Home মূল কাগজ বিশেষ রচনা হামিদুজ্জামান ভাস্কর্য উদ্যান

হামিদুজ্জামান ভাস্কর্য উদ্যান

বঙ্গভবনের ভেতরের পাখি পরিবার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশপ্তক, ফার্মগেট মোড়ের ইলিশ, পটুয়াখালীতে জয় বাংলা ভাস্কর্যের শিল্পী হামিদুজ্জামান খান। আমাদের ভাস্কর্য-শিল্পে তার অসামান্য অবদান থাকলেও চিত্রকলায়ও তার দক্ষতা কম নয়। পড়াশোনা করেছেন চিত্রকলার ওপর। ভারতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন ভাস্কর্য বিষয়ে। ভাস্কর্য ও চিত্রকলা দুই মাধ্যমেই তিনি কাজ করে যাচ্ছেন সমান তালে। অগুণিত ভাস্কর্য গড়েছেন দেশে এবং বিদেশে। তার বেশিরভাগই করেছেন মুক্তিযুদ্ধকে বিষয় করে। কিছু ভাস্কর্য গড়েছেন স্পেসটাকে ইন্টারেস্টিং করার জন্য। শিল্পকলা একাডেমি থেকে পেয়েছেন চারটি পুরস্কার। ২০০৬ সালে পেয়েছেন একুশে পদক। সম্প্রতি বহুমাত্রিক এই শিল্পীর নামে ভাস্কর্য উদ্যান উদ্বোধন হলো গাজীপুর সামিট পাওয়ার প্ল্যাণ্টে। শিল্পী হামিদুজ্জামান খানের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মোহাম্মদ আসাদ

হামিদুজ্জামান ভাস্কর্য উদ্যান’ উদ্বোধন হলো। এটির বিশেষত্ব কী?
একটি ম্যুরাল বা দেয়ালচিত্র কেন্দ্র করে এই উদ্যানের সৃষ্টি। সাড়ে তিনশ ফুট দৈর্ঘ্য এবং ২২ উচ্চতার একটি দেয়ালচিত্র। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দেয়ালচিত্র। বহিরাঙ্গণে এত বড় দেয়ালচিত্র দেশের বাইরেও আমার চোখে পড়েনি।

এই উদ্যানের শুরুটা হলো কীভাবে?
সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজিজ খানের সঙ্গে আমি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছি। তিনি বিভিন্ন জায়গা থেকে আমাকে বহু জিনিস মেইল করেন। একবার আমাকে মেসেজ দিলেন একটা দেয়াল হচ্ছে, এখানে কিছু করা যায় কি না। আমার মাথায় বহুদিন ধরেই বহিরাঙ্গণের স্পেস চেইঞ্জ করার জন্য কাজের পরিকল্পনা চলছিল। বাড়ির সামনে, বাগানে একটা ভাস্কর্য থাকলে সে জায়গার চেহারাটাই বদলে যায়। সে-রকম অনেক কাজ করেছি। একটু বড় আকারের করার ইচ্ছা ছিল বহু দিনের। এই দেয়ালটা পেয়ে আমার স্বপ্নপুরণের একটা স্পেস পেলাম। এটা একটা পাওয়ার প্ল্যাণ্টের দেয়াল। আমি বলব, এটা শিল্পের প্রনোদানা, শিল্পকর্মেও অনুপ্রেরণা দেয়া। বিশাল এই কর্মযজ্ঞ পুরোপুরি শেষ করতে সময় লেগেছে এক বছর।

এত বড় একটি কাজ করতে গিয়ে স্বাধীনতা পেয়েছিলেন কেমন?
আমি যা চেয়েছি তাই হয়েছে। আজিজ খান সাহেব শুধু একজন বড় ব্যবসায়ী নয়, তিনি শিল্পের সমঝদার। সেই দেয়ালের কত যে পরিবর্তন করেছি তা বলে শেষ করা কঠিন। সাড়ে তিনশ ফুট লম্বা দেয়ালের মাঝে মাঝে পিলার দিয়ে খোপ খোপ। আমি এই খোপ খোপ ভরাট করে প্লেইন একটা দেয়াল বানিয়ে দিতে বললাম। আর উপরে জানালায় কালার প্লাস ছিল সেটা বাদ দিয়ে সাদা কাচ লাগিয়ে দিতে বললাম। তিনি ইঞ্জিনিয়ারকে এর সমাধান দিতে বললেন। ইঞ্জিনিয়ার বলল, এটা সম্ভব কিন্তু দেয়াল মোটা হয়ে যাবে। খরচ বাড়বে। আজিজ খান বললেন, খরচ যা-ই হোক, দেয়াল স্ট্রেইট করে দেন। এই দেয়ালটি ক্যানভাসে রূপান্তর করতে দেয়ালের পুরুত্ব দাঁড়াল ১৫ ইঞ্চি। সাড়ে তিনশ ফুট এই দেয়ালটি প্লাস্টার করে দেওয়ার পর আমি এটা নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম। বলে রাখা ভালো, গাজীপুরের কড্ডায় অবস্থিত সামিট পাওয়ার প্ল্যাণ্ট দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। ৪৬৪ মেগাওয়ার্ড বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী এই প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করা হয়েছে মাত্র নয় মাসে। তার জন্য আন্তর্জাতিক সম্মানও পেয়েছে। বিশাল এই প্রতিষ্ঠানের একটি বিশাল দেয়াল ইন্টারেস্টিং করার চেষ্টা করেছি আমি।

এই কাজে কী কী বিষয় স্থান পেয়েছে?
এটা একটা বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী ইন্ডাস্ট্রি। ইন্ডাস্ট্রির মেশিনপত্রের মূল অংশটিই চাকা। মেশিন চালু করলেই চাকা ঘুরতে থাকে। চাকা ঘুরলেই উৎপাদন। উৎপাদন মানে উন্নয়ন, এগিয়ে যাওয়া। বিদ্যুৎ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ হলো টারবাইন। আমি এই দেয়ালটিতে চাকা, টারবাইন দিয়ে সাজিয়েছি। নানা আকারের চাকা। কোথাও বড়, কোথাও ছোট, নানান আকারের। কোথাও আবার চাকার অংশবিশেষ। চাকাগুলো কোনোটা মার্বেল পাথরের, কোনোটা স্টেইনলেস স্টিলের, কোনোটা সাধারণ লোহার। চাকাগুলো পুনঃপুনঃ ব্যবহার করে ইন্টারেস্টিং করা হয়েছে। আরও বড় বিষয় হলো, কাজটিতে অনেক স্পেস আছে। বিদ্যুৎ তো একটা লাইন, ছুটে চলে। তাই নিচে একটা স্টিলের পাইপ দিয়ে লাইন বানিয়ে সাবজেক্টগুলোকে একটার সঙ্গে আরেকটার সম্পর্ক করলাম। পরস্পরের কাছাকাছি নিয়ে আসলাম।

কী কী উপকরণ ব্যবহার করেছেন এই দেয়ালে, সেগুলোর স্থায়িত্ব কেমন?
খোলা জায়গায় এই দেয়াল। রোদে পুড়বে, বৃষ্টিতে ভিজবে। এর জন্য আমি স্টোন ব্যবহার করেছি। এখানে গ্রানাইট পাথর ব্যবহার করেছি। কোনো-কোনোটায় পাথর কেটে নকশা করেছি। এক পাথরের ভেতর অন্য রঙের পাথর বসিয়েছি। তারপর স্টেইনলেস স্টিল আছে। লোহাও আছে। লোহার তৈরি চাকাগুলো লেকার দিয়ে ফিক্সড করে দেয়া হয়েছে। সবই রয়েল বোল্ট দিয়ে আটকে দেয়া হয়েছে। প্রথমে শেওলা ধরা দেয়ালে লাগানোর পর দেখতে তেমন ভালো দেখায়নি। পরে পুরো দেয়ালটাকে সাদা রঙ করার পর সাবজেক্টগুলো ফুটে উঠল। এই ম্যাটেরিয়াল সম্পর্কে আমার ভালো ধারণা আছে। এগুলো দীর্ঘসময় টিকে থাকবে।

উদ্যানের গল্পটা শুনতে চাই ।
বড় এই দেয়ালের পাশেই আছে আরও একশ ফুটের মতো দেয়াল। সেটাও এই দেয়ালের সঙ্গে লিং করালাম। দেয়ালের সামনে অনেকটুকু খোলা জায়গা পেলাম। সেখানে সবুজ ঘাস লাগিয়ে দেয়া হলো। বিশাল এই সবুজের মঝে মাঝে রয়েছে ভাস্কর্য। এখানে নানা আকৃতির, নানা রকম বিষয়ের ১২টি ভাস্কর্য। ভাস্কর্যের মধ্যে আছে এক শিশু বিদ্যুতের খুঁটির নিচে বসে বই পড়ছে। একাত্তরে লাশ পরে থাকা সেই রিকশা আছে। এগুলো লোহার। পাথরের আছে নানা রকমের শেইপ। সেগুলোর কোনো-কোনোটা বসার বেঞ্চি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।

NO COMMENTS

Leave a Reply