Home ফিচার
Featured posts

কারিকা প্রতিবেদক

প্রায় দুই কোটি মানুষের এই ঢাকা শহরে গণপরিবহন যেন গণভোগান্তির অপর নাম। রাজধানী ঢাকায় কার্যকর গণপরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে ইতোমধ্যে অনেক পরিকল্পনা ও প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। মেট্রোরেল, বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি), ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ বেশকিছু পরিকল্পনা ও প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।
রাজধানীর গণপরিবহন-ব্যবস্থায় শৃঙ্খলার অভাব রয়েছে-বিশেষজ্ঞ থেকে সাধারণ মানুষ সবাই একবাক্যে স্বীকার করবেন। অন্যদিকে নাগরিকদের মধ্যে আইন মানার প্রবণতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের চিরায়ত যে নিয়ম-সেটারও ঘাটতি আছে। তাই সড়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে সিগন্যাল বাতির প্রচলন থাকলেও ঢাকার অধিকাংশ ইন্টারসেকশনগুলোতে যানচলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয় হাতের ইশারায় অর্থাৎ ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে। কখনো কখনো যানবাহন ও পথচারীর বিশৃঙ্খল চলাচল নিয়ন্ত্রণে রশি, বাঁশ ও উঁচু লোহার ব্যারিকেডের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।
ঢাকার গণপরিবহন-ব্যবস্থার বেহাল দশায় বীতশ্রদ্ধ হয়ে অনেকেই ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছেন। যাদের গাড়ি কেনার সামর্থ্য নেই তারা রাইড শেয়ারিং সেবার দ্বারস্থ হচ্ছেন। গণপরিবহনের বদলে নাগরিকরা ব্যক্তিগত ছোট গাড়ির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় যানজট বাড়ছে সড়কে।
২০১৭ সালে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ৬ শতাংশ ব্যক্তিগত গাড়ি ঢাকার ৭৬ শতাংশ সড়ক দখল করে রাখে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক সংগঠন ডোমোক্রেসি ওয়াচের ওই জরিপে আরও বলা হয়, ঢাকার ১৬৮টি রুটে গণপরিবহনের সংখ্যা ৫ হাজার ৪০৭, যা ন্যূনতম ১৩ হাজার হওয়া প্রয়োজন।
যাত্রী ওঠা-নামার ক্ষেত্রে নির্ধারিত বাস স্টপেজ থাকলেও যাত্রী, চালক ও পরিবহনের সহকারি কেউ-ই গণপরিবহনে ওঠা-নামার ক্ষেত্রে নির্ধারিত বাস স্টপেজ ব্যবহার করেন না। গণপরিবহনের বিশৃঙ্খল চলাচলে একদিকে যেমন সড়কে যানজট বাড়ছে, অন্যদিকে রয়েছে দুঘর্টনার ঝুঁকিও।
বিআরটিএর আইনে সিটিং সার্ভিসের কোনো অস্তিত্ব নেই। অথচ রাজধানীজুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অবৈধ সিটিং সার্ভিস। আবার ‘সিটিং সার্ভিসে’র নাম করে অতিরিক্ত ভাড়া নিলেও অনেক বাসে আসনের অতিরিক্ত যাত্রী তোলা হচ্ছে, বাড়তি ভাড়া দিলেও তাদের যেতে হচ্ছে দাঁড়িয়ে। যাত্রী ওঠা-নামার জন্য এসব গাড়ি যত্রতত্র দাঁড়াচ্ছে। ফলে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েও সেবা পাচ্ছেন না যাত্রীরা। ঢাকার রাস্তায় ভাড়া নিয়ে যাত্রী ও গণপরিবহনের সহকারির বাগবিতন্ডা এখন নিত্য ঘটনা।
রাজধানীর মিরপুর, আগারগাঁও হয়ে গুলিস্তান ও যাত্রাবাড়ী রুটে চলছে প্রায় ২০টি কোম্পানির এক হাজারেরও বেশি বাস-মিনিবাস। এসব কোম্পানির নামে আরও কয়েক’শ বাস ও মিনিবাস নামানোর অনুমতি আছে। অথচ সড়কের ধারণক্ষমতা বা যাত্রীসংখ্যার অনুপাতে কী পরিমাণ বাস বা মিনিবাস দরকার-এ ধরনের কোনো সমীক্ষা নেই। সরকার বা বাসমালিক-কারও কাছে নেই এ-সংক্রান্ত তথ্য। শুধু মিরপুর নয়, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, মতিঝিল, সাভারসহ কয়েকটি রুটেও প্রায় অভিন্ন চিত্র দেখা গেছে।
পরিবহন-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো ধরনের সমীক্ষা ছাড়াই একই রুটে অনেক কোম্পানির বাসের রুট পারমিট দেয়া হচ্ছে। বেশিরভাগ কোম্পানির মালিক প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এ ছাড়া একই কোম্পানিতে অনেক মালিকের গাড়ি থাকায় বেশি আয়ের আশায় সড়কে গণপরিবহনের রেষারেষি বাড়ছে। যাত্রী বেশি পাওয়া এবং দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে আরেকটি ট্রিপের সিরিয়ালের আশায় নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করছেন না চালকরা। তারা রাস্তার মাঝখানে গাড়ি রেখেই যাত্রী ওঠা-নামা করাচ্ছেন।
এসব সমস্যা নিরসনে এবং রাজধানীর গণপরিবহন-ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনতে ঢাকা ও আশেপাশের এলাকায় ২২টি রুট নির্ধারণ করা হয়েছে। রুটগুলোতে মহানগরীর সব বাস ছয়টি কোম্পানির অধীনে যাত্রী পরিবহন করবে। ছয়টি কোম্পানির বাস ছয় রঙের (গোলাপি, কমলা, সবুজ, বেগুনি, মেরুণ ও নীল) হবে। গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে গঠিত বাস রুট রেশনালাইজেশন-সংক্রান্ত কমিটির বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
বাস রুট রেশনালাইজেশন-সংক্রান্ত কমিটির বৈঠক শেষে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন সাংবাদিকদের বলেন, ‘২০২০ সালকে “মুজিববর্ষ” ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আমরা এই বছরের মধ্যেই গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে চাই। নাগরিকদের একটি নিরাপদ নগরী উপহার দিতে চাই। সেই লক্ষ্য নির্ধারণ করে কাজ করছে বাস রুট রেশনালাইজেশন-সংক্রান্ত কমিটি।’
বাসভাড়া নিয়ে বিদ্যমান নৈরাজ্য কমাতে এবং গণপরিবহনে ওঠা-নামায় নির্ধারিত বাস স্টপেজ ব্যবহার নিশ্চিত করতে রাজধানীর গণপরিবহনে টিকিট বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে গঠিত এই কমিটির নবম বৈঠকে মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, ‘ঢাকা শহরের কোথাও টিকিট ছাড়া গণপরিবহনে যাত্রী চলাচল করতে পারবে না বলে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এতে করে বিদ্যমান যে বাস-সংকট এবং যাত্রীদের দুর্ভোগ তার অবসান হবে। তাই ডিটিসি, বিআরটিএ, বিআরটিসি, ডিএসসিসি ও ডিএনসিসি এবং পরিবহন মালিকদের সমন্বয়ে বাসের টিকিট এবং কাউন্টার স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন করে পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, ‘শিগগিরই যাতে এ ব্যবস্থা কার্যকর করা যায় সেজন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে সড়কের জায়গা যাতে বেদখল না হয় সেজন্য সব পরিবহনের টিকিট কাউন্টার এক জায়গায় হবে।’
রাজধানীর গণপরিবহন-ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনয়নের অংশ হিসেবে চলতি বছরের মার্চে ধানমন্ডিতে এবং মে মাসে উত্তরাতে চক্রাকার এসি বাস-সার্ভিস চালু করা হয়। ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ও ডিএমপির সমন্বয়ে রাজধানীর মতিঝিল ও সদরঘাট এলাকাতেও চক্রাকার বাস-সার্ভিস চালু হওয়ার কথা রয়েছে।

কারিকা প্রতিবেদক
নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে রাজধানীর পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলো। রাতের অন্ধকারে ভেঙে ফেলা হচ্ছে এসব স্থাপনা। সম্প্রতি পুরান ঢাকার জাহাজ বাড়ি ভেঙে ফেলায় এই শঙ্কা আরও বেড়েছে। উচ্চ আদালত এসব ভবনের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করে সেটা রক্ষণাবেক্ষণের নির্দেশ দেওয়ার পরও সেই আদেশ মানছে না দায়িত্বশীল কেউ।
রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকমতো কাজ করছে না বলে অভিযোগ করেছে হেরিটেজ স্থাপনা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো। তাদের দাবি, অতিদ্রুত নিরাপত্তা না বাড়ালে প্রভাবশালীদের ‘আক্রমণে’ হারিয়ে যাবে পুরান ঢাকার সব ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা।
ঈদের আগের দিন রাতে পুরান ঢাকার চক সার্কুলার রোডের ‘জাহাজ বাড়ি’ ভেঙে ফেলা হয়। ভবনটি ভাঙার সময় আরবার স্টাডি গ্রুপের প্রধান নির্বাহী তাইমুর ইসলাম চকবাজার থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। তখন পুলিশ গিয়ে ভবনটি ভাঙার কাজ বন্ধ করে দিলেও শেষ পর্যন্ত বাড়িটি রক্ষা করা যায়নি। পুলিশও এর সঙ্গে জড়িত কাউকে আটক করেনি।
এর আগে সূত্রাপুর থানা ভবনসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বেশ কয়েকটি হেরিটেজ বাড়ি ভাঙা শুরু হলে পুলিশের সহযোগিতায় তা বন্ধ করা হয়। কিন্তু জাহাজ বাড়ি রক্ষা করতে না পারায় সংশ্লিষ্টদের মনে শঙ্কা বেড়েছে।
২০০৯ সালের ২ ফ্রেরুয়ারী পুরান ঢাকার চারটি অঞ্চলকে ঢাকার ঐতিহ্য বা হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করে রাজউক। গেজেটে ৯৩টি স্থাপনা ও ১৩টি সড়ককে ঐতিহ্যবাহী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ২০১৭ সালে হেরিটেজের সংখ্যা ৭৫টিতে নামিয়ে আনা হয়। ১৩টি সড়কও তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।
রাজউকের তালিকাকে ক্রুটিপূর্ণ দাবি করে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা নিয়ে কাজ করা আরবান স্টাডি গ্রুপ। ২০০৪ সালে নিজেদের উদ্যোগে ঢাকার প্রায় ২ হাজার ৭০০ ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার তালিকা তৈরি করে সংগঠনটি। এর মধ্যে গ্রেড-১ ও ২-এ ২ হাজার ২০০ ভবন রয়েছে। এই তালিকা রাজউক, সিটি করপোরেশন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরে জমা দিয়ে কোনও লাভ হয়নি। পরে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সংরক্ষণের দাবিতে ২০১২ সালে উচ্চ আদালতে রিট করে আরবান স্টাডি গ্রুপ।
রিটের রায়ে আদালত বলেন, কোন কোন ভবন ঐতিহ্যবাহী ও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন তার তালিকা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত আরবান স্টাডি গ্রুপের খসড়া তালিকাভুক্ত ভবনে কোনো প্রকার পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করা যাবে না। তালিকাভুক্ত এসব বাড়ি বা স্থাপনা নির্মাণের নকশা অনুমোদন না দিতে রাজউককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তালিকাভুক্ত এসব স্থাপনা যথাযথ আছে কিনা তা পরীক্ষার জন্য একটি উপদেষ্টা কমিটি করতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওই কমিটিকে তিন মাস পরপর কাজের অগ্রগতি প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে হবে। ওই তালিকায় গ্রেড-১-এ জাহাজ বাড়িটিও অন্তর্ভুক্ত আছে।
খোদ রাজধানীতে জাহাজ বাড়ির মতো ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়া প্রসঙ্গে স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সবসময় ঐতিহ্য এবং হেরিটেজ সংরক্ষণের প্রতি দরদী হওয়ার কথা বলে আসছে। তারপরও জাহাজ বাড়ির মতো ঐতিহ্যবাহী ভবন ভেঙে দেয়ার মতো ঘটনা প্রমাণ করছে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সংরক্ষণে সিরিয়াস না।
জাহাজ বাড়ি ভাঙা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আরবান স্টাডি গ্রুপের প্রধান নির্বাহী তাইমুর ইসলাম বলেন, ‘এটা স্পষ্ট, ঐতিহ্যবাহী ভবনগুলো নিয়ে এখন প্রভাবশালীরা অঘোষিত যুদ্ধই ঘোষণা করেছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর, রাজউক ও পুলিশ কেউ আদালতের আদেশ মানছে না। ভবনগুলো ভাঙার ক্ষেত্রে দস্যুদের মতো আচরণ করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘শঙ্কায় আছি যেভাবে ভবনগুলো ভাঙা হচ্ছে, তাতে ঐতিহ্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে যাবে। আর রাজউক যে গেজেট করেছে, প্রত্নতত্ত্ব আইন অনুযায়ী সেটা তারা করতে পারে না।’
জানা গেছে, উনিশ শতকের মাঝামাঝিতে নির্মিত এই ভবনটি ঢাকার প্রথম বাণিজ্যিক ভবন হিসেবে বিবেচিত হতো। ওই ভবনের বিভিন্ন দোকানের ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভবনটি ওয়াকফ এস্টেট হিসেবে ছিল। তারা নিয়মিত ওয়াকফ প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রতিনিধিকে ভাড়া দিয়ে আসছিলেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘জাহাজ বাড়ি’ ভবনটি তৈরি করা হয়েছে আনুমানিক ১৮৭০ সালে। ভবনের মালিক ১৯২০ সালে বদু হাজির নামে ওয়াকফ সম্পত্তি করে দিয়ে যান। বদু হাজির মৃত্যুর পর তার বড় সন্তান ফেকু হাজি ভবনটির দায়িত্বে ছিলেন। ফেকু হাজির মৃত্যুর পর তার বড় ছেলে হাজি আবদুল হক ভাঙার আগ পর্যন্ত ভবনটি তত্ত্ববধায়ন করছিলেন।
তিনতলা ‘জাহাজ বাড়ি’র দোতলায় নকশা করা রেলিং, ছাদওয়ালা টানা বারান্দা ছিল। আর অবয়বজুড়ে ছিল নানা রকম কারুকাজসমৃদ্ধ। কোনাকৃতি আর্চের সারি, কারুকাজ করা কার্নিশ। কলামে ব্যবহার করা হয়েছে আয়নিক ও করিন্থিয়ান ক্যাপিটাল। ভবনের পশ্চিম প্রান্তে আর্চ ও কলামের সঙ্গেও নানা রকম অলংকরণের ব্যবহার দেখা যায়। সব মিলিয়ে এই ভবনটিতে যে ধরনের অলংকরণের ব্যবহার রয়েছে, তা একে এক অনন্য মাত্রা দিয়েছে। এই ধরনের অলংকরণ পুরান ঢাকায় আর কোনো ভবনে দেখা যায় না। সেদিক থেকে এর নান্দনিক গুরুত্বের জন্যই ভবনটি সংরক্ষণ করার প্রয়োজন ছিল বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

ঋণ দেবে বিশ্বব্যাংক

কারিকা প্রতিবেদক
বিশ্বে বসবাসের সবচেয়ে অযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়, খবরটি প্রায় সবারই জানা। বসবাসযোগ্যতার দিক দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শহরের একটি তালিকা তৈরি করেছে ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা, অপরাধের মাত্রা, শিক্ষার সুযোগ ও স্বাস্থ্যসেবার মানের মতো বেশকিছু সূচক বিবেচনায় নিয়ে সারা বিশ্বের ১৪০টি শহরের ভালো-মন্দ দিক বিবেচনায় নিয়ে তালিকাটি করা হয়েছে। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকার নিচে অবস্থান করছে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক।
তবে দুঃসংবাদের পাশাপাশি ঢাকাবাসীর জন্য স্বস্তির সংবাদও আছে। ঢাকার পাশে চারটি উপশহর গড়তে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে ৮৫০ কোটি টাকা দেবে বিশ্বব্যাংক।
বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সমিতির (আইডিএ) আওতায় আগামী ৩০ বছরের মেয়াদে শতকরা শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ সার্ভিস চার্জে ও ১ দশমিক ২৫ শতাংশ সুদে এই ঋণ দেবে বিশ্বব্যাংক।
গত মে মাসের শেষের দিকে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে এনইসি সম্মেলন কক্ষে এ-সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) অতিরিক্ত সচিব জাহিদুল হক ও বিশ্বব্যাংকের পক্ষে ভারপ্রাপ্ত আবাসিক প্রতিনিধি জাহিদ হোসেন নিজ নিজ সংস্থার পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
‘ঢাকা সিটি নেইবারহুড আপগ্রেডিং প্রজেক্টের আওতায়’ রাজধানী কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, সূত্রাপুর-নয়াবাজার-গুলিস্তান, খিলগাঁও-মুগদা-বাসাবোতে চারটি উপশহর গড়ে তুলতে এই ঋণ দেয়া হবে। প্রকল্পের আওতাভুক্ত এলাকায় খেলার মাঠ, পার্ক, জলপ্রপাত, রাস্তা, হাঁটার পথ, উন্মুক্ত সবুজ স্থান ও নাগরিক সুবিধা-সংবলিত কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ করা হবে। যাতে করে প্রকল্প-এলাকার ১০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ সুবিধা ভোগ করার পাশাপাশি এসব এলাকায় বসবাসরত নারী, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও উপকৃত হবেন।
প্রকল্প সম্পর্কে বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি জাহিদ হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশের মোট উৎপাদনশীলতার দিক দিয়েই ঢাকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সমন্বিত সড়ক নেটওয়ার্ক তৈরির পাশাপাশি খেলাধুলার মাঠ ও খালি জায়গা তৈরি করে সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির পরিবেশ নিশ্চিত করাই এ প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য।’

ঈদ-পরবর্তী প্রতিটি শো ছিল হাউজফুল

আবদুল্লাহ আল মামুন

‘তরুণ বয়সে চট্টগ্রামের প্রায় সবগুলো সিনেমা হলে সিনেমা দেখেছি। এক পর্যায়ে সিনেমা হলগুলোর পরিবেশ নষ্ট হয়ে যায়। সিনেমার মানও কমে যায়। পরিবার নিয়ে সিনেমা দেখার মতো পরিবেশ তো ছিলই না। দীর্ঘদিন পর সিলভার স্ক্রিনে সিনেমা দেখতে এসে সেই তারুণ্যে ফিরে গেলাম। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। আরামদায়ক বসার আসন। উন্নত সাউন্ড সিস্টেম। পরিসর ছোট হলেও সিলভার স্ক্রিনে সিনেমা দেখে মুগ্ধ।’ বলছিলেন নগরের হালিশহর থেকে চট্টগ্রামের প্রথম সিনেপ্লেক্স সিলভার স্ক্রিনে স্বপরিবারে সিনেমা দেখতে আসা ব্যবসায়ী হামিদুর রহমান। গত বছরের ১৬ আগস্ট নগরের ২ নম্বর গেইট ফিনলে স্কয়ারে যাত্রা শুরু হয় সিনেপ্লেক্স : সিলভার স্ক্রিন। সাড়া ফেলে চট্টগ্রামের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মধ্যে। এবার ঈদ-আনন্দেও চট্টগ্রামের লোকজনের জন্য বাড়তি বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে যুক্ত হয়েছে এ সিনেপ্লেক্সটি। যেখানে প্লাটিনাম ও টাইটানিয়াম নামে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির দুটি হল রয়েছে। অর্থাৎ একই সময়ে দুই পর্দায় আলাদা আলাদা সিনেমার প্রদর্শনীর ব্যবস্থা রয়েছে। দুটি হলের একটিতে রয়েছে উন্নত ও আরামদায়ক আসনব্যবস্থা, অন্যটিতে যুক্ত আছে রিক্লাইনিং আসনব্যবস্থা (শোয়ানো যায় এমন)। দুটি হলেই রয়েছে ডিজিটাল সাররাউন্ড ৭.১ সাউন্ড সিস্টেম। গত ১৯ জুন মঙ্গলবার সিলভার স্ক্রিনে নিজের অভিনীত সিনেমা ‘নোলক’ দেখেন অভিনেত্রী ইয়ামিন হক ববি।
সিলভার স্ক্রিন সিনেপ্লেক্সে সিনেমা উপভোগের পর দর্শক অভি আদিত্য বলেন, ‘সিলভার স্ক্রিনের স্ক্রিন ও সাউন্ড কোয়ালিটি খুবই মানসম্মত। সিনেমা হলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আচরণও খুব ভালো। তবে দর্শকদের জন্য সিট ও হল আরও বাড়ানো দরকার। চট্টগ্রামের সিনেমাপ্রেমীদের জন্য মাত্র দুটো হল খুবই অপ্রতুল।’
বন্ধুদের নিয়ে সিনেমা দেখতে এসেছিলেন রেজোয়ান রাজু। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রজন্মের কাছে সিনেমা হল মানে ছিল যত্রতত্র পানের পিক। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ। ভাঙা চেয়ার। ছারপোকা। উৎকট গন্ধ। সিলভার স্ক্রিন সে ধারণা পাল্টে দিয়েছে। এখানে নান্দনিক পরিবেশে আরামদায়ক আসনে বসে সিনেমা উপভোগ করেছি। তবে দর্শকদের ওয়েটিংয়ের পরিসরটি আরও বড় করা দরকার। এ ছাড়া লাইনে দাঁড়িয়ে টিকেট কেটে ছবি দেখা খুবই বিরক্তিকর। অনলাইনে টিকেট কাটার ব্যবস্থা করা হলে খুবই ভালো হয়।’
সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, সিলভার স্ক্রিনের নজরকাড়া পরিবেশ। হলে প্রবেশ করতেই চকচকে মেঝে চোখে পড়ে। একপাশে একটি টিকেট কাউন্টার। চার পাশেই নানা রঙের পোস্টার। রয়েছে কয়েকটি স্ক্রিন। যেখানে হলে প্রদর্শন হওয়া সিনেমার অংশবিশেষ দেখানো হচ্ছে। হলের সামনে স্বল্পপরিসরের জায়গা। যেখানে বসার ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে চকচকে ওয়াশরুমও। প্লাটিনাম হলে প্রবেশ করে দেখা গেল, উন্নত ও আরামদায়ক আসনব্যবস্থা। টাইটানিয়ামের আসনগুলোও নজরকাড়া। রিক্লাইনিং সিটগুলোতে যেকেউ সুইচ টিপেই শুয়ে কিংবা কাত হয়ে উপভোগ করতে পারবেন সিনেমা। আসনে থাকা সুইচ টিপে অর্ডার করা যাবে খাবারও।
সিলভার স্ক্রিনের অন্যতম উদ্যোক্তা ফারুক আহমেদ বলেন, ‘প্রায় এক বছর আগে যাত্রা শুরু করেছে সিলভার স্ক্রিন। এর মধ্যে চট্টগ্রামের সিনেমাপ্রেমীদের মধ্যে ভালো সাড়া ফেলেছে। তবে আমাদের দেশীয় ছবির প্রতি দর্শকদের আগ্রহ কম দেখা যাচ্ছে। দেবী যেভাবে সাড়া ফেলেছিল, গত এক বছরে অন্য কোনো সিনেমা সেভাবে সাড়া ফেলেনি। কনটেন্ট ভালো না হলে দর্শকরা আগ্রহী হন না। তবে বিদেশী সিনেমার প্রতি দর্শকদের আগ্রহ রয়েছে। অ্যাকশন ও হরর টাইপের ছবিগুলো বেশি দেখতে চান তারা। দীর্ঘদিন সিনেমা হলের প্রতি দর্শকদের দূরত্ব ছিল। যার কারণে কাহিনি-নির্ভর সিনেমার প্রতি আগ্রহ কমে গেছে। তবে ভালো কনটেন্টের সিনেমা তৈরি হলে ভালো ব্যবসাও হবে। আমরা ভালো কনটেন্টের অভাবে ভুগছি। এবার ঈদে সিনেমাপ্রেমীদের যথেষ্ট সাড়া পেয়েছি। ঈদের পরদিন থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যা ও বিকেলের শো ছিল হাউজফুল।’
সিলভার স্ক্রিনের কর্মকর্তারা জানান, প্রতিদিন বেলা সাড়ে ১১টা থেকে রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত চারটি প্রদর্শনী (শো) হয়। প্লাটিনামে বাংলাদেশি ছবির মর্নিং ও ম্যাটিনি শোর টিকেটমূল্য ৩৫০ টাকা। প্রিমিয়াম সিট ৫০০ টাকা। বিদেশী ছবির মর্নিং ও ম্যাটিনি শোর টিকেট ৪০০ টাকা। প্রিমিয়াম সিট ৪০০ টাকা। বাংলাদেশি ছবির সন্ধ্যা ও নাইট শোর টিকেট মূল্য ৪০০ টাকা। প্রিমিয়াম সিট ৬০০টাকা। বিদেশী ছবির সন্ধ্যা ও নাইট শোর টিকেট মূল্য ৫০০ টাকা। প্রিমিয়াম সিট ৭০০টাকা।
টাইটানিয়ামে বাংলাদেশি ছবির টিকেট ১ হাজার ২০০ টাকা এবং বিদেশি ছবির টিকেট ১ হাজার ৫০০ টাকা। প্রাথমিকভাবে কাউন্টারে নিয়মিত শো’র টিকিট পাওয়া যাবে। কাউন্টার থেকে এক থেকে পাঁচদিন আগে পর্যন্ত অগ্রিম টিকিট কাটা যায়। পরবর্তীতে অনলাইনেও টিকিট কাটার ব্যবস্থা রাখা হবে। দুটি হলের মধ্যে প্লাটিনামে আসনসংখ্যা ৭০টি। টাইটানিয়ামে আসনসংখ্যা ১৮টি। বর্তমানে হল দুটিতে চলছে বাংলাদেশি ছবি নোলক। বিদেশী ছবির মধ্যে চলছে অ্যাভেঞ্জার : এন্ড গেম, আলাদ্দিন, গডজিলা : কিং অব মনস্টারস ও ডার্ক ফনিক্স।

ঢাকার কাছেই রূপগঞ্জে পাঁচ তরুণের স্বপ্নকানন

রুখসানা মিলি

প্রয়োজন পূরণ করার ‘অজুহাতে’ প্রকৃতিকে ‘প্রায় বিদায়’ করে দিয়ে প্রিয় নগরী ঢাকা হয়ে উঠেছে কংক্রিটের জঙ্গল। প্রতিযোগিতায় ছুটে চলা জীবনের ক্লান্তি ধুয়ে একটু সজীবতা ফিরিয়ে আনতে পারে ফুল-পাখি-আকাশ-সবুজ-খোলা প্রান্তর-নির্জনতা-ভরা প্রকৃতি। ঢাকার খুব কাছেই এমন সব প্রাকৃতিক আয়োজন নিয়ে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে জিন্দা পার্ক।
খোলা সবুজ মাঠের পাশে একটি লাইব্রেরি ভবন। কমিউনিটি স্কুল এবং কমিউনিটি ক্লিনিক, মসজিদ, রেস্টুরেন্ট-সব নির্মাণই সাধারণ তবে অনন্য। গাছের ডালে তৈরি মাঁচানে পা ঝুলিয়ে বসে অনায়াসে কাটিয়ে দেয়া যাবে কিছু সময়। কিংবা ছোট্ট স্বচ্ছ জলের দ্বীপটিতে প্যাডেল বোটে করে নামা বা লেকের পানিতে বোটে ঘুরে বেড়ানো নিঃসন্দেহে আনন্দ দেবে। নানান রকম গাছের সারি, সবুজ ঘাস, রঙ্গনের সারি, মাটির রাস্তা বোলাবে শাস্তির পরশ।
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা রাইসুল ইসলাম জানান, বাচ্চাদের নিয়ে প্রায়ই তারা এখানে আসেন। প্রকৃতির উদারতায় প্রতিবারই ফেরত যান নতুন সজীবতা নিয়ে। ঢাকায় প্রায় বন্দি থাকা সন্তানেরা এখানে এসে পাখির সঙ্গে ফুলের সঙ্গে মেতে ওঠে অপার আনন্দে। মাটি, ঘাসের সঙ্গে ওদের মিতালি আনন্দ দেয় তাকেও।
অনেকে আবার ঘুরতে আসেন দলবেঁধে। এমনকি পিকনিক বা অন্যান্য আয়োজন নিয়ে বড় দলও আসে। উদ্যোক্তারা জানান, সারা বছরই দর্শনার্থীরা থাকেন। তবে ছুটির দিনগুলোতে ভিড় বেশি হয়।
ঢাকার আশেপাশের আরও যেসব রিসোর্ট বা পার্ক গড়ে উঠেছে, সেগুলোর সঙ্গে জিন্দা পার্কের মূল পার্থক্য হলো, এই পার্কটি দর্শনার্থীদের কেবল প্রশান্তি জোগাচ্ছে না, পাশাপাশি হয়ে উঠেছে ওই গ্রামের মানুষের সহায়ও। সমিতির পক্ষ থেকে প্রয়োজন অনুসারে ক্ষুদ্রঋণ দেয়া হয়। শিশুদের জন্য পড়ার ব্যবস্থাও রয়েছে ওখানকার স্কুলটিতে।
আশির দশকে মাত্র ৬০টাকা পুঁজি আর আশেপাশের মানুষের জীবনের ইতিবাচক পরিবর্তনের ছোঁয়া আনার স্বপ্ন নিয়ে পাঁচ কিশোরের হাত ধরে যাত্রা শুরু করে ‘অগ্রপথিক ­পল্লী সমিতি’। সেই পাঁচ কিশোরের সংগঠনের উদ্যোগেই এখন গড়ে উঠেছে ১০০ বিঘার এই ‘শান্তি কানন’।
জিন্দা পার্কের স্বপ্নদ্রষ্টা তবারক হোসেন কুসুম জানান, শান্তিনিকেতনের আদলে এই পার্কের নাম রাখার পরিকল্পনা ছিল : শান্তি কানন। তবে গ্রামের নামানুসারে আশেপাশের লোকের দেয়া নামেই পার্কটি ‘জিন্দা পার্ক’ নামে পরিচিত পেয়েছে।
পার্কটিকে ঘিরে যে জিন্দা গ্রামের দেখা পাওয়া যাবে, তাকে আদর্শ গ্রাম বলা যায়। সামাজিক উদ্যোগে বদলে যাওয়ার উদাহরণ এই গ্রামটি। কুসুম বলেন, ‘ব্যক্তিগত উদ্যোগে আমরা এভাবে এগিয়ে চলেছি। সরকারি উদ্যোগ থাকলে আরও বিস্তৃত হওয়া সম্ভব।’ সারাদেশে একই আদলে এগিয়ে গেলে সব গ্রামই আদর্শ গ্রাম হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
জিন্দা পার্কে রয়েছে ২৫০ প্রজাতির ২৫ হাজারেরও বেশি গাছ। আছে হরেক রকম ফুলের সমারোহ। নানা পাখির বাস এই পার্কে। তবে শীতে আসে অনেক অতিথি পাখি। সব মিলিয়ে পাখিদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে পার্কটি।
পার্কটিতে আছে একটি রেস্টুরেন্ট। ‘মহুয়া স্ন্যাকস অ্যান্ড মহুয়া ফুড’ নামের এই রেস্টুরেন্টে দর্শনার্থীরা পাবেন দেশীয় সব খাবার।
পার্কে ঢুকতে চাইলে ১০০ টাকা দিয়ে টিকিট কাটতে হবে। আছে পর্যাপ্ত পার্কিং-ব্যবস্থাও। পার্কের অবস্থান নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে। ব্যক্তিগত গাড়ি না থাকলে পূর্বাচল ৩০০ফিট রাস্তার কুড়িল বিশ্বরোড থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা দিয়ে যাওয়া যাবে। সময় লাগতে পারে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট। এ ছাড়াও রয়েছে বিআরটিসির বাসে যাওয়া-আসার ব্যবস্থা।

ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব

সোহরাব শান্ত

প্রথমবারের মতো যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে বুড়িগঙ্গা নদীতে ক্যাবল কার নির্মাণের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ভারতীয় একটি প্রতিষ্ঠানের এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব দেওয়ার পর বুড়িগঙ্গার সদরঘাট এলাকায় ক্যাবল কার নির্মাণের চিন্তা করছে সরকার। তবে এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ক্যাবল কার নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাই বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র বলছে, ক্যাবল কার নির্মাণ হলে বুড়িগঙ্গা নদীর দুই পাশে বসবাসকারী বাসিন্দাদের যোগাযোগ-দুর্ভোগ কমবে, পাশাপাশি কমবে নদীপথে পারাপারে দুর্ঘটনাও। বর্তমানে নৌকায় নদী পারাপারে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়াও পর্যটনে গুরুত্ব বাড়বে বুড়িগঙ্গার।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ভারতের কলকাতাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কনভেয়ার ও রোপওয়ে সার্ভিসেস লিমিটেড এরই মধ্যে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ে প্রাথমিক প্রস্তাব জমা দিয়েছে। ভারতের একটি প্রতিনিধি দল গত ১৯ মার্চ সদরঘাট-এলাকা পরিদর্শন শেষে ২০ মার্চ নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। ওই বৈঠকে কনভেয়ার ও রোপওয়ে সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখর চক্রবর্তীর নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল ‘এরিয়াল রোপওয়ে সিস্টেম’ নামে ক্যাবল কার নির্মাণের বিষয়ে একটি প্রেজেন্টেশন দেন। বৈঠকে নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী ও সচিব মো. আবদুস সামাদ উপস্থিত ছিলেন।
ঢাকা যানবাহন সমন্বয় বোর্ডের সঙ্গেও বৈঠক করে প্রতিনিধি দলটি। ওই সভায় প্রস্তাব দেওয়া হয়, ক্যাবল কারের সেবা কোনো ধরনের বিপত্তি ছাড়াই তারা সদরঘাট থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারবেন।
এদিকে ৩০ মার্চ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখর চক্রবর্তী নৌ-পরিবহন সচিবের কাছে তাদের প্রস্তাব সংবলিত চিঠি দেন। তবে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ ধরনের প্রস্তাব অনানুষ্ঠানিক, বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প-প্রস্তাব অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মাধ্যমে আসতে হবে।
নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আবদুস সামাদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের ক্যাবল কার নির্মাণের একটা প্রস্তাব পেয়েছি। আমরা এটা পরীক্ষা করে দেখব। কারণ বুড়িগঙ্গার ওপর ক্যাবল কার নির্মাণের বিষয়ে আমাদেরও আগ্রহ রয়েছে। তবে সম্ভাব্যতা যাচাই করে যদি আমরা দেখি এটা করা যুক্তিযুক্ত এবং কারিগরি-বিশেষজ্ঞরা যদি মত দেন, তখনই এ বিষয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নেব।’
সূত্র আরও জানায়, সদরঘাটে নানা ধরনের সমস্যা রয়েছে জানিয়ে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানটি প্রস্তাবে বলেছে, সদরঘাট দিয়ে বিপুলসংখ্যক যাত্রী বিশৃঙ্খলভাবে নদী পার হন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লঞ্চে করে যাত্রীরা সদরঘাটে আসেন।
প্রস্তাবে আরও বলা হয়, আমরা মনে করি, যারা নদী পার হন কিংবা সদরঘাট দিয়ে দূর-দূরান্তে যান; সার্বিক এ ব্যবস্থা পৃথক হওয়া উচিত। এ ছাড়া দেখা গেছে, নদী পার হতে গিয়ে ডিঙি নৌকা উল্টে হতাহতের ঘটনাও ঘটে। বুড়িগঙ্গার দুই তীর ক্যাবল কারের মাধ্যমে সংযুক্ত করলে তা প্রতিদিনের যাত্রী পারাপার সহজ করবে এবং নদী ও নদীর তীর পরিস্কার রাখতে সহায়ক হবে। টার্মিনালগুলো দূরপাল্লার লঞ্চ ভেড়া ও ছেড়ে যাওয়ার জন্য নিরাপদ রাখা যাবে।
টুইন রোপওয়ে সিস্টেমের মাধ্যমে সদরঘাটকে সিমসন ঘাট ও লালকুঠি ঘাটের সঙ্গে সংযুক্ত করার প্রস্তাব দিয়ে চিঠিতে আরও বলা হয়, ক্যাবল কারে যাত্রী ওঠানো ও নামানোর জন্য দু’প্রান্তে বহুতল বিশিষ্ট কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হবে।
জরিপ কার্যক্রমের পর অনুমতি-সাপেক্ষে তিন সপ্তাহের মধ্যে প্রজেক্ট রিপোর্টের সঙ্গে প্রাক্কলিত প্রকল্প-ব্যয়ের হিসাবও দাখিল করার কথা বলা হয়েছে প্রস্তাবে। প্রতিষ্ঠানটি একটি সার্ভেরও প্রস্তাব দিয়েছে চিঠিতে।
নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) ভোলা নাথ দে বলেন, ‘বিদেশিদের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়ার পদ্ধতি হলো, অর্থনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকলে প্রস্তাব অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মাধ্যমে আসতে হয়। এ ছাড়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমেও আসতে পারে। প্রস্তাব আসলে প্রথম যে কাজটা হয়, এটার একটা ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি (সম্ভাব্যতা যাচাই) করা হয়। নৌপথ আমাদের, তাই আমরা যদি রোপওয়ে করি, তাহলে সেটা সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় নাকি আমাদের অধীনে হবে-এ বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয় থাকবে।’
নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘সদরঘাটে নৌকায় যাত্রী পারাপারে মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনা ঘটে। নৌকা উল্টে যায়, বড় বড় লঞ্চের সঙ্গে ধাক্কা লেগে হতাহতের ঘটনা ঘটে। এ সমস্যাগুলো দূর করার জন্যই মূলত ক্যাবল কারের কথা বলা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘তবে ক্যাবল কারের নিরাপত্তার বিষয় আছে। এটা ইংল্যান্ড কিংবা ইউরোপ নয় যে কয়েকজন পর্যটক এটাতে চড়বে। সদরঘাটে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ হাজার গার্মেন্টেসের কর্মী এপার-ওপার যায়। এ ছাড়া এ নদী দিয়ে বড় বড় জাহাজ আসা-যাওয়া করে। বাল্কহেড (বালুবাহী কার্গো) চলে। নৌকা বন্ধ করে রোপওয়ে করলে কতগুলো রোপওয়ে লাগবে। সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের যুগে ফলদায়ক হবে না-এমন কিছু তো করা যাবে না। আমি তো ইকোপার্কের জন্য রোপওয়ে করছি না।’
ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, ‘মানুষ এখন নৌকায় ১০ টাকায় পার হচ্ছে, রোপওয়েতে কত নেয়া হবে? খরচ বেশি হলে তো মানুষ উঠবে না। পাহাড় থাকা দুর্গম এলাকায় সাধারণত ক্যাবল কার দেখা যায়। সেখানে সদরঘাটের মতো এত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় রোপওয়ের স্থাপনা কীভাবে হবে, সেটাও একটা চ্যালেঞ্জ।’

কারিকা প্রতিবেদক

বর্ষার শুরুতেই রাজধানীতে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। শুধু বর্ষা নয়, বছরের অন্য সময়েও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃষ্টিপাত বাড়লে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। এ কারণে এখনই ডেঙ্গু মোকাবেলায় সচেতন না হলে তা মহামারি আকার ধারণ করতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিসংখ্যান বলছে, এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুনের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত রাজধানীতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ২৯৫ জন, যা গত দুই বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। ঘটেছে মৃত্যুও। এদিকে জুনের প্রথম সপ্তাহেই ৫৫ জন আক্রান্ত হওয়ার নিশ্চিত খবর পাওয়া গেছে। তবে এখনও ডেঙ্গুর প্রকোপ মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছায়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, গতবারের তুলনায় এবার এডিস মশার এবং চিকুনগুনিয়ার জীবনু বিস্তারকারী মশার জন্মহার বাড়ছে। ফলে এ বছর ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়ার প্রকোপ আগের বছরের চেয়ে বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্ষাকাল পুরোপুরি এলে এবং বৃষ্টির হার বাড়লে এটির প্রকোপ আরও বাড়বে বলে তারা মনে করেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে এখনই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এক হয়ে কাজ করতে হবে। এখনই ব্যবস্থা নিয়ে এডিস মশার প্রকোপ কমাতে না পারলে বর্ষায় এটি মহামারি আকার ধারণ করতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসাব বলছে, ২০১৮ সালের প্রথম পাঁচ মাস পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা ছিল ১৩৩ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ বিভাগের পরিচালক সানায়া তাহমিনা বলেছেন, জরিপে তারা দেখেছেন ঢাকায় বাসাবাড়িতে ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়ার জীবাণুবাহী এডিস মশা জন্মের হার বাড়ছে এবং এর ফলে এ-বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ আগের চেয়ে বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সানায়া তাহমিনা বলেন, ‘আমরা বছরে তিনবার এই জরিপ করি। একটা প্রি-মনসুন মানে বর্ষা শুরু হওয়ার আগে, একটি বর্ষা মৌসুমে এবং আরেকটি বর্ষার পরে। মার্চে যে প্রি-মনসুন জরিপ চালিয়েছি, তাতে দেখা গেছে, এডিস মশার লার্ভার ঘনত্বের সূচক ঢাকায় এখন ২২ শতাংশ।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই সূচকের মানে হলো, এডিস মশার প্রতি একশটি প্রজনন উৎসের মধ্যে কতটিতে এডিস মশার লার্ভা রয়েছে। এখন যদি ২০টিতে মশার লার্ভা পাওয়া যায় তাহলে সেটাকে বিপজ্জনক বলে ধরা হয়।’
‘জরিপে সেটা ২২ শতাংশ, মানে এটা এখন বিপজ্জনক সীমারও বেশি। আর যেহেতু এই জরিপ বর্ষা শুরুর আগে, ফলে বর্ষা শুরু হলে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার খুবই আশঙ্কা রয়েছে।’ যোগ করেন তাহমিনা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ঢাকার দুটি সিটি কর্পোরেশনের ৯৭টি ওয়ার্ডের ১০০টি জায়গায় জরিপ চালিয়েছে। এসব এলাকার প্রায় এক হাজার বাড়ি ঘুরে নমুনা সংগ্রহ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মীরা। এর মধ্যে নির্মাণাধীন বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং এবং পুরনো ভবনসমূহে জরিপ চালানো হয়েছে।
সানায়া তাহমিনা জানিয়েছেন, জুন মাসের প্রথম আটদিনেই ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু-আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ৪৬জন রোগী। তিনি মনে করেন, হাসপাতালে ভর্তি রোগীর বাইরেও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত আরও অনেক মানুষ রয়েছেন যারা অনেক সময় চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে ভর্তি হন না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরিপে দেখা গেছে, দুই সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়ার ঝুঁকিতে বেশি আছে ঢাকা দক্ষিণ। দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ১৫টি ওয়ার্ডে এডিস মশার লার্ভা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, উত্তর সিটি কর্পোরেশনে সাতটি ওর্য়াডেও এ ঘনত্ব নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকার ডেঙ্গুর প্রজনন মৌসুম ছাড়াও বছরব্যাপী নানামুখী উদ্যোগ নিয়ে থাকে। এর মধ্যে এডিস মশা ঠেকাতে গাপ্পী মাছের পোনা ড্রেনে ছাড়ার মতো অভিনব উদ্যোগও নিয়েছিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন। এরপর এডিস মশা মারতে পুরুষ এডিস মশা আমদানির পরিকল্পনার কথাও শোনা গিয়েছিল।
জুন-জুলাই মাস ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার প্রজনন মৌসুম। এ সময় থেমে থেমে বৃষ্টিপাতের কারণে বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টির পানি জমে থাকে। জমে থাকা পরিস্কার পানিতে এডিস মশার জন্ম হয়। তাই এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতন হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বাসা-বাড়ির আশপাশে কোথাও যেন পানি জমে না থাকে সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকার আহŸান জানিয়েছেন তারা। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবজনিত কারণে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। এটি রোধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়া হলে এ বছর ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া মহামারি আকার ধারণ করতে পারে।

0 67

মির্জা মাহমুদ আহমেদ
ঘুম মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ অংশ। সেই সঙ্গে বিছানা ও শোবার ঘর মানুষের জীবন যাপনের অন্যতম অনুসঙ্গ। সময়ের বিবর্তনে মানুষ বনচারী থেকে নগরবাসী হয়ে উঠেছে সেই সাথে বিছানা ও শোবার ঘরে এসেছে পরিবর্তন। শোবার ঘর বা বিছানার অতীত ইতিহাস অনুসন্ধান করলে বিভিন্ন গোত্র, সমাজ, রাজপরিবার ও বিত্তশালীদের ঐতিহ্য, প্রথা, বিশ্বাস ও আভিজ্যাতের খোঁজ পাওয়া যায়।
প্রাচীন যাযাবর গোত্রের লোকেরা যেখানে ঘাস এবং পশুর চামড়ার ওপর নিজেদের বিছানা বানাতো সেখানে বর্তমানে আরামদায়ক শোবার ঘর ও বিছানা তৈরিতে নতুন নতুন ধারণা এবং প্রযুক্তির সন্নিবেশ ঘটানো হচ্ছে। অতীতের সমাজবদ্ধ ধারণার বিপরীতে বতর্মানে শোবার ঘর তৈরিতে গোপনীয়তা বা প্রাইভেসীকে অধিকতর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। ঘুমের মতো আটপৌরে একটি কাজকে আরামদায়ক করতে বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির উৎকর্ষতা এবং উন্নত ধ্যান ধারণাকে কাজে লাগানো হচ্ছে। চলুন জেনে নেয়া যাক আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাপনে আষ্টে পৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা বিছানা ও শোবার ঘরের সাতকাহন।
পৃথিবীর প্রাচীনতম বিছানা
দক্ষিণ অফ্রিকার সিবুদুর গোত্রের লোকেরা ৭৭ হাজার বছর আগে স্যাজ নামক সামুদ্রিক ঘাস থেকে বিছানা তৈরি করতেন, এমন প্রমাণ প্রত্নতাত্ত্বিকরা পেয়েছেন।
সুগন্ধযুক্ত স্যাজ ঘাসগুলিতে একটি মনোরম গন্ধ আছে যা প্রাকৃতিক কীটনাশক হিসেবে কাজ করে। মশা এবং অনান্য পোকামাকড় থেকে রক্ষা করে। লম্বা ঘাস দিয়ে বোনা বিছানাগুলো ম্যাটের মতো ব্যবহার করা হতো। সামুদ্রিক ঘাস স্যাজ থেকে বানানো বিছানাগুলো এত কার্যকর ছিলো যে লোকে এখনও বিছানা বুনতে এই ঘাস ব্যবহার করে থাকে। প্রত্নতত্ত্ববিদরা ধারনা করছেন সিবুদুর গোত্রের লোকেরা বসতি স্থানান্তর করার সময় বিছানাগুলো পুড়িয়ে ফেলেছিল। প্রত্নতত্ত্ববিদরা মনে করছেন সম্ভবত এলাকাটি পরিস্কার রাখতে এবং কীট ও জৈব পদার্থ থেকে মুক্ত রাখতে এমনটি করা হয়েছিল।
৭২০০ বছর আগে চীনে হওকিয়াং নামে একটি বিছানার ব্যাপক প্রচলন ছিলো। হওকিয়াং নামের বিছানাগুলোতে পাথর আগুনে গরম করে তারপর মাথার নিচে বালিশ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। প্রত্নতত্ত্ববিদরা ধারণা করেন প্রস্তর যুগের সময় এই ধরনের বিছানার প্রচলন ছিলো। ঠিক এর কাছাকাছি সময়ে ক্যাং নামের আরেক ধরনের বিছানা চীনে ব্যবহার করা হতো। যাতে একটি কঠিন পৃষ্ঠের উপরে আগুন জ্বালানো হতো এবং ঘুমানোর আগে ধুয়ে পরিস্কার করা হতো। একটি পাথর খন্ড তাপ ব্যবহার করে গরম করে পরে সেখানে বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখা হতো। যাতে পাথরের নিচে আগুন প্রজ্জলিত থাকতে পারে। সে সময়ের নতুন এই প্রযুক্তিকে কাং বলা হতো। এখনও চীনের কিছু অংশে কাং প্রযুক্তির বিছানা দেখতে পাওয়া যায়। প্রজ্জলিত আগুন থেকে উৎপন্ন তাপ ঘরের একাধিক কাজে ব্যবহার করা হতো। এই আগুন থেকে খাবার রান্না করা, গরম করা ছাড়াও রাতে আরামদায়ক ঘুমের জন্য ব্যবহৃত হতো।

প্রাচীন সমাজের শোবার ঘর ও বিছানা
প্রাচীন মিশরীয়রা বিছানাসহ তাঁদের বেশিরভাগ আসবাবে কাঠ ও কাপড় ব্যবহার করতেন। বেশিরভাগ কাঠের জোগান আসতো তাঁদের প্রতিবেশি দেশ থেকে। আমদানী করা বেশিরভাগই কাঠই ছিলো খোদাইকৃত নকশাকরা। প্রাচীন আসবাবের কিছু আজো মিশরে টিকে আছে। মিশরের প্রাচীন বিছানাগুলোর সাথে বর্তমান সময়ের বিছানার সাদৃশ্য পাওয়া যায়। প্রাচীন বিছানাগুলো আয়তক্ষেত্রকার কাঠামোযুক্ত ছিল যা একটি ছিদ্রযুক্ত প্লাটফর্মের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। বিছানার পায়ার কারুকার্য এবং অনান্য মূল্যবান সজ্জাকরণ উপাদানের ব্যবহার বিছানা ব্যবহারকারীর সামাজিক অবস্থান প্রকাশ করতো। বিছানার চারপাশে নকশাদার জমকালো পর্দা থাকতো। বালিশগুলো লিলেন কাপড়ে মোড়ানো থাকতো। প্রাচীন আমলের বিছানাগুলো অনেক উচু হতো বিধায় মিশরীয়রা বিছানায় উঠতে নামতে সিড়ি ব্যবহার করতো। সিড়িটি বিছানার পাদদেশ জুড়ে অবস্থান করতো।
প্রাচীন রোমানদের বিছানাগুলো জীবনের নানাক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো। বিছানার বহুবিধ ব্যবহারের জন্য তারা বিখ্যাত ছিলো। রোমানদের বিছানাগুলো শুধুমাত্র ঘুমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো না। ঘুমানোর জন্য ব্যবহৃত চেম্বার বিছানা আরও নানা কাজে ব্যবহার করা হতো। রোমানীয়রা খড় কিংবা পাখির পালক দিয়ে বালিশ বানাতো।
কিছু রাজকীয় রোমান পরিবারে লেকট্যাস জিনিয়ারেস নামক একটি বিশেষ বিছানা ছিলো। সেই বিছানা শুধুমাত্র বাসর রাতেই ব্যবহার করা হতো। প্রতীকী এই বিশেষ বিছানা মূল শয়নকক্ষে স্থাপন করা হতো। রোমানীয়রা খাওয়া এবং পড়াশোনার জন্য আলাদা আলাদা বিছানা ব্যবহার করতো। মৃতদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করতে পিয়ারে নিয়ে যাওয়ার জন্য রোমানীয় সমাজে লেকটাস ফ্যানেরবিস নামক এক বিশেষ ধরনের বিছানার প্রচলন ছিলো।
বিছানা ও শোবার ঘর নিয়ে পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর হাজারো গল্প আছে বলার মতো।
কয়েকটি আদিবাসী সম্প্রদায় এখনো তাঁদের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী বিছানা ও শোবার ঘরের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। সময়ের বির্বতনের সঙ্গে এশিয়ার কিছু আদিবাসী সম্প্রদায় তাঁদের বিছানা ও শোবার ঘরের উলে­খ্যযোগ্য পরিবর্তন ঘটিয়েছে।
আধুনিক জীবনযাপনের মিশেলে আদিবাসীদের জীবনাচরণ, ঐতিহ্যবাহী বাড়ি ঘরের স্থাপত্য নকশায় যেমন পরিবর্তন এসেছে ঠিক তেমনি করে বিছানা ও শোবার ঘরের পরিবর্তনও চোখে পড়ার মতো।
বিছানা এবং শোবার ঘরের ইউরোপীয় ইতিহাস
আর্কিটেকচার, আসবাবপত্র এবং টেক্সাটাইল ডিজাইনে আমেরিকানরা ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের উপর নির্ভরশীল ছিলো। এমনকি আজও আমাদের বাড়ি ঘরের নকশা ও সাজ সজ্জায় ইউরোপীয় প্রভাব লক্ষ্য করা যায় । তাই আজ আমরা যে আর্দশ আমেরিকান শোবার ঘরের গল্প শুনতে পাই তাঁর সূচনা অনেক আগেই ইউরোপে হয়েছিলো।
ইউরোপের বিছানা ও শোবার ঘরের বিকাশ জানতে হলে ঘুরে আসতে হবে মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ডের ইতিহাস থেকে।
মধ্যযুগীয় বিছানা এবং শোবার ঘর (৫ম থেকে ১৫শ শতক)
মধ্যযুগীয় সমাজে শোবার ঘরের গোপনীয়তা অতটা গুরুত্ব পেত না। সে সময় সম্প্রদায়কে শক্তিশালী রাখতে সংখ্যাগরিষ্ঠার ওপর জোর দেয়া হতো। সম্প্রদায়ের লোকেরা গ্রেট হলের চারপাশে বা আশেপাশে জীবিকা নির্বাহে নিয়োজিত থাকতেন। মধ্যযুগে রাজকীয় প্রাসাদ, উন্নত দুর্গ অথবা একটি বড় ম্যানর হাউজের বড় বা প্রধান ঘরকে গ্রেট হল বলা হতো।
খাদ্য প্রস্তুত থেকে শুরু করে রান্না, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিয়ে, জন্ম, মৃত্যু এবং ঘুম সব কিছুই এই গ্রেট হলের মধ্যেই সম্পন্ন হতো। গ্রেট হলের সুরক্ষিত আঙ্গিনায় চলতো প্রতিদিনের রুটিন মাফিক কাজকর্ম। যখন রাত নামতো তখন সবাই গ্রেট হলে বিছানা পেতে ফায়ার প্লেসের চারপাশে ঘুমাতো। সে সময় বিছানা হিসেবে রাশ নামের এক প্রকার নরম ঘাস ব্যবহার করা হতো। কিছু লোক বালিশ হিসেবে খড় ব্যবহার করতো আবার কেউ কেউ কাঠের টুকরো ব্যবহার করতো। রাতে ফায়ারপ্লেস থেকে যাতে আগুন ছিটকে আসতে না পারে সেজন্য ফায়ারপ্লেস ঢেকে রাখা হতো।
রাজা এবং রানী ওপরের তলায় বসবাস করতেন। রাজার পরিবারের সদস্য, নিকট বন্ধু এবং দাস দাসীদের জন্যও ওপরের তলায় ঘর সংরক্ষিত ছিলো। যদিও ওপরতলার সংরক্ষিত ঘরগুলো সেসময় কিছুটা গোপনীয়তার ধারণা দিয়েছিল। ওপরতলার সংরক্ষিত ঘরগুলো ব্যবসা-বানিজ্য, বিবাহ এর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য আর্দশ জায়গা ছিলো। ওপরের তলায় একটি আধুনিক ভিআইপি লাউঞ্জের মতো জায়গা ছিল, সেখানে শুধু বিশেষ ব্যাক্তিরাই প্রবেশ করতে পারতেন। বিশেষ ঘরগুলোতে কেবলমাত্র বিশেষ ব্যাক্তিদেরকে থাকার এবং ঘুমানোর জন্য আমন্ত্রণ জানানো হতো। এখানো উলে­খ্যযোগ্য যে ভিআইপি লাউঞ্জ সদৃশ্য ঘরটিতে সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষমতাবান এবং আধিপত্য বিস্তারকারী ব্যাক্তিবর্গ প্রবেশ করতে পারতেন। ঘরটিতে প্রবেশের জন্য সম্প্রদায়ের মধ্যে আধিপত্যের লড়াই ও প্রতিযোগিতা চলতো বলেও ধারণা করেন প্রত্নতত্ত্ববিদরা।
ভিআইপি লাউঞ্জ সদৃশ্য ঘরটিকে সম্প্রদায়ের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে দেখা হতো। ব্যবসার আলোচনার জন্য অথবা বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার জন্য ওই ঘরটি ব্যবহার করার অনুমতি পাওয়া গেলে সেটি অসাধারণ সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
ওপরের তলার শোবার ঘরগুলোতে ব্যবহৃত বিছানা এবং সাজসজ্জা বেশ ব্যয়বহুল ছিলো। খড়, পাখির পালক এবং কাপড় দিয়ে তৈরি চার স্তরের গদি সম্বলিত বিছানা তৈরিতে কারিগরদের কঠোর পরিশ্রম করতে হতো।
সেই সময়ে রাজা-রাণী তাঁদের বিছানায় একান্তে সময় কাটাতেন। আসবাবপাত্র ও বিছানার সাজসজ্জায় সে সময় বিপুল পরিমান অর্থ ব্যয় করা হতো। মধ্যযুগীয় ওই সময়টাতে ইংল্যান্ডে প্রচুর যুদ্ধ হতো এবং ক্রমাগত মুকুট পরিবর্তনের ঘটনা ঘটছিলো। রাজারা সে সময় প্রায়ই যুদ্ধক্ষেত্রে অবর্তীণ হতেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁদের বিছানাও নিয়ে যাওয়া হতো। এবং এগুলো দেখাশোনার জন্য বিপুল পরিমান দাস-দাসী নিয়োগ দেয়া হয়েছিলো।
লর্ড চেম্বারলাইন এমন একটি শোবার ঘর ও বিছানা দেখাশোনার দায়িত্বে প্রধান দাস হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। এই পদটি এতই বিশেষ মর্যাদা সম্পন্ন ছিলো যে, এই পদটিকে রাজার ব্যাক্তিগত সচিব পদমর্যাদার সমমান গণ্য করা হতো। শোবার ঘর ও বিছানা দেখাশোনার প্রধান দাসের পদটি এখনো ইউরোপের অনেক রাজ পরিবারে বহাল আছে।
১৬ তম শতকের টিউডার বিছানা ও শোবার ঘর (১৪৮৫-১৬০৩)
মধ্যবিত্ত শ্রেনীর জন্য সময়টা পরিবর্তিত হচ্ছিল ।সে সময়ে মধ্যবিত্তরা উচ্চবিত্তদের দেখাদেখি নিজেদের বাড়িতে ওপরের তলার ঘরে বসবাস শুরু করতে লাগলেন। উচ্চবিত্তদের তুলনায় মধ্যবিত্তদের শোবার ঘরের সাজসজ্জা সাধারণ-ই ছিলো বলা চলে। সাধারণত মধ্যবিত্তদের বিছানার সাথে কাপড় রাখার জন্য একটি চাকাওলা সিন্দুক সংযুক্ত থাকতো।
উচ্চবিত্তদের মতো মধ্যবিত্তরাও জন্ম, বিয়ে, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সামাজিক ও জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে শোবার ঘরের ব্যবহার বাড়াতে লাগলো। শোবার ঘরে জন্ম ও মৃত্যুর মতো অবধারিত ঘটনা একই সময়ে ঘটতে লাগলো। তিন সন্তানের জন্ম দিয়ে শোবার ঘরে মায়ের মৃত্যু সেসময় টিউডারবাসীর মনে বেশ দাগ কেটেছিলো। টিউডার সম্রাট অষ্টম কিং হেনরির জন্য শয়নকক্ষ শুধুমাত্র আরাম করার জায়গা হিসেবে বিবেচিত হতো না।
বরং পরবর্তী প্রজন্ম জন্মদানের ক্ষেত্রে শয়নকক্ষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলো। মুকুটের উত্তরাধিকার নির্ধারনে শোবার ঘর এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল যে, অনেক সময় শোবার ঘরের সফলতার উপর ভিত্তি করে মুকুটের ভাগ্য নির্ধারিত হতো।
রাণী তার শোবার ঘরে বিশ্বস্ত দাসীদের নিয়ে নিজস্ব বিচারালয় পরিচালনা করতেন। শোবার ঘরের অভ্যন্তরে স্থাপিত বিচারালয়ে কাজ করার সুযোগ পাওয়া দাস-দাসীরা বিশেষ সম্মানে ভূষিত হতেন। রাজা বা রাণীর কাছাকাছি থাকার পাশাপাশি তারা বিচারকার্য সরাসরি প্রত্যাক্ষ করার সুযোগ পেতেন।
মধ্যবিত্ত শ্রেনীর বিছানা অত্যন্ত মূল্যবান ছিলো। পরিবারের আয়কৃত এক-তৃতীয়াংশ সম্পদ তারা বিছানার পেছনে ব্যয় করতো। এই কারনে প্রজম্মের পর প্রজন্ম একই বিছানা ব্যবহার করা হতো।
টিউডার সময়কালে শোবার ঘরে গোপনীয়তা তখনও গুরুত্বপূর্ণ কোন ইস্যু হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়নি। সে সময়ে শোবার ঘরে অতিথী ও প্রতিবেশীদের অবাধ যাতায়াত ছিলো। টিউডার সময়কালের শেষভাগে বাচ্চাদের জন্য চাকাযুক্ত বিশেষ বিছানার প্রচলন শুরু হয়। এই সময়কালে শোবার ঘরকে নাগরিকরা নিজেদের জীবন যাত্রার অংশ ভাবতে শুরু করলেন। টিউডার রাজবংশীয় লোকেদের জীবন ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কারে ভরা ছিলো। রাত সবসময় তাঁদের কাছে ভীতিকর বলে বিবেচিত হতো। রাতকে ভীতিমুক্ত রাখতে টিউডার সম্প্রদায়ের লোকেরা নানারকম লোকো আচার ও প্রথা মেনে চলতেন।

১৭ শতকের স্টুয়ার্ট বিছানা ও শোবার ঘর (১৬০৩-১৬৮৮)
১৭ শতকে কী শাসকগোষ্ঠী কী মধ্যবিত্ত সকলের মাঝেই শোবার ঘরকে বিশেষায়িত করার একটা প্রবনতা লক্ষ্য করা যায়। এজন্য বাড়ির একটি বড় অংশজুড়ে শোবার ঘর বানাতো হতো। এই সময়কালে অনান্য ঘর থেকে শোবার ঘরকে আলাদা করার প্রচলন শুরু হয়। দম্পতিদের জন্য আলাদা শোবার ঘরের ধারণাটাও এই শতক থেকে চালু হয়। ১৭ শতকের শোবার ঘরগুলো শুধু শোবার ঘর হিসেবেই ব্যবহৃত হতো। ওই সময় শোবার ঘরে ড্রেসিং টেবিল, আলমিরা অথবা ওর্য়াডোব এর মতো প্রয়োজনীয় আসবাব ছিলো না। রাজা-রাণীরা শোবার ঘরের বাইরে একটা সাধারণ কক্ষে পোষাক পরিচ্ছদ বদল করতেন। ১৭ শতকে স্টুয়ার্ট শোবার ঘর বিশেষায়িত স্থান হিসেবে বিবেচিত হলেও সেখানে পরিবারের সদস্য, বন্ধু-বান্ধব, ব্যবসায়িক সহযোগী এবং দাস-দাসীদের প্রবেশাধিকার ছিলো। সেসময় রাজা রাণীর শোবার ঘরে দায়িত্বপালনকারী দাস-দাসীদের সম্মানের চোখে দেখা হতো। অনেকে তাঁদের প্রতি ঈর্ষানীতও ছিলেন।
উইলিয়াম এবং মেরির বাসভবন হ্যাম্পটন কোর্টে শোবার ঘরগুলো সিরিজ আকৃতিতে সাজানো ছিলো। বাসভবনটিতে কোন হল ঘর ছিলো না। একেকটি শোবার ঘর দরজার মাধ্যমে অপর ঘরের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলো।
বিভিন্ন পদমর্যাদার সামরিক বেসামরিক কর্মকর্তাদের শোবার ঘর অতিক্রম করে রাজার শোবার ঘরে পৌছতে হতো। প্রকৃতপক্ষে রাজাসহ বিভিন্ন পদাধিকারধারী ব্যাক্তিবর্গের বিছানাগুলো খুবই চিত্তাকর্ষক ও আরামদায়ক ছিলো। চকচকে এবং গিল্ডযুক্ত পদার্থ দিয়ে শোবার ঘরগুলো সাজানো থাকতো। এই বিছানা ও শোবার ঘরে অবসর যাপনও বেশ মজাদার ও রোমাঞ্চকর ছিলো।
রাজা-রাণীর বিছানা শোবার ঘর দেখভাল ও পরিস্কার করার জন্য আলাদা দাস-দাসী নিযুক্ত করা হতো। রাজা-রাণী ঘুমানোর জন্য যে শোবার ঘর ব্যবহার করতেন সেটা অন্য ঘরগুলোর থেকে আলাদা ছিলো।
স্টুয়াট শতকের শেষ রানি এনি তার মৃত্যুর জন্য একটি বিশেষ বিছানা পছন্দ করে গিয়েছিলেন। বিছানাটিতে পাঁচটি গদির স্তর ছিলো। হাতল,পায়া থেকে শুরু করে বিছানার আবৃত অংশসমূহের ওপর সূক্ষভাবে কাঠের কারুকাজ করা ছিলো। সেই সময়ে মৃত্যুর জন্য বিছানা পছন্দের রীতি প্রচলিত ছিলো না। রাণী এনির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জর্জিয়া শতকের সূচনা হয়। বিছানা ও শোবার ঘরের এক শৈল্পিক শতকের সমাপ্তি ঘটে একই সঙ্গে ।
১৮ শতকের জর্জিয়ান ফেডারেল বিছানা ও শোবার ঘর
ইংরেজী জর্জিয়ান শতকে বিছানা ও শোবার ঘরের উল্লেখযোগ্য বির্বতন ঘটে। সবচেয়ে বড় বির্বতনটি হলো এই সময়ে ডুপ্লেক্স বাড়ির প্রচলন শুরু হয়। ডুপ্লেক্স বাড়ির প্রচলন হওয়াতে শোবার ঘরগুলো একতলার পরিবর্তে দোতলায় স্থানতরিত হতে থাকে। দোতলায় ওঠার জন্য বাড়ির অভ্যন্তরে সিড়ির ব্যবহার এই শতকে শুরু হয়। এই সময়টাতে শোবার ঘরের গোপনীয়তা বা প্রাইভেসির বিষয়টি ধীরে ধীরে বিবেচনায় আসতে শুরু করে।
তাই রাজা-রাণীরা তাঁদের ব্যাক্তিগত শোবার ঘরের বাইরে দাস-দাসীদের জন্য ভবনের নিচতলায় আলাদা শোবার ঘরের বদোবস্ত করেন। যেহেতু দাস-দাসীদের জন্য পৃথক ঘরের বন্দোবস্ত করা হয়েছে তাই তাঁদের ওপরের তলায় ডেকে আনতে এই সময়টাতে কলিং বেলের প্রচলন শুরু হয়।
জর্জিয়ান শতকে ইংরেজ মধ্যবিত্ত শ্রেনীতে ব্যাপক আর্থিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। মুক্ত বাণিজ্যের প্রসার ঘটায় ইংরেজ মধ্যবিত্তরা বিশ্বজুড়ে নতুন নতুন পণ্যের সঙ্গে পরিচিত হোন এবং সেগুলো ব্যবহারের সুবিধা নিতে থাকেন। মধ্যবিত্ত শ্রেণী বিকশিত হওয়ায় স্বভাবতই রাজ পরিবারগুলোর সর্বময় ক্ষমতা খর্ব হচ্ছিলো। বিকশিত মধ্যবিত্ত সমাজ গণতন্ত্রমুখী হচ্ছিলো। রাজা-রাণীর ব্যাক্তিগত শয়নকক্ষের ক্ষমতাও কমছিলো ধীরে ধীরে। সেই সঙ্গে কমছিল শোবার ঘরের অভিনবত্ব ও জৌলুসতা।
ইংল্যান্ডে মধ্যবিত্তদের গণতন্ত্রমুখীতা আমেরিকানদেরও সমানভাবে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিলো। পরে আমেরিকানরা গনতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রর্বতন করে আনুষ্ঠানিকভাবে ইংল্যান্ড থেকে আলাদা হয়ে যায়।
যদিও আমেরিকা গণতন্ত্র তৈরি করেছিলো এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ইংল্যান্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল, তবুও ধনী ব্যাক্তিরা তখনও শোবার ঘরকে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হিসেবে দেখছিলেন।

১৯ শতকের ভিক্টোরিয়ান বিছানা ও শোবার ঘর
১৯ শতকের শেষভাগে আমেরিকায় দ্রুত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। ১৮৮০ থেকে ১৮৯০ এই সময়ের মধ্যে শতকরা ৪০ শতাংশ লোক গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী হয়েছে। যার ফলে শহরে দ্রুত জনবসতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দূষণও বেড়েছে। বিশাল এই জনগোষ্ঠীর আবাসনের ব্যবস্থা করে দিতে একদিকে সেসময় যেমন আকাশচুম্বী বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে অন্যদিকে বাণিজ্যিকভাবে গণপরিবহন চালু হয়েছে। অতিরিক্ত মানুষের চাপে শহরে শব্দ দূষণ এবং স্যানিটারী সমস্যার প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রাচীন বড় শহরগুলিতে ভিক্টোরিয়ান প্রভাব শক্তিশালী ছিলো। উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শহুরে পরিশ্রমী ভিক্টোরিয়ানদের সাধারন মানের বিছানা ছিলো। তাঁদের বিছানা ও শোবার ঘর নিয়ে ভাববার অতটা অবকাশ ছিলো না। ভিক্টোরিয়ান পরিবারগুলো শিষ্টাচার, স্বাস্থ্য এবং পরিছন্নতার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলো।
শহুরে বহুতল ভবনগুলোতে তখন গৃহকর্তা/গৃহকত্রীর জন্য ব্যাক্তিগত শোবার ঘর তৈরির পাশাপাশি শিশুদের জন্য আলাদা শোবার ঘর রাখার প্রচলন শুরু হয়। তখনকার দিনে ভিক্টোরিয়ানস অ্যাপার্টমেন্টগুলোতে আলাদা সার্ভেন্টস রুম ছিল। সেখানে নারী ও পুরুষ গৃহকর্মীরা আলাদা আলাদা ঘরে থাকতেন।
শিল্প বিপ্লব নতুন প্রযুক্তির সৃষ্টি করেছে। বাড়ি নির্মাণ ও সাজসজ্জা সামগ্রী জনগণের ক্রয় সীমার মধ্যে চলে এসেছে। নির্মাণ সামগ্রী ও বাড়ি সাজসজ্জা উপকরণের দাম সাধারণের নাগালের মধ্যে আসায় ভিক্টোরিয়ানসরা ইন্টেরিয়র ডিজাইন, ডেকোরেশন, রং ও টেক্সচারের দিকে আগের চেয়ে বেশি মনোযোগী হলো। উইন্ডো শেড এবং গ্রে কালার সেসময় শোবার ঘরে খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠলো। শোবার ঘরে বৃহৎ আকারের আয়না লাগানোর চল সেই সময়টাতে শুরু হলো। ভিক্টোরিয়ানস যুগে রাজা-রানী থেকে শুরু করে সাধারন মানুষ পর্যন্ত শোবার ঘরের গোপনীয়তা বা প্রাইভেসিকে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে ভাবতে লাগলেন।
ইংল্যান্ডের রক্ষণশীল দলের নেতা স্যার রবার্ট পীল যখন কয়েকজন অজ্ঞাত নারীকে দেখিয়ে দৃঢ়তার সাথে বলতে থাকেন এরা সবাই হুইগের স্ত্রী ছিলেন তখন রাণী ভিক্টোরিয়া সেই দাবি উড়িয়ে দেন। এই স্ক্যান্ডালের কারনে রাণী ভিক্টোরিয়া তার শোবার ঘরের গোপনীয়তা রক্ষার ওপর জোর দিয়েছিলেন। এই ঘটনার পর রাণীর শোবার ঘরে দাস-দাসীদের আনাগোনা সীমিত হয়ে পড়ে। এবং বহিরাগত মানুষদের জন্য রাজ দরবারের ব্যাক্তিগত শোবার ঘরে প্রবেশের সুযোগ চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।
উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এবং বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে দারিদ্রদের জন্য শহরে জীবনধারন করা দুর্বিষহ হয়ে উঠলো। তাঁদের অনেকেই ঘনবসতিপূর্ণ অস্বাস্থকর অনিরাপদ পরিবেশে মানবেতর জীবন যাপন করতে লাগলেন। পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠলো। বহু মানুষের একই নাগরিক সেবা গ্রহন এবং নাগরিক সেবার বাইরে অনেক মানুষ অবস্থান করায় নিউইর্য়ক শহরের দুর্নাম সেসময় সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। বস্তির মতো ঘরগুলোতে একটি শোবার ঘরই পরিবারের অনান্য সদস্যরা শেয়ার করতো। খাওয়াসহ বাকী কাজগুলো ওই একটি ঘরের মধ্যে সম্পন্ন করতে হতো।
২০ শতকের প্রথমদিকে বিছানা ও শোবার ঘর
২০ শতকের শুরুর দিকে শিল্প বিপ্লবের ব্যাপক উৎকর্ষ সাধিত হয়। সেই সঙ্গে বাড়ি নির্মাণ সামগ্রী ও সাজসজ্জা উপকরণেরও ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়। বিদ্যুতের ব্যবহার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনকে ব্যপকভাবে প্রভাবিত করে। বাড়ির সাজসজ্জায় গ্লিটজ এবং গ্লামারস অব মুভিং পিকচার্স এর ব্যবহার আধুনিকতার ছোঁয়া এনে দেয় । ১৯২০ সালের দিকে অথনৈতিক স্ফীতি শোবার ঘরকে বিলাসবহুল করতে এবং গ্লামারস আনতে উৎসাহ যোগায়। বিলাসবহুল নকশা এবং গ্রামারস এর কারনে শোবার ঘর সুন্দর এবং মনোমুগ্ধকর হয়ে উঠলো।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী আমেরিকা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সৈন্যরা যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে বিয়ে করতে শুরু করে। যুবক বিবাহিত সৈনিকরা তাঁদের পিতা-মাতার সাথে বসবাস করতেন না। তারা তাঁদের নতুন সংসারে নিজেদের পছন্দমতো বাড়ি তৈরি করে নিতো। ১৯৫০ এর দশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নব দম্পতিদের বিলাসী জীবনযাপনের দিকে ধাবিত করে এবং গৃহ সাজসজ্জায় নতুন করে মনোযোগী করে তোলে।
ষাটের দশকের বিছানা
ষাটের দশকে একটি নতুন প্রযুক্তির বিছানা ইংল্যান্ড হয়ে আমেরিকাতে ছড়িয়ে পড়ে। স্ক্যান্ডিনইভিয়ান প্রযুক্তির এই বিছানাটি ডুবেট নামেও পরিচিত ছিলো। বিখ্যাত গৃহস্থালী পণ্যের খুচরা বিক্রেতা টেরেন্স কনরাড সর্বপ্রথম স্ক্যান্ডিনইভিয়ান প্রযুক্তির বিছানা ইংল্যান্ডে আনে। এই প্রযুক্তির বিছানার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো অল্প সময়ের মধো বিছানা তৈরি করে ফেলা যায়। স্ক্যান্ডিনইভিয়ান বা ডুবেট প্রযুক্তির বিছানা দম্পতিদের আনুষ্ঠানিকভাবে বিছানা প্রস্তুতের ঝামেলা থেকে মুক্তি দিয়েছিলো। ষাটের দশকে সংঘটিত যৌন বিপ্লবে এই প্রযুক্তির বিছানার পরোক্ষ ভূমিকা ছিলো বলে মনে করা হয়।
ষাট থেকে সত্তর দশকের সময়কালটাতে শোবার ঘরে আরাম, অবসর বিনোদনের ব্যবস্থা এবং ব্যাক্তি স্বাতন্ত্র প্রকাশের দিকটি প্রাধ্যান্য পেতে থাকলো।
এই সময়ের বিছানা ও শোবার ঘর
বর্তমান সময়ের বিছানা ও শোবার ঘর নির্মাণের ক্ষেত্রে বিলাসবহুল আসবাবের উপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে । মাস্টারস্যুট ধরনের শোবার ঘরে বিশাল আকৃতির টিভি, ফায়ারপ্লেস, শোবারঘরের সঙ্গে এটার্চ বাথরুম এবং বিলাস বহুল বাথরুম ফিটিংস এর উপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। বর্তমান সময়ের কিছু আধুনিক মাস্টার স্যুটে স্বয়ংকীয় কফি বানানোর মেশিন, স্বয়ংকীয় আলো নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থাসহ মেঝে থেকে স্বয়ংকীয় তাপ নিয়ন্ত্রন সুবিধা সংযোজিত আছে। বাচ্চাদের শোবার ঘরে সাম্প্রতিক সময়ের ইন্টেরিয়র ডিজাইনে ব্যাক্তিগত বাথরুম তৈরির প্রচলন লক্ষ্য করা যায়। একই সঙ্গে শোবার ঘরে বড় আকারের রিডিং ও প্লেয়িং স্পেস রাখার প্রবনতাও লক্ষ্য করা যায় এই সময়ে।
শোবার ঘরের ভেতরে বাথরুম, রিডিং ও প্লেয়িং স্পেসের সমন্বয় ঘটাতে প্রযুক্তির সহায়তায় নতুন নতুন ইন্টেরিয়র ডিজাইনও বেশ নজর কাড়ে। লিভিং রুমের স্পেসের সাথে সমন্বয় রেখে আনুপাতিক হারে রিডিং ও প্লেয়িং স্পেসের জন্য আলাদা জায়গা রাখা হচ্ছে। বাচ্চার বেড়ে ওঠার সাথে তাল মিলিয়ে শোবার ঘরের ইন্টেরিয়র ডিজাইনেও আসে পরিবর্তন।
বিলাসবহুল শোবার ঘর তৈরিতে আজকাল পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহারের উপর জোর দেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে স্থপতিদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে বাঁশ ও শন।
অদ্ভুত শোনালেও সত্যি যে আধুনিক সময়ে অশ্বকেশরের ম্যাট্রেস আবার ফিরে এসেছে। পশ্চিমা বিশ্বের বিখ্যাত খুচরো গৃহস্থালী সামগ্রী বিক্রেতা হেইসেনস চেইনশপ অশ্বকেশরের এই ম্যাট্রেস বাজারে এনেছে।
আধুনিক শোবার ঘরগুলোতে ইদানীং নরম কাপড়ের বেষ্টনি দিয়ে শব্দ শোষণের ব্যবস্থা রাখা হয়। শোবার ঘরকে পুরোপুরি অন্ধকারাচ্ছন রাখতে আজকাল ব্লাক আউট শেডস প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে।
আধুনিক শোবার ঘরগুলোতে ক্লান্তি কাটানোর পাশাপাশি ট্রেস বা উদ্বিগ্নতা কাটানোর জন্য সব রকমের ব্যবস্থাই আছে।
বড় আকৃতির আধুনিক আসবাব ও সাজসজ্জায় ঠাসা শোবার ঘরগুলো বর্তমানে সময়ে বাড়ির মালিকের অর্থনৈতিক অবস্থা, সামাজিক মর্যাদা ও ব্যাক্তিত্ব প্রকাশ করে। মানুষের পছন্দ অপছন্দ রুচি ভেদে শোবার ঘরের চেহারাতেও পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। সব দিক বিবেচনায় বর্তমান সময়ের আধুনিক শোবার ঘরগুলোকে শতাব্দীর সবচেয়ে আরামদায়ক, বিলাসবহুল ও গোপনীয় শয়নকক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া যায়।

পোর্চ ডট কম অবলম্বণে

মির্জা মাহমুদ আহমেদ
পুরনো ঢাকার কথা মনে হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ঘিঞ্জি গলিপথ আর গায়ের ওপর গা লাগানো দালানকোঠায় ঠাসা রুদ্ধ এক জনপথের কথা ।
চিরচেনা এই দৃশ্যের বাইরে চতুভুর্জ আকৃতির একখন্ড সবুজ মাঠ খানিকটা অবাক-ই করে দেয়। মাঠ জুড়ে সবুজের সমারোহ চোখে দেয় স্বস্তি, মনে প্রশান্তি।
অথচ বছর দুয়েক আগেও দৃশ্যপটটা ঠিক এমন ছিলো না। ঢাকার অন্যসব পার্কের মতো লালবাগের এই মাঠটিতে উৎকট গন্ধের সাথে ছিলো ময়লা আবর্জনার স্তুপ। সামনের সড়কে ছিলো পিকআপ ভ্যান, রিক্সা, লেগুনার অবৈধ পার্কিং, বস্তি আর টং দোকানের সারি। সংস্কারে পুরোপুরি বদলে গিয়ে নতুন অবয়ব পেয়েছে পুরনো ঢাকার ঢাকেশ্বরী সড়কের শহীদ আব্দুল আলীম খেলার মাঠ। মাঠটিতে বালুর বদলে এখন দোল খাচ্ছে দৃষ্টিনন্দন সবুজ ঘাস। মাঠের চারপাশে লাগানো হয়েছে আমড়া, কামরাঙা, লটকনসহ দেশীয় ফল ফুলের নানা জাতের গাছ। সেখানে প্রজাপতি,ফড়িং, পাখিদের সাথে নিরন্তন খেলায় মেতে উঠছে শিশুরা।
সম্প্রতি মাঠটি ঘুরে দেখা গেছে, খেলার মাঠের মূল কাজ শেষ হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে হাঁটার পথ। এর নিচে আছে পানি নিষ্কাশনের সংযোগ ও ভূগর্ভস্থ পানি সংরক্ষনের ব্যবস্থা। মাটির নিচে ভূগর্ভস্থ পরিখায় সংরক্ষিত হবে পাঁচ লক্ষ লিটার বৃষ্টির পানি। ভূগর্ভে সংরক্ষিত এই পানি মাঠে ব্যবহার করা হবে। বাড়তি পানি পরিশোধন করে কফিশপ, পাবলিক টয়লেট, ব্যায়ামাগার এবং পাশ্ববর্তী মসজিদের চাহিদা পূরণ করা হবে। জরুরি প্রয়োজনে অগ্নিনির্বাপনের কাজেও ব্যবহার করা যাবে এই পানি। মাঠের উত্তর-পূর্ব দিকে করা হয়েছে একটি দোতলা ভবন। এর নিচতলায় করা হয়েছে ব্যায়ামাগার ও পাবলিক টয়লেট। দোতলায় একটি কফি শপ করা হয়েছে। কফিশপের সাথেই থাকছে পাঠাগার ও বই বিক্রয় কেন্দ্র। মাঠের উত্তরপাশে ক্রিকেট অনুশীলন করার জন্য পিচ আকৃতির একফালি জায়গা রাখা হয়েছে। পূর্ব দিকে রাখা হয়েছে শিশু কর্নার। সেখানে শিশুদের বিনোদনের ব্যবস্থা থাকবে। মাঠের চারপাশে লাগানো হয়েছে এলইডি বাতি। উদ্ধোধনের আগেই মাঠের চারপাশের অংশে বিভিন্ন বয়সী মানুষজন হাঁটাচলা করছেন। অনেকে বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন।
চকবাজার নিউমার্কেট রুটে চলাচলকারী লেগুনার লাইনম্যান হাবিব বৈশাখের তপ্ত রোদে গাছের ছায়ায় বসে খানিকটা জিরিয়ে নিচ্ছিলেন। কথায় কথায় জানালেন মাঠের আগের অবস্থার কথা। বললেন আগে মাঠে খেলা তো দূরে থাক, মাঠের পাশ দিয়ে হাঁটার পরিস্থিতি ছিল না। সন্ধ্যার পর এখানে মাদকসেবীরা অসামাজিক কার্যকলাপ চালাতো। মাঠ সংস্কারের পর আশপাশের পরিবেশ উন্নত হয়েছে।
মা রোকেয়া ইসলামের হাত ধরে ঘুরতে এসেছে ছোট্ট মিহিরিমা। লালবাগের স্থানীয় বাসিন্দা রোকেয়া জানালেন প্রায়ই মেয়েকে নিয়ে এখানে ঘুরতে আসেন তিনি। আগে মাঠের চারপাশে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং বখাটেদের উৎপাতের কারনে এদিকে আসতেন না। এছাড়া বছরের বেশিরভাগ সময়ই মাঠ দখল করে চলতো মেলা। সংস্কার কাজের পর মাঠের চারপাশের পরিবেশ উন্নত হয়েছে। আশেপাশের মানুষের আচরণেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে বলে জানান তিনি।
সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে সংস্কারের পর এই মাঠে যাতে মেলাসহ অনান্য কর্মকান্ড চলতে না পারে সেজন্য আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। স্থানীয়দের অনুরোধে মাঠটিতে শুধু ঈদের নামাজ পড়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
শহীদ আব্দুল আলীম খেলার মাঠের সংস্কার কাজ করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অঞ্চল-৩ (আজিমপুর)। জল সবুজে ঢাকা প্রকল্পের আওতায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে আওতাধীন এরকম আরও ১৯টি পার্ক এবং ১২টি খেলার মাঠের উন্নয়ন কাজ চলছে। আশা করা হচ্ছে এ বছরের শেষ নাগাদ পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।
‘জল সবুজের ঢাকা’ প্রকল্পের প্রধান স্থপতি রফিক আজম কারিকাকে বলেন আগে যেমন মনে করা হতো দেয়াল দিয়ে মাঠটিকে সুরক্ষিত করা যাবে এটা আসলে ভুল ধারণা। দেয়ালের কারনে মনোজাগতিক বাধা তৈরি হয়। দেয়াল থাকার ফলে নিদিষ্ট সময়ের পর এলাকাবাসী যখন মাঠটি আর ব্যবহার করতে পারতেন না। তখন সন্ধ্য্যার পর দেয়াল টপকে সেখানে দুষ্টুলোকেরা ঢুকতো। দেয়ালের আবডাল থাকায় দুস্কৃতিকারীদের জন্য মাঠটি দখল এবং অপকর্ম করা সহজ হতো। তাই আবদুল আলীম মাঠসহ জল সবুজের ঢাকা প্রকল্পের সব মাঠ ও পার্কের স্থাপত্য নকশা করার সময় দেয়াল উঠিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেই। দেয়াল তুলে দেয়ার ইতিবাচক দিকটি বোঝাতে সিটি কর্পোরেশনসহ সব মহলের কাছে আমার অনেক ঘাম ঝরাতে হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত আমি তাঁদের বোঝাতে পেরেছি। দেয়াল না থাকার ফলে স্থানীয়রা মাঠটি নিজেদের বলে ভাবছে, যখন ইচ্ছে তখন ব্যবহার করতে পারছে। মাঠে আগত দর্শনার্থীদের চোখ এক্ষেত্রে নিরাপত্তা রক্ষায় কাজ করবে। সেই সঙ্গে আছে সিসি ক্যামেরার নজরদারি।
খেলাধূলার বাইরে মাঠের বহুবিধ ব্যবহার প্রসঙ্গে রফিক আজম বলেন, আগে মাঠটিতে শুধু ফুটবল খেলা হতো। কিন্তু নতুন করে সংস্কার করার পর মাঠটিতে ফুটবল খেলার পাশাপাশি ক্রিকেট খেলার ব্যবস্থা থাকবে। শিশুদের খেলার জায়গা থাকবে, বড়দের হাঁটার জায়গা থাকবে, যারা স্বাস্থ্য সচেতন তাঁদের জন্য ব্যায়াম করার ব্যবস্থা থাকবে। পড়–য়াদের জন্য মাঠ সংলগ্ন ভবনের ওপরতলায় বই পড়ার ব্যবস্থা থাকবে। কফির কাপে চুমুক দিয়ে গল্প করা যাবে। ওয়াইফাই ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় কাজ সারা যাবে।
অতীতে এমন অনেক ভালো উদ্যোগ শুধুমাত্র রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে নষ্ট হয়ে গেছে এই মাঠটি সংরক্ষণে কি ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হবে এমন প্রশ্নের জবাবে রফিক আজম বলেন, মাঠটি দেখাশোনার জন্য স্থানীয় জনগনের অংশগ্রহনে একটি কমিটি করে দেয়া হবে। মাঠ সংলগ্ন বাড়িতে বসবাসরত নারী, পুরুষ, কিশোর, কিশোরী, খেলোয়াড়, মসজিদের ইমাম, জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় বরেণ্য ব্যাক্তি সেই কমিটির সদস্য হবেন।
মাঠটি রক্ষাবেক্ষনের জন্য মালি, পরিছন্নতা কর্মী, লাইব্রেরিয়ান, কফি শপের দোকানীও স্থানীয় পর্যায় থেকে নিয়োগ দেয়া হবে।
পরিকল্পিত নগর স্থাপত্য শিশু মনোজগতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে উলে­খ করে রফিক আজম বলেন, শহীদ আব্দুল আলীম খেলার মাঠটি শিশুদের জন্য একটি প্রাকৃতিক শিক্ষাদান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে। ছয় ঋতু সম্পর্কে জানতে তাকে আর বইয়ের কাছে যেতে হবে না। সে প্রকৃতি থেকেই ছয় ঋতু সম্পর্কে জানবে। গাছ চিনবে। ফুল চিনবে। গাছ থেকে ফল পেড়ে খাওয়ার যে অপরিসীম আনন্দ সেটা শিশুরা এখানে উপভোগ করতে পারবে। ঢাক গাছ থেকে যে ঢাকা নামের উৎপত্তি সেটা শিশুরা এই মাঠ থেকেই জানবে।
এখন থেকে পুরনো ঢাকার শিশু কিশোররা ড্রাগের পেছনে না ছুটে প্রজাপতির পেছনে ছুটবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যাক্ত করেন।
ছোট খাটো সংস্কার কাজ শেষ হলে এবং কফি শপ ব্যবস্থাপনায় মালয়েশিয়ান চেইন শপ সিক্রেট রেসিপির সঙ্গে চুক্তির বিষয়টি চূড়ান্ত হলে খুব শীঘ্রই দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেয়া হবে লালবাগের শহীদ আবদুল আলীম মাঠ। পুরনো ঢাকাবাসীর জন্য গর্বের বিষয় হবে এই মাঠটি। আর জল সবুজের ঢাকা প্রকল্পের পুরো কাজ শেষ হলে নগরবাসীর সামনে হাজির হবে নতুন এক সবুজাভ ঢাকা।

মিলটন মোললা
এক বর্গকিলোমিটার জায়গার ভেতর সবচেয়ে বেশি মসজিদ থাকার বিচারে বিশ্বের শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে আজকের বাংলাদেশ। কিন্তু কীভাবে তার শুরু? কোথা থেকে এলো এই দেশ? হাজার বছরের ইতিহাস খুঁড়ে বাংলা নামের আদিরূপ খুঁজতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, ‘ভঙ্গ’ নামে প্রাচীন এক জনগোষ্ঠীর নাম থেকে এর উদ্ভব, যাদের বাস ছিল বর্তমান বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে। ব্লকমান নামে এক ঐতিহাসিক বলছেন, বঙ্গ নামে এক রাজা ছিলেন, যিনি প্রাচীন রাজ্য ভঙ্গ-এর প্রতিষ্ঠাতা। ভারতের প্রাচীনতম পুরাণগ্রন্থ মহাভারতেও উল্লেখ রয়েছে এই রাজার কথা।
ইতিহাসে বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠার উল্লেখ প্রথম পাওয়া যায় খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৬ সালে আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের প্রেক্ষিতে। পরবর্তী গ্রিক ও লাতিন ইতিহাসকাররাও তার এ অভিযানের প্রেক্ষিতে বলেছেন, গঙ্গারিডি নামে এক শক্তিশালী রাজ্যের ভয়াবহ প্রতিরোধের মুখোমুখি হওয়ার ভয়েই শেষ পর্যন্ত ভারত অভিযান অসমাপ্ত রেখে ফিরে যান আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট। গঙ্গা উপত্যকায় বাংলাতেই ছিল সেই দুর্ধর্ষ গঙ্গারিডি জাতির বসবাস। এই অঞ্চল খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ এবং দ্বিতীয় শতকে এবং পরবর্তীতে চতুর্থ ও পঞ্চম শতকে এটি মৌর্য এবং গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীনে চলে যায়। সপ্তম শতকে এখান থেকেই সাম্রাজ্য গড়েন রাজা শশাঙ্ক এবং সপ্তম থেকে একাদশ শতক অবধি এ জনপদ শাসন করেন পাল রাজারা।
বাংলায় নগরসভ্যতার প্রাচীনতম স্থাপনা খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে প্রতিষ্ঠিত মহাস্থানগড়। বর্তমান বগুড়া জেলার কাছাকাছি এর অবস্থান। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে ১২ শতকের মধ্যে বাংলায় নির্মিত এবং এখনো টিকে থাকা প্রাচীন স্থাপনার অবশিষ্টাংশের মধ্যে আছে অসংখ্য ধর্মীয় ভবন এবং বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। রাজশাহী জেলায় পাহাড়পুরে ৭৭০-৮১০ খ্রিস্টাব্দে এবং ৮ থেকে ১২ শতকের মধ্যে কুমিল্লার ময়নামতিতে নির্মিত হয় উপমহাদেশের বৃহত্তম বৌদ্ধ বিহার। বাংলায় ১০৮০ খ্রিস্টাব্দে হিন্দু সেন রাজাদের হাতে চলে যায় পাল রাজার ক্ষমতা। ১২০৪ সালে নবাগত মুসলিমদের হাতে চলে যাওয়ার পূর্ব অবধি বজায় থাকে এ পরিস্থিতি।

ভারত তথা বাংলায় মুসলিম আগমন
আরব ভূমিতে জন্ম নেয়ার পর তুরস্ক, পারস্য এবং আফগানিস্তান হয়ে ভারতবর্ষে পদার্পণ করে ইসলাম। ১২ শতকের দিকে উত্তর ভারতে প্রতিষ্ঠা ঘটে যায় তার। ১৬ শতকে মুঘল শাসন শুরু হওয়ার পূর্ব-অবধি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন স্থাপত্যের নির্মাণ ঘটে এসব শাসকের আনুকূল্যে। উত্তর ভারত, গুজরাট, দাক্ষিণাত্য এবং বাংলায় (বর্তমান বাংলাদেশে) এর প্রসার ঘটে সর্বাধিক। মুঘল আমলের নির্মাণশৈলীগুলো মূলত প্রথম যুগের এ নির্মাণশৈলীরই অনুকরণ বা তা দিয়ে অনুপ্রাণিত।
১২০৪ সালে মুহাম্মাদ বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয় এ সময়কার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা। এর ফলে সুদূর আরব-পারস্য থেকে শুরু হয়ে এশিয়ার পূর্বদিকে ইসলামী আধিপত্যের শেষ প্রান্তসীমা হয়ে দাঁড়ায় বাংলা। ফলে ওইসব এলাকা থেকে ভাগ্যান্বেষণ, জীবিকা এবং ধর্ম প্রচারের লক্ষ্যে বহু মানুষের আগমনও শুরু হয় এ অঞ্চলে। এসব মানুষের মেধা-কৃষ্টি ও সংস্কৃতির মধ্যে ছিল নিজের দেশ থেকে বয়ে আনা স্থাপত্য আর কারিগরি জ্ঞান। নতুন দেশে আসার পর তার সঙ্গে মিশেল ঘটে যায় স্থানীয় কাঁচামাল এবং নির্মাণশৈলীর। এভাবেই একদিন হিন্দু এবং বৌদ্ধ প্রভাবপুষ্ট এ জনপদে প্রথমবার নিজেদের মতো করে নতুন নির্মাণের ভিত্তি স্থাপন করেন তারা। বিশ্বের যেখানেই গেছে মুসলিমরা, ধর্মের মূল নির্দেশনা প্রতিপালন, প্রতিদিন পাঁচবার নামাজ আদায়ের উদ্দেশে সেখানেই তারা নির্মাণ করেছে মসজিদ। বিহার এবং স্তুপা অধ্যুষিত নতুন দেশে স্থাপত্যশৈলীর বিচারে নতুন ধরনের এসব মসজিদ হয়ে ওঠে ভিন্ন স্থাপত্যের এক অনন্য নজির। পার্সি ব্রাউনের ভাষায়, রহস্যময়তার আধাররূপী মন্দিরের সঙ্গে তুলনামূলক বিচারে স্থানীয়দের সামনে মসজিদের স্থাপত্য-স্বভাবতই ঋজু ও সরলরূপে প্রতিভাত হয়।
মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রে কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্যণীয়। প্রতি শুক্রবার ধর্মানুগ মানুষের বৃহৎ সমাবেশকে ধারণ করার কথা মাথায় রেখেই শুরু হয় এর নির্মাণ-প্রক্রিয়া। মক্কায় কাবাঘরের দিকে মুখ থাকে প্রার্থনাকারীদের। মক্কার দিকে নির্দেশিত দেয়ালটি কিবলা দেয়াল এবং এর নাম ‘মিহরাব’ যা বস্তুত একটি অলঙ্কৃত কুলুঙ্গি। মসজিদে আরও থাকে ইমামের আসন বা মিম্বার, একটি মাকসুরা বা চারদিক ঘেরা একটি উঁচু স্থান, এক বা একাধিক মিনার, যেখান থেকে বিশ্বাসীদের প্রার্থনায় মিলিত হওয়ার আহবান জানান মুয়াজ্জিন। মসজিদে আরও থাকে একটি শান বা প্রাঙ্গণ, যেখানে রক্ষিত হয় কূপ কিংবা জলাধার, যার পানি দিয়ে নামাজে দাঁড়ানোর আগে অজু করেন নামাজি।
মুসলিমরা যখন বাংলায় আসে, তারা সঙ্গে নিয়ে আসে তাদের নতুন স্থাপত্য। মসজিদ ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে তারা নতুন বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, সামগ্রী, প্রযুক্তি ও আবহাওয়ার মিশেল ঘটিয়ে দেন। মধ্যযুগে মুসলিম আগমনের সেই প্রথম যুগ থেকেই মসজিদ নির্মাণে এক অনন্য বৈশিষ্ট্য গড়ে ওঠে বাংলায়। শাসকশ্রেণির চিন্তাভাবনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের আকাঙ্খারও প্রতিফলন ঘটতে দেখা যায় এসব নির্মাণে।
মুসলিমপ্রধান বাংলায় মসজিদ ইসলামী প্রেরণা ও সকল ধরনের কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু। ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে ইসলামী ঝান্ডাতলে শামিল হয়ে যায় বাংলা। সেই সময় থেকেই মসজিদ নির্মাণের ধারা চলে এসেছে এ জনপদে। গবেষকরা মোটা দাগে সময়টিকে তিনভাগে ভাগ করেছেন-প্রাথমিক ইসলামী কাল, মুঘল আমল এবং ঔপনিবেশিক যুগ। আজ আমরা বাংলায় ঐতিহ্যমন্ডিত কয়েকটি মসজিদের কথা তুলে ধরছি।

ছোট সোনা মসজিদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ
মুসলিম শাসনামলে বাংলায় অনেক নতুন শহর, দুর্গ, বিখ্যাতজনের স্মৃতিবিজড়িত তোরণ, বিজয়স্তম্ভ, মসজিদ, সমাধিসৌধ, সড়ক ও সেতু নির্মিত হয়। তবে এ শাসকরা সবচেয়ে বেশি যা নির্মাণ করেন, তা হচ্ছে মসজিদ আর বিশুদ্ধ পানির জন্য বিশাল পুকুর, দীঘি কিংবা জলাধার। বাংলায় ইসলামের প্রথম যুগে সুলতার হুসেন শাহের আমলে রাজধানী গৌড়ের একটি বিখ্যাত মসজিদ ছোটো সোনা মসজিদ। ১৪৯৩ থেকে ১৫১৯ সালের ভেতর এটি নির্মাণ করেন ওয়ালি মুহাম্মাদ নামে এক ব্যক্তি। আদিতে মাঝখানের সারিতে তিনটি চৌচালাসহ পনেরটি সোনায় মোড়ানো গম্বুজ ছিল এর ছাদে। প্রথমেই নজর কেড়ে নেয় মসজিদটির অসাধারণ অলঙ্করণ আর প্রতিটি দেয়ালের ভেতর এবং বাহির উভয় দিকেই খোদাইকাজ। অলঙ্কৃত পাথরের কারুকাজ দেখলে মনে হবে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পোড়ামাটির কাজ। স্থাপনার মেঝেতে প্রথম দিকে ছিল পুষ্পনকশাখচিত চকচকে সুন্দর টালি। সরু খিলানঅলা একটি পাথরের তোরণ রয়েছে মসজিদের পূর্বদিকে।

বাঘা মসজিদ, রাজশাহী
হুসেন শাহের আমলে আরেকটি চমৎকার স্থাপনা ১৫২৩ সালে সুলতান নুসরাত শাহ নির্মিত বাঘা মসজিদ। উল্টো কাপের আকৃতিতে ছোট দশটি গম্বুজ রয়েছে এর ছাদে। প্রতিটি দেয়ালে বিশেষত মিহরাবের অলঙ্করণেও রয়েছে পোড়ামাটির অপূর্ব কারুকাজ, যাতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বিভিন্ন নকশা, আঙুর আর গোলাপের আবহ।

কুসুম্বা মসজিদ, নওগাঁ
মুসলিম সালতানাতের শেষ দিককার স্থাপত্য-নিদর্শন কুসুম্বা মসজিদ। সুলতান গিয়াসউদ্দিন প্রথম বাহাদুর শাহের আমলে জনৈক সোলায়মান এটি নির্মাণ করেন। আয়তাকার এ মসজিদের ছাদে রয়েছে অর্ধগোলাকৃতি ছয়টি গম্বুজ। ইসলামী শাসনের প্রাথমিক যুগে নির্মিত মসজিদগুলোর মধ্যে মাত্র ছয়টি পাথরনির্মিত মসজিদ টিকে আছে বর্তমানে, কুসুম্বা মসজিদ তাদের অন্যতম। এতে ব্যবহৃত কালো ব্যাসাল্ট পাথরগুলো নদীপথে আমদানি করা হয় রাজমহল এবং বিহারের পাহাড় থেকে। মসজিদের উত্তর-পূর্ব কোনে মজবুত পাথর নির্মিত পিলারের ওপর গড়ে তেলা হয়েছে একটি অলঙ্কৃত গ্যালারি। প্রার্থনাকক্ষের মেঝে থেকে একটি সিঁড়ি উঠে গেছে এই গ্যালারিতে। ধারণা করা হয়, এ গ্যালারিটি ছিল মূলত রাজ্যের সুলতান কিংবা শাসক কিংবা এর নির্মাতাদের জন্য বিশেষভাবে সংরক্ষিত।

ষাট গম্বুজ মসজিদ, বাগেরহাট
বাগেরহাটের খান জাহান ঘরানায় নির্মিত এ মসজিদ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সবচেয়ে মনোগ্রাহী এবং বৃহত্তম ইষ্টক-নির্মিত মসজিদ। এর ছাদের মাঝখানের সারিতে সাতটি চৌচালাসহ রয়েছে ৭৭টি ছোট গম্বুজ। ১৪৪২ সালে শুরু হয়ে মসজিদের নির্মাণ-কাজ শেষ হয় ১৪৫৯ সালে। ইউনেস্কো এটিকে ঘোষণা করেছে ‘বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ এবং ভারতবর্ষের সবচেয়ে নজরকাড়া মুসলিম স্থাপত্য’ হিসেবে। মসজিদের প্রার্থনা-কক্ষের আয়তন ১৬০ ফুট বাই ১৯০ ফুট এবং এর ধারণক্ষমতা একসঙ্গে ২,০০০ লোক। আলো-হাওয়া গমনাগমনের জন্য এর পূর্বদিকে ১১টি এবং উত্তর ও দক্ষিণে সাতটি করে খিলানঅলা দরজা রয়েছে।

শুরা মসজিদ, দিনাজপুর
ইট-পাথরে নির্মিত শুরা মসজিদ মুসলিম সালতানাতের আরেকটি চমৎকার স্থাপত্য-নমুনা। এতে মূল প্রার্থনাকক্ষটি বর্গাকৃতির, যার সামনে পূর্বদিকে আছে একটি করিডোর এবং ছয়টি অষ্টভ‚জাকৃতির টারেট বা খুদে মঞ্চ। তৎকালীন স্থাপত্যের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল এটি। ঢালু হয়ে নেমে গেছে এর কার্নিশ এবং তিনটি মিহরাবসমৃদ্ধ পশ্চিম দেয়ালে আকীর্ণ রয়েছে বিস্তর পোড়ামাটির অলঙ্করণে। এর মূল প্রার্থনাকক্ষের ওপর রয়েছে একটিমাত্র লম্বা পেটমোটা গম্বুজ। এ ছাড়া করিডোর ঘিরে আছে তিনটি ছোট গম্বুজ। গৌড়ের ছোট সোনা মসজিদের মতো এর দেয়ালেও অলঙ্কৃত হয়েছে পাথরের খোদাই কারুকাজ।

গৌড়ের দারাশবাড়ি মসজিদ
ইলিয়াস শাহী আমলের প্রবীণ স্থাপত্যের এক উৎকৃষ্ট নমুনা দারাশবাড়ি মসজিদ। সুলতান ইউসুফ শাহের আমলে ১৪৭০ সালে এর নির্মাণ। বারান্দায় সাতটি খিলানঅলা ফটক দিয়ে ঢুকতে হয় মূল প্রার্থনাকক্ষে। ধারণা করা যায়, এর ছাদের ওপর একগুচ্ছ চৌচালাসহ ছিল সারিবদ্ধ গম্বুজ। বাইরে থেকে সিঁড়ি উঠে গেছে উত্তর-পূর্ব কোনে একটি গ্যালারিতে। ভেতরে পশ্চিম দিকে দেয়ালে উৎকীর্ণ রয়েছে নয়টি মিহরাব। এর গায়ে শিল্পিত হয়েছে পুষ্প ও জ্যামিতি আকারে নজরকাড়া পোড়ামাটির অলঙ্করণ।

গৌড়ের রাজবিবি মসজিদ
একটি মাত্র গম্বুজঅলা বর্গাকৃতির এ মসজিদের গায়ে একটি বারান্দা, যার ছাদে তিনটি ক্ষুদ্রাকৃতির গম্বুজ। এর দেয়ালে উৎকীর্ণ পোড়ামাটির অলঙ্করণ, যাতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ফুলের নকশা। কালো ব্যাসাল্ট নির্মিত পিলারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে গম্বুজ। প্রার্থনাকক্ষের পশ্চিম দেয়ালের শোভা বর্ধন করেছে অলঙ্কৃত কালো পাথরের মিহরাব। স্থাপত্যশৈলী থেকে এটি ১৫ শতকের নির্মাণ বলে মনে করা হয়। স্থাপনার গায়ে কোরানের একটি আয়াত আরবিতে উৎকীর্ণ রয়েছে এখনো। রাজবিবির পরিচিতি সুস্পষ্ট নয়, তবে তিনি রাজকীয় হেরেমের কোনো প্রভাবশালী নারী হয়ে থাকবেন বলেই ধারণা করা হয়।

গৌড়ের ধুনিচক মসজিদ
আয়তাকার এ প্রার্থনাভবনের নির্মাণশৈলীতে ইলিয়াস শাহ আমলের ঘরানা সুস্পষ্ট। এতেও রয়েছে একটিমাত্র গম্বুজ। তিনটি অলঙ্কৃত মিহরাব রয়েছে পশ্চিমের দেয়ালে। প্রতিটি মিহরাবের গায়ে লতানো অলঙ্করণ।

গোয়ালদি মসজিদ, সোনারগাঁও
সুলতান আমলের আরেকটি এক-গম্বুজঅলা মসজিদের নিদর্শন গোয়ালদি মসজিদ। পানাম নগরের আধামাইল উত্তর-পূর্বে এর অবস্থান। সুলতান হুসাইন শাহের আমলে ১৪১৯ সালে হিজাবার আকবর খান এটি নির্মাণ করেন। তিনটি অসাধারণ বক্র মিহরাবসমৃদ্ধ ১৬ বর্গফুট আয়তনের একটি চমৎকার নির্মাণ এ মসজিদ। তিন মিহারবের মাঝখানেরটির গায়ে খোদাই কাজে দেখা যায় ফুলের নকশা। অন্যগুলো নকশা করা হয়েছে পোড়ামাটির অলঙ্করণে। ভেতরে গম্বুজের ভার বহন করে দাঁড়িয়ে আছে পাথরের স্তম্ভ।

চুনাখোলা মসজিদ, বাগেরহাট
শস্যবহুল সমতল জমির প্রেক্ষাপটে ছবির মতো মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে দাঁড়িয়ে আছে চুনাখোলা মসজিদ। সিঙ্গাইর মসজিদের অনুরূপ স্থাপত্যে নির্মিত এবং একইরকম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তীব্র আবহাওয়ার দাপটে।