Home ফিচার
Featured posts

0 463

কারিকা ডেক্স


ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী
উপাচার্য, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক

আমার শৈশব কেটেছে ঢাকায়। সে সময়ে ঢাকা সত্যিকার অর্থেই বসবাসের জন্য এক আকর্ষণীয় শহর ছিল। ১৯৫২ সাল থেকে আমরা ঢাকায় আছি। গত ৬৫ বছরে চোখের সামনেই দেখেছি কিভাবে ছোট একটি প্রাদেশিক রাজধানী থেকে ঢাকা আজ কোটি মানুষের শহর হিসেবে পরিণত হয়েছে। পঞ্চাশের দশকে পুরো ঢাকা শহরে মানুষ ছিল সব মিলিয়ে তিন লাখের মতো। যেহেতু আয়োজনে ছোট ছিল, তাই তখন পুরোনো ঢাকার দিকেই মানুষজন ছিল বেশি। বেশিরভাগ এলাকাতে হেঁটেই যাওয়া যেত। বাসের দুটি রুট ছিল এবং অল্প কিছু বাস চলতো। যে বাসগুলো চলতো সেগুলো বেশ নিয়ন্ত্রিত ছিল। ঢাকা মটর ভেহিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের তত্ত্বাবধানে বাসগুলো চলাচল করতো। কোনো বাস যদি দেরি করে তাহলে তাকে জরিমানা করা হতো। আমাদের সময়ে যারা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ছিলেন তাদের বেশির ভাগেরই স্কুলে যাওয়া-আসা হতো হেঁটে কিংবা বাসে। ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার খুব কমই হতো। যানজট খুব একটা ছিল না তবে কিছুটা থাকতো পুরোনো ঢাকা আর চকবাজারে। খুব একটা বায়ুদূষণ ছিল না। ছোটবেলা থেকে যারা ঢাকায় বড় হয়েছে তাদের জন্য বিনোদন বা খেলাধুলার পর্যাপ্ত খোলা জায়গা ছিল। পাড়ায় পাড়ায় মাঠ ছিল, ক্লাব ছিল। যেখানে বিভিন্ন বয়সি কিশোর-তরুণদের সে বয়সে মানসিক বিকাশ ও শরীরচর্চার জন্য যা যা দরকার সেসব সুযোগ-সুবিধা ছিল। ১৯৫৮ সালে ঢাকার জন্য একটা মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। সেখানেও স্টেডিয়াম, খেলার মাঠ, আবাসিক এলাকা ইত্যাদি কী কোথায় থাকবে সে বিষয়গুলো চিহ্নিত করা হয়। ঢাকার মধ্যে অনেকগুলো খাল ছিল। এসব খাল দিয়ে নৌকা চলাচল করতো। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ধোলাইখাল। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল মতিঝিল। যদিও এখন নাম মতিঝিলই আছে কিন্তু ঝিলটি আর নেই। আমার মনে আছে, এ ঝিল দিয়ে নৌকা চলাচল করতো। এ ঝিল থেকে খাল দিয়ে নৌকাগুলো বুড়িগঙ্গায় গিয়ে নৌকাবাইচে অংশ নিত। একইভাবে ধানমন্ডিতে, এখন যেখানে পান্থপথ সেখানে একটা খাল ছিল। এখন যেখানে রাসেল স্কয়ার সেখানে বাজার বসতো এবং বিভিন্ন ধরনের মাছ, সবজি পাওয়া যেত। এর এক দিকে ধানমন্ডি লেক ছিল, অন্যদিকে ছিল খাল।
আসলে সে সময়ে খোলামেলা এলাকা থাকায় অনেকেই সময়টাকে ভালোভাবে কাজে লাগাতে পেরেছে। এখন তো খালগুলো সব ভরাট হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে অবকাঠামোগত এলাকাগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এখনও প্রায়ই খবর দেখা যায় বিভিন্ন মাঠ কিংবা খাল সিটি করপোরেশন হয়তো নিজেই দখল করে কিছু করছে বা প্রভাবশালীরা দখল করে ভবন নির্মাণ করে ফেলছে। আরেকটা ব্যাপার ছিল ভবনের ঘনত্ব। আবাসিক এলাকাগুলোতে উঁচু ভবন ছিল না বললেই চলে। এলাকাভিত্তিক অনেক আন্তরিকতা ছিল আবাসিক এলাকাগুলোতে এবং বিভিন্ন ধরনের আপদে-বিপদে, আনন্দ-উৎসবে সবাই একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকতো। এখন বড় বড় ভবন নির্মাণ হচ্ছে, ফ্ল্যাটভিত্তিক বাসায় সবাই বসবাস করছে কিন্তু পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দার সঙ্গেই যোগাযোগ নেই। আগে দেখা যেত একই এলাকার কেউ অসুস্থ হলে বা আহত হলে সবাই মিলে তার চিকিৎসা বা সুস্থতার জন্য লেগে যেত। এখন পাশের কেউ অসুস্থ হলেও অনেকেই জেনেও না জানার ভান করে। ফলে নাগরিক হিসেবে বসবাস করার জন্য যে মানবিকতা থাকা দরকার, সেটা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখন হয়ে উঠেছে যানজট। আগে দেখা যেত সবাই খুব সহজে ঘন ঘন একে অন্যের বাসায় যেত। সামাজিক বন্ধনটা অনেক শক্ত ছিল। এখন যানজটের ভয়ে কেউ চাইলেও আত্মীয়-স্বজনের বাসায় যেতে চায় না। ফলে আসলে সামাজিক বন্ধনটা আগের মতো থাকছে না, দূর্বল হয়ে পড়ছে।
এসব প্রতিকারের জন্য যেটা জরুরি প্রয়োজন, সেটা হচ্ছে একটি দীর্ঘ পরিকল্পনার আওতায় আনা। এ জন্য মেট্রোপলিটন এরিয়া ডেভলপমেন্ট প্ল্যান করা হলো এবং এরই অংশ হিসেবে ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান করা হয়েছিল। যেখানে খোলা মাঠের অভাব পূরণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় করার একটা রূপরেখা ছিল।
জলাবদ্ধতা আরেকটা বড় সমস্যা এখন। কিভাবে এটি প্রতিরোধ করা যেত সেটিও ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানে ছিল। এখনও যারা জমিতে ভবণ নির্মাণে আছেন তারা যদি নির্দিষ্ট জায়গা ভরাট করার আগে নিয়মটা মানেন তাহলে জলাবদ্ধতা অনেক কমানো সম্ভব। এছাড়া খালগুলোকে উদ্ধার করলেও অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব। যে পুকুরগুলো আছে সেগুলোও উদ্ধারের দিকে নজর দেয়া যেতে পারে। আগে দেখা যেত এসব পুকুরেও সাঁতার কাটা যেত যার সাহায্যে শারীরিক চর্চাও হতো আবার অন্যান্য কাজও হতো। তবে আমার মনে হয় এখনও অনেক কিছু করা সম্ভব যার সাহায্যে ঢাকাকে একটি মানবিক শহর হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। বিশেষ করে এখন প্রয়োজন ‘ঢাকা মহানগরকে বাঁচাতে চাই’ এমন লক্ষ্য নিয়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছা। এখন যারা ঢাকায় বড় হচ্ছে তারা যাতে সামাজিক বন্ধনের বিষয়টাতে আরো বেশি যুক্ত হতে পারে।
আরেকটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, সেটা হচ্ছে ঢাকায় যেভাবে মানুষ সারাদেশ থেকে ক্রমাগত আসছে সেটা কিন্তু টেকসই হিসেবে শহরের জন্য ভালো না। এ জন্য যদি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবিকা নির্বাহের মতো ব্যবস্থাগুলো অন্যান্য শহরে স্থানান্তর করা যায় তাহলে ঢাকাকেন্দ্রিক মানুষের স্রোত অনেক কমে যাবে। পাশাপাশি ঢাকার আশেপাশে অনেকগুলো শহর আছে যেগুলোর সঙ্গে ট্রেনের ব্যবস্থা করতে পারলে অনেক ভালো হবে। এতে করে এসব জেলা-শহর থেকে ঢাকায় মানুষরা আসবে ঠিকই কিন্ত থাকবে না। ট্রেনে আসবে এবং কাজ শেষ করে আবার চলে যাবে।
মানবিক শহর হিসেবে ঢাকাকে গড়ে তুলতে চাইলে ঢাকার যে বিষয়গুলো ছিল সেগুলোকে আবার ফিরিয়ে আনতে হবে। এখন প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা অনুযায়ী সদিচ্ছা দিয়ে এগিয়ে যাওয়া।

কারিকা প্রতিবেদকঃ


১৯০৯ সাল। ঢাকা তখন রাজধানী, নতুন প্রদেশ পূর্ববঙ্গের। বিচিত্র গাছপালায় সুশোভিত করতে হবে ঢাকার পথঘাট, উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ। এই গুরুদায়িত্ব নিয়েই তখন ঢাকায় আসেন লন্ডনের কিউ বোটানিক গার্ডেনের অন্যতম কর্মী রবার্ট লুইস প্রাউডলক। বলধার প্রকৃতিপ্রেমিক জমিদার নরেন্দ্রনারায়ণ রায়ও ঠিক একই সময়েই শুরু করেন তাঁর অমর সৃষ্টি ‘সাইকি’ বাগানের কাজ। নিজেই ছিলেন সাইকির স্থপতি, শিল্পী ও বিশেষজ্ঞ। সাইকি ছিলেন গ্রিক পৌরাণিক উপাখ্যানের প্রেমের দেবতা ‘কিউপিডের’ পরমা সুন্দরী স্ত্রীর নাম। সাইকি মানে আত্মা, যা দেবরাজ ‘জুপিটার’ কর্তৃক অমরত্ব লাভ করেছিল। নরেন্দ্রনারায়ণ রায় প্রায় ২৭ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে ১৯৩৬ সালে সাইকি বাগানের কাজ শেষ করেন। তারপর সিবিলিও গড়ে তোলেন। কিন্তু বৃক্ষপ্রেমী এই জমিদারের মৃত্যুর পর থেকেই বাগানটির ক্রান্তিকাল শুরু হয়। প্রায় ১০০ বছরের ব্যবধানে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে বাগানটির জৌলুস আর কমতে থাকে বাগানের সমৃদ্ধ উদ্ভিদপ্রজাতির সংগ্রহ।

আমরা জানি, নানা কারণে আজ বলধা গার্ডেন বিপন্ন। অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং অযত্ন -অবহেলা ও অদূরদর্শিতা এ বাগানের দুস্প্রপ্য উদ্ভিদগুলো হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। ইতোমধ্যেই অনেক দুর্লভ বৃক্ষ হারিয়ে গেছে। গত কয়েক বছরে এই সংখ্যা আরও অনেক বেড়েছে। দেশের প্রকৃতিপ্রেমিক লেখক ও বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে বলধা গার্ডেন সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে আসছে। গুরুত্বপূর্ণ এই বাগানের চারপাশে অনেক সুউচ্চ স্থাপনা তৈরি হওয়ায় সেখানকার উদ্ভিদবৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। পাশাপাশি বর্ষায় সুয়ারেজের উপচেপড়া ময়লা পানিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার কারণেও প্রতি বছর অনেক গাছপালার মৃত্যু হচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে এখানকার বিলুপ্ত গাছের তালিকা প্রতিনিয়তই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অচিরেই এই বাগান ধ্বংস হবে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
দেশের উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও নিসর্গীদের মতে, মূল গাছগুলো অক্ষত রেখে এবং বর্তমান বাগানকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করে চারাকলমের মাধ্যমে বাগানের গাছগুলো অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে বলধা গার্ডেনের আদলে আরেকটি বাগান তৈরি করা উচিত। তাহলে বাগানটি নিশ্চিত বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে। হারিয়ে যাবে না বাগানের দুস্প্রাপ্য গাছগুলো।
আমরা মনে করি, দেশের কোনো সুবিধাজনক স্থানে এ বাগানের সব উদ্ভিদপ্রজাতি নিয়ে হুবহু আরেকটি বাগান তৈরি করে দেশের শত বছরের ঐহিত্য এই বাগানটি রক্ষা করা সম্ভব। এজন্য উপযুক্ত স্থান হতে পারে ঢাকার অদূরে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান বা সংলগ্ন এলাকা। সেখানে বলধা বাগানের জন্য পরিমাণমতো জায়গা নিয়ে বিদ্যমান নকশায় সৃজন করা যায় আরেকটি নতুন বলধা গার্ডেন। এর জন্য প্রয়োজন হবে একটি বিশেষ নার্সারি এবং কয়েকজন সুদক্ষ মালি। তবে খেয়াল রাখতে হবে কোনোভাবেই যেন উদ্যানের পুরনো নকশার বিকৃতি না ঘটে, আদি উদ্যানও অবহেলার শিকার না হয়। কারণ সংরক্ষণের নামে বাগানের নাম ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পরিবর্তন বাঞ্ছনীয় নয়।

বলধা গার্ডেনের বর্তমান হতশ্রী রূপ দেখে খুব সহজেই অনুমান করা যায়, বাগানটি লোকবল ও অর্থ সঙ্কটে ভুগছে। বাগানের সর্বত্র অযত্নের ছাপ। সংরক্ষিত সাইকি অংশের পরিস্থিতিও বেশ নাজুক। স্বল্প সংখ্যক মালি নিয়ে শুধু গাছগুলো বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। চারপাশের উঁচু দালানে প্রায় ঢাকা পড়েছে বাগানটি। দিনের আলোয়ও পেছনের দিকটা বেশ অন্ধকার। সিবিলি অংশে সারাদিনই দর্শনার্থীদের ভিড়। এই দর্শনার্থীরা মূলত অন্য মতলবে এখানে আসেন। অপ্রয়োজনীয় মানুষের বিক্ষিপ্ত পদচারণা বাগানের গাছগুলোকে বিপন্নতর করে তুলছে। প্রশ্ন হলো, বলধা গার্ডেনের মতো এমন স্পর্শকাতর একটি স্থাপনা কেন টিকিটের বিনিময়ে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হলো! তবুও যারা এখানে বেড়াতে আসেন তারা যদি সত্যিকার অর্থে বৃক্ষের সমঝদার হতেন তাহলে কোনো প্রশ্ন ছিল না। উপরন্তু নিত্যদিনের এই অনিয়ন্ত্রিত জনস্রোত উদ্যানের বিপন্ন গাছগুলোর মৃত্যুকেই শুধু ত্বরান্বিত করছে। এই বাগানের অর্জিত অর্থ ছাড়া কি বন বিভাগের চলছিল না? আবার এখানকার অর্জিত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হলেও বাগান রক্ষণাবেক্ষণে তার সিকিভাগও ব্যয় হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা অচিরেই এসব আত্মঘাতী কাজের সমাপ্তি ঘটবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাগানটি বাঁচিয়ে রাখতে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
বিকল্প বলধা গার্ডেন প্রতিষ্ঠায় সরকারি এবং বেসরকারি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে বিষয় সংশ্লিষ্ট গবেষক এবং বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হলে কাঙ্ক্ষিত সফলতা আসবে বলে মনে করি।

বাগানের উল্লেখযোগ্য সংগ্রহঃ 
বলধা গার্ডেনের সর্বমোট আয়তন শূন্য দশমিক ১ হেক্টর হলেও সাইকি অংশ দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে যথাক্রমে ১০০ ও ৪৫ মিটার। সিবিলি অংশ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হলেও সাইকি সংরক্ষিত। উভয় বাগানে সর্বমোট ৮৭ পরিবারের ৭২০ প্রজাতির ১৭ হাজার উদ্ভিদ ছিল বলে জানা যায়। সাইকি অংশে প্রায় ৪৫০ প্রজাতির উদ্ভিদের বিরলতম সংগ্রহ গড়ে তোলা হয়েছিল। প্রবেশপথের দু’পাশে প্রথমেই শাপলা ও পদ্মপুকুর। সেখানে ১২ প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ রয়েছে। দুর্লভ শাপলার মধ্যে হলুদ শাপলা ও থাই-বেগুনি শাপলা উল্লেখযোগ্য। আরেকটু সামনেই ডানদিকে রোজক্যাকটাস, প্যাপিরাস, কনকসুধা। বাঁ দিকে আছে ঘৃতকুমারী। তারপর ঔষধি গাছ-গাছড়া, আমাজন পদ্ম, পদ্ম, অর্কিড ঘর, হংসলতা, তার পাশেই জমিদারের বাড়ি ও জাদুঘর। তার দক্ষিণ পাশেই জ্যাকুইনিয়া, শারদমল্লিকা, কণ্টকলতা, গুস্তাভা, হিং, শ্বেতচন্দন, সাইকাস, স্বর্ণ অশোক, কুর্চি, ভুর্জপত্র। ডানদিকে ক্যাকটাসের দুর্লভ সংগ্রহ নিয়ে একটি ঘর। এখানে ক্যাকটাস ঘরের সংখ্যা ৩টি, পটিংঘর একটি, ছায়াঘর দুটি, অর্কিডঘর একটি। মাঝখানে আছে চারদিকে তাকসমেত পিরামিড আকৃতির একটা ঘর। তাকগুলোতে থরে থরে সাজানো ক্যাকটাস। একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে ছায়াঘর। সেখানে নানা জাতের ফার্ন, ফার্নঘরের ভেতর কৃত্রিম সুড়ঙ্গের মাধ্যমে চমৎকার পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। স্বর্ণ অশোকের পাশেই সাদা ও গোলাপি রঙের ক্যামেলিয়া, তারপর রাজ অশোক। দক্ষিণ দিকের দেয়ালের পাশে ছোট জাতের কয়েকটি পাম। ছোট-বড় মিলিয়ে সাইকিতে ১৬ প্রজাতির পাম রয়েছে। সাইকির বিরলতম সংগ্রহের মধ্যে আরও আছে লতাচালতা, ক্যানেঙ্গা, ঈশের মূল, নবমল্লিকা, ওলিওপ্রেগরেন্স, জিঙ্গো বাইলোবা, অ্যারোপয়জন, র‌্যাভেনিয়া, আফ্রিকান বকুল, নাগলিঙ্গম, উদয়পদ্ম, রাজ অশোক ইত্যাদি।

সিবিলি বাগানের বিশেষত্ব হচ্ছে এর প্রবেশপথ। কারণ প্রবেশপথের দু’পাশ উদয়পদ্মে সুসজ্জিত। এ পথ একেবারে উত্তরপ্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। এছাড়াও মনোলোভা সব ক্যামেলিয়ার ঘর এ বাগানেই। এখানেও চারপাশে ঘোরানো পথ আছে। বাঁ পাশে পুকুরের কোনায় আছে সুউচ্চ মুচকুন্দ আর ডানপাশে পোর্টল্যান্ডিয়া। আরেকটু এগোলে চোখে পড়বে কলকে, অ্যারোপয়জন, কপসিয়া, হলদু, দেবকাঞ্চন, কনকসুধা, কনকচাঁপা, লতা জবা, স্কারলেট কর্ডিয়া, কাউফল। শঙ্খনিধি পুকুরে নানান জাতের জলজ ফুলের চাষ হয়। সারাবছরই কিছু না কিছু ফুল থাকে। পুকুরের চারপাশে তাক আছে, দু’পাশে আছে শানবাঁধানো ঘাট। পথের শেষ প্রান্তে আছে কয়েকটি দুর্লভ রাজ অশোক, তারপর বাঁ দিকে ঘুরলে আফ্রিকান টিউলিপ (রুদ্রপলাশ), গড়শিঙ্গা, ক্যামেলিয়ার ঘর, দেয়াল লাগোয়া পশ্চিম পাশে আছে একসারি ক্যানেঙ্গা ও ইয়ক্কা, দু’জাতের কেয়া ইত্যাদি। এ বাগানে দুটি ঘর আছে, একটিতে থাকে অর্কিড, অন্যটি চারাগাছের ভান্ডার। শঙ্খনিধি পুকুরের পশ্চিম পাড়ের দোতলা ঘরটি এখন পরিত্যক্ত। এখানে আরও আছে মাধবী, অশোক, লুকলুকি, পান্থপাদপ, শতায়ু উদ্ভিদ, পাখিফুল, কৃষ্ণবট ইত্যাদি। এ বাগানের গোলাপ এক সময় উপমহাদেশে প্রসিদ্ধ ছিল।

কারিকা ডেক্স


আমার নিজের অভিজ্ঞতায় ঢাকার বাইরে, বিদেশের অনেকগুলো শহরের কথা বলা যায়। তবে আমার কাছে বেশি প্রাসঙ্গিক মনে হয় ঢাকার পর ব্যাঙ্কক। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাঙ্কক। ঢাকায় আমি সারাজীবনই ছিলাম, কয়েক বছর বাদে। ব্যাঙ্ককে আমি চার বছর বসবাস করেছি। ১৯৮২ থেকে ১৯৮৬ এই সময়টায়। আশির দশকের প্রথম দিকে ব্যাঙ্কক বিশাল একটি শহর ছিল তা কিন্তু নয়। তবে ঢাকার চেয়ে বড় ছিল। তখন ঢাকায় ছিল প্রায় ১৫ লাখ মানুষ। ব্যাঙ্ককে ২৫-৩০ লাখ মানুষ। গত ৩০ বছরে এখন ব্যাঙ্ককে পৌনে দুই কোটি মানুষ, ঢাকায়ও পৌনে দুই কোটি। পরিবহনের কথা যদি বলি সেই সময়ে ব্যাঙ্ককে ব্যক্তিগত মোটরগাড়ির প্রচলন ছিল এবং জনপ্রিয় ছিল। তখন থাইল্যান্ড আয়ের দিক থেকে উঠে এসেছিল। ব্যাঙ্কক আরও বেশি এগিয়েছিল। ব্যাঙ্কক থাইল্যান্ডের সবচেয়ে বড় শহর। সেখানে দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর চিয়াংমাই অনেক ছোট। চিয়াংমাই থেকে প্রায় ৩০ গুণ বড় ব্যাঙ্কক। ঢাকা হলো বাংলাদেশের রাজধানী, বৃহত্তম শহর। দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার লোকসংখ্যা আড়াই থেকে তিনগুণ বেশি। ব্যাঙ্কক শহরও ঢাকার মতো দেশের কেন্দ্রে অবস্থান। থাইল্যান্ডের কেন্দ্রে হলো ব্যাঙ্কক, বাংলাদেশের কেন্দ্রে হলো ঢাকা। আশির দশকে ঢাকায় পরিবহন বলতে কিছু পাবলিক বাস ছিল, বিআরটিসি বাস। সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ার মতো ছিল রিকশা। এখনও আছে রিকশা। এখন দুই সিটি করপোরেশন মিলে প্রায় পাঁচ লাখ রিকশা। সেই সময়ে দুই লাখের মতো রিকশা ছিল। আর ছিল বেবিট্যাক্সি। এছাড়া আর ছিল প্রাইভেট গাড়ি। প্রাইভেট গাড়ির সংখ্যা ব্যাঙ্ককের তুলনায় অনেক কম ছিল। আমি ব্যাঙ্কক শহরের বাইরে বসবাস করতাম। এআইটি, এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, সেখানে অধ্যাপনা করতাম। সেটা ব্যাঙ্কক শহরের কেন্দ্র থেকে ৪০ কিমি দূরে। সেখান থেকে আমার গাড়ি চালিয়ে ব্যাঙ্ককে যেতে ৪৫ মিনিট লাগত। ১৯৮৬ সালে যখন আমি ব্যাঙ্কক থেকে চলে আসি, তখন কিন্তু অনেক সময় লাগত। তখন এত বেশি গাড়ি হয়ে গিয়েছিল, আগে ওই ৪০ কিলোমিটার রাস্তা ৪৫ মিনিট লাগত। চার বছরে সেটা আড়াই ঘণ্টা সময়ে পৌঁছানো যেত। তখন ব্যাঙ্কক ছিল খুব যানজটের শহর। এখন যেমনটা বলি ঢাকাকে। সেখান থেকে ব্যাঙ্কক কিন্তু উত্তরণ হয়েছে। সেটা কীভাবে পারল তারা? এই যে গণপরিবহন বা বাস ট্রানজিট তারা প্রভূত উন্নয়ন সাধন করেছে। একটা হলো প্রাইভেট গাড়ি সহজ চলাচলের জন্য তারা ১২ লেনের হাইওয়ে করেছে। ১২ লেন কেন কোথাও কোথাও আরও বেশি। নিচে ১২ ওপরে ৬ এই ১৮ লেনের রাস্তা। এগুলো হলো গাড়ির জন্য। নিচে দিয়ে বাস চলত। গাড়ি নিচে নিয়ে এবং ওপর দিয়ে। তার ফলে শহরতলি থেকে কেন্দ্রে যাওয়া, এয়ারপোর্ট থেকে কেন্দ্রে যাওয়া  সময়টা অনেক সাশ্রয় হতো। আরও পরে ব্যাঙ্কক শহরে বড় রকমের গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু হয়। সেটা হলো স্কাই ট্রেন। মাথার ওপর দিয়ে ট্রেন। সেটা প্রথম দিকে এতটা জনপ্রিয় ছিল না। পরে খুব জনপ্রিয় হয়েছে। এখন সেখানে স্কাই ট্রেন, মেট্রো ট্রেন হচ্ছে। এক্সওয়ে এগুলো তো আছেই। সেখানে সবই মোটরচালিত যানবাহন। ট্রেন তো আছেই, রিকশা নেই। সিএনজি অটোরিকশা যেটাকে বলি, সেটাকে ওরা বলে টুকটুক। তিন চাকার এই বাহন আছে প্রচুর। এখন গাড়ির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় মনে হয় টুকটুকের সংখ্যা কম। টুকটুক মিটারে চলে এবং খুব নিয়মের মধ্যে। আরেকটা বাহন ব্যাঙ্ককে ইউনিক সেটা হলো মোটরবাইক ট্যাক্সি। মোটরসাইকেলই ভাড়ায় চলে। এটাকেই ট্যাক্সি বলে। একজন যাত্রী নেয়। এটা আমি যখন প্রথম যাই তখনই দেখেছি। পরে আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এই বাহন চালকদের আলাদা পোশাকও আছে। বাহক পুরুষ, যাত্রী মেয়ে এতে কোনোই অসুবিধা নেই এবং খুবই নিরাপদ। খুবই স্বস্তিতে চলাফেরা করতে পারে। হাইওয়েতে এটা ওরা অনুমোদন দেয় না। হাইওয়ের পাশের লোকাল রোড এবং অলিগালিতে এই বাহন চলে। ব্যাঙ্ককের বিশেষ একটা পরিবহন এই মোটরসাইকেল ট্যাক্সি। ব্যক্তিগত সাইকেল আছে, তবে কম। আর আছে টেম্পো বা লেগুনা। পিকআপ কনভার্ট করে লেগুনা তৈরি করেছে। খুব নিরাপদ, সব নতুন ঝরঝরে গাড়ি। একটি বড় শহরের জন্য সবচেয়ে বেশি যেটা জরুরি সেটা হলো ট্যাক্সি। ব্যাঙ্কক শহরে যে কোনো জায়গায় যে কোনো সময়ে ট্যাক্সি পাওয়া যায়। দুই রকমের ট্যাক্সি তখন ছিল, এখনও হয়তো আছে। একটি চলে মিটারে। অন্যটি দরদাম করে। কয়েকটা কোম্পানির হাজার হাজার ট্যাক্সি। বিভিন্ন রঙের সেসব ট্যাক্সি হাত দেখানো মাত্রই সামনে এসে থামে। মানুষের আয়ের তুলনায় এই ট্যাক্সি খুবই সাশ্রয়ী। আমাদের এখানে ট্যাক্সি অত্যন্ত দুর্মূল্য। আয়ের লোক না হলে, বাধ্য না হলে, বিপদে না পড়লে ট্যাক্সিতে ওঠে না। আমাদের এখানে সংখ্যাও কম, দামও বেশি। ব্যাঙ্ককে বাস সার্ভিসও সুন্দর। আমাদের এখানের মতো শত শত কোম্পানি নেই। মাত্র দু’চারটি কোম্পানি বাস সার্ভিস দিয়ে থাকে। একটি হলো বিএমএ, ব্যাঙ্কক মেট্রোপলিটন অখরিটি। সেখানে এসি গাড়িই বেশি। সেসব বাসে খুব আরামে চলাচল করা যায়। মিনিবাসও আছে, তবে কম। এসব কারণে দুই কোটি মানুষ খুব সহজে চলাচল করতে পারছে। আরেকটা বিষয় যেটা ঢাকায় হতে পারত। সেটা হচ্ছে ব্যাঙ্ককের খালে অসংখ্য যানবাহন চলাচল করে। ওদের বড় একটি নদী আছে। নদীটির দুই তীরেই ব্যাঙ্কক শহর গড়ে উঠেছে। একদিকে মূল শহর, অন্যদিকে কেরানীগঞ্জের মতো নতুন শহর। সেই নদীতে প্রচুর নৌবাস চলাচল করে। ঢাকায় দু’বার চেষ্টা করল ওয়াটারবাস চালাতে। একটা-দুইটা করে ছাড়ে আবার বন্ধ করে দেয়। এখানের পরিকল্পনা একেবারে দুর্বল। খামাখাই একটু বেশি দামের ওয়াটারবাস আনে। সাধারণ নৌকার মতো থাকলেই চলে। সঙ্গে একটু ছাউনি, ইঞ্জিনচালিত হলে মানুষ চলাচল করতে পারে। এখানে দুই কোটি টাকার বাস দরকার নেই। দশ লাখ টাকার নৌযান হলেই হয়। ব্যাঙ্ককের নদীতে শত শত সাধারণ নৌবাস। নদী পারাপারের জন্য আছে, দূরে যাওয়ার জন্য আছে। বেড়ানোর জন্য আছে। এখানে আমি বলব ব্যাঙ্কক থেকে বাংলাদেশের অনেক শেখার আছে। দুটি শহর প্রায় একই রকম। আমাদেরটি চারশ’ বছরের পুরনো। ওদেরটা তিনশ’ বছরের পুরনো। দুটি শহরই সমতল। তবে ওদের অর্থনৈতিক অবস্থা অনেক ভালো। যে কারণে ওরা উন্নতমানের ট্রান্সপোর্ট গ্রহণ করতে পারে।
একটা শহর বাসযোগ্য করতে হলে একটা হলো গাড়ি-ঘোড়া যানবাহন, আরেকটা হলো ট্রাফিক ব্যবস্থা ম্যানেজমেন্ট। ভালো যোগাযোগ ক্ষেত্রে ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থাটাই আসল। এটা থাইল্যান্ডে অত্যন্ত ভালো, সুচারু এবং নিয়মের বাইরে চলা যাবে না, একেবারেই না। এক সময় ছিল থাইল্যান্ডের পুলিশ দুর্নীতির আশ্রয় নিত। মাঝে মাঝে ঘুষ নিয়ে ছেড়ে দিত। এখন নেই বললেই চলে। নিয়মের মধ্যে সবাইকে চলতে হবে। লেনের গাড়ি লেনে চলতে হবে। যেখানে-সেখানে ক্রস করা যাবে না। অটোমেটিক সিগন্যাল, টাইমার সিগন্যাল। কতক্ষণ পর সবুজ বাতি জ্বলবে তা তো দেখাই যায়। ঢাকায় সিগন্যাল বাতি থাকলেও এর ব্যবহার নেই। ব্যাঙ্ককে ট্রাফিক আইন মানতেই হবে। একেবারেই মানতে হবে। এর বিকল্প হতেই পারে না। আমি চার বছর ব্যাঙ্কক শহরে গাড়ি চালিয়েছি। আমাকে দু’বার জরিমানা দিতে হয়েছে। প্রথমবার হলো আমি ইউটার্ন নিয়েছি যেখানে ইউটার্ন নেয়ার কথা নয়। আমি বুঝতে পারিনি। পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে পুলিশ এসে বলে তুমি তো এই কাজ করেছ। আমি জরিমানা দিতে বাধ্য হলাম। আরেকবার আমি লেন চেঞ্জ করেছি শুধু। ইনার লেন থেকে মাঝখানের লেনে চলে এসেছি। আমি লেন চেইঞ্জ করেছি। আমাকে ধরেছে, জরিমানা দিতে বাধ্য হয়েছি। এর আর কোনো বিকল্প নেই।
একটা জিনিস বলা খুব দরকার বাস বা পাবলিক পরিবহনকে প্রাধান্য দিতে হবে। ব্যাঙ্ককের প্রধান সড়কের একটা লেন আছে বাসের জন্য। এখানে আর কেউ আসতে পারবে না। বাস লেন নির্দিষ্ট করে দেওয়া। ওখানে কোনো যানবাহন আসতে পারবে না। এলেও বাস আসার আগে সরে যেতে হবে। ব্যাঙ্ককের সব রাস্তাই চওড়া। তবে ব্যাঙ্ককের একেবারে কেন্দ্রে জ্যাম নেই বলব না, বলব এখানে যানবাহন খুব স্লো চলে। উল্টাপাল্টা আসার কোনো উপায় নেই। এই পথটুকু স্লো গতিতে এগোতে হবে। এটা অল্প কিছু জায়গায়। এটা তো বাস বা গাড়ির বেলায়। স্কাই ট্রেন, মেট্রো রেল কিন্তু গতিতেই থাকে। বলেছিলাম শহরের অসংখ্য খাল ওরা পরিবহনের যোগ্য করে তুলেছে। ওই পানিতে পা রাখা যাবে না। ময়লা পানি। কিন্তু যাত্রীবাহী নৌকা চলে। ইঞ্জিনচালিত নৌকা শাঁ শাঁ করে যাচ্ছে অথবা মালামাল নিয়ে যাচ্ছে। ব্যাঙ্ককে আরেকটি বিষয় নদী ও খালগুলোতে নৌকার ওপর বাজার। নৌকার ওপর ফলের বাজার, ফুলের বাজার, তরিতরকারির বাজার। এটা আমাদের এখানে হতে পারত। ব্যাঙ্ককের পরিবহনে আধুনিকায়ন হয়েছে। গণপরিবহনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশৃঙ্খলামুক্ত করা হয়েছে। কঠিন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সব যানবাহন যন্ত্রচালিত। রিকশা বলে কিছু নেই। মিক্স ট্রান্সপোর্ট বলে কিছু নেই, গতি কম আর বেশি বলে কিছু নেই। আরেকটা বিষয় পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা। ব্যাঙ্ককে পার্কিং ব্যবস্থা না থাকলে হাসপাতাল বা শপিং সেন্টার করার পারমিশনই দেবে না। শহরে রয়েছে পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা। এর বাইরে পার্কিং করার উপায় নেই।
আমাদের এখানে যে পরিকল্পনাটা হয় সেটা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয় না। আর আইন মানতে বাধ্য করতেই হবে। তা না হলে হবে না। যদি বিশৃঙ্খল হয়, আইন বহির্ভূত চলে, আইন মানানো না যায়, তাহলে কিছুতেই উন্নতি হবে না। ঢাকায় এখন খুবই বিশৃঙ্খল অবস্থা। পরিবহনের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত দুর্বল। যদিও একটা মহাপরিকল্পনা আছে স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান (এসটিপি)। এটা ২০০৬ সালে করেছিল। অনুমোদন দিয়েছিল ২০০৯ সালে। আবার সেটাকে রিভাইজ করেছে। প্রথমে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের অর্থায়নে করেছিল। পরে আবার জাইকার অর্থায়নে করেছে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে হয়তো ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি হবে। কিন্তু সে দীর্ঘ মেয়াদটা অনেক সুদূরে, কাছাকাছি হচ্ছে না। কারণ ওখানে আছে ছয়টি মেট্রোলাইন। মাথার ওপর দিয়ে অথবা পাতাল দিয়ে যাবে। বাস ট্রাফিক ট্রানজিট হবে চারটি মনে হয়। কমিউটার ট্রেন সার্ভিস হবে, ওয়াটারওয়ে হবে। কিন্তু এই হবে হবে শুনি আজকে ৯-১০ বছর। শুরু হয়েছে মাত্র একটি মেট্রো লাইনের। সেটাও এক বছরে অতি সামান্য অগ্রগতি হয়েছে। যে দক্ষতার সঙ্গে এটা পরিচালিত হচ্ছে বা অদক্ষতার সঙ্গে। তাতে ভয় হয় পাঁচ বছরে একটা লাইন শেষ হবে কি না। কিন্তু হওয়া উচিত ওই পরিকল্পনা মতে ছয়টি লাইন। তারপর এই যে দেড়-দুইশ’ বাস কোম্পানি আছে, সেটাকে একটা শৃঙ্খলার মধ্যে আনার কথা আমরা শুনি। পরিকল্পনায় এটা বলা হয়েছে। সেটা করতে পারছে না। কিছু করতে গেলেই রাজনৈতিক একটা আন্দোলন শুরু হয়। পরিবহন খাতে যারা স্বার্থসংশ্লিষ্ট তারা এমন একটা বিশৃঙ্খলা তৈরি করে সরকার ভয় পেয়ে সরে যায়। তার মানে পরিবহন খাতটা গোটা জনগণকে, শহরবাসীকে, সরকারকেও জিম্মি করে রেখেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি অদূর ভবিষ্যতে হবে বলে আমার মনে হয় না। এসটিপি এবং ঢাকা মাস্টারপ্ল্যান, রাজউক যেটা করেছে। এই দুটো যদি পাশাপাশি রেখে সরকার বা কর্তৃপক্ষ যারা আছে তারা যদি গভীর মনোনিবেশ করে, প্রশাসন বা শাসন যদি নগরশাসন ব্যবস্থার উন্নতি করতে পারে, তাহলে কিছু হবে। তা নাহলে দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগ পোহাতেই হবে ঢাকাবাসীকে।

কারিকা ডেক্স


বিদেশে অনেক শহর দেখেছি। তার মধ্যে একটা জায়গা আমার কাছে অন্যরকম। ২০০৬ সালে একটা স্কলারশিপ নিয়ে গিয়েছিলাম সেখানে। সেখারকার ঘর-বাড়ি, প্রাকৃতিক দৃশ্য, নদী, পাহাড় এবং মানুষজন। শহরটার নাম অমরিয়া। ইতালির একটা ছোট্ট শহর। লোকসংখ্যা কম, তবে খুব গোছালো। শহরজুড়ে বাড়িগুলোর সবই প্রায় পুরনো। পাথরের তৈরি সবই প্রায় দোতলা-একতলা ডুপ্লেক্স বাড়ি, দুয়েকটা তিনতলা। বাড়িগুলোর ওপরে ছাদ নেই, টালি দিয়ে ছাওয়া। শহরের ওপরে গিয়ে দেখলে চোখে পড়ে শুধু লাল টালি। আমি একটি বাড়িতে গিয়ে উঠেছিলাম, সেটা ছিল একটি রাজবাড়ি। সেটা বোধহয় চৌদ্দশ’ শতকের গড়া। সে রাজবাড়িটি এখনও ইনটেক্ট আছে। ইতালির এই শহরটি ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল। এখানে অনেক ভূমিকম্প হয়েছে, কিন্তু এই রাজবাড়িটির কিছু হয়নি। বাড়িটিতে বাগান। সকাল হলেই পাখির শব্দ। ময়ূরের ওড়াউড়ি। আমার খুবই ভালো লেগেছে।
একদিন গবি নামের অন্য একটি এলাকায় উৎসব দেখতে গেলাম। সেটা অসাধারণ উৎসব। অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে বাড়িগুলোয় নানা রঙের পতাকা দিয়ে ছাওয়া। তাদের কাছে জেনেছি এক এক ধর্মযাজকের এক এক রঙের পতাকা। যে যে ধর্মযাজকের নীতির অনুসারী সে রকম পতাকা বাড়িতে টানিয়ে রাখে। কোনো বাড়িতে লাল-হলুদ, কোনো বাড়িতে লাল-নীল, কোনো বাড়িতে আবার সাদা-নীল পতাকা ঝোলানো আছে। মাঠে অনুষ্ঠান। সবাই পতাকার রঙ মিলিয়ে পোশাক পরেছে। যার যার ধর্মযাজকের মূর্তি একটা পিলারের মতো কাঁধে করে ২০-২৫ জন লোক যাচ্ছে। যাজকের মূর্তি নিয়ে অনেকগুলো দল। সবাই খুব দ্রুত দৌড়ে যাচ্ছে। এভাবে যাচ্ছে আর আসছে। সেই মূর্তি অনেক সময় হেলে যায়, আবার সেটাকে সোজা করে। অনেক লোক এসেছে শুধু দেখার জন্য। সব শেষে সবাই একটা জায়গায় গিয়ে জড়ো হয়। সেখান থেকে বর্তমান যে ধর্মযাজক বা এ উৎসবের প্রধান তিনি রঙিন পাথর ছিটিয়ে দেন। আকিব পাথরের মতো রঙিন সে পাথর কুড়িয়ে যে যেটা পাচ্ছে সেটাই ভাগ্যবান মনে করে। মনে করে ভাগ্যবান বলেই সে এটা পেয়েছে। সব লোকই খুঁজছে। কেউ পাচ্ছে, কেউ পাচ্ছে না।
তার পাশেই মন্টি নামের আরেকটা শহরে গেলাম। পাহাড়ের ভেতর অসাধারণ একটা গুহা। গুহাটার ভেতরটা ক্রিস্টালে ঝকঝক করছে। যারা এটা আবিষ্কার করেছে তাদের তথ্য অনুসারে হাজার হাজার বছরের আগে এটা সৃষ্টি হয়েছে। পাহাড়ের ওপর থেকে যে পানি পড়ে তার সঙ্গে কেমিক্যাল মিশ্রণে এমনটি হয়েছে। বিশাল ক্রিস্টাল এরিয়া কোথাও মানুষের মতো, কোথাও গাছ, কোথাও মোমবাতির মতো। আমরা যখন গিয়েছি তখনও টিপটিপ করে পানি পড়ছিল। দেখা গেল, পাঁচ-সাত বছরে এক ইঞ্চি বড় হয়। দেখতে অসাধারণ একটা সুন্দর। সেখান থেকে ফেরার পথে একটা গ্রামে গেলাম। সেখানে শুধু সিরামিকের পটারি আর পটারি। রাস্তার দুই পাশে পটারি সাজানো। এগুলো ট্যুরিস্টদের জন্য ওরা তৈরি করে।
এই শহরের প্রধান বিষয় হলো ল্যান্ডস্কেপট। দেখতে মনে হয় ল্যান্ডস্কেপট পেইন্টিং। শহরের যেখানেই যাবে খুব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। ওদের সব কিছুই চলে নিয়ম-কানুনের মধ্যে। ওখানের নাগরিকরা সবাই শান্তিপ্রিয়। মারামারি-কাটাকাটি নেই, উচ্চশব্দ নেই। মানুষের বড় গ্যাদারিং নেই। বাজারে সব সাজানো আছে। কেনাকাটায় বেশি সময় ব্যয় হয় না। ওদের সব রেডিমেড। ওখানের নাগরিকদের দেখেছি কারো উপকার করতে পারলে খুশি হয়। কথা শুনতে পারলে ওরা খুশি হয়। রেস্তোরাঁয় খাওয়ার পর বিলটা দিতে চায়। যে পাক করে খাওয়ার পর তাকে ধন্যবাদ দিতে হয়। যে ঝাড়ু–দার, ঘর পরিষ্কার করার পর তাকে ধন্যবাদ দিতে হয়। ঝাড়ু–দার, বাবুর্চি যে বেতন পায় ডাইরেক্টরও একই বেতন পায়। যার ফলে কোনো ভেদাভেদ নেই। মালি আর ডাইরেক্টর একই। ডাইরেক্টরও কাগজ পড়ে থাকতে দেখলে কুড়িয়ে নেয়। এই বিষয়গুলো তারা যুগ যুগ ধরে ঠিক রাখছে। কোনোরকম ভেদাভেদ করেনি। আমি যে ক্যাম্পাসে ছিলাম সেখানে এত পরিষ্কার ছিল, একটা কাগজের টুকরো ছিল না। রাস্তাঘাটও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। কেউ বাইরে কিছু ফেলে না। আমাদের এখানে একজনে একটা করে ফেলে। দশজনে ফেললে অনেক নোংরা হয় সহজেই। ওদের কেউ কল্পনাই করতে পা্রেনা বাইরে কিছু ফেলবে। ওদের অনেক কিছু দেখে বুঝেছি সভ্য জাতি হলে এমন হয়। শহরজুড়েই অটোমেটিক সিগন্যাল বাতি। কোনো পুলিশ-টুলিশ কিছুই থাকে না। তবে সবাই সিগন্যাল বাতি মেনে চলাচল করে। পুরো শহরটাই শব্দহীন। অনুষ্ঠানগুলো হয় হোটেলে।
অমরিয়ায় আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে একটা পেইন্টিং মিউজিয়াম। বড় এক পেইন্টার আলবার্তো ভুরি’র একক মিউজিয়াম। সে ছিল একজন সার্জারির ডাক্তার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকাতে চাকরি করত। ইতালির পক্ষে কাজ করার দায়ে আমেরিকার সৈন্যরা তাকে গ্রেফতার করে। পরে সে মুক্তি পায়। তখন সে ডাক্তার পেশা বাদ দিয়ে আঁকাআঁকি শুরু করে। তার বিষয়টা সাধারণ। দুটো ক্যানভাস সেলাই করে তার মধ্যে রঙ দিয়ে এঁকেছে। প্লাস্টিক জোড়া দিয়ে ছবি এঁকেছে। এ রকম তার অসংখ্য ছবি আছে। মিউজিয়ামটাও উদ্ভট টাইপের। আগে যে তামাকপাতা শুকানোর বিল্ডিং ছিল, তেমনই একটা বিল্ডিংয়ে মিউজিয়ামটা বানিয়েছে। একজন পেইন্টারকে তার নিজের এলাকায় স্টাবলিশ করা হয়েছে। আমাদের এখানে ব্যক্তির জন্মস্থানে হওয়া সম্ভব নয়। এখানে লোক খারাপ বলেই হয় না। আমাদের এখানে নগর পরিকল্পনা নিয়ে কথা হয়। আর ওদের সব কিছুই হয় পরিকল্পনার মধ্যে। পুরনো কোনো বাড়ি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ভাঙতে পারবে না। নতুন বাড়ি করতে গেলেও অনুমতি ছাড়া উপায় নেই। কেউ গাছ কাটবে না। আমাদের ওখানে যেতে হলে জেনারেশনকে আরও শেখাতে হবে।
সন্ধ্যায় গিয়ে সেখনে পৌঁছলাম। ওদের সন্ধ্যা হয় ৭-৮টার দিকে। প্রতিষ্ঠানের ডাইরেক্টর এলো গাড়ি নিয়ে। গাড়ি যাচ্ছে শহরের দিকে। পথের দুই পাশে চমৎকার ল্যান্ডস্কেপট। ওখানে যার গাড়ি সে চালায়। ড্রাইভার, অসম্ভব। ড্রাইভার রাখবে কী করে? ড্রাইভারের তো একই বেতন। যাদের গাড়ি নেই তারা ট্রেনে বা বাসে চলাচল করে। অমরিয়ার রাস্তার মোড়ে ভাস্কর্য বা সাজানো নেই। রোমে দেখেছি রাস্তার মোড়ে রাজাদের ঘোড়ার ওপর ভাস্কর্য বা কোনো গ্রুপ স্ট্যাচু। তাও সেটা প্রাচীনামলে রাজাদের করা। আধুনিক স্কাপচার চোখে পড়েছে বাগানে বা শহরের বিশেষ কোনো জায়গায়। যেখানে-সেখানে ভাস্কর্য করার উপায় নেই। সেটাও উদ্ভট কোনো কিছু বসানো সম্ভব নয়। শিল্পসম্মত হতে হবে। না হলে পারমিশনই পাবে না। আমি একটা কিছু বানালাম, নিজেই নিয়ে বসিয়ে দিলাম, সেটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। নিজের বাড়ির সামনেও নয়। বাড়ির সামনে কাঠামোর চিন্তা জাপানে আছে। তারা গাছ বা তার কাজ বাড়ির সামনে রাখে। ইতালিতে বসেই করতে হবে বাড়ির ভেতরে। ওদের পরিকল্পনা ভালো, ওরা পেরেছে। আমরা পারি না কারণ আমাদের পরিকল্পনার অভাব। আরেকটা হলো, যে যেমনে পারে নীতিতে টাকা রোজগারের প্রতিযোগিতা। সবচেয়ে বেশি দায়ী হলো যারা অ্যাড দেয়। বিচার বিশ্লেষণ না করেই একটা কজে অ্যাড দিয়ে দেয়। আর একটা বিষয় হলো, যে যেটা পারে সেটা তাকে করতে দেয়া হয় না। আবার, যে পারেনা সে-ই করে কাজটা। যার জন্য আমাদের হ-য-ব-র-ল অবস্থা। একটা ভালো জিনিসের তো জাজমেন্ট করতে হবে, যে এইটা ভালো। এই ধান্ধাবাজি জিনিসগুলো শুরু হয়েছে অনেক আগে থেকে। কাউকে দিয়ে একটা কিছু করিয়ে বসিয়ে দিল। তার জন্য পাঁচজন জুরি বোর্ডের মেম্বার দালালি করল। তারপর পয়সাটা ভাগ-বাটোয়ারা হলো। একমাত্র সৈয়দ আবদুল্লাহ খালেদের ‘অপরাজেয় বাংলা’ ভাস্কর্য তৈরির সময় কোনো ঝামেলায় পড়েনি। সে সময় ছাত্র সংসদে ম. হামিদ এরা ছিল। ভালো শিল্পী-ভাস্কর যে এখানে নেই তা নয়। অনেক জঞ্জাল হয়েছে। এখন আমাদের পরিকল্পনামাফিক নতুন করে ভাবতে হবে।

0 490

খালিদ জামিল


দ্যা গার্ডেন অব কসমিক স্পেকুলেশন, স্কটল্যান্ডthe-garden-of-cosmic-speculation
সাধারণ মানুষ হিসেবে বছরে কেবল একবার এই বাগান নিজ চোখে দেখার সুযোগ মিলবে আপনার। আর সেটা যদি কাজে লাগাতে পারেন তবেই বুঝবেন বিজ্ঞান আর গণিতের কী অপূর্ব সমন্বয় ঘটানো হয়েছে এখানে। সোজা কথা বললে এমন বাগান পৃথিবীতে আর একটিও নেই। এটার কারিগর চার্লস জেনকেস ও তার স্ত্রী ম্যাগি কেসউইক। ডামফ্রাইজের কাছে পোর্ট্রেক হাউসে এর অবস্থান। জায়গাটা স্কটল্যান্ডে। বাগান করার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ শুরুতে যেমনটা ভাবেন, জেনকেস ও ম্যাগি তা থেকে ভিন্ন কিছু করার এমন উদ্যোগ নেন ১৯৮৯ সালে।

নুরুন্নবী চৌধুরী


খুব গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেট ম্যাচের মাঝখানে হঠাৎ ডিশের লাইন বন্ধ হয়ে গেল কিংবা পছন্দের কোনো নাটক দেখতে দেখতে নেটওয়ার্ক নেই বলে টেলিভিশন সেটের মাঝ বরাবর একটা লাইন ভেসে উঠল! মন-মেজাজের কী দশা হয় তখন তা হয়তো ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়! তবে কম-বেশি আমাদের সবারই কিন্তু টেলিভিশন দেখা নিয়ে এমন বিরক্তিকর অভিজ্ঞতা রয়েছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ দেখাতে এসে গেল ডিজিটাল মাধ্যম। এখন আপনার টেলিভিশনও হয়ে যাবে ডিজিটাল, তার জন্য প্রয়োজন শুধু একটি সেটটপ বক্সের। টেলিভিশনে ভালো মানের ছবি ও শব্দ নিশ্চিত করতে সারা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও এখন ব্যবহৃত হচ্ছে এই ‘জাদুর বাক্স’।

যেভাবে কাজ করে সেটটপ বক্স
সেটটপ বক্সের মাধ্যমে ফাইবার অপটিক্যাল কেবলের সাহায্যে টিভিতে দেখা যায় ঝকঝকে ছবি। নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করতে সেটটপ বক্সের সঙ্গে স্থাপন করা হয় জেনারেটর ও অনলাইন ইউপিএস, কল সেন্টার, সার্ভিস মনিটরিং প্যানেলসহ বিভিন্ন সুবিধা-সংবলিত একটি পূর্ণাঙ্গ সেবাকাঠামো।

কী সুবিধা দিচ্ছে?
অ্যানালগ টিভিতে কম-বেশি ১০০-১৫০টি চ্যানেল দেখার সুযোগ থাকে বলা হলেও আদতে প্রকৃত সংখ্যাটি ৭০ ছাড়াবে কিনা সন্দেহ রয়েছে। সেটটপ বক্সের সাহায্যে আপনি প্রায় ১১০টির বেশি চ্যানেল দেখতে পাবেন নিশ্চিন্তে। এতদিন যেসব এইচডি বলে জেনে এসেছেন, সেটটপ বক্স ব্যবহার করলে এবার সত্যিই সেই চ্যানেলগুলো এইচডি ভিউতে দেখতে পাবেন। তাছাড়া ঝড়-বৃষ্টি কিংবা রাস্তার খননকাজে কেবল কাটা পড়লে বিকল্প ব্যবস্থায় সংযোগ চালু থাকবে।

বাংলাদেশে সেটটপ বক্স
বাংলাদেশে টেলিভিশন সম্প্রচার শুরু হয়েছে প্রায় ৫২ বছর আগে। ১৯৬৪ সালে ছিল সাদা-কালোর একটি চ্যানেল। আশির দশকের শুরুতে যা রঙিন পর্দায় রূপ নেয়। আর ১৯৯২ সাল থেকে শুরু হয় ডিশ অ্যান্টেনার যুগ। এতে রয়েছে দেশ-বিদেশের রকমারি সব চ্যানেল। অ্যানালগ কেবল টিভির এই সেবায় খানিকটা ঘোলাটে ছবি, ঝড়-বৃষ্টিতে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়াসহ নানা ঝক্কি-ঝামেলা থাকে। দর্শকের এই অতৃপ্ত মনের হাল বুঝতে পেরেই সচকিত হয়ে ওঠেন কর্তৃপক্ষ।
২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশে প্রথম ডিজিটাল কেবল লাইনের ঘোষণাটি আসে বেঙ্গল ডিজিটালের পক্ষ থেকে। শুরুতে শুধু ঢাকা শহরকে টার্গেট করে কার্যক্রম পরিচালনা করা হলেও পরবর্তী সময়ে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে বিভাগীয় শহরগুলোতেও এই সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হবে বলে জানায় কর্তৃপক্ষ।

খরচ কেমন?
সেটটপ বক্স নামের যন্ত্রটির দাম পড়বে ৩,৫০০ টাকার মতো। একবার এই বক্সটি কিনে প্রতিমাসে কার্ডের মাধ্যমে রিচার্জ করে দেখতে পারবেন পছন্দের ও প্রয়োজনীয় চ্যানেলগুলো। এজন্য বেছে নিতে হবে আপনার সুবিধামতো প্যাকেজটি।
দর্শকদের চাহিদা, বয়স, রুচি ও ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনা করে একাধিক চ্যানেলের বিভিন্ন প্যাকেজ রাখা হয়েছে সেটটপ বক্সের সঙ্গে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৩০০ টাকার প্যাকেজে ৯০টি চ্যানেল দেখা যাবে। এর মধ্যে বাংলাদেশের সব চ্যানেলসহ ৭০টি ফ্রি চ্যানেল রয়েছে। এছাড়া ২০টি পে-চ্যানেল থাকবে। অন্যদিকে ৬০০ টাকার প্যাকেজে বর্তমানে ১৫১টি চ্যানেল দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে বাংলাদেশি চ্যানেলসহ ৭৬টি ফ্রি চ্যানেল ও ৭৫টি পে-চ্যানেল রয়েছে।
একটি সেটটপ বক্স দিয়ে একটি টিভিতে অনুষ্ঠান দেখা যাবে। তবে বাসায় দুটি টিভি সেট থাকলে পুরনো অ্যানালগ লাইন থেকে ওই টিভিতে সংযোগ দেওয়া যাবে। এতে ৯০টির মতো চ্যানেল দেখা যাবে। সেক্ষেত্রে খরচ কিছুটা বাড়বে। ৩০০ টাকার প্যাকেজসহ মোট খরচ হবে ৪৫০ টাকা। আর ৬০০ টাকার প্যাকেজে সব মিলিয়ে পড়বে ৭০০ টাকার মতো।

কীভাবে পাবেন জাদুর বাক্সের সংযোগ?
বর্তমানে অ্যানালগ সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে সেটটপ বক্স। অর্থাৎ আপনি যাদের কাছ থেকে ডিশের সংযোগ নিয়েছেন তাদেরকে সেটটপ বক্সের চাহিদার কথা জানালে সংগ্রহ এবং সেটিং করে দেবে। তারপর একদম নির্ঝঞ্ঝাটে উপভোগ করতে পারবেন ডিজিটাল টেলিভিশনের জাদু!

0 721
কারিকা ডেস্ক
নতুন অফিস নির্মাণ করছে অ্যাপল কম্পিউটার ইনকরপোরেটেড। ‘অ্যাপল ক্যাম্পাস-২’ নামক নতুন অফিসে একসাথে ১৩ হাজার কর্মী অফিস করতে পারবে। ক্যাম্পাসের ১ লাখ ২০ হাজার বর্গফুটের ভূগর্ভস্থ  মিলনায়তনে হাজার খানেক আসন ধারণ ক্ষমতার সম্মেলন কক্ষ আছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান ‘ফোস্টার অ্যান্ড পার্টনার’-এর নকশায় নির্মিত এই সিলিন্ডার আকৃতির ভূগর্ভস্থ মিলনায়তনটি ভূমির ওপর থেকেই দেখা যায়। অ্যাপলের বর্তমান ক্যাম্পাস থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরের এই ক্যাম্পাস-২ নির্মাণে অ্যাপল ততটাই মনোযোগ দিয়েছে, যতটা অ্যাপল প্রতিটি পণ্য তৈরিতে দিয়ে থাকে। প্রায় ৫০০ বাঁকানো কাচের পাত সরানো এবং জায়গামতো বসানোর কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বড় বড় যন্ত্রম্যানিপুলেটরস। এই কর্মযজ্ঞ নিয়ে ১৯টি দেশের নকশাকার প্রতিষ্ঠান, কাঁচামাল সরবরাহকারী এবং অন্যান্য বিক্রেতার সাথে কাজ করছে অ্যাপল।
নতুন অ্যাপল অফিসের ভেতরে কোনো কলাম নেই। কলামের বদলে জায়গাটি খালি রাখা হয়েছে এবং এটি কাচ দিয়ে ঘেরা হবে। আছে নিচের ইভেন্ট হলে নামার জন্য সিঁড়ি। তবে থিয়েটারের সুন্দর ছাদটিই খুব সম্ভবত এর আসল আকর্ষণ। অ্যাপল বিশ্বাস করে, এটাই এ যাবৎকালের তৈরি সবচেয়ে বড় ছাদ, যা কার্বন তন্তু দিয়ে তৈরি। দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান প্রিমিয়ার কম্পোজিট টেকনোলজি এটি তৈরি করেছে।
বৃত্তাকার ছাদটি গড়ে ৭০ ফুট লম্বা এবং ১১ ফুট চওড়া ৪৪টি রেডিয়াল প্যানেলের সমন্বয়ে গঠিত। এর ওজন ৮০ টন। এই ছাদের ওপর থেকে অ্যাপলের নতুন ক্যাম্পাসের চারদিক দেখা যায়। নতুন ক্যাম্পাসের মূল ভবনটির আয়তন ২৮ লাখ বর্গফুট। এটি হবে চারতলাবিশিষ্ট এবং মাটির নিচেও তিনটি তলা থাকবে। নতুন অফিসের নির্মাণকাজ শেষ হবে চলতি বছরের শেষের দিকে। আর উদ্বোধন করা হবে ২০১৭ সালে। তৈরি হওয়ার আগেই সবার নজর কেড়েছে এই প্রাঙ্গণ। এই ক্যাম্পাসে অ্যাপলের নতুন করপোরেট অফিস এবং পণ্য প্রদর্শনের শোরুম থাকবে। বড় বড় বাঁকানো কাচের প্যানেল দিয়ে তৈরি অ্যাপলের এই মূল ভবনটি দেখতে অনেকটা ইউএফও (আন-আইডেন্টিফাইড ফায়িং অবজেক্ট) বা উড়ন্ত চাকতির মতো।

0 855
কারিকা ডেস্ক
ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের দু প্রান্ত চলছে কাজ আর কাজ। একটু এগুতেই দেখা মিলবে পদ্মায় বিশাল বিশাল ক্রেন। ভারি ভারি সব যন্ত্রপাতি ব্যবহার হচ্ছে দেশের সর্ববৃহত প্রকল্প বাস্তবায়নে। ইতোমধ্যে হ্যামারও এসে পড়েছে পদ্মা পাড়ে।পুরো প্রকল্প এলাকায় তিন শিফটে পুরো ২৪ ঘন্টাই কাজ চলছে। পদ্মা সেতু কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, চার বছরের পরিকল্পনা অনুযায়ী চলছে এই কাজ। এখনও পর্যন্ত সিডিউল যথাযথভাবেই এগুচ্ছে। কোথাও বিচ্যুতি হয়নি। তাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সেতুর কাজ সম্পন্ন হবে। প্রকল্প এলাকায় চীনা প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপ করেও জানা গেছে পদ্মা সেতুর কাজের অগ্রগতির চিত্র। বর্ষা আসন্ন। তবে এখনও পদ্মা শান্ত। বৃষ্টি-বাদলও কম। তাই প্রকৃতি অনুকূলে। এ সুযোগের পুরোটাই ব্যবহার করা হচ্ছে। দেশী বিদেশী এবং সামরিক বেসামরিক মিলে ৯ হাজার ৩ শ’ লোক কাজ করছে এখানে। সরেজমিন পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে- স্বপ্নের এই সেতুর বাস্তবায়নের মহাযজ্ঞ।
পাল্টে গেছে দৃশ্যপট। ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের দোগাছি সার্ভিস এরিয়া থেকে শুরু করে মাওয়া পর্যন্ত দু’পাশে কাজ আর কাজ। কোথাও চলছে আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে মাটি ভরাটের, মাটি সমান্তরাল করার কাজ। আবার চলছে যন্ত্র চালিত মেশিন দিয়ে পাথর ভাঙ্গার কাজ। একটু আগালেই কুমারভোগে ওয়ার্কসপ তৈরীর কাজটি যেন আরও বিশাল। যা দেখেই অনেক কিছু স্পষ্ট হবে। কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে হরদম ব্যস্ততাতো রয়েছেই। মাওয়া চৌরাস্তা থেকে এগিয়ে নদীর পারে গেলেই দেখা যাবে-ভাসমান ক্রেনের সাহায্যে চলছে পাইলিংয়ের কাজ। দিনরাত পালাক্রমে কাজ চলছে। এখন মাওয়াকে দেখার কোন উপায় নেই এখানে এতবড় ফেরিঘাট ছিল যুগযুগ ধরে। ফেরিঘাট কিংবা, টার্মিনাল কিছ্রুই চিহ্ন মাত্র নেই। রাস্তা ঘাটেও পরিবর্তন এসছে। আর যে রেস্ট হাউস ছিল মাওয়া চৌরাস্তার কাছে, তাও নেই। মাটির সাথে মিশে গেছে। সদ্য বিলুপ্ত মাওয়া ফেরিঘাটের একটু সামনে থেকে সোজা পূর্ব দিকে একটি নতুন রাস্তা করা হয়েছে। এই রাস্তা কুমারভোগ কনসট্রাকসন ইয়ার্ড পর্যন্ত। এই রাস্তা দিয়েই পদ্মা সেতুর মামলামাল আনা নেয়া হচ্ছে। এই ইয়ার্ডের বিশাল ওয়ার্কসপে সেতুর মূল পাইল তৈরীর প্রক্রিয়া চলছে। বিশাল এই পাইল এখান থেকে পিলার পয়েন্টে নেয়ার জন্য তৈরী হচ্ছে। রেল লাইনের মত ক্রেন লাইন তৈরী হচ্ছে নদী তীর পর্যন্ত। বিশাল কনসট্রাকশন ইয়ার্ড একেবারে নতুন ফেরিঘাট শিমুলিয়া পর্যন্ত। পুরোটাই বিশেষ বেষ্টুনি দিয়ে ঘেরা। তবে বাইরে থেকে বোঝা যায় কাজের ব্যস্ততা। পদ্মার অপর প্রান্ত শরীয়তপুরের জাজিরা পয়েন্টও হুলস্তুল কাজের অনরূপ চিত্র। নদীশাশন, চরকাটা, সার্ভিস রোড তৈরী সবই চলছে পুরোদমে। আর এসব কাজের তদারকি করছেন বিশেষজ্ঞ টিম। প্রতিটি কাজেরই নির্দিষ্ট সময় বেধে দেয়া আছে। যারা অনেক কিছুই হচ্ছে দ্রুত। তাই নির্ধারিত ২০১৮ সালের মধ্যেই পদ্মা সেতুর কাজ সম্পন্ন হতে পারে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। গত ২৬ নভেম্বরের থেকে ক্ষণ গননার পরই থেকেই চায়না মেজর ব্রীজ কোম্পানী পুরো দমে শুরু করেছে এই কাজ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই কাজ শেষ না হলে দিনপ্রতি গুনতে হবে বড়  অঙ্কের জরিমানা। তাই কাজের গতি না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। হরতাল অবরোধের ছোয়া মাত্র নেই এখানে। চার বছরের জন্য ঘোষিত নির্ধারিত সিডিউল অনুযায়ী যথাসময়ে বা আগে পদ্মা বহুমুখী সেতুর কাজ সম্পন্ন হচ্ছে। পদ্মা সেতু নির্মাণের পর মঙ্গলা সমুদ্রবন্দরের ব্যবহার বাড়বে। পিছিয়ে পরা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ বাড়বে। বাড়বে জীনযাত্রার মান ও মাথাপিছু আয়। তাই আনন্দে উদ্বেল এই অঞ্চলের মানুষ। কাজের অগ্রগতির চিত্র ২৬ নভেম্বর মূল সেতু কাজের ওয়ার্ক অর্ডার দেয়া হয়েছে চার বছরের জন্য। এই দিন থেকেই ক্ষণ গননা শুরু হয়েছে। ডিসেম্বর থেকে তারা কাজের অগ্রগতি রিপোর্ট পেশ করছে। সর্বশেষ দেয়া ফেব্রুয়ারি মাসের এই রিপোর্টেও সেতু কর্তৃপক্ষের হাতে জমা হয়েছে। এই রিপোর্টে সেতু বাস্তবায়নের সঠিক চিত্র পাওয়া যাবে। মাওয়া প্রান্তে ৯টি স্থানে মাটি পরীক্ষর কাজ সম্পন্ন হয়ে গেছে। ওপারের জাজিরা পয়েন্টে সম্পন্ন হয়েছে চারটি স্থানের মাটির পরীক্ষা কাজ হয়েছে। অন্যকাজের অগ্রগতিও আশানুরূপ। ৭৫০টি ছোট বড় যন্ত্রপাতি ইতোমধ্যে মাওয়ায় পৌছছে। পৌছেছে হ্যামার। ট্রায়াল পাইলের যাবতীয় মালামালও ইতোমধ্যে মাওয়ায়  এসে গেছে। এ সকল মালামাল মানসম্মত কিনা তার পরীক্ষাও সম্পন্ন হয়ে গেছে। মাওয়া ও জাজিরা সংযোগ সেতুর কাজও নির্ধারিত সময়ের শুরু হচ্ছে। মাওয়া প্রান্তে দেড় কিলোমিটার নদী শাসনের কাজ ১৭ মার্চ থেকে শুরু হয়েছে। এই কাজে প্রায় ১৫ শ’ বাংলাদেশী শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছে। এ পর্যন্ত মূল সেতুর কাজের অগ্রগতি সাড়ে ১০ শতাংশ।
রাতের মাওয়া দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না আগের চিত্র। যেন আরও বিস্ময়কর। এটি দেখে মনে হবে একবারেই স্বপ্নের মত। কখনও এমন দৃশ্য এখানে দেখা যাবে এটি কল্পনাও করেননি এখানকার মানুষ।
মেদিনীমন্ডল গ্রামের আব্দুল মতিন খান বলেন, আমাদের বাড়ির পাশের এমন উন্নয়ন বিপ্লব ঘটবে এমন স্বপ্নেও ভাবিনি। পদ্মা সেতু তৈরী করতে এত আয়োজন এটিও ভাবতে পারিনি। এখন সবই যেন বাস্তবে দেখছি।  রাতের বেলায়ও কাজের কোন কমতি নেই। দিনের গতিতেই তিন শিফটে কাজ চলছে এখানে।  মর্হুতের জন্যও বন্ধ নেই কাজ। আট ঘন্টা করে চলছে প্রতি শিফ্ট। পুরো প্রকল্প এলাকায় দিনের মত আলো। অনেক দূর গ্রাম থেকেও দেখা যায় মাওয়ার এই আলো। পদ্মা সেতুর কাজ যেন আকাশসুদ্ধ আলো করে দিয়েছে। সেই আলোর ঝিলিক পরছে পদ্মা নদীতেও। এছাড়া প্রকৌশলীদের থাকার জন্য মাওয়া ও জাজিরায় ভাড়া করা হয়েছে ২০টি বাড়ি। শ্রমিকদের থাকার জন্য দুই পাড়ে টিন শেডের প্রায় ২শ’ ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। দ্বিতল বিশিষ্ট সেতুটি নির্মিত হবে কংক্রিট আর স্টিল দিয়ে। এর উপর দিয়ে গাড়ি ও নিচ দিয়ে ট্রেন চলাচল ব্যবস্থা থাকবে। মূল সেতু, সংযোজ সড়ক ও নদী শাসন সব মিলে সেতু প্রকল্পের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে মূল সেতু নির্মাণের কাজ করছে চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কোম্পানি। এছাড়া অন্যান্য প্রকল্পে কাজ করছে আলাদা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। তাই পদ্মা সেতু নির্মাণকে কেন্দ্র করে মুন্সীগঞ্জ জেলার মাওয়া এবং শরিয়তপুর জেলার জাজিরার বিশাল এলাকাজুড়ে চলছে ব্যাপক কর্মতৎপরতা। পদ্মা সেতু ৪২টি পিলারের ওপর নির্মিত হবে। ১৫০ মিটার পরপর পিলার বসানো হবে। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী গত ১ মার্চ সেতুর এ্যাংকর পাইল বসানো শুরু হয়। এছাড়া সেতু এলাকার অ্যালাইনমেন্টের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। ভারি ভারি নির্মাণ যন্ত্র দিয়ে চলছে পাথর কাটা, মাটি কাটা, মাটি ভরাট, রাস্তা সমান করার কাজ। ওয়েল্ডিংয়ের আলোর ঝলকানি আর ভারি যন্ত্রপাতির শব্দে মুখরিত জাজিরার পদ্মাপাড়। চীন থেকে ইতোমধ্যে তিনশর অধিক প্রকৌশলী এসেছেন আরও কয়েক শতাধিক আসার কথা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সূত্র। প্রকল্পটির জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২৪ হাজার ৭৭ কোটি টাকা। তিন  বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার শর্তে সংযোগ সড়ক ও টোল প্লাজা নির্মাণ কাজ করেছে যৌথভাবে আবদুল মোনেম নিমিটেড ও মালয়েশিয়ার এইচসিএম নামের দুইটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। ২৫ মিটার প্রস্থ মোট ১২.১৬ কিলোমিটার সংযোগ সড়কের মধ্যে জাজিরা পয়েন্টে সারে দশ কিলোমিটার দৈঘ্র্যের ৪ লেন বিশিষ্ট সংযোগ সড়কের কাজ চলছে দ্রুততার সঙ্গে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সংযোগ সড়ক নির্মাণ সম্পন্ন করে তা মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার বিষয়টি ভেবে দেখছে সরকার। ১৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় নির্ধারণ করে ঢাকার গেন্ডারিয়া থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত ৮২.৩২ কিলোমিটার রেল পথ নির্মাণ করা হবে। যার জন্য রেল বিভাগ ৩৬৫ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করছে। জাজিরার নাওডোবায় সার্ভিস এরিয়া-২ এর অধীনে পদ্মা রিসোর্ট নির্মাণ করা হবে। এখানে ১টি মোটেল ম্যাস, ১টি রিসোর্ট অভ্যার্থনা কেন্দ্র, ১টি সুপারভেশন অফিস ও ৩০টি ডুপ্লেক্স ভবন নির্মাণের কাজও দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে যা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। এ দিকে প্রকল্পের সকল কাজ তদারকির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার কোরিয়ান এক্সপ্রেসওয়ে ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে।

0 873
ইসরিত ইয়াসমিন রিংকি
ব্যক্তিত্ব ও নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য ১০ জনের মধ্যে যেমন কেউ কেউ নিজেকে আলাদা করে চিনিয়ে নিতে পারেন, ঠিক তেমনি কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান তার নিজস্ব ডিজাইন ও স্থাপত্যে সবার থেকে পৃথকভাবে চেনাতে বা আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়। রাজধানী ঢাকায় অপারেশন শুরু করা পাঁচতারকা হোটেল লা মেরিডিয়ান তেমনই একটি প্রতিষ্ঠান। দেশের প্রধান বিমানবন্দর থেকে ঢাকা শহরের দিকে দুই কিলোমিটার এগোলেই যে-কারো চোখে পড়বে নান্দনিকতা আর আভিজাত্যে ভরপুর এই হোটেল-ভবনটি।
অসংখ্য ভবনের মাঝ থেকে নিজেকে আলাদা করে চেনাতে নতুন কিছু নয়, বরং তার চিরচেনা বৈশিষ্ট্যই যথেষ্ট। ইন্টারন্যাশনাল হোটেল হিসেবে এর রয়েছে নিজস্ব সৃজনশীল ব্র্যান্ড।
নিজস্ব স্থাপত্য ধরণ অটুট রেখে হোটেল-ভবন নির্মাণে নান্দনিকতা আনতে দ্য বেস্ট হোল্ডিংস লিমিটেডের মালিকানাধীন লা মেরিডিয়ানের নির্মিত হোটেলটির আর্কিটেক্ট ছিল থাইল্যান্ডের বেন্ট সেভেরিন অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস। এর সব সরঞ্জাম কেনা হয়েছে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
কিচেন ও লন্ড্রি সার্ভিসের পরামর্শক সিঙ্গাপুর পিটিআই লিমিটেড। স্পা-র দায়িত্বে মালয়েশিয়ার লাইফস্টাইল হেলথ অ্যান্ড ফিটনেস। লাইটিং ও সিকিউরিটি কনসালটেন্ট যথাক্রমে সিঙ্গাপুরের দ্য লাইট বক্স ও এসকেএম।
লা মেরিডিয়ান হোটেলের মার্কেটিং কমিউনিকেশন ম্যানেজার জাইরিন সুলতানা কারিকাকে বলেন, বাংলাদেশে যতগুলো পাঁচতারকা হোটেল রয়েছে তার মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড়। হোটেলের রুমসংখ্যা এবং প্রতিটি রুমের আয়তনের দিক থেকে এর চেয়ে বৃহৎ আর কোনো হোটেল দেশে নেই। বর্তমানে হোটেলটিতে রয়েছে ৩০৪টি অতিথি-কক্ষ ও স্যুটস। এসব কক্ষের আয়তন ৩৭৫ বর্গফুট থেকে শুরু করে ৪,২৫০ বর্গফুট পর্যন্ত। ৮,৫০,০০০ বর্গফুটের ১৬ তলা বিশিষ্ট হোটেলটিতে রয়েছে ৩০০ গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা।
৬টি ডাইনিং রেস্টুরেন্টে মিলবে সব মহাদেশীয় খাবার। বিশাল বলরুম, বৃহৎ রুফ টপ ব্যাঙ্কয়েট ভেন্যু এবং ৩০,০০০ বর্গফুটের ইভেন্ট স্পেসসহ ৬টি মিটিং রুমে রয়েছে করপোরেটসহ যেকোনো ধরনের মিটিং করার সুবিধা। আছে সিগনেচার স্পা, ফিটনেস সেন্টার, সর্বোচ্চ উঁচুতে স্কাইলাইন ইনফিনিটি পুল, যে পুল থেকে দেখা যায় পুরো ঢাকা নগরীকে।
স্মার্ট টেলিভিশন, ফ্রি ওয়াইফাই, রেইনফল শাওয়ারসহ স্টাইলিশ ওয়াশরুম, রুফ টপ টেনিস কোর্ট, জুস বারসহ সব ধরনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে হোটেলটিতে।
মূলত ব্যবসায়ী, করপোরেট ক্লায়েন্ট ও এয়ারলাইন্সের ক্রুদের টার্গেট করে হোটেলটির ব্যবসার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে এরই মধ্যে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের টিম হোটেল এবং এশিয়া কাপ ক্রিকেটের টিম হোটেল হিসেবে খুবই দ্রুততার সঙ্গে অতিথিদের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছে লা মেরিডিয়ান।
বর্তমানে যেসব হোটেল দেশে রয়েছে তাদের চেয়ে ১১ বর্গমিটার বেশি বড় এই হোটেলের রুমগুলো। দেশের কোনো হোটেলেরই আয়তন ৩০ বর্গমিটারের বেশি নয়।
লা মেরিডিয়ানে নিয়োজিত ৪০ শতাংশ কর্মীই একেবারে নতুন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য হোটেল ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড হসপিটালিটি বিভাগ থেকে স্নাতক করা শিক্ষার্থীদেরই তারা তৈরি করেছে হোটেল পরিচালনা করতে।
বিশ্বের ৫০টি দেশে লা মেরিডিয়ানের ১২০টি হোটেল রয়েছে। এয়ার ফ্রান্সের মালিকানাধীন হোটেলটি ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। মূলত এয়ার ফ্রান্সের যাত্রীদের থাকার জন্য প্যারিসে এক হাজার কক্ষের হোটেল নির্মাণ করা হয়। দুই বছরের মধ্যে ইউরোপ ও আফ্রিকাতে তারা আরো ১০টি হোটেল তৈরি করে। ৬ বছরের মধ্যে এই সংখ্যা ২১টিতে উন্নীত হয়। দ্রুত হোটেল সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৮টিতে। ২০০৫ সালে স্টার উড হোটেল লা মেরিডিয়ান অধিগ্রহণ করে।

0 925
New Stadium at Purbachal

কারিকা ডেস্ক:

রাজধানীর অদূরে পূর্বাচলে নির্মিতব্য স্টেডিয়াম সাইট পরিদর্শন করেছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত সংসদীয় কমিটির ২০তম বৈঠক শেষে কমিটির সদস্যরা স্টেডিয়াম পরিদর্শনে যান।

এরআগে কমিটি সভাপতি জাহিদ আহসান রাসেলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কমিটির সদস্য যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ড. বীরেন শিকদার, উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়, কবিরুল হক, নাহিম রাজ্জাক এবং আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী অংশ নেন।

বৈঠকে জানানো হয়, পূর্বাচলে প্রস্তাবিত স্টেডিয়ামটি হবে ৭৫ হাজার আসনের। যা নির্মানের দায়িত্ব থাকবে অস্ট্রেলিয় প্রতিষ্ঠানের উপর। এছাড়াও কক্সবাজারের নতুন স্টেডিয়াম হবে এক লাখ আসনের। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগ্রহে স্টেডিয়াম দুটি নির্মাণ করা হচ্ছে।