Home মূল কাগজ সাক্ষাৎকার স্থাপত্যে আমাদের দেশ অনেক সমৃদ্ধ

স্থাপত্যে আমাদের দেশ অনেক সমৃদ্ধ

0 141

তানজিম হাসান সেলিম
স্থপতি

বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে পড়াশোনা শেষ করে দেশেই কাজ শুরু করি। কিন্তু খুব একটা সুবিধা করতে পারছিলাম না। মনে হয়েছিল দেশের চেয়ে বাইরে কাজ করলেই ভালো করব। সেই চিন্তা থেকে আবুধাবি চলে যাই। সেখানে কাজ করতে করতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নকশা করি। আর এই কাজের মাধ্যমেই যেন দেশে আমার পুনর্জাগরণ হলো! আমার স্ত্রী স্থপতি নাহিদ ফারজানা; তিনিও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রকল্পে কাজ করেছেন। জাদুঘরের কাজ করতে গিয়ে দেশে ফিরে পরিবারের সঙ্গে এক হওয়া এবং খুব অর্থপূর্ণ একটা কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে অন্যরকম আনন্দ হচ্ছিল।
২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসের দিকে বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ট্রাস্টি বোর্ড যৌথভাবে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নকশা আহবান করে। প্রতিযোগিতায় আমিও অংশ নিই। ওই বছরের ডিসেম্বরে ফলাফল প্রকাশ হয়। আমার কাজটা নির্বাচিত হয়। আবুধাবির চাকরি ছেড়ে ২০১০-এর শুরুতে দেশে চলে আসি। ওই বছরের মাঝামাঝিতে জাদুঘর ট্রাস্টি বোর্ডের সঙ্গে আমার চুক্তি হয়। তারপর প্রায় আট বছর এই কাজেই লেগে থাকি। ২০১৭ সালের ১৬ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উদ্বোধন হয়। বাংলাদেশের মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ মিশে আছে। সেদিক থেকে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরও একটা বড় আবেগের জায়গা। নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ; বিশেষত মুক্তিযোদ্ধারা যখন প্রশংসা করেন, আবেগতাড়িত হয়ে যাই। আরেকটা স্বীকৃতি হচ্ছে অনেক শ্রদ্ধেয় স্থপতিরাও কাজটার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। অনেক সহযোগিতাও করেছেন। আমার জীবনের এখন পর্যন্ত করা সবচেয়ে বড় কাজ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, যা নিয়ে আমি গর্ব করি।
একটা রাষ্ট্র্র ভৌগোলিকভাবে আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্রে প্রথমে যেটা কাজ করে, তা হলো দ্রোহ। পশ্চিম পাকিস্তানের অনেক শৃঙ্খল আমরা মানিনি। এই দ্রোহটা আমার কাছে খুব মূল্যবান মনে হয়। দ্রোহ থেকেই পরবর্তী বিদ্রোহের স্পিরিটটা নেওয়া হয়েছে বলে আমি মনে করি। দ্রোহ বিষয়টা সার্বজনীন। এটাকে কোনো বয়স, লিঙ্গ, জাতি, ধর্ম বা ভৌগোলিক সীমারেখা দিয়ে আটকানো যায় না। এই দ্রোহকে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে প্রকাশের চিন্তা ছিল। এ রকম অনেক চিন্তার সমন্বয় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। এর মধ্যে অন্যতম হলো একটা সেমি-পাবলিক স্পেস রাখা। জাদুঘরে যে শ্রেণি-পেশার মানুষই আসুক, ভবনের ভেতরের একটা অংশ পর্যন্ত যেন ঢুকতে পারে। এরপর গ্যালারি দেখতে চাইলে টিকেট কেটে ঢুকবে। ওখানে একটা উন্মুক্ত অ্যাম্পিথিয়েটারও আছে, যেখানে নানা অনুষ্ঠান করা যায়।
এ রকম একটা কাজ করা একজন স্থপতির জন্য বিশাল সুযোগ। আমার ভেতরে এক ধরনের তাড়না ছিল যে, কীভাবে এটাকে আমরা এমন একটা জায়গায় নিতে পারি, যেখানে একই সঙ্গে বাংলাদেশের সংস্কৃতি, পারিপার্শ্বিকতা ও ভাবধারা সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিকতাও থাকে; থাকে সার্বজনীনতাও। আমার চিন্তা ছিল, এটা যেন পুরো দুনিয়ার মুক্তিসংগ্রামীদের আবেগের জায়গাটা ধরতে পারে। বিশেষত, আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের যে সংগ্রাম, রাজনৈতিক নেতাদের কূটনৈতিক তৎপরতা, সামরিক বাহিনীর ভূমিকা এবং সাধারণ মানুষকে প্রশিক্ষিত করায় ভূমিকা নেওয়া সবগুলো বিষয়ই ধরার একটা প্রয়াস। ভাগ্যক্রমে আমরা খুব কম সময়ে; মাত্র ৯ মাসে স্বাধীনতা পেয়েছি। কিন্তু এই ৯ মাসে অনেক জীবন গেছে, অনেক রক্ত ঝরেছে। অনেক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। যে হারিয়েছে, তার দুঃখ আমরা মুছতে পারব না। অনেক মানুষ আছে, যারা হয়তো সে অর্থে স্বীকৃত নন কিন্তু যুদ্ধে তার অনেক অবদান আছে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এসে তারা যেন অনুভব করে যে, এটা তার আবেগের জায়গা।
আমার ছবি আঁকার অভ্যাসটা স্থাপত্যের জায়গায় এক ধরনের সুবিধা দিয়েছে। আর্কিটেকচারের ক্ষেত্রে পরিকল্পনাটা বাস্তবতার সঙ্গে মিলতে হয়, আর্টের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা একটু বেশি। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের পরিকল্পনা করতে গিয়ে কিছু বিষয় হয়তো মনের মতো করতে পারিনি। সেগুলোর আক্ষেপ থেকে হোক, অপূর্ণতা থেকে হোক কিছু ছবি এঁকেছি। আমার ছবির প্রদর্শনীও হয়েছে। আমি পেশাদার চিত্রশিল্পী নই। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় এটা আমার একটা স্বাধীনতা। ছোটবেলায় যখন ছবি আঁকতাম, তখন পরিবার থেকে খুব একটা উৎসাহ দেওয়া হতো না। বিশেষ করে প্রাণীর ছবি আঁকা নিয়ে সামাজিক নিরুৎসাহের এক ধরনের প্রভাব ছিল। তখন আমি মেশিনারিজ, গাড়ি এ ধরনের জিনিসপত্র আঁকতে শুরু করি, যা পরবর্তীতে আমাকে অনেক সহায়তা করেছে।
মজার ব্যাপার হলো, স্থাপত্য সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিল না। এমনকি ভর্তি হওয়ার পরও তেমন অনুভূতি কাজ করত না। এটা আসলে ঘটনাক্রমে হয়ে গেছে! আমার পরিকল্পনা ছিল পদার্থবিজ্ঞানে পড়া। তা যদি না-ও হয়, নিদেনপক্ষে কম্পিউটার সায়েন্স বা ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং। বাবা বললেন, দেশের বাইরে যাওয়া যাবে না। দেশেই থাকতে হবে। বাইরে যাওয়ার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েও বাবার আপত্তিতে যাওয়া হয়নি। দেশে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার মতো যতটুকু পড়া বা প্রস্তুতি নেওয়া দরকার সেটা আমার ছিল না। আমার এক বন্ধু বলল, তুমি যেহেতু ছবি-টবি আঁকতে পারো, বুয়েটের জন্য প্রস্তুতি নাও। ফরম কিনে পরীক্ষা দেই। টিকে যাই। ভর্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি আর্কিটেকচার (স্থাপত্য) বিষয়টা সম্পর্কে তেমন কিছু জানতাম না। বাংলাদেশে যে এত বড় বড় স্থাপনা রয়ে গেছে তাও অনুধাবন করিনি। পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি স্থাপনা আমাদের সংসদ ভবন, লুই আই কানের করা। এর সামনে দিয়ে কত গিয়েছি, সেভাবে এর মর্মার্থ অনুধাবন করিনি। এটা আসলে এক ধরনের ট্রেইনিং-ওরিয়েন্টেশন ছাড়া বোঝা কঠিন। আর্টের মধ্যে সবচেয়ে জটিল অংশটাই হলো আর্কিটেকচার। ফটোগ্রাফি বলেন, পেইন্টিং বলেন, পারফর্মিং আর্ট বা ফাইন আর্ট বলেন; সিনেমা বা স্কাল্পচার এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জটিল অংশ হচ্ছে আর্কিটেকচার। আর্কিটেকচার করলে আপনাকে বাস্তবের সঙ্গে যুক্ত হতেই হবে। আপনাকে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মুখোমুখি দাঁড়াতেই হবে। এটাকে কাঠামো দিতে হবে, এটার একটা যান্ত্রিক ব্যবস্থা লাগবে। মানুষ এটাকে ব্যবহার করবে। নিরাপত্তার ব্যাপারও আছে।
আমার মতে, আমাদের দেশের সেরা ভবনগুলোর মধ্যে সংসদ ভবন অবশ্যই এক নম্বর। মাজহারুল ইসলামকে বাংলাদেশের আধুনিক স্থাপত্যের পথিকৃৎ বলা যেতে পারে। ওনার করা যে স্থাপনাগুলো আছে প্রত্যেকটিই খুব ডিফিকাল্ট। ন্যাশনাল আর্কাইভ ভবন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্ট কলেজ বিল্ডিং (চারুকলা ভবন) তার উল্লেখযোগ্য কাজ।
একটা সময় আমাদের দেশে বাইরের বিশ্ববিখ্যাত স্থপতিরা এসে কাজ করতেন। তারা নতুন ও বৈশ্বিক চিন্তা-ভাবনা এখানকার স্থাপনায় যোগ করেছেন। মাজহারুল ইসলামের সময় করা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি উদাহরণ হিসেবে আসতে পারে। ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পল রুডলফের করা। মাজহারুল ইসলামের পরামর্শে তখন নামকরা আর্কিটেক্টদের এ দেশে আনা হয়েছে। লুই আই কানও তার প্রস্তাবিত আর্কিটেক্টদেরই একজন।
স্থাপনার মধ্য দিয়ে একটা শহরের অনেক কিছুই বোঝা সম্ভব। একটা দেশের উন্নতি বোঝা যায়। কারণ রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক বিভিন্ন রকম প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একটা ভবন তৈরি হয়। যে কমিউনিটি বা দেশে ভবনটা হচ্ছে ওইটা ওই জায়গাটার একটা স্যাম্পলের মতো। যেখান থেকে ধারণা নেওয়া যায়, এরা আর্টে, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বা কালচারে কেমন। এটা একটা সার্বজনীন চিন্তা। যদি গ্রিকদের কথা বলি, রোমান, ইজিপটেশিয়ান বা চাইনিজদের কথা বলি, ওদের প্রত্নতাত্তিক নিদর্শনের মধ্যে কিন্তু ভবন আসেই। এসব ভবন দেখে তাদের ধর্মীয় চিন্তা থেকে শুরু করে সামাজিক অবস্থান, জীবনযাপন প্রণালী, তাদের পেশা-দক্ষতা সবকিছু সম্পর্কে ধারণা করা যায়।
আমার নিজের কিছু কাজের কথা যদি বলি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নিয়েই পড়েছিলাম ২০১৭-এর শুরুর দিক পর্যন্ত। গত সাত বছরে আমি তেমন বড় কাজ করিনি। কিছু ছোট ছোট কাজ গুরুত্ব দিয়ে করেছি। ঢাকার গ্রীনরোডে একটা অ্যাপার্টমেন্ট প্রজেক্ট করেছি পারিল ভিউ। ৮৪টা অ্যাপার্টমেন্ট আছে ওখানে। ওইটা একটা অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স, তবে নিচে কমার্শিয়াল স্পেসও আছে। আন্তর্জাতিক কিছু কম্পিটিশনে অংশ নিয়েছি। কিছু ফ্যাক্টরি ডিজাইন-ডেভেলপমেন্টের কাজ করেছি।
বর্তমানে বগুড়ায় অটিস্টিক বাচ্চাদের জন্য ‘প্রয়াস’ নামে একটা স্কুলের কাজ করছি। স্কুলটা নির্মাণকাজ শুরু হবে শিগগিরই। আরেকটা প্রাইভেট ক্যান্সার হাসপাতালের কাজ করছি। এটা ঢাকার সাভারে হবে। ‘প্রয়াস’ স্কুলটার কাজের বিনিময়ে আমি তেমন কোনো টাকা-পয়সা নিচ্ছি না, সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই করছি।

অনুলিখনঃ সোহরাব শান্ত

NO COMMENTS

Leave a Reply