Home সর্বশেষ সিমেন্টের দাম উর্দ্ধমুখী

সিমেন্টের দাম উর্দ্ধমুখী

কারিকা ডেস্ক
বিশ্ববাজারে সিমেন্টের অন্যতম কাঁচামাল ক্লিংকারের প্রধান সরবরাহকারী চীন। দেশটি থেকে মানভেদে প্রতি টন ক্লিংকার আমদানিতে খরচ পড়ে ৩০-৪০ ডলার। এর সঙ্গে অন্যান্য খরচ মিলিয়ে দেশে সিমেন্ট উৎপাদনে টনপ্রতি ব্যয় হয় সর্বোচ্চ ৭০ ডলার বা ৫ হাজার ৬০০ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে এখন প্রতি টন সিমেন্ট বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ৬০ ডলার বা ৪ হাজার ৮০০ টাকায়। অথচ দেশের বাজারে বর্তমানে ৫০ কেজি ওজনের প্রতি ব্যাগ সিমেন্টের গড় দাম কোম্পানিভেদে ৪০০-৪৫০ টাকা। এতে টনপ্রতি বাজারমূল্য দাঁড়ায় সর্বনিম্ন ৮ হাজার টাকা বা ১০০ ডলার। এ হিসাবে বাংলাদেশে সিমেন্ট বিক্রি হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের চেয়ে ৬০-৬৫ শতাংশ বেশি দামে।
বেশি দামে সিমেন্ট বিক্রির কথা স্বীকার করেন উৎপাদকরাও। তাদের দাবি, সিমেন্টে লাভের বড় একটা অংশ চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী বিতরণকারীদের পকেটে। আর বিতরণকারী ডিলাররা বলছেন, মালিকরাই বাড়তি মুনাফা করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে উপকরণের দাম কমলেও অলিগোপলি বা অপূর্ণ প্রতিযোগিতার (গুটি কয়েক প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য) কারণে দেশে সিমেন্টের দাম কমছে না। যদিও দাম কমানো হয়েছে বলে দাবি উৎপাদকদের। তবে ব্যাগপ্রতি (৫০ কেজি) ১০-২০ টাকা কমানো আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান লাইটক্যাসলের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে সিমেন্ট শিল্পের বাজার ১৭৪ কোটি ডলারের। এর ৮৫ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করছে শীর্ষ ১০ কোম্পানি। আর শীর্ষ পাঁচ কোম্পানির হাতে রয়েছে মোট বাজারের ৪৮ দশমিক ১২ শতাংশ। এর মধ্যে ১৫ দশমিক ৯১ শতাংশ দখল করে আছে শাহ সিমেন্ট। ৯ দশমিক ৭৬ শতাংশ বাজার দখল নিয়ে এর পরই রয়েছে হাইডেলবার্গ। অন্য বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মেঘনা সিমেন্টের দখলে রয়েছে এ বাজারের ৮ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ, হোলসিমের ৭ দশমিক ৪ ও লাফার্জের ৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ। কোম্পানিগুলো উৎপাদিত সিমেন্ট আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে ৬০-৬৫ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি করছে। আর নিজেদের উৎপাদন খরচের চেয়ে বেশি রাখছে ৪০ শতাংশ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফ্রেশ ব্র্যান্ডের ৫০ কেজি ওজনের প্রতি ব্যাগ সিমেন্ট বিক্রি হচ্ছে ৪৪০ টাকায়। হাইডেলবার্গের স্ক্যান সিমেন্ট বিক্রি হচ্ছে ৪৮৫ টাকায়, লাফার্জের সুপারক্রিট ৪৫৫, হোলসিম ৫০০-৫১০ ও আকিজ সিমেন্ট ৪৬০ টাকায়।
এ প্রসঙ্গে আকিজ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ বশির উদ্দিন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আকিজ সিমেন্টের দাম কমানো হয়েছে। বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে।
একই কথা জানান কনফিডেন্স সিমেন্টের নির্বাহী পরিচালক নেওয়াজ মোহাম্মদ ইকবাল ইউসুফ। তিনি বলেন, ‘এরই মধ্যে আমরা সিমেন্টের দাম কমিয়েছি। এ বিষয়ে ঘোষণাও দেয়া হয়েছে। তবে খুচরা পর্যায়ে দাম না কমলে আমাদের কিছু করার নেই।’
পরিবেশকদের দাবি, লাভের বেশির ভাগই কোম্পানিগুলো নিয়ে যাচ্ছে। নগদে কিনলে কোম্পানিগুলো এক ধরনের দাম রাখে। আবার বাকিতে কিনলে আরেক দাম।
নেত্রকোনা সদর উপজেলার পরিবেশক মীরন তালুকদার বলেন, বাকিতে পণ্য কিনলে কোম্পানিগুলোকে ব্যাগপ্রতি ২৫-৩০ টাকা অতিরিক্ত দিতে হয়। প্রতি ব্যাগ ক্রাউন সিমেন্ট বাকিতে কিনলে ৪৬৩ টাকা পরিশোধ করতে হয়। আর নগদে কিনলে ৪৪০ টাকায় পাওয়া যায়। একইভাবে আকিজ সিমেন্ট বাকিতে কিনলে ব্যাগপ্রতি ৪৪০ ও নগদে ৪১০ টাকা পরিশোধ করতে হয়।
তবে পরিবেশকদের এ দাবির সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেন উৎপাদকরা। বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি ও মেট্রোসেম সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শহীদুল্লাহ বলেন, ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত সুবিধা দেয়ার কারণে সিমেন্টের মূল্য সুবিধা গ্রাহকরা পান না। এক ব্যাগ সিমেন্টের দাম ৫০০ টাকা হলে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতার কমিশন এবং পরিবহনে ব্যয় হয় ১০০ টাকা। এ কারণে গ্রাহক পর্যায়ে দাম বেশি পড়ে।
তমা কনস্ট্রাকশনের পরিচালক শওকত আলী এ প্রসঙ্গে বলেন, নির্মাণ ব্যয়ের সিংহভাগই হয় রড ও সিমেন্ট বাবদ। দুটি নির্মাণসামগ্রীর দামই আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে দেশে বেশি। নির্মাণ খরচও তাই বেশি পড়ছে। সিমেন্টের দাম কম থাকলে নির্মাণ ব্যয়ও কম হতো। তাতে সরকারি-বেসরকারি সব প্রকল্প কম ব্যয়ে সম্পাদন করা যেত।
উল্লেখ্য, দেশে সিমেন্টের চাহিদা রয়েছে বছরে ১ কোটি ৮০ লাখ থেকে দুই কোটি টন। এর বিপরীতে খাতটির উৎপাদন সক্ষমতা ৩ কোটি ৩০ লাখ থেকে ৩ কোটি ৫০ লাখ টন। চাহিদা কম থাকায় কারখানাগুলো উৎপাদন ক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না। সক্ষমতার গড়ে ৬০-৬৫ শতাংশ অব্যবহূত থাকছে।

NO COMMENTS

Leave a Reply