Home মূল কাগজ ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয় করবে ভিআরএফ

৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয় করবে ভিআরএফ

সাবরিনা মিলি


নিত্যনতুন যেসব প্রযুক্তির কল্যানে জীবন-যাপন অনেকটা সহজ এবং আরামদায়ক হয়ে উঠেছে, ভিআরএফ তার মধ্যে একটি।
ভিআরএফ মানে ভেরিয়েবল রেফ্রিজারেন্ট ফ্লো বা ভেরিয়েবল রেফ্রিজারেট ভলিউম। এটা এক ধরনের এইসভিআইসি প্রযুক্তি। ১৯৮২ সালে ডাইকিন ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডকর্তৃক উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তি অনেকটা সেন্ট্রাল এসি সিস্টেমের মতো। তবে এক্ষেত্রে পাওয়া যায় কিছু বাড়তি সুবিধা। ধরা যাক, একটি শপিংমলে ৫০টি দোকান আছে। সেখানে যদি সেন্ট্রাল এসি ব্যবহার করা হয় তাহলে সব জায়গায় একই তাপমাত্রা থাকবে। কিন্তু ভিআরএফের মাধ্যমে মেশিন একটা হলেও সেটা দিয়েই প্রত্যেক দোকানের তাপমাত্রা আলাদাভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে ইনডোরের জন্য একটা আর আউটডোরের জন্য আরেকটা বক্স থাকবে। এটার মাধ্যমে সাড়ে ১৭ টন থেকে শুরু করে হাজার টন পর্যন্তও ইনডোর থেকে বাতাস বের করা সম্ভব। এর মাধ্যমে তিন রুমের জন্য তিনটি এসির বদলে একটা মেশিন দিয়েই কাজ চালানো যায়, যেটা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে কেন্দ্রীয়ভাবে। মোবাইল ফোন দিয়েও তাপমাত্রা ঠিক করে নেয়া যাবে সুবিধামতো।

মো. সিফাত বিন আমিন, এইচভিএসির সহকারী মহাব্যবস্থাপক, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ।

এই ধরনের প্রযুক্তি বড় পরিসরে ব্যবহার করা হয়েছে এর আগে। এখন সেটা দুই হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাটেও কাজে লাগানো সম্ভব। ব্যাপারটা বাংলাদেশে খুব একটা পরিচিত হয়ে না উঠলেও দুই-এক বছরের মধ্যেই সর্বসাধারণের কাছে পৌঁছে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে উদ্যোক্তাদের।
রাজধানীর অভিজাত হোটেল সোনারগাঁও কিংবা শেরাটনে ব্যবহার করা হয়েছে চিলার সিস্টেম, যেটা বেশ পুরনো প্রযুক্তি। ১৯৮২ সালে আবিষ্কার হওয়ার পর এটার কার্যকারিতা দেখে স্যামসাং-এলজির মতো প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলো আগ্রহ প্রকাশ করে।

কেন এই প্রযুক্তি ভবনে ব্যবহার করবেন?
উদ্যোক্তাদের দাবি, ভিআরএফ ব্যবহারে ৪০ শতাংশ কম বিদ্যুত লাগবে। ধরা যাক, একটা ফ্ল্যাটের তিন রুমে তিনটি এসি। এক্ষেত্রে একেকটি রুম থেকে যদি ৪০ শতাংশ বিদ্যুত বাঁচানো যায় তাহলে সব মিলিয়ে সাশ্রয়ের খাতাটা বেশ ভারীই হবে। শুধু তা-ই নয়, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটা মেশিনের মাধ্যমে তিন বেডরুমসহ ড্রইং-ডাইনিং সবখানে ঠান্ডা বাতাস পৌঁছে দেয়া সম্ভব। যেখানে সাধারণ এসিতে বাইরের মেশিনের সঙ্গে ভেতরেরটির সংযোগকারী পাইপের দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ ১৫ মিটার রাখা যায় সেখানে এই প্রযুক্তিতে ২২৫ মিটার পর্যন্ত দূরে মূল মেশিন রাখা সম্ভব। আপনি চাইলে আপনার মেশিনটি ছাদেও বসাতে পারবেন। ফলে ভবনের বাহ্যিক সৌন্দর্য্য রক্ষা করা পাবে অনায়াসে।
ভিআরএফের কাজ সেন্ট্রাল এসির মতো হলেও এটার ব্যবহার তুলনামূলক অনেক সহজ। সেন্ট্রাল এসির ক্ষেত্রে মোটা পাইপ ব্যবহার করতে হলেও এক্ষেত্রে চিকন পাইপ দিয়ে কাজ চালানো সম্ভব। কুলিং টাওয়ারের পরিবর্তে ছাদে একটা মেশিন রাখলেই থাকছে না আর কোনো বাড়তি ঝামেলা।
সাধারণ এসির তুলনায় এই প্রযুক্তির দাম কিছুটা বেশি। একটি বাসায় প্রতি টন এসির জন্য এখন খরচ করতে হয় প্রায় ৫৫ হাজার টাকা। কিন্তু ভিআরএফের ক্ষেত্রে প্রতি টনে খরচ পড়বে ৮৮ হাজার টাকা। কিন্তু ভিআরএফের উদ্যোক্তারা বলছেন, সাধারণ এসির ক্ষেত্রে যেখানে বড়জোর পাঁচ বছর পর্যন্ত কোনো মেরামত ছাড়া চালানো সম্ভব, ভিআরএফের ক্ষেত্রে সেই মেয়াদটা ২০ বছরের বেশি। সব মিলিয়ে হিসেবে করে দেখা গেছে, পুরো সিস্টেমের খরচ ৭/৮ মাসের মধ্যে এর ক্রেতা তুলে ফেলতে পারবেন।

বাংলাদেশে ভিআরএফ
ভিআরএফ বাংলাদেশে গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছতে শুরু করে বছর তিনেক আগে। বর্তমানে গার্মেন্টস ভবনগুলোতে এর ব্যবহার শুরুর চেষ্টা চলছে। আন্তর্জাতিক উদ্যোগের কারণে গার্মেন্টস ভবনগুলো গ্রিন বিল্ডিং না হলে ক্রেতারা অর্ডার দিতে অনীহা দেখায়। সে কারণেই গার্মেন্টস-মালিকরা ভিআরএফের ব্যাপারে আগ্রহী হতে পারেন। কারণ সাধারণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় প্রচুর পরিমাণে সিএফসি গ্যাস নির্গত হয়। ভিআরএফে যেটা অনুপস্থিত।
বাংলাদেশে ভিআরএফ প্রযুক্তি ব্যবহারে বর্তমানে এগিয়ে আছে গুলশান-বনানী এলাকার বাণিজ্যিক ভবনগুলো। তার পরেই আছে গার্মেন্টস কারখানা। এরপর হোটেল-রেস্টুরেন্ট আর হাসপাতাল। চট্টগ্রামের জিপিএইচ ইস্পাতের দশতলা কর্পোরেট অফিস ও ফ্যাক্টরি বিল্ডিংয়ে বর্তমানে এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। সেখানে বসানো হয়েছে প্রায় সাড়ে ৬০০ টনের ভিআরএফ। এছাড়া চট্টগ্রামেই কেএসআরএমের একটি ভবনেও ব্যবহার করা হয়েছে এই প্রযুক্তি। ফেনীতে নকশী টাওয়ার নামে একটি প্রজেক্টের নির্মাণ-কাজ চলছে, যেখানে একই সঙ্গে থাকছে হোটেল, হাসপাতাল ও শপিং কমপ্লেক্স। এমন ধরনের প্রজেক্ট বাংলাদেশে এই প্রথম যেখানে ব্যবহার করা হচ্ছে ভিআরএফ।
এইচভিএসির সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. সিফাত বিন আমিন কারিকাকে বলেন, ‘প্রাণ-আরএফএল কোম্পানি তাদের পণ্যের গুণগত মানের মাধ্যমে বাজারে শীর্ষস্থানে থাকতে চায়। এর আগে আমরা চিলার নিয়ে কাজ করেছি। গত তিন বছর এই ভিআরএফ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভিআরএফ প্রযুক্তির মেইটেনেন্সের দরকার হয় কয়েকটা ক্ষেত্রে। প্রথমত ফিল্টার পরিষ্কার করতে হয়। এছাড়া পাওয়ার লাইন মেশিন যেখানে বসানো হয় সে জায়গার কোনো সমস্যা হতে পারে। সেক্ষেত্রে প্রাণ-আরএফএল তাদের ক্রেতাদের প্রথম এক বছর বিনামূল্যে সার্ভিস দিয়ে থাকে। এরপর চুক্তিতে আসতে হয়। একটা নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে কোম্পানি এই সার্ভিস দিয়ে থাকে। টাকার অঙ্কটা এলাকা ও মেশিনের টনের ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়।’

NO COMMENTS

Leave a Reply