Home মূল কাগজ সাক্ষাৎকার সুশাসন ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব

সুশাসন ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব

0 311

মাহমুদা মোমেন
সিনিয়র ভাইস প্রেন্সিডেন্ট এন্ড হেড অব রিটেইল ফাইন্যান্স সেন্টার
ট্রাষ্ট ব্যাংক লিমিটেড

সাক্ষাৎকার গ্রহণঃ মির্জা মাহমুদ আহমেদ

ব্যাংকের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করার চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে বলুন। কতোটা উপভোগ করেন?
ব্যাংকিং সেক্টরে প্রতিদিনই নতুন নতুন পরিবর্তন আসছে। একই সঙ্গে এনপিএল (নন পারফর্মিং লোন)বেড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ক্লাসিফাইড লোনের পরিমান ছিল ১,১৬,২৮৮ কোটি এবং এনপিএল (নন পারফর্মিং লোন) প্রায় ১২ শতাংশ, যা ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। দক্ষতার সঙ্গে লোন দেয়া এবং সেটা আবার যথাসময়ে ফেরত নিয়ে আসা বর্তমান সময়ে ব্যাংকসহ যেকোন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে আমরা কিন্তু চ্যালেঞ্জটাকে মোকাবিলাও করতে পারি। সুশাসন ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। ট্রাষ্ট ব্যাংকের বোর্ড অব ডিরেক্টরস থেকে শুরু করে ম্যানেজমেন্ট লেভেলে যারা আছেন তারা লোন দেয়ার ব্যাপারে খুবই স্বচ্ছতা বজায় রাখেন।
ট্রাষ্ট ব্যাংকের একজন কর্মী হিসেবে বলতে পারি, আমি খুবই ভাগ্যবান; কারণ কোনো লোনের ব্যাপারে আমাদের ওপর কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করা হয় না। লোন দেয়ার ব্যাপারে অযাচিত কোন চাপ আমাদের ফিল করতে হয়না। নিয়ম অনুযায়ী গ্রাহক লোন পাওয়ার উপযুক্ত হলেই কেবল লোন পাস করা হয়। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং সেক্টরে আরেকটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, প্রতিনিয়ত রেগুলেশন পরিবর্তিত হচ্ছে। গত বছর ঋণ পুনঃ তফসিলের ডাউন পেমেন্টের পরিমাণ যেটা ছিল সেটা পরিবর্তন করে হঠাৎ ২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। এটা ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। ঋণ পুনঃ তফসিলের পলিসি পরিবর্তন করে দেওয়ায় ব্যাংকের পোর্টফোলিও ভালো হচ্ছে কিন্তু পরবর্তী সময়ে ভালো ঋণগুলো মন্দ ঋণে পরিণত হওয়ার আশস্কা থেকে যাচ্ছে। এই ঋণগুলোকে নজরদারীতে রাখাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যাংকিং খাত অস্থিতিশীল থাকার পরও ট্রাষ্ট ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা এবার অনেক ভালো হয়েছে। আমাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পেরেছি। আশা করি, সামনের দিনগুলোতে আমরা আরও এগিয়ে যাব।এই অর্জন সম্ভব হয়েছে আমাদের ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট এবং বোর্ড অব ডিরেক্টরসদের পরিচালন দক্ষতার কারনে।


রিটেইল ব্যাংকিং এ ট্রাষ্ট ব্যাংক কোন কোন ক্ষেত্রগুলোতে ঋণ প্রদান করে? ট্রাষ্ট ব্যাংকের হোম লোন সম্পর্কে জানতে চাই?
রিটেইল ব্যাংকিংয়ে অন্য সব ব্যাংক যেসব খাতে ঋণ প্রদান করে, আমরাও সেসব খাতে ঋণ প্রদান করে থাকি। রিটেইলে আমরা হোম লোন, পারসনাল লোন, কার লোন দিয়ে থাকি। ট্রাষ্ট ব্যাংকের টোটাল রিটেইল পোর্টফোলিও প্রায় ৩,১০০ কোটি টাকা। এই পোর্টফোলিওর মধ্যে আমরা প্রায় ৬০০ কোটি টাকা হোম লোন দিয়েছি। ব্যাংকিং খাতে এনপিএল যেখানে ১২ শতাংশ, সেখানে আমাদের ব্যাংকের রিটেইল এনপিএল ২ শতাংশেরও কম। বর্তমান সরকার আবাসন সেক্টরকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি হোমলোনের সীমা ১.২০ কোটি থেকে বাড়িয়ে ২ কোটি করা হয়েছে। পূর্বাচল,উত্তরা তৃতীয় ফেজ, কেরানীগঞ্জে নতুন শহর গড়ে উঠছে। ট্রাষ্ট ব্যাংক এসব প্রকল্পে হোম লোন দিতে আগ্রহী। আমরা মনে করি হোম লোন বিতরণের মাধ্যমে আমরা একটা সিকিউরড সেগমেন্টে বিনিয়োগ করতে পারব। একই সাথে হোম লোন দেয়ার মাধ্যমে মানুষের স্থায়ী আবাস সৃষ্টিতে ট্রাষ্ট ব্যাংক ভূমিকা রাখতে পারবে। শহর এলাকার পাশাপাশি ট্রাষ্ট ব্যাংক ২০১৭ সাল থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে সব্বোর্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত হোম লোন দিচ্ছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে হোম লোন দেয়ার ক্ষেত্রে আমরা জমির মূল্যকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকি। বাজার যাচাই করে এবং রিপেমেন্ট বিহ্যেভিয়্যার দেখে আমরা পুরোদমে ইউনিয়ন পর্যায়ে হোমলোন দেয়া শুরু করবো।
আমানতকারীদের ট্রাষ্ট ব্যাংক কি কি সুবিধা দিচ্ছে?
ট্রাষ্ট ব্যাংকে বিভিন্ন ধরনের এফডিআর ডিপোজিট স্কিম আছে। ট্রাষ্ট অ্যাসুরেন্স ডিপোজিট স্কিম (টিএডিএস) নামে আমাদের একটা প্রোডাক্ট আছে। টিএডিএস ডিপোজিট স্কিমে আমানতের বিপরীতে গ্রাহককে ইন্সুরেন্স কাভারেজ দেয়া হয়। বিভিন্ন ইন্সুরেন্স কোম্পানির চেয়ে বেশি হারে আমরা ইন্সুরেন্স কাভারেজ দিচ্ছি।
এই ডিপোজিট স্কিমের সুবিধা হচ্ছে আমানতকারী যেকোন পরিমাণ আমানত গচ্ছিত রেখে মৃত্যুবরণ করলেও তাঁর মনোনীত ব্যক্তি মেয়াদ পূর্তিতে প্রতিশ্রুত সমুদয় অর্থ প্রাপ্ত হবেন এবং খুব দ্রুততম সময়ে কোন ভোগান্তি ছাড়াই মনোনীত ব্যক্তি এই অর্থ উত্তোলন করতে পারেন।
এছাড়া নারী-গ্রাহকদের জন্য ‘ট্রাষ্ট সৃষ্টি’ নামে আমাদের একটি প্রোডাক্ট আছে সেখানেও আমরা ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ইন্সুরেন্স কাভারেজ দিয়ে থাকি। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ট্রাষ্ট ব্যাংক ‘স্টুডেন্ট ব্যাংকিং’ চালু করেছে। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ডিপোজিট গ্রহণের পাশাপাশি ল্যাপটপ কেনার জন্য আমরা সহজ শর্ত ও স্বল্প সুদে ডিজিটাল লোন দিচ্ছি। ট্রাস্ট ব্যাংকে যাদের স্টুডেন্ট অ্যাকাউন্ট আছে তারা অভিভাবকের মাধ্যমে এই ডিজিটাল লোন সুবিধা নিতে পারেন।
পথশিশুদের ব্যাংকিং সেবার আওতায় নিয়ে আসতে আমরা নিরলস কাজ করে যাচ্ছি। এরই ধারাবাহিকতায় খুলনায় একটি কার্যক্রম পরিচালনা করছি।


ট্রাষ্ট ব্যাংক রিটেইল ব্যাংকিংয়ে বিশেষায়িত কী সেবা দিচ্ছে বা ভবিষত্যে কি ধরনের বিশেষায়িত সেবা দেয়ার পরিকল্পনা আছে?
ফ্রিল্যান্সারদের জন্য আমাদের একটি বিশেষায়িত লোন প্রোডাক্ট আছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সাথে একত্রিত হয়ে আমরা পরীক্ষামূলকভাবে প্রোডাক্টটি চালু করেছি। শিগগিরই প্রোডাক্টটি পুরোদমে চালু করার ইচ্ছা আছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় থেকে আইসিটি বিষয়ক কোর্স শেষ করে যারা উদ্যোক্তা হতে চায় তাদেরকে এই প্রোডাক্টের আওতায় লোন দেয়া হবে। ফ্রিল্যান্সাররা যাতে এসএমই লোনে শর্ত পূরণের ঝামেলা এড়িয়ে সহজে লোন নিতে পারেন, সেজন্যই এই প্রোডাক্টটি চালু করা। এই লোনের ক্ষেত্রে ট্রেড লাইন্সেসসহ বাড়তি কাগজপত্র জমা দেয়ার ঝামেলা থাকবে না। এই লোন সুবিধাটা চালু হলে তথ্য প্রযুক্তি খাতে যারা উদ্যোক্তা হতে চায় তারা দারুণভাবে উপকৃত হবে।

যেসব নারী ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ক্যারিয়ার গড়তে চায় তাদের প্রতি আপনার পরামর্শ কি?
আমি যখন ব্যাংকিং সেক্টরে কর্মজীবন শুরু করি তখন ব্যাংকে নারী কর্মীর সংখ্যা অনেক কম ছিল। এখন অনেক বেড়েছে। নারী-কর্মী বাড়ার পেছনে প্রধানত দুটি কারণ কাজ করেছে প্রথমত নারীরা তাদের মেধা ও দক্ষতা দিয়ে এই সেক্টরে কাজ করার যোগ্য হিসেবে নিজেদের তৈরি করেছেন। দ্বিতীয়ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্ট নারী-কর্মীদের ওপর আস্থা রাখছেন। আমাদের বর্তমান সামাজিক অবস্থা চিন্তা করলে আমি মনে করি ব্যাংকিং সেক্টরে কাজ করা নারীদের জন্য বেশ নিরাপদ। এখানে কাজের পরিবেশ খুব ভালো।
ব্যাংকিং সেক্টরে যারা ক্যারিয়ার গড়তে চায়, তাদের প্রতি আমার পরামর্শ হলো, অনেক বেশি পড়তে হবে, জানতে হবে এবং ডেডিকেশন দেখাতে হবে। সেই সঙ্গে সময়, সততা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করে যেতে হবে।

NO COMMENTS

Leave a Reply