Home ফিচার
Featured posts

0 94

কারিকা প্রতিবেদক

প্রায় দুইকোটি মানুষের এই মেগাসিটিকে ঘিরে নগরবাসীর প্রত্যাশা কম নয়। প্রত্যাশার পারদ যেমনি উপরের দিকে তেমনি প্রাপ্তির খাতাও বলা চলে প্রায় শূন্য! । এরই মধ্যে ঢাকা পেয়ে গেছে দুই নগরপিতাকে। নতুন দায়িত্ব নেয়া এই দু’জনের প্রতি প্রত্যাশা কী- কারিকার পাঠকদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিলো তারা কেমন ঢাকা প্রত্যাশা করেন? এমন প্রশ্নে পাঠকদের কাছ থেকে স্বর্তঃফূর্ত সাড়া পাওয়া গেছে। পাঠকরা জানিয়েছেন তাঁদের প্রত্যাশার কথা তাঁদের ভাবনার কথা।
নগরপিতার কাছে পরিস্কার পরিচ্ছন, দূষণ ও যানজটমুক্ত ঢাকার প্রত্যাশা করেন এনআরবি ব্যাংকের কর্মকর্তা মোহাম্মদ খালেদ হোসেন। বেসরকারি চাকরিজীবী দিলশাম মাহ্জাবিন মৌরির প্রত্যাশাও দুনীর্তি, যানজটমুক্ত সবুজ ঢাকার। সংবাদকর্মী স্বপ্ন রোজ রাজধানীর প্রতিটি বাস স্ট্যান্ডে নারীদের জন্য পৃথক টয়লেট ও স্তন্যদান কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার দাবী জানিয়েছেন।
প্রকৌশলী মির্জা নূর আহমেদের মতে, মেয়রদের কার্যপরিধি সীমিত থাকায় তাঁদের কাজের গন্ডিও ছকে বাঁধা। তাই নির্ধারিত কয়েকটি কাজ ছাড়া সিটি করপোরেশন স্বাধীনভাবে আর কোন কাজ করতে পারে না। নাগরিকদের প্রত্যাশা পূরণে যানজট প্রশমন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মশার উপদ্রব কমানো এবং নিরবিচ্ছিন পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে নগর কর্তৃপক্ষকে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে বলে মনে করেন তিনি। সিটি করপোরেশনকে সড়ক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি ট্রাফিক শৃঙ্খলার দায়িত্ব নিতে হবে। এছাড়া সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সিটি করপোরেশনের নিজস্ব বাহিনী গড়ে তুলতে হবে। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন নগরী গড়ে তোলার লক্ষ্যে উন্নত দেশের আদলে জরিমানার ব্যবস্থা করতে হবে। যেসব বাড়ি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এর সামনে ময়লা আবর্জনা থাকবে, তাদেরকে জরিমানার আওতায় আনতে হবে। ময়লা আবর্জনা পরিস্কারের পাশাপাশি এসব বিষয় দেখভালের জন্য সিটি করপোরেশনের কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। মশা এবং অন্যান্য পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে আলাদা সেল গঠন করতে হবে এবং পরিবেশের কোন ক্ষতি না করে এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ঢাকা ওয়াসাকে সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রনাধীন করতে হবে। অবৈধভাবে ফুটপাত ও রাস্তা দখলকারীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে এবং নির্মাণ সামগ্রী রাস্তায় বা ফুটপাতে রাখলে জরিমানার বিধান চালু করতে হবে, দুনীর্তি প্রতিরোধে মেয়র এবং কাউন্সিলারদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে তবেই সিটি করপোরেশন নগরবাসীর কাঙ্খিত প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে বলে মত দেন অনেকেই।
বাংলাদেশ ইনষ্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলসের) তথ্য কর্মকর্তা মামুন অর রশিদ মনে করেন, যানজট, গণপরিবহনের সংকট, ময়লা আবর্জনা, জলাবদ্ধতা, মশার উপদ্রব এবং গ্যাস-পানির দুঃপ্রাপ্যতা ঢাকার নিত্যসঙ্গী।
শুধু ধনিক শ্রেনীর কথা ভাবলেই চলবে না একই সঙ্গে নগরের খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের কথাও ভাবতে হবে। যারা এ নগরের প্রাণ। নাগরিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সিটি করপোরেশন দলমত নির্বিশেষে জনগণের প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠবে, জনমতকে প্রাধান্য দিয়ে জনহিতকর কাজ করবে এমনটাই প্রত্যাশা করি।
পিতার কাছে সন্তানের যেমন চাওয়া মেগাসিটি ঢাকার বাসিন্দা হিসেবে নগরপিতার কাছে ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের সংবাদকর্মী জিকো সালেহীনের প্রত্যাশাটাও ঠিক তেমনি। তিনি বলেন, ঢাকা সিটিকে যানজট,দূষণ ও ডেঙ্গু মুক্ত শহর হিসেবে দেখতে চাই। সেই সঙ্গে পরিচ্ছন্ন বাধাহীন ফুটপাতে চলতে চাই। প্রতিটি ওয়ার্ডে খেলার মাঠ চাই,দখল হয়ে যাওয়া খাল এবং নালার পুনরুদ্ধার চাই। প্রতিটি আঞ্চলিক সিটি করপোরেশন অফিসে ওয়ান স্টপ সার্ভিস সুবিধা চাই। প্রতিদিনের কাঁচাবাজার মনিটরিং এবং দ্রব্য-মূল্যের দাম নিয়ন্ত্রণ চাই। পোষ্টার মুক্ত নগরী দেখতে। চাই মাদক মুক্ত সমাজ। নাগরিক হিসেবে আমাদের চাওয়া পাওয়ার শেষ নাই। প্রত্যাশা করি নবনির্বাচিত মেয়রেরা অতীতের না হওয়া কাজ দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করবেন।

0 111

মির্জা মাহমুদ আহমেদ

রাস্তার পাশের চা-দোকানকে বলা হয় পাবলিক পার্লামেন্ট! শতপথ শত মতের সম্মিলন ঘটে চা-দোকানকে ঘিরে। কখনও কখনও মতের অমিল হলে চায়ের কাপেই ওঠে ঝড়! শহুরে জীবনছকে বাঁধা, ব্যস্ত। ফলে এখন আর সেভাবে চায়ের দোকানে আড্ডা জমে না। এছাড়া রাজপথ থেকে পাড়া-মহল্লার অলিগলি-সবখানেই গড়ে উঠেছে ছোট ছোট কফিশপ ও ক্যাফে। সব মিলিয়ে চা-দোকানের আড্ডাটা অনেকটাই যেন মান্না দে’র কফি হাউজের ভাগ্য বরণ করেছে এই সময়ে এসে। মান্না দে যেমনটা গেয়েছিলেন ‘কফি হাউজের আড্ডাটা আজ আর নেই, আজ আর নেই…।’
ঘড়িতে তখন দুপুর সাড়ে ১২টার কিছু বেশি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্বরের চা-দোকানগুলো ঘিরে শিক্ষার্থীদের ছোট ছোট জটলা। একটি জটলার কাছে গিয়ে জানা গেল, তারা সবাই আসন্ন সেমিস্টার ফাইনাল নিয়ে কথা বলছেন। কারও হয়তো নোট জোগাড় হয়নি। কারো পুরো বই-ই বাকি। কেউ হয়তো শেষ সময়ে প্রয়োজনীয় চ্যাপ্টারগুলো দাগিয়ে নিচ্ছেন। জটলার মধ্যেই কথা হয় অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন বিভাগের শিক্ষার্থী নাজিয়া আফরিন মৌমিতার সঙ্গে। মৌমিতা বললেন, ‘সামনেই আমাদের পরীক্ষা, তাই চায়ের আড্ডায় এখন পড়াশোনা নিয়েই বেশি কথা হচ্ছে। এমনিতে চায়ের আড্ডায় কথার কোনো লাগাম থাকে না। সিনেমা, ফেসবুক, গসিপ, ট্যুর-প্ল্যান-এসব বিষয় নিয়েই কথা হয় বেশি। এছাড়া আড্ডায় যখন ছেলেরা থাকে তখন ক্রিকেট, পলিটিক্স, হল পলিটিক্স, গেম, মুভি, গার্লফ্রেন্ড, ফেসবুক-এসব বিষয় নিয়েই কথা হয়। আর মেয়েদের আড্ডায় অবশ্যই বড় অংশজুড়ে থাকে ড্রেস আর সাজগোজ।
তেজগাঁওয়ের নাবিস্কো বিস্কিট কারখানা পার হয়ে খানিকটা এগিয়ে ডানে ঘুরলে ছোট একটা টং দোকান। কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিতে টং দোকানের সামনে রাখা কাঠের বেঞ্চিতে বসলাম। দোকানি তখন এক মনে টুংটাং শব্দ তুলে চা বানিয়ে যাচ্ছেন। কান পাততেই শোনা গেল নতুন বছরে বাড়িভাড়া বৃদ্ধি, বাসা বদলানোর ঝক্কি, ছেলেমেয়েদের স্কুলে ভর্তি, শীতের সবজির দাম কিংবা বেড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে আলাপ। সেই সঙ্গে আলাপে উঠে এলো অন্যান্য বছরের তুলনায় ঢাকায় এবার শীতের তীব্রতার কথাও। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতেই কেউ সেরে নিলেন ব্যবসায়িক, পারিবারিক কিংবা অফিশিয়াল আলাপ।
৩০ বছরের বেশি সময় ধরে তেজগাঁওয়ের এ জায়গাটিতে চা বিক্রি করছেন মজিদ মিয়া। বললেন,‘এখানে যারা চা খেতে আসেন, অধিকাংশই আশপাশের ফ্যাক্টরি অথবা অফিসে কাজ করেন। পাশেই মহাখালী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল হওয়ায় অনেক যাত্রী, পথচারীও চায়ে চুমুক দিয়ে ক্লান্তিদূর করতে আসেন।’
শীতের মৌসুমে চায়ের বিকিকিনি রমরমা হলেও চায়ের দোকানে আগের মতো আড্ডা জমে না বলে জানালেন মজিদ মিয়া। কিন্তু কেন জমে না? উত্তরটা দিলেন কেটলি থেকে কাপে চা ঢালতে ঢালতেই, ‘এখন সবাই ব্যস্ত। দুই দন্ড বসার ফুরসত নেই। যদিওবা বসে, মোবাইল হাতে নিয়ে টিপতে থাকে। চোখ দুইটা থাকে মোবাইলের দিকে।’
বাংলাদেশের জন্ম-ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে দুটি চা-দোকানের নাম। প্রথমটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুদা’র ক্যান্টিন, অন্যটি পাবনার রূপপুরের বিবিসি বাজার।
১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে এদেশের মানুষের অধিকার আদায়ে যত আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে তার সঙ্গে ‘মধুর ক্যান্টিন’ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ক্যাম্পাসে একটি কথা প্রচলিত রয়েছে, মধুর ক্যান্টিনে না এলে ভালো রাজনীতিবিদ হওয়া যায় না। এ কথার প্রমাণ মেলে বর্তমান ছাত্র সংগঠনগুলোর ‘মধু’কেন্দ্রিক কার্যক্রমে। ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা প্রতিদিনই সকাল-বিকাল জমায়েত হন মধুর ক্যান্টিনে। আজও দেশের যেকোনো সংকটকালে ও গণমানুষের অধিকার আদায়ে ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ ভূমিকার ডাক দেওয়া হয় এখান থেকে। ’৪৮-এর ভাষা আন্দোলন, ’৪৯-এর বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলন, ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৭০-এর সাধারণ নির্বাচন ও সর্বশেষ মুক্তিযুদ্ধের সময় বলিষ্ঠ নেতৃত্ব আসে এ ক্যান্টিন থেকেই।
’৬৯ থেকে ’৭১ পর্যন্ত বহু বৈঠক মধুর ক্যান্টিনে হয়েছে। যার কারণে মধুদার ক্যান্টিনটি ক্রমেই ছাত্র রাজনীতির মূল ঘাঁটিতে রূপান্তরিত হয়। মধুদার আন্তরিক ব্যবহার ও সততার জন্য খুব অল্প সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের বিশ্বস্ত হয়ে ওঠেন। সেই বিশ্বস্ততার দামও দিতে হয় তাকে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে প্রবেশ করে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় মধুদাকে। মধুদার ছেলে অরুণ কুমার দে’র ভাষ্যমতে, সেই রাতে তার বাবা অর্থাৎ মধুদার হাতে প্রথম গুলি লাগার পর ওই দৃশ্য দেখে তার মা’ও মারা যান। একই রাতে আরও মারা যান মধুদার সদ্যবিবাহিত পুত্র রণজিৎ কুমার ও তার স্ত্রী রিনা রানী।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ক্র্যাকডাউনের পর কাশেম মোল্লা পাকশীর রূপপুরে নিজ গ্রামে চলে যান। সেখানে নিজ হাতে লাগান একটি কড়ই গাছ। গাছের পাশেই দেন ছোট্ট একটি চায়ের দোকান। তখন স্ত্রী আনোয়ারা বেগমের ইচ্ছায় কাশেম মোল্লা ‘থ্রি ব্র্যান্ডের একটি রেডিও কেনেন। তখন ‘থ্রি ব্র্যান্ড’ রেডিওর মালিক হওয়া ছিল রীতিমতো গর্বের। চায়ের দোকানে ক্রেতাদের ভিড় জমানোর জন্য রেডিওটি তিনি প্রতিদিন দোকানে নিয়ে যেতেন। পুরোদমে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে বিবিসি বাংলায় খবর প্রচারিত হতো। খবর শোনার জন্য মুক্তিযোদ্ধারা কাশেম মোল্লার চায়ের দোকানে আসতেন। রাতে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র, বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা ও কলকাতা বেতারের খবর শোনার জন্য আশপাশের মানুষ নিয়মিত ভিড় জমাত তার চায়ের দোকানে। খবরে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের কথা শুনে একদিকে যেমন অবরুদ্ধ দেশবাসী উদ্দীপ্ত হতেন, তেমনি দেশজুড়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর চালানো বর্বরতা সম্পর্কেও জানা যেত।
পাকহানাদার বাহিনীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি রেডিওতে মুক্তিযোদ্ধাদের খবর শোনাতেন। চা খেতে আসা লোকজনের কাছ থেকে পাওয়া নানারকম তথ্য থাকত কাশেম মোল্লার কাছে। গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের দেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর ও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সম্পর্কে তথ্য দিতেন তিনি।
ক্রমেই ভিড় বাড়তে থাকে তার দোকানে। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তার গড়ে ওঠে সখ্য। দেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েকদিন আগে রাজাকারদের খবরের ভিত্তিতে পাকিস্তানি সেনারা হানা দেয় কাশেম মোল্লার চায়ের দোকানে। রাইফেলের বাঁট দিয়ে তার পায়ে আঘাত করে। সেই থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত খুঁড়িয়ে হাঁটতেন কাশেম মোল্লা।
মুক্তিযুদ্ধের সময় সন্ধ্যা হলেই রূপপুর গ্রামে হাঁকডাক শুরু হয়ে যেত। গ্রামের লোকেরা একে অন্যকে বলত, ‘চলো বিবিসি শুনতে যাই। এভাবে কাশেম মোল্লার চায়ের দোকানে বিবিসি’র খবর শোনাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে আরও কয়েকশ’ দোকান, বিস্তার লাভ করতে থাকে বাজার, যা দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ‘বিবিসি শোনার বাজার’ থেকে মানুষের মুখে মুখে ‘বিবিসি বাজার’ নামে পরিচিত হয়।

0 171

নিয়ন্ত্রণে নেই ‘বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন’

কারিকা প্রতিবেদক

ভাড়াটিয়াদের জন্য নতুন বছর আসছে বাড়তি বাড়িভাড়ার বোঝা নিয়ে। ঢাকাসহ দেশের অধিকাংশ জায়গায় বাড়িওয়ালারা নতুন বছরে ভাড়াটিয়াদের বাড়তি বাড়িভাড়া দেওয়ার জন্য ইতিমধ্যে নোটিশ দিয়েছেন। চলতি বছরের জুলাই মাসে গ্যাসের বর্ধিত মূল্য কার্যকর করে সরকার। তখন বাড়িওয়ালারা এক দফা বাড়িভাড়া বাড়িয়েছিলেন। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার দোহাই দিয়ে বছরান্তে আরেক দফা বাড়িভাড়া বাড়ানোর জন্য নোটিশ দিয়েছেন।
অন্যদিকে, গত সেপ্টেম্বরে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করায় পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসের দাম বেড়েছে। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে শিক্ষা, পরিবহনসহ অন্যান্য ব্যয়।
জীবনযাত্রার অন্যান্য ব্যয়ের সঙ্গে বাড়তি বাড়িভাড়ার বোঝা যোগ হওয়ায় দিশেহারা রাজধানীর মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষেরা।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) হিসাবে, ২৫ বছরে রাজধানীতে বাড়িভাড়া বেড়েছে ৩৮৮ শতাংশ। ভাড়াটিয়া ঐক্য পরিষদ বলেছে, বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণে আইন আছে। রাজধানীর কোন এলাকায় বাড়ি ভাড়া কত হবে-সেটিও নির্ধারিত। কিন্তু এসব শুধু কাগজ-কলমেই, বাস্তবে কোনো প্রয়োগ নেই। ফলে বাড়ির মালিকরা এমন স্বেচ্ছাচারিতা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন চান ভাড়াটিয়া ও ভোক্তা-অধিকার কর্মীরা।
১৩ বছর ধরে রাজধানীর কলাবাগান এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন শামসুর রহমান। প্রথমে যখন বাসায় ওঠেন, ভাড়া ছিল আট হাজার টাকা। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম হারে বাড়িয়ে এখন প্রতি মাসে তাকে ২২ হাজার টাকা বাসাভাড়া গুনতে হয়। ছেলেমেয়ের স্কুল এবং তার অফিস কাছে হওয়ায় বেশি ভাড়ার বোঝা নিয়েই ওই বাসায় ভাড়া করছেন তিনি।
শুধু কলাবাগান কিংবা মোহাম্মদপুর নয়, রাজধানীসহ সারা দেশেই, বিশেষত নগর ও শহরাঞ্চলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে বাসাভাড়া।
রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, কল্যাণপুর, কাঁঠালবাগান, গ্রিন রোড, ধানমণ্ডি, রামপুরা, সেগুনবাগিচা, বংশাল, গুলশান, বনানী, উত্তরা, বসুন্ধরা, আগারগাঁও, শ্যামলী, মগবাজার, মালিবাগসহ বিভিন্ন এলাকার ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি বছরই নানা অজুহাতে বাড়ির মালিক ভাড়া বাড়ান। আরোপ করা ভাড়া না দিতে চাইলে দেয়া হয় বাড়ি ছাড়ার নোটিশ। বাড়িভাড়া সংক্রান্ত আইন না জানায় এবং আইনের প্রয়োগ না থাকায় অনেকটা নিরুপায় হয়ে বাসিন্দারা মেনে নেন বেশি ভাড়ার শর্ত।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষ যেসব এলাকায় বসবাস করে সেখানে চাহিদার তুলনায় বাড়ির সংখ্যা কম। ফলে বাড়িওয়ালারা ভাড়াটিয়াদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বাড়িভাড়া, গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের বিল বাড়ায় ঢাকাবাসীর দৈনন্দিন ব্যয়ও বাড়ছে। বাড়িভাড়া নিয়ে যে আইন আছে, তা ভাড়াটিয়া-সহায়ক নয়। সরকারের আইন প্রয়োগের বিষয়ে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি গৃহায়ণ কর্মসূচির উদ্যোগ বাড়াতে হবে।
১৯৯১ সালের বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের ১৫ নম্বর ধারা কেন আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না-তা জানতে চেয়ে গত ১ ডিসেম্বর রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। এ ছাড়া ‘ভাড়া নিয়ন্ত্রক’ নিয়োগসহ বাড়িভাড়ার বিদ্যমান অসঙ্গতি দূর করে মানসম্মত বাড়িভাড়া নির্ধারণ ও সুপারিশ প্রণয়নে অনুসন্ধান আইন, ১৯৫৬-এর ৩(১) ধারা অনুযায়ী অনুসন্ধান কমিশন গঠনে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না-রুলে তাও জানতে চেয়েছেন আদালত। চার সপ্তাহের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব, সংসদ সচিবালয় ও আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং ঢাকা সিটি করপোরেশনের (উত্তর ও দক্ষিণ) মেয়রসহ সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের এ রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
রুল প্রসঙ্গে ভাড়াটিয়া পরিষদের সভাপতি বাহারানে সুলতান বাহার বলছেন, বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের অসঙ্গতি দূর করে এটাকে যুগোপযোগী করা জরুরি ও অত্যাবশ্যক। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের ভাড়া নির্ধারণ পদ্ধতি-সংক্রান্ত ধারাটি কেন অবৈধ ও বেআইনি ঘোষণা করা হবে না-তা জানতে চেয়ে হাইকোর্ট সম্প্রতি যে রুল জারি করেছেন আমরা তা স্বাগত জানাই। বাড়িভাড়া আইনের বিদ্যমান অসঙ্গতি দূর করে মানসম্মত বাড়িভাড়া নির্ধারণের যে সুপারিশ হাইকোর্ট করেছেন, তা অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও বর্তমানে ভাড়াটিয়াদের প্রাণের দাবি।
তিনি বলেন, আমরা প্রত্যাশা করি, সংশ্লিষ্টরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি সম্পর্কে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে হাইকোর্টকে মতামত জানাবেন এবং ভাড়াটিয়াদের জন্য ন্যায্য ভাড়া নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।
অন্যদিকে বাড়ির মালিকরা বলছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে, তার ওপর বাড়িভাড়ার টাকার ওপর অনেক মালিকই নির্ভরশীল। সেই সঙ্গে বাড়ছে নানা ধরনের ট্যাক্স। বাড়ির মেনটেইনেন্স খরচও আগের থেকে অনেক বেড়েছে। এসব কারণে ভাড়া বাড়াতে হয়। তাদের দাবি, অনেক বাড়িওয়ালার কোনো ব্যবসা বা ইনকাম থাকে না, বাড়িভাড়ার ওপরই নির্ভর করতে হয়। তাদের সাংসারিক খরচ মেটাতে অনেক হিমশিম খেতে হয়। তাই বাড়িভাড়া না বাড়িয়ে উপায় থাকে না।

0 94

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

সোহরাব আলম

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত স্মৃতি সম্বলিত আধুনিক জাদুঘর ‘মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক দেশের প্রধান এই প্রতিষ্ঠান রাজধানীর আগারগাঁওয়ে প্রায় দুই বিঘা জায়গার ওপর নির্মিত। স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর লড়াকু বাঙালির স্মৃতি, সত্তা ও আবেগ সংরক্ষণ করা হয়েছে এই জাদুঘরে। জাদুঘরটিতে রয়েছে প্রাচীন বাংলা থেকে বর্তমান বাংলাদেশের (১৯৭০ পর্যন্ত) পরম্পরার বিন্যাস। এটি নতুন প্রজন্মকে মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানানোর এক পরিকল্পিত স্থান। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা, প্রকাশনা, ভ্রাম্যমাণ প্রদর্শনী, মৌখিক ইতিহাস সংগ্রহসহ বহুমুখী কার্যক্রমে সম্প্রসারিত এ জাদুঘর।
মুক্তিযুদ্ধের স্মারক প্রদর্শনের জন্য মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে রয়েছে চারটি গ্যালারি। ভবনের চতুর্থ ও পঞ্চম তলায় গ্যালারিগুলোতে স্থান পেয়েছে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিনিধিত্বমূলক প্রত্ননিদর্শন। রয়েছে আলো-আঁধারির খেলাও। ২০ টাকায় প্রবেশ টিকিট কেটে র‌্যাম্পে হেঁটে যেতে হয় চতুর্থ তলায়। জাদুঘরের চারটি গ্যালারির দুটি এই তলায়। প্রথম গ্যালারিতে ঢুকলেই দেখা যায়, প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত; ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, পাকিস্তান পর্ব, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন হয়ে সত্তরের সাধারণ নির্বাচন, দেশের ভূপ্রকৃতির বৈশিষ্ট্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতি, এ জনপদের প্রতিনিধিত্বমূলক বিভিন্ন প্রত্ননিদর্শন।
প্রথম প্রদর্শনকক্ষটির নাম : আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের সংগ্রাম। ফসিল, প্রাচীন টেরাকোটা, মৃৎপাত্র, শিলাখন্ডসহ নানা প্রকার নিদর্শনের সঙ্গে রয়েছে ঐতিহাসিক ঘটনা ও ব্যক্তির আলোকচিত্র।
দ্বিতীয় প্রদর্শনকক্ষের নাম : আমাদের অধিকার, আমাদের ত্যাগ। এই কক্ষ থেকেই দর্শক সরাসরি ঢুকে পড়বেন মহান মুক্তিযুদ্ধের পর্বে। স্বাধীনতার ঘোষণা, ৪ এপ্রিল কুষ্টিয়ার যুদ্ধ ও সারা দেশের গণহত্যার নিদর্শন রয়েছে এ গ্যালারিতে। আছে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্র। আরও রয়েছে ১ জানুয়ারি ১৯৭১ সাল থেকে ৩০ এপ্রিল ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সংগ্রহ। শব্দ ও আলোর প্রক্ষেপণের বিশেষ প্রদর্শনীর এ গ্যালারি আমাদের অধিকার, আমাদের ত্যাগের। আলোকচিত্র, নিদর্শন আর স্থাপনাকর্মে ফুটে উঠেছে রেসকোর্স ময়দানে ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ, ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞ, প্রতিরোধযুদ্ধ ও মুজিবনগর সরকার গঠন।
এরপর সিঁড়ি বা লিফটে পঞ্চম তলায় গিয়ে দেখা যাবে বাকি দুটি। গ্যালারি দুটির নাম ‘আমাদের যুদ্ধ, আমাদের মিত্র’ আর ‘আমাদের জয়, আমাদের মূল্যবোধ’।
‘আমাদের যুদ্ধ, আমাদের মিত্র’ গ্যালারিতে রয়েছে ১ মে থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সব স্মৃতি। এরমধ্যে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া উদ্বাস্তুদের জীবনযাপন, তাদের সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও যুদ্ধের বিভিন্ন প্রশিক্ষণকে সামনে আনা হয়েছে আলোকচিত্রের মধ্য দিয়ে। এ ছাড়া শরণার্থীদের ব্যাগ, কম্বল, যুদ্ধের সার্টিফিকেটসহ মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধ উপলক্ষে তৈরি বিভিন্ন পোস্টার, শহীদদের ব্যবহৃত সামগ্রী ও আন্তর্জাতিক সমর্থনকে তুলে ধরা হয়েছে।
‘আমাদের জয়, আমাদের মূল্যবোধ’ গ্যালারিতে ‘বিলোনিয়া যুদ্ধের মডেল’ ব্যবহার করে দর্শকদের দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ চলার সময়ের অভিজ্ঞতা স্বাদ। এখানে ঠাঁই পেয়েছে চিথলিয়া রেল স্টেশনে যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষ। আছে ৭১-এর যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহৃত বিভিন্ন মেশিনগান, নারী নির্যাতনের বিভিন্ন চিত্র, মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহৃত অ্যাশট্রে, কলম, চশমা; যুদ্ধে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর নানা কার্যক্রম, দগ্ধ ঘরবাড়ির অংশসহ পাক হানাদারবাহিনীর আত্মসমর্পণের চিত্র।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ইতিহাস-সমৃদ্ধ চারটি গ্যালারি যেন জাতির গৌরবদীপ্ত ইতিহাসের সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার অন্যতম একটি মাধ্যম। একইসঙ্গে এ ইতিহাস সবসময় প্রেরণা সঞ্চার করে বিকশিত একটি সমাজ গঠনের।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের স্থপতি তানজিম হাসান সেলিম। তিনি কারিকা’কে বলেন, ‘আমার জীবনের এখন পর্যন্ত করা সবচেয়ে বড় কাজ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, যা নিয়ে আমি গর্ব করি। আমার চিন্তা ছিল, এটি যেন সারা বিশ্বের মুক্তি-সংগ্রামীদের আবেগের জায়গাটা ধরতে পারে। বিশেষত আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের যে সংগ্রাম, রাজনৈতিক নেতাদের কূটনৈতিক তৎপরতা, সামরিক বাহিনীর ভূমিকা এবং সাধারণ মানুষকে প্রশিক্ষিত করায় ভূমিকা নেওয়া-সবগুলো বিষয়ই ধরার একটা প্রয়াস।’
স্থপতি তানজিম হাসান সেলিম আরও বলেন, ‘ভাগ্যক্রমে আমরা খুব কম সময়ে; মাত্র ৯ মাসে স্বাধীনতা পেয়েছি। কিন্তু এই ৯ মাসে অনেক জীবন গেছে, অনেক রক্ত ঝরেছে। অনেক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। যে হারিয়েছে, তার দুঃখ আমরা মুছে পারব না। অনেক মানুষ আছে, যারা হয়তো সে অর্থে স্বীকৃত নন কিন্তু যুদ্ধে তার অনেক অবদান আছে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এসে যেন তারা অনুভব করে, এটা তার আবেগের জায়গা।’
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর রোববার ও সরকারি ছুটির দিন ছাড়া সোম থেকে শনিবার প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। শীতকালে (অক্টোবর থেকে ফ্রেরুয়ারি) খোলা থাকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত আর রমজান মাসে বেলা সাড়ে ৩টা পর্যন্ত।

0 90

কারিকা প্রতিবেদক
ঢাকার কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল আবাসিক এলাকায় প্রায় ১৪ হাজার ফ্ল্যাট নির্মাণের কাজ শুরু করেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। ২০২৩ সালের মধ্যে পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি হতে যাচ্ছে দেশের অন্যতম প্রধান বহুতল ভবনবিশিষ্ট আবাসন প্রকল্প। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে মালয়েশিয়ার ‘বিএনজি গ্লোবাল হোল্ডিংস অ্যান্ড কনসোর্টিয়াম’।
রাজউক সূত্রে জানা গেছে, ‘ঝিলমিল রেসিডেন্সিয়াল পার্ক’ প্রকল্পের আওতায় ফ্ল্যাটগুলো নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ২০১৭ সালের নভেম্বরে বিএনজি গ্লোবাল হোল্ডিংস অ্যান্ড কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চুক্তি করেছিল রাজউক। চুক্তি অনুযায়ী, ঝিলমিল আবাসিক এলাকায় ১৬০ একর জমিতে হবে এই প্রকল্প। প্রকল্পের আওতায় মোট ৮৫টি ভবন নির্মাণ করবে বিএনজি। ভবনগুলোর মধ্যে ৬০টি হবে সেমি বেসমেন্টসহ ২০ তলা ও ২৫টি হবে বেসমেন্টসহ ২৫ তলার। মোট তিনটি শ্রেণিতে ফ্ল্যাট হবে ১৩ হাজার ৭২০টি। ‘এ’ শ্রেণির ১ হাজার ৫৫০ বর্গফুট আয়তনের ফ্ল্যাট হবে ৯ হাজার ১২০টি, ‘বি’ শ্রেণির ১ হাজার ৭৫০ বর্গফুটের হবে ২ হাজার ৫৭৬টি এবং ‘সি’ শ্রেণির ২ হাজার ৪০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট হবে ২ হাজার ২৪টি। আগামী ডিসেম্বর বা জানুয়ারি নাগাদ ফ্ল্যাট বরাদ্দের আবেদন আহবান করা হবে।
ঝিলমিল প্রকল্পের অবস্থান বুড়িগঙ্গা নদীর চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সেতু থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে। প্রকল্পের পাশ দিয়ে গেছে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক। তা ছাড়া ঢাকা শহরে যাতায়াতের জন্য একটি উড়ালসড়ক নির্মাণেরও পরিকল্পনা আছে। প্রকল্প-এলাকার ভেতরে চলাচলের জন্য ১২ দশমিক ১৯ মিটার থেকে ৩৬ দশমিক ৫৮ মিটার প্রশস্ত রাস্তা তৈরি করা হবে। এলাকার চারপাশে থাকবে মোট ছয়টি প্রবেশপথ। মূল প্রবেশপথের সামনে থাকবে ৬০ দশমিক ৪০ মিটার প্রশস্ত রাস্তা, যা হবে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত। পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হলে এখান থেকে ঢাকা শহরের পাশাপাশি দেশের দক্ষিণাঞ্চলে যোগাযোগ সহজ হয়ে যাবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, ঝিলমিল প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ হাজার ৯৭৯ কোটি ২০ লাখ টাকা। পুরো টাকা বিনিয়োগ করবে বিএনজি। এরপর ছয় কিস্তিতে বিনিয়োগের টাকা পরিশোধ করবে রাজউক।
চুক্তি অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হওয়ার দুই বছর পর বিএনজিকে ৪০০ কোটি টাকা দেবে রাজউক। এর পরের বছর অর্থাৎ চতুর্থ বর্ষে আরও ৪০০ কোটি টাকা এবং পঞ্চম থেকে অষ্টম বছর পর্যন্ত প্রতি বছর একটি করে আরও চার কিস্তিতে ২ হাজার ২৯৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা করে পরিশোধ করা হবে।
রাজউক সূত্র জানিয়েছে, ঝিলমিল প্রকল্পের ভবনগুলো ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল বিল্ডিং সিস্টেম’ (ভবন নির্মাণের আধুনিক একটি প্রক্রিয়া) প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্মাণ করা হবে। এখানে ইটের ব্যবহার থাকবে না, পুরো কাজ হবে আরসিসি ঢালাই দিয়ে। তাই ভবনগুলো মজবুত ও ভূমিকম্প সহনীয় হবে। প্রকল্প এলাকার মোট জমির ৩২ শতাংশে থাকবে ভবন, বাকি ৬৮ শতাংশ উন্মুক্ত থাকবে। এতে লেক, পার্ক, খেলার মাঠ, ওয়াকওয়ে, জগিং ট্র্যাক, কৃত্রিম ঝরনা, রাস্তা নির্মাণ করা হবে। এখানে যারা বসবাস করবেন, তাদের জন্য স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, মসজিদ, মার্কেট, কমিউনিটি স্পেসের ব্যবস্থা রাখা হবে। থাকবে পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ব্যবস্থাও।
নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাটের নির্মাণ ব্যয় ধরেছে ৩,৬৯৬ টাকা। আনুষ্ঠানিকভাবে নির্মাণকাজ শুরু করার পর প্রতি বর্গফুট ৪,৯০০-৫,১০০ টাকায় বিক্রি করবে রাজউক। বিক্রির জন্য রাজউকের অন্যান্য ফ্ল্যাট প্রকল্পের মতো এ ক্ষেত্রেও আবেদন আহবান করা হবে। লটারির মাধ্যমে ফ্ল্যাট বরাদ্দ চূড়ান্ত করা হবে। এ ক্ষেত্রেও কিস্তি সুবিধা থাকবে।

মির্জা মাহমুদ আহমেদ

বাংলাদেশের বাস্তবতায় নারীরা বৃদ্ধ বয়সে পরিবারের বোঝা হিসেবে বিবেচিত হয়। শুধু বয়স্ক নারীদের কথাই বলছি কেন? কম বয়সের অনেক নারীও দারিদ্র, যৌতুক, স্বামীর মাদক গ্রহণ ও বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের কারণে নির্যাতিত হন। বেশিরভাগ নারী মুখ বুজে স্বামীর নির্যাতন মেনে নিলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্যাতন মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে অনেক সময় বিবাহ-বিচ্ছেদের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। বিবাহ-বিচ্ছেদের পর নির্যাতিত নারীরা পারিবারিক ও সামাজিক কোনো সহায়তা পান না। অন্যদিকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাবে কোনো সম্মানজনক পেশাও তারা বেছে নিতে পারেন না। যার ফলে বেশিরভাগ দারিদ্রপীড়িত নারী স্বল্পবেতনে অসম্মানজনক পেশা বেছে নিতে বাধ্য হন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনেকে ভিক্ষাবৃত্তি বা অবৈধ-অসামাজিক কাজের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েন।
অসহায় দারিদ্রপীড়িত এসব নারী ও শিশুদের সহায় হিসেবে কাজ করছে ‘আমব্রেলা ফাউন্ডেশন’। প্রতিষ্ঠার পর থেকে অলাভজনক, অরাজনৈতিক ও স্বেচ্ছাসেবী এ সংস্থাটি দরিদ্র স্বামী পরিত্যাক্তা নারী ও শিশুদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, পোশাক ও খাদ্যের যোগান দিয়ে যাচ্ছে। বিগত বছরগুলোর মতো সামনেও ‘আমব্রেলা ফাউন্ডেশন’ এ সকল নারী-শিশুদের পুনর্বাসনে সহযোগিতার আন্তরিক কোমল হাত বাড়িয়ে দিতে চায়।
‘আমব্রেলা ফাউন্ডেশন’ এমন একটি সমাজের স্বপ্ন দেখে, যেখানে কোনো নারী ও শিশু মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে না। তাই বর্তমানে এ সংস্থায় আশ্রিতদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা, পুষ্টিকর খাবার ও পানীয় জল সরবরাহ করা, অনিরাপদ পরিবেশ থেকে রক্ষা করাসহ মনস্তাত্বিক পরামর্শ ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। নারী ও শিশুদের জন্য নিরাপদ, অহিংস, বৈষম্য ও অন্যায়মুক্ত স্বপ্নের সমাজ গঠনের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে সংস্থাটি।
গৃহহীন নারী ও শিশুদের জীবনমান উন্নত করার পদক্ষেপ হিসেবে শিশুদের শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা ও নারীদের স্বনির্ভর করার উদ্দেশে কাজ করে যাচ্ছে তারা।
বর্তমানে ছয়টি প্রাথমিক পরিষেবার ভিত্তিতে ‘আমব্রেলা ফাউন্ডেশন’ নারী ও শিশুদের জন্য কাজ করছে। যার মধ্যে রয়েছে দরিদ্র, অসহায় নারীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থলের ব্যবস্থা করা, সমাজে পুনর্বাসন না হওয়া পর্যন্ত আশ্রয় গ্রহনের সুযোগ প্রদান করা, আশ্রিত নারী ও শিশুদের খাদ্য এবং প্রয়োজনীয় সকল উপকরণ সরবরাহ করা এবং নিরাপদ পানি পান, রান্না এবং গৃহস্থালির কাজে ব্যবহারের জন্য টিউবওয়েল স্থাপন করা।
জানা গেছে, আমব্রেলা ফাউন্ডেশনে আশ্রিত নারী ও শিশুদের বিশেষ দক্ষতার বিকাশ ঘটাতে ও সামাজিকভাবে সংগঠিত করতে প্রাথমিক শিক্ষা ও উন্নয়ণ প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। এ ছাড়াও নারীদের গৃহস্থালি, সেলাই, রান্না, হাঁস-মুরগী পালনবিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদানের পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষা ও পরিবার পরিকল্পনা সংক্রান্ত প্রশিক্ষনও প্রদান করা হচ্ছে।
আশ্রিত নারীদের স্বাস্থ্য ও আইনি সেবা নিশ্চিতের লক্ষ্যে তাদের বিভিন্ন স্থানীয় হাসপাতাল, ক্লিনিক ও আইনি সেবাসংস্থার সঙ্গে নেটওয়ার্ক স্থাপন করে দিয়েছে আমব্রেল ফাউন্ডেশন।
এসব জনহিতকর কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। তাই যেকোনো কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ও সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিরা এ মানবিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন।
জানা গেছে, ‘আমব্রেলা ফাউন্ডেশন’ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কৌশলগত অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে স্পন্সরশিপ আহবান করছে। এ ছাড়া ব্যক্তিশ্রেণির ডোনারদের কাজ থেকে ‘লাইফ টাইম মেম্বার’, ‘রেগুলার মেম্বার’ এবং ‘ওয়ান টাইম চ্যারিটি’ ক্যাটাগরিতে অনুদান সংগ্রহ করছে।

0 59

কারিকা প্রতিবেদক
যানজট নিত্যসঙ্গী, অথচ রাজধানী ঢাকার রাস্তায় চলাচলের জন্য নিবন্ধন নেওয়া গাড়ির সংখ্যা আন্তর্জাতিক মানদন্ডের চেয়ে সাত গুণ বেশি। গত ১০ বছরে গাড়ি বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। এর মধ্যে প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেল ৬৫ শতাংশ। বিআরটিএর সর্বশেষ পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে এ তথ্য মিলেছে।
জানা গেছে, ঢাকায় ছোট গাড়ি নিয়ন্ত্রণে বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ উপেক্ষা করে বিআরটিএ নিয়ন্ত্রণহীনভাবে নিবন্ধন দিয়েছে। ফলে বেড়ে গেছে ব্যক্তিগত গাড়িসহ অন্যান্য ছোট গাড়ির সংখ্যা। এতে বেড়েছে নানা সমস্যাও। মামলা দিয়েও সমস্যার কূল কিনারা করতে পারছে না পুলিশ বা বিআরটিএ।
রাস্তার তুলনায় গাড়ি চলার হার বিবেচনায় আন্তর্জাতিক মানদন্ডে ঢাকায় সর্বোচ্চ ২ লাখ ১৬ হাজার গাড়ি চলতে পারে। অথচ বিআরটিএ গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিবন্ধন দিয়েছে ১৪ লাখ ৯৩ হাজার ২৩৩টি গাড়িকে। ২০১১ সাল পর্যন্ত নিবন্ধিত ছিল ৭ লাখ ২ হাজার ৯৪৭টি গাড়ি।
পাশের দেশ ভারতসহ যুক্তরাজ্য, চীন ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোতে সড়কে শৃঙ্খলা রাখতে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। চীন ও সিঙ্গাপুরে গাড়ি কেনার নীতি রয়েছে লটারি পদ্ধতিতে। ভারতের দিল্লিতে নম্বরের জোড়-বিজোড় পদ্ধতিতে ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচলের নিয়ম চালু করা হয়েছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের ব্যবস্থার দাবি বিভিন্ন সময়ে তুলেছেন কেউ কেউ। কিন্তু বাস্তবে তা কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) সূত্রে জানা গেছে, গত আগস্টেই বিআরটিএর কাছে ঢাকায় মোটরসাইকেল নিবন্ধন আর না দেওয়ার প্রস্তাব করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
এদিকে পুরনো আইনের চেয়ে নতুন আইনে জরিমানা বেশি হওয়ায় তা থেকে রেহাই পেতে গাড়ি চালানোর অনুমতিপত্র বা লাইসেন্স ও গাড়ির ফিটনেস সনদ পেতে বিআরটিএর বিভিন্ন কার্যালয়ে গ্রাহকদের ভিড় বাড়ছে।
বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, দেশে প্রায় তিন লাখ চালক ড্রাইভিং লাইসেন্স পাচ্ছেন না। এর মধ্যে মামলার স্লিপ নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন দেড় লাখ চালক। নতুন আইনে লাইসেন্স না থাকলে ছয় মাসের জেল বা অনধিক ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডের বিধান রয়েছে।
ঢাকার বিআরটিসি সূত্র জানায়, ঢাকায় এসি বাস ছাড়া কোনো ছোট গাড়ির রুট পারমিট দেওয়া হবে না। কোম্পানিভিত্তিক বাস চলাচল পদ্ধতি চালু হলে ছোট গাড়ি নিরুৎসাহ হবে। তবে তা হতে আরও দুই বছর লেগে যাবে।
নতুন সড়ক পরিবহন আইনের ষষ্ঠ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, সরকার বা সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে কর্তৃপক্ষ জনস্বার্থে সমগ্র বাংলাদেশ বা যেকোনো এলাকার জন্য যেকোনো ধরনের মোটরযানের সংখ্যা নির্ধারণ করতে পারবে। কোনো এলাকায় মোটরযানের সংখ্যা নির্ধারিত সংখ্যার বেশি হলে অতিরিক্ত মোটরযান অন্যত্র চলাচলের অনুমতি দেওয়া যাবে। আইনের এ বিধান অনুসরণ করার ওপর জোর দিয়ে বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, ‘কত গাড়ি চলাচল করে, তা বিজ্ঞানসম্মতভাবে বের করে কোন এলাকায় কত গাড়ি চলবে, তা নির্ধারণ করা দরকার। এতে শৃঙ্খলা রক্ষা করা যাবে।’
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের গবেষণায় বলা হয়েছে, গাড়ির সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, আইনের দুর্বল প্রয়োগ ও নির্ধারিত বাস স্টপেজ ব্যবহার না হওয়ায় রাজধানীতে যানজট প্রকট রূপ নিয়েছে। যানজটের বড় কারণ ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যাপারে জনগণকে নিরুৎসাহ না করা।
বিআরটিএ সূত্র জানায়, ঢাকায় বিআরটিএর আটজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও চট্টগ্রামে দুজন ম্যাজিস্ট্রেট ছাড়াও বিভিন্ন জেলা ও পুলিশ প্রশাসন অভিযান চালাবে।
বিআরটিএর চেয়ারম্যান ড. কামরুল আহসান বলেন, ‘নতুন আইন সম্পর্কে জনগণকে জানাতে হবে। আমাদের প্রস্তুতির পর শিগগিরই মাঠ পর্যায়ে নতুন আইন কার্যকর করা হবে।’

0 316

কারিকা প্রতিবেদক
কথায় আছে, চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে। বিপদের মুহূর্তে বা জরুরি প্রয়োজনের সময় আমরা অনেকেই কী করব ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। এখন আর এ কথা খাটবে না! যেকোনো বিপদ বা জরুরি সেবার জন্য আছে হটলাইন ৯৯৯, যা জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর। জরুরি মুহূর্তে পুলিশি সহায়তা, ফায়ার সার্ভিসের সেবা বা অ্যাম্বুলেন্স পেতে ৯৯৯ নম্বরে একটি ফোনকলই যথেষ্ট হতে পারে। আপনার কল পেয়ে ছুটে আসবে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস কর্মী বা অ্যাম্বুলেন্স। এ সেবা পেতে হাতে মোবাইল ফোন থাকলেই চলবে, অন্য কোনো খরচ বা ঝামেলার বালাই নেই। কারণ ৯৯৯ নম্বরে কল করা যায় সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।
‘৯৯৯’ নাগরিকের জরুরি যেকোনো প্রয়োজনে কোনো একটি মুঠোফোন থেকে সম্পূর্ণ টোল ফ্রি বা বিনামূল্যে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্স-সেবা দিয়ে থাকে। ৯৯৯ সার্ভিসের প্রশিক্ষিত কর্মীরা প্রয়োজন অনুযায়ী ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ বা অ্যাম্বুলেন্স-সেবা প্রদানকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন। সপ্তাহে ৭ দিন ২৪ ঘণ্টা চালু থাকে এই সেবা।
জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর কার্যক্রম পরিচালিত হয় রাজধানীর আবদুল গণি রোডের পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে। ২০১৭ সালের ১২ ডিসেম্বর জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর যাত্রা হয়েছিল। বাংলাদেশে এ ধরনের সেবা এটিই প্রথম। শুধু রাজধানী ঢাকার লোকজনই নয়, দেশের যেকোনো জায়গা থেকে ৯৯৯-এ ফোন করে সমস্যার কথা জানিয়ে দরকারি সহায়তা নেওয়া যায়। বিপদগ্রস্ত বা সহায়তাপ্রত্যাশী মানুষকে সেবা দিতে সার্বক্ষণিক অবস্থান করেন জরুরি সেবা ৯৯৯-এর কর্মকর্তা ও কর্মীরা।
নিজে বিপদগ্রস্ত হলে যেমন ৯৯৯-এ ফোন করে প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস বা অ্যাম্বুলেন্স-সহায়তা নেওয়া যায়, তেমনি রাস্তায় কাউকে অপরাধের শিকার বা দুর্ঘটনায় ভুগতে দেখলেও পুলিশকে জানানো যায়। প্রয়োজন হলে ডাকা যায় ফায়ার সার্ভিস বা অ্যাম্বুলেন্স। তিন ক্ষেত্রেই কল করতে হবে ৯৯৯-এ। এমনকি রাস্তার সরকারি গাছ রক্ষায়, বিপদগ্রস্ত পশু-পাখিকে উদ্ধারের জন্য সহায়তা চেয়ে ৯৯৯-এ ফোন করা যায়। আপনার ফোন পেয়ে সংশ্লিষ্ট থানা, ফায়ার সার্ভিস ইউনিট বা অ্যাম্বুলেন্স-সার্ভিসকে ঘটনাস্থলে পাঠিয়ে দেবে জাতীয় জরুরি সেবার কর্মী বা কর্মকর্তারা। এছাড়া ধর্ষণচেষ্টা, বাল্যবিয়ে রোধের মতো কাজেও আপনি ৯৯৯-এর সহায়তা নিতে পারেন। বিভিন্ন ধরনের অপরাধী গ্রেফতার, গৃহকর্মী নির্যাতন রোধ, পারিবারিক নির্যাতন বন্ধ ইত্যাদি প্রয়োজনে ৯৯৯-এ তথ্য দিয়ে সহায়তা করা যায়। এ পর্যন্ত ৯৯৯-এ ফোন করে ঝামেলা এড়িয়ে সহজে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন জরুরি সেবা পেয়েছেন লাখো মানুষ।
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক জানিয়েছেন, চলতি (সেপ্টেম্বর) মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ১ কোটি ৪২ লাখ ফোন রিসিভ হয়েছে। ১২ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় প্রতিমন্ত্রী এ তথ্য দেন।
জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, ‘এর মধ্যে বেশিরভাগ মানুষ সেবা পেয়েছেন। ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি সার্ভিসে এ মুহূর্তে ১৪২ কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছেন।’ তিনি জানান, এ সার্ভিসে জনবলের সংখ্যা পাঁচশ’তে উন্নীতকরণের চেষ্টা চলছে।
জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কর্মরত একজন কর্মকর্তা জানান, ধর্ষণ-সংক্রান্ত ঘটনা, গৃহকর্মী নির্যাতন, কাউকে আটকে রাখা, পাচার চেষ্টা, লিফটে আটকে পড়া, অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকা, দুর্ঘটনা, অগ্নিকান্ডের ঘটনা, অ্যাম্বুলেন্স, প্রাণনাশের আশঙ্কা, পারিবারিক সমস্যা সমাধান, নিখোঁজ শিশু উদ্ধার, গাছকাটা বন্ধ করা, শব্দদূষণ, ছিনতাইসহ নানা ধরনের সমস্যায় সাধারণ ও বিপদগ্রস্ত মানুষকে তারা এ পর্যন্ত সহযোগিতা করেছেন।
জাতীয় জরুরি সেবা হেল্প ডেস্ক ৯৯৯-এর পুলিশ সুপার মো. তবারক উল্লাহ বলেন, ‘প্রতিদিন নানা সমস্যায় মানুষ এখানে ফোন করছেন। জরুরি সহায়তা পেয়ে উপকৃত হচ্ছেন। তবে শুরুতে কৌতুহলী মানুষের প্রচুর ফোন আসত। এখন এই সমস্যা নেই বললেই চলে।’ শুরুতে ৩৩টি ওয়ার্কস্টেশন ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন ১০০টির মতো ওয়ার্কস্টেশন। তাতে এখন আগের চেয়ে ভালোভাবে সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।’
৯৯৯-এ ফোন করে কাউকে পরবর্তী সময়ে কোনো আইনি ঝামেলা পোহাতে হবে না উল্লেখ করে তবারক উল্লাহ বলেন, ‘এখানে তথ্যদাতার গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়।’ কোনো ক্ষেত্রে তথ্যদাতার পরিচয় প্রয়োজন হলে সেটাও নিজস্ব চ্যানেলে মোকাবেলা করা হয় বলে জানান তিনি।

0 278

কারিকা প্রতিবেদক
জাতীয় সংসদ ভবনকে বিশ্বখ্যাত স্থপতি লুই আই কানের মূল নকশায় ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে মূল সংসদ ভবনের শতাধিক অস্থায়ী কক্ষ ভেঙে ফেলার কাজ চলতি মাসেই শুরু করতে যাচ্ছে সংসদ সচিবালয়। অস্থায়ী কক্ষের বর্তমান অফিসগুলো মূল ভবনের বাইরে সচিব হোস্টেলে স্থানান্তর করা হবে। সেখানে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
তবে কতগুলো কক্ষ ভাঙা হবে সে ব্যাপারে এখনও কিছু নিশ্চিত করা যায়নি। এছাড়া সংসদের সীমানায় বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবর এবং স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাসভবনসহ অন্যান্য স্থাপনার বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বিদেশ থেকে মূল নকশা সংগ্রহের পরও জিয়ার কবর সংসদের সীমানায় পড়েছে কিনা, তা এখনও নিশ্চিত করতে পারেনি স্থাপত্য অধিদপ্তর।
মূল নকশায় ফেরার উদ্যোগ সম্পর্কে সংসদ সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব ড. জাফর আহমেদ খান বলেন, ‘মূল ভবনের অভ্যন্তরে অস্থায়ী কক্ষগুলো পর্যায়ক্রমে সরিয়ে নেওয়া হবে। চেষ্টা থাকবে যতদূর সম্ভব লুই আই কানের মূল নকশায় ফিরে যাওয়ার।’ তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজনের তাগিদে সংসদের ভেতরে কাঠের প্রাচীর দিয়ে অস্থায়ী কক্ষগুলো তৈরি করা হয়েছিল। সংসদের কাজে সরাসরি সম্পৃক্ত এমন বিভাগগুলো রেখে বাকিগুলো পর্যায়ক্রমে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।’
তিনি জানান, সচিব হোস্টেলে অবস্থানরতদের সরিয়ে নেওয়া এবং সংসদের অন্যদের আবাসনের জন্য পূর্ত মন্ত্রণালয়ের কাছে ৫০০ ফ্ল্যাট চাওয়া হবে। এসব ফ্ল্যাট পাওয়া গেলে সচিব হোস্টেল খালি করে সেখানেই কিছু অফিস স্থানান্তর করা হবে।
স্থপতি লুই কান প্রকৃতির সঙ্গে সংগতি রেখে এ ভবনের নকশা করেছেন। ভবনের ছাদে ব্যবহার করা হয়েছে কাচের ইট। বাতাস ও সূর্যের আলো যাতে অনায়াসে প্রবেশ করতে পারে, সেজন্য প্রতি ব্লকের চার ভাগের এক ভাগ খালি বা ভয়েড হিসেবে রাখা হয়েছে। যাতে বৈদ্যুতিক আলো ছাড়াই দিনের বেলায় কাজ করা যায়। কিন্তু বর্তমানে সংসদ ভবনে বৈদ্যুতিক আলো ছাড়া কাজ করার সুযোগ নেই। কারণ আলো ও বাতাস ঢোকার বেশিরভাগ পথ বন্ধ হয়ে গেছে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরির ফলে। এমনকি লেকের পাড়ে অবস্থিত কক্ষগুলোর বেশিরভাগেও এখন দিনের বেলা বিদ্যুৎ ছাড়া অন্ধকার থাকে।
৫৮ হাজার ৩২৭ দশমিক ৫৯ বর্গমিটার এলাকায় অবস্থিত সংসদ এলাকার মধ্যে পার্লামেন্ট ভবনের অবস্থান ৩ দশমিক ৪৪ একর জমিতে। পাশাপাশি উত্তর প্লাজা ১ দশমিক ৪৬ একর, দক্ষিণ প্লাজা ৪ দশমিক ৯৮ একর এবং বাকি জমিতে আবাসিক ভবন, হোস্টেল, বাগান, রাস্তা, লেক ইত্যাদি রয়েছে। ভবন কমপ্লেক্সে ৫০টি সোপান, ৩৪০টি শৌচাগার, ১ হাজার ৬৩৫টি দরজা, ৩৩৫টি জানালা, ৩০০টি পার্টিশন দেয়াল, ৩ হাজার ৩৩০ দশমিক ৫৭ বর্গমিটার কাচের শাটার, ৫ হাজার ৪৩৪ দশমিক ৮৩ বর্গমিটার কাঠের শাটার এবং ৩ হাজার ৭৩৮ ঘনমিটার কাঠের প্যানেল রয়েছে। ভবনের সর্বোচ্চ তলাটি বা লেভেল ১০ ব্যবহার্য বিভিন্ন যন্ত্রপাতির জন্য নির্ধারিত।
গণপূর্ত বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, লুই কানের নকশায় ভবনের কক্ষের সংখ্যা থাকার কথা ৪০০। কিন্তু এখন আছে ৫০০-এরও বেশি। বড় কক্ষগুলোতে কাঠের বিভাজন দিয়ে অনেক ছোট কক্ষ তৈরি করা হয়েছে। এই ভবনে কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকলেও নকশাবহিভূত এসব কক্ষের জানালার পাশে আলাদা শীতাতপ যন্ত্র লাগানো হয়েছে। এটা করতে গিয়ে অনেক জানালা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পশ্চিম ব্লকে সচিবের কক্ষের সামনের উন্মুক্ত জায়গা কাচ দিয়ে ঘিরে নতুন একটি কক্ষ বানানো হয়েছে। প্রাকৃতিকভাবে আলোকিত এই জায়গাটি এখন প্রায় অন্ধকার।
সংসদের গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ফজলুল হক বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে কতগুলো কক্ষ ভাঙা হবে, তা এখনও যাচাই-বাছাই করা হয়নি। তবে লাইটিং এরিয়া বন্ধ করে বানানো কক্ষগুলো ভাঙার বিষয়ে নির্দেশনা পাওয়া গেছে।’
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর থেকেই সংসদের ভেতরে-বাইরে জিয়ার কবর অপসারণের বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা আলোচনা সামনে আসে। বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে রাজনৈতিক মাঠও গরম করেছেন রাজনীতিবিদরা। জুলাইয়ে শেষ হওয়া সর্বশেষ বাজেট অধিবেশনেও জিয়ার কবর সরিয়ে নেওয়ার দাবি তুলেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক।
২০১৪ সালে এ নিয়ে তুমুল রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনার নির্দেশে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাফেজখানায় সংরক্ষিত মূল নকশা সংগ্রহের উদ্যোগ নেয় সংসদ সচিবালয়। সরকারের পক্ষ থেকেও জানানো হয়, মূল নকশা হাতে পাওয়ার পরই জিয়ার কবর সরানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। গত বছরের ২৮ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী এই নকশা দেখেন। এরপর ওই নকশার কপি ন্যাশনাল আর্কাইভ, স্থাপত্য অধিদপ্তর ও সংসদ সচিবালয়ে সংরক্ষণের জন্য রাখা হয়।
মূল নকশা প্রধানমন্ত্রীকে প্রদর্শনের সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি কাজী গোলাম নাসির। তিনি জানান, সংসদের মূল নকশার কপি তাদের দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে তারা সরকার বা সংসদের কাছ থেকে কোনো লিখিত নির্দেশনা এখনও পাননি। তাই নকশা অনুযায়ী মূল ভবনের মধ্যে বা সংসদের সীমানায় নকশাবহিভূত স্থাপনা কোনটি তা যাচাই-বাছাই করা হয়নি। জিয়ার কবর সংসদের নকশার মধ্যে রয়েছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যাচাই-বাছাই ছাড়া কিছুই বলা সম্ভব নয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, লুই আই কানের মূল নকশার প্রথম ধাপ ছিল ২০৮ একর জায়গার ওপর জাতীয় সংসদ ভবন নির্মাণ। যার সামনে ও পেছনেও বিস্তীর্ণ সবুজ খোলা মাঠ থাকবে। চারদিকে আট লেনের সড়ক, মাঝখানে লেক। দ্বিতীয় ধাপে লেকের পর বিস্তীর্ণ সবুজ। এছাড়া বাকি জায়গায় গড়ে তোলা হবে সচিবালয়, লাইব্রেরি, জাদুঘর, হাসপাতালসহ প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক বলয়।
১৯৬১ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের আমলে বর্তমান সংসদ ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়। তখন স্থপতি মাজহারুল ইসলামকে এই ভবনের স্থপতি নিয়োগ করা হয়। তার প্রস্তাবেই লুই আই কান এই প্রকল্পের প্রধান স্থপতি হিসেবে নিয়োগ পান। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ১৯৮২ সালের ২৮ জানুয়ারি এ ভবনটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়।

0 209

আগা খান অ্যাওয়ার্ড ফর আর্কিটেকচার ২০১৯

কারিকা প্রতিবেদক
কেরানীগঞ্জের দক্ষিণ কানারচরের ‘আর্কেডিয়া এডুকেশন প্রজেক্ট’ এ বছর আগা খান অ্যাওয়ার্ড ফর আর্কিটেকচার ২০১৯ জিতেছে। প্রজেক্টটির স্থপতি সাইফ উল হক।
গত ২৯ আগস্ট রুশ ফেডারেশনের তাতারস্তানের রাজধানী কাজানে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়।
‘আর্কেডিয়া এডুকেশন প্রজেক্ট’ একটি উভচর কাঠামোর স্কুল। এমন এলাকায় স্কুলটি অবস্থিত, যেখানে বছরের কয়েক মাস পানিতে নিমজ্জিত থাকে। যখন পানি আসে, তখন স্কুলটি ভেসে থাকে; পানি চলে গেলে সেটি মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকে। স্কুলের পুরো কাঠামোটি তৈরি করা হয়েছে ড্রাম, বাঁশ ও দড়ি দিয়ে।
বিভিন্ন দেশের ছয়টি প্রজেক্ট এবার আগা খান অ্যাওয়ার্ড ফর আর্কিটেকচার পেয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও বাহরাইন, ফিলিস্তিন, রুশ ফেডারেশন, সেনেগাল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রকল্প পুরস্কার জিতেছে। বিজয়ীরা ১০ লাখ ডলার অর্থমূল্যের পুরস্কার ভাগ করে নেবে।
এ বছর পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ছিল ২০টি প্রজেক্ট। এর মধ্যে দুটি প্রজেক্ট ছিল বাংলাদেশের। আর্কেডিয়া এডুকেশন ছাড়া অন্যটি হলো গাজীপুরের আম্বার ডেনিম লুম শেড।
আর্কেডিয়া এডুকেশন প্রজেক্টটি সম্পর্কে প্রতিযোগিতার বিচারকরা বলেছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সময় স্থানীয় সামগ্রী ব্যবহার করে কীভাবে সাশ্রয়ী ও টেকসই সমাধান সম্ভব, তা বাঁশের তৈরি স্কুলটি দেখিয়েছে। প্রজেক্টটি স্থপতি, নির্মাতা ও গ্রাহকের দলীয় প্রচেষ্টার ফল। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তারা স্কুলটি নির্মাণে উদ্ভাবনী ক্ষমতা দেখিয়েছেন।
কেরানীগঞ্জের দক্ষিণ কানারচরের ইটাভাড়া সেতু-সংলগ্ন বুড়িগঙ্গার শাখা-নদীর তীরে বাঁশ ও ড্রাম দিয়ে তৈরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি নদীতে ভাসছিল। ঝকঝকে তকতকে স্কুল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক বিভাগের মো. আবদুস সালাম জানান, এখানে বছরে নয় মাস ক্লাস চলে। বর্ষার সময় নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি বন্ধ রাখতে হয়। এখন স্কুল বন্ধ রয়েছে।
স্থপতি সাইফ উল হক বলেন, ‘বাংলাদেশের কোনো স্থাপনার জন্য আগা খান অ্যাওয়ার্ড ফর আর্কিটেকচার পাওয়া সম্মানের। প্রজেক্টে আমার সঙ্গে অনেকে কাজ করেছেন, তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।’
মালেকা ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের জন্য আর্কেডিয়া এডুকেশন প্রজেক্টটির নকশা প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছিল ২০১২ সালের ডিসেম্বরে। নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে। ২০১৬ সালের ফ্রেরুয়ারিতে এটির নির্মাণ শেষ হয়। নির্মাণে ব্যয় হয় ৪৩ লাখ ৩০ হাজার ৭০০ টাকা।
প্রজেক্টটি সাধারণ হলেও এটি নদীর স্রোতে বাধা দেওয়া এবং বর্জ্য-ব্যবস্থাপনার মতো জটিল বিষয়গুলোর সমাধান করেছে বলে পুরস্কারের বিচারকরা মনে করেছেন। তারা বলেন, জনগণের জীবনমান উন্নয়ন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার মতো বৈশ্বিক সমস্যা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষার সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রে প্রজেক্টটি সমাধানের পথ দেখিয়েছে।
উল্লেখ্য, স্থাপত্য পুরস্কারের ক্ষেত্রে প্রাচীন ও সম্মানজনক আগা খান অ্যাওয়ার্ড দেওয়া শুরু হয় ১৯৭৭ সাল থেকে। প্রতি তিন বছর পর এ সম্মাননা দেওয়া হয়।
এর আগে ২০১৬ সালে এই পুরস্কার জিতেছিলেন দুই বাংলাদেশি স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম ও কাশেফ মাহবুব চৌধুরী। তাদের আগে বাংলাদেশে অবস্থিত বিদেশিদের দ্বারা নির্মিত তিনটি স্থাপনা পেয়েছিল এ পুরস্কার। সেগুলো হলো জাতীয় সংসদ ভবন, গ্রামীণ ব্যাংক হাউজিং প্রকল্প ও রুদ্রপুর স্কুল।