Home ফিচার সমন্বিত উদ্যোগে আধুনিক হবে রাজধানীর গণপরিবহন-ব্যবস্থা

সমন্বিত উদ্যোগে আধুনিক হবে রাজধানীর গণপরিবহন-ব্যবস্থা

কারিকা প্রতিবেদক

প্রায় দুই কোটি মানুষের এই ঢাকা শহরে গণপরিবহন যেন গণভোগান্তির অপর নাম। রাজধানী ঢাকায় কার্যকর গণপরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে ইতোমধ্যে অনেক পরিকল্পনা ও প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। মেট্রোরেল, বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি), ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ বেশকিছু পরিকল্পনা ও প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।
রাজধানীর গণপরিবহন-ব্যবস্থায় শৃঙ্খলার অভাব রয়েছে-বিশেষজ্ঞ থেকে সাধারণ মানুষ সবাই একবাক্যে স্বীকার করবেন। অন্যদিকে নাগরিকদের মধ্যে আইন মানার প্রবণতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের চিরায়ত যে নিয়ম-সেটারও ঘাটতি আছে। তাই সড়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে সিগন্যাল বাতির প্রচলন থাকলেও ঢাকার অধিকাংশ ইন্টারসেকশনগুলোতে যানচলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয় হাতের ইশারায় অর্থাৎ ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে। কখনো কখনো যানবাহন ও পথচারীর বিশৃঙ্খল চলাচল নিয়ন্ত্রণে রশি, বাঁশ ও উঁচু লোহার ব্যারিকেডের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।
ঢাকার গণপরিবহন-ব্যবস্থার বেহাল দশায় বীতশ্রদ্ধ হয়ে অনেকেই ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছেন। যাদের গাড়ি কেনার সামর্থ্য নেই তারা রাইড শেয়ারিং সেবার দ্বারস্থ হচ্ছেন। গণপরিবহনের বদলে নাগরিকরা ব্যক্তিগত ছোট গাড়ির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় যানজট বাড়ছে সড়কে।
২০১৭ সালে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ৬ শতাংশ ব্যক্তিগত গাড়ি ঢাকার ৭৬ শতাংশ সড়ক দখল করে রাখে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক সংগঠন ডোমোক্রেসি ওয়াচের ওই জরিপে আরও বলা হয়, ঢাকার ১৬৮টি রুটে গণপরিবহনের সংখ্যা ৫ হাজার ৪০৭, যা ন্যূনতম ১৩ হাজার হওয়া প্রয়োজন।
যাত্রী ওঠা-নামার ক্ষেত্রে নির্ধারিত বাস স্টপেজ থাকলেও যাত্রী, চালক ও পরিবহনের সহকারি কেউ-ই গণপরিবহনে ওঠা-নামার ক্ষেত্রে নির্ধারিত বাস স্টপেজ ব্যবহার করেন না। গণপরিবহনের বিশৃঙ্খল চলাচলে একদিকে যেমন সড়কে যানজট বাড়ছে, অন্যদিকে রয়েছে দুঘর্টনার ঝুঁকিও।
বিআরটিএর আইনে সিটিং সার্ভিসের কোনো অস্তিত্ব নেই। অথচ রাজধানীজুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অবৈধ সিটিং সার্ভিস। আবার ‘সিটিং সার্ভিসে’র নাম করে অতিরিক্ত ভাড়া নিলেও অনেক বাসে আসনের অতিরিক্ত যাত্রী তোলা হচ্ছে, বাড়তি ভাড়া দিলেও তাদের যেতে হচ্ছে দাঁড়িয়ে। যাত্রী ওঠা-নামার জন্য এসব গাড়ি যত্রতত্র দাঁড়াচ্ছে। ফলে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েও সেবা পাচ্ছেন না যাত্রীরা। ঢাকার রাস্তায় ভাড়া নিয়ে যাত্রী ও গণপরিবহনের সহকারির বাগবিতন্ডা এখন নিত্য ঘটনা।
রাজধানীর মিরপুর, আগারগাঁও হয়ে গুলিস্তান ও যাত্রাবাড়ী রুটে চলছে প্রায় ২০টি কোম্পানির এক হাজারেরও বেশি বাস-মিনিবাস। এসব কোম্পানির নামে আরও কয়েক’শ বাস ও মিনিবাস নামানোর অনুমতি আছে। অথচ সড়কের ধারণক্ষমতা বা যাত্রীসংখ্যার অনুপাতে কী পরিমাণ বাস বা মিনিবাস দরকার-এ ধরনের কোনো সমীক্ষা নেই। সরকার বা বাসমালিক-কারও কাছে নেই এ-সংক্রান্ত তথ্য। শুধু মিরপুর নয়, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, মতিঝিল, সাভারসহ কয়েকটি রুটেও প্রায় অভিন্ন চিত্র দেখা গেছে।
পরিবহন-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো ধরনের সমীক্ষা ছাড়াই একই রুটে অনেক কোম্পানির বাসের রুট পারমিট দেয়া হচ্ছে। বেশিরভাগ কোম্পানির মালিক প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এ ছাড়া একই কোম্পানিতে অনেক মালিকের গাড়ি থাকায় বেশি আয়ের আশায় সড়কে গণপরিবহনের রেষারেষি বাড়ছে। যাত্রী বেশি পাওয়া এবং দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে আরেকটি ট্রিপের সিরিয়ালের আশায় নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করছেন না চালকরা। তারা রাস্তার মাঝখানে গাড়ি রেখেই যাত্রী ওঠা-নামা করাচ্ছেন।
এসব সমস্যা নিরসনে এবং রাজধানীর গণপরিবহন-ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনতে ঢাকা ও আশেপাশের এলাকায় ২২টি রুট নির্ধারণ করা হয়েছে। রুটগুলোতে মহানগরীর সব বাস ছয়টি কোম্পানির অধীনে যাত্রী পরিবহন করবে। ছয়টি কোম্পানির বাস ছয় রঙের (গোলাপি, কমলা, সবুজ, বেগুনি, মেরুণ ও নীল) হবে। গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে গঠিত বাস রুট রেশনালাইজেশন-সংক্রান্ত কমিটির বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
বাস রুট রেশনালাইজেশন-সংক্রান্ত কমিটির বৈঠক শেষে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন সাংবাদিকদের বলেন, ‘২০২০ সালকে “মুজিববর্ষ” ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আমরা এই বছরের মধ্যেই গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে চাই। নাগরিকদের একটি নিরাপদ নগরী উপহার দিতে চাই। সেই লক্ষ্য নির্ধারণ করে কাজ করছে বাস রুট রেশনালাইজেশন-সংক্রান্ত কমিটি।’
বাসভাড়া নিয়ে বিদ্যমান নৈরাজ্য কমাতে এবং গণপরিবহনে ওঠা-নামায় নির্ধারিত বাস স্টপেজ ব্যবহার নিশ্চিত করতে রাজধানীর গণপরিবহনে টিকিট বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে গঠিত এই কমিটির নবম বৈঠকে মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, ‘ঢাকা শহরের কোথাও টিকিট ছাড়া গণপরিবহনে যাত্রী চলাচল করতে পারবে না বলে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এতে করে বিদ্যমান যে বাস-সংকট এবং যাত্রীদের দুর্ভোগ তার অবসান হবে। তাই ডিটিসি, বিআরটিএ, বিআরটিসি, ডিএসসিসি ও ডিএনসিসি এবং পরিবহন মালিকদের সমন্বয়ে বাসের টিকিট এবং কাউন্টার স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন করে পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, ‘শিগগিরই যাতে এ ব্যবস্থা কার্যকর করা যায় সেজন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে সড়কের জায়গা যাতে বেদখল না হয় সেজন্য সব পরিবহনের টিকিট কাউন্টার এক জায়গায় হবে।’
রাজধানীর গণপরিবহন-ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনয়নের অংশ হিসেবে চলতি বছরের মার্চে ধানমন্ডিতে এবং মে মাসে উত্তরাতে চক্রাকার এসি বাস-সার্ভিস চালু করা হয়। ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ও ডিএমপির সমন্বয়ে রাজধানীর মতিঝিল ও সদরঘাট এলাকাতেও চক্রাকার বাস-সার্ভিস চালু হওয়ার কথা রয়েছে।

NO COMMENTS

Leave a Reply