্ছে, সড়ক বিভাজকের এসব নৈরাজ্যিক বৃক্ষরোপণ সম্পর্কে সিটি করপোরেশন কিছুই জানে না।

সিটি করপোরেশনে এ বিষয়ে কোনো আলাদা বিভাগও নেই। কারা এসব গাছ রোপণ করেছে সেসব অনুসন্ধান করেও তেমন কোনো ফল পাওয়া যায়নি। সিটি করপোরেশন যেখানে নগরের দ মুে র কর্তা, সেখানে ওরাই আছে অন্ধকারে।

অথচ ঢাকা হতে পারে ছয়ঋতুর শহর। সব ঋতুর মিশেল থাকবে ঢাকার প্রকৃতিতে। বাড়তি হিসেবে কেবল প্রয়োজন কয়েকটি অ্যাভিনিউ, যা সারা বছরের আদর্শ উদ্যান বানাতে সাহায্য করবে। রাজধানীর পার্ক ও উদ্যানগুলোকেও সেভাবে সাজানো যেতে পারে। কিংবা সুযোগ থাকলে দু’একটি নতুন পার্কও বানানো যেতে পারে। এর কোনোটাও যদি সম্ভব না হয়, তাহলে পুরনো পার্কের ভেতর সারা বছরের স্থায়ী কিছু রঙ তৈরি করা যায়। মাঠপর্যায়ে প্রকৃতি ও পরিবেশকর্মীদের এসব কাজে সম্পৃক্ত করলে আশানুরূপ সফলতা আসবে। সবচেয়ে ভালো হয় সম্ভবমতো ইমারতরাজির ফাঁকফোকরে সারা বছরের রঙটা থিতু করা। তাতে গোটা শহরেই ছয়ঋতুর রঙ ছড়িয়ে পড়বে। ঢাকার উল্লেখযোগ্য পার্ক ও উদ্যানগুলো ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। আগের তুলনায় আমাদের বিমানবন্দর সড়কটি অনেকটাই শিল্পমি ত। কিন্তু সে তুলনায় দু’পাশের জলাশয়গুলোর চিত্র ততটাই পীড়াদায়ক। আমাদের জলজ ফুলগুলো সেখানে থিতু হতে পারে। প্রায় সারাবছর ফুল ফোটেÑ এমন গাছগুলোকেও আমরা কাজে লাগাতে পারি। এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বাগানবিলাস। তবে ঋতুভিত্তিক শহর তৈরির ক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে উঁচু ও স্থায়ী বৃক্ষের প্রাধান্য থাকতে হবে।

আমাদের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী চট্টগ্রামকে বসন্ত-ঋতুর প্রাধান্য দিয়ে গড়ে তোলা যেতে পারে। পার্বত্য জনপদেই উদযাপিত হতে পারে বসন্ত উৎসব। বসন্তকে সাজানোর জন্য আমদের বন থেকে অনেক কিছু ধার নিতে হবে। পাহাড়েই মিলবে অনেক উপাদান। বসন্তের পুষ্পিত প্রাঙ্গণকে মাতিয়ে রাখে কনকচাঁপা, মুচকুন্দ, পলাশ, পারিজাত, শিমুল, গামারি, গোলাপজামের ফুল, মিলেশিয়া, গ্লি¬রিসিডিয়া, জামরুল ফুল ইত্যাদি। এদের প্রতিটি গাছ নিয়ে আলাদা অ্যাভিনিউ হতে পারে। কিংবা বর্ণবৈচিত্র্য সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন রঙের মিশেলেও তৈরি হতে পারে বীথি। চট্টগ্রাম শহরজুড়ে আছে অসংখ্য টিলা। এসব টিলাতেই বিভিন্ন রঙ ছড়িয়ে দেওয়া যায়। পথপাশে কণ্টকলতা, মাধবী, নীলমণি, হাপরমালি ও পাথরকুচি বসন্তের শোভাকে আরও মনলোভা করে তুলবে। তবে বসন্তের পুষ্পতালিকা আরও অনেক দীর্ঘ। ক্ষুদ্র ঘাসফুল থেকে সুউচ্চ তেলশুরও এ মৌসুমের ফুল।

শুধু এমন পরিকল্পিত শহরই আমাদের শহরের প্রাকৃতিক দৈন্য ঘোচাতে পারে।

কারিকা প্রতিবেদক

NO COMMENTS

Leave a Reply