Home মূল কাগজ প্রচ্ছদ

0 214

সোহরাব আলম
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের শহরাঞ্চলে নানা বয়সী মানুষের মধ্যে সহিংস ও নিষ্ঠুর আচরণ বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে অস্থিরতা ও আত্মহত্যাপ্রবণতা। এমনকি কিশোরদের মধ্যেও সহিংস আচরণের বিস্তার ঘটছে। কিছু ‘কিশোর গ্যাং’ মানুষ খুনেও জড়িত। শহরের মানুষের এমন সহিংস ও আত্মবিধ্বংসী হয়ে ওঠার পেছনে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ফ্ল্যাটভিত্তিক জীবনযাপনে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। নগরজীবনের ব্যস্ততার মধ্যে মানসিক অস্থিরতা বা মানসিক রোগের প্রাদুর্ভাব কমাতে সামাজিক মিথস্ক্রিয়া বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন স্বাস্থ্য-বিশেষজ্ঞরা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নগরায়ণ বর্তমান শতাব্দীর অন্যতম প্রধান কারণ, যা স্বাস্থ্য খাতের ওপর প্রভাব ফেলছে। ২০৫০ সালের মধ্যে সারা বিশ্বের ৬৮ ভাগের বেশি মানুষ নগরে বসবাস করবে। আর বাংলাদেশে যে আনুপাতিক হারে নগরায়ণ হচ্ছে, তা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের নগরে বসবাসকারী জনসংখ্যা গ্রামীণ জনসংখ্যার চেয়েও বেশি হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এমনকি ভবন নকশার দুর্বলতার কারণেও নগরবাসীর মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে। সাধারণত স্থপতিরা অনেক দিক বিবেচনায় রেখেই ভবনগুলোর নকশা (ডিজাইন) করেন। প্রাকৃতিক পরিবেশ খেয়াল করে বিশুদ্ধ বাতাস চলাচলের সুবিধার্থে সঠিক ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা রাখা হয়। এ ধরনের ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট ভবনসহ নগর এলাকার মানুষকে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানসিকভাবে ভালো রাখে। সুস্থ রাখে। কিন্তু উল্টোটা হলে বিপদ।
দেশে দ্রুত বর্ধমান শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার অবস্থান শীর্ষে। এখানকার বেশিরভাগ নগরায়ণ হচ্ছে অপরিকল্পিতভাবে। প্রতিনিয়ত উঠছে আকাশচুম্বী ভবন। হারিয়ে যাচ্ছে খোলা জায়গা। এমনকি প্রায় দুই কোটি বাসিন্দার এই নগরে খেলাধুলার মাঠগুলোও হারিয়ে যাচ্ছে বহুতল ভবনের আড়ালে। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে ঘিঞ্জি হয়ে উঠেছে অনেক এলাকা। পরস্পরের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ ও আলাপ তথা সামাজিক মিথষ্ক্রিয়া আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। নগরে স্বাভাবিক বিনোদনের জন্যও নেই পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। সব মিলিয়ে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার পরিবেশ নেই বললেই চলে। ফলে মানসিক স্বাস্থ্যহীনতা ক্রমেই বাড়ছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সামাজিক অবক্ষয় এবং ব্যক্তিগত অস্থিরতা ও সহিংস আচরণ। নাগরিক জীবনের প্রভাবে মানসিক স্বাস্থ্য কতটা ক্ষতিগ্রস্ত, তার গবেষণালব্ধ পরিসংখ্যান না থাকলেও এই হার যে বাড়ছে-তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এ ক্ষেত্রে শুধু কিশোরদের অপরাধী হয়ে ওঠার ঘটনাই বড় উদাহরণ হতে পারে।
সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকার নয়টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল, মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত, মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালত এবং শিশু আদালতের বিচারিক নিবন্ধন খাতার তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ বছরে ঢাকায় ৯৯ খুনের মামলায় তিনশ’র বেশি কিশোর জড়িত থাকার অভিযোগ এসেছে। এর মধ্যে গত দেড় বছরে ঘটেছে ১৩টি খুন। এতে জড়িত অন্তত ১২০ কিশোর। এদের নাম উল্লেখ করে খুনের মামলাও হয়েছে।
প্রতিবেদনে রাজধানীর উত্তরা, হাজারীবাগ, চকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের খবরও উঠে এসেছে। বিভিন্ন গ্যাংয়ের সদস্য কিশোরদের মধ্যে নামী স্কুলের শিক্ষার্থীও রয়েছে, যারা খুন-ধর্ষণ-মাদকসহ নানা অপরাধে জড়িত। এসব অপরাধের পেছনে প্রেমসংক্রান্ত বিরোধ, মাদক ও তথাকথিত ‘হিরোইজম’ অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। এছাড়া চুরি-ছিনতাইয়ের মতো অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে কিশোররা। কিশোরদের এসব ভুল পথে পা বাড়ানোর পেছনে নানা কারণ রয়েছে। উন্নত প্রযুক্তির অপব্যবহার, অভিভাবকদের অবহেলা, সমাজে বয়োজ্যেষ্ঠদের খরবদারি কমে যাওয়া কিংবা রাজনৈতিক ছত্রছায়া- গড়পড়তায় এই কারণগুলো তাদেরকে ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
নগরের অপরিকল্পিত সম্প্রসারণের কারণে মানসিক বিকাশের যথাযথ পরিবেশ তৈরি হচ্ছে না। এমনকি মানসিক সমস্যার কারণেই বাড়ছে আত্মহত্যার সংখ্যা। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও পুলিশ সদর দপ্তরের এক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গড়ে ২৮ জন আত্মহত্যা করেন। সে হিসাবে প্রতি বছর দেশে প্রায় ১০ হাজার মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। বিশ্বজুড়ে নগরায়ণের পরিবর্তন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে তৈরি হতাশা এবং মানসিক রোগের প্রাদুর্ভাব মানুষকে আরও বেশি আত্মহত্যাপ্রবণ করে তুলেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সারা পৃথিবীতে প্রতিদিন গড়ে তিন হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) বলছে, এটা এখন এক নীরব মহামারী (সাইলেন্ট এপিডেমিক) হয়ে উঠেছে। এখন ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সের মানুষদের মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ আত্মহত্যা। সিডিসির গবেষণা থেকে জানা যায়, প্রতি ১২ জন তরুণের মধ্যে অন্তত একজন আত্মহত্যার চেষ্টা করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ নানা সরকারি-বেসরকারি গবেষকদের ধারণা, আত্মহত্যার মূল কারণ হতে পারে-১. ভেঙে পড়া সামাজিক বন্ধন, ২. পরিবারের সাবেক কাঠামোর অবলুপ্তি, ৩. অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ৪. বেকারত্ব, ৫. মানসিক অবসাদ প্রভৃতি। আর এসব কারণ শহরাঞ্চলেই বেশি বিদ্যমান, অপরিকল্পিত নগরায়ণ যা ত্বরান্বিত করছে।
নগরজীবনে মানসিক চাপ কমানোর জন্য প্রয়োজন সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধি। ঢাকার সম্প্রসারণকে সব ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগের জন্য সুপরিকল্পিত করা যায়নি বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
স্থপতি রবিউল হুসাইন বলেন, ‘আইনের বিধান অনুসারে স্থাপনা এমনভাবে নির্মাণ করতে হবে যেন আলো-বাতাস চলাচলের সুযোগ থাকে। জায়গা ছাড়ার কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু ভবনগুলো নির্মাণের সময় এগুলো মানা হয় না। ফলে কংক্রিটের জঙ্গল তৈরি হচ্ছে। এসব ‘জঙ্গলে’ নানা ধরনের দূষণ কেবল শারীরিক নয়, মানসিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে নাগরিকদের। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, পানিদূষণের প্রভাব শরীরের সঙ্গে সঙ্গে মনের ওপরও পড়ছে।’
সুপরিকল্পিত নগরায়ণের অভাবে এর বাসিন্দাদের অবচেতন মনে চাপ তৈরি হচ্ছে, পরে যা ক্ষত হয়ে দেখা দিচ্ছে। মানসিক স্বাস্থ্যসহ সব স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এই নগরের বিকেন্দ্র্রীকরণ প্রয়োজন বলেও মত দেন রবিউল হুসাইন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডা. সালাহ্উদ্দিন কাউসার বিপ্লব কারিকাকে বলেন, ‘এই নগরে আমরা যেভাবে বসবাস করছি, তাতে আমাদের সামাজিক যোগাযোগ-দক্ষতা কমে যাচ্ছে। শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নেই। যন্ত্রনির্ভর শৈশব নিয়ে বেড়ে উঠছে তারা। ফলে মানবিক হয়ে ওঠা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মনের জন্য অবসর প্রয়োজন, স্পেস প্রয়োজন। পরিকল্পনাহীন ইট-পাথরের শহরে মনের স্পেস তৈরির সুযোগ কম। অথচ পরিকল্পিত নগর গড়ে উঠলে চমৎকার পরিবেশে পর্যাপ্ত অবসর ও মনের স্পেস তৈরির সুযোগ হতো। বর্তমানে যেভাবে আমরা এগিয়ে চলেছি, তাতে মানুষ অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে।’
অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দুর্বল নকশার ভবনে বসবাসের ক্ষতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে সালাহ্উদ্দিন কাউসার বিপ্লব বলেন, ‘কোনো নাগরিক যদি সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকেই জ্যামে আটকা পড়েন, ময়লা-নোংরার মধ্যে পড়েন তাহলে তার মেজাজ ধীরে ধীরে খারাপ হবে-এটাই স্বাভাবিক। ফ্ল্যাটে বা বাড়িতে ঠিকমতো আলো-বাতাস না ঢুকলেও মেজাজ খারাপ থাকবে। যার প্রভাব পড়বে মানসিক স্বাস্থ্যে। সব মিলিয়ে অফিস বা কাজে যাওয়ার সময় থেকে শুরু করে বাসায় ফেরা পর্যন্ত মেজাজ খারাপ থাকবে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে পরিকল্পিত নগরায়ণের বিকল্প নেই।’ হতাশা, অস্থিরতা ও সহিংস আচরণের প্রভাব থেকে মুক্তির জন্য সামাজিক মিথষ্ক্রিয়ার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন এই মনোবিদ।

মির্জা মাহমুদ আহমেদ
বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা অন্যতম এবং বর্তমানে ঢাকার জনসংখ্যা প্রায় দুই কোটি। পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক রাজধানী হওয়ার পর মতিঝিল ছিল ঢাকার প্রধানতম বাণিজ্যিক এলাকা। পাকিস্তান আমলের শুরুতে ঢাকার পরিকল্পিত উন্নয়নের জন্য ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট গঠন করা হয়, যা ‘ডিআইটি’ নামে বহুল পরিচিত। ১৯৫৬ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ২০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনায় মতিঝিল ও কারওয়ান বাজারকে বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে দেখানো হয়। গুলশান-বনানী, উত্তরাকে তখন বিবেচনা করা হয় আবাসিক এলাকা হিসেবে। স্বাধীনতার পূর্ববতী সময়ে এবং পরবর্তী কয়েক দশক মতিঝিলকে ঘিরে আবর্তিত হতো দেশের সব ব্যবসা-বাণিজ্য। ব্যাংক-বীমাসহ বড় বড় বহুজাতিক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের অফিসগুলো সব মতিঝিলেই ছিল।
দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটলে এবং অর্থনীতি বিকশিত হলে মতিঝিল ছাড়িয়ে বাণিজ্যিক এলাকা বিস্তৃত হয় গুলশানে। এক সময় অভিজাত আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত থাকলেও গুলশান এখন বাংলাদেশের অন্যতম বাণিজ্যিক এলাকা। অনেক বহুজাতিক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা এখন গুলশানে। নামি-দামি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের অফিসসহ এখানে গড়ে উঠেছে খ্যাতনামা অনেক করপোরেট অফিস।
পুরনো স্থাপত্যশৈলীর বদলে এসব করপোরেট অফিসের নির্মাণশৈলীতে ব্যবহৃত হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি। শুধু কংক্রিট-স্ট্রাকচারের বদলে এখন মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে গ্লাস, কংক্রিট ও স্টিলের সংমিশ্রণে আধুনিক প্রযুক্তিতে নির্মিত অত্যাধুনিক সব বাণিজ্যিক ভবন। গুলশান অ্যাভিনিউয়ে রাস্তার দু’পাশে দেখা মিলবে সারি সারি ঝা-চকচকে আধুনিক সব বাণিজ্যিক বহুতল ভবন। যার বেশিরভাগই নির্মিত হয়েছে কংক্রিট, গ্লাস ও স্টিলের সমন্বয়ে। বাংলাদেশের বাণিজ্যিক স্থাপনার স্থাপত্যশৈলীতে যে নতুন ধারার সূচনা হয়েছে, আধুনিক বাণিজ্যিক ভবনগুলো দেখলে সেটা সহজেই অনুমান করা যায়। একসময়ের পাট ও চা রফতানিনির্ভর অর্থনীতি মোকাম বা গদিঘর ছেড়ে এখন ঝা-চকচকে আলিশান সুসজ্জিত করপোরেট ভবনে ঠাঁই করে নিয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির বিকাশমান এই দিকটি লক্ষ্য করলেই উত্থান-পর্বটা সহজেই টের পাওয়া যায়।
১৮৫০ সালে নির্মাণশিল্পে প্রথমবারের মতো বৃহৎ আকারে গ্লাসের ব্যবহার শুরু হয়। ইংল্যান্ডের হাইড পার্কে ক্রিস্টাল প্রাসাদ নির্মাণে প্রথমবারের মতো ব্যাপকভাবে গ্লাস ফ্রেম ও স্টিলের অবকাঠামো ব্যবহার করা হয়। প্রাসাদটি নির্মাণে সে-সময় তিন লাখ কাচের টুকরো ব্যবহৃত হয়েছিল। কাচের বড় বড় প্যানেলের সঙ্গে লোহার ফ্রেমগুলো সেট করে সেগুলো থেকে প্রাসাদটির দেয়াল এবং সিলিং তৈরি করা হয়েছিল। কাচের প্যানেল ও স্টিলের ফ্রেম দিয়ে নির্মিত প্রাচীন ক্রিস্টাল প্রাসাদের সঙ্গে হাল-আমলের গ্লাস স্ট্রাকচার ও স্টিল স্ট্রাকচারের মিল রয়েছে।
যদিও স্টিল আবিষ্কারের শতাব্দী পূর্ণ হতে চলল, তবুও নির্মাণশিল্পে স্টিলের ব্যবহার খুব বেশি পুরনো নয়, বিশেষত বহুতল ভবনে স্টিল স্ট্রাকচারের ব্যবহার। ১,৮০০ দশকের শেষদিকে বহুতল ভবন নির্মাণে প্রথম স্টিল স্ট্রাকচারের ব্যবহার শুরু হয়। বিশ শতকের শুরুর দিকে স্টিল স্ট্রাকচার নির্মিত বহুতল ভবন ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বহুতল ভবনে গ্লাস স্ট্রাকচারের ব্যবহার বেশ পুরনো হলেও একদম নিরুপায় না হলে স্টিল স্ট্রাকচার ব্যবহারের পক্ষপাতি নন স্থপতি মুস্তাফা খালিদ পলাশ। তিনি কারিকাকে বলেন, ‘স্টিল বিল্ডিং সেসব জায়গায় ব্যবহার করা উচিত, যেখানে মাটির বহনক্ষমতা কম। ঢাকার সয়েল খুব ভালো। আর ঢাকায় পনের-বিশতলা ভবনকেই আমরা বহুতল ভবন মনে করে থাকি। সেক্ষেত্রে স্টিল বিল্ডিং করার কোনো অবকাশ নেই, দরকারও নেই। ভবন নির্মাণে স্টিল স্ট্রাকচারের যেমন সুবিধা আছে, তেমনি অসুবিধাও কম নয়। কংক্রিটের তুলনায় স্টিল খুব ব্যয়বহুল। আমরা যে অবস্থানে এখন আছি, তাতে এখনো আমরা স্টিল ব্যবহারে বাধ্য নই। স্টিল স্ট্রাকচারের বিল্ডিংয়ে অগ্নিপ্রতিরোধক একটা প্রলেপ (ফায়ার কোটিং) দিতে হয়। ফায়ার কোটিং দেয়াটা খুব ব্যয়বহুল।’
ওয়ান এলিভেনে টুইন টাওয়ারে বিমান হামলার ঘটনা স্মরণ করে মুস্তাফা খালিদ পলাশ বলেন, ‘আমরা দেখেছি টুইন টাওয়ারের স্টিল স্ট্রাকচারের বিল্ডিংয়ে আগুন লেগে খুব সহজে সেটা ধসে পড়েছিল। তাপমাত্রায় স্টিল প্রসারিত হয়ে বিম ঝুলে পড়ে নাট-বল্টু খুলে সব একসঙ্গে কলাপস করার ঝুঁকি থাকে।’
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সুউচ্চ ভবন নির্মাণে স্টিলের বদলে কংক্রিট বেশি উপযোগী বলে মনে করেন তিনি। কংক্রিটের আরসিসিতে স্টিল ব্যবহার করা হচ্ছে উল্লেখ করে মুস্তাফা খালিদ পলাশ বলেন, ‘কংক্রিটের সুবিধা হচ্ছে, এটি একটি কম্প্রিহেনসিভ ম্যাটেরিয়াল। সেই কম্প্রিহেনসিভটা কংক্রিট নিতে পারে। আবার স্টিল ভেতরে যেটা থাকে, সেটা টেনশাইল ম্যাটেরিয়াল। স্টিল টেনশাইল বহন করে। স্টিল ও কংক্রিট যুগপৎভাবে একটা স্ট্রাকচারকে ধারণ করে।’
আমাদের জলবায়ু, আর্দ্র আবহাওয়া, অগ্নিপ্রতিরোধমূলক জ্ঞানের অভাব এবং সচেতনতার ঘাটতি বহুতল ভবনে স্টিল স্ট্রাকচারের ব্যবহার বিপজ্জনক হতে পারে। বনানীর এফআর টাওয়ারে অগ্নিকান্ডের ঘটনা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘এফআর টাওয়ারের অগ্নিদুর্ঘটনা যদি কোনো স্টিল বিল্ডিংয়ে ঘটত, তাহলে হয়তো পুরো দালানটিই ধসে পড়ত।’
রাজধানীর গুলশানে গড়ে উঠছে হাল আমলের অন্যতম করপোরেট ডেস্টিনেশন বিটিআই ল্যান্ডমার্ক। মুস্তাফা খালিদ পলাশের স্থাপত্য-নকশা করা বিটিআই ল্যান্ডমার্ক বাণিজ্যিক ভবন সম্পর্কে তিনি কারিকাকে বলেন, ‘বিটিআই ল্যান্ডমার্কে সহজ লাগসই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ভবনটিতে কংক্রিটের পাশাপাশি যেসব কাচ ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো লোই কাচ। লোই কাচ তাপ প্রতিরোধ করে। স্যান্ডউইচ গ্লাস হওয়ার ফলে বাইরের তাপ ভেতরে ঢুকছে না, ভেতরের তাপ বাইরে বের হচ্ছে না। এতে করে বিদ্যুৎ খরচ কম হয়। এয়ার কন্ডিশনিং লোডটা কম পড়ে।
কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন তৈরি পোশাক, চামড়া, সফটওয়্যার, কনজিউমার গুডস, টেলিযোগাযোগ, ফার্মাসিউটিক্যাল ও গ্যাসের মতো বিকাশমান সেক্টরগুলোতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। সেই সঙ্গে করপোরেট ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের অফিসগুলোর স্থাপত্যনকশাতেও এসেছে আধুনিকতার ছোঁয়া, যা বাংলাদেশের বাণিজ্যিক স্থাপনায় নতুন ধারা যোগ করেছে।

 

ধকল কাটবে দূষণ-দখলের

মির্জা মাহমুদ আহমেদ
দূষণে-দখলে বিপর্যস্ত ঢাকার চারপাশের নদী রক্ষা ও এর সৌন্দর্যবর্ধনে মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর তীরভূমিতে পিলার স্থাপন, তীররক্ষা, ওয়াকওয়ে, জেটিসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণে একটি প্রকল্প বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন আছে।
বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার চারপাশে নদীতীর রক্ষা ও সৌন্দর্যবর্ধনের এই প্রকল্প বাস্তবায়নে চলতি (২০১৮-১৯) অর্থবছরে ৮৪৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে প্রকল্পের খসড়া নকশা প্রণয়ন শুরু করা হয়েছে।
ঐতিহাসিক আহসান মঞ্জিলকে কেন্দ্র করে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে গড়ে তোলা হবে দৃষ্টিনন্দন এলাকা। ঢাকার চারটি নদীকে কেন্দ্র করে নির্মাণ করা হবে সবুজে ঘেরা তিনটি ইকোপার্ক। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু আর শীতলক্ষ্যার তীরে নির্মাণ করা হবে ২২০ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে। নদীতীরের বিভিন্ন স্থানে নির্মাণ করা হবে ১০০টিরও বেশি ঝুলন্ত সিঁড়ি। থাকবে ৪০৯টি বসার স্থান। পণ্য ওঠানামার জন্য নির্মিত হবে ১৯টি আধুনিক আরসিসি জেটি। বাবুবাজার থেকে সদরঘাট এলাকার নদীর পাড় দখলমুক্ত করে সেখানে নদীর পর্যবেক্ষণ ডেক এবং দৃষ্টিনন্দন দোকান নির্মাণ করা হবে। সংস্কৃতি চর্চার জন্য থাকবে উন্মুক্ত অপেরা হাউজ। নদীতীরের চারদিক থাকবে সবুজে ঘেরা। শিশুদের জন্য থাকবে আলাদা শিশু কর্নার। মনজুড়ানো আলোকসজ্জায় পাল্টে যাবে বুড়িগঙ্গাসহ চার নদীর রাতের দৃশ্য।
বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর দূষণ রোধ, দখল প্রতিরোধ ও সৌন্দর্যবর্ধনে ধাপে ধাপে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২২-এর জুন মাস নাগাদ এই প্রকল্পের কাজ শেষ হতে পারে।
নদীতীর দখল ঠেকাতে প্রায় ১০ হাজার সীমানা পিলার বসানো হবে। প্রতিটি সীমানা পিলারের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে সাড়ে তিন লাখ টাকা। যার স্থায়িত্ব হবে ন্যূনতম ১০০ বছর। আরসিসি ঢালাই করা সীমানা পিলারের ৩০ থেকে ৩৫ ফুট থাকবে মাটির নিচে এবং পিলারের ওপরে ১৬ ফুট দৃশ্যমান থাকবে।
এই প্রকল্পের উপপরিচালক প্রকৌশলী এএসএম আশরাফুজ্জামান বলেন, ইতোমধ্যে সরাসরি নিয়োগযোগ্য জনবল ও আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগের কাজ শেষ হয়েছে। পরামর্শক সেবা গ্রহণের জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বেশকিছু এক্সক্যাভেটর ও পন্টুন কেনার জন্য চুক্তি হয়েছে। এছাড়া প্রকল্পের আওতায় ঢাকা নদীবন্দর এলাকায় ২ হাজার ৬টি সীমানা পিলার নির্মাণের দরপত্র আহবান করা হয়েছে। পাশাপাশি রামচন্দ্রপুর থেকে বছিলা ও রায়েরবাজার খাল থেকে কামরাঙ্গীর চর পর্যন্ত ওয়াকওয়ে, কিওয়াল, ওয়ানওয়ে অন পাইল ইত্যাদি স্থাপনা নির্মাণের দরপত্র আহবান করা হয়েছে। সব মিলিয়ে গত এক বছরে প্রকল্পের ১০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
ঢাকার চারপাশের নদীতীর উন্নয়নে গৃহীত মহাপরিকল্পনা প্রসঙ্গে স্থপতি ইকবাল হাবীব কারিকাকে বলেন, প্রথমত, নদীর পাড়জুড়ে যে ধরনের পরিকল্পনাই নেয়া হোক না কেন তার পরিবেশগত এবং সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন করে দেখা দরকার। এ প্রকল্পে যে ব্যয় হবে তার ফিন্যান্সিয়াল রিটার্ন ক্যালকুলেশন করে দেখতে হবে। এই প্রাক সমীক্ষাগুলো অতন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের বৃহৎ প্রকল্পগুলোতে পরিবেশগত সামাজিক এবং অর্থনৈতিক প্রাক সমীক্ষার গুরুত্ব আইনগতভাবেই রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সমীক্ষা না করে যেন প্রকল্পটি শুরু করা না হয়। দ্বিতীয়ত নদীর পাড় উদ্ধারের পাশাপাশি উদ্ধারকৃত জায়গা সুনির্দিষ্ট করে সংরক্ষণের প্রক্রিয়া যদি না শুরু করা হয়, তাহলে সমীক্ষানির্ভর কার্যক্রম শেষ হয়ে আসতে আসতে তা আবার বেদখল হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে আমরা বলেছিলাম, প্রয়োজন হলে ডিজিটাল পদ্ধতিতে অর্থাৎ আইওটি বেজ ডিজিটাল পদ্ধতিতে জমির সীমা চিহ্নিতকরণ এবং দখলী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সেই কার্যক্রমগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। নদীপাড়ের যেসব এলাকায় সৌন্দর্যবর্ধন ও উন্নয়নকাজ করা হবে, সেসব এলাকায় ভূমির মূল্য বেড়ে যাবে। নাগরিকদের বসবাসের হারও বেড়ে যাবে। সেজন্য ওইসব অঞ্চলে অবকাঠামোগত সুবিধা ও ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমও পরিকল্পনার মধ্যে আনতে হবে। তা করা না হলে প্রকল্প বাস্তবায়নের পর সেখানে খাবার পানির সংকট এবং নানারকম নাগরিক সমস্যা দেখা দেবে। ট্রাফিক কনজাকশন সৃষ্টি হবে। ঢাকার চার নদী দিয়ে পুরো ঢাকা শহরের কঠিন ও তরল বর্জ্য প্রবাহিত হয়। সেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। নদীতীর রক্ষা ও উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে তরল ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও এই প্রকল্পের সঙ্গে অর্ন্তভুক্ত করে সেটার কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে। সেটা করা না হলে জনসাধারণ এই বৃহৎ প্রকল্পের সুফল পাবে না।
বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমডোর এম মাহবুব উল ইসলাম বলেন, যেভাবে উন্নয়নমূলক কাজ করার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে, তা টেকসই হবে। চলতি বছরের মধ্যেই খুঁটি বসানোর কাজ শুরু হবে। বাকি কাজ দ্রুত সময়ে শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর তীরভূমিতে পিলার স্থাপন, তীররক্ষা, ওয়াকওয়ে, জেটিসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণ (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্পের অংশ হিসেবে গত ২৯ জানুয়ারি থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকার চারপাশে নদ-নদী তীরে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে ৩ হাজার ৫৭৫টি স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে বিআইডব্লিউটিএ। ৩৬ দিনের এই অভিযানে ৯১ একর জমি উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযান চলাকালে জব্দ করা বালু, মাটি ও পাথর নিলামে তুলে ৫ কোটি ২ লাখ ২৬ হাজার টাকা বিক্রি করা হয়েছে। জরিমানা করা হয়েছে ৫ লাখ ৮৫ হাজার টাকা।

মিলটন মোললা
এক বর্গকিলোমিটার জায়গার ভেতর সবচেয়ে বেশি মসজিদ থাকার বিচারে বিশ্বের শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে আজকের বাংলাদেশ। কিন্তু কীভাবে তার শুরু? কোথা থেকে এলো এই দেশ? হাজার বছরের ইতিহাস খুঁড়ে বাংলা নামের আদিরূপ খুঁজতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, ‘ভঙ্গ’ নামে প্রাচীন এক জনগোষ্ঠীর নাম থেকে এর উদ্ভব, যাদের বাস ছিল বর্তমান বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে। ব্লকমান নামে এক ঐতিহাসিক বলছেন, বঙ্গ নামে এক রাজা ছিলেন, যিনি প্রাচীন রাজ্য ভঙ্গ-এর প্রতিষ্ঠাতা। ভারতের প্রাচীনতম পুরাণগ্রন্থ মহাভারতেও উল্লেখ রয়েছে এই রাজার কথা।
ইতিহাসে বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠার উল্লেখ প্রথম পাওয়া যায় খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৬ সালে আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের প্রেক্ষিতে। পরবর্তী গ্রিক ও লাতিন ইতিহাসকাররাও তার এ অভিযানের প্রেক্ষিতে বলেছেন, গঙ্গারিডি নামে এক শক্তিশালী রাজ্যের ভয়াবহ প্রতিরোধের মুখোমুখি হওয়ার ভয়েই শেষ পর্যন্ত ভারত অভিযান অসমাপ্ত রেখে ফিরে যান আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট। গঙ্গা উপত্যকায় বাংলাতেই ছিল সেই দুর্ধর্ষ গঙ্গারিডি জাতির বসবাস। এই অঞ্চল খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ এবং দ্বিতীয় শতকে এবং পরবর্তীতে চতুর্থ ও পঞ্চম শতকে এটি মৌর্য এবং গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীনে চলে যায়। সপ্তম শতকে এখান থেকেই সাম্রাজ্য গড়েন রাজা শশাঙ্ক এবং সপ্তম থেকে একাদশ শতক অবধি এ জনপদ শাসন করেন পাল রাজারা।
বাংলায় নগরসভ্যতার প্রাচীনতম স্থাপনা খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে প্রতিষ্ঠিত মহাস্থানগড়। বর্তমান বগুড়া জেলার কাছাকাছি এর অবস্থান। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে ১২ শতকের মধ্যে বাংলায় নির্মিত এবং এখনো টিকে থাকা প্রাচীন স্থাপনার অবশিষ্টাংশের মধ্যে আছে অসংখ্য ধর্মীয় ভবন এবং বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। রাজশাহী জেলায় পাহাড়পুরে ৭৭০-৮১০ খ্রিস্টাব্দে এবং ৮ থেকে ১২ শতকের মধ্যে কুমিল্লার ময়নামতিতে নির্মিত হয় উপমহাদেশের বৃহত্তম বৌদ্ধ বিহার। বাংলায় ১০৮০ খ্রিস্টাব্দে হিন্দু সেন রাজাদের হাতে চলে যায় পাল রাজার ক্ষমতা। ১২০৪ সালে নবাগত মুসলিমদের হাতে চলে যাওয়ার পূর্ব অবধি বজায় থাকে এ পরিস্থিতি।

ভারত তথা বাংলায় মুসলিম আগমন
আরব ভূমিতে জন্ম নেয়ার পর তুরস্ক, পারস্য এবং আফগানিস্তান হয়ে ভারতবর্ষে পদার্পণ করে ইসলাম। ১২ শতকের দিকে উত্তর ভারতে প্রতিষ্ঠা ঘটে যায় তার। ১৬ শতকে মুঘল শাসন শুরু হওয়ার পূর্ব-অবধি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন স্থাপত্যের নির্মাণ ঘটে এসব শাসকের আনুকূল্যে। উত্তর ভারত, গুজরাট, দাক্ষিণাত্য এবং বাংলায় (বর্তমান বাংলাদেশে) এর প্রসার ঘটে সর্বাধিক। মুঘল আমলের নির্মাণশৈলীগুলো মূলত প্রথম যুগের এ নির্মাণশৈলীরই অনুকরণ বা তা দিয়ে অনুপ্রাণিত।
১২০৪ সালে মুহাম্মাদ বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয় এ সময়কার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা। এর ফলে সুদূর আরব-পারস্য থেকে শুরু হয়ে এশিয়ার পূর্বদিকে ইসলামী আধিপত্যের শেষ প্রান্তসীমা হয়ে দাঁড়ায় বাংলা। ফলে ওইসব এলাকা থেকে ভাগ্যান্বেষণ, জীবিকা এবং ধর্ম প্রচারের লক্ষ্যে বহু মানুষের আগমনও শুরু হয় এ অঞ্চলে। এসব মানুষের মেধা-কৃষ্টি ও সংস্কৃতির মধ্যে ছিল নিজের দেশ থেকে বয়ে আনা স্থাপত্য আর কারিগরি জ্ঞান। নতুন দেশে আসার পর তার সঙ্গে মিশেল ঘটে যায় স্থানীয় কাঁচামাল এবং নির্মাণশৈলীর। এভাবেই একদিন হিন্দু এবং বৌদ্ধ প্রভাবপুষ্ট এ জনপদে প্রথমবার নিজেদের মতো করে নতুন নির্মাণের ভিত্তি স্থাপন করেন তারা। বিশ্বের যেখানেই গেছে মুসলিমরা, ধর্মের মূল নির্দেশনা প্রতিপালন, প্রতিদিন পাঁচবার নামাজ আদায়ের উদ্দেশে সেখানেই তারা নির্মাণ করেছে মসজিদ। বিহার এবং স্তুপা অধ্যুষিত নতুন দেশে স্থাপত্যশৈলীর বিচারে নতুন ধরনের এসব মসজিদ হয়ে ওঠে ভিন্ন স্থাপত্যের এক অনন্য নজির। পার্সি ব্রাউনের ভাষায়, রহস্যময়তার আধাররূপী মন্দিরের সঙ্গে তুলনামূলক বিচারে স্থানীয়দের সামনে মসজিদের স্থাপত্য-স্বভাবতই ঋজু ও সরলরূপে প্রতিভাত হয়।
মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রে কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্যণীয়। প্রতি শুক্রবার ধর্মানুগ মানুষের বৃহৎ সমাবেশকে ধারণ করার কথা মাথায় রেখেই শুরু হয় এর নির্মাণ-প্রক্রিয়া। মক্কায় কাবাঘরের দিকে মুখ থাকে প্রার্থনাকারীদের। মক্কার দিকে নির্দেশিত দেয়ালটি কিবলা দেয়াল এবং এর নাম ‘মিহরাব’ যা বস্তুত একটি অলঙ্কৃত কুলুঙ্গি। মসজিদে আরও থাকে ইমামের আসন বা মিম্বার, একটি মাকসুরা বা চারদিক ঘেরা একটি উঁচু স্থান, এক বা একাধিক মিনার, যেখান থেকে বিশ্বাসীদের প্রার্থনায় মিলিত হওয়ার আহবান জানান মুয়াজ্জিন। মসজিদে আরও থাকে একটি শান বা প্রাঙ্গণ, যেখানে রক্ষিত হয় কূপ কিংবা জলাধার, যার পানি দিয়ে নামাজে দাঁড়ানোর আগে অজু করেন নামাজি।
মুসলিমরা যখন বাংলায় আসে, তারা সঙ্গে নিয়ে আসে তাদের নতুন স্থাপত্য। মসজিদ ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে তারা নতুন বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, সামগ্রী, প্রযুক্তি ও আবহাওয়ার মিশেল ঘটিয়ে দেন। মধ্যযুগে মুসলিম আগমনের সেই প্রথম যুগ থেকেই মসজিদ নির্মাণে এক অনন্য বৈশিষ্ট্য গড়ে ওঠে বাংলায়। শাসকশ্রেণির চিন্তাভাবনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের আকাঙ্খারও প্রতিফলন ঘটতে দেখা যায় এসব নির্মাণে।
মুসলিমপ্রধান বাংলায় মসজিদ ইসলামী প্রেরণা ও সকল ধরনের কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু। ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে ইসলামী ঝান্ডাতলে শামিল হয়ে যায় বাংলা। সেই সময় থেকেই মসজিদ নির্মাণের ধারা চলে এসেছে এ জনপদে। গবেষকরা মোটা দাগে সময়টিকে তিনভাগে ভাগ করেছেন-প্রাথমিক ইসলামী কাল, মুঘল আমল এবং ঔপনিবেশিক যুগ। আজ আমরা বাংলায় ঐতিহ্যমন্ডিত কয়েকটি মসজিদের কথা তুলে ধরছি।

ছোট সোনা মসজিদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ
মুসলিম শাসনামলে বাংলায় অনেক নতুন শহর, দুর্গ, বিখ্যাতজনের স্মৃতিবিজড়িত তোরণ, বিজয়স্তম্ভ, মসজিদ, সমাধিসৌধ, সড়ক ও সেতু নির্মিত হয়। তবে এ শাসকরা সবচেয়ে বেশি যা নির্মাণ করেন, তা হচ্ছে মসজিদ আর বিশুদ্ধ পানির জন্য বিশাল পুকুর, দীঘি কিংবা জলাধার। বাংলায় ইসলামের প্রথম যুগে সুলতার হুসেন শাহের আমলে রাজধানী গৌড়ের একটি বিখ্যাত মসজিদ ছোটো সোনা মসজিদ। ১৪৯৩ থেকে ১৫১৯ সালের ভেতর এটি নির্মাণ করেন ওয়ালি মুহাম্মাদ নামে এক ব্যক্তি। আদিতে মাঝখানের সারিতে তিনটি চৌচালাসহ পনেরটি সোনায় মোড়ানো গম্বুজ ছিল এর ছাদে। প্রথমেই নজর কেড়ে নেয় মসজিদটির অসাধারণ অলঙ্করণ আর প্রতিটি দেয়ালের ভেতর এবং বাহির উভয় দিকেই খোদাইকাজ। অলঙ্কৃত পাথরের কারুকাজ দেখলে মনে হবে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পোড়ামাটির কাজ। স্থাপনার মেঝেতে প্রথম দিকে ছিল পুষ্পনকশাখচিত চকচকে সুন্দর টালি। সরু খিলানঅলা একটি পাথরের তোরণ রয়েছে মসজিদের পূর্বদিকে।

বাঘা মসজিদ, রাজশাহী
হুসেন শাহের আমলে আরেকটি চমৎকার স্থাপনা ১৫২৩ সালে সুলতান নুসরাত শাহ নির্মিত বাঘা মসজিদ। উল্টো কাপের আকৃতিতে ছোট দশটি গম্বুজ রয়েছে এর ছাদে। প্রতিটি দেয়ালে বিশেষত মিহরাবের অলঙ্করণেও রয়েছে পোড়ামাটির অপূর্ব কারুকাজ, যাতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বিভিন্ন নকশা, আঙুর আর গোলাপের আবহ।

কুসুম্বা মসজিদ, নওগাঁ
মুসলিম সালতানাতের শেষ দিককার স্থাপত্য-নিদর্শন কুসুম্বা মসজিদ। সুলতান গিয়াসউদ্দিন প্রথম বাহাদুর শাহের আমলে জনৈক সোলায়মান এটি নির্মাণ করেন। আয়তাকার এ মসজিদের ছাদে রয়েছে অর্ধগোলাকৃতি ছয়টি গম্বুজ। ইসলামী শাসনের প্রাথমিক যুগে নির্মিত মসজিদগুলোর মধ্যে মাত্র ছয়টি পাথরনির্মিত মসজিদ টিকে আছে বর্তমানে, কুসুম্বা মসজিদ তাদের অন্যতম। এতে ব্যবহৃত কালো ব্যাসাল্ট পাথরগুলো নদীপথে আমদানি করা হয় রাজমহল এবং বিহারের পাহাড় থেকে। মসজিদের উত্তর-পূর্ব কোনে মজবুত পাথর নির্মিত পিলারের ওপর গড়ে তেলা হয়েছে একটি অলঙ্কৃত গ্যালারি। প্রার্থনাকক্ষের মেঝে থেকে একটি সিঁড়ি উঠে গেছে এই গ্যালারিতে। ধারণা করা হয়, এ গ্যালারিটি ছিল মূলত রাজ্যের সুলতান কিংবা শাসক কিংবা এর নির্মাতাদের জন্য বিশেষভাবে সংরক্ষিত।

ষাট গম্বুজ মসজিদ, বাগেরহাট
বাগেরহাটের খান জাহান ঘরানায় নির্মিত এ মসজিদ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সবচেয়ে মনোগ্রাহী এবং বৃহত্তম ইষ্টক-নির্মিত মসজিদ। এর ছাদের মাঝখানের সারিতে সাতটি চৌচালাসহ রয়েছে ৭৭টি ছোট গম্বুজ। ১৪৪২ সালে শুরু হয়ে মসজিদের নির্মাণ-কাজ শেষ হয় ১৪৫৯ সালে। ইউনেস্কো এটিকে ঘোষণা করেছে ‘বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ এবং ভারতবর্ষের সবচেয়ে নজরকাড়া মুসলিম স্থাপত্য’ হিসেবে। মসজিদের প্রার্থনা-কক্ষের আয়তন ১৬০ ফুট বাই ১৯০ ফুট এবং এর ধারণক্ষমতা একসঙ্গে ২,০০০ লোক। আলো-হাওয়া গমনাগমনের জন্য এর পূর্বদিকে ১১টি এবং উত্তর ও দক্ষিণে সাতটি করে খিলানঅলা দরজা রয়েছে।

শুরা মসজিদ, দিনাজপুর
ইট-পাথরে নির্মিত শুরা মসজিদ মুসলিম সালতানাতের আরেকটি চমৎকার স্থাপত্য-নমুনা। এতে মূল প্রার্থনাকক্ষটি বর্গাকৃতির, যার সামনে পূর্বদিকে আছে একটি করিডোর এবং ছয়টি অষ্টভ‚জাকৃতির টারেট বা খুদে মঞ্চ। তৎকালীন স্থাপত্যের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল এটি। ঢালু হয়ে নেমে গেছে এর কার্নিশ এবং তিনটি মিহরাবসমৃদ্ধ পশ্চিম দেয়ালে আকীর্ণ রয়েছে বিস্তর পোড়ামাটির অলঙ্করণে। এর মূল প্রার্থনাকক্ষের ওপর রয়েছে একটিমাত্র লম্বা পেটমোটা গম্বুজ। এ ছাড়া করিডোর ঘিরে আছে তিনটি ছোট গম্বুজ। গৌড়ের ছোট সোনা মসজিদের মতো এর দেয়ালেও অলঙ্কৃত হয়েছে পাথরের খোদাই কারুকাজ।

গৌড়ের দারাশবাড়ি মসজিদ
ইলিয়াস শাহী আমলের প্রবীণ স্থাপত্যের এক উৎকৃষ্ট নমুনা দারাশবাড়ি মসজিদ। সুলতান ইউসুফ শাহের আমলে ১৪৭০ সালে এর নির্মাণ। বারান্দায় সাতটি খিলানঅলা ফটক দিয়ে ঢুকতে হয় মূল প্রার্থনাকক্ষে। ধারণা করা যায়, এর ছাদের ওপর একগুচ্ছ চৌচালাসহ ছিল সারিবদ্ধ গম্বুজ। বাইরে থেকে সিঁড়ি উঠে গেছে উত্তর-পূর্ব কোনে একটি গ্যালারিতে। ভেতরে পশ্চিম দিকে দেয়ালে উৎকীর্ণ রয়েছে নয়টি মিহরাব। এর গায়ে শিল্পিত হয়েছে পুষ্প ও জ্যামিতি আকারে নজরকাড়া পোড়ামাটির অলঙ্করণ।

গৌড়ের রাজবিবি মসজিদ
একটি মাত্র গম্বুজঅলা বর্গাকৃতির এ মসজিদের গায়ে একটি বারান্দা, যার ছাদে তিনটি ক্ষুদ্রাকৃতির গম্বুজ। এর দেয়ালে উৎকীর্ণ পোড়ামাটির অলঙ্করণ, যাতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ফুলের নকশা। কালো ব্যাসাল্ট নির্মিত পিলারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে গম্বুজ। প্রার্থনাকক্ষের পশ্চিম দেয়ালের শোভা বর্ধন করেছে অলঙ্কৃত কালো পাথরের মিহরাব। স্থাপত্যশৈলী থেকে এটি ১৫ শতকের নির্মাণ বলে মনে করা হয়। স্থাপনার গায়ে কোরানের একটি আয়াত আরবিতে উৎকীর্ণ রয়েছে এখনো। রাজবিবির পরিচিতি সুস্পষ্ট নয়, তবে তিনি রাজকীয় হেরেমের কোনো প্রভাবশালী নারী হয়ে থাকবেন বলেই ধারণা করা হয়।

গৌড়ের ধুনিচক মসজিদ
আয়তাকার এ প্রার্থনাভবনের নির্মাণশৈলীতে ইলিয়াস শাহ আমলের ঘরানা সুস্পষ্ট। এতেও রয়েছে একটিমাত্র গম্বুজ। তিনটি অলঙ্কৃত মিহরাব রয়েছে পশ্চিমের দেয়ালে। প্রতিটি মিহরাবের গায়ে লতানো অলঙ্করণ।

গোয়ালদি মসজিদ, সোনারগাঁও
সুলতান আমলের আরেকটি এক-গম্বুজঅলা মসজিদের নিদর্শন গোয়ালদি মসজিদ। পানাম নগরের আধামাইল উত্তর-পূর্বে এর অবস্থান। সুলতান হুসাইন শাহের আমলে ১৪১৯ সালে হিজাবার আকবর খান এটি নির্মাণ করেন। তিনটি অসাধারণ বক্র মিহরাবসমৃদ্ধ ১৬ বর্গফুট আয়তনের একটি চমৎকার নির্মাণ এ মসজিদ। তিন মিহারবের মাঝখানেরটির গায়ে খোদাই কাজে দেখা যায় ফুলের নকশা। অন্যগুলো নকশা করা হয়েছে পোড়ামাটির অলঙ্করণে। ভেতরে গম্বুজের ভার বহন করে দাঁড়িয়ে আছে পাথরের স্তম্ভ।

চুনাখোলা মসজিদ, বাগেরহাট
শস্যবহুল সমতল জমির প্রেক্ষাপটে ছবির মতো মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে দাঁড়িয়ে আছে চুনাখোলা মসজিদ। সিঙ্গাইর মসজিদের অনুরূপ স্থাপত্যে নির্মিত এবং একইরকম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তীব্র আবহাওয়ার দাপটে।

আবদুল্লাহ আল মামুন
লুসাই পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে কর্ণফুলী নদী বঙ্গোপসাগরের যেখানে মিশেছে, সেই মোহনায় নির্মাণ হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল, যা চট্টগ্রামবাসীর স্বপ্নের ‘কর্ণফুলী টানেল’ হিসেবে পরিচিত। দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে কাজ। ২০২২ সালের পর উন্মুক্ত হবে টানেলের এই স্বর্ণালি দ্বার। ফলে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীর আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলা টানেলের মাধ্যমে মূল নগরের সঙ্গে যুক্ত হবে। চীনের সাংহাইয়ের আদলে গড়ে উঠবে দুই শহরের সমন্বয়ে একটি নগর। ভবিষ্যতে এশিয়ান হাইওয়ে নেটওয়ার্কেও যুক্ত হবে এই টানেল। ঢাকার সঙ্গে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সরাসরি সংযোগ স্থাপন হবে।
এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলের প্রকল্প পরিচালক হারুনুর রশিদ চৌধুরী বলেন, ‘ইতিমধ্যে প্রকল্পের ৩৬ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। নদীর তলদেশে টানেল বোরিং মেশিনের মাধ্যমে ১২০ মিটার খনন করা হয়েছে। এই মেশিনের মাধ্যমে নদীর তলদেশে দুটি টিউব নির্মাণ করা হবে। প্রতিটি টিউবে দুই লেনের সড়ক নির্মাণ করা হবে। আশা করছি, ২০২২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।’
২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে কর্ণফুলী টানেলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সড়ক ও সেতু বিভাগ। প্রকল্পটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশন অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড (সিসিসিসি)। প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় হবে ৩ হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা। চীন সরকার সহায়তা করবে ৫ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা নেভাল একাডেমি থেকে শুরু হয়ে এই টানেল দক্ষিণ চট্টগ্রামের আনোয়ারায় কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি (কাফকো) এবং চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের (সিইউএফএল) মাঝামাঝি প্রান্তে যুক্ত হবে। নদীর তলদেশে টানেলের দৈর্ঘ্য হবে ৩ হাজার ৪০০ মিটার (প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার)। কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে গাড়ি যাওয়ার জন্য একটি এবং আসার জন্য আরেকটি টিউব তৈরি হবে, যা ‘টানেল’ নামে পরিচিত। প্রতিটি টিউবের প্রস্থ হবে ১০ দশমিক ৮ মিটার। দুটি টিউবে গাড়ি চলাচলের জন্য থাকবে দুটি করে লেন। টিউব দুটির ন্যূনতম দূরত্ব থাকবে ১১ মিটার। আর টানেলটি নদীর তলদেশ থেকে সর্বোচ্চ ৩৬ মিটার এবং সর্বনিম্ন ১২ মিটার মাটির গভীরে নির্মিত হবে।
নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ করা হবে টানেল বোরিং মেশিন (টিবিএম) যন্ত্রের মাধ্যমে। মেশিনটি চীন থেকে আনা হয়েছে। এটি নদীর তলদেশে খননের পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সড়কপথও নির্মাণ করবে। মেশিনটি বসানো হয়েছে পতেঙ্গা অংশে। গত ২৪ ফ্রেরুয়ারি টিবিএমের মাধ্যমে মূল টানেল খননের কাজ উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর থেকে ১২০ মিটার খনন করা হয়েছে। এভাবে খনন ও সড়ক তৈরির মাধ্যমে নদীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলে যাবে মেশিনটি। দক্ষ প্রকৌশলীরা সার্বক্ষণিক কম্পিউটারাইজ পদ্ধতিতে মেশিনটি পরিচালনা করছেন। নির্মাণকাজে অংশ নিচ্ছে ১ হাজার থেকে ১২শ’ শ্রমিক।


প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টানেল নির্মাণের মাধ্যমে চট্টগ্রাম নগরে নিরবচ্ছিন্ন ও যুগোপযোগী সড়ক-যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, বিদ্যমান সড়ক-যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন, কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে গড়ে ওঠা শহরের সঙ্গে ডাউন টাউনকে যুক্ত করা এবং উন্নয়নকাজ ত্বরান্বিত করা, চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং গভীর সমুদ্রবন্দরের নির্মাণকাজ ত্বরান্বিত করা ও ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের মধ্যে নতুন একটি সড়ক-যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
টানেল নির্মাণকে কেন্দ্র করে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে বিনিয়োগ শুরু করেছে দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো। বর্তমানে সেখানে আংশিক চালু রয়েছে কোরিয়ান ইপিজেড। পাশাপাশি বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে উঠেছে কিছু শিল্প-কারখানা। টানেল নির্মাণের সঙ্গে সমন্বয় রেখে সরকার আনোয়ারায় একটি ইকোনমিক জোন স্থাপন করছে। পাশাপাশি চীনের বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ ‘চায়না ইকোনমিক জোন’ বাস্তবায়িত হচ্ছে।
২০০৮ সালে চট্টগ্রামে লালদীঘি মাঠের এক জনসভায় কর্ণফুলী টানেল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তখন বিষয়টিকে বাংলাদেশের জন্য অসম্ভব মনে করেছিল অনেকেই। অবশেষে সেই অসম্ভবের টানেল ক্রমে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।

আবদুল্লাহ আল মামুন
মন্দা কাটিয়ে সুদিন ফিরতে শুরু করেছে আবাসন খাতে। কয়েক বছর ধরে অবিক্রীত থাকা ফ্ল্যাটের বিক্রিও বেড়েছে। গত বছর থেকে ব্যাংক ঋণে সুদের হার কমে আসায় ফ্ল্যাট কিনতে আগ্রহী হয়েছিল ক্রেতারা। কিন্তু গৃহ ঋণে ব্যাংক সুদের হার আবারও বেড়ে যাওয়ায় এখন কিছুটা স্থবির হয়ে পড়েছে ফ্ল্যাট-প্লট বিকিকিনি। তবে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগে ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে বাজার পরিস্থিতি। ফলে আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরাও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় আছেন। এ জন্য গ্রাহকদের দীর্ঘ মেয়াদে ও এক অংকের সুদে গৃহ ঋণ, ফ্ল্যাটের নিবন্ধন খরচ কমানো ও বিনা প্রশ্নে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ চান আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা। প্রতিবারের মতো এবারও নগরের তারকা হোটেল রেডিসন ব্লু বে ভিউ চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল চারদিনব্যাপী আবাসন মেলা। এবারের মেলায় বিভিন্ন প্রকল্পের সাত হাজার ফ্ল্যাট ও দেড় হাজার প্লট নিয়ে মেলায় হাজির হয়েছিল ৩৬টি আবাসন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান। এরমধ্যে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান রেডি ফ্ল্যাট হাজির করবে ক্রেতাদের সামনে। এছাড়া এবার পাঁচশ কোটি টাকার বিকিকিনিরও টার্গেট নির্ধারণ করেছে রিহ্যাব।
রিহ্যাব চট্টগ্রাম সুত্র জানায়, মেলায় এবার ৫৬টি প্রতিষ্ঠানের ৭৬টি স্টল ছিল। এরমধ্যে আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৩৬টি, ব্যাংক ও অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান ১১টি ও নির্মাণসামগ্রী প্রতিষ্ঠান থাকবে ৯টি। এছাড়া ১৭টি প্রতিষ্ঠান কো-স্পন্সর হিসেবে মেলায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে রিহ্যাব চট্টগ্রাম অঞ্চলের চেয়ারম্যান আবদুল কৈয়ূম চৌধুরী বলেন, ‘এবারের মেলাকে আমরা বিগত মেলাগুলোর চেয়ে আরও অধিক জাঁকজমকভাবে আয়োজন করেছি। মানুষের অন্যতম মৌলিক চাহিদা বাসস্থান নিশ্চিত করাই রিহ্যাবের মূল লক্ষ্য। মেলার মাধ্যমে রিহ্যাব গ্রাহকদের একই ছাদের নিচে তাদের সাধ ও সাধ্যের মধ্যে পছন্দের ফ্ল্যাট ও প্লট বেছে নেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘২০১৬ সাল থেকে আবাসন খাত আস্তে আস্তে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। ব্যাংক ঋণে সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে আনা গেলে আবাসন খাত আবারো চাঙ্গা হয়ে উঠবে। তবে ফ্ল্যাট বিক্রি আগের চেয়ে বেড়েছে। মানুষের মধ্যে এখনো আস্থার সংকট রয়েছে। আমরা আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি।’
আবাসন খাতের উদ্যোক্তারা জানান, ২০১২ সাল থেকে আবাসন ব্যবসার মন্দার শুরু হয়। ২০১৪ সালের হিসাবে, চট্টগ্রামে রিহ্যাবের সদস্যভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ১০ হাজার ফ্ল্যাটের মধ্যে অবিক্রিত পড়েছিল প্রায় পাঁচহাজার ফ্ল্যাট। সে সময় অভিজ্ঞ-অনভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদের হাতে ছিল এ বাজার। বিশেষ করে মন্দা শুরু হওয়ার পর মৌসুমি ব্যবসায়ীরা গ্রাহকদের প্লট বা ফ্ল্যাট বুঝিয়ে না দিয়ে সটকে পড়েন। মন্দার কারণে বেচাকেনা কমে যাওয়ায় বিনিয়োগ আটকে যায় প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদেরও। তখন থেকে আবাসন খাতে নতুন প্রকল্পের সংখ্যা কমে আসে। চলমান প্রকল্পগুলোয় গ্রাহকের সাড়া কম থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান নির্মাণকাজ শেষ করার সময় পিছিয়ে দেন উদ্যোক্তারা। এসবের ফলে গ্রাহকদের আস্থায় ভাটা পড়ে। সারা দেশের মতো চট্টগ্রামেও ছিল এ অবস্থা। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে ব্যবসায়ীরা গত কয়েক বছরে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণে ঝুঁকে পড়েন। তবে মন্দার ধাক্কায় যেসব প্রতিষ্ঠান বাজারে টিকে ছিল, তারাই এখন গ্রাহকদের আস্থা ধরে রেখেছে। কয়েক বছরের মন্দার পর ২০১৫ সালের জুন মাস থেকে স্থবিরতা কাটতে শুরু করেছে আবাসন খাতে। গত তিন বছরে কয়েক হাজার অবিক্রিত ফ্ল্যাট বিক্রি হয়েছে। ফ্ল্যাটের দামও যৌক্তিক পর্যায়ে নেমে এসেছে। নতুন বিনিয়োগের জন্য এখন জমি খুঁজছেন আবাসন ব্যবসায়ীরা। অবিক্রিত ফ্ল্যাটের বিক্রি বাড়ায় খুশি তারা। তবে ফ্ল্যাট বিক্রির চেয়ে ক্রেতাদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন ও আস্থা অর্জনে জোর দিচ্ছে মেলায় অংশ নেওয়া অধিকাংশ আবাসন প্রতিষ্ঠান।
অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৭ শতাংশ সুদের হার এখন ৯ শতাংশ থেকে সাড়ে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত নেমে এসেছে। মেলায় বিভিন্ন হারে গৃহ ঋণের অফার নিয়ে ১১টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিবে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে মেলায় স্পট ঋণ অনুমোদন দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। চাকরিজীবীদের আয়, ব্যবসায়ীদের ব্যাংক টার্নওভার, ভূমি মালিকদের জায়গার উপর নির্ভর করে বিভিন্ন মেয়াদে ঋণ দিবে বিভিন্ন ব্যাংক ও অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান।

0 598



সোহরাব শান্ত
চারশ’ বছর বয়সী রাজধানী ঢাকা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমৃদ্ধ হয়েছে। আধুনিক অট্টালিকা, প্রশস্ত সড়ক-উড়ালসড়ক, লেক-ঝিল সমৃদ্ধ ঢাকা এখন অনেকটাই জৌলুসপূর্ণ। বিপরীতে পরিবেশ দূষণ ও যানজটে নাকাল এই মহানগরীর পৌনে ২ কোটি নাগরিক। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারের নানা উদ্যোগ সফলতার মুখ দেখেনি। তবে ২০১৯ সালের শুরুর দিকে দায়িত্ব নেওয়া নতুন সরকার সমস্যা সমাধানে কার্যকরী উদ্যোগ নেবে এমন প্রত্যাশা ঢাকার নাগরিকসহ পরিবেশবিদ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের। নতুন বছরে ঢাকার ‘সুস্থতা’ নিশ্চিতকরণে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর পরামর্শ ও কর্মপরিকল্পনাও রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকার প্রধান সমস্যাগুলোর অন্যতম কয়েকটি হলো যানজট, বায়ু ও শব্দদূষণ। এছাড়াও রয়েছে নিরাপদ পানির সরবরাহের অনিশ্চয়তা। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ও আইনের সঠিক প্রয়োগ দরকার।
ঢাকায় পরিবেশ দূষণ ও যানজট নিয়ে যারপরনাই বিরক্ত নাগরিকরা। সাংবাদিক রনি রেজা বলছিলেন, বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ঢাকা। বায়ুদূষণ, ধুলো-বালি-ধোঁয়া, পানি-দূষণ, সুপেয় পানির অপ্রতুলতা, ওয়াসার পানির সরবরাহ-ব্যবস্থা, বোতলজাত পানির নিরাপত্তা, বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা, অপরিচ্ছন্নতা, ডাস্টবিন ব্যবহার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জ্যাম, সড়ক ব্যবস্থাপনা, পার্ক-বিনোদন-খেলাধুলার জায়গা অপ্রতুলতাসহ যতগুলো প্রতিবন্ধকতা রয়েছে; সবগুলোই মনুষ্যসৃষ্ট। নাগরিকের সচেতনতায় এসব রোধ করা সম্ভব। একইরকম মত দিয়েছেন রামপুরার বাসিন্দা গৃহবধূ ফাহিমা আক্তার নূপুর ও শান্তিনগরের বাসিন্দা সরকারি কর্মকর্তা সৈয়দ শাফায়েত মোর্শেদ শুভ।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা ফ্রিল্যান্সিং বিশেষজ্ঞ মো. ইকরাম বলেন, ঢাকার রাস্তাঘাট যেমন অপরিষ্কার, একই সঙ্গে ঢাকার বাতাসও বিষাক্ত। রয়েছে প্রচুর শব্দ দূষণের যন্ত্রণা। কোরবানির বর্জ্য গত কয়েক বছর ধরে সন্ধ্যার আগেই সম্পূর্ণ পরিষ্কার করে প্রশাসন বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা আরেকটু মনোযোগ দিলে ঢাকা শহরকে সবসময়ই পরিচ্ছন্ন রাখতে পারে।
তিনি বলেন, সবুজ ঢাকা গড়ায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের পরিকল্পনা গুরুত্বের সঙ্গে বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
সাংবাদিক গউস রহমান পিয়াল বলেন, যানজট/সড়ক ব্যবস্থাপনায় দরকার দক্ষ আমলা, প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের মতো নেতা, সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
তরুণ সাংবাদিক আব্দুর রাজ্জাক সরকার ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, শহরকে পরিষ্কার রাখতে রাস্তার মোড়ে মোড়ে লাগানো ডাস্টবিন যে শহরের নাগরিকরা নিজেই চুরি করে, সে শহর সমস্যামুক্ত হবে কীভাবে?
ব্যাংক কর্মকর্তা আতিকুর রহমান মানিকের মতে, যানজট সমস্যা দূরীকরণে ট্রাফিকিং ব্যবস্থা আরো জোরদার করতে হবে।
‘গ্রিন সেভার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা পরিবেশকর্মী আহসান রনি বলেন, ঢাকা মহানগরীর অন্যতম সমস্যা ধুলাদূষণ। শুধু মানুষ নয়, গাছগুলোও ভালোভাবে শ্বাস নিতে পারছে না। গাছের পাতাগুলো ধুলার পরতে ঢাকা পড়ে আছে। ফলে একদিকে গাছের পাতাগুলো পর্যাপ্ত কার্বন শুষে নিতে পারছে না, আবার পর্যাপ্ত অক্সিজেনও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, কয়েক বছর ধরেই ঢাকার বাতাসে ক্ষুদ্র বস্তুকণার উপস্থিতি সহনীয় মাত্রার ওপরে রয়েছে। ক্ষতিকর বস্তুকণার এ উপস্থিতি না কমে উল্টো বাড়ছে। ঢাকার বাতাসে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ক্ষুদ্র বস্তুকণা পিএম ২.৫ ও পিএম ১০-এর মাত্রা গত বছরের চেয়ে বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে সালফার ডাই-অক্সাইড ও কার্বন মনোক্সাইডের উপস্থিতিও।
বায়ুর মান পরীক্ষায় নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (সিএএসই/কেস) প্রকল্পের আওতায় ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, রাজশাহী ও বরিশালের আটটি শহরে ১১টি কন্টিনিউয়াস এয়ার মনিটরিং স্টেশন (সিএএমএস) স্থাপন করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর।
বাতাসে যেসব ক্ষতিকর উপাদান আছে, তার মধ্যে মানবদেহের জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর পার্টিকুলেট ম্যাটার (পিএম) ২.৫। ২.৫ মাইক্রোমিটার বা তার চেয়ে কম ব্যাসের অতিক্ষুদ্র এসব বস্তুকণার সহনীয় মাত্রা প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ৬৫ মাইক্রোগ্রাম। যদিও ঢাকার বাতাসে পাওয়া গেছে এর চেয়ে বেশি মাত্রায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বায়ুদূষণের জন্য মূলত দায়ী ইটভাটা ও নির্মাণকাজ। ঢাকা মহানগরীর আশপাশে অনেক এলাকায় ইটভাটা রয়েছে। নির্মাণকাজের সময় নিয়ম না মেনে মাটি, বালুসহ অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী দীর্ঘদিন যত্রতত্র ফেলে রাখা, রাস্তার দু’পাশে ময়লা-আবর্জনা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা, সর্বোপরি যানবাহনের কালো ধোঁয়া বাতাসকে দূষিত করে তোলে। ফলে বাড়ছে সালফার ডাই-অক্সাইড ও কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা।
নীরব ঘাতক শব্দদূষণে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রাজধানীবাসী। এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ঢাকায় শব্দদূষণের মাত্রা তিন থেকে চার গুণেরও বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর ৯০ শতাংশ মানুষ কানে কম শোনে। এর কারণ হচ্ছে, প্রতিনিয়ত উচ্চহারে শব্দ গ্রহণ করা। রাজধানীতে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার বেড়েই চলছে। বাংলাদেশের আইনে পরিষ্কার বলা আছে, হর্নের শব্দ কোনো অবস্থাতেই ৬০ (ষাট) ডেসিমেলের ওপর যেতে পারবে না। হাইড্রোলিক হর্নে ফ্রিকোয়েন্সি ১০০ ডেসিমেল ছাড়িয়ে যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডবিøউএইচও/হু) প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ৬০ ডেসিবেল মাত্রার শব্দ মানুষকে অস্থায়ী বধির এবং ১০০ ডেসিবেল মাত্রার শব্দ মানুষকে স্থায়ীভাবে বধির করে দেয়। অথচ ঢাকা শহরে শব্দের মাত্রা ধারণা করা হয় ৬০-৮০ ডেসিবেল।
চিকিৎসকরা বলছেন, বাতাসে সহনীয় মাত্রার অতিরিক্ত অতিসূ² এ বস্তুকণা স্বল্পমেয়াদে মাথাব্যথা, শ্বাসতন্ত্রের রোগসহ নানা ব্যাধির জন্য দায়ী। এর প্রভাবে দীর্ঘমেয়াদে ফুসফুস ক্যান্সার, কিডনিসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অনেক অঙ্গও ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে মনে করেন তারা। শব্দদূষণ যে কোনো মানুষের জন্য ক্ষতিকর হলেও হর্নের ফলে শিশু এবং গর্ভবতী নারীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের নাক, কান, গলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. রোকন উদ্দিন ভ‚ইয়া বলেন, বায়ুদূষণের জন্য প্রধানত যে ক্ষতি হয়, সেটা হলো মানুষের ক্রনিক লাং ডিজিজ (ফুসফুসের রোগ) হতে পারে। ধোঁয়ার কারণে ফুসফুসে ক্যান্সার হতে পারে। ধুলোবালিজনিত পরিবেশ দূষণের কারণে শিশুদের হাঁপানি ও নিউমোনিয়া হতে পারে। ফুসফুসের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। শব্দদূষণের জন্য মানুষের শ্রবণ ক্ষমতা লোপ পায়। ঢাকার শিশুরা এটার জন্য বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। শ্রবণ ক্ষমতা কমার কারণে শিশুর সঠিক মেধা বিকাশেও সমস্যা হতে পারে।
রাজধানী ঢাকায় ঘণ্টায় গড়ে প্রায় সাত কিলোমিটার গতিতে চলে যানবাহন। যানজটের তীব্রতা বোঝাতে বিদায়ী বছরের মাঝামাঝি বিশ্বব্যাংক আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। রাজধানীর একটি হোটেলে ‘২০৩৫ সাল নাগাদ ঢাকার উন্নয়ন সম্ভাবনা’ নিয়ে দিনব্যাপী ওই সম্মেলন হয়।
এদিকে, বাজারে বেআইনিভাবে বোতলীকরণ খাওয়ার পানির মান নির্ণয় করে চলতি মাসের (জানুয়ারি) ২১ তারিখের মধ্যে প্রতিবেদন দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) পক্ষে সময় আবেদনের শুনানি নিয়ে গত ১৪ জানুয়ারি বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট রিসার্চের প্রফেসর ড. আইনুন নিশাত কারিকা’কে বলেন, সম্প্রতি কাগজ পড়ে জানলাম, যানজট নিরসনে একটা ভ‚গর্ভস্থ সার্কুলার রেলের চিন্তা হচ্ছে। এগুলো অন্তত ১৫-২০ বছর আগে হাতে নেওয়া উচিত ছিল। আমাদের ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানিংয়ে আট-দশটা রুটের কথা বলা আছে। অথচ ঢাকা শহরের ভেতরে যেসব পয়েন্টে রেগুলার জ্যাম আছে, সেখানে আন্ডারপাস অথবা ওভারপাস করা উচিত।
দূষণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাস্তায় ময়লা ফেলাসহ বালু ও অন্যান্য নির্মাণ সামগ্রী রাখা হচ্ছে। একটু পানি ছিটিয়ে দিলেই কিন্তু এই বালু ওড়াটা বন্ধ হয়।
নিরাপদ পানি প্রাপ্তির বিষয়ে আইনুন নিশাত বলেন, পাবলিক হেলথের দায়িত্বে যারা আছে, তাদের কাজ হচ্ছে সাধারণ নাগরিকের স্বার্থ রক্ষা করা। নিরাপদ পানি নিশ্চিতকরণে ওয়াসার পরিদর্শন টিম থাকা উচিত। বিএসটিআই, পরিবেশ অধিদফতরের সার্টিফিকেট থাকা উচিত। ঢাকা সিটি করপোরেশনের খাদ্য নিরাপত্তা টিমকে গতিশীল করা উচিত। বড় বড় জারে করে বিভিন্ন অফিসে যে পানি সরবরাহ করা হয়, তা-ও পরীক্ষা করে মান নিশ্চিত করা উচিত। সরকার এই দায়িত্ব এলজিইডি, ওয়াসা, পাবলিক হেলথ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অথবা সিটি করপোরেশনকে দিতে পারে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান কারিকাকে বলেন, পরিকল্পনায় ঢাকার জন্য পাঁচটা এমআরটি লাইনের কথা বলা আছে। এগুলো হলে যানজট সমস্যা অনেকটাই কমে আসবে। ঢাকা সিটির জন্য কয়েকটা রুট ভাগ করে বাসগুলোকে একেকটা কোম্পানির আওতায় নিয়ে এলে সড়কে বাসগুলোর অসুস্থ প্রতিযোগিতা থাকবে না। ড্রাইভারদের মাসিক বেতনের ভিত্তিতে নিয়োগ দিলেও ভালো ফল আসবে, তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতার মনোভাব থাকবে না। একই সঙ্গে পথচারীরা সড়কের আইন-কানুন মেনে চললে সড়ক শৃঙ্খলা রক্ষা হবে।
শব্দদূষণ প্রসঙ্গে মিজানুর রহমান বলেন, যেখানে হর্ন বাজানো যাবে না, সেখানে সাইন দেওয়া থাকে; যেমন হাসপাতাল ও স্কুল-কলেজের সামনে। তবুও আমাদের দেশে হর্ন বাজানো হয়। এটা নির্ভর করে ড্রাইভারের শিক্ষা, সচেতনতা ও মানসিকতার ওপর। এজন্য তাদের সচেতন করার উদ্যোগ নিতে হবে। হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার বন্ধে আইন আছে। এটার প্রয়োগ করা উচিত।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান কারিকাকে বলেন, বায়ুদূষণ, বন উজাড়, শিল্প, কৃষি জমির সুরক্ষাÑ এই চারটা বিষয় এ বছর প্রাধান্য পাওয়া উচিত। সরকার যত উন্নয়নের কথা বলে তত কিন্তু আমাদের বনের জায়গা চলে যাচ্ছে। পাহাড় চলে যাচ্ছে। নতুন নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপন মানেই কৃষি জমির ওপর আগ্রাসন। সেখানে যেন ভারসাম্য বজায় থাকে, সেটা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, বায়ুদূষণ রোধে একটা আইন করছে সরকার। আমরা সেই আইন প্রণয়নে সরকারকে সাহায্য করছি। একই সঙ্গে আমরা সরকারের সঙ্গে বিকল্প উন্নয়ন উপকরণ; যেমন পুরনো ইটের বদলে বিকল্প হিসেবে কী আনা যায় এসব নিয়েও দর কষাকষি করব।
পরিবেশ অধিদফতরের কেস প্রকল্পের পরিচালক অতিরিক্ত সচিব ড. এসএম মঞ্জুরুল হান্নান খান বলেন, বায়ুদূষণ রোধে সচেতনতা বাড়াতে অনেক কাজই করা হচ্ছে। টিভিতে বিজ্ঞাপন দেওয়া, মিটিং করা, সেমিনার করা, ওয়ার্কশপ করা, এগুলো সবই হচ্ছে। আমরা মাঝে মাঝেই মোবাইল কোর্ট করি। জরিমানা করি। ড্রাইভারদের সঙ্গে আলোচনা সভা করি। আগের তুলনায় সচেতনতা বেড়েছে।
বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আছে জানিয়ে কেস প্রকল্পের পরিচালক বলেন, পরিবেশ দূষণ রোধে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে অনেক বড় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আমরা সিরিয়াসলি এই দায়িত্ব পালন করব। ইটভাটা থেকে ৬০ ভাগ দূষণ হয়। পরিবেশ আইন যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা একাদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিল আকারে উঠবে। বিলটা পাস হয়ে গেলে আমরা পুরনো পদ্ধতির ইটভাটাগুলোকে আর চলতে দেব না।
বায়ু ও শব্দদূষণ রোধে পুরনো গাড়িগুলোর রুট পারমিট না দিতে বিআরটিএকে চিঠি দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গেও সভা করেছি। সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সভা করেছিÑ রাস্তায় যেন সকালে-বিকালে তারা পানি দেয়। এতে ধুলাবালি কম উড়বে।
বায়ুর অবস্থা জানতে পরিবেশ অধিদফতরের ১১টা সিএএমএস স্টেশন আছে জানিয়ে মঞ্জুরুল হান্নান খান বলেন, আরও পাঁচটা স্থায়ী স্টেশন করা হচ্ছে। ১৫টা মোবাইল স্টেশন করা হচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়, যখন কাজ চলে সেখানে বায়ুদূষণ হচ্ছে কিনা, এটা মাপার জন্য। এগুলো চলতি বছরই শুরু করা হবে।
তিনি বলেন, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আলাদা একটা প্রজেক্ট হয়েছিল, আবার নতুন একটা প্রজেক্ট শুরু হবে। নিষিদ্ধ হাইড্রোলিক হর্ন নিয়ন্ত্রণে আমরা মোবাইল কোর্ট করব।
প্রসঙ্গত, একাদশ জাতীয় সংসদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সুরক্ষা’ অংশের একটি পয়েন্টে বলা হয়েছে, ‘উৎপাদনশীল বনের আয়তন ২০১৫ সালের ১৩.১৪ শতাংশ হতে ২০ শতাংশে উন্নীতকরণ; ঢাকা ও অন্য বড় নগরগুলোতে বায়ুর মান উন্নয়ন এবং বিশুদ্ধ বায়ু আইন প্রণয়ন; শিল্প বর্জ্যরে শূন্য নির্গমন/নিক্ষেপণ প্রবর্ধন করা; জলাভ‚মি সংরক্ষণ আইন মেনে বিভিন্ন নগরের জলাভ‚মি পুনরুদ্ধার ও সুরক্ষা করা; উপক‚লরেখাব্যাপী ৫০০ মিটার চওড়া স্থায়ী সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা হবে।’ বিদায়ী বছরের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে আওয়ামী লীগের দেওয়া এই ইশতেহার বাস্তবায়ন হলে ঢাকার বায়ু নির্মল হতে পারে।

0 2599

নিজস্ব প্রতিবেদক

গত ১ অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের বিলবোর্ড উচ্ছেদ অভিযান। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুরু হওয়া এ অভিযানে এ পর্যন্ত ১৭টি বড় এবং ১০টি ছোট বিলবোর্ড উচ্ছেদ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিটি কর্পোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ও বিউটিফিকেশান সেলের প্রধান ক্যাপ্টেন রিপন কুমার সাহা। উচ্ছেদকৃত বিলবোর্ডগুলো ঘটনাস্থলেই নিলামে বিক্রি করা হয়। এতে ডিএনসিসির রাজস্ব খাতে প্রায় তিন লাখ টাকা জমা হয়েছে বলে জানা যায়। ডিএনসিসির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও মেয়রের একান্ত ব্যক্তিগত সচিব শামসুল ইসলাম মেহেদীর নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত বৃহস্পতিবার রাত পৌনে দশটা থেকে শুক্রবার সকাল সাতটা পর্যন্ত অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযান শুরুর ঘন্টাখানেক পর ঘটনা স্থলে যান মেয়র আনিসুল হক। ২৭টি অপসারণের সবগুলিই হয়েছে ঢাকা বিমানবন্দর এলাকায়।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে মেয়র আনিসুল হক এ অভিযানের ঘোষণা দেন। বর্তমানে ডিএনসিসি এলাকার সব বিলবোর্ডই অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

আর্কিটেক্ট বি কে এস ইনান এখন গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ-এর টেকনিক্যাল ডিরেক্টর। তিনি স্থপতি হিসেবে এই অনন্য রিসোর্টকে গড়ে তুলেছেন। কিভাবে গ্র্যান্ড সুলতানের জন্ম হলো? কোথায় এটি আলাদা সে গল্প শোনাচ্ছেন তিনি। লিখেছেন ওমর শাহেদ

1

এতো জায়গা থাকতে গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ কেন শ্রীমঙ্গলে তৈরি করা হলো? এই প্রশ্নটির জবাব খুঁজতে আজ থেকে পাঁচ-সাত বছর আগে আমাদের ফিরে যেতে হবে। শ্রীমঙ্গলে ঘুরতে গিয়েছিলাম। এক ভোরে বেড়িয়ে পড়লাম ক্যামেরা কাঁধে নিয়ে। শখের বশে আমি ছবি তুলি। একটি দৃশ্য খুব ভালো লেগে গেল। ছবিটি তুলে ফেললাম। পরে একদিন ছবিটি দেখালাম গ্র্যান্ড সুলতানের অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা ভাইস চেয়ারম্যান সৈয়দ কামরুজ্জামানকে। অনেকক্ষণ ধরে তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন। বললেন, ‘এটা কোন জায়গা?’ উত্তরে জানালাম, শ্রীমঙ্গল। সকালের সূর্য কেবল উঠছে। পাতার ফাঁক দিয়ে আলো পড়ছে মাটির পথে। সে আলোয় উজ্জ্বল হয়েছে পাতার মধ্যে মাকড়শার জালটি। আলো দেখলেন বেশ খানিকক্ষণ। তারপর বললেন ‘এ তো স্বর্গীয় আলো।’
আর এ নিয়ে কথাবার্তা হয়নি। আমি জানিও না, খাজা টিপু সুলতান এবং তিনি মিলে শ্রীমঙ্গলে ১৫ একর জায়গা চূড়ান্ত করে ফেলেছেন। নিজের কাজ নিয়ে ততদিনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। অনেক দিন পরে ডাক পড়লো। তারা দুজনে মিলে গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ নির্মাণের কাজ শুরু করে দিয়েছেন। আমাকে বললেন, ‘আর্কিটেক্ট হিসেবে আপনি আমাদের এই স্বপ্নের প্রকল্পটির বাস্তবায়ন করবেন। কোনোভাবেই শ্রীমঙ্গলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে নষ্ট করবো না আমরা। বরং একে বহুগুণে বাড়িয়ে তুলব।’

2

শুরু হলো কাজ। একদল নবীন সহকর্মীকে নিয়ে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। রাত-দিন কাজ করেছি। প্রতিটি ইট কোথায় কোনটি বসবে সেটি আমি জানি। সেগুলোকে জায়গা মতো বসানোর ক্ষেত্রে সামান্য শ্রমিক ভাইয়ের অবদান আছে, তেমনি আমাদেরও রক্ত-ঘাম মিশে আছে। রাতের পর রাত দিনের পর দিন তাদের সঙ্গে কাজ করেছি।
সেখানে যে পরিমাণ গাছ ছিল, এখন তার ১০ গুণ গাছ আছে। লেকটি যেখানে আছে, সেটি আসলে গর্ত ছিল। আমরা তাকে সুন্দর করে লেকের আকার দিয়েছি। টিলার কোনো চেহারাই ছিল না। এই টিলাটিকে আজকের চেহারা দেবার পেছনে যে কত মানুষের পরিশ্রম লেগে আছে! যেখানে ভবনটি আছে, সেখানে কোনো গাছই ছিল না। আমরা কোনোভাবেই প্রকৃতিকে ক্ষতিগ্রস্থ করিনি। বরং তাকে শতগুণে বিকশিত করার জন্য যাবতীয় মেধা, শ্রম ঢেলে দিয়েছি। আমাদের এই বিশাল প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কাজ যখন চলছে তখন একদিন ইস্পাহানী গ্রুপের কর্ণধার সালমান ইস্পাহানী এসেছিলেন। তিনি শুনেছেন, এখানে ঢাকা থেকে এসে একদল মানুষ গ্র্যান্ড সুলতান নামের একটি রাজকীয় রিসোর্ট তৈরি করছেন। অনেকক্ষণ মনোযোগ দিয়ে আমাদের কাজ দেখলেন। ঘুরে বেড়ালেন। তারপর বিষ্ময় আর চাপতে না পেরে খাজা টিপু সুলতানকে বলেই ফেললেন, ‘হোয়াট হ্যাভ ইউ ডান?’

6

গ্র্যান্ড সুলতানের প্রতিটি গাছের চারা নিজের হাতে লাগিয়েছেন গ্র্যান্ড সুলতানের চেয়ারম্যান খাজা টিপু সুলতান। মালিদের নিজে বাগান পরিচর্যা করা শিখিয়েছেন। একটি পাঁচ তারকা হোটেলে যা যা আছে তার চেয়ে কোনোভাবেই কোনো কিছু কম নেই আমাদের। বিশাল লেক আছে, ঘোরার ব্যবস্থা আছে। আছে আরাম-আয়েশের সব ব্যবস্থা। বললে তো আর কেউ বিশ্বাস করতে চাইবেন না এখন, প্রতিটি বিছানার বালিশ নিজের হাতে খাজা টিপু সুলতান পরীক্ষা করে দেখেছেন। সেভাবে এমনকি বিছানার চাদরটিতেও তার হাতের পরশ লেগে আছে। ফ্লোরের পাথরের টুকরো থেকে শুরু করে ওয়াল পেপারটিও সবার পরামর্শে তিনি নিজের হাতে কিনেছেন। তিনি নিশ্চিত হতে চেয়েছেন, গ্র্যান্ড সুলতানের সবকিছুই উৎকৃষ্ট মানের হোক। আমরা সে পরীক্ষায় পাশ করেছি কি না সেটি বিচারের ভার ভ্রমণপিয়াসী মানুষদের।
গ্র্যান্ড সুলতানকে নিয়ে অনেক অনেক স্মৃতি আছে। এটি অন্য যে কোনো হোটেল, রিসোর্টের চেয়ে একেবারে আলাদা। বিশাল এক লাইব্রেরি আছে। তাতে গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ড থেকে শুরু করে ইয়োগা, গলফের বই, শিশুদের কার্টুনের বই পর্যন্ত আছে। যখন বই-ব্যবসায়ীরা শুনলেন, রিসোর্টে লাইব্রেরি করা হবে, তারা এত বেশি অবাক এবং খুশি হয়ে গেলেন যে, অবিশ্বাস্য অংকের ছাড় দিয়ে বই বিক্রি করলেন। মাত্র দুদিনে এই বিশাল লাইব্রেরির সব বই কেনা হয়েছে।
এখানে আছে হেলিপ্যাড। গ্র্যান্ড সুলতানের সবকিছুর মতো টোটাল গ্লাস ফিটিংসও কেবল বাংলাদেশেরই নয়, এশিয়ার সেরা। আমরা এখানে সর্বোচ্চ প্রযুক্তির মাধ্যমে সবচেয়ে ভালো উপকরণই ব্যবহার করেছি। আমরা বিভিন্ন দেশের নান্দনিকতা, নানা সংস্কৃতির রূপ-রস এখানে রাখার চেষ্টা করেছি। লিফটে যে কাঠের ডিজাইনটি আছে সেটি পারশিয়ান কালচার থেকে নেওয়া। এই পরিশ্রম আর চেষ্টার একটিই উদ্দেশ্য, গ্র্যান্ড সুলতানকে আমরা যে কোনো সমাজের, বয়সের মানুষের উপযোগী করে তৈরি করতে চেয়েছি। একে আর এখন কেউ রিসোর্ট বলেন না। ভেতরে ঢুকে তার মনে হয়, কোনো বড় হোটেলে ঢুকেছেন। সমাজের যে কোনো অংশের মানুষ তার ছুটিছাটা, বিনোদনের সময়টুকু কাটাতে গ্র্যান্ড সুলতানে আসছেন-এই আমাদের অর্জন। এ অর্জন সেই মানুষটিরও যিনি গ্র্যান্ড সুলতানের আঙ্গিনার, আশেপাশের গাছের পাতা কুড়িয়ে জমা করেন প্রতিদিন।
গ্র্যান্ড সুলতানের মাধ্যমে কেবল পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটেনি, সে এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়নও হয়েছে। এখানে প্রচুর স্থানীয় কর্মী কাজ করেন। তাদের সবার মিলিত চেষ্টাতেই ২০১৪ সালে ‘মোষ্ট লাক্সারিয়াস গলফ রিসোট’ হিসেবে ওয়ার্ল্ড লাক্সারি হোটেল পুরষ্কার পেয়েছে ‘গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ’। আর আমাদের সাফল্য যদি বলতেই হয় তাহলে বলবো, এক কাপ কফি বা চা হাতে যখন কেউ চারপাশটি একা একা ঘুরে দেখেন, তার ভালো লাগে, চেহারায় সেটির ছাপ দেখে, তার কথা শুনে আমরাও ভাবি, এত কষ্ট-পরিশ্রম হয়তো বৃথা যায়নি। যখন কেউ বলেন ফোনের অপর প্রান্তের বন্ধুকে, ‘আমি এসেছি। ভালো লাগছে। তুমিও শ্রীমঙ্গল এসে গ্র্যান্ড সুলতানে ঘুরে যাও’, খুব ভালো লাগে।

ছবি – বি কে এস ইনানের সৌজন্যে

খাজা টিপু সুলতান
চেয়ারম্যান