Home সর্বশেষ

0 23

গুলশান বনানী রুটে নতুন বাস সার্ভিস ‘গুলশান চাকা’

কারিকা প্রতিবেদক
সন্ধ্যা। কাকলী বাসট্যান্ডে যাত্রীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে বাস। অথচ মাসখানেক আগেও চিত্রটা ঠিক এমন ছিল না। অফিস শেষের সময়টাতে বাসের জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন যাত্রীরা। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর তবেই মিলতো কাঙ্খিত বাস। গত ২৬ জুলাই কাকলী-গুলশান ০২- নতুন বাজার রুটে ‘গুলশান চাকা’ নামে আরেকটি চক্রাকার এসি বাস সার্ভিস চালু হয়েছে। তাতেই এই রুটের চেনা দৃশ্যের খানিকটা বদল হয়েছে। যানজট না থাকলে যাত্রীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকছে বাস।
উদ্ধোধনের পর ‘গুলশান চাকা’ কিছুদিন নতুন বাজার থেকে বাড্ডা-গুলশান লিংক রোড ও গুলশান ১ নম্বরে চলাচল করেছিল। তবে নিরাপত্তার কারণে এই গাড়িগুলো গুলশান এলাকার বাইরে চলাচল না করতে গুলশান সোসাইটির পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়। এরপর সেই রুটের পারমিট বাতিল করা হয়েছে। নতুন এই বাস সার্ভিস চালু হওয়ার ফলে যাত্রী ভোগান্তি কমলেও ভাড়া নিয়ে আগের মতো অসন্তোষ রয়ে গেছে। ‘ঢাকা চাকা’র মতো গুলশান চাকার ভাড়াও বেশি বলে জানান যাত্রী জুনাইয়া তাবাসসুম। এক কিলোমিটার দূরত্বে যে ১৫ টাকা ভাড়া, আড়াই কিলোমিটারের ভাড়াও একই। তিনি নতুন বাজার থেকে গুলশান ২ নম্বরের ভাড়া ১০ টাকা হলে ঠিক হতো বলে মনে করেন।
‘গুলশান চাকা লিমিটেড’ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফতাব উদ্দিন বলেন, কাকলী থেকে নতুন বাজার পথে গুলশান চাকা বাস চলছে। কিছুদিন নতুন বাজার থেকে বাড্ডা-গুলশান লিংক রোড ও গুলশান ১ নম্বরে চলেছিল। তবে নিরাপত্তার কারণে এই গাড়িগুলো গুলশান এলাকার বাইরে চলাচল না করতে গুলশান সোসাইটির পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়। এরপর থেকে গুলশান-বনানীর বাইরে যাচ্ছে না এই বাস। তিনি জানান, ২০টি বাসের অনুমোদন দেওয়া আছে। বর্তমানে ১৮টির মতো চলছে। এ ছাড়া গুলশান ১ নম্বর পুলিশ প্লাজা হয়ে তেজগাঁও শিল্প এলাকার জিএমজি মোড় পর্যন্ত রুট পারমিট পাওয়া গেছে। এই রুটেও গাড়ি চলবে।
চক্রাকার বাস সার্ভিস ‘ঢাকার চাকা’ উদ্ধোধন হওয়ার পর প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক বলেছিলেন, বাস চলাচল বাড়লে পর্যায় ক্রমে ঢাকা চাকা’র ভাড়া কমানো হবে। কিন্তু তার মৃত্যুর পর এ ব্যাপারে আর কোন পদক্ষপ নেয়া হয়নি। বেসরকারি চাকরিজীবী সজিব ইসলাম সায়েম বলেন, ‘গুলশান এলাকায় একটিমাত্র কোম্পানির গণপরিবহন চলত আগে। বাসের জন্য দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। তবে নতুন বাসসেবা চালু হওয়ায় এই দাঁড়ানোর কষ্ট কমেছে। যখনই আসছি, একটি না একটি বাস পাচ্ছি। গুলশান চাকা বাসগুলোর সিট বেশ আরামদায়ক ,বাসটিও বেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন”
এর আগে চলতি বছরের মার্চে ধানমন্ডি-আজিমপুর রুটে এবং মে মাসে উত্তরাতে চক্রাকার বাস সার্ভিস চালু করে বিআরটিসি। রাজধানীর গণ পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনতে এলাকা ভিত্তিক চক্রাকার বাস সাার্ভিস সেবার পরিধি বাড়াতে চায় সরকার। সেজন্য পুরান ঢাকা ও মতিঝিল এলাকাকে কেন্দ্র করে আরেকটা চক্রাকার বাস সার্ভিস চালু করার কথা ভাবছেন সংশ্লিষ্টরা।

কারিকা প্রতিবেদক
মেগাসিটি ঢাকাকে শৃঙ্খলায় আনার দাবি সব শ্রেণির নাগরিকের। তাই বিগত সময়ে জারি করা পৃথক সব নীতিমালা একত্রিত করে যুগোপযোগী ‘জাতীয় নগরায়ণ নীতিমালা-২০১৯’ প্রণয়ন করতে যাচ্ছে সরকার। নীতিমালা অনুযায়ী এখন থেকে মেগাসিটিতে আর শিল্প ও অন্যান্য প্রধান খাতে বড় বিনিয়োগ করা যাবে না। পরিবর্তে মেগাসিটির বাইরে কোনো নগর ও অঞ্চলে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হবে। দরিদ্রদের জন্য বিশেষ অঞ্চল, নগরের স্থানীয় প্রশাসনকে শক্তিশালীকরণ, মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী নগরের উন্নয়ন, ভূমি ব্যবহারের যথোপযুক্ত নির্দেশনা, যানজট নিরসনে গণপরিবহনের উন্নয়ন ও আইন-শৃঙ্খলার উন্নয়নে নানা ধরনের পরিকল্পনা ঠাঁই পেয়েছে এই নীতিমালায়। ইতোমধ্যে নগর-নীতিমালার একটি খসড়া তৈরি করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। শিগগিরই এটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে মন্ত্রিসভার বৈঠকে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সূত্রে এই তথ্য পাওয়া গেছে।
জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, ‘নগরগুলোকে পরিকল্পনামাফিক গড়ে তোলার তাগিদ থেকেই এ নীতিমালা করা হচ্ছে। ঢাকার দিকে তাকালেই বোঝা যায় পরিকল্পিত নগরের প্রয়োজন কতটুকু। এটি আগেই হওয়া দরকার ছিল। যেহেতু হয়নি, তাই এর সঙ্গে জড়িত সবার মতামত নিয়ে একটি নীতিমালা করা হচ্ছে।’
স্থানীয় সরকার বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশের জাতীয় উন্নয়নে শহর ও নগর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বর্তমানে নগর-জনগোষ্ঠী দেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ২৮ ভাগ। প্রতিনিয়ত নগরের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অব্যাহতভাবে দ্রুত নগরায়ণে সৃষ্ট অবকাঠামো ও পরিষেবার বিপুল চাপ এবং টেকসই নগরায়ণের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া বর্ধিত এ জনগোষ্ঠীর জন্য আবাসন, পানি , পয়োনিষ্কাশন, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ, যোগাযোগসহ নগর সুবিধাদিও বড় ধরনের সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই অবস্থায় পরিকল্পিত নগরায়ণ না হলে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা সম্ভব হবে না সরকারের পক্ষে-এমন উপলদ্ধি থেকে সরকার পরিকল্পিতভাবে নগরায়ণে নগর-নীতিমালা তৈরি করছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এ নীতিমালা বাস্তবায়ন করা হলে নগরায়ণের ইতিবাচক দিকগুলো বৃদ্ধির পাশাপাশি অর্জিত হবে নগরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও। ভবিষ্যতে নগরবাসীকে কার্যকর নাগরিক-সুবিধাও দেয়া হবে যথাযথভাবে। এতে মাস্টারপ্ল্যান বা মহাপরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে বলে জানা গেছে। নীতিমালার ভবিষ্যৎ রূপকল্প অংশে বলা হয়েছে, নীতিমালা কার্যকর করার পর নগর ও শহরগুলো বিকেন্দ্রীকৃত ও কার্যকর স্থানীয় সরকার দ্বারা পরিচালিত হবে, যেখানে সুশীল সমাজ ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীসহ স্থানীয় নগরবাসীর আশা-আকাংখা প্রতিফলিত হবে। সুষ্ঠু নগরায়ণ-নীতিমালা প্রণয়নের ফলে প্রধান প্রধান নগরে অবৈধ বস্তির সংখ্যাও কমবে বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। নীতিমালায় ‘নগরের ক্রমবিন্যাস’ অংশে বলা হয়েছে, অধিকতর ভারসাম্যপূর্ণ ও বিকেন্দ্রীকৃত নগর-ব্যবস্থা গড়ে তুলতে জাতীয় নগর-কৌশল প্রণীত হবে। জাতীয় নগর-নীতিমালার আওতায় সর্বাগ্রে একটি নগর ক্রমবিন্যাস তৈরি করা হবে। সব নগর ও শহরের অবস্থানকে সুনির্দিষ্ট করে চিহ্নিত করা হবে সেখানে। জাতীয় নগর ক্রমবিন্যাসের জন্য ছয়টি ধাপে নগরকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে জনসংখ্যা ১০০ লাখ বা অনূর্ধ্বকে মেগাসিটি, পাঁচ লাখ থেকে ১০০ লাখ বা অনূর্ধ্বকে মহানগর বা মেট্রোপলিটন সিটি, দুই লাখ থেকে অনূর্ধ্ব পাঁচ লাখ জনসংখ্যার এলাকাকে আঞ্চলিক শহর বা শিল্পশহর বলা হবে। এছাড়া জনসংখ্যা পঞ্চাশ হাজার থেকে অনূর্ধ্ব দুই লাখ পর্যন্ত মাঝারি শহর বা জেলা শহর, এরপর ক্রমান্বয়ে উপজেলা শহর, ছোট শহর ও কমপ্যাক্ট টাউন বা বিকাশমান অনুকেন্দ্র বলা হয়েছে।
নীতিমালা অনুযায়ী মেগাসিটিতে অর্থাৎ রাজধানী ঢাকায় শিল্প খাতসহ অন্যান্য বড় খাতে আর বিনিয়োগ করা যাবে না। মহানগর বা অন্যান্য আঞ্চলিক শহরে শিল্প খাতে বিনিয়োগ করা যাবে। খসড়ায় ‘মাস্টারপ্ল্যান’ তথা কৌশলগত পরিকল্পনার জন্য সব উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ/সিটি করপোরেশন/পৌরসভা ব্যবস্থা নেবে। যতদিন সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সংস্থা নিজে পরিকল্পনা তৈরি করতে না পারে ততদিন কেন্দ্রীয় সংস্থা, যেমন নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর বা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে এ কাজ সম্পাদন করবে। সিটি করপোরেশন বা পৌরসভা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে মাস্টারপ্ল্যানের আওতাভুক্ত স্কিমগুলোর মধ্যে থেকে অগ্রাধিকার স্কিম গ্রহণ করবে।
নীতিমালা অনুযায়ী নগরের মধ্যবিত্ত ও দরিদ্রদের আবাসনে ভূমি ও অর্থ সরবরাহে এবং আবাসনের যথাযথ পরিবেশ সৃষ্টিতে সরকার সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। অতিদরিদ্র, নিম্ন আয়ের মানুষ এবং গৃহহীনদের জন্য আবাসন প্রকল্প গ্রহণ করবে সরকার। এছাড়া দরিদ্রদের জন্য বস্তি উন্নয়নে কাজ করবে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে বস্তি উচ্ছেদ করা যাবে না। বস্তিগুলোতে রক্ষাযোগ্য ও অযোগ্য তালিকা তৈরি করবে সরকার। যোগাযোগ-অযোগ্য বস্তিগুলো উচ্ছেদ করা হবে। কিন্তু তার আগে বস্তিবাসীদের পুনর্বাসন করতে হবে। নীতিমালায় নগর পরিবহনের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। নগরে চলাফেরায় ব্যক্তি-মোটরযানের পরিবর্তে গণপরিবহনকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। নগরের রাস্তায় পথচারীদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের কথা বলা হয়েছে এ নীতিমালায়। অগ্রাধিকার অনুযায়ী, প্রতিটি সড়কে পর্যাপ্ত ফুটপাত রাখার সুযোগ রাখা হয়েছে হাঁটার জন্য। এ ক্ষেত্রে রাস্তার পাশে অবৈধ দখলদারিত্ব উচ্ছেদের কথা বলা হয়েছে। ফুটপাতে ব্যবসায়ীদের জন্য নির্দিষ্ট একটি অঞ্চল তৈরি করে ব্যবসার সুযোগের কথাও উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া রাস্তার প্রতিটি পরিবহনের চলাচলের ক্ষেত্রে পৃথক লেন নির্দিষ্ট করার কথা বলা হয়েছে।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, প্রতিটি শহরে জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে খেলার মাঠ, পার্ক এবং বিনোদনের জন্য জায়গা রাখতে হবে। পাশাপাশি কবরস্থান ও শ্মশানঘাটের জন্য রাখতে হবে আলাদা জায়গা। নগরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সব স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। পুলিশের সঙ্গে জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর ব্যাপারেও জোর দেয়া হয়েছে নীতিমালায়। নগরের যুবসমাজের উন্নয়নেও নানা ধরনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে যুবসমাজকে আত্মনির্ভরশীল করতে সহজলভ্য ঋণ-সুবিধা প্রদান। তাদের আবাসনে ব্যাচেলর হোস্টেল নির্মাণ, দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণের কথাও বলা হয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। এছাড়া নগরের উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটি গঠনের কথাও বলা হয়েছে নীতিমালায়।

0 50

সোহরাব আলম
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের শহরাঞ্চলে নানা বয়সী মানুষের মধ্যে সহিংস ও নিষ্ঠুর আচরণ বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে অস্থিরতা ও আত্মহত্যাপ্রবণতা। এমনকি কিশোরদের মধ্যেও সহিংস আচরণের বিস্তার ঘটছে। কিছু ‘কিশোর গ্যাং’ মানুষ খুনেও জড়িত। শহরের মানুষের এমন সহিংস ও আত্মবিধ্বংসী হয়ে ওঠার পেছনে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ফ্ল্যাটভিত্তিক জীবনযাপনে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। নগরজীবনের ব্যস্ততার মধ্যে মানসিক অস্থিরতা বা মানসিক রোগের প্রাদুর্ভাব কমাতে সামাজিক মিথস্ক্রিয়া বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন স্বাস্থ্য-বিশেষজ্ঞরা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নগরায়ণ বর্তমান শতাব্দীর অন্যতম প্রধান কারণ, যা স্বাস্থ্য খাতের ওপর প্রভাব ফেলছে। ২০৫০ সালের মধ্যে সারা বিশ্বের ৬৮ ভাগের বেশি মানুষ নগরে বসবাস করবে। আর বাংলাদেশে যে আনুপাতিক হারে নগরায়ণ হচ্ছে, তা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের নগরে বসবাসকারী জনসংখ্যা গ্রামীণ জনসংখ্যার চেয়েও বেশি হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এমনকি ভবন নকশার দুর্বলতার কারণেও নগরবাসীর মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে। সাধারণত স্থপতিরা অনেক দিক বিবেচনায় রেখেই ভবনগুলোর নকশা (ডিজাইন) করেন। প্রাকৃতিক পরিবেশ খেয়াল করে বিশুদ্ধ বাতাস চলাচলের সুবিধার্থে সঠিক ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা রাখা হয়। এ ধরনের ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট ভবনসহ নগর এলাকার মানুষকে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানসিকভাবে ভালো রাখে। সুস্থ রাখে। কিন্তু উল্টোটা হলে বিপদ।
দেশে দ্রুত বর্ধমান শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার অবস্থান শীর্ষে। এখানকার বেশিরভাগ নগরায়ণ হচ্ছে অপরিকল্পিতভাবে। প্রতিনিয়ত উঠছে আকাশচুম্বী ভবন। হারিয়ে যাচ্ছে খোলা জায়গা। এমনকি প্রায় দুই কোটি বাসিন্দার এই নগরে খেলাধুলার মাঠগুলোও হারিয়ে যাচ্ছে বহুতল ভবনের আড়ালে। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে ঘিঞ্জি হয়ে উঠেছে অনেক এলাকা। পরস্পরের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ ও আলাপ তথা সামাজিক মিথষ্ক্রিয়া আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। নগরে স্বাভাবিক বিনোদনের জন্যও নেই পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। সব মিলিয়ে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার পরিবেশ নেই বললেই চলে। ফলে মানসিক স্বাস্থ্যহীনতা ক্রমেই বাড়ছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সামাজিক অবক্ষয় এবং ব্যক্তিগত অস্থিরতা ও সহিংস আচরণ। নাগরিক জীবনের প্রভাবে মানসিক স্বাস্থ্য কতটা ক্ষতিগ্রস্ত, তার গবেষণালব্ধ পরিসংখ্যান না থাকলেও এই হার যে বাড়ছে-তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এ ক্ষেত্রে শুধু কিশোরদের অপরাধী হয়ে ওঠার ঘটনাই বড় উদাহরণ হতে পারে।
সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকার নয়টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল, মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত, মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালত এবং শিশু আদালতের বিচারিক নিবন্ধন খাতার তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ বছরে ঢাকায় ৯৯ খুনের মামলায় তিনশ’র বেশি কিশোর জড়িত থাকার অভিযোগ এসেছে। এর মধ্যে গত দেড় বছরে ঘটেছে ১৩টি খুন। এতে জড়িত অন্তত ১২০ কিশোর। এদের নাম উল্লেখ করে খুনের মামলাও হয়েছে।
প্রতিবেদনে রাজধানীর উত্তরা, হাজারীবাগ, চকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের খবরও উঠে এসেছে। বিভিন্ন গ্যাংয়ের সদস্য কিশোরদের মধ্যে নামী স্কুলের শিক্ষার্থীও রয়েছে, যারা খুন-ধর্ষণ-মাদকসহ নানা অপরাধে জড়িত। এসব অপরাধের পেছনে প্রেমসংক্রান্ত বিরোধ, মাদক ও তথাকথিত ‘হিরোইজম’ অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। এছাড়া চুরি-ছিনতাইয়ের মতো অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে কিশোররা। কিশোরদের এসব ভুল পথে পা বাড়ানোর পেছনে নানা কারণ রয়েছে। উন্নত প্রযুক্তির অপব্যবহার, অভিভাবকদের অবহেলা, সমাজে বয়োজ্যেষ্ঠদের খরবদারি কমে যাওয়া কিংবা রাজনৈতিক ছত্রছায়া- গড়পড়তায় এই কারণগুলো তাদেরকে ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
নগরের অপরিকল্পিত সম্প্রসারণের কারণে মানসিক বিকাশের যথাযথ পরিবেশ তৈরি হচ্ছে না। এমনকি মানসিক সমস্যার কারণেই বাড়ছে আত্মহত্যার সংখ্যা। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও পুলিশ সদর দপ্তরের এক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গড়ে ২৮ জন আত্মহত্যা করেন। সে হিসাবে প্রতি বছর দেশে প্রায় ১০ হাজার মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। বিশ্বজুড়ে নগরায়ণের পরিবর্তন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে তৈরি হতাশা এবং মানসিক রোগের প্রাদুর্ভাব মানুষকে আরও বেশি আত্মহত্যাপ্রবণ করে তুলেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সারা পৃথিবীতে প্রতিদিন গড়ে তিন হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) বলছে, এটা এখন এক নীরব মহামারী (সাইলেন্ট এপিডেমিক) হয়ে উঠেছে। এখন ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সের মানুষদের মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ আত্মহত্যা। সিডিসির গবেষণা থেকে জানা যায়, প্রতি ১২ জন তরুণের মধ্যে অন্তত একজন আত্মহত্যার চেষ্টা করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ নানা সরকারি-বেসরকারি গবেষকদের ধারণা, আত্মহত্যার মূল কারণ হতে পারে-১. ভেঙে পড়া সামাজিক বন্ধন, ২. পরিবারের সাবেক কাঠামোর অবলুপ্তি, ৩. অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ৪. বেকারত্ব, ৫. মানসিক অবসাদ প্রভৃতি। আর এসব কারণ শহরাঞ্চলেই বেশি বিদ্যমান, অপরিকল্পিত নগরায়ণ যা ত্বরান্বিত করছে।
নগরজীবনে মানসিক চাপ কমানোর জন্য প্রয়োজন সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধি। ঢাকার সম্প্রসারণকে সব ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগের জন্য সুপরিকল্পিত করা যায়নি বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
স্থপতি রবিউল হুসাইন বলেন, ‘আইনের বিধান অনুসারে স্থাপনা এমনভাবে নির্মাণ করতে হবে যেন আলো-বাতাস চলাচলের সুযোগ থাকে। জায়গা ছাড়ার কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু ভবনগুলো নির্মাণের সময় এগুলো মানা হয় না। ফলে কংক্রিটের জঙ্গল তৈরি হচ্ছে। এসব ‘জঙ্গলে’ নানা ধরনের দূষণ কেবল শারীরিক নয়, মানসিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে নাগরিকদের। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, পানিদূষণের প্রভাব শরীরের সঙ্গে সঙ্গে মনের ওপরও পড়ছে।’
সুপরিকল্পিত নগরায়ণের অভাবে এর বাসিন্দাদের অবচেতন মনে চাপ তৈরি হচ্ছে, পরে যা ক্ষত হয়ে দেখা দিচ্ছে। মানসিক স্বাস্থ্যসহ সব স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এই নগরের বিকেন্দ্র্রীকরণ প্রয়োজন বলেও মত দেন রবিউল হুসাইন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডা. সালাহ্উদ্দিন কাউসার বিপ্লব কারিকাকে বলেন, ‘এই নগরে আমরা যেভাবে বসবাস করছি, তাতে আমাদের সামাজিক যোগাযোগ-দক্ষতা কমে যাচ্ছে। শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নেই। যন্ত্রনির্ভর শৈশব নিয়ে বেড়ে উঠছে তারা। ফলে মানবিক হয়ে ওঠা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মনের জন্য অবসর প্রয়োজন, স্পেস প্রয়োজন। পরিকল্পনাহীন ইট-পাথরের শহরে মনের স্পেস তৈরির সুযোগ কম। অথচ পরিকল্পিত নগর গড়ে উঠলে চমৎকার পরিবেশে পর্যাপ্ত অবসর ও মনের স্পেস তৈরির সুযোগ হতো। বর্তমানে যেভাবে আমরা এগিয়ে চলেছি, তাতে মানুষ অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে।’
অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দুর্বল নকশার ভবনে বসবাসের ক্ষতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে সালাহ্উদ্দিন কাউসার বিপ্লব বলেন, ‘কোনো নাগরিক যদি সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকেই জ্যামে আটকা পড়েন, ময়লা-নোংরার মধ্যে পড়েন তাহলে তার মেজাজ ধীরে ধীরে খারাপ হবে-এটাই স্বাভাবিক। ফ্ল্যাটে বা বাড়িতে ঠিকমতো আলো-বাতাস না ঢুকলেও মেজাজ খারাপ থাকবে। যার প্রভাব পড়বে মানসিক স্বাস্থ্যে। সব মিলিয়ে অফিস বা কাজে যাওয়ার সময় থেকে শুরু করে বাসায় ফেরা পর্যন্ত মেজাজ খারাপ থাকবে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে পরিকল্পিত নগরায়ণের বিকল্প নেই।’ হতাশা, অস্থিরতা ও সহিংস আচরণের প্রভাব থেকে মুক্তির জন্য সামাজিক মিথষ্ক্রিয়ার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন এই মনোবিদ।

কারিকা প্রতিবেদক
মহাখালী ওয়্যারলেস থেকে গুলশান-১-এর দিকে একটু যেতেই জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় পরীক্ষাগার। এর দেয়াল ঘেঁষেই হ্যাঙ্গারে ঝুলছে হরেক রকমের কাপড়, যা ঘিরে মানুষের জটলা। ঢাকার রাস্তায় হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে কিংবা কাগজের কার্টনের ওপর কাপড় বিক্রির দৃশ্য হরহামেশাই চোখে পড়ে। কিন্তু এখানে যে কাপড়গুলো ঝুলছে সেগুলো নতুন নয়, পুরোনো।
দেয়ালের গায়ে পুরোনো কাপড় কেন? এমন প্রশ্ন জাগতেই পারে। দেয়ালের লেখাটা পড়ে মিলল উত্তর। লেখা রয়েছে : আপনার অপ্রয়োজন হতে পারে অন্য কারো প্রয়োজন। এর ডান দিকে লেখা : আপনার বা আপনার সন্তানের অপ্রয়োজনীয় কাপড় দিয়ে যান। বাম দিকে লেখা : আপনার বা আপনার সন্তানের প্রয়োজনে নিয়ে যান।
গত শীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের সুবাদে ঢাকার কয়েকটি জায়গায় এমন উদ্যোগ দেখা গিয়েছিল, যা ধীরে ধীরে পুরো ঢাকায় ছড়িয়ে গেছে।
২০১৫ সালে ইরানের উত্তর-পূর্বের শহর মাশাদে প্রথম এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেখানে শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র পৌঁছে দিতে অজ্ঞাত কোনো ব্যক্তি এমন উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
সেই উদ্যোগে উদ্বুদ্ধ হয়ে ২০১৫ সালের নভেম্বরে মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলার আড়পাড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরপর লক্ষীপুরের রায়পুর উপজেলার চর আবাবিল এসসি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২০১৭ সালে এমন উদ্যোগ নিতে দেখা যায়।
ঢাকায় ‘মানবতার দেয়াল’ প্রথম চালু করে পুরান ঢাকার লালবাগ স্পোর্টিং ক্লাব। ক্লাবের দেয়ালের বাইরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে সারি সারি পুরোনো কাপড়। নিজের প্রয়োজনমতো যেকেউ সেখান থেকে কাপড় নিতে পারবেন এবং নতুন বা পুরোনো কাপড় অন্যের জন্য রেখে যেতে পারেন।
লালবাগের ঢাকেশ্বরী রোড দিয়ে লালবাগ কেল্লার দিকে যেতেই বাম পাশে পড়বে পুরোনো একটি বাড়ি। একতলা। গোলাপি রঙের বাড়িতেই লালবাগ স্পোর্টিং ক্লাবের কার্যালয়। ১৯৬২ সালে যাত্রা করে ক্লাবটি। ভবনের বাইরের দিকে ডান পাশের দেয়ালে সাজিয়ে রাখা হয়েছে কিছু পুরোনো কাপড়। দেয়ালের নাম রাখা হয়েছে : মানবতার দেয়াল। ব্যানারের এক পাশে লেখা : আপনার অপ্রয়োজনীয় জিনিস এখানে রেখে যান এবং অন্য পাশে লেখা : আপনার প্রয়োজনীয় একটি জিনিস এখান থেকে নিয়ে যান।
লালবাগ ও মহাখালী ছাড়াও মানবতার দেয়ালের এই মহতি উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানীর মিরপুর, ভাষানটেক, উত্তরা, মোহাম্মদপুর, বনশ্রীসহ বিভিন্ন এলাকায়।
মহাখালীর মানবতার দেয়ালের উদ্যোক্তা সাইদুর রহমান বলেন, ‘বাসায় এত রকমের কাপড় জমে, সেগুলো যদি কারও কাজে লাগে, ক্ষতি কী? যে কাপড়গুলো আমরা ব্যবহার করছি না, সেটা বাইরে ঝুলিয়ে দিলে কেউ না কেউ নিয়ে যাবে-এই চিন্তা থেকেই এই উদ্যোগ নিয়েছি।’
এক রিকশাচালক বলেন, ‘একটা প্যান্ট কিনতে গেলে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা লাগে। আমি এমনিতেই পেয়ে গেলাম, এটা আমার জন্য অনেক উপকার হলো।’
প্রতিদিনের সংবাদপত্র কিংবা টিভির পর্দা খুললেই যেখানে পাওয়া যায় হানাহানি আর বিদ্বেষের খবর, সেখানে দৃষ্টান্ত হতে পারে মানবতার দেয়াল। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, আদর্শ রাষ্ট্রব্যবস্থায় অসহায় মানুষকে সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনার বিকল্প নেই। এজন্য প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন। মানবতার দেয়ালের মতো মহতি উদ্যোগ হতে পারে সেই আন্দোলনের সূতিকাগার।

0 44

কারিকা প্রতিবেদক
প্রাচ্যের ডান্ডি হিসেবে খ্যাত নারায়নগঞ্জের দেওভোগে নির্মিত হচ্ছে দেশের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন মসজিদ। দেওভোগ পাকা রোড জামে মসজিদটির স্থ্যাপত্য নকশা করেছে স্যানমার ইন্টেরিয়র অ্যান্ড আর্কিটেকচার। মধ্যপ্রাচ্যের অ্যারাবিয়ান স্থ্যাপত্য শৈলীর আদলে নির্মিত আন্তর্জাতিক মানের এই মসজিদটির নির্মাণ কাজ শেষ হলে নারায়নগঞ্জ, ঢাকা তথা সমগ্র বাংলাদেশের জন্য মসজিদটি একটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে বিবেচিত হবে।
রাফিউদ্দিন রিয়াদ, মুজাফফর মাহামুদ গিলান, রায়হান আহমেদ ভূঁইয়ার তত্ত্বাবধানে এবং স্থানীয় এলাকাবাসীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় মসজিদটির নির্মাণ কাজ খুব দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। ছয়তলা ভিত্তি সম্পন্ন মসজিদটিতে বর্তমানে চতুর্থ তলার কাজ চলছে। আশা করা যাচ্ছে এ বছরের শেষ নাগাদ মুসল্লিরা মসজিদটিতে নামাজ আদায় করতে পারবেন।
স্থপতি আমিনুল ইসলামের স্থ্যাপত্য নকশা করা মসজিদটির পুরোটা জুড়ে থাকছে অ্যারাবিয়ান আর্কিটেক্ট এবং মেটাল ক্যালিওগ্রাফি। মসজিদটির মেহরাব এর নকশাতেও থাকবে ভিন্নতা। মেহরাবের ভেতরে অন্ধকারাচ্ছনতা দুর করতে সেখানে ডে লাইট প্রবেশের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যাতে মনে হবে ঐশ্বরিক কোন আলোয় মেহরাবটি আচ্ছন। প্রাচীন আমলের মসজিদের মতো আধুনিক এই মসজিদটিতেও স্যান্ডিলিয়্যার লাইট ব্যবহার করা হয়েছে। মসজিদের বড় জানালা দিয়ে অবারিত আলো-বাতাস প্রবেশের সুযোগ রাখা হয়েছে। ইমামের সঙ্গে মুসল­ীদের ভিজ্যুয়াল কানেকশন বজায় রাখার জন্য মসজিদটির প্রথমতলা থেকে দ্বিতীয়তলার ফ্লোরের মধ্যে ভয়েড রাখা হয়েছে। ঘন বসতিপূর্ণ এলাকাটিতে অপরাপর স্থাপনা থেকে নির্মিতব্য মসজিদটির ভিন্নতা আনতে এর বাইরের অংশে অফ হোয়াইট রং ব্যবহার করা হয়েছে।
মসজিদ নির্মাণ কাজের অন্যতম উদ্যোক্তা রায়হান আহমেদ ভূঁইয়া কারিকাকে জানান, ‘মসজিদটির নির্মাণ কাজের শুরুর দিকে আমি মসজিদটির স্থ্যাপত্য নকশা করার জন্য একটি ভালো ইন্টেরিয়র ফার্ম খুঁজছিলাম। পরে ইন্টারনেট সার্চ করে স্যানমার ইন্টেরিয়র ও আর্কিটেকচার এর খোঁজ পাই। প্রথমদিকে মসজিদটির স্থ্যাপত্য নকশা করার জন্য ১২ লক্ষ টাকা বিল ধরা করা হয়। আমি প্রতিষ্ঠানটিকে কিছু টাকা কম নেয়ার অনুরোধ করলে স্যানমার গ্রুপের ডিরেক্টর আতিকা হক পুরো ডিজাইনটি বিনামূল্যে করে দেন।
রায়হান আহমেদ ভূইয়া জানান, মসজিদটির সর্ম্পূণ নির্মাণ কাজ শেষ হলে এতে ১২০০-১৪০০ মুসলি­ একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারবেন। তিনি আরও জানান মসজিদটির প্রবেশ দ্বারে একটি ডিজিটাল টার্চ স্ক্রীণবোর্ড থাকবে যাতে নামাজের সময় সূচি ছাড়াও কোরআন তেলাওয়াত শোনার ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়াও মসজিদ সংলগ্ন একটি লাশ ঘর থাকবে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত লাশ ঘরটিতে ব্যবস্থা কয়েক ঘন্টা লাশ সংরক্ষন করা যাবে। মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পটি তত্ত্বাবধান করছেন প্রকৌশলী কাওসারুল হক সিদ্দিকী এবং রাফাতুল রাজিব।

0 27

চট্টগ্রাম বন্দরের আপত্তিতে বারিকবিল্ডিং থেকে সল্টগোলা পর্যন্ত নির্মাণ হবে সড়কের বাইরে

আবদুল্লাহ আল মামুন

চট্টগ্রামের লালখানবাজার থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে সেই ২০১৭ সালের ১১ জুলাইয়ে। এরমধ্যে পার হয়ে গেছে দুইবছর। শুরু হয়েছে কাজও। এখন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের আপত্তিতে নকশায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এটা হলে বেড়ে যাবে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ ব্যয়। এছাড়া স্থানীয় লোকজনের বাধার মুখে পড়তে পারে নির্মাণকাজও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্পগুলো নেওয়ার আগে কোন ধরণের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। যার কারণে কাজ শুরুর পর নকশায় পরিবর্তন আনতে হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের আপত্তি হচ্ছে- বন্দর সীমানা ঘেঁষে বিদ্যমান সড়কের উপর দিয়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ হলে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে চট্টগ্রাম বন্দর। বিঘ্নিত হবে বন্দরের পণ্যবাহী যানবাহন চলাচলও।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস বলেন, ‘এটা সত্যি যে প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির আগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের (স্টেকহোল্ডার) সঙ্গে আলাপ করে মতামত নেওয়া হয়নি। যার কারণে প্রকল্পের কাজ শুরুর পর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের আপত্তি এসেছে। বন্দর দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তাদের আপত্তি বিবেচনায় নিয়ে উভয়পক্ষের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রস্তাবের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন নকশা পরিবর্তন,ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করে প্রকল্প ব্যয় পুনর্গঠন করা হবে।’
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘বিদ্যমান সড়কের উপর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হলে বন্দরমুখী যানবাহনের আসা-যাওয়া বাধাগ্রস্থ হবে। এছাড়া বন্দরের নিরাপত্তা দেওয়াল ঘেঁষে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ হলে বন্দরের নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়বে। এ জন্য বন্দরের পক্ষ থেকে বিষয়টি চউককে জানানো হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে নগরের বারিকবিল্ডিং থেকে সল্টগোলা ক্রসিং পর্যন্ত বিদ্যমান সড়কের ডানপাশে ৩০ ফুট ভূমি অধিগ্রহণ করে তার উপর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ ও বন্দর কার্যালয়ের সামনে দুইটি উঠা-নামার পথ রাখার বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।’
২০১৭ সালের ১১ জুলাই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। ব্যয় ধরা হয় ৩ হাজার ২৫০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। ২০২০ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ করার কথা রয়েছে। প্রকল্পটি যৌথভাবে বাস্তবায়ন করবে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স-র‌্যাঙ্কিন। অনুমোদনের প্রায় দেড় বছর পর গত ২৪ ফেব্রুয়ারী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পিলার পাইলিং কাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর থেকে নগরের সিমেন্টক্রসিং থেকে কাঠগড় পর্যন্ত প্রায় ৬০টি পিলারের পাইলিংয়ের কাজ শেষ হয়েছে। এরমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের আপত্তির মুখে টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। টেকনিক্যাল কমিটি কয়েক দফা সভা করে নগরের বারিকবিল্ডিং থেকে সল্টগোলা ক্রসিং পর্যন্ত সড়কের ডান পাশে ৩০ ফুট করে ভূমি অধিগ্রহণ করে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া নগরের লালখানবাজার থেকে বারিকবিল্ডিং ও সল্টগোলা থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত বিদ্যমান সড়কের উপর নির্মাণ হবে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে।
বারিকবিল্ডিং থেকে সল্টগোলা ক্রসিং পর্যন্ত সড়কের দৈর্ঘ্য প্রায় তিন কিলোমিটার। এ সড়কের ডান পাশে হাজারের অধিক দোকান ও বহুতল ভবন রয়েছে। সরকারি অনেক স্থাপনাও রয়েছে। এসব ভবন ভেঙ্গে ভূমি অধিগ্রহণ করতে হলে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে কয়েক’শ কোটি টাকা। বাড়বে ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয়ও। স্থানীয় লোকজনের বসত-বাড়ি থাকায় নির্মাণ কাজ বাধার মুখে পড়বে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ প্রসঙ্গে পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সাধারণ সম্পাদক স্থপতি জেরিনা হোসেন বলেন, ‘চউকের গত ১০ বছরের কাজগুলো সাবেক চেয়ারম্যানের ইচ্ছেমতো হয়েছে। কখনো স্টেকহোল্ডারদের মতামত নেননি তিনি। নগর পরিকল্পনাবিদদের পরামর্শও গ্রহণ করেননি। যার কারণে এসব প্রকল্প অপরিকল্পিত ও লোক দেখানো। এগুলো জনবান্ধব কোন প্রকল্প নয়। একটি কাজ মাঠ পর্যায়ে শুরু হওয়ার পর নকশায় পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে বুঝা যায় প্রকল্পগুলো কতটা অপরিপক্ক। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে জনগণের টাকা হরিলুট হচ্ছে।’
তবে প্রকল্প পরিচালক ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘প্রকল্পটিতে বন্দর কর্তৃপক্ষের অর্থায়নের কথা ছিল। তখন তারা এসব মতামত জানাননি। যার কারণে কাজ শুরুর পর নকশায় পরিবর্তন আনতে হচ্ছে। এতে বড় কোন প্রতিবন্ধকতা তৈরি হবে না। কারণ বারিকবিল্ডিং থেকে সল্টগোলা ক্রসিং পর্যন্ত সড়কের ডান পাশে অধিকাংশ জায়গা বন্দর কর্তৃপক্ষের। তারা তা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের জন্য ছেড়ে দিবে। বাকি জায়গা ভূমি অধিগ্রহণ করতে হবে।’
সাড়ে ১৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নয়টি এলাকায় ২৪টি র‌্যাম্প (গাড়ি ওঠা-নামার পথ) থাকবে। নগরের টাইগারপাসে চারটি, আগ্রাবাদে চারটি, বারিক বিল্ডিং মোড়ে দুটি, নিমতলী মোড়ে দুটি, কাস্টমস মোড়ে দুটি, সিইপিজেডে চারটি, কেইপিজেডে দুটি, কাটগড়ে দুটি, পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত এলাকায় দুটি র‌্যাম্প থাকবে। র‌্যাম্পগুলোর মোট দৈর্ঘ্য হবে ১২ কিলোমিটার। প্রতিটি র‌্যাম্প হবে দুই লেনের ও একমুখী। চার লেনের এই এক্সপ্রেসওয়ের প্রশস্থতা হবে ৫৪ ফুট।

0 33

কারিকা প্রতিবেদক
ইট-পাথরের এই শহরে সবুজের দেখাই মেলে না। রাজধানী ঢাকায় গাছপালা এমনিতেই কম। তার ওপর নানারকম উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে প্রতিনিয়ত কাটা পড়ছে গাছ। মেট্রোরেল নির্মাণ-প্রকল্পের কারণে পল্লবী থেকে আগারগাঁও হয়ে বাংলামোটর পর্যন্ত সড়কের বেশকিছু গাছ কাটা পড়ছে। যদিও মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ কাটা-পড়া এসব গাছের পরিবর্তে তিনগুণ বেশি বিভিন্ন প্রজাতির ‘অর্নামেন্টাল’ বা সৌন্দর্যবর্ধনের গাছ লাগিয়ে ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার কথা বলছে। তবে পরিবেশবাদীরা বলছেন, অর্নামেন্টাল নয়, দেশীয় গাছ লাগিয়েই সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি ক্ষতি পুষিয়ে দিতে হবে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) সূত্র জানিয়েছে, মেট্রোরেল প্রকল্পের পল্লবী থেকে মিরপুর-১০ নম্বর হয়ে ফার্মগেট-বাংলামোটর পর্যন্ত ১ হাজার ৬৫টি গাছ কাটা পড়বে। তবে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, প্রকল্প-এলাকায় বড় ধরনের কোনো গাছ কাটা পড়েনি। প্রকল্পের কাজ শুরুর সময় বলা হয়, প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে যেসব গাছ কাটা পড়বে তা নতুন করে লাগিয়ে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া হবে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষকে যতদূর সম্ভব কমসংখ্যক গাছ কাটার পাশাপাশি কাটা পড়া গাছের তিনগুণ বেশি নতুন করে লাগিয়ে দেওয়ার শর্ত দিয়েছিল।
ডিএনসিসি মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষকে ডেকেছি। প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমাদের সঙ্গে তাদের কী কী চুক্তি ছিল, সেগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনা হবে।’ মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই শর্ত অনুযায়ী কাজ করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জানতে চাইলে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএ সিদ্দিক বলেন, ‘সড়কদ্বীপে অর্নামেন্টাল গাছগুলো হয়। একে গাছ না বলে আমরা অন্যভাবে বলতে পারি। আমরা এর তিনগুণ বেশি গাছ লাগাব। মেট্রোরেলের ভায়াডাক্টের নিচে গাছ লাগিয়ে দেব এবং সেগুলো পরিচর্চা ও রক্ষণাবেক্ষণ করব।’
উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘বিমানবন্দর সড়কে যেমনটা করা হয়েছে, ঠিক তেমন করা হবে, যেন দৃষ্টিনন্দন হয়।’ এটা অনেক সুন্দর হবে দাবি করে তিনি আরও বলেন, ‘মেট্রোরেলের থ্রিডি যে নকশা প্রকাশ করা হয়েছে, সেখানে সড়কদ্বীপে কোনো গাছের অস্তিত্ব দেখা যায়নি।’
তবে পরিবেশবাদীরা বলছেন, প্রকল্প-এলাকায় যে পরিমাণ গাছ কাটা পড়েছে, অতি দ্রুত সেসব গাছ না লাগালে পরিবেশে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। তাদের দাবি, সৌন্দর্যবর্ধনের গাছ নয়, দেশীয় প্রজাতির বড় গাছ লাগিয়েই সড়কের সৌন্দর্য বাড়ানো যায়। এজন্য প্রকল্পের শর্ত অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের কাজ করতে হবে। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) সাধারণ সম্পাদক ও পরিবেশ অধিদফতরের সাবেক অতিরিক্ত পরিচালক প্রকৌশলী মো. আবদুস সোবহান বলেন, ‘ঢাকা শহরে যে পরিমাণ গাছ ও পানি থাকা দরকার, তা নেই। গাছ কাটার ফলে এখন এলাকাভেদে তাপমাত্রার তারতম্য দেখা যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের যেসব স্থানে উন্নয়নের কাজ চলে, সেখানে গাছ লাগানো ও কাটার বিশাল কর্মযজ্ঞ হয়। যারা এই প্রকল্প পরিচালনা করছেন, তাদের দায়িত্ব হচ্ছে শর্ত অনুযায়ী তা বাস্তবায়ন করা।’
আবদুস সোবহান বলেন, ‘শুধু সিটি করপোরেশনের নয়, পরিবেশ অধিদফতরেরও দায়িত্ব রয়েছে। গাছ কেটে অর্নামেন্টাল গাছ লাগালেই চলবে না। দেশীয় গাছ লাগিয়ে সড়কের সৌন্দর্যবর্ধন করতে হবে।’
মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ বড় গাছ কাটার কথা না বললেও সংসদ অ্যাভিনিউ সড়কে মেট্রোরেল-প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে সংসদ ভবনের সীমানা লাগোয়া অংশে বেশ কয়েকটি বড় বড় গাছ কাটা পড়েছে।

0 27

সোহরাব শান্ত
শিশুরা মাঝে মাঝে বিছানায় মাথা রেখে পা উপরে তুলে খেলার চেষ্টা করে। কিন্তু উপরের দিকে পা রেখে কত সময়ই-বা থাকা যায়, যেখানে মাথা উপরে থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এমন কোনো জায়গা যদি পাওয়া যায়, যেখানে বিছানা-বালিশ, চেয়ার-টেবিল থেকে শুরু করে সবকিছুই উল্টো! চাইলেই কেউ নিচের দিকে মাথা রেখে বসতে পারছে! হাঁটতে পারছে! কেমন হয়? ভাবছেন এ তো অসম্ভব? না, সম্ভব।
রাজধানীর লালমাটিয়ায় গড়ে ওঠা ‘আপসাইড ডাউন বিডি’ নামের ইল্যুশন গ্যালারিতে তৈরি আছে এমন পরিবেশ। যেখানে গিয়ে নিজেদের ‘উল্টো পৃথিবীর বাসিন্দা’ বানাচ্ছেন দর্শনার্থীরা। এ যেন এক স্বপ্নরাজ্য।
অবস্থান লালমাটিয়ার সি ব্লকে, মিনার মসজিদের পূর্ব পাশে, ২/৬ নম্বর ভবনের নিচতলা।
‘আপসাইড ডাউন বিডি’ দেশের প্রথম ইল্যুশন গ্যালারি। তিন হাজার বর্গফুটের বেশি আয়তনের ইল্যুশনাল আর্ট গ্যালারি তথা বিস্ময়কর জগৎ উপভোগ করতে প্রতিদিনই ভিড় জমাচ্ছেন নানান বয়সের দর্শনার্থীরা। শিশুরা অবাক বিস্ময়ে উপভোগ করছে বর্ণিল এই গ্যালারির বিভ্রমে ভরা বৈচিত্র্যময় সব দৃশ্যপট। দর্শনার্থীরা জিরো গ্র্যাভিটি পরিবেশে ছবি তোলার আনন্দে মেতে উঠছেন সপরিবারে। বিভ্রমে ভরপুর মজার এই জগতে সাতটি সুপরিসর কক্ষে থাকা নানান আসবাব ছাদ থেকে উল্টো হয়ে ঝুলছে। কক্ষগুলোর স্থাপত্যশৈলী ও আসবাবের অবস্থান এমনই অদ্ভুত যে, কায়দা করে এগুলোর সঙ্গে তোলা ছবি উল্টো করে ধরলেই মনে হবে লোকজন যেন হাওয়ায় ভাসছে।
ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভিজ্যুয়াল ইল্যুশন গ্যালারি রয়েছে। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো এই গ্যালারি তৈরি করেছেন চারজন তরুণ উদ্যোক্তা-আবদুল্লাহ আল মাহবুব, শাফি আহমেদ, ইশতিয়াক মাহমুদ অনিক ও আসিফুর রহমান। তারা জানান, ইন্দোনেশিয়ার বালিতে ঘুরতে গিয়ে এ ধরনের গ্যালারির সঙ্গে প্রথমবারের মতো পরিচয় হয় তাদের। তখনই আইডিয়াটা মনে ধরে যায়। ঢাকা মহানগরীর মানুষের প্রধান বিনোদন বিভিন্ন রেস্তোরাঁকেন্দ্রিক। তাই মানুষকে অভিনব কিছুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে ‘ইল্যুশন আর্ট গ্যালারি’ করার সিদ্ধান্ত নেন তারা।
‘আপসাইড ডাউন বিডি’-এর অন্যতম উদ্যোক্তা ইশতিয়াক মাহমুদ অনিক জানান, নানান স্থাপত্যকৌশল প্রয়োগ করে ইল্যুশনাল আর্ট গ্যালারিতে বিভ্রম তৈরি করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এজন্য প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনাও আছে। গ্যালারিগুলোতে বসার চেয়ার, দাবার বোর্ড ও টেলিভিশন থেকে শুরু করে বইয়ের তাক-সবকিছুই উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা। শৌচাগার, শোবার ঘর, রান্নাঘর, শিশুদের খেলার কক্ষ ও অফিস কক্ষ সাজানোর আদলও একই রকম। সবক’টি কক্ষে প্রচলিত আসবাবসহ ঘর সাজানোর উপকরণগুলোও উল্টো করে ঝোলানো। নজরকাড়া আলোকসজ্জায় পরিবেশও খুব উপভোগ্য। প্রতিটি কক্ষের আসবাবের সঙ্গে বিশেষ ভঙ্গিতে তোলা স্বাভাবিক ছবি উল্টো করে ধরলেই তৈরি করে বিভ্রম। মনে হবে ছবির লোকগুলো ভেসে আছে। ‘তান্ত্রিক ঘর’ নামের একটি কক্ষে রয়েছে চমৎকার দেয়ালচিত্র। শূন্যের ওপর বসে থাকা বা শোয়ার ছবি তোলার জন্য তৈরি করা হয়েছে ঘরটি।
ইশতিয়াক মাহমুদ অনিক আরও জানান, চলতি বছরের ১৭ মে গ্যালারি চালুর শুরু থেকেই দারুণ সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৭০ জন দর্শনার্থী আসছেন। তাদেরকে গ্যালারি ঘুরিয়ে দেখানো এবং ছবি তোলার কাজে সহযোগিতার জন্য প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব লোকবল রয়েছে। তারা প্রত্যেকে পেশাদার আলোকচিত্রী। দর্শনার্থীদের ছবি তোলার বিভিন্ন ভঙ্গি দেখিয়ে দেন তারা।
‘আপসাইড ডাউন বিডি’তে দর্শনার্থীদের জন্য গ্যালারি উন্মুক্ত থাকে বেলা ২টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত। রবি ও সোমবার সাপ্তাহিক বন্ধ। সাধারণ টিকিটের মূল্য ৪০০ টাকা। ১০ বছরের কম বয়সীদের জন্য ২৫০ টাকা। তবে দর্শনার্থীদের আগ্রহ ও চাহিদা বিবেচনায় বন্ধের দিন ও টিকিটের দাম কমানোর চিন্তা করছে কর্তৃপক্ষ।
‘আপসাইড ডাউন বিডি’র অন্যতম উদ্যোক্তা ইশতিয়াক আহমদ অনিক বলেন, ‘শুধু রোববার সাপ্তাহিক ছুটি রেখে সপ্তাহের ছয়দিন খোলা রাখার চিন্তাভাবনা চলছে। সেক্ষেত্রে সোমবারও খোলা রাখা হবে। টিকিটের দামও কিছুটা কমতে পারে। এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলে ‘আপসাইড ডাউন বিডি’র ফেসবুক পেজে তা জানিয়ে দেওয়া হবে।

কারিকা প্রতিবেদক
রাজধানী ঢাকায় বিগত ২০ বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ বেড়েছে। এবারের ডেঙ্গুর ধরনও ভিন্ন। ইতোমধ্যে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত বেশ ক’জন মারা যাওয়ায় এই নিয়ে চরম ভীতি কাজ করছে মানুষের মধ্যে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এতদিন ব্যবহার করে আসা মশকনিধন ওষুধ পাল্টে নতুন ওষুধের ব্যবহার শুরু করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) কর্তৃপক্ষ। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনও (ডিএসসিসি) মশা নির্মূলে ব্যাপক গুরুত্ব দিচ্ছে। এমতাবস্থায় শুধু সিটি করপোরেশনের দিকে তাকিয়ে না থেকে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো বেশি জরুরি বলে মনে করছেন চিকিৎসকসহ সচেতন মহল।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ছিটানো ওষুধে মশা মরছে না। রাজধানীর মানুষ মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ। এ বছর বর্ষা মৌসুম শুরুর সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক এডিস মশা প্রচলিত কীটনাশক দিয়ে মরছে না। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৮ সালের মার্চের মধ্যে করা গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, ঢাকা শহরের এডিস মশা ওষুধ-প্রতিরোধী।
আইসিডিডিআরবির প্যারাসাইটোলজি ল্যাবরেটরির সহযোগী বিজ্ঞানী ও এই গবেষণা দলের প্রধান মোহাম্মদ শফিউল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আজিমপুর, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, গুলশান, কড়াইল, মিরপুর-১, উত্তরা সেক্টর-৪, মালিবাগ চৌধুরীপাড়া ও খিলগাঁও এলাকা থেকে এডিস মশার ডিম সংগ্রহ করা হয়। পরীক্ষাগারে সেই ডিম থেকে লার্ভা ও পরে মশা তৈরি করা হয়। সেই মশাকে ঢাকা শহরে ব্যবহার করা হচ্ছে-এমন কীটনাশকের সংস্পর্শে আনা হয়। তাতে দেখা যায়, সব মশা মরছে না। কীটনাশকের বিষক্রিয়া সহ্য করেও অনেক মশা বেঁচে থাকছে।’
গবেষণাটির সঙ্গে আইসিডিডিআরবির তিনজন ও যুক্তরাষ্ট্রের দুটি প্রতিষ্ঠানের তিনজন বিজ্ঞানী যুক্ত ছিলেন। গত বছর ২২ মে এই গবেষণার ফলাফল একটি অনুষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তাদের সামনে প্রকাশ করে আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানীরা। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে সরকারের স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের (সিডিসি) পরিচালক অধ্যাপক সোনিয়া তাহমিনা এবং রোগতত্ত¡, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক মিরজাদী সাব্রিনা ফ্লোরা উপস্থিত ছিলেন। দুই সিটির তখনকার প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তারাও ছিলেন।
জানা গেছে, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় মানোত্তীর্ণ নয়, ছিটালে মশা তেমন মরে না-সম্প্রতি মশকনিধনের এমন ওষুধ ব্যবহার বন্ধ করে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে উত্তর সিটি করপোরেশন। তারা নতুন ওষুধ ব্যবহার করছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আগে দ্য লিমিট অ্যাগ্রো প্রডাক্ট লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানের ‘লিমিট লিকুইড ইনসেকটিসাইড’ নামের ওষুধটি ব্যবহার করত দুই সিটি করপোরেশন। উত্তর সিটি করপোরেশন ওই ওষুধ পরীক্ষার জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্ল্যান্ট প্রোটেকশন উইংয়ে (পিপিইউ) পাঠায়। সেখানে পরীক্ষায় ওষুধটি মানোত্তীর্ণ হয়নি। তাই ডিএনসিসিতে ওই ওষুধের ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মশা নিধনে বর্তমানে ডিএনসিসি নকন লিমিটেডের ‘নকন মসকিউটো ইনসেকটিসাইড’ নামের ওষুধটি ব্যবহার করছে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা ও করণীয়
ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও সচেতনতায় বেশকিছু পরামর্শ দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন ও চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ। গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি জানিয়েছেন, ডেঙ্গুর কোনো ভ্যাক্সিন নেই। যেহেতু ডেঙ্গু ভাইরাস চার ধরনের, তাই চারটি ভাইরাস প্রতিরোধে কাজ করে-এমন ভ্যাক্সিন এখনও আবিষ্কৃৃত হয়নি। তাই ডেঙ্গুজ্বর প্রতিরোধের মূলমন্ত্রই হলো এডিস মশার বিস্তার রোধ এবং এই মশা যেন কামড়াতে না পারে-তার ব্যবস্থা করা।
এডিসকে ‘ভদ্র’ মশা আখ্যায়িত করে ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, ‘অভিজাত এলাকায় বড় বড় সুন্দর সুন্দর দালানকোঠায় এরা বসবাস করে থাকে। স্বচ্ছ পানিতে ডিম পাড়ে। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার ডিম পাড়ার উপযোগী স্থানগুলোকে পরিষ্কার রাখতে হবে এবং একই সঙ্গে মশক নিধনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’
তার মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যক্তিগত সতর্কতার গুরুত্ব অপরিসীম। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই চিকিৎসক বলেন, ‘এডিস মশা মূলত দিনের বেলা, সকাল ও সন্ধ্যায় কামড়ায়, তবে রাতে উজ্জ্বল আলোতেও কামড়াতে পারে। দিনের বেলা যথাসম্ভব শরীর ভালোভাবে ঢেকে রাখতে হবে, মশার কামড় থেকে বাঁচার জন্য ঘুমানোর সময় দিনে ও রাতে মশারি ব্যবহার করতে হবে। সম্ভব হলে ঘরের দরজা ও জানালায় নেট লাগানো যেতে পারে। প্রয়োজনে মসকুইটো রিপ্লেন্ট স্প্রে, লোশন বা ক্রিম, কয়েল, ম্যাট ব্যবহার করা যেতে পারে। বাচ্চাদের হাফপ্যান্টের পরিবর্তে ফুলপ্যান্ট বা পায়জামা পরাতে হবে।’
বসতবাড়ির বাইরে মশার বংশ বিস্তার রোধে করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘মাঝে মাঝে বিক্ষিপ্তভাবে বৃষ্টি হওয়ার ফলে ঘরের বাইরে পানি জমতে পারে। যেমন ফুলের টব, প্লাস্টিকের পাত্র, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের ড্রাম, মাটির পাত্র, টিনের কৌটা, ডাবের পরিত্যক্ত খোসা, কন্টেইনার, মটকা, ব্যাটারির শেল, পলিথিন ও চিপসের প্যাকেট ইত্যাদি। এসব জায়গায় জমে থাকা পানি দ্রুত ফেলে দিতে হবে।’
বসতবাড়ির মশা নিধন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সবার আগে ঘরে সাজানো ফুলদানি, অব্যবহৃত কৌটা, বাড়িঘর এবং বাড়ির আশপাশে যেকোনো পাত্র বা জায়গায় জমে থাকা পানি তিন থেকে পাঁচদিন পরপর ফেলে দিলে এডিস মশার লার্ভা মারা যায়। পাত্রের গায়ে লেগে থাকা মশার ডিম অপসারণে পাত্রটি ভালোভাবে ঘষে পরিষ্কার করে নিতে হবে। ঘরের বাথরুমে কোথাও জমানো পানি পাঁচদিনের বেশি যেন না থাকে-সেটা নিশ্চিত করতে হবে। ঘরের অ্যাকুয়ারিয়াম, ফ্রিজ বা এয়ার কন্ডিশনারের নিচে এবং মুখ খোলা পানির ট্যাংকে যেন পানি জমে না থাকে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। বাড়ির ছাদে অনেকেই বাগান করে থাকেন। সেখানে টবে বা পাত্রে যেন কোনো ধরনের পানি পাঁচদিনের বেশি জমে না থাকে, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। বাড়ির আশপাশে ঝোপঝাড়, জঙ্গল, জলাশয় ইত্যাদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।’

নান্দনিক কিন্তু নির্মমতার সাক্ষী

আবুল হোসেন আসাদ
গ্লাডিয়েটরদের রক্ত, নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতা ছড়িয়ে আছে যে স্থাপত্যটির বুকের জমিনজুড়ে, অপূর্ব নির্মাণশৈলীর যে স্থাপত্যটি আজও মনুষ্যসৃষ্ট নয়নাভিরাম স্থাপত্যের এক সপ্তাশ্চর্য, তা হলো-রোমের কলোসিয়াম। রোমের শহরতলিতে অবস্থিত এটি। রোম থেকে ভ্যাটিকান পর্যন্ত যাওয়ার জন্য খোলা ছাদবিহীন ট্যুরিস্ট বাস রয়েছে অসংখ্য। এগুলোতে নির্দিষ্ট ফি’র বিনিময়ে পুরো দর্শনীয় এলাকা ভালো করে ঘুরে দেখা যায়। নির্দিষ্ট সময় পরপর বিরতি। বাস থেকে কলোসিয়ামের সামনে নামলাম। নিরাপত্তাবেষ্টনী পার হয়ে ঢুকে গেলাম কলোসিয়ামের ভেতরে। অনুভূতি-অসাধারণ। রোমের কলোসিয়ামের কথা শুনেছি, বইয়ে পড়েছি। প্রথমেই ওপরের দিকে ওঠা শুরু করলাম সিঁড়ি বেয়ে। পাথরের সিঁড়ি। একটু খাড়া। ধীরে ধীরে উঠতে থাকলাম। নতুন আবেশ। নতুন পরিবেশ। দুই চোখ মেলে দেখতে থাকি চারপাশ।
উপবৃত্তাকার ছাদবিহীন বিশাল একটি খোলা মঞ্চ এই কলোসিয়াম। ছয় একর জমির ওপর নির্মিত হয়েছে এটি। উচ্চতা প্রায় ৪৮ মিটার, দৈর্ঘ্য ১৮৮ মিটার এবং চওড়ায় ১৫৬ মিটার। প্রত্যেক তলায় ৮০টি করে তিনটি লেভেলে মোট ২৪০টি আর্চ আছে। ৮৬ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৫৪ মিটার প্রস্থের মেঝে আচ্ছাদিত কাঠ ও বালি দিয়ে। গ্লাডিয়েটরদের পশ্চাদপসরণে বাধার সৃষ্টি করত কলোসিয়ামের উপবৃত্তাকার উঁচু দেয়াল। প্রায় এক লাখ কিউবিক মিটারের বেশি ট্র্যাভারটাইন পাথর ব্যবহার করা হয়েছিল এই অ্যাম্ফিথিয়েটার নির্মাণে। ৫০ হাজার লোক একসঙ্গে বসে এখানে গ্লাডিয়েটরদের যুদ্ধ দেখতে পারত। আসন-ব্যবস্থাটি কয়েকটি ভাগে বিভক্ত ছিল। প্রথম লেভেলে তৎকালীন সিনেটররা বসতেন। সম্রাটের নিজস্ব সুসজ্জিত আনন বা মর্বেলের তৈরি বক্সটিও এই লেভেলে অবস্থিত ছিল। দ্বিতীয় লেভেলটি রোমান অভিজাত, যারা সিনেটের সদস্য ছিলেন না, তাদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। তৃতীয় লেভেলটিতে সাধারণ মানুষদের বসার ব্যবস্থা ছিল। তৃতীয় লেভেলটি আবার তিন ভাগে বিভক্ত ছিল। নিচের দিককার অংশটিতে ধনী ব্যক্তিরা বসতেন, মাঝের অংশটি মধ্যবিত্তরা বসতেন এবং উপরের অংশে কাঠ দিয়ে নির্মিত একটি কাঠামো ছিল, যেখানে দরিদ্রশ্রেণির মানুষ দাঁড়িয়ে খেলা উপভোগ করতেন। রোমান সাম্রাজ্যের সব নাগরিকের এই জায়গায় বিনামূল্যে প্রবেশাধিকার ছিল।
ভূগর্ভস্থ হাইপোজিয়াম তৈরি করা হয় নির্মাণের পরের দুই বছরে। এতে দুইতলা বিশিষ্ট ভূগর্ভস্থ খাঁচা এবং সুড়ঙ্গের মিলন ঘটানো হয় যেখানে মরণখেলা শুরুর আগে ধরে আনা বন্যপশু এবং অসহায় গ্লাডিয়েটদের রাখা হতো। খাঁচাগুলোতে চলাচলের জন্য অসংখ্য গোপন সুড়ঙ্গ-পথ ছিল। এসব সুড়ঙ্গ ছিল বিশাল আকারের। হাতির মতো বিশালাকার বন্যপ্রাণীও এ সুড়ঙ্গ-পথে চলাচল করতে পারত। কলোসিয়ামের আরেকটি দিক হচ্ছে, দর্শকদের ঠান্ডা বাতাস সরবরাহ করার জন্য এর ‘ভেলারিয়াম’ নামের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থা, যা ছিল দড়ির তৈরি ক্যানভাসের একটি আচ্ছাদন। এ আচ্ছাদনের মাঝখানে একটি ছিদ্র ছিল। আচ্ছাদনটি পুরো কলোসিয়ামের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আবৃত করত এবং বাতাস ধরে রাখার জন্য এর মধ্যখানে ঢালু রাখা হতো। বাতাস সরবরাহ সচল রাখার জন্য বিশেষ প্লাটফর্মে দাঁড়ানো পাঙ্খা-পুলাররা এই দড়ি নিয়ন্ত্রণ করত। কলোসিয়ামে অসংখ্য ভোমিটারিয়া বা প্যাসেজ ছিল, যা সারি সারি আসনের পাশ দিয়ে অবস্থিত ছিল। গ্রাউন্ড লেভেলে ৮০টি প্রবেশদ্বার ছিল। এর মধ্যে ৭৬টি ছিল সাধারণ দর্শকদের ব্যবহারের জন্য। তারা ভোমিটোরিয়াম দিয়ে নিজ আসনে পৌঁছাত। কলোসিয়াম বহু প্রাচীনকালে নির্মিত হলেও এর নির্মাণশৈলীতে রয়েছে অনন্য নিপুণতা। বর্তমান সময়ের প্রকৌশলীরা অনেক স্টেডিয়াম নির্মাণেও কলোসিয়ামের কাঠামো থেকে ধারণা নিয়ে থাকেন।
কলোসিয়াম পাথরের তৈরি। এটি মূলত শুরুতে তৈরি হয়েছিল একটি নাট্যশালা হিসেবে। ৭২ খ্রিস্টাব্দে এটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। ফেরিয়াস বংশের সম্রাট ভেসপাসিয়ান এটি নির্মাণ করেন। ভেসপাসিয়ানের মৃত্যুর পর নির্মাণকাজ শেষ করেন তার পুত্র টাইটাস। ধারণা করা হয়, ৭০ খ্রিস্টাব্দের দিকে ইহুদি বিদ্রোহের পর যুদ্ধবন্দি ইহুদি দাসদের দিয়ে এই কলোসিয়ামটি নির্মিত হয়েছে। ১০ বছর ধরে ৬০ হাজার ইহুদি দাসকে কাজে লাগিয়ে ৮০ খ্রিস্টাব্দে কলোসিয়ামের নির্মাণকাজ শেষ করেন টাইটাস। তিনি এটিকে অফিসিয়ালি ‘ফ্ল্যাভিয়ান অ্যাম্পিথিয়েটারিয়াম (গ্যালারি)’ নাম দিয়ে জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। একদম শুরুতে এটি খেলাধুলার জন্য ব্যবহৃত হতো এবং নাট্যশালার জন্য ব্যবহৃত হতো। কলোসিয়ামে নিয়মিত হতো পশুর লড়াই আর এগুলোর করুণ মৃত্যু দেখতে দেখতে একঘেয়েমি বোধ করেন সম্রাট টাইটাস। তাই পরিশেষে পশুর পরিবর্তে মানুষে-মানুষে লড়াইয়ের হিংস্র আর অমানবিক চিন্তা মাথায় আসে তার। এরপর থেকে শুরু হয় মানুষে-মানুষে, মানুষ-হিংস্র পশুতে জীবন-মরণের লড়াই আর মৃত্যুর করুণ ও বীভৎস কাহিনি। মল্লযুদ্ধ দিয়েই শুরু হয় গ্লাডিয়েটরদের খেলা এবং এই মল্লযুদ্ধের জন্য একজন আরেকজনকে কাঠের তরবারি দিয়ে আঘাত করতে থাকে। ‘গ্লাডিয়াস’ অর্থ খাটো তরবারি। এ তরবারি দিয়ে লড়াইকারীদের বলা হতো-গ্লাডিয়েটর। প্রথমদিকে যুদ্ধবন্দিদের দিয়েই লড়াই শুরু। এ লড়াই দুজনের মধ্যে চলত ততক্ষণ, যতক্ষণ-না একজনের মৃত্যু হতো। পরে প্রচলন হয় গ্লাডিয়েটরদের লড়াই। লড়াই চলাকালে কোনো এক গ্লাডিয়েটর আহত হয়ে পড়ে গেলে উল্লাসে ফেটে পড়ত পুরো কলোসিয়াম। মৃত্যুভয়ে ভীত, ক্ষত-বিক্ষত গ্লাডিয়েটর রেওয়াজ অনুযায়ী হাত তুলে সম্রাটের কাছে করুণা প্রার্থনা করত, প্রাণভিক্ষা চাইত। মঞ্জুর করা না-করা সম্পূর্ণ সম্রাটের মেজাজের ওপর নির্ভর করত। সম্রাট ক্ষমা করলে সে যাত্রায় বেঁচে যেত পরাজিত গ্লাডিয়েটর, আর না করলে নিশ্চিত মৃত্যু। অনেক সময় রোমান মহিলারা নামকরা গ্লাডিয়েটরদের প্রেমে পড়ে গৃহত্যাগও করতেন।
রোম থেকে রোমানরা চলে গেছে অনেক বছর আগে। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রয়ে গেছে আজও এই কলোসিয়াম। রোমান সাম্রাজ্যের সূতিকাগার ছিল এই রোম। নিরোর বাঁশি, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির স্মৃতিবিজড়িত ইতালি আর এই রোম। ইতালির এই রোম নগরীর কেন্দ্রবিন্দুতে নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতা, রক্ত, আর্তনাদ ও জীবন সংশয়ের অভিশাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কলোসিয়াম। কলোসিয়ামের মূল স্থাপত্যের দুই-তৃতীয়াংশই ধ্বংস হয়ে গেছে। এই কলোসিয়ামের মাটিতে মিশে আছে সেই সময়ের গ্লাডিয়েটরদের রক্ত। অজস্র বন্যপ্রাণীর করুণ মৃত্যু ও রক্ত। কলোসিয়ামের দেয়ালে কান পাতলে আজও বুঝি শোনা যায় সেই ভয়াবহতা ও নিষ্ঠুরতার শব্দ! তারপরও কলোসিয়াম আজও পৃথিবীর অন্যতম জনপ্রিয় একটি ট্যুরিস্ট-স্পট। ১৯৯০ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী অঞ্চলের স্বীকৃতি দেয় কলোসিয়ামকে। এটি পৃথিবীতে মনুষ্যসৃষ্ট আধুনিক সপ্তাশ্চর্যগুলোর একটি বলে নির্বাচিত হয় ২০০৭ সালে। কলোসিয়াম প্রাচীন স্থাপত্যশিল্পের এক অসাধারণ নিদর্শন, যা একই সঙ্গে রোমানদের হিংস্রতা আর নির্মাণশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন হয়ে টিকে আছে শত শত বছর ধরে।

লেখক : সাইক্লিস্ট ও সাইকেলে বিশ্বভ্রমণকারী