Home মূল কাগজ প্রচ্ছদ চট্টগ্রাম নগরে সহসা শেষ হচ্ছে না খোঁড়াখুঁড়ির দুর্ভোগ

চট্টগ্রাম নগরে সহসা শেষ হচ্ছে না খোঁড়াখুঁড়ির দুর্ভোগ

আবদুল্লাহ আল মামুন
সড়ক খোঁড়াখুঁড়ির দুর্ভোগ থেকে সহসা মুক্তি মিলছে না চট্টগ্রাম নগরবাসীর। চট্টগ্রাম ওয়াসার সড়ক খোঁড়াখুঁড়ির মধ্যে এবার সড়ক কাটার অনুমতি পেয়েছে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)। এরপর মাটির নিচে কেবল (তার) স্থাপনের কাজ শুরু করবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। ফলে নগরবাসীর দুর্ভোগ আরো বাড়বে। সড়ক কাটার পর তাৎক্ষণিক সংস্কার না করায় শুষ্ক মৌসুমে ধুলা এবং বৃষ্টির সময় কাদার যন্ত্রণায় ভুগতে হয় লোকজনকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন আগামী এক দশকেও এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাবে না নগরবাসী। তবে সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীন প্রকল্প নেওয়ার কারণে জনদুর্ভোগ বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত সব সেবা প্রদানকারী সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর প্রধানকে করপোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় করতে ২০১৬ সালের ২৭ জুন পরিপত্র জারি করে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়। কিন্তু এই নির্দেশ মানছে না সেবা সংস্থাগুলো।
চট্টগ্রাম নগরের পানি সরবরাহ বাড়ানোর জন্য ‘কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্প-২’ এবং ‘চট্টগ্রাম পানি সরবরাহ উন্নীতকরণ ও স্যানিটেশন প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করছে। এই দুটি প্রকল্পের আওতায় নগরের সাড়ে ৬০০ কিলোমিটার সড়ক কাটছে ওয়াসা। ৬০০-এর বেশি সড়ক ধাপে ধাপে কাটা হচ্ছে। এরপর শুরু হবে চট্টগ্রাম মহানগরীর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা স্থাপন প্রকল্প। ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকার এ প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৩ সাল পর্যন্ত। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুতগতিতে কাজ চলছে। এ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে ২০৩০ সালে। কাজের গতি ধীর হলে ২০৪০ সালে গিয়ে ঠেকবে। ‘মডার্নাইজেশন অব টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক ফর ডিজিটাল কানেকটিভিটি’ প্রকল্পের আওতায় অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল স্থাপনে নগরের প্রায় ১০৪ কিলোমিটার সড়ক খোঁড়ার অনুমতি পেয়েছে বিটিসিএল। গত ৩ অক্টোবর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন তাদের এ অনুমতি দেয়। আগামী বছরের শুরুতে মাটির নিচে বৈদ্যুতিক তার স্থাপনের কাজ শুরু করবে পিডিবি। ইতোমধ্যে তারা মাটির নিচে সাবস্টেশন ও ট্রান্সফরমার স্থাপনের কাজ শুরু করেছে। নগরে মোট সড়কের দৈর্ঘ্য ১ হাজার ১০৪ কিলোমিটার। এর মধ্যে পিচঢালা সড়ক রয়েছে ১ হাজার ১৯৭টি, যার মোট দৈর্ঘ্য ৭৪৪ কিলোমিটার।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, ‘সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রকল্প গ্রহণ না করায় দুর্ভোগ বাড়ছে। ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়ির কারণে মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই। যখন ওয়াসার কাটা সড়কগুলো সংস্কারে কার্যক্রম শুরু করেছি, তখন বিটিসিএল অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল স্থাপনে সড়ক কাটার অনুমতি চেয়েছে। প্রতিটি সংস্থার উচিত প্রকল্প নেয়ার সময় সমন্বয় করা। আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক করে সমন্বয়ের মাধ্যমে সেবা সংস্থাগুলো তাদের প্রকল্পগুলো নিতে পারত। বারবার তাগিদ দেওয়ার পরও তারা সমন্বয়ের কাজটি করেন না। যার কারণে সিটি করপোরেশনকে দুর্নামের ভাগিদার হতে হয়।’
ওয়াসা সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম মহানগরীর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা স্থাপন প্রকল্প একটি পয়োশোধনাগার, প্রায় ছয় কিলোমিটার গভীর পয়োলাইন, ১৮৯ কিলোমিটার গ্রাভিটি পাইপ, ৩ হাজার ৬২০টি ম্যানহোল ও চেম্বার, ৩ দশমিক ৩১ কিলোমিটার ফোর্স মেইন, ১৮৯ কিলোমিটার ইউটিলিটি রি-অ্যালাইনমেন্ট, ১২টি পয়োপাম্পস্টেশন, ১৪৪ কিলোমিটার সার্ভিস লাইন, ৭২ হাজার ৫০২টি বাড়ির সংযোগ, ফিকেল স্ল্যাজ শোধনাগার এবং অনসাইট স্যানিটেশন উন্নয়ন করা হবে। এসব কাজে কত কিলোমিটার সড়ক খোঁড়া লাগবে তা এখনও নির্ধারণ করা হয়নি।
চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী একেএম ফজলুল্লাহ বলেন, ২০২২ সালের মধ্যে পানি সরবরাহ লাইন স্থাপনের কাজ শেষ হবে। এর মধ্যে শুরু হবে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা স্থাপনের কাজ। জনদুর্ভোগ কমাতে ছয় ভাগে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত লেগে যাবে।
পিডিবি সূত্র জানায়, বিদ্যুৎ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ৪১টি সাবস্টেশন স্থাপন করা হবে। ৭টি সাবস্টেশন আধুনিকায়ন করা হবে। এছাড়া প্রায় ৫০০ কিলোমিটার ক্যাবল মাটির নিচে স্থাপন করা হবে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (দক্ষিণাঞ্চল) প্রধান প্রকৌশলী প্রবীর কুমার সেন বলেন, প্রথম পর্যায়ে ১৫টি সাবস্টেশন স্থাপন ও ৭টি সাবস্টেশন আধুনিকায়নের কাজ চলছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে ২৬টি সাবস্টেশন স্থাপন কাজ শুরু করা হবে। ইতোমধ্যে ভূমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার তার মাটির নিচে স্থাপনের কাজ শুরু হয়ে যাবে।
বিটিসিএল সূত্রে জানা গেছে, উচ্চ গতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ‘মডার্নাইজেশন অব টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক ফর ডিজিটাল কানেকটিভিটি’ প্রকল্পের আওতায় মাটির নিচে অপটিক্যাল স্থাপন করা হবে। সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি চলতি বছরের অক্টোবরে শুরু করে আগামী বছরের ৩০ জানুয়ারির মধ্যে শেষ করা হবে বলে জানানো হয়। তবে সিটি করপোরেশন আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি শেষ করার শর্তে অনুমোদন দিয়েছে। এজন্য নগরের মোট ১ লাখ ৪ হাজার ২৫ মিটার সড়ক কাটা হবে, যার মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১০৪ কিলোমিটার।

কাটা হবে যেসব সড়ক
সিটি করপোরেশনে জমা দেওয়া তালিকা অনুযায়ী, বিটিসিএল মুরাদপুর টেলিফোন এক্সচেঞ্জের আওতায় কাটা হবে ১৬ হাজার ৮৮২১ মিটার সড়ক। এগুলো হচ্ছেÑ মোহাম্মদপুর, সুগন্ধা, মির্জাপুল, পাঁচলাইশ, ওআর নিজাম রোড, আব্দুল লতিফ, আবদুল্লাহ খান, হামদু মিয়া, চট্টগ্রাম-হাটহাজারী, আবদুল হামিদ, সিডিএ অ্যাভিনিউ, চাঁদ মিয়া, ওমর আলী মাতব্বর, খতিবের হাট, আবদুল করিম, ফরিদের পাড়া, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার হাইওয়ে, বারইপাড়া, খাজা, নাজিরপাড়া, এ জি বায়েজিদ বোস্তামী, হাজী নূর আহমেদ, মসজিদ লেন, হিলভিউ ও কেবি ফজলুল কাদের সড়ক।
পাহাড়তলী এলাকায় কালুরঘাট টেলিফোন এক্সচেঞ্জের আওতায় কাটা হবে ১২ হাজার ৮৮ মিটার। এগুলো হচ্ছে- পাহাড়তলী কলেজ রোড, জাকির হোসেন রোড, বিএডিসি রোড, কৃষ্ণচ‚ড়া, আবদুল হান্নান, হাবিব লেন, পশ্চিম খুলশী, আমবাগান, শহীদ লেন, পাঞ্জাবি লেন, আকবর শাহ, জাকির হোসেন রোড, ফয়’স লেক, লেকভিউ আবাসিক এলাকা, রোজ ভ্যালি আবাসিক এলাকা, ফ্লোরা পাস, দক্ষিণ খুলশী ও আবদুল মালেক লেন সড়ক।
বিটিসিএল কালুরঘাট টেলিফোন এক্সচেঞ্জের আওতায় কাটা হবে ৪ হাজার ৪৬৪ মিটার সড়ক। সড়কগুলো হচ্ছে- বিএফআইডিসি সড়ক, চাঁদ মিয়া সড়ক ও অক্সিজেন সড়কের পাশ বরাবর।
বায়েজিদ টেলিফোন এক্সচেঞ্জের আওতায় কাটা হবে ২৬ হাজার ৪৭৯ মিটার সড়ক। এখানে কাটা হবে- বসির মার্কেট, হামজারবাগ, সুন্নিয়া মাদ্রাসা, হাসেম বাজার, পিলখানা, হামজা খাঁ লেন, বায়েজিদ বোস্তামী, অক্সিজেন-কুয়াইশ, স্টাফ কলোনি, মাজার শাহ গায়েবি মসজিদ, ইয়াকুব আলী, পলিটেকনিক, কাজী মুজাফ্ফর আহমেদ, চৌধুরী সড়ক, নুরুল আলম, তুলাতলি, রহমান নগর, চশমা হিল আবাসিক এলাকা, বিসিক শিল্পনগরী, বায়েজিদ আবাসিক এলাকা, চট্টগ্রাম-রাঙামাটি এবং চট্টগ্রাম-হাটহাজারী সড়ক এলাকা।
নন্দনকানন টেলিফোন এক্সচেঞ্জের আওতায় কাটা হবে ৪৪ হাজার ১৭৩ মিটার সড়ক। সড়কগুলো হচ্ছেÑ ইকবাল সড়ক, বংশাল সড়ক, আশরাফ আলী সড়ক, নতুন রাস্তা, সতীশ বাবু লেন, কোর্ট সড়ক, লালচাঁদ সড়ক, কে বি আমান আলী সড়ক, নবাব সিরাজউদ্দৌলা রোড, কলেজ রোড, ডিসি রোড, মদিনা মসজিদ লেন, সিঅ্যান্ডবি কলোনি সড়ক, মোমিন রোড, জামালখান রোড, সিডিএ অ্যাভিনিউ রোড, জাকির হোসেন রোড, নূরবাড়ি সড়ক, লাভ লেন সড়ক, হেমসেন লেন সড়ক, নেভি কলোনি, রেবোতি মোহন লেন, বড়–য়া সড়ক, ভিক্টোরিয়া কলেজ রোড, তালপুকুর সড়ক, ডিসি হিল সড়ক, বৌদ্ধমন্দির সড়ক, আন্দরকিল্লা সড়ক, জে এম সেন লেন, টেরিবাজার সড়ক, জুবিলি রোড সড়ক, গোলাপ সেন লেন, লালদীঘি পাড় সড়ক, হাজারী লেন, চৈতন্য গলি, সদরঘাট সড়ক, খাতুনগঞ্জ সড়ক ও আমবাগান সড়ক।

NO COMMENTS

Leave a Reply