Home চট্টগ্রাম ২০০ কিলোমিটার সড়কের বেহাল দশা

২০০ কিলোমিটার সড়কের বেহাল দশা

বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় বিপাকে চট্টগ্রামবাসী

আবদুল্লাহ আল মামুন

বন্দর সংযোগ-সড়ক বা পিসি রোড। চট্টগ্রাম নগরের এ সড়কটির অধিকাংশজুড়ে কার্পেটিংয়ের কোনো চিহ্ন নেই। সড়কজুড়ে তৈরি হয়েছে ছোট-বড় গর্ত। গাড়ি উল্টে ঘটছে দুর্ঘটনা। গর্তে পড়ে গাড়ি বিকল হয়ে তৈরি হচ্ছে যানজট। অথচ চট্টগ্রাম বন্দরের অধিকাংশ ট্রাক ও লরি চলাচল করে এ সড়ক দিয়ে। শুধু পিসি রোড নয়, টানা বর্ষণ ও জলাবদ্ধতায় বেহাল দশা নগরের অধিকাংশ সড়কের। গত নয় অর্থবছরে এসব সড়কের সংস্কার ও উন্নয়নে সিটি করপোরেশন ব্যয় করেছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। এর পরও এ বর্ষায়ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নগরের ২০০ কিলোমিটার সড়ক। তবে বিশেষজ্ঞদের দাবি, নিম্নমানের কাজ ও পানি নিষ্কাশন-ব্যবস্থা ঠিক না থাকায় প্রতিবছর বর্ষায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়ে নগরের সড়কগুলো।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, ‘টানা বর্ষণে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম নগরের সড়কগুলো। সৃষ্টি হয়েছে ছোট-বড় খানাখন্দ। এসব সড়ক মেরামতের জন্য করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগ অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। কিন্তু অতিবৃষ্টি ও থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলোর মেরামতের কাজে বিঘ্ন ঘটছে। সময়ও বেশি লাগছে।’ নগরবাসীর সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন মেয়র।
সরেজমিন নগরের সড়কগুলো ঘুরে দেখা যায়, টাইগারপাস থেকে কদমতলী মোড়-এ সড়কের সিআরবি এলাকায় তৈরি হয়েছে বড় গভীর গর্ত। সিএনজি অটোরিকশা আটকে বিকল হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া কদমতলী সিআরবি সড়কেরও একই দশা। নগরের অক্সিজেন মোড়ে বৃষ্টিতে তৈরি হওয়া গর্তে আটকে গেছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা। তা তুলতে গলদঘর্ম হতে হয় চালককে। ওই মোড়ে সড়কের কার্পেটিং উঠে গেছে। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে (অক্সিজেন-কুয়াইশ সংযোগ সড়ক) সড়কের দুই পাশে কোনো কার্পেটিং নেই। পুরো সড়ক খানা-খন্দকে ভরা। অটোরিকশাচালক রহিম উল্লাহ বলেন, ‘এক বছর ধরে সড়ক ভেঙে গেছে। এবারের বৃষ্টিতে ভাঙা সড়ক ডোবায় পরিণত হয়েছে। বৃষ্টি হলে গাড়ি চালানো যায় না।’
জাকির হোসেন সড়কের ওয়্যারলেস মোড় ও খুলশী এলাকায় তৈরি হয়েছে ছোট-বড় গর্ত। একই চিত্র নগরের আমবাগান সড়কেও। উন্নয়নকাজ চলমান থাকা পিসি রোড ও আগ্রাবাদ এক্সেস রোডে তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে যানবাহন। বিমানবন্দর সড়কের সিমেন্ট-ক্রসিং ও সল্টগোলা এলাকায়ও তৈরি হয়েছে গর্ত। দীর্ঘদিন ধরে চলাচল-অনুপযোগী হয়ে পড়ে আছে আরাকান সড়কের একাংশ। শাহ আমানত সেতু সংযোগ-সড়কেও তৈরি হয়েছে একাধিক গর্ত।
সিটি করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, নগরের মোট সড়কের পরিমাণ ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার। প্রতিবছর বর্ষায় এসব সড়কের একাংশ ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়ে। দুর্বিষহ হয়ে পড়ে নাগরিক জীবন। নগরের সড়কগুলো রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নে গত অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৫০০ কোটি টাকার বেশি। মূলত নগরের ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো সংস্কারের পাশাপাশি পুরনো সড়ক নতুন করে নির্মাণ করা হয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ব্যয় হয়েছিল ৪২০ কোটি টাকা। এ ছাড়া ২০১৩-১৪ অর্থবছর থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত চারটি অর্থবছরে সড়কের রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নে ব্যয় হয়েছে ৫০১ কোটি টাকা। ওই সময়ে মেরামত করা হয়েছিল ৩৭৭ কিলোমিটার সড়ক। এত ব্যয়ের পরও টেকসই হচ্ছে না নগরের সড়কগুলো।
এ প্রসঙ্গে পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহসভাপতি ও সড়ক-পরিবহন বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া বলেন, ‘নগরের সড়কগুলোর সংস্কার ও উন্নয়নে কাজ গুনগত হয় না। আবার যে কাজ হয় তাতে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় না। নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার তো আছেই। ফলে সংস্কারের বছরখানেকের মধ্যেই রাস্তা ভেঙে যাচ্ছে।’
প্রতি বর্ষায় সড়ক নষ্ট হয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া বলেন, ‘বৃষ্টি তো শুধু চট্টগ্রামে হচ্ছে না। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও হয়। কিন্তু কোথাও তো সংস্কারের এক বছরের মধ্যে সড়ক নষ্ট হয়ে যায় না। তাহলে এখানে কেন নষ্ট হয়। ঠিকভাবে কাজ করলে একটি সড়ক অন্তত ৫ থেকে ৭ বছর অক্ষত থাকার কথা। সড়ক কেন খারাপ হচ্ছে, এ জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় অবশ্যই আনতে হবে। না হলে প্রতি বছর টাকা খরচ হবে। কিন্তু দুর্ভোগ থেকে যাবে।’
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সংস্কারের পরও সড়ক ভেঙে যাওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কারণ দায়ী। পানির পাইপ স্থাপনে দীর্ঘদিন ধরে ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়ি, নগরে পণ্যবাহী ভারী যানবাহন চলাচল, জলাবদ্ধতাসহ বিভিন্ন কারণে সংষ্কারের পরও সড়কগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাই সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং বিআরটিএ ও ট্রাফিক বিভাগের কার্যকর ভূমিকা ছাড়া এই অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।’

NO COMMENTS

Leave a Reply