Home মূল কাগজ প্রচ্ছদ

মিলটন মোললা
এক বর্গকিলোমিটার জায়গার ভেতর সবচেয়ে বেশি মসজিদ থাকার বিচারে বিশ্বের শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে আজকের বাংলাদেশ। কিন্তু কীভাবে তার শুরু? কোথা থেকে এলো এই দেশ? হাজার বছরের ইতিহাস খুঁড়ে বাংলা নামের আদিরূপ খুঁজতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, ‘ভঙ্গ’ নামে প্রাচীন এক জনগোষ্ঠীর নাম থেকে এর উদ্ভব, যাদের বাস ছিল বর্তমান বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে। ব্লকমান নামে এক ঐতিহাসিক বলছেন, বঙ্গ নামে এক রাজা ছিলেন, যিনি প্রাচীন রাজ্য ভঙ্গ-এর প্রতিষ্ঠাতা। ভারতের প্রাচীনতম পুরাণগ্রন্থ মহাভারতেও উল্লেখ রয়েছে এই রাজার কথা।
ইতিহাসে বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠার উল্লেখ প্রথম পাওয়া যায় খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৬ সালে আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের প্রেক্ষিতে। পরবর্তী গ্রিক ও লাতিন ইতিহাসকাররাও তার এ অভিযানের প্রেক্ষিতে বলেছেন, গঙ্গারিডি নামে এক শক্তিশালী রাজ্যের ভয়াবহ প্রতিরোধের মুখোমুখি হওয়ার ভয়েই শেষ পর্যন্ত ভারত অভিযান অসমাপ্ত রেখে ফিরে যান আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট। গঙ্গা উপত্যকায় বাংলাতেই ছিল সেই দুর্ধর্ষ গঙ্গারিডি জাতির বসবাস। এই অঞ্চল খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ এবং দ্বিতীয় শতকে এবং পরবর্তীতে চতুর্থ ও পঞ্চম শতকে এটি মৌর্য এবং গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীনে চলে যায়। সপ্তম শতকে এখান থেকেই সাম্রাজ্য গড়েন রাজা শশাঙ্ক এবং সপ্তম থেকে একাদশ শতক অবধি এ জনপদ শাসন করেন পাল রাজারা।
বাংলায় নগরসভ্যতার প্রাচীনতম স্থাপনা খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে প্রতিষ্ঠিত মহাস্থানগড়। বর্তমান বগুড়া জেলার কাছাকাছি এর অবস্থান। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে ১২ শতকের মধ্যে বাংলায় নির্মিত এবং এখনো টিকে থাকা প্রাচীন স্থাপনার অবশিষ্টাংশের মধ্যে আছে অসংখ্য ধর্মীয় ভবন এবং বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। রাজশাহী জেলায় পাহাড়পুরে ৭৭০-৮১০ খ্রিস্টাব্দে এবং ৮ থেকে ১২ শতকের মধ্যে কুমিল্লার ময়নামতিতে নির্মিত হয় উপমহাদেশের বৃহত্তম বৌদ্ধ বিহার। বাংলায় ১০৮০ খ্রিস্টাব্দে হিন্দু সেন রাজাদের হাতে চলে যায় পাল রাজার ক্ষমতা। ১২০৪ সালে নবাগত মুসলিমদের হাতে চলে যাওয়ার পূর্ব অবধি বজায় থাকে এ পরিস্থিতি।

ভারত তথা বাংলায় মুসলিম আগমন
আরব ভূমিতে জন্ম নেয়ার পর তুরস্ক, পারস্য এবং আফগানিস্তান হয়ে ভারতবর্ষে পদার্পণ করে ইসলাম। ১২ শতকের দিকে উত্তর ভারতে প্রতিষ্ঠা ঘটে যায় তার। ১৬ শতকে মুঘল শাসন শুরু হওয়ার পূর্ব-অবধি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন স্থাপত্যের নির্মাণ ঘটে এসব শাসকের আনুকূল্যে। উত্তর ভারত, গুজরাট, দাক্ষিণাত্য এবং বাংলায় (বর্তমান বাংলাদেশে) এর প্রসার ঘটে সর্বাধিক। মুঘল আমলের নির্মাণশৈলীগুলো মূলত প্রথম যুগের এ নির্মাণশৈলীরই অনুকরণ বা তা দিয়ে অনুপ্রাণিত।
১২০৪ সালে মুহাম্মাদ বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয় এ সময়কার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা। এর ফলে সুদূর আরব-পারস্য থেকে শুরু হয়ে এশিয়ার পূর্বদিকে ইসলামী আধিপত্যের শেষ প্রান্তসীমা হয়ে দাঁড়ায় বাংলা। ফলে ওইসব এলাকা থেকে ভাগ্যান্বেষণ, জীবিকা এবং ধর্ম প্রচারের লক্ষ্যে বহু মানুষের আগমনও শুরু হয় এ অঞ্চলে। এসব মানুষের মেধা-কৃষ্টি ও সংস্কৃতির মধ্যে ছিল নিজের দেশ থেকে বয়ে আনা স্থাপত্য আর কারিগরি জ্ঞান। নতুন দেশে আসার পর তার সঙ্গে মিশেল ঘটে যায় স্থানীয় কাঁচামাল এবং নির্মাণশৈলীর। এভাবেই একদিন হিন্দু এবং বৌদ্ধ প্রভাবপুষ্ট এ জনপদে প্রথমবার নিজেদের মতো করে নতুন নির্মাণের ভিত্তি স্থাপন করেন তারা। বিশ্বের যেখানেই গেছে মুসলিমরা, ধর্মের মূল নির্দেশনা প্রতিপালন, প্রতিদিন পাঁচবার নামাজ আদায়ের উদ্দেশে সেখানেই তারা নির্মাণ করেছে মসজিদ। বিহার এবং স্তুপা অধ্যুষিত নতুন দেশে স্থাপত্যশৈলীর বিচারে নতুন ধরনের এসব মসজিদ হয়ে ওঠে ভিন্ন স্থাপত্যের এক অনন্য নজির। পার্সি ব্রাউনের ভাষায়, রহস্যময়তার আধাররূপী মন্দিরের সঙ্গে তুলনামূলক বিচারে স্থানীয়দের সামনে মসজিদের স্থাপত্য-স্বভাবতই ঋজু ও সরলরূপে প্রতিভাত হয়।
মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রে কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্যণীয়। প্রতি শুক্রবার ধর্মানুগ মানুষের বৃহৎ সমাবেশকে ধারণ করার কথা মাথায় রেখেই শুরু হয় এর নির্মাণ-প্রক্রিয়া। মক্কায় কাবাঘরের দিকে মুখ থাকে প্রার্থনাকারীদের। মক্কার দিকে নির্দেশিত দেয়ালটি কিবলা দেয়াল এবং এর নাম ‘মিহরাব’ যা বস্তুত একটি অলঙ্কৃত কুলুঙ্গি। মসজিদে আরও থাকে ইমামের আসন বা মিম্বার, একটি মাকসুরা বা চারদিক ঘেরা একটি উঁচু স্থান, এক বা একাধিক মিনার, যেখান থেকে বিশ্বাসীদের প্রার্থনায় মিলিত হওয়ার আহবান জানান মুয়াজ্জিন। মসজিদে আরও থাকে একটি শান বা প্রাঙ্গণ, যেখানে রক্ষিত হয় কূপ কিংবা জলাধার, যার পানি দিয়ে নামাজে দাঁড়ানোর আগে অজু করেন নামাজি।
মুসলিমরা যখন বাংলায় আসে, তারা সঙ্গে নিয়ে আসে তাদের নতুন স্থাপত্য। মসজিদ ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে তারা নতুন বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, সামগ্রী, প্রযুক্তি ও আবহাওয়ার মিশেল ঘটিয়ে দেন। মধ্যযুগে মুসলিম আগমনের সেই প্রথম যুগ থেকেই মসজিদ নির্মাণে এক অনন্য বৈশিষ্ট্য গড়ে ওঠে বাংলায়। শাসকশ্রেণির চিন্তাভাবনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের আকাঙ্খারও প্রতিফলন ঘটতে দেখা যায় এসব নির্মাণে।
মুসলিমপ্রধান বাংলায় মসজিদ ইসলামী প্রেরণা ও সকল ধরনের কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু। ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে ইসলামী ঝান্ডাতলে শামিল হয়ে যায় বাংলা। সেই সময় থেকেই মসজিদ নির্মাণের ধারা চলে এসেছে এ জনপদে। গবেষকরা মোটা দাগে সময়টিকে তিনভাগে ভাগ করেছেন-প্রাথমিক ইসলামী কাল, মুঘল আমল এবং ঔপনিবেশিক যুগ। আজ আমরা বাংলায় ঐতিহ্যমন্ডিত কয়েকটি মসজিদের কথা তুলে ধরছি।

ছোট সোনা মসজিদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ
মুসলিম শাসনামলে বাংলায় অনেক নতুন শহর, দুর্গ, বিখ্যাতজনের স্মৃতিবিজড়িত তোরণ, বিজয়স্তম্ভ, মসজিদ, সমাধিসৌধ, সড়ক ও সেতু নির্মিত হয়। তবে এ শাসকরা সবচেয়ে বেশি যা নির্মাণ করেন, তা হচ্ছে মসজিদ আর বিশুদ্ধ পানির জন্য বিশাল পুকুর, দীঘি কিংবা জলাধার। বাংলায় ইসলামের প্রথম যুগে সুলতার হুসেন শাহের আমলে রাজধানী গৌড়ের একটি বিখ্যাত মসজিদ ছোটো সোনা মসজিদ। ১৪৯৩ থেকে ১৫১৯ সালের ভেতর এটি নির্মাণ করেন ওয়ালি মুহাম্মাদ নামে এক ব্যক্তি। আদিতে মাঝখানের সারিতে তিনটি চৌচালাসহ পনেরটি সোনায় মোড়ানো গম্বুজ ছিল এর ছাদে। প্রথমেই নজর কেড়ে নেয় মসজিদটির অসাধারণ অলঙ্করণ আর প্রতিটি দেয়ালের ভেতর এবং বাহির উভয় দিকেই খোদাইকাজ। অলঙ্কৃত পাথরের কারুকাজ দেখলে মনে হবে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পোড়ামাটির কাজ। স্থাপনার মেঝেতে প্রথম দিকে ছিল পুষ্পনকশাখচিত চকচকে সুন্দর টালি। সরু খিলানঅলা একটি পাথরের তোরণ রয়েছে মসজিদের পূর্বদিকে।

বাঘা মসজিদ, রাজশাহী
হুসেন শাহের আমলে আরেকটি চমৎকার স্থাপনা ১৫২৩ সালে সুলতান নুসরাত শাহ নির্মিত বাঘা মসজিদ। উল্টো কাপের আকৃতিতে ছোট দশটি গম্বুজ রয়েছে এর ছাদে। প্রতিটি দেয়ালে বিশেষত মিহরাবের অলঙ্করণেও রয়েছে পোড়ামাটির অপূর্ব কারুকাজ, যাতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বিভিন্ন নকশা, আঙুর আর গোলাপের আবহ।

কুসুম্বা মসজিদ, নওগাঁ
মুসলিম সালতানাতের শেষ দিককার স্থাপত্য-নিদর্শন কুসুম্বা মসজিদ। সুলতান গিয়াসউদ্দিন প্রথম বাহাদুর শাহের আমলে জনৈক সোলায়মান এটি নির্মাণ করেন। আয়তাকার এ মসজিদের ছাদে রয়েছে অর্ধগোলাকৃতি ছয়টি গম্বুজ। ইসলামী শাসনের প্রাথমিক যুগে নির্মিত মসজিদগুলোর মধ্যে মাত্র ছয়টি পাথরনির্মিত মসজিদ টিকে আছে বর্তমানে, কুসুম্বা মসজিদ তাদের অন্যতম। এতে ব্যবহৃত কালো ব্যাসাল্ট পাথরগুলো নদীপথে আমদানি করা হয় রাজমহল এবং বিহারের পাহাড় থেকে। মসজিদের উত্তর-পূর্ব কোনে মজবুত পাথর নির্মিত পিলারের ওপর গড়ে তেলা হয়েছে একটি অলঙ্কৃত গ্যালারি। প্রার্থনাকক্ষের মেঝে থেকে একটি সিঁড়ি উঠে গেছে এই গ্যালারিতে। ধারণা করা হয়, এ গ্যালারিটি ছিল মূলত রাজ্যের সুলতান কিংবা শাসক কিংবা এর নির্মাতাদের জন্য বিশেষভাবে সংরক্ষিত।

ষাট গম্বুজ মসজিদ, বাগেরহাট
বাগেরহাটের খান জাহান ঘরানায় নির্মিত এ মসজিদ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সবচেয়ে মনোগ্রাহী এবং বৃহত্তম ইষ্টক-নির্মিত মসজিদ। এর ছাদের মাঝখানের সারিতে সাতটি চৌচালাসহ রয়েছে ৭৭টি ছোট গম্বুজ। ১৪৪২ সালে শুরু হয়ে মসজিদের নির্মাণ-কাজ শেষ হয় ১৪৫৯ সালে। ইউনেস্কো এটিকে ঘোষণা করেছে ‘বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ এবং ভারতবর্ষের সবচেয়ে নজরকাড়া মুসলিম স্থাপত্য’ হিসেবে। মসজিদের প্রার্থনা-কক্ষের আয়তন ১৬০ ফুট বাই ১৯০ ফুট এবং এর ধারণক্ষমতা একসঙ্গে ২,০০০ লোক। আলো-হাওয়া গমনাগমনের জন্য এর পূর্বদিকে ১১টি এবং উত্তর ও দক্ষিণে সাতটি করে খিলানঅলা দরজা রয়েছে।

শুরা মসজিদ, দিনাজপুর
ইট-পাথরে নির্মিত শুরা মসজিদ মুসলিম সালতানাতের আরেকটি চমৎকার স্থাপত্য-নমুনা। এতে মূল প্রার্থনাকক্ষটি বর্গাকৃতির, যার সামনে পূর্বদিকে আছে একটি করিডোর এবং ছয়টি অষ্টভ‚জাকৃতির টারেট বা খুদে মঞ্চ। তৎকালীন স্থাপত্যের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল এটি। ঢালু হয়ে নেমে গেছে এর কার্নিশ এবং তিনটি মিহরাবসমৃদ্ধ পশ্চিম দেয়ালে আকীর্ণ রয়েছে বিস্তর পোড়ামাটির অলঙ্করণে। এর মূল প্রার্থনাকক্ষের ওপর রয়েছে একটিমাত্র লম্বা পেটমোটা গম্বুজ। এ ছাড়া করিডোর ঘিরে আছে তিনটি ছোট গম্বুজ। গৌড়ের ছোট সোনা মসজিদের মতো এর দেয়ালেও অলঙ্কৃত হয়েছে পাথরের খোদাই কারুকাজ।

গৌড়ের দারাশবাড়ি মসজিদ
ইলিয়াস শাহী আমলের প্রবীণ স্থাপত্যের এক উৎকৃষ্ট নমুনা দারাশবাড়ি মসজিদ। সুলতান ইউসুফ শাহের আমলে ১৪৭০ সালে এর নির্মাণ। বারান্দায় সাতটি খিলানঅলা ফটক দিয়ে ঢুকতে হয় মূল প্রার্থনাকক্ষে। ধারণা করা যায়, এর ছাদের ওপর একগুচ্ছ চৌচালাসহ ছিল সারিবদ্ধ গম্বুজ। বাইরে থেকে সিঁড়ি উঠে গেছে উত্তর-পূর্ব কোনে একটি গ্যালারিতে। ভেতরে পশ্চিম দিকে দেয়ালে উৎকীর্ণ রয়েছে নয়টি মিহরাব। এর গায়ে শিল্পিত হয়েছে পুষ্প ও জ্যামিতি আকারে নজরকাড়া পোড়ামাটির অলঙ্করণ।

গৌড়ের রাজবিবি মসজিদ
একটি মাত্র গম্বুজঅলা বর্গাকৃতির এ মসজিদের গায়ে একটি বারান্দা, যার ছাদে তিনটি ক্ষুদ্রাকৃতির গম্বুজ। এর দেয়ালে উৎকীর্ণ পোড়ামাটির অলঙ্করণ, যাতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ফুলের নকশা। কালো ব্যাসাল্ট নির্মিত পিলারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে গম্বুজ। প্রার্থনাকক্ষের পশ্চিম দেয়ালের শোভা বর্ধন করেছে অলঙ্কৃত কালো পাথরের মিহরাব। স্থাপত্যশৈলী থেকে এটি ১৫ শতকের নির্মাণ বলে মনে করা হয়। স্থাপনার গায়ে কোরানের একটি আয়াত আরবিতে উৎকীর্ণ রয়েছে এখনো। রাজবিবির পরিচিতি সুস্পষ্ট নয়, তবে তিনি রাজকীয় হেরেমের কোনো প্রভাবশালী নারী হয়ে থাকবেন বলেই ধারণা করা হয়।

গৌড়ের ধুনিচক মসজিদ
আয়তাকার এ প্রার্থনাভবনের নির্মাণশৈলীতে ইলিয়াস শাহ আমলের ঘরানা সুস্পষ্ট। এতেও রয়েছে একটিমাত্র গম্বুজ। তিনটি অলঙ্কৃত মিহরাব রয়েছে পশ্চিমের দেয়ালে। প্রতিটি মিহরাবের গায়ে লতানো অলঙ্করণ।

গোয়ালদি মসজিদ, সোনারগাঁও
সুলতান আমলের আরেকটি এক-গম্বুজঅলা মসজিদের নিদর্শন গোয়ালদি মসজিদ। পানাম নগরের আধামাইল উত্তর-পূর্বে এর অবস্থান। সুলতান হুসাইন শাহের আমলে ১৪১৯ সালে হিজাবার আকবর খান এটি নির্মাণ করেন। তিনটি অসাধারণ বক্র মিহরাবসমৃদ্ধ ১৬ বর্গফুট আয়তনের একটি চমৎকার নির্মাণ এ মসজিদ। তিন মিহারবের মাঝখানেরটির গায়ে খোদাই কাজে দেখা যায় ফুলের নকশা। অন্যগুলো নকশা করা হয়েছে পোড়ামাটির অলঙ্করণে। ভেতরে গম্বুজের ভার বহন করে দাঁড়িয়ে আছে পাথরের স্তম্ভ।

চুনাখোলা মসজিদ, বাগেরহাট
শস্যবহুল সমতল জমির প্রেক্ষাপটে ছবির মতো মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে দাঁড়িয়ে আছে চুনাখোলা মসজিদ। সিঙ্গাইর মসজিদের অনুরূপ স্থাপত্যে নির্মিত এবং একইরকম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তীব্র আবহাওয়ার দাপটে।

আবদুল্লাহ আল মামুন
লুসাই পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে কর্ণফুলী নদী বঙ্গোপসাগরের যেখানে মিশেছে, সেই মোহনায় নির্মাণ হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল, যা চট্টগ্রামবাসীর স্বপ্নের ‘কর্ণফুলী টানেল’ হিসেবে পরিচিত। দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে কাজ। ২০২২ সালের পর উন্মুক্ত হবে টানেলের এই স্বর্ণালি দ্বার। ফলে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীর আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলা টানেলের মাধ্যমে মূল নগরের সঙ্গে যুক্ত হবে। চীনের সাংহাইয়ের আদলে গড়ে উঠবে দুই শহরের সমন্বয়ে একটি নগর। ভবিষ্যতে এশিয়ান হাইওয়ে নেটওয়ার্কেও যুক্ত হবে এই টানেল। ঢাকার সঙ্গে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সরাসরি সংযোগ স্থাপন হবে।
এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলের প্রকল্প পরিচালক হারুনুর রশিদ চৌধুরী বলেন, ‘ইতিমধ্যে প্রকল্পের ৩৬ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। নদীর তলদেশে টানেল বোরিং মেশিনের মাধ্যমে ১২০ মিটার খনন করা হয়েছে। এই মেশিনের মাধ্যমে নদীর তলদেশে দুটি টিউব নির্মাণ করা হবে। প্রতিটি টিউবে দুই লেনের সড়ক নির্মাণ করা হবে। আশা করছি, ২০২২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।’
২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে কর্ণফুলী টানেলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সড়ক ও সেতু বিভাগ। প্রকল্পটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশন অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড (সিসিসিসি)। প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় হবে ৩ হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা। চীন সরকার সহায়তা করবে ৫ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা নেভাল একাডেমি থেকে শুরু হয়ে এই টানেল দক্ষিণ চট্টগ্রামের আনোয়ারায় কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি (কাফকো) এবং চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের (সিইউএফএল) মাঝামাঝি প্রান্তে যুক্ত হবে। নদীর তলদেশে টানেলের দৈর্ঘ্য হবে ৩ হাজার ৪০০ মিটার (প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার)। কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে গাড়ি যাওয়ার জন্য একটি এবং আসার জন্য আরেকটি টিউব তৈরি হবে, যা ‘টানেল’ নামে পরিচিত। প্রতিটি টিউবের প্রস্থ হবে ১০ দশমিক ৮ মিটার। দুটি টিউবে গাড়ি চলাচলের জন্য থাকবে দুটি করে লেন। টিউব দুটির ন্যূনতম দূরত্ব থাকবে ১১ মিটার। আর টানেলটি নদীর তলদেশ থেকে সর্বোচ্চ ৩৬ মিটার এবং সর্বনিম্ন ১২ মিটার মাটির গভীরে নির্মিত হবে।
নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ করা হবে টানেল বোরিং মেশিন (টিবিএম) যন্ত্রের মাধ্যমে। মেশিনটি চীন থেকে আনা হয়েছে। এটি নদীর তলদেশে খননের পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সড়কপথও নির্মাণ করবে। মেশিনটি বসানো হয়েছে পতেঙ্গা অংশে। গত ২৪ ফ্রেরুয়ারি টিবিএমের মাধ্যমে মূল টানেল খননের কাজ উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর থেকে ১২০ মিটার খনন করা হয়েছে। এভাবে খনন ও সড়ক তৈরির মাধ্যমে নদীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলে যাবে মেশিনটি। দক্ষ প্রকৌশলীরা সার্বক্ষণিক কম্পিউটারাইজ পদ্ধতিতে মেশিনটি পরিচালনা করছেন। নির্মাণকাজে অংশ নিচ্ছে ১ হাজার থেকে ১২শ’ শ্রমিক।


প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টানেল নির্মাণের মাধ্যমে চট্টগ্রাম নগরে নিরবচ্ছিন্ন ও যুগোপযোগী সড়ক-যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, বিদ্যমান সড়ক-যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন, কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে গড়ে ওঠা শহরের সঙ্গে ডাউন টাউনকে যুক্ত করা এবং উন্নয়নকাজ ত্বরান্বিত করা, চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং গভীর সমুদ্রবন্দরের নির্মাণকাজ ত্বরান্বিত করা ও ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের মধ্যে নতুন একটি সড়ক-যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
টানেল নির্মাণকে কেন্দ্র করে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে বিনিয়োগ শুরু করেছে দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো। বর্তমানে সেখানে আংশিক চালু রয়েছে কোরিয়ান ইপিজেড। পাশাপাশি বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে উঠেছে কিছু শিল্প-কারখানা। টানেল নির্মাণের সঙ্গে সমন্বয় রেখে সরকার আনোয়ারায় একটি ইকোনমিক জোন স্থাপন করছে। পাশাপাশি চীনের বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ ‘চায়না ইকোনমিক জোন’ বাস্তবায়িত হচ্ছে।
২০০৮ সালে চট্টগ্রামে লালদীঘি মাঠের এক জনসভায় কর্ণফুলী টানেল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তখন বিষয়টিকে বাংলাদেশের জন্য অসম্ভব মনে করেছিল অনেকেই। অবশেষে সেই অসম্ভবের টানেল ক্রমে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।

আবদুল্লাহ আল মামুন
মন্দা কাটিয়ে সুদিন ফিরতে শুরু করেছে আবাসন খাতে। কয়েক বছর ধরে অবিক্রীত থাকা ফ্ল্যাটের বিক্রিও বেড়েছে। গত বছর থেকে ব্যাংক ঋণে সুদের হার কমে আসায় ফ্ল্যাট কিনতে আগ্রহী হয়েছিল ক্রেতারা। কিন্তু গৃহ ঋণে ব্যাংক সুদের হার আবারও বেড়ে যাওয়ায় এখন কিছুটা স্থবির হয়ে পড়েছে ফ্ল্যাট-প্লট বিকিকিনি। তবে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগে ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে বাজার পরিস্থিতি। ফলে আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরাও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় আছেন। এ জন্য গ্রাহকদের দীর্ঘ মেয়াদে ও এক অংকের সুদে গৃহ ঋণ, ফ্ল্যাটের নিবন্ধন খরচ কমানো ও বিনা প্রশ্নে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ চান আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা। প্রতিবারের মতো এবারও নগরের তারকা হোটেল রেডিসন ব্লু বে ভিউ চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল চারদিনব্যাপী আবাসন মেলা। এবারের মেলায় বিভিন্ন প্রকল্পের সাত হাজার ফ্ল্যাট ও দেড় হাজার প্লট নিয়ে মেলায় হাজির হয়েছিল ৩৬টি আবাসন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান। এরমধ্যে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান রেডি ফ্ল্যাট হাজির করবে ক্রেতাদের সামনে। এছাড়া এবার পাঁচশ কোটি টাকার বিকিকিনিরও টার্গেট নির্ধারণ করেছে রিহ্যাব।
রিহ্যাব চট্টগ্রাম সুত্র জানায়, মেলায় এবার ৫৬টি প্রতিষ্ঠানের ৭৬টি স্টল ছিল। এরমধ্যে আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৩৬টি, ব্যাংক ও অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান ১১টি ও নির্মাণসামগ্রী প্রতিষ্ঠান থাকবে ৯টি। এছাড়া ১৭টি প্রতিষ্ঠান কো-স্পন্সর হিসেবে মেলায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে রিহ্যাব চট্টগ্রাম অঞ্চলের চেয়ারম্যান আবদুল কৈয়ূম চৌধুরী বলেন, ‘এবারের মেলাকে আমরা বিগত মেলাগুলোর চেয়ে আরও অধিক জাঁকজমকভাবে আয়োজন করেছি। মানুষের অন্যতম মৌলিক চাহিদা বাসস্থান নিশ্চিত করাই রিহ্যাবের মূল লক্ষ্য। মেলার মাধ্যমে রিহ্যাব গ্রাহকদের একই ছাদের নিচে তাদের সাধ ও সাধ্যের মধ্যে পছন্দের ফ্ল্যাট ও প্লট বেছে নেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘২০১৬ সাল থেকে আবাসন খাত আস্তে আস্তে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। ব্যাংক ঋণে সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে আনা গেলে আবাসন খাত আবারো চাঙ্গা হয়ে উঠবে। তবে ফ্ল্যাট বিক্রি আগের চেয়ে বেড়েছে। মানুষের মধ্যে এখনো আস্থার সংকট রয়েছে। আমরা আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি।’
আবাসন খাতের উদ্যোক্তারা জানান, ২০১২ সাল থেকে আবাসন ব্যবসার মন্দার শুরু হয়। ২০১৪ সালের হিসাবে, চট্টগ্রামে রিহ্যাবের সদস্যভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ১০ হাজার ফ্ল্যাটের মধ্যে অবিক্রিত পড়েছিল প্রায় পাঁচহাজার ফ্ল্যাট। সে সময় অভিজ্ঞ-অনভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদের হাতে ছিল এ বাজার। বিশেষ করে মন্দা শুরু হওয়ার পর মৌসুমি ব্যবসায়ীরা গ্রাহকদের প্লট বা ফ্ল্যাট বুঝিয়ে না দিয়ে সটকে পড়েন। মন্দার কারণে বেচাকেনা কমে যাওয়ায় বিনিয়োগ আটকে যায় প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদেরও। তখন থেকে আবাসন খাতে নতুন প্রকল্পের সংখ্যা কমে আসে। চলমান প্রকল্পগুলোয় গ্রাহকের সাড়া কম থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান নির্মাণকাজ শেষ করার সময় পিছিয়ে দেন উদ্যোক্তারা। এসবের ফলে গ্রাহকদের আস্থায় ভাটা পড়ে। সারা দেশের মতো চট্টগ্রামেও ছিল এ অবস্থা। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে ব্যবসায়ীরা গত কয়েক বছরে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণে ঝুঁকে পড়েন। তবে মন্দার ধাক্কায় যেসব প্রতিষ্ঠান বাজারে টিকে ছিল, তারাই এখন গ্রাহকদের আস্থা ধরে রেখেছে। কয়েক বছরের মন্দার পর ২০১৫ সালের জুন মাস থেকে স্থবিরতা কাটতে শুরু করেছে আবাসন খাতে। গত তিন বছরে কয়েক হাজার অবিক্রিত ফ্ল্যাট বিক্রি হয়েছে। ফ্ল্যাটের দামও যৌক্তিক পর্যায়ে নেমে এসেছে। নতুন বিনিয়োগের জন্য এখন জমি খুঁজছেন আবাসন ব্যবসায়ীরা। অবিক্রিত ফ্ল্যাটের বিক্রি বাড়ায় খুশি তারা। তবে ফ্ল্যাট বিক্রির চেয়ে ক্রেতাদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন ও আস্থা অর্জনে জোর দিচ্ছে মেলায় অংশ নেওয়া অধিকাংশ আবাসন প্রতিষ্ঠান।
অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৭ শতাংশ সুদের হার এখন ৯ শতাংশ থেকে সাড়ে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত নেমে এসেছে। মেলায় বিভিন্ন হারে গৃহ ঋণের অফার নিয়ে ১১টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিবে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে মেলায় স্পট ঋণ অনুমোদন দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। চাকরিজীবীদের আয়, ব্যবসায়ীদের ব্যাংক টার্নওভার, ভূমি মালিকদের জায়গার উপর নির্ভর করে বিভিন্ন মেয়াদে ঋণ দিবে বিভিন্ন ব্যাংক ও অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান।

0 283



সোহরাব শান্ত
চারশ’ বছর বয়সী রাজধানী ঢাকা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমৃদ্ধ হয়েছে। আধুনিক অট্টালিকা, প্রশস্ত সড়ক-উড়ালসড়ক, লেক-ঝিল সমৃদ্ধ ঢাকা এখন অনেকটাই জৌলুসপূর্ণ। বিপরীতে পরিবেশ দূষণ ও যানজটে নাকাল এই মহানগরীর পৌনে ২ কোটি নাগরিক। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারের নানা উদ্যোগ সফলতার মুখ দেখেনি। তবে ২০১৯ সালের শুরুর দিকে দায়িত্ব নেওয়া নতুন সরকার সমস্যা সমাধানে কার্যকরী উদ্যোগ নেবে এমন প্রত্যাশা ঢাকার নাগরিকসহ পরিবেশবিদ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের। নতুন বছরে ঢাকার ‘সুস্থতা’ নিশ্চিতকরণে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর পরামর্শ ও কর্মপরিকল্পনাও রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকার প্রধান সমস্যাগুলোর অন্যতম কয়েকটি হলো যানজট, বায়ু ও শব্দদূষণ। এছাড়াও রয়েছে নিরাপদ পানির সরবরাহের অনিশ্চয়তা। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ও আইনের সঠিক প্রয়োগ দরকার।
ঢাকায় পরিবেশ দূষণ ও যানজট নিয়ে যারপরনাই বিরক্ত নাগরিকরা। সাংবাদিক রনি রেজা বলছিলেন, বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ঢাকা। বায়ুদূষণ, ধুলো-বালি-ধোঁয়া, পানি-দূষণ, সুপেয় পানির অপ্রতুলতা, ওয়াসার পানির সরবরাহ-ব্যবস্থা, বোতলজাত পানির নিরাপত্তা, বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা, অপরিচ্ছন্নতা, ডাস্টবিন ব্যবহার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জ্যাম, সড়ক ব্যবস্থাপনা, পার্ক-বিনোদন-খেলাধুলার জায়গা অপ্রতুলতাসহ যতগুলো প্রতিবন্ধকতা রয়েছে; সবগুলোই মনুষ্যসৃষ্ট। নাগরিকের সচেতনতায় এসব রোধ করা সম্ভব। একইরকম মত দিয়েছেন রামপুরার বাসিন্দা গৃহবধূ ফাহিমা আক্তার নূপুর ও শান্তিনগরের বাসিন্দা সরকারি কর্মকর্তা সৈয়দ শাফায়েত মোর্শেদ শুভ।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা ফ্রিল্যান্সিং বিশেষজ্ঞ মো. ইকরাম বলেন, ঢাকার রাস্তাঘাট যেমন অপরিষ্কার, একই সঙ্গে ঢাকার বাতাসও বিষাক্ত। রয়েছে প্রচুর শব্দ দূষণের যন্ত্রণা। কোরবানির বর্জ্য গত কয়েক বছর ধরে সন্ধ্যার আগেই সম্পূর্ণ পরিষ্কার করে প্রশাসন বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা আরেকটু মনোযোগ দিলে ঢাকা শহরকে সবসময়ই পরিচ্ছন্ন রাখতে পারে।
তিনি বলেন, সবুজ ঢাকা গড়ায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের পরিকল্পনা গুরুত্বের সঙ্গে বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
সাংবাদিক গউস রহমান পিয়াল বলেন, যানজট/সড়ক ব্যবস্থাপনায় দরকার দক্ষ আমলা, প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের মতো নেতা, সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
তরুণ সাংবাদিক আব্দুর রাজ্জাক সরকার ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, শহরকে পরিষ্কার রাখতে রাস্তার মোড়ে মোড়ে লাগানো ডাস্টবিন যে শহরের নাগরিকরা নিজেই চুরি করে, সে শহর সমস্যামুক্ত হবে কীভাবে?
ব্যাংক কর্মকর্তা আতিকুর রহমান মানিকের মতে, যানজট সমস্যা দূরীকরণে ট্রাফিকিং ব্যবস্থা আরো জোরদার করতে হবে।
‘গ্রিন সেভার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা পরিবেশকর্মী আহসান রনি বলেন, ঢাকা মহানগরীর অন্যতম সমস্যা ধুলাদূষণ। শুধু মানুষ নয়, গাছগুলোও ভালোভাবে শ্বাস নিতে পারছে না। গাছের পাতাগুলো ধুলার পরতে ঢাকা পড়ে আছে। ফলে একদিকে গাছের পাতাগুলো পর্যাপ্ত কার্বন শুষে নিতে পারছে না, আবার পর্যাপ্ত অক্সিজেনও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, কয়েক বছর ধরেই ঢাকার বাতাসে ক্ষুদ্র বস্তুকণার উপস্থিতি সহনীয় মাত্রার ওপরে রয়েছে। ক্ষতিকর বস্তুকণার এ উপস্থিতি না কমে উল্টো বাড়ছে। ঢাকার বাতাসে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ক্ষুদ্র বস্তুকণা পিএম ২.৫ ও পিএম ১০-এর মাত্রা গত বছরের চেয়ে বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে সালফার ডাই-অক্সাইড ও কার্বন মনোক্সাইডের উপস্থিতিও।
বায়ুর মান পরীক্ষায় নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (সিএএসই/কেস) প্রকল্পের আওতায় ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, রাজশাহী ও বরিশালের আটটি শহরে ১১টি কন্টিনিউয়াস এয়ার মনিটরিং স্টেশন (সিএএমএস) স্থাপন করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর।
বাতাসে যেসব ক্ষতিকর উপাদান আছে, তার মধ্যে মানবদেহের জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর পার্টিকুলেট ম্যাটার (পিএম) ২.৫। ২.৫ মাইক্রোমিটার বা তার চেয়ে কম ব্যাসের অতিক্ষুদ্র এসব বস্তুকণার সহনীয় মাত্রা প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ৬৫ মাইক্রোগ্রাম। যদিও ঢাকার বাতাসে পাওয়া গেছে এর চেয়ে বেশি মাত্রায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বায়ুদূষণের জন্য মূলত দায়ী ইটভাটা ও নির্মাণকাজ। ঢাকা মহানগরীর আশপাশে অনেক এলাকায় ইটভাটা রয়েছে। নির্মাণকাজের সময় নিয়ম না মেনে মাটি, বালুসহ অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী দীর্ঘদিন যত্রতত্র ফেলে রাখা, রাস্তার দু’পাশে ময়লা-আবর্জনা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা, সর্বোপরি যানবাহনের কালো ধোঁয়া বাতাসকে দূষিত করে তোলে। ফলে বাড়ছে সালফার ডাই-অক্সাইড ও কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা।
নীরব ঘাতক শব্দদূষণে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রাজধানীবাসী। এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ঢাকায় শব্দদূষণের মাত্রা তিন থেকে চার গুণেরও বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর ৯০ শতাংশ মানুষ কানে কম শোনে। এর কারণ হচ্ছে, প্রতিনিয়ত উচ্চহারে শব্দ গ্রহণ করা। রাজধানীতে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার বেড়েই চলছে। বাংলাদেশের আইনে পরিষ্কার বলা আছে, হর্নের শব্দ কোনো অবস্থাতেই ৬০ (ষাট) ডেসিমেলের ওপর যেতে পারবে না। হাইড্রোলিক হর্নে ফ্রিকোয়েন্সি ১০০ ডেসিমেল ছাড়িয়ে যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডবিøউএইচও/হু) প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ৬০ ডেসিবেল মাত্রার শব্দ মানুষকে অস্থায়ী বধির এবং ১০০ ডেসিবেল মাত্রার শব্দ মানুষকে স্থায়ীভাবে বধির করে দেয়। অথচ ঢাকা শহরে শব্দের মাত্রা ধারণা করা হয় ৬০-৮০ ডেসিবেল।
চিকিৎসকরা বলছেন, বাতাসে সহনীয় মাত্রার অতিরিক্ত অতিসূ² এ বস্তুকণা স্বল্পমেয়াদে মাথাব্যথা, শ্বাসতন্ত্রের রোগসহ নানা ব্যাধির জন্য দায়ী। এর প্রভাবে দীর্ঘমেয়াদে ফুসফুস ক্যান্সার, কিডনিসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অনেক অঙ্গও ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে মনে করেন তারা। শব্দদূষণ যে কোনো মানুষের জন্য ক্ষতিকর হলেও হর্নের ফলে শিশু এবং গর্ভবতী নারীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের নাক, কান, গলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. রোকন উদ্দিন ভ‚ইয়া বলেন, বায়ুদূষণের জন্য প্রধানত যে ক্ষতি হয়, সেটা হলো মানুষের ক্রনিক লাং ডিজিজ (ফুসফুসের রোগ) হতে পারে। ধোঁয়ার কারণে ফুসফুসে ক্যান্সার হতে পারে। ধুলোবালিজনিত পরিবেশ দূষণের কারণে শিশুদের হাঁপানি ও নিউমোনিয়া হতে পারে। ফুসফুসের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। শব্দদূষণের জন্য মানুষের শ্রবণ ক্ষমতা লোপ পায়। ঢাকার শিশুরা এটার জন্য বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। শ্রবণ ক্ষমতা কমার কারণে শিশুর সঠিক মেধা বিকাশেও সমস্যা হতে পারে।
রাজধানী ঢাকায় ঘণ্টায় গড়ে প্রায় সাত কিলোমিটার গতিতে চলে যানবাহন। যানজটের তীব্রতা বোঝাতে বিদায়ী বছরের মাঝামাঝি বিশ্বব্যাংক আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। রাজধানীর একটি হোটেলে ‘২০৩৫ সাল নাগাদ ঢাকার উন্নয়ন সম্ভাবনা’ নিয়ে দিনব্যাপী ওই সম্মেলন হয়।
এদিকে, বাজারে বেআইনিভাবে বোতলীকরণ খাওয়ার পানির মান নির্ণয় করে চলতি মাসের (জানুয়ারি) ২১ তারিখের মধ্যে প্রতিবেদন দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) পক্ষে সময় আবেদনের শুনানি নিয়ে গত ১৪ জানুয়ারি বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট রিসার্চের প্রফেসর ড. আইনুন নিশাত কারিকা’কে বলেন, সম্প্রতি কাগজ পড়ে জানলাম, যানজট নিরসনে একটা ভ‚গর্ভস্থ সার্কুলার রেলের চিন্তা হচ্ছে। এগুলো অন্তত ১৫-২০ বছর আগে হাতে নেওয়া উচিত ছিল। আমাদের ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানিংয়ে আট-দশটা রুটের কথা বলা আছে। অথচ ঢাকা শহরের ভেতরে যেসব পয়েন্টে রেগুলার জ্যাম আছে, সেখানে আন্ডারপাস অথবা ওভারপাস করা উচিত।
দূষণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাস্তায় ময়লা ফেলাসহ বালু ও অন্যান্য নির্মাণ সামগ্রী রাখা হচ্ছে। একটু পানি ছিটিয়ে দিলেই কিন্তু এই বালু ওড়াটা বন্ধ হয়।
নিরাপদ পানি প্রাপ্তির বিষয়ে আইনুন নিশাত বলেন, পাবলিক হেলথের দায়িত্বে যারা আছে, তাদের কাজ হচ্ছে সাধারণ নাগরিকের স্বার্থ রক্ষা করা। নিরাপদ পানি নিশ্চিতকরণে ওয়াসার পরিদর্শন টিম থাকা উচিত। বিএসটিআই, পরিবেশ অধিদফতরের সার্টিফিকেট থাকা উচিত। ঢাকা সিটি করপোরেশনের খাদ্য নিরাপত্তা টিমকে গতিশীল করা উচিত। বড় বড় জারে করে বিভিন্ন অফিসে যে পানি সরবরাহ করা হয়, তা-ও পরীক্ষা করে মান নিশ্চিত করা উচিত। সরকার এই দায়িত্ব এলজিইডি, ওয়াসা, পাবলিক হেলথ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অথবা সিটি করপোরেশনকে দিতে পারে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান কারিকাকে বলেন, পরিকল্পনায় ঢাকার জন্য পাঁচটা এমআরটি লাইনের কথা বলা আছে। এগুলো হলে যানজট সমস্যা অনেকটাই কমে আসবে। ঢাকা সিটির জন্য কয়েকটা রুট ভাগ করে বাসগুলোকে একেকটা কোম্পানির আওতায় নিয়ে এলে সড়কে বাসগুলোর অসুস্থ প্রতিযোগিতা থাকবে না। ড্রাইভারদের মাসিক বেতনের ভিত্তিতে নিয়োগ দিলেও ভালো ফল আসবে, তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতার মনোভাব থাকবে না। একই সঙ্গে পথচারীরা সড়কের আইন-কানুন মেনে চললে সড়ক শৃঙ্খলা রক্ষা হবে।
শব্দদূষণ প্রসঙ্গে মিজানুর রহমান বলেন, যেখানে হর্ন বাজানো যাবে না, সেখানে সাইন দেওয়া থাকে; যেমন হাসপাতাল ও স্কুল-কলেজের সামনে। তবুও আমাদের দেশে হর্ন বাজানো হয়। এটা নির্ভর করে ড্রাইভারের শিক্ষা, সচেতনতা ও মানসিকতার ওপর। এজন্য তাদের সচেতন করার উদ্যোগ নিতে হবে। হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার বন্ধে আইন আছে। এটার প্রয়োগ করা উচিত।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান কারিকাকে বলেন, বায়ুদূষণ, বন উজাড়, শিল্প, কৃষি জমির সুরক্ষাÑ এই চারটা বিষয় এ বছর প্রাধান্য পাওয়া উচিত। সরকার যত উন্নয়নের কথা বলে তত কিন্তু আমাদের বনের জায়গা চলে যাচ্ছে। পাহাড় চলে যাচ্ছে। নতুন নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপন মানেই কৃষি জমির ওপর আগ্রাসন। সেখানে যেন ভারসাম্য বজায় থাকে, সেটা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, বায়ুদূষণ রোধে একটা আইন করছে সরকার। আমরা সেই আইন প্রণয়নে সরকারকে সাহায্য করছি। একই সঙ্গে আমরা সরকারের সঙ্গে বিকল্প উন্নয়ন উপকরণ; যেমন পুরনো ইটের বদলে বিকল্প হিসেবে কী আনা যায় এসব নিয়েও দর কষাকষি করব।
পরিবেশ অধিদফতরের কেস প্রকল্পের পরিচালক অতিরিক্ত সচিব ড. এসএম মঞ্জুরুল হান্নান খান বলেন, বায়ুদূষণ রোধে সচেতনতা বাড়াতে অনেক কাজই করা হচ্ছে। টিভিতে বিজ্ঞাপন দেওয়া, মিটিং করা, সেমিনার করা, ওয়ার্কশপ করা, এগুলো সবই হচ্ছে। আমরা মাঝে মাঝেই মোবাইল কোর্ট করি। জরিমানা করি। ড্রাইভারদের সঙ্গে আলোচনা সভা করি। আগের তুলনায় সচেতনতা বেড়েছে।
বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আছে জানিয়ে কেস প্রকল্পের পরিচালক বলেন, পরিবেশ দূষণ রোধে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে অনেক বড় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আমরা সিরিয়াসলি এই দায়িত্ব পালন করব। ইটভাটা থেকে ৬০ ভাগ দূষণ হয়। পরিবেশ আইন যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা একাদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিল আকারে উঠবে। বিলটা পাস হয়ে গেলে আমরা পুরনো পদ্ধতির ইটভাটাগুলোকে আর চলতে দেব না।
বায়ু ও শব্দদূষণ রোধে পুরনো গাড়িগুলোর রুট পারমিট না দিতে বিআরটিএকে চিঠি দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গেও সভা করেছি। সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সভা করেছিÑ রাস্তায় যেন সকালে-বিকালে তারা পানি দেয়। এতে ধুলাবালি কম উড়বে।
বায়ুর অবস্থা জানতে পরিবেশ অধিদফতরের ১১টা সিএএমএস স্টেশন আছে জানিয়ে মঞ্জুরুল হান্নান খান বলেন, আরও পাঁচটা স্থায়ী স্টেশন করা হচ্ছে। ১৫টা মোবাইল স্টেশন করা হচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়, যখন কাজ চলে সেখানে বায়ুদূষণ হচ্ছে কিনা, এটা মাপার জন্য। এগুলো চলতি বছরই শুরু করা হবে।
তিনি বলেন, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আলাদা একটা প্রজেক্ট হয়েছিল, আবার নতুন একটা প্রজেক্ট শুরু হবে। নিষিদ্ধ হাইড্রোলিক হর্ন নিয়ন্ত্রণে আমরা মোবাইল কোর্ট করব।
প্রসঙ্গত, একাদশ জাতীয় সংসদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সুরক্ষা’ অংশের একটি পয়েন্টে বলা হয়েছে, ‘উৎপাদনশীল বনের আয়তন ২০১৫ সালের ১৩.১৪ শতাংশ হতে ২০ শতাংশে উন্নীতকরণ; ঢাকা ও অন্য বড় নগরগুলোতে বায়ুর মান উন্নয়ন এবং বিশুদ্ধ বায়ু আইন প্রণয়ন; শিল্প বর্জ্যরে শূন্য নির্গমন/নিক্ষেপণ প্রবর্ধন করা; জলাভ‚মি সংরক্ষণ আইন মেনে বিভিন্ন নগরের জলাভ‚মি পুনরুদ্ধার ও সুরক্ষা করা; উপক‚লরেখাব্যাপী ৫০০ মিটার চওড়া স্থায়ী সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা হবে।’ বিদায়ী বছরের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে আওয়ামী লীগের দেওয়া এই ইশতেহার বাস্তবায়ন হলে ঢাকার বায়ু নির্মল হতে পারে।

0 2298

নিজস্ব প্রতিবেদক

গত ১ অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের বিলবোর্ড উচ্ছেদ অভিযান। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুরু হওয়া এ অভিযানে এ পর্যন্ত ১৭টি বড় এবং ১০টি ছোট বিলবোর্ড উচ্ছেদ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিটি কর্পোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ও বিউটিফিকেশান সেলের প্রধান ক্যাপ্টেন রিপন কুমার সাহা। উচ্ছেদকৃত বিলবোর্ডগুলো ঘটনাস্থলেই নিলামে বিক্রি করা হয়। এতে ডিএনসিসির রাজস্ব খাতে প্রায় তিন লাখ টাকা জমা হয়েছে বলে জানা যায়। ডিএনসিসির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও মেয়রের একান্ত ব্যক্তিগত সচিব শামসুল ইসলাম মেহেদীর নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত বৃহস্পতিবার রাত পৌনে দশটা থেকে শুক্রবার সকাল সাতটা পর্যন্ত অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযান শুরুর ঘন্টাখানেক পর ঘটনা স্থলে যান মেয়র আনিসুল হক। ২৭টি অপসারণের সবগুলিই হয়েছে ঢাকা বিমানবন্দর এলাকায়।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে মেয়র আনিসুল হক এ অভিযানের ঘোষণা দেন। বর্তমানে ডিএনসিসি এলাকার সব বিলবোর্ডই অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

আর্কিটেক্ট বি কে এস ইনান এখন গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ-এর টেকনিক্যাল ডিরেক্টর। তিনি স্থপতি হিসেবে এই অনন্য রিসোর্টকে গড়ে তুলেছেন। কিভাবে গ্র্যান্ড সুলতানের জন্ম হলো? কোথায় এটি আলাদা সে গল্প শোনাচ্ছেন তিনি। লিখেছেন ওমর শাহেদ

1

এতো জায়গা থাকতে গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ কেন শ্রীমঙ্গলে তৈরি করা হলো? এই প্রশ্নটির জবাব খুঁজতে আজ থেকে পাঁচ-সাত বছর আগে আমাদের ফিরে যেতে হবে। শ্রীমঙ্গলে ঘুরতে গিয়েছিলাম। এক ভোরে বেড়িয়ে পড়লাম ক্যামেরা কাঁধে নিয়ে। শখের বশে আমি ছবি তুলি। একটি দৃশ্য খুব ভালো লেগে গেল। ছবিটি তুলে ফেললাম। পরে একদিন ছবিটি দেখালাম গ্র্যান্ড সুলতানের অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা ভাইস চেয়ারম্যান সৈয়দ কামরুজ্জামানকে। অনেকক্ষণ ধরে তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন। বললেন, ‘এটা কোন জায়গা?’ উত্তরে জানালাম, শ্রীমঙ্গল। সকালের সূর্য কেবল উঠছে। পাতার ফাঁক দিয়ে আলো পড়ছে মাটির পথে। সে আলোয় উজ্জ্বল হয়েছে পাতার মধ্যে মাকড়শার জালটি। আলো দেখলেন বেশ খানিকক্ষণ। তারপর বললেন ‘এ তো স্বর্গীয় আলো।’
আর এ নিয়ে কথাবার্তা হয়নি। আমি জানিও না, খাজা টিপু সুলতান এবং তিনি মিলে শ্রীমঙ্গলে ১৫ একর জায়গা চূড়ান্ত করে ফেলেছেন। নিজের কাজ নিয়ে ততদিনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। অনেক দিন পরে ডাক পড়লো। তারা দুজনে মিলে গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ নির্মাণের কাজ শুরু করে দিয়েছেন। আমাকে বললেন, ‘আর্কিটেক্ট হিসেবে আপনি আমাদের এই স্বপ্নের প্রকল্পটির বাস্তবায়ন করবেন। কোনোভাবেই শ্রীমঙ্গলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে নষ্ট করবো না আমরা। বরং একে বহুগুণে বাড়িয়ে তুলব।’

2

শুরু হলো কাজ। একদল নবীন সহকর্মীকে নিয়ে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। রাত-দিন কাজ করেছি। প্রতিটি ইট কোথায় কোনটি বসবে সেটি আমি জানি। সেগুলোকে জায়গা মতো বসানোর ক্ষেত্রে সামান্য শ্রমিক ভাইয়ের অবদান আছে, তেমনি আমাদেরও রক্ত-ঘাম মিশে আছে। রাতের পর রাত দিনের পর দিন তাদের সঙ্গে কাজ করেছি।
সেখানে যে পরিমাণ গাছ ছিল, এখন তার ১০ গুণ গাছ আছে। লেকটি যেখানে আছে, সেটি আসলে গর্ত ছিল। আমরা তাকে সুন্দর করে লেকের আকার দিয়েছি। টিলার কোনো চেহারাই ছিল না। এই টিলাটিকে আজকের চেহারা দেবার পেছনে যে কত মানুষের পরিশ্রম লেগে আছে! যেখানে ভবনটি আছে, সেখানে কোনো গাছই ছিল না। আমরা কোনোভাবেই প্রকৃতিকে ক্ষতিগ্রস্থ করিনি। বরং তাকে শতগুণে বিকশিত করার জন্য যাবতীয় মেধা, শ্রম ঢেলে দিয়েছি। আমাদের এই বিশাল প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কাজ যখন চলছে তখন একদিন ইস্পাহানী গ্রুপের কর্ণধার সালমান ইস্পাহানী এসেছিলেন। তিনি শুনেছেন, এখানে ঢাকা থেকে এসে একদল মানুষ গ্র্যান্ড সুলতান নামের একটি রাজকীয় রিসোর্ট তৈরি করছেন। অনেকক্ষণ মনোযোগ দিয়ে আমাদের কাজ দেখলেন। ঘুরে বেড়ালেন। তারপর বিষ্ময় আর চাপতে না পেরে খাজা টিপু সুলতানকে বলেই ফেললেন, ‘হোয়াট হ্যাভ ইউ ডান?’

6

গ্র্যান্ড সুলতানের প্রতিটি গাছের চারা নিজের হাতে লাগিয়েছেন গ্র্যান্ড সুলতানের চেয়ারম্যান খাজা টিপু সুলতান। মালিদের নিজে বাগান পরিচর্যা করা শিখিয়েছেন। একটি পাঁচ তারকা হোটেলে যা যা আছে তার চেয়ে কোনোভাবেই কোনো কিছু কম নেই আমাদের। বিশাল লেক আছে, ঘোরার ব্যবস্থা আছে। আছে আরাম-আয়েশের সব ব্যবস্থা। বললে তো আর কেউ বিশ্বাস করতে চাইবেন না এখন, প্রতিটি বিছানার বালিশ নিজের হাতে খাজা টিপু সুলতান পরীক্ষা করে দেখেছেন। সেভাবে এমনকি বিছানার চাদরটিতেও তার হাতের পরশ লেগে আছে। ফ্লোরের পাথরের টুকরো থেকে শুরু করে ওয়াল পেপারটিও সবার পরামর্শে তিনি নিজের হাতে কিনেছেন। তিনি নিশ্চিত হতে চেয়েছেন, গ্র্যান্ড সুলতানের সবকিছুই উৎকৃষ্ট মানের হোক। আমরা সে পরীক্ষায় পাশ করেছি কি না সেটি বিচারের ভার ভ্রমণপিয়াসী মানুষদের।
গ্র্যান্ড সুলতানকে নিয়ে অনেক অনেক স্মৃতি আছে। এটি অন্য যে কোনো হোটেল, রিসোর্টের চেয়ে একেবারে আলাদা। বিশাল এক লাইব্রেরি আছে। তাতে গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ড থেকে শুরু করে ইয়োগা, গলফের বই, শিশুদের কার্টুনের বই পর্যন্ত আছে। যখন বই-ব্যবসায়ীরা শুনলেন, রিসোর্টে লাইব্রেরি করা হবে, তারা এত বেশি অবাক এবং খুশি হয়ে গেলেন যে, অবিশ্বাস্য অংকের ছাড় দিয়ে বই বিক্রি করলেন। মাত্র দুদিনে এই বিশাল লাইব্রেরির সব বই কেনা হয়েছে।
এখানে আছে হেলিপ্যাড। গ্র্যান্ড সুলতানের সবকিছুর মতো টোটাল গ্লাস ফিটিংসও কেবল বাংলাদেশেরই নয়, এশিয়ার সেরা। আমরা এখানে সর্বোচ্চ প্রযুক্তির মাধ্যমে সবচেয়ে ভালো উপকরণই ব্যবহার করেছি। আমরা বিভিন্ন দেশের নান্দনিকতা, নানা সংস্কৃতির রূপ-রস এখানে রাখার চেষ্টা করেছি। লিফটে যে কাঠের ডিজাইনটি আছে সেটি পারশিয়ান কালচার থেকে নেওয়া। এই পরিশ্রম আর চেষ্টার একটিই উদ্দেশ্য, গ্র্যান্ড সুলতানকে আমরা যে কোনো সমাজের, বয়সের মানুষের উপযোগী করে তৈরি করতে চেয়েছি। একে আর এখন কেউ রিসোর্ট বলেন না। ভেতরে ঢুকে তার মনে হয়, কোনো বড় হোটেলে ঢুকেছেন। সমাজের যে কোনো অংশের মানুষ তার ছুটিছাটা, বিনোদনের সময়টুকু কাটাতে গ্র্যান্ড সুলতানে আসছেন-এই আমাদের অর্জন। এ অর্জন সেই মানুষটিরও যিনি গ্র্যান্ড সুলতানের আঙ্গিনার, আশেপাশের গাছের পাতা কুড়িয়ে জমা করেন প্রতিদিন।
গ্র্যান্ড সুলতানের মাধ্যমে কেবল পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটেনি, সে এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়নও হয়েছে। এখানে প্রচুর স্থানীয় কর্মী কাজ করেন। তাদের সবার মিলিত চেষ্টাতেই ২০১৪ সালে ‘মোষ্ট লাক্সারিয়াস গলফ রিসোট’ হিসেবে ওয়ার্ল্ড লাক্সারি হোটেল পুরষ্কার পেয়েছে ‘গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ’। আর আমাদের সাফল্য যদি বলতেই হয় তাহলে বলবো, এক কাপ কফি বা চা হাতে যখন কেউ চারপাশটি একা একা ঘুরে দেখেন, তার ভালো লাগে, চেহারায় সেটির ছাপ দেখে, তার কথা শুনে আমরাও ভাবি, এত কষ্ট-পরিশ্রম হয়তো বৃথা যায়নি। যখন কেউ বলেন ফোনের অপর প্রান্তের বন্ধুকে, ‘আমি এসেছি। ভালো লাগছে। তুমিও শ্রীমঙ্গল এসে গ্র্যান্ড সুলতানে ঘুরে যাও’, খুব ভালো লাগে।

ছবি – বি কে এস ইনানের সৌজন্যে

খাজা টিপু সুলতান
চেয়ারম্যান

খায়রুল আলম

বান্দরবানের মিলনছড়িতে গিয়ে কিসের মিলন দেখব? হ্যাঁ, প্রাকৃতিক সৌর্ন্দযের অবারিত সমারোহ এবং মেঘের রাজ্য ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছে যদি থাকে, তাহলে ঘুরে আসতে পারেন বাংলাদেশের পাহাড়ি কন্যাখ্যাত বান্দরবান।
বাংলার ভূ-স্বর্গ পার্বত্য জেলা বান্দরবানে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও বাঙালি সম্প্রদায়ের প্রায় চার লাখ মানুষের বসবাস। এলাকাটিকে প্রকৃতি সাজিয়েছে মনের মাধুরি মিশিয়ে। গাছ-গাছালি ঘেরা এবং পাহাড়-নদী-হ্রদ আর ঝর্ণার অমোঘ সৌন্দর্যের টানে সেখানে সারা বছরই বিশেষ করে শীত মৌসুমজুড়ে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে। আর তাই সেখানে গড়ে উঠেছে সরকারি-বেসরকারি বেশকিছু পর্যটন স্পট, হোটেল ও রেস্তোরাঁ।

Hillside Resort_MUNIA_03

শুধু বান্দরবানেই নয়, দেশের প্রথম রিসোর্টটি রয়েছে এখানে। বান্দরবান শহর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে চিম্বুক সড়কের মিলনছড়ি এলাকায় পাহাড়ের বুকে গড়ে ওঠা ‘হিলসাইট রিসোর্ট’ নামের এ রিসোর্ট বান্দরবানের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন রিসোর্ট হিসেবে পরিচিত। যেখানে বসে পাহাড়, নদী আর মেঘের দৃশ্য উপভোগ করতে পারবেন সহজেই। বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বাড়ির আদলে এখানে রয়েছে বেশ কয়েকটি সুন্দর কটেজ। উঁচু-নিচু অসমান বিশাল একটা চত্বর জুড়ে অবস্থান রিসোর্টটির। মাটির পাহাড়ের গায়ে ধাপে ধাপে কাটা সিড়ি, সেটা দিয়ে ওঠা-নামার সময় কোনো কটেজ থাকবে মাথার উপরে, কোনোটা আবার পায়ের নিচে। কটেজগুলোর নামও বেশ সুন্দর ও পরিচিত। ময়না, মারমা ইত্যাদি। পাহাড়ের ঢালে বাঁশের খুঁটি, তার ওপরে দাঁড়িয়ে পুরো কটেজটা। দেয়াল থেকে শুরু করে বারান্দার রেলিং পর্যন্ত সবই বাঁশের। মাথার ওপর পাতার ছাউনি। আর ঘরের সিলিং ও দেয়ালগুলো শীতলপাটি দিয়ে মোড়ানো।
হিলসাইট রিসোর্টের পুরো এলাকাই ঘন সবুজ গাছ দিয়ে মোড়া, একমাত্র পায়ে-চলার এক চিলতে পথটুকু ছাড়া সবটাজুড়েই রয়েছে সবুজের আচ্ছাদন। চারপাশটা নিবিড় জঙ্গল; তাতে কলা, কাঁঠাল, পেঁপে ইত্যাদি পরিচিত সব গাছের ভিড়। আর আছে বিশাল সব বাঁশঝাড়, থোকায় থোকায় ফুটে থাকা হরেক রঙের ফুল ছড়ায় স্নিগ্ধতা। সেগুন, মেহগনি, গামাড়ি, কড়ই ইত্যাদিসহ অসংখ্য রেইনট্রি পুরো রিসোর্টটিকে দিয়েছে নিবিড় প্রশান্তির ছোঁয়া।
রিসোর্টটিতে রয়েছে ১০০ জন অতিথির একসঙ্গে বসে খাওয়ার মতো একটি রেস্টুরেন্ট। নাম রিগ্রী ক্ষ্যাং রেস্তোরাঁ। রেস্টুরেন্টের বারান্দা থেকে বিশাল এলাকাজুড়ে নান্দনিক দৃশ্য উপভোগ করে অনেকটা সময় কাটিয়ে দেন অতিথিরা। বান্দরবান থেকে রুমা, চিম্বুক, নীলগিরি বা থানচি যাওয়ার পথে নাস্তার জন্য এবং ফেরার পথে লাঞ্চ খাওয়ার জন্য অনেকেই এখানে বিরতি দেন।

Hillside Resort_Munia_04

অতিথিদের আবাসনের জন্য বর্তমানে এই রিসোর্টে দুটি ডরমিটরি কক্ষ, ১২টি নন-এসি কক্ষ এবং ১১টি এসি কক্ষ রয়েছে। সর্বমোট ৮০ জনের আবাসনের সু-ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। প্রতিদিন জনপ্রতি ভাড়া ৯০০ টাকা থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকার মধ্যে।
ঢাকা থেকে এখানে আসার বিভিন্ন ব্যবস্থা রয়েছে। সবচেয়ে সহজে এবং কম খরচে যেতে হলে সকালে কিংবা রাতে ঢাকা থেকে বান্দরবানের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া এসি কিংবা নন-এসি বাসে চড়তে হবে। এছাড়াও ঢাকা থেকে ট্রেন কিংবা বিমানে করে চট্টগ্রামে গিয়ে ওখান থেকে বাসে কিংবা গাড়ি ভাড়া করেও যাওয়া যায়। বান্দরবান শহরে সবাই হিলসাইট রিসোর্টকে ‘মিলনছড়ি’ নামেই জানে।
যোগাযোগ : ০১৭১১-৬৯৬৩৩১, ০১৭১১-৫২৪২৬৫, ০১৭৩০-০৪৫০৮৩
ওয়েবসাইট : www.guidetoursbd.com

0 2809

প্রকৃত অর্থে আমাদের দেশে সবুজ-নগরী এখনও অনেকটাই স্বপ্ন। নগরজীবনে সবুজের ছোঁয়াও অনেকটাই অধরা। এখানে সবুজের চর্চা, চাষ বা নির্মাণÑ কোনোটাই হয় না। আছে ইট-পাথরের কোলাহল, সরু, অন্ধকার গলি-ঘুপসির আর্তনাদ। ফুলের সৌরভের পরিবর্তে আছে দুর্গন্ধময় ময়লার ভাগাড়, নর্দমা আর কালো ধোঁয়ার যন্ত্রণা। কিন্তু সবুজে মোড়ানো এই দেশের নগরগুলো এমন হতশ্রী হওয়ার তো কথা নয়। হতে পারত সবুজ নগরের দৃষ্টান্ত। সুদূর অতীত থেকে আমাদের উদ্যান রচনার এই উদাসীনতা নিয়ে ভাবলে অনুমান বা ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ থেকে কিছু কথা বলা যায়। প্রাচীন বাংলার নিরেট পেশাজীবীদের কথা বাদ দিয়ে সৌখিন সম্প্রদায়ের কথা ধরলেও ফলাফলের ক্ষেত্রে হতাশ হতে হয়। সম্ভবত বিষয়টি একেবারেই উপেক্ষিত ছিল। কিংবা প্রকৃতির প্রাণবন্ত উপস্থিতিই আমাদের এই কাজে নিরুৎসাহিত করেছে। বলা যেতে পারে গোটা বাংলাদেশ প্রকৃতির আনুকূল্যে নিজেই একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ উদ্যান। আর তাতেই উপেক্ষিত হয় পরম-কাক্সিক্ষত বিষয়টি। এটাও আমাদের ধারণা। যেসব দেশে প্রকৃতি কঠোর, সেসব দেশের মানুষ আনন্দ সৃষ্টি ও উপভোগের জন্য প্রকৃতির অনুকরণে নিজ আবেষ্টনীকে সৌন্দর্যমি ত ও উপভোগ্য করার জন্য গাছপালা লাগিয়ে উদ্যান বানায়। আমাদের দেশে সেই শূন্যতা সম্ভবত কখনই অনুভূত হয়নি। তবে ‘নেই নেই’ করেও আমাদের উদ্যান-সম্পর্কের ইতিহাস প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো। কিন্তু সাতচল্লিশের পর থেকে এখানে উদ্যান-চর্চা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। শুধু তা-ই নয়, আমাদের ঐতিহ্যবাহী উদ্যানগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বিপন্নও হয়ে পড়ে। কোনো কোনোটি এখন বিলুপ্তির পথেও।

ঢাকায় এই সঙ্কট আরও প্রকট। ব্রিটিশ-ভারতের উদ্যানকর্মী আর এল প্রাউডলক ঢাকায় রমনাগ্রিন নামে সবুজায়নের যে বৃহৎ প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন, পরবর্তীকালে তা অনেকটাই উপেক্ষিত হয়। অথচ ঢাকার নিসর্গ-নির্মাণে রমনা এলাকাটিই অনুসরণীয় হতে পারত। কিন্তু তা হয়নি, বরং ধীরে ধীরে সঙ্কুচিত হয়েছে। ঢাকা হতশ্রী হওয়ার অন্যতম কারণ পরিকল্পনার অভাব। এখানে সবার আগে মানুষ গিয়ে নতুন নতুন উপ-শহর তৈরি করে। তারপর আসে অন্যান্য নাগরিক-সেবা-প্রতিষ্ঠান। ফলে পরিকল্পনা করার আর কোনো সুযোগ থাকে না। এভাবে প্রতিনিয়তই আমাদের শহরগুলো ইট-কাঠের জঞ্জালে পরিণত হচ্ছে। যদি সত্যিকার মনের চোখ দিয়ে দেখা যায়, তাহলে শুধু শহরগুলোর কথা বাদ দিলে আমাদের গোটা দেশটাই অসাধারণ সৌন্দর্যমি ত। অথচ এখানকার নিসর্গের আনুকূল্যে শহরগুলোই সবচেয়ে বেশি প্রকৃতি ও শিল্পের মিশেলে গড়ে উঠতে পারত।

নতুন-পুরনো মিলিয়ে ঢাকার আয়তন এখন আর খুব একটা ছোট নয়। আবার বিশাল জনসংখ্যার বিপরীতে এই আয়তনও যথেষ্ট নয়। তারপরও আমরা মনে করি সব কিছু ঠিকঠাক রেখেই এখনও আবার নতুন করে ঢাকা শহরকে সবুজে ঢেকে দেওয়া সম্ভব। প্রয়োজন শুধু লাগসই পরিকল্পনা ও সদিচ্ছার। কলকাতা শহরেও একইভাবে সবুজায়ন করা হয়েছে। গত চার দশক ধরে নিভৃতে লাগানো গাছগুলোই এখন সেখানে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। কয়েক বছর আগে ঢাকায় স্থপতিদের সংগঠন এ ধরনের একটি উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। অনেক আলোচনাও হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর এগোয়নি। আসলে বিষয়-বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে উদ্যোগটি আগে সরকারকেই নিতে হবে। তার সঙ্গে অন্যরা যুক্ত হলে তা আরও গতিশীল এবং ফলদায়ক হবে।

ঢাকায় রমনা (বর্তমান রমনা পার্ক, বেইলি রোড, হেয়ার রোড) এবং লাগোয়া বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, শেরেবাংলা নগরসহ ধানমি এলাকায় কিছুটা সবুজের আঁকিবুকি চোখে পড়ে। বর্ধিত নতুন ঢাকার বাকি অংশ অনেকটাই নি®প্রাণ, ছায়াহীন। সেখানে খাড়া রোদ বা বৃষ্টিতে আশ্রয়ের জন্য পথের ধারে একটি গাছও খুঁজে পাওয়া যাবে না। প্রায় এক দশক আগে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন উপলক্ষে অনেকটা আকস্মিকভাবেই ঢাকার সড়ক দ্বীপ, পথপাশ এবং সড়ক বিভাজকে গাছ লাগানোর তোড়জোড় শুরু হয়। কাজটি যতটা আকস্মিকভাবে শুরু হয়েছিল, আবার ততটা আকস্মিকভাবেই শেষ হয়। ফলে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ঢাকা ফিরে আসে তার পুরনো, হতশ্রী রূপে। তাছাড়া ঢাকার মতো সড়ক বিভাজকে এমন অপরিকল্পিত বৃক্ষায়ন পৃথিবীর আর কোথাও আছে কি-না জানা নেই। আস্ত বট, বকুল, কৃষ্ণচূড়া লাগানো হয়েছে বিভাজকে। এসব গাছ কতটা বড় হবে, কত দিন বাঁচবেÑ তা না জেনেই কাজটি করা হয়েছে। সবচেয়ে অবিশ্বাস্য বিষয় হচ্ছে, সড়ক বিভাজকের এসব নৈরাজ্যিক বৃক্ষরোপণ সম্পর্কে সিটি করপোরেশন কিছুই জানে না।

সিটি করপোরেশনে এ বিষয়ে কোনো আলাদা বিভাগও নেই। কারা এসব গাছ রোপণ করেছে সেসব অনুসন্ধান করেও তেমন কোনো ফল পাওয়া যায়নি। সিটি করপোরেশন যেখানে নগরের দ মুে র কর্তা, সেখানে ওরাই আছে অন্ধকারে।

অথচ ঢাকা হতে পারে ছয়ঋতুর শহর। সব ঋতুর মিশেল থাকবে ঢাকার প্রকৃতিতে। বাড়তি হিসেবে কেবল প্রয়োজন কয়েকটি অ্যাভিনিউ, যা সারা বছরের আদর্শ উদ্যান বানাতে সাহায্য করবে। রাজধানীর পার্ক ও উদ্যানগুলোকেও সেভাবে সাজানো যেতে পারে। কিংবা সুযোগ থাকলে দু’একটি নতুন পার্কও বানানো যেতে পারে। এর কোনোটাও যদি সম্ভব না হয়, তাহলে পুরনো পার্কের ভেতর সারা বছরের স্থায়ী কিছু রঙ তৈরি করা যায়। মাঠপর্যায়ে প্রকৃতি ও পরিবেশকর্মীদের এসব কাজে সম্পৃক্ত করলে আশানুরূপ সফলতা আসবে। সবচেয়ে ভালো হয় সম্ভবমতো ইমারতরাজির ফাঁকফোকরে সারা বছরের রঙটা থিতু করা। তাতে গোটা শহরেই ছয়ঋতুর রঙ ছড়িয়ে পড়বে। ঢাকার উল্লেখযোগ্য পার্ক ও উদ্যানগুলো ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। আগের তুলনায় আমাদের বিমানবন্দর সড়কটি অনেকটাই শিল্পমি ত। কিন্তু সে তুলনায় দু’পাশের জলাশয়গুলোর চিত্র ততটাই পীড়াদায়ক। আমাদের জলজ ফুলগুলো সেখানে থিতু হতে পারে। প্রায় সারাবছর ফুল ফোটেÑ এমন গাছগুলোকেও আমরা কাজে লাগাতে পারি। এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বাগানবিলাস। তবে ঋতুভিত্তিক শহর তৈরির ক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে উঁচু ও স্থায়ী বৃক্ষের প্রাধান্য থাকতে হবে।

আমাদের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী চট্টগ্রামকে বসন্ত-ঋতুর প্রাধান্য দিয়ে গড়ে তোলা যেতে পারে। পার্বত্য জনপদেই উদযাপিত হতে পারে বসন্ত উৎসব। বসন্তকে সাজানোর জন্য আমদের বন থেকে অনেক কিছু ধার নিতে হবে। পাহাড়েই মিলবে অনেক উপাদান। বসন্তের পুষ্পিত প্রাঙ্গণকে মাতিয়ে রাখে কনকচাঁপা, মুচকুন্দ, পলাশ, পারিজাত, শিমুল, গামারি, গোলাপজামের ফুল, মিলেশিয়া, গ্লি¬রিসিডিয়া, জামরুল ফুল ইত্যাদি। এদের প্রতিটি গাছ নিয়ে আলাদা অ্যাভিনিউ হতে পারে। কিংবা বর্ণবৈচিত্র্য সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন রঙের মিশেলেও তৈরি হতে পারে বীথি। চট্টগ্রাম শহরজুড়ে আছে অসংখ্য টিলা। এসব টিলাতেই বিভিন্ন রঙ ছড়িয়ে দেওয়া যায়। পথপাশে কণ্টকলতা, মাধবী, নীলমণি, হাপরমালি ও পাথরকুচি বসন্তের শোভাকে আরও মনলোভা করে তুলবে। তবে বসন্তের পুষ্পতালিকা আরও অনেক দীর্ঘ। ক্ষুদ্র ঘাসফুল থেকে সুউচ্চ তেলশুরও এ মৌসুমের ফুল।

শুধু এমন পরিকল্পিত শহরই আমাদের শহরের প্রাকৃতিক দৈন্য ঘোচাতে পারে।

কারিকা প্রতিবেদক

0 2059

দিন দিন বেড়ে চলেছে মহানগরের পরিসর। অবধারিত এই বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভাবনায় আসছে ভবিষ্যৎ নগরের রূপরেখা। প্রকৃতই নগরের চেহারা কী দাঁড়াচ্ছে বা বৃদ্ধির এই প্রক্রিয়া কি যথার্থভাবেই অগ্রসর হচ্ছে? এসব নিয়েই এবারের প্রচ্ছদ।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের সাড়ে চার হাজার এবং গাজীপুরের কালীগঞ্জের প্রায় দেড় হাজার একর মিলিয়ে সর্বমোট প্রায় ছয় হাজার একর জমিতে পূর্বাচল নতুন শহর নির্মাণ করছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। অপরদিকে, ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের দুই পাশ একের পর এক আবাসন প্রকল্পের দখলে চলে যাচ্ছে। বর্ষার পানিতে তলিয়ে যাওয়া কৃষিজমিতে শোভা পাচ্ছে অর্ধশতাধিক প্রকল্পের সাইনবোর্ড। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রকল্পের মাটি ভরাটের কাজও শেষ হয়েছে। রাজউকের অনুমোদন কিংবা পরিবেশ অধিদফতরের অবস্থানগত ছাড়পত্র নেই অধিকাংশ প্রকল্পের। এতে জলা-কৃষিজমিসহ বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল সঙ্কুচিত হচ্ছে, বাড়ছে স্থায়ী জলাবদ্ধতার ঝুঁকি।

রাজউক বলছে, ড্যাপের উল্লিখিত পরিকল্পনা ও নকশার বিরুদ্ধে তথাকথিত আন্দোলন করে বা হুমকি দিয়ে কোনো লাভ হবে না। সরকার ড্যাপ বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুযায়ী এই নতুন শহরে যেতে রাজধানীর কুড়িল থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত ৩০০ ফুট চওড়া সংযোগ-সড়ক নির্মাণ-কাজ চলছে। এলাকায় পরিকল্পিতভাবে জলাবদ্ধতা নিরসন ও পানি নিষ্কাশন করার জন্য সংযোগ-সড়কের দু’পাশে ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ১০০ ফুট প্রস্থের দুটি খাল নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে ড্যাপে। এখন ড্যাপের নকশা অনুযায়ী খাল খননের বিরুদ্ধে একটি কুচক্রী মহল এলাকার কিছুসংখ্যক নিরীহ মানুষকে উসকে দিয়ে নিজেদের দখলকৃত অবৈধ জায়গা রক্ষা করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান (ডিএমডিপি) অনুযায়ী রাজধানী ঢাকার চারপাশে সংরক্ষিত জলাধার ও নিচু জলাভূমি সুরক্ষার কথা থাকলেও সেটি রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। এখন ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) অনুযায়ী ৩০০ ফুট পূর্বাচলের সংযোগ-সড়কের দু’পাশে (উত্তর ও দক্ষিণে) ১০০ ফুট করে দুটি খাল যদি খনন ও সংরক্ষণ করা না যায়, তবে ঢাকার পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাবে। বর্ষা ও বন্যার পানিতে ডুবে যাবে মহানগরীর মধ্যাঞ্চলসহ বিস্তীর্ণ এলাকা। মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসবে ঢাকার পরিবেশের ওপর। তাছাড়া ড্যাপের সমীক্ষা ও গেজেটের পর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আইনগত বাধ্যবাধকতাও আছে। যারা সরকারের এই আইন অমান্য করবে বা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধাদান করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও বলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

রাজউক সূত্র জানায়, ১৯৯৫-২০১৫ সালে ১৫২৮ বর্গকিলোমিটারে রাজউক মহাপরিকল্পনার আওতায় প্রণয়ন করা হয়Ñ ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান (ডিএমডিপি)। নির্দিষ্ট সময়েই প্রণয়ন করার কথা থাকলেও প্রকৃত অর্থে ড্যাপের সমীক্ষার কাজ শুরু হয় ২০০৪ সালের জুলাই মাসে এবং শেষ হয় ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে। ২০১০ সালের জুন মাসে সরকার অনুমোদিত ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানে সংযোগ-সড়কের উভয় পাশে ১শ’ ফুট প্রস্থের দুটি খালের সংস্থান রাখা হয়েছে। রাজউক জানিয়েছে, রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্রের সঙ্গে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে ১৯৯৪ সালে প্রগতি সরণির উত্তর প্রান্ত কুড়িল থেকে বালু নদী সংলগ্ন প্রকল্প এলাকা পর্যন্ত সাড়ে ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৩০০ ফুট প্রস্থের জমি রাস্তা ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বুড়িগঙ্গা সেতুর দক্ষিণে কেরানীগঞ্জ থেকে কুচিয়ামোড়া ধলেশ্বরী সেতু পর্যন্ত রাজউকের সীমানার মধ্যে রাস্তার দুই পাশে ঝিলমিল, প্রিয়প্রাঙ্গণ, পশ্চিমদী মডেল টাউন, কেরানীগঞ্জ মডেল টাউন, সবুজ ছায়া আবাসন প্রকল্প, এভার সাইন সিঙ্গাপুর সিটি ও ভূঁইয়া আবাসিক প্রকল্পে মাটি ভরাট করা হয়েছে। ঝিলমিল ছাড়া কোনো প্রকল্পের রাজউকের অনুমোদন নেই। কিন্তু পরিবেশ অধিদফতরের অবস্থানগত ছাড়পত্র ছাড়াই মাটি ভরাট করেছে ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্প। যদিও এসব প্রকল্পের বেশ ক’টির অনুমোদনের ব্যাপারে মন্ত্রিপরিষদ-সভায় আলোচনা হয়েছে কিন্তু চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত এখনও পর্যন্ত গৃহীত হয়নি। এ অঞ্চলের জমিগুলো সবই রাজউকের ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত। ২০১০ সালে সংশোধিত পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে পরিবেশগত ছাড়পত্র ব্যতীত জলাধার ভরাট বা অন্যভাবে শ্রেণি পরিবর্তন করলে প্রথমবার ২ লাখ টাকা বা দুই বছর কারাদ- অথবা উভয় দ- আর পরবর্তী সময়ে একই অপরাধ করলে ২ থেকে ১০ বছর কারাদ বা ২ থেকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দ-ে দ-িত করার বিধান রয়েছে। আইন কাগজে-কলমে থাকলেও মানছে না কেউ। পরিবেশবাদীরা বলছেন, এমন চলতে থাকলে ঢাকার পাশের নদীগুলো যেমন গতিপথ হারাবে, তেমনি পুরো শহর বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাবে।

আবু নাসের খান
চেয়ারম্যান, পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)

ঢাকার পাশেই গড়ে উঠছে নতুন শহর, এ শহরের কাঠামো কেমন হবে বলে মনে করছেন?
ঢাকায় পাশে শহর হবে এটা খুবই ভালো খবর হতে পারত। কারণ তাতে এই শহরের ওপর চাপ কমবে, গাড়ি-ঘোড়া কমবে, মানুষ একটু শান্তিতে বসবাস করবে। কিন্তু একটা মেগাসিটির কাছে এমন শহর কখনও গ্রহণযোগ্য নয়।

কেন গ্রহণযোগ্য নয়?
এত কাছাকাছি হওয়ার ফলে সেখানে অধিকহারে লোকজন বসবাস করবে। ফলে যানবাহনের চাহিদা বাড়বে।
রাস্তাঘাট যানবাহনের চাপে কুলিয়ে উঠতে পারবে না। কারণ ওখান থেকে লোকজন বিভিন্ন কাজে এই রাজধানীর দিকেই আসতে থাকবে। ফলে চাপ বাড়বে।

যানবাহনের চাপ বাড়বে বলেই কি এমনটা মনে করছেন?
কাছাকাছি একটা শহরের মধ্য একটা ইন্টারনাল যোগাযোগ থাকে। আপনি তা চাইলেও বাদ দিতে পারবেন না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বাড়তে থাকবে। ফলে মূল ঢাকায় মানুষের পাশাপাশি গাড়ি-ঘোড়ার চাপও বাড়তেই থাকবে। ফলে একটি শহর স্বাভাবিক সৌন্দর্য হারিয়ে মৃত শহরে পরিণত হতে পারে।

পরিবেশের ওপর কী রকম প্রভাব পড়তে পারে?
রাজউকের পূর্বাচল উপশহর প্রকল্প পরিবেশ সম্পর্কিত সব আইন লঙ্ঘন করে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর ফলে ওই এলাকার পরিবেশের ওপর কৃত্রিমভাবে মারাত্মক বির্পযয় ডেকে আনা হচ্ছে।

ম. শাফিউল আল ইমরান