Home মূল কাগজ সাক্ষাৎকার

মো. শেখ সাদী, চেয়ারম্যান, এশিওর গ্রুপ


কৈশোরের দুরন্ত, চঞ্চল আর মেধাবী ছেলে মো. শেখ সাদী। জন্ম ১৯৭৮ সালে, কুষ্টিয়ায়। শৈশব কেটেছে গ্রামেই। তখন থেকেই কিভাবে মানুষের উন্নয়নে কাজ করা যায় সে স্বপ্ন দেখতেন। মেধাবী ছাত্র হওয়ায় ছিলেন সবার স্নেহভাজন। স্কুলজীবনে এলাকার দানবীর হিসেবে খ্যাত আলাউদ্দিন সাহেবকে দেখে মুগ্ধ হতেন। হতেন অনুপ্রাণিত। সৎ উপায়ে ব্যবসা করার দৃঢ় মানসিকতার শুরু তখন থেকেই। খুব অল্প বয়স থেকেই মো. শেখ সাদী দূরদর্শী, নির্ভীক হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ঢাকা কলেজ থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নেন এমবিএ ডিগ্রি। লেখাপড়া শেষে চাকুরি নয়, চেয়েছেন উদ্যোক্তা হতে। আবাসন খাতের নানা অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনার প্রতি লক্ষ্য রেখেই ২০০৭ সালের ১৯ জানুয়ারি তিনি শুরু করেন এশিউর গ্রুপের প্রথম প্রতিষ্ঠান এশিউর প্রোপার্টিজ লিমিটেড। এই ব্যবসায় ক্রেতা ও জমির মালিক উভয় পক্ষের চরম ভোগান্তির বিষয়ে সচেতন ছিলেন শেখ সাদী। তাই উভয় পক্ষকে সন্তুষ্ট রেখে ব্যবসা করার দৃঢ় চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন তিনি। ব্যবসায়িক জীবনে অক্লান্ত পরিশ্রম, নিষ্ঠা, সততা ও দূরদর্শিতাই ছিল তার শক্তি। প্রতিষ্ঠানের সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, সুন্দর কর্মময় পরিবেশ সৃষ্টি, ক্রেতা ও জমির মালিকের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিপত্রের শর্ত অনুযায়ী যথাসময়ে সকল কার্য সম্পাদন এসব বিষয়ে ছিলেন শুরু থেকেই সতর্ক দৃষ্টি রেখেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সবার সন্তুষ্টি প্রয়োজন। কারণ তাদের সন্তুষ্ট না রাখলে ক্রেতার সন্তুষ্টির ব্যাপারে তারা আন্তরিক হবে না। আর ক্রেতাকে সন্তুষ্ট করতে না পারলে সব চেষ্টাই বৃথা। আর তাই অফিসের কর্মীদের জন্য নিয়মিত কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়। নিজেই সবার সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন। ফলে মালিক-কর্মচারী ভেদাভেদ ভুলে সবার মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। উন্নত হয় কাজের পরিবেশ। গ্রাহকসেবার ক্ষেত্রেও এশিওর প্রোপার্টিজ লিমিটেডের সব কর্মী অত্যন্ত যত্নবান। বর্তমানে এশিউর গ্র“পের তিনটি ডেভেলপার কোম্পানির অধীনে ১২৫টি আবাসিক ও সাতটি বাণিজ্যিক প্রকল্প বিভিন্ন মেয়াদে সহস্রাধিক গ্রাহককে হস্তান্তরের জন্য চলমান রয়েছে।
ইতিমধ্যে ‘আইএসও ৯০০১ : ২০১৫ কিউএমএস সার্টিফিকেট’ অর্জনের মাধ্যমে এশিওর গ্রুপ সুপরিচিত ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় প্রায় ২০০বিঘা জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে হয়েছে ‘এশিওর এগ্রো কমপ্লেক্স’।
ব্যক্তিগত জীবনে স্ত্রী এবং দু’সন্তান নিয়ে সুখী পরিবার মো. শেখ সাদীর। নানা জনউন্নয়নমূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন নিয়মিত।
সাক্ষাৎকার : ফারিয়া মৌ

কারিকা ডেক্স


ইসমাইল ফারুক চৌধুরী (মে. জে. অব.)
নির্বাহী পরিচালক
মিরপুর সিরামিক ওয়ার্কস লিমিটেড ও খাদিম সিরামিক লিমিটেড

স্বাধীনতার পূর্বে কলকারখানা, রাস্তাঘাট, অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এসব দিক দিয়ে এ অঞ্চল ছিল অনেক পিছিয়ে। সেই সময়, পঞ্চাশ দশকের শেষের দিকে বিখ্যাত ব্যবসায়ী তাবানী পরিবারের পক্ষে দুই সহোদর আরিফ ওয়ালী মোহাম্মদ তাবানী ও রশীদ ওয়ালী মোহাম্মদ তাবানী জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের তৈরি মেশিনের সমন্বয়ে বেসরকারিভাবে গড়ে তোলেন মিরপুর সিরামিক ওয়ার্কস লি.। যা এখনো পরিবেশবান্ধব সিরামিক, ইট, ব্লক, ক্লিংকার, পেভার এবং সাধারণ ফ্লোর ও রুফ টাইলস উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে। এছাড়াও উলে­খযোগ্য পণ্যের মধ্যে রয়েছে ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিকস, আর্কিটেকচারাল ওয়াল টাইলস, ফেন্সি স্ক্রিন, পেভার্স টাইলস, রুফ টাইলস ইত্যাদি।

আমরা মনে করি বাজারে টিকতে হলে পণ্যের গুনগত মান, দৃষ্টিনন্দন ডিজাইন এবং ক্রেতাসন্তুটি অর্জন অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহকের চাহিদা পুরণে গবেষণা চালিয়ে নতুন নতুন উদ্ভাবনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিকমানের টাইলস বাজারে নিয়ে আসা প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যেই এগিয়ে চলেছে মিরপুর সিরামিকস।
মিরপুর সিরামিক ওয়ার্কস লিমিটেড রপ্তানি ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য ‘জাতীয় রপ্তানি ট্রফি ১৯৯৬-৯৭’ অর্জন করেছে। দেশে উলে­খযোগ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও আমরা অবদান রেখে চলেছি।
আমাদের ব্রিকস দিয়ে তৈরি হয়েছে বাঙালির বীরত্বগাঁথা স্বাধীনতার প্রতীক শহীদ মিনার, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, জাতীয় সংসদ ভবন ইত্যাদি উলে­খযোগ্য স্থাপনা।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও মিরপুর সিরামিকস ও খাদিম সিরামিকের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারণ এটি ব্যবহারে বারবার রঙ ও প্লাস্টারের বাড়তি খরচ বেঁচে যায়। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদান থেকে তৈরি, তাই একবার ব্যবহার করেই আজীবন প্রকৃত বৈশিষ্ট্য বজায় থাকে।

গ্রাহকের সুবিধার জন্য দেশজুড়ে পণ্য সরবরাহ করতে ডিলার ও নিজস্ব শো-রুমের মাধ্যমে বিক্রয় ও বিতরণ করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেয়া হয়। ফলে দেশের অধিকাংশ গ্রাহকের চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে। এ ছাড়াও বিশেষ করে বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশসমূহে এর চাহিদা ব্যাপক। এক্ষেত্রে সরকারের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি আরো বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশে একমাত্র মিরপুর সিরামিকস দীর্ঘদিন ধরে তৈরি করে আসছে সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব ও অত্যাধুনিক মৈশিনে তৈরি সিরামিক ব্রিকস। আর্কিটেক্ট ও ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদার কারণে এবং সিরামিক শিল্পে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে সিরামিক ব্রিকসের পাশাপাশি আগামী প্রজন্মের সিরামিক টাইলস, যেমন বিভিন্ন ডিজাইনের ওয়াল ও ফ্লোর টাইলস তৈরির পরিকল্পনা আমাদের আছে। এছাড়াও মিরপুর সিরামিকের সহযোগী-প্রতিষ্ঠান খাদিম সিরামিকস দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিকমানের সিরামিক-সামগ্রী তৈরি করছে। সম্প্রপ্তি খাদিম সিরামিক বাজারে নিয়ে এসেছে বিশ্বখ্যাত স্প্যানিশ টাইল্স Diseno ও Europa সিরিজ, যা ঘরের ভিতরে এবং বাইরে ব্যবহার-উপযোগী। এছাড়াও খাদিম সিরামিক তৈরি করছে টাইলস্ ফিটিংয়ে চিরদিনের বন্ধন খাদিম’স টাইল অ্যাডহেসিভ।

কারিকা ডেক্স


এম এম জসিম উদ্দিন
হেড অব অপারেশন, বসুন্ধরা এলপি গ্যাস

বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় একটি শিল্পগ্রুপ বসুন্ধরা। এলপি গ্যাসখাতে আপনাদের বিনিয়োগের পেছনে কী চিন্তা কাজ করেছে?
শুধু এলপি গ্যাস নয়, বাংলাদেশে শিল্পায়নের বহু খাতই আমরা প্রথম শুরু করেছি। বাংলাদেশের সিমেন্ট, কাগজসহ অন্য অনেক শিল্প আগে আমদানি-নির্ভর ছিল। এই আমদানি-নির্ভরতা কাটাতে আমরা এসব শিল্প স্থাপন করি।
এলপি গ্যাসখাতে বাংলাদেশের প্রথম ও সর্ববৃহৎ বেসরকারি বিনিয়োগ বসুন্ধরা এলপি গ্যাস। এর পেছনে কাজ করেছে বসুন্ধরা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান সাহেবের দূরদৃষ্টি। আমরা শুরু করি ১৯৯৯ সালে। বিপিসির পরে আমরাই প্রথম বেসরকারি খাত যারা এলপি গ্যাসে বিনিয়োগ করে। চলতি বছরের শেষে আমরা এখন দ্বিতীয় প্ল্যান্ট শুরু করতে যাচ্ছি। এ প্ল্যান্ট উদ্বোধনের ফলে আমাদের উৎপাদন-ক্ষমতা এখনকার চেয়ে দ্বিগুণে রূপ নেবে।

বর্তমানে বাংলাদেশে এলপি গ্যাসের বাজার কী রকম?
আমাদের এ-খাতে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি আছে ৪০ শতাংশ। আগে উপশহর এলাকায় এলপি গ্যাসের প্রচলন বেশি ছিল। বসুন্ধরাই সর্বপ্রথম ছোট ছোট দোকানে এলপি গ্যাসের প্রচলন শুরু করে। আমরা তাদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছি যে এটি রান্নার অন্যতম অনুসঙ্গ। আমরা তাদের উপযোগী করে সিলিন্ডারে এলপি গ্যাস বিক্রি শুরু করি।
শুধু ব্যবসার জন্য আমরা এ খাতে এগিয়ে আসিনি। আমাদের একটি সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা রয়েছে। কারণ একটি দেশের পরিবেশের স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় রাখার জন্য ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশে আছে মাত্র ৬ শতাংশ। যে কারণে আমাদের গাছ কেটে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ নেই। সরকারও এ-বিষয়ে এখন মনোযোগী হয়েছে।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে, বর্তমানে এলপি গ্যাসের দাম অনেক কমে এসেছে। যদি কেউ লাকড়ি কিনে ব্যবহার করে তাহলে এলপি গ্যাসের চেয়ে বেশি খরচ পড়বে। তাই দিনে দিনে এ-খাতের বাজার বিস্তৃত হচ্ছে। প্রয়োজন বাড়ছে বলেই মানুষ এ গ্যাসের ওপর ঝুঁকে পড়ছে। আগামীতে এ-খাতের বাজার আরো বাড়বে বলে আমি বিশ্বাস করি।

বর্তমানে আবাসিক খাতে গ্যাস-সংযোগ বন্ধ করার ঘোষণা এসেছে। এটি এলপি গ্যাস খাতের ওপর কিভাবে প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন?
আবাসিক খাতে এলপি গ্যাস ব্যবহারের কিছু সুবিধা আছে। আবার অসুবিধাও আছে। কারণ বহুতল ভবনে গ্যাস-সংযোগ দিতে গেলে উঁচু জায়গায় গ্যাস নেয়া একটি চ্যালেঞ্জ। আমরাই সর্বপ্রথম এলপি গ্যাসের ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্ল্যান্ট করেছি। ইতিমধ্যে আমরা রাজউকের প্রকল্প ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনির কয়েকটি প্রকল্পে এ-ধরনের কাজে হাত দিয়েছি। আমরা সিলিন্ডার-ব্যাংক স্থাপন করেছি। এই ব্যাংক থেকে গ্যাস ঘরে ঘরে পৌঁছে যাবে। গ্যাস রিচার্জ করলেই হবে। এর জন্য আমরা ছোট ছোট পাঁচ টনের সিলিন্ডারবাহী ট্যাংকার কিনেছি। আবাসনখাতে এলপি গ্যাস ব্যবহার আমাদের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে বলে আমি মনে করি। এক্ষেত্রে সরকার আমাদের ব্যাপক সহযোগিতা করছে।

এলপি গ্যাসের দাম বেশি এমন একটি অভিযোগ শোনা যায়…
একসময় অন্য জ্বালানির চেয়ে এলপি গ্যাসের দাম বেশি ছিল। বর্তমানে বারো কেজির প্রতি সিলিন্ডার মাত্র ১,০০০ থেকে ১,১০০ টাকায় পাওয়া যায়। আগের চেয়ে সিলিন্ডার-প্রতি প্রায় ৫০০ টাকা কমে গেছে। এখন এটি অনেক সাশ্রয়ী ও ভোক্তাবান্ধব হয়েছে।

এলপি গ্যাসের নিরাপত্তা বিষয়টিও উল্লেখ করতে হয়। এটি বিস্ফোরণের ভয় আছে...
নিরাপত্তার বিষয়টি ভোক্তার ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে। সিলিন্ডারটি যথাযথভাবে সিল করা হয়েছে কিনা সেটি ভালো করে দেখতে হবে। বসুন্ধরার ওপর ভোক্তাদের আস্থা আছে। দেশে সিলিন্ডার টেস্ট করার একমাত্র প্রতিষ্ঠানটি আমাদের। এটি অন্য কোম্পানিও ব্যবহার করে। আমাদের এ কারখানাটি মংলায় অবস্থিত। আমাদের ভোক্তা-গৃহিনিদের প্রতি আমার অনুরোধ, ভালো কোম্পানির সিলিন্ডার ব্যবহার করুন। সিলিন্ডারের সিল-ক্যাপটি যথাযথভাবে আছে কিনা সেটি পরীক্ষা করে দেখবেন। আমরা এক্ষেত্রে হলোগ্রামিক স্টিকার ব্যবহার করি।

এলপি গ্যাস নিয়ে আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
ভবিষ্যতে বেশি পরিমাণ উৎপাদনে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে। এছাড়া আমরা এলপি গ্যাসের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে চাই। বেশি পরিমাণ উৎপাদন করা গেলে দামও কমে আসবে।

বাজেটে সরকারের কাছে কোনো প্রস্তাব রাখছেন আপনারা?
এ খাতের জন্য আমাদের কিছু কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। এসব বিষয়ে শুল্ক কমানোর প্রস্তাব দিয়েছি আমরা। আমরা জানি সরকার এ-খাতের প্রতি মনোযোগী। তাই এলপি গ্যাসকে জনগণের আরো কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য সরকার উদ্যোগী হবে বলে মনে করছি।

সাক্ষাৎকার গ্রহনঃ ফারুক আহমেদ


প্রশ্ন : বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প। আমরা কি এটা তৈরি করতে সক্ষম? রোসাটমের পক্ষ থেকে এ ক্ষেত্রে কী ধরনের সহযোগিতা পাওয়া যাবে?
উত্তর : বাংলাদেশের এরই মধ্যে পারমাণবিক কেন্দ্রে কাজ করার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ, পেশাদার ব্যক্তি রয়েছেন। যদিও আইএইএ বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ সেই দেশগুলোর কাতারে পড়ে, যারা সবে নিজেদের পারমাণবিক বিদ্যুৎশিল্প গড়ে তুলতে শুরু করেছে। এ কারণেই রাশিয়া ও বাংলাদেশের যৌথ লক্ষ্য হলো বিশেষজ্ঞদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে উন্নয়নের উচ্চাকাঙ্খা  রয়েছে বাংলাদেশের এবং এ জন্য দেশটির দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন রয়েছে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র (এনপিপি) নির্মাণে, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সৃষ্টি এবং ব্যয়িত জ্বালানি, তেজস্ক্রিয় বর্জ্যরে ইস্যুগুলোর সমাধান এবং এনপিপির কার্যক্রম স্থগিতসহ দক্ষ কর্মীদের প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অর্জনের ক্ষেত্রে রোসাটম এনপিপি নির্মাণে অভিজ্ঞতা, বিশেষজ্ঞ মতামত ও সার্বিক বিষয়টির যে কোনো ইস্যুতে সমাধানের ব্যাপারে পরামর্শ ও সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।
কার্যত প্রশিক্ষণের বিষয়টি এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। আমরা ইতোমধ্যে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কয়েক বছরের প্রশিক্ষণের জন্য রোসাটমের কোটায় রাশিয়ায় প্রশিক্ষণের আমন্ত্রণ জানিয়েছি। এর আওতায় প্রথম ব্যাচ আগামী বছরই তাদের গ্রাজুয়েশন শেষ করবে।
শিক্ষার্থীদের ন্যাশনাল রিসার্চ নিউক্লিয়ার ইউনিভার্সিটি এমইপিএইচআই ও এর শাখাগুলোয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। প্রথমে তারা রাশিয়ান ভাষায় একটি প্রস্তুতিমূলক কোর্স সম্পন্ন করে এবং তারপর ‘পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র : নকশার কাজ, কার্যকলাপ ও প্রকৌশল’-এ বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ব্রিটিশ কোম্পানি কিউএস-এর করা তালিকায় ২০১৬ সালের জুন মাসে প্রথমবারের মতো ব্রিকস জোটের দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে শীর্ষ ৫০টির মধ্যে উঠে এসেছে এমইপিএইচআই-এর নাম। বর্তমানে ৩০টি দেশের ৯ শতাধিক শিক্ষার্থী এমইপিএইচআই-এ পড়ালেখা করছে।
পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের নকশা ও নির্মাণের পাশাপাশি রোসাটম সমন্বিত কিছু সুযোগও দিচ্ছে, যার মধ্যে পারমাণবিক অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং আইএইএ’র নির্দেশনা অনুযায়ী পরমাণু নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রতিষ্ঠা, স্থানীয় ব্যবসার সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন, জ্বালানি সরবরাহ, পারমাণবিক কেন্দ্রের কার্যক্রম ও রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যয়িত জ্বালানি ব্যবস্থাপনা এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর কর্মসূচি অন্যতম।

প্রশ্ন : নির্মাণে সহায়তা দেবে কে?
উত্তর : রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি হচ্ছে ২০১১ সালের ২ নভেম্বর স্বাক্ষরিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে আন্তঃসরকার সহযোগিতা চুক্তির আওতায়। প্রকল্পটি এএসই গ্রুপ বাস্তবায়ন করছে, যা রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রোসাটমের অধীনস্থ একটি প্রতিষ্ঠান। ২০১৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর এএসই গ্রুপ ভিভিইআর-১২০০ চুল্লিসহ দুই ইউনিটের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্ত্র নির্মাণে সাধারণ চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি রাজধানী ঢাকা থেকে ১৬০ কিলোমিটার দূরে পদ্মা নদীর পূর্ব তীরে তৈরি হচ্ছে।
বিশ্বের পারমাণবিক প্রকৌশল ব্যবসায় এএসই একটি নেতৃস্থানীয় কোম্পানি, বৈশ্বিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ বাজারের ৩০ শতাংশেরও বেশি যার দখলে। বিশ্বের ১৫টি দেশে এর প্রতিনিধি ও সক্রিয় কার্যালয় কার্যক্রমে রয়েছে; বিদেশে প্রকল্পগুলোর ৮০ শতাংশেরও বেশি কোম্পানির অধীনে বাস্তবায়িত হয়েছে।
তার ওপর এএসই তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করে এবং যেকোনো প্রকার জটিল প্রকৌশলগত স্থাপনায় পুরোমাত্রায় ইপিসি, ইপিসি (এম) ও পিএমসি সেবা দিয়ে থাকে। জটিল প্রকৌশলগত স্থাপনা মাল্টি-ডি নির্মাণ প্রকল্পে প্রশাসনের জন্য উদ্ভাবনী ব্যবস্থা তৈরি ও উৎসাহ দিয়ে থাকে এএসই, যাতে করে বাজেট, সময়সীমা ও মানের মতো বিষয়গুলো ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকর প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করা যায়।

প্রশ্ন : কী নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করা হবে?
উত্তর : আমরা মনে করি, বাংলাদেশের সরবরাহকারীদের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরাসরি সংশ্লিষ্ট থাকা উচিত; এতে শুধু ব্যত্যয় ঘটবে উপকরণের ক্ষেত্রে, যার মান হতে হবে রাশিয়ার মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং আইএইএ’র নির্দেশনা অনুযায়ী। উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে সামগ্রী সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হবে।
এ ব্যাপারে এএসই গ্রুপ ও বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি) প্রাক-দরপত্র কনফারেন্সের আয়োজন করা হয়েছে। বাংলাদেশি পণ্য উৎপাদনকারী ও সরবরাহকারীদের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সংশ্লিষ্ট করার লক্ষ্যে এর আয়োজন করা হয়। এই কনফারেন্সের আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে রাশিয়ার পক্ষ থেকে পণ্যের গুণগত মান ও চাহিদাসহ দরপত্র জমাদানকারী ও শর্তাবলি অন্যতম ছিল। মূল নির্মাণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন আগামী সেপ্টেম্বর নাগাদ শুরু হবে।
এই পর্যায়ে এসে নির্মাণ কার্যক্রমে পণ্য সরবরাহকারী ও উপকরণ নির্বাচনসহ বালু, সিমেন্ট, ইস্পাত, নিম্নচাপের পাইপলাইন ও গোলাকৃতির ধাতব পণ্য নির্বাচন প্রয়োজন।

প্রশ্ন : মান নিয়ন্ত্রণ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?
উত্তর : বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রতিটা দশাই আইএইএ ও জাতীয় নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিএইআরএ-এর মাধ্যমে যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। ২০১৬ সালের ২১ জুন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ (বিএইআরএ) রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণস্থলে প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম শুরুর জন্য বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনকে (বিএইসি) লাইসেন্স ইস্যু করে। নির্মাণ এলাকায় ৬৩টি পর্যবেক্ষণ, যার মধ্যে মাটি, বায়ু ও ভূকম্পন-সংক্রান্ত পর্যালোচনাসহ পরিবেশের ওপর এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রভাব বিচার করেই ওই লাইসেন্স ইস্যু করা হয়। একই সময়ে বিএইআরএ বাছাইকৃত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্পেরও অনুমোদন দেয়।

প্রশ্ন : বাংলাদেশে পারমাণবিক চুল্লি ও অন্যান্য উপকরণ সরবরাহের পদ্ধতি কী হবে?
উত্তর : ভারী এবং/অথবা বড় আয়তনের উপকরণের প্রতিটা সরবরাহই একটা করে বিশেষ কারিগরি কার্যক্রম। এএসই বিশেষজ্ঞরা এই সরবরাহের বিভিন্ন উপায় নিয়ে বিচার-বিবেচনা করেছেন। নদীপথে উপকরণ সরবরাহকেই আমরা সবচেয়ে অনুকূল বলে বিবেচনা করেছি। সেন্ট পিটার্সবার্গে মহাসাগরগামী জাহাজে চুল্লি তোলা হবে, যা মোংলা বন্দরে খালাস করা হবে। সেখান থেকে নদীপথে নৌকায় করে নির্মাণস্থলে নিয়ে যাওয়া হবে। পণ্য খালাসের জন্য রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণস্থলে একটি বিশেষ জেটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

প্রশ্ন : নতুন এই প্রযুক্তিতে কীভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে?
উত্তর : রাশিয়ার পরিকল্পনায় নির্মিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় হালকা পানির ভিভিইআর-টাইপ চুল্লি, নিম্নচাপে সাধারণ পানির চুল্লি ব্যবহার হয়ে থাকে। ফিনল্যান্ড, বেলারুশ এবং অন্য দেশগুলোয় ভিভিইআর-টাইপ চুল্লির পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়নের বিভিন্ন দশায় রয়েছে। এ ধরনের চুল্লিতে নিউট্রন উৎপাদক এবং চুল্লি ঠান্ডা করা উভয় কাজেই পানির ব্যবহার হয়।
বিশ্বজুড়ে ভিভিইআর-টাইপ চুল্লি সবচেয়ে নিরাপদ বলে বিবেচিত এবং রাশিয়ার পারমাণবিক শিল্পের উন্নয়ন কর্মসূচির ভিত্তিতে তৈরি করা হয়। পঞ্চাশ বছরের কার্যক্রমে ভিভিইআর-টাইপ চুল্লির (ভিভিইআর-৪৪০, ভিভিইআর-১০০০) পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য এবং আন্তর্জাতিক বিদ্যুতের বাজারে প্রতিযোগিতামূলক বলে প্রমাণিত হয়েছে, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র শিল্পে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করেছে এবং এর ক্রমাগত উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উপস্থাপন করেছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের শক্তি উৎপাদন ইউনিটটি হবে ভিভিইআর-১২০০ চুল্লি ভিত্তিক, যা তৃতীয় (থ্রি-প্লাস) প্রজন্মের প্রযুক্তি। নতুন প্রযুক্তির এই ইউনিটগুলোয় কারিগরি ও আর্থিক সূচকগুলোর উন্নতি সাধিত হয়েছে, যাতে করে পুরোপুরি নিরাপদ কার্যক্রম এবং ফুকুশিমা পরবর্তী আইএইএ-এর মান পুরোপুরি নিশ্চিত হয়েছে। ভিভিইআর-১২০০ রাশিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী চুল্লি এবং এর তিনটি বিশেষ সুবিধা রয়েছে : উচ্চ কার্যকারিতা, টেকসই এবং নিরাপদ। ভিভিইআর-১২০০-এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যা টর্নেডো, হারিকেন, ভূমিকম্প, বিমান দুর্ঘটনাসহ বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ আঘাতে সর্বোচ্চ বাধার সৃষ্টি করে।
পরোক্ষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তি সরবরাহ পুরোপুরি বিঘ্নিত হলেও কাজ করতে সক্ষম, কার্যকর ব্যবস্থা অথবা অপারেটরের হস্তক্ষেপ ছাড়াই এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুরো নিরাপত্তা দিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যদি অন্য সব শক্তি সরবরাহের উৎস বিকল হয়ে পড়ে, তাহলে পরোক্ষ তাপ অপসারণ ব্যবস্থা (পিএইচআরএস) চুল্লির কেন্দ্র থেকে দীর্ঘমেয়াদে তাপ অপসারণ নিশ্চিত করে। দুর্ঘটনার সময় মূল দ্রবীভূতকারী ডিভাইস (সিএমএলডি) বা ‘কোর ক্যাচার’ কেন্দ্রের গলিত উপকরণগুলোকে থান্ডা করবে। এই ডিভাইস প্রতিরক্ষামূলক শেলের অখন্ডতা নিশ্চিত করে এবং এতে করে ব্যাপক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেও পরিবেশে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ছড়িয়ে পড়া রহিত হয়।

প্রশ্ন : পরিবেশের ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে?
উত্তর : দিনে দিনে কার্বন ডাই-অক্সাইডের নিঃসরণ বাড়ছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন শিল্প এর অন্যতম উৎস। তারপরও আমাদের ভবিষ্যতের ওপর বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সঠিক পছন্দের সরাসরি প্রভাব থাকবে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার তথ্য অনুসারে, বর্তমানে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে ৩৮ শতাংশ ‘সবুজ’ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে এবং এই প্রেক্ষাপটে মানবজাতির ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার হিসাব মতে, ৪৫ বছরের কার্যক্রমে বিশ্বের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ৫৬ গিগাটন কার্বন ডাই-অক্সাইডের নিঃসরণ এড়াতে পেরেছে। বর্তমান হারের বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই পরিমাণ বিশ্বজুড়ে দুই বছরের নিঃসরণের সমপরিমাণ। রাশিয়া ও বিদেশে নির্মিত রাশিয়ার নকশা করা সব পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এই হিসাবে অন্তুর্ভুক্ত করে দেখা গেছে, ২০৩০ সাল নাগাদ বার্ষিক কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের পরিমাণ ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন টন প্রতিরোধ সম্ভব, যা বিশ্বের গাড়ি খাতের বার্ষিক নিঃসরণের ৮০ শতাংশ। রূপকার্থে বলতে গেলে, আমাদের বিশুদ্ধ বায়ু সেবনের সুযোগ করে দিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ‘পৃথিবীর ফুসফুসে’ পরিণত হতে পারে।

সাক্ষাতকার গ্রহনঃ সাইফুল ইসলাম


আপনি টানা ষষ্ঠবারের মতো সিডিএ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেয়েছেন। এতবার তো এর আগে কেউ দায়িত্ব পায়নি..
২০০৯ সালের এপ্রিলে চউক (সিডিএ) চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দেওয়ার পর থেকে আমার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ষষ্ঠবারের মতো সিডিএ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশে এটি একটি ইতিহাস। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার আমার কাজে সন্তুষ্ট হয়েই আমাকে এই দায়িত্ব দিয়েছেন।
চউক (সিডিএ) প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর প্রথমবার কোনো রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমি নিয়োগ পেয়েছি। আমার মেয়াদকালে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের অনুমোদন নিয়েছি। ৬ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ শেষ করেছি। প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ চলমান আছে। দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে চট্টগ্রাম উন্নয়নের পালে ধীরগতির যে হাওয়া ছিল আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর তা ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। আমি দেখিয়ে দিয়েছি সততা, আন্তরিকতা আর মানুষের প্রতি ভালোবাসা থাকলে সত্যিকার অর্থেই উন্নয়ন সম্ভব। সমৃদ্ধ মালয়েশিয়ার রূপকার মাহাথির মোহাম্মদকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম What is the reason behind the development of Malaysia ? উনি দুটি শব্দ আমাকে বলেছিলেন Opportunity and the honesty । আমি আন্তরিকতা দিয়ে মানুষের পাশে থাকা এবং মানুষের কল্যাণে নিবেদিত হওয়ার চেষ্টা করেছি। আমার মেয়াদকালে অবকাঠামো উন্ন্য়ন, শিক্ষার উন্ন্য়ন, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন তথা বহুমুখী ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। চট্টগ্রামের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ আর চট্টগ্রামবাসীর সহযোগিতা ও সমর্থন আমাকে কর্ম সম্পাদনে দুঃসাহসী করে তুলেছে।
আগামী দুই বছরের মেয়াদকলে আপনার কর্মপরিকল্পনা কী?
বিপুলাকৃতির অনেকগুলো প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। এর মধ্যে রয়েছে জলাবদ্ধতা দূর, যানজট নিরসন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন,পর্যটনশিল্পের বিকাশ ও বন্দরকে অগ্রাধিকার দেওয়া। আগামী পাঁচ বছরে বন্দরের কর্মকান্ড- দ্বিগুণের চেয়েও বেশি হবে। এতে অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিষয়টি চউক (সিডিএ) অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করেছে। সে জন্য প্রায় ২ হাজার ৫শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে পতেঙ্গা বিচ থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত ১৭ কিমি বেড়িবাঁধ হচ্ছে। বেড়িবাঁধ হওয়ার ফলে জলোচ্ছ্বাস থেকে শহর রক্ষা পাবে। বাইপাসের মাধ্যমে যানজট নিরসন হবে, পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঘটবে এবং কর্ণফুলী টানেলের অ্যাপ্রোচ রোড হিসেবে ব্যবহার হবে। আগামী তিন বছরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হলে নগরবাসী এর সুফল ভোগ করবে। অন্যদিকে আগামী তিন বছরের মধ্যে পতেঙ্গায় সাগরপাড়ে বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। উত্তর ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের যানবাহন শহরের ভেতর দিয়ে যাতায়াত করে। ফলে শহরের ভেতর যানজট লেগেই থাকে। তাই নগরবাসীকে ভোগান্তির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ৩২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ফৌজদারহাট থেকে বায়েজিদ পর্যন্ত ৬ কিমি বাইপাস রোড নির্মাণ হচ্ছে।
লালখানবাজার থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত প্রায় ১৮ কিমি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ আগামী দুই বছরের মধ্যে শুরু হবে। এতে বন্দর ও ইপিজেড এলাকার মানুষ যানজটমুক্ত হবেন।
চট্টগ্রাম নগরীর সবচেয়ে অবহেলিত এরিয়া হচ্ছে বাকলিয়া। উন্নয়নের ছোঁয়া তেমন লাগেনি। ২০৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬ লেনের বাকলিয়া এক্সেস রোড তৈরি করা হবে। এতে নগরীর বাকলিয়া এলাকার বিশাল অংশ উন্নয়নের আওতায় আসবে।
প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম নগরের কালুরঘাট সেতু থেকে চাক্তাই খাল পর্যন্ত কর্ণফুলী নদীর তীরে সাড়ে ৮ কিমি ৪ লেনবিশিষ্ট সড়কসহ বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হবে। একই সঙ্গে জলাবদ্ধতার পানি নিষ্কাশনের জন্য কর্ণফুলী নদীর সঙ্গে যুক্ত ১২টি খালের মুখে পাম্প হাউস ও জোয়ারের অতিরিক্ত পানি ঠেকানোর জন্য প্রতিরোধক গেট স্থাপন করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে নগরীর চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ এলাকা জলাবদ্ধতার সীমাহীন দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাবে।
 বর্তমানে সারাবিশ্বে বিরাজ করছে আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব। ওই প্রভাব মোকাবেলা করার জন্য পরিবেশবান্ধব স্থাপনা নির্মাণে ভবন মালিকদের প্রতি আপনাদের দিকনির্দেশনা আছে কী?
আবহাওয়ার পরির্বতন বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। সে জন্য চাক্তাই খাল থেকে কালুরঘাট সেতু পর্যন্ত বেড়িবাঁধ ও পতেঙ্গা থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত বেড়িবাঁধ নির্মাণ করছি শহরকে জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করার জন্য। পাশাপাশি দুটি বেড়িবাঁধে আমরা ১ লাখ গাছের চারা রোপণ করব, যা পরিবেশ তথা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করবে। অন্যদিকে ভবন নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮ অনুযায়ী ভবন নির্মাণ করতে সবাই বাধ্য।  সেখানে বাগান হবে, গাছ লাগানো হবে, মোট কথা সবুজ থাকবে। এক্ষেত্রে যারা নিয়মের ব্যত্যয় ঘটাবে তাদের ক্ষেত্রে আমরা অত্যন্ত কঠোর আচরণ করতে বাধ্য হব। আমরা চাই প্রতিটি ভবনের বাসিন্দারা সবুজের মধ্যে বসবাস করুক। এর সঙ্গে সংযুক্ত আছে সুয়ারেজ সিস্টেম ডেভেলপ করা। এতে করে বর্জ্য সরাসরি নদীতে বা নালাতে পড়ে পরিবেশ দূষণ করবে না।
 জলজট, জলাবদ্ধতা ও যানজটমুক্ত চট্টগ্রাম নগরীকে নান্দনিকভাবে গড়ে তুলতে সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি আপনার করণীয় কী?
জলাবদ্ধতা নিরসনে মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন। কর্ণফুলীতে ড্রেসিংয়ের প্রয়োজন হবে। বিদ্যমান খাল খনন, খাল সম্প্রসারণ এবং নতুন খাল উন্নতকরণ করতে হবে। তবে এ কাজগুলো কে করবে তা নির্ধারণ করবে সরকার। সরকার যদি চায় তাহলে সিডিএ করবে। চউকের (সিডিএ) চলমান প্রকল্প মুরাদপুর থেকে লালখানবাজার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, লালখানবাজার থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, চাক্তাই খাল থেকে কালুরঘাট সেতু পর্যন্ত বেড়িবাঁধ, ফৌজদারহাট থেকে পতেঙ্গা বাইপাস, বাকলিয়া এক্সেস রোড, ফৌজদারহাট থেকে বায়েজিদ লিংক রোড প্রকল্পের কাজগুলো সম্পন্ন হলে বর্তমানে নগরীর যে বহুদিনের পুরনো সমস্যা জলবদ্ধতা ও যানজট, সেটা পুরোপুরি নিরূপণ হবে।

ড. মোহাম্মদ শৌকত আকবর।সিইও ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।

সাক্ষাৎকার গ্রহনঃ মুজাহিরুল হক রুমেন


প্রশ্ন : সর্বশেষ কাজের অগ্রগতি অনুযায়ী রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কবে নাগাদ জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে?
উত্তর : রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্যে রাশিয়ান ফেডারেশনের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের মধ্যে সম্পাদিত জেনারেল কন্ট্রাক্ট মোতাবেক প্রতিটি ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন ২টি ভিভিআর-১২০০ টাইপ রিঅ্যাক্টর (১২০০দ্ধ২ = ২৪০০ মেগাওয়াট) নির্মাণ করা হবে। চুক্তির শর্ত মোতাবেক দুটি ইউনিটের মধ্যে প্রথম ইউনিটটি ২০২২ সালের অক্টোবরে কমিশনিং হবে এবং জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে। এই ইফনিটটি অক্টোবর ২০২৩-এ প্রভিশনাল টেকওভার করা হবে। একইভাবে ১ বছর পর দ্বিতীয় ইউনিটটির কমিশনিং, পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু এবং প্রভিশনাল টেকওভার করা হবে।

প্রশ্ন : ভূমিকম্পসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও কারিগরি দুর্ঘটনা মোকাবেলায় কী কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কেন্দ্রটি স্থাপনে?
উত্তর : পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে ভূমিকম্পসহ সব প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং কারিগরি দুর্ঘটনা ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া অপরিহার্য। পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের স্থান নির্বাচনের সময়েই প্রস্তাবিত স্থানটির মাটির অবস্থা, ভূতাত্ত্বিক ও হাইড্রোলজিক্যাল বৈশিষ্ট্য, বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকালে কিংবা কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনকালে সাইটের মাটির সম্ভাব্য পরিবর্তন, ভূত্বকের ওপরের অংশে সৃষ্ট গহ্বর, ভূমিক্ষয়, ভূমিকম্প, বন্যা, সাইক্লোন, টর্নেডো, বর্জ্রপাতসহ সব ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং মনুষ্য সৃষ্ট দুর্ঘটনা সংক্রান্ত ঝুঁকির বিষয়াদি বিচার-বিশ্লেষণ করে সাইট নির্ধারণ করা হয়। সাইটের নিরাপত্তা সংক্রান্ত কারিগরি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে IAEA-এর গাইডলাইন, দেশীয় এতদসংক্রান্ত আইনি ও কারিগরি বাধ্যবাধকতা এবং প্রযুক্তি সরবরাহকারী দেশের এতদ্সংক্রান্ত আইনি ও কারিগরি বাধ্যবাধকতা অনুসরণ করে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাইট মূল্যায়ন করে সাইটের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হয়।
এছাড়াও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বড় ধরনের ঝুঁকি মূল্যায়নের জন্য আন্তর্জাতিক এটেস্টেশন প্রক্রিয়ায়, পদ্ধতিগত ইউনিফিকেশন নিশ্চিত করতে বিশেষ ধরনের কম্পিউটার কোডগুলোর মাধ্যমে সম্ভাব্য নিরাপত্তা বিশ্লেষণ (PSA)-এর মাধ্যমে সাইট চূড়ান্ত করা হয়। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য লাইসেন্স প্রাপ্তির ক্ষেত্রে উপরোল্লিখিত সব সমীক্ষা ও সাইট সেফটি স্টাডির আলোকে সাইট সেফটি রিপোর্ট প্রণয়ন অত্যাবশ্যক। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও কারিগরি দুর্ঘটনা মোকাবেলায় জরুরি প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা সম্পর্কিত বিস্তারিত প্রতিবেদন ও প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা সম্পর্কিত তথ্যাবলি উপস্থাপন করা বাধ্যতামূলক।
বাংলাদেশ সরকার পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাইট নির্বাচনের ক্ষেত্রে Safety First এই মূলনীতি গ্রহণ করেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের সাইট নির্বাচন করেছে। সাইটের নিরাপত্তা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে উপরোল্লিখিত যাবতীয় আন্তর্জাতিক কারিগরি ও আইনি বিষয়াদি যথাযথভাবে অনুসরণ, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের গাইডলাইন ও আইনি বাধ্যবাধকতা যথাযথভাবে পালন, ফুকুশিমা-১ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুর্ঘটনা হতে অর্জিত শিক্ষাসহ ফুকুশিমা দুর্ঘটনার অব্যবহিত পরে IAEA Preparatory  Mission  কর্তৃক Rooppur NPP এলাকা মূল্যায়ন সংক্রান্ত  Geotechnical aspects and Geomorphology, Hydrolologycal Hazards and river morphology সুপারিশমালা বিবেচনা করে রাশান ফেডারেশনের এনপিপি ডিজাইন ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের সাইট নিরাপত্তা বিশ্লেষণ, ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভে এবং পরিবেশগত সমীক্ষা সম্পাদন করা হয়েছে এবং প্রকল্প এলাকাটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য একটি নিরাপদ স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
প্রযুক্তি নির্বাচনের ক্ষেত্রে রুশ নির্মিত সর্বাধুনিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নভোভরনেঝ-২-কে রূপপুর এনপিপি-এর রেফারেন্স প্লান্ট হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে। উল্লিখিত রেফারেন্স প্লান্টের আদলে আরও অধিকতর সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ডিজাইনে সব ধরনের প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা (ভূমিকম্প, বন্যা, ম্যাট্রলোজিক্যাল ইভেন্ট, ইত্যাদি) এবং মনুষ্যসৃষ্ট দুর্ঘটনা যেমন- অগ্নিসংযোগ, বিমান বিধ্বস্ততা এবং টেররিস্ট অ্যাটাকসহ সব ধরনের কারিগরি দুর্ঘটনা মোকাবেলায় সক্ষম রিঅ্যাক্টর নকশা প্রণয়ন করা হয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নকশা এমনভাবেই প্রণয়ন করা হচ্ছে যে, যেকোনো পরিস্থিতিতে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সক্ষমতার সঙ্গে নিরাপদে পরিচালনা করা সম্ভব হবে এবং রিঅ্যাক্টর কনটেনমেন্টের বাইরে তেজস্ক্রিয়তা না ছড়ানোর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
এসব ব্যবস্থার ফলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার সম্ভাবনা প্রচলিত অন্যান্য পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চেয়ে ১০ গুণ কমে গেছে। এভাবে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা এতটাই কমে এসেছে যেগুলো মানুষ বাস্তবিক কাজকর্মে ধর্তব্যের মধ্যেই বিবেচনা করে না।
উল্লেখ্য, প্রকল্পের পারমাণবিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মনুষ্যসৃষ্টসহ সব ধরনের কারিগরি দুর্ঘটনা মোকাবেলার সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাইট লাইসেন্স প্রদান করেছে।

প্রশ্ন : এর কাঁচামাল (ইউরোনিয়াম) আসছে কোত্থেকে, কাঁচামালের দাম নির্ধারণ করছেন কীভাবে?
উত্তর : এক্ষেত্রে আমার মনে হয় কাঁচামাল শব্দটি যথার্থ নয়, তবে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনের জন্য ‘পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি’ (Nuclear Fuel) প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। বাংলাদেশ সরকার ও রাশান ফেডারেশনের মধ্যে স্বাক্ষরিত আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তি (IGA) অনুযায়ী রাশিয়ান ফেডারেশন বাংলাদেশের চাহিদা মোতাবেক কেন্দ্রের আয়ুষ্কালব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ করবে। এ ধরনের জ্বালানি ক্রয়ে আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী মাইনিং, মিলিং, এনরিচমেন্ট, ফুয়েল ফেব্রিকেশন, ফুয়েল ট্রান্সপোর্টেশন ইত্যাদি সংক্রান্ত ব্যয় এবং ক্রমপুঞ্জিত বর্ষের আন্তর্জাতিক বাজার দর যাচাই করে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানির দাম নির্ধারণ করা হয়। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে স্বাক্ষরিত General Contrac-এ কেন্দ্রটি পরিচালনার প্রথম দিককার কয়েক বছরের জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। উল্লেখ্য, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে এক কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি বাবদ যে ব্যয় হয় তা প্রচলিত অন্যান্য তাপ-বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তুলনায় অনেক কম।
প্রশ্ন : যেহেতু এই কেন্দ্রটিই হবে দেশের প্রথম পারমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র, এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব কি রাশিয়ার হাতেই থাকবে?
উত্তর : প্রশ্নটির যথার্থতা নিয়ে আমার মনে সংশয় রয়েছে। আমাদেরকে একটি বিষয় স্মরণ রাখতে হবে, প্রকল্পটি এডিপি প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়নাধীন বাংলাদেশ সরকারের একটি ফাস্টট্রেক প্রকল্প। আন্তর্জাতিক বিধি-বিধান এবং জাতীয় আইন অনুযায়ী কেন্দ্রের মালিক/অপারেটর হিসেবে বাংলাদেশ পক্ষকে নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ হতে কেন্দ্র পরিচালনার সক্ষমতা অর্জনপূর্বক অপারেশন লাইসেন্স গ্রহণ করতে হবে। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তির অধীনে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করবে পাশাপাশি কেন্দ্রের কমিশনিং পর্যায় হতে কেন্দ্রটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য যাবতীয় জনবলের প্রশিক্ষণ প্রদান করবে। এটি একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃত মানবসম্পদ উন্নয়ন রীতি। উপরোক্ত আলোচনায় এ বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে যে, প্রথম পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের অধীনে প্রতিষ্ঠিত নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের। চলতি বছর থেকেই General Contrac-এর অধীনে কোম্পানির জনবলের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। আশা করি এ পদ্ধতি বাংলাদেশের এই ক্ষেত্রে শতভাগ সফল হবে। তবে আপনি ঠিকই বলেছেন, বাংলাদেশে প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনকারী দেশ হিসেবে জনগণকে প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায় বাংলাদেশ সরকারের ‘Safety First, Quality First’  নীতি অনুযায়ী দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রাথমিক পর্যায়ে রাশান বিশেষজ্ঞদের কারিগরি সহায়তা নেওয়া হবে।

প্রশ্ন : বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিচালনায় রাষ্ট্রের দক্ষতা তৈরিতে কী কী পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর দায়িত্ব বাংলাদেশের হাতে কীভাবে আসবে, কত সময় লাগবে?
উত্তর : রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য জাতীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় Nuclear Infrastructure প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে IAEA-এর Milestones guide অনুসরণ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ এবং Infrastructure প্রতিষ্ঠার অগ্রগতি মনিটরিংয়ের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি জাতীয় কমিটি, মাননীয় মন্ত্রী, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে কারিগরি কমিটি এবং সচিব, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ কাজ করছে। রাষ্ট্রের দক্ষতা তৈরির উদ্দেশ্যে একাধিক আইন প্রণয়ন করা হয়েছে এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পারমাণবিক নিরাপত্তা ও তেজস্ক্রিয় বিকিরণ নিয়ন্ত্রণ বিষয়াদি তদারকির জন্য বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিরাপদে পরিচালনার জন্য নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। উল্লিখিত দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় মানব সম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। দেশে প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল গড়ে তোলার লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং এমআইএসটি-তে নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট চালু করেছে। এসব ডিপার্টমেন্টে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষাথী অধ্যয়ন শুরু করেছে। এছাড়া রাশান ফেডারেশনের MEPHI-তে প্রতিবছর প্রায় ২০ জন করে শিক্ষার্থী প্রেরণ করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৫০ জন অধ্যয়নরত রয়েছে এবং চলতি বছর আরও ২০ জন শিক্ষার্থী প্রেরণ করা হবে। ভবিষ্যতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দক্ষ জনবল গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রকল্প এলাকায় একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ট্রেনিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। এ ইনস্টিটিউটের প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্রশিক্ষকের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা ঠিকাদারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। চলতি বছর থেকে ইনস্টিটিউটের প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হবে। এছাড়া প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের অন্যান্য গবেষণাগারে কর্মরত বিজ্ঞানী/প্রকৌশলীদেরকে ভারত সরকারের সহায়তায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৯০ জন পারমাণবিক প্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে। এছাড়াও রাষ্ট্রের দক্ষতা তৈরিতে IAEA-এর কারিগরি সহযোগিতার আওতায় মানব সম্পদ উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান আছে।

সাবরিনা মিলি


কারিকা : মেহের আফরোজ শাওন এই নামটা বিনোদন জাগতের সেলিব্রেটি হিসেবেই জানা, আড়ালে তিনি একজন স্থপতিও, কিন্তু সেদিকে কেন গেলেন না?
মেহের আফরোজ শাওন : একটা মানুষের যখন অনেকগুলো ফেস বা অংশ থাকে, তখন একটা পর্যায়ে গিয়ে তাকে বাছাই করতে হয় কোন দিকটা নিয়ে সে সামনের দিকে এগোবে। কিছু থাকে পছন্দের জায়গা। আর কিছু ক্ষেত্রে মানুষ তার কাছে কিছু প্রত্যাশা করে। এখন আমি হয়তো পছন্দ করছি না, কিন্তু আমার দর্শক বা শুভাকাক্সক্ষী যারা আছে তাদের হয়তো একধরনের পছন্দ। তো দুটের মধ্যে তাল মেলানো কিন্তু খুব কঠিন হয়ে যায়। সেটা করতে গিয়ে আমাকে বেশ কিছু ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। প্রায় ৫-৬ বছর হলো আমি অভিনয়টা করছি না। নাচটাও আমাকে ছাড়তে হয়েছে। কিন্তু বাকি কোনোটাই কিন্তু আমি একেবারে ছেড়ে দেইনি। যদি বলেন সরাসরি কোনগুলো করছেন, আমি বলব এখন করছি পরিচালনা, গান এবং স্থাপত্য চর্চা। আর্কিটেকচারে একেবারে যাওয়া হয়নি এটা ঠিক না। আমি পাস করার পর তখন বাচ্চাগুলো ছোট ছিল, কিন্তু তখনও কাজ করেছি। তখন শুধু বাসা কিংবা অফিসের ইন্টেরিয়র করেছি। অবশ্য অপরিচিতদের জন্য না। নিজেদের পরিচিতদের মধ্যে। তারপর ২০১২ সালে আমার যারা আর্কিটেক্ট বন্ধু এমনকি আমার শিক্ষকরাও বলতে থাকলেন, তুমি কেন কাজ করছ না। আমার ক্ষেত্রে আসলে ১০টা-৫টা চাকরি করা কখনোই সম্ভব ছিল না। আর আর্কিটেকচারে তো আরও বেশি সময় দিতে হয়। ব্যাপারটা এমন যে ডিরেকশনও পুরো সময় নিয়ে। আবার এই আর্কিটেকচারও পুরো সময় নিয়ে নেয়। পার্টটাইম বলে কিছু নেই। যখন আমার দু’জন ব্যাচমেট বলল, আমরা চাই তুমি কাজ কর, তো আমরা তিনজনে মিলে কিছু একটা করতে পারি। যখন তুমি অনেক ব্যস্ত থাকবে তখন আমরা সামলে নিলাম। আমার যে প্রজেক্টটা তুমি সামলাতে চাও সেটা তুমি করলে। আমার দুই কাছের বন্ধুর কাছ থেকে যখন আমি প্রস্তাবটা পেলাম তখন ভাবলাম টুকটাক কাজ তো করছি। ওদের সঙ্গে কাজ যখন করছি তখন আমি বড় কাজগুলো তো সাহস করে হাতে নিতে পারব। আমাদের কো¤পানির নাম ডটস। আমরা দু’জন মেয়ে একজন ছেলে। ঢাকার বাইরে অনেকে প্রজেক্টের কথা বলতেন। কিন্তু ঢাকার বাইরে প্রজেক্ট নিয়ে আসলে মেয়েদের দৌড়াদৌড়ি একটু কঠিন হয়ে যায়। তারপর বিল্ডিং কনসালট্যান্সি করতে গেলে দেখা যায় ঢালাই হচ্ছে, সাইটে যেতে হচ্ছে। মাঝেমধ্যেই দেখা যায়, একজন ছেলে পার্টনার থাকলে অফিসের মধ্যে সুবিধা হয়। আমাদের তিনজনের সিনক্রোনাইজেশন খুবই ভালো। আমি, নায়লা হাসান ও মান্না রাব্বি। আমরা যখন স্টুডেন্ট প্রজেক্ট করতাম তখনো আমাদের সিনক্রোনাইজেশন খুবই ভালো ছিল। ২০১২ সালে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম এবং কো¤পানি স্থাপন করলাম। আর্কিটেকচার পেশাটাই এমন, পুরোটাই আসলে অভিজ্ঞতার ওপরে। গান বা অভিনয়ে যেটা হয়, একটা রিয়েলিটি শোতে প্রথম হলো আর অভিনয়ে চলে এলো। একটা অ্যালবাম হিট করল আর সেই সঙ্গে বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী হয়ে গেল। কিন্তু আর্কিটেকচার এমন একটা পেশা, যেখানে যত অভিজ্ঞতা হবে তত আস্তে আস্তে ভালো প্রজেক্ট পাওয়া যাবে। তো সেই দিক থেকে বলতে গেলে বলতে হবে আমি এখনো আসলে অভিজ্ঞতাই অর্জন করছি। বলছি না এমন বড় কোনো কাজ করছি। তবে অভিজ্ঞতা যে অর্জন করছি সেটাই অনেক বড় পাওয়া। যে বিষয়টাতে পড়াশোনা করেছি সেটা একেবারে ভুলে যেতে চাইনি। আমার খুব শখের একটা বিষয় ছিল আর্কিটেকচার। অন্য অনেক বিষয় পড়লে আরও আগে পাস করতে পারতাম। মিডিয়াতে আমার যে ক্ষেত্র সেখানে বেশি সময় দিতে পারতাম। স্টুডেন্ট থাকা অবস্থায় অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। এমনও হয়েছে, আমার আর্কিটেকচারের ফাইনাল জুরি, পাশাপাশি শ্যামল ছায়া ছবির শুটিং। আমি জুরি করতে এসেছি শুটিংয়ের অর্ধেক শেষ করে। আমার জুরি বিকেলে পড়েছে, আমি সকালে শুটিং করেছি। এসেছিলাম হিন্দু বউয়ের শাড়ি পরা আর শাখা-সিঁদুর পরা। আমার শিক্ষকরাও বুঝতে পেরেছিলেন আমি শুটিং করে এসেছি। জুরি শেষ করে আবার রাতে শুটিংয়ে গেছি। এই পড়াশোনার জন্য যে এত কষ্ট করেছি সেই কাজটাও যে করতে পেরেছি সেটাই অনেক কিছু।

কারিকা : স্থাপত্য পেশায় বাংলাদেশে নারীদের অবস্থানকে কীভাবে দেখেন?
শাওন : এক্ষেত্রে আমাকে একটু পক্ষপাতদুষ্ট মনে হবে। তবুও বলি, সৃষ্টিশীল কাজের দিক থেকে নারীরা অনেক এগিয়ে। একমাত্র নারীরাই মাল্টিটাস্কিং করতে পারে। এটা নিয়ে আমরা তিন পার্টনার মাঝেমধ্যে খুব হাসাহাসি করি যে, আমাদের মধ্যে যে ছেলে আছে সে দেখা যাচ্ছে শুধু অফিস নিয়েই থাকছে। আমরা অফিসে কাজ করতে করতে বাসায় রান্না কী হলো, বাচ্চাটা স্কুল থেকে এসে কী খেল সেগুলো চিন্তা করছি। আবার সহকর্মী বন্ধু মিস্ত্রির সঙ্গে গিয়ে রাগারাগি করে আসছে, আমরা অন্যভাবে বলি। এই যে আচরণটা, এই বিষয়গুলো সামলানো, ইঞ্জিনিয়ারকে সামলানো এক রকম। কিন্তু একটা মেয়ে যখন বাসায় থাকে তাকে বুয়া থেকে শুরু করে বাচ্চা, স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি সবাইকে সামলাতে হয়। এই যে তার অভিজ্ঞতাটা, আমার মনে হয় এটা মেয়েরা সবচেয়ে বেশি কাজে লাগাতে পারে সৃজনশীল ক্ষেত্রে। আমার যেটা মনে হয় আর্কিটেকচার পেশাতে মেয়েরা অনেক এগিয়ে আছে, তাদের কাজ করার অনেক সুযোগ আছে। ঢাকার বাইরের কাজগুলোতে, মেয়ে বলে বলছি না, দেখা যায় মন পড়ে থাকে বাচ্চাটার কাছে। এমন তো অনেক সময় হয়, চট্টগ্রামের প্রজেক্ট, রাতে থাকতেই হবে। এই সময়ে খুব কষ্ট লাগে। আমাদের একটা প্রজেক্ট চলছে ফেনীতে। হাসপাতাল। আমি এখনও সাইটটাই দেখতে পারিনি। আমাদের মান্না গেছে, ছবি তুলে নিয়ে এসেছে। সে আমাদের বোঝাচ্ছে। ভিডিও করে নিয়ে এসেছে। না দেখে দেখে কাজ। তখন এমন হয়কি, একটু মনে হয় অবহেলাই কী করলাম।

কারিকা : মেয়েদের জন্যই আর্কিটেকচার এমন একটা কথা বলা হয়। কতটা সত্য বলে মনে করেন?
শাওন : সত্য মনে করি না। আমি বলব, মেয়েদের জন্য কিংবা ছেলেদের জন্য বলে কোনো কথা নেই। ব্যাপারটা হচ্ছে, প্রত্যেকটা মানুষের একটা স্বপ্নের কাজ থাকে। যেমন শচীন টেন্ডুলকার ভালো খেলবে। ওকে এখন ধরে যদি বলা হয় তুমি খেলতে পারবে না। এটা ছেলেদের জন্য নয়, তোমার জন্য অন্যকিছু। আবার অনেক ছেলে আছে ভালো রান্না করে। তাকে যদি বলা হয় সেটা মেয়েদের কাজ। কার ভেতরে যে কোন গুণ আছে সেটা তো আমরা জানি না।

কারিকা : তাহলে কি বিষয়টা এ রকম যে, আমরা আসলে নারীকে অবহেলার চোখে দেখছি?
শাওন : আমরা দু’রকম। মুখোশধারী। কখনও আমরা নারীকে মাথার ওপর তুলে ফেলি, আবার কখনও পায়ের নিচে ফেলি। মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র আমাদের দেশেই একবারে ¯িপকার থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত নারী। এটা আমরা মানছি। আবার এই নারীর পান থেকে চুন খসলেই বলি এই দেখ, এই জন্যই তো ইভটিজিং হয়। সব ক্ষেত্রেই দোষ। বাচ্চাটা অন্যায় করলেই বলবে, মা নিশ্চয় ঠিকমতো শেখায়নি। স্বামীর ক্ষেত্রে বলবে, বউটা খেয়াল রাখে না, তাই সে অন্যদিকে যাচ্ছে।

কারিকা : স্থপতি হওয়ার ক্যারিয়ারটা কি প্রলম্বিত করার পরিকল্পনা আছে?
শাওন : হ্যাঁ, অবশ্যই। প্রলম্বিত করার পরিকল্পনা আছে বলেই তো কাজটা করছি। সব কিছুর একটা বয়স থাকে। যেমন নায়িকা হওয়ার ক্ষেত্রে। নায়িকা হওয়ার কিন্তু একটা বয়স থাকে। এই বয়সটা পেরিয়ে গেলে কিন্তু আর নায়িকা হওয়া যায় না। নায়িকা বলতে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে যেটাকে বোঝায় সেটাকে বোঝাচ্ছি। কিন্তু কেন্দ্রীয় চরিত্রে যে অভিনেত্রী থাকেন সে-ই নায়িকা, সেটা চল্লিশোর্ধ্ব হলেও। আমরা সিথিলমেন্ট নায়িকা যেটাকে বলি, তার একটা সময় থাকে। আবার একটা ম্যাচিওরিটির পর কেউ হয়তো ডিরেক্টর হতে পারে। আবার অনেকদিন গান শেখার পর কেউ গায়ক হতে পারে। সে রকম আর্কিটেকচার ব্যাপারটা এমন যেন শুরুতে এসেই একটা বড় কিছু করে ফেললাম এটা হয় না। খুবই কম, আস্তে আস্তে কাজ করতে করতে স্বপ্নের কোনো একটা কাজ হয়, যে কাজটা আর্কিটেক্ট হিসেবে নিজের পরিচিতিটাকে স্ট্রং করার মতো। আমাদের দেশে এতজন আর্কিটেক্ট কাজ করে যাচ্ছেন, অথচ হাতেগোনা কয়েকজনের নামই সেভাবে পরিচিতি পেয়েছে। তুমি নিজেও যেহেতু আর্কিটেক্ট, তুমি অবশ্যই বুঝবে। সে চেষ্টাটা আমাদের সব আর্কিটেক্টের মনেও কিন্তু থাকে, যে আমরা কাজ করছি আমরা কিন্তু অনেক সময় মন খারাপ করে থাকি যে আমরা জানি ক্লায়েন্ট চাচ্ছে বলে দিচ্ছি কিন্তু বুঝতে পারছি যে এটা ঠিক হচ্ছে না। আমরা চেষ্টা করি যে ক্লায়েন্টের রুচিটাকে পরিবর্তন করার, বারবার বলি এটা এই কারণে দিচ্ছি এবং তার মধ্যেও অনেক ক্লায়েন্ট চায়, উনাদের মধ্যে একটু বেশি চাওয়া থাকে। যেগুলো আসলে আমাদের মতের সঙ্গে মিলছে না, লজিক্যাল না এই একটা দুঃখ কিন্তু শুরুর দিকে থাকে। এখন আমি
মনে করি, কিছুটা অভিজ্ঞতার পর একজন স্থপতি বলতে পারেন যে ‘না, আমি এটাই চাই।’
আপনার আমার কথায় বিশ্বাস রাখতে হবে। আমি খুব অল্প সময়ে ২০১২ থেকে ২০১৬ এই পাঁচ বছরে এই জায়গাটাতে আমরা এসেছি। কিন্তু শুরুর দিকে আমরা কিছু বললে হয়তো ক্লায়েন্টকে শোনাতে পারতাম না, নতুন কো¤পানি। যেহেতু অভিজ্ঞার বিষয় ছিল। কিন্তু এখন যখন আমরা বলি তখন আবশ্যই সেই বিশ্বাসটা থাকে। আজ থেকে আর পাঁচ বছর পরে, আর্কিটেকচারের সঙ্গে চুল পাকার একটা ব্যাপার আছে, বলবে : এ অনেকদিনের পাকা আর্কিটেক্ট। চুল-টুল পাকলে তারপর হয়তোবা পাকা আর্কিটেক্ট হিসেবে… (হাসি) প্রলম্বিত করার অবশ্যই ইচ্ছে আছে এবং বেশকিছু ভালো কাজ করার ইচ্ছে আছে যেটা মানুষ মনে রাখবে।

কারিকা : শুনেছি, আপনি হুমায়ূন আহমেদ প্রতিষ্ঠিত স্কুলের ডিজাইনার। সেটা স¤পর্কে জানতে চাই।
শাওন : এই স্কুলটা যখন আমি করেছি তখন আমি স্টুডেন্ট ছিলাম এবং স্টুডেন্ট প্রজেক্টে এই স্কুল নিয়েই কাজ করছিলাম। আমাদের তখন শুটিং চলত। শুটিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে আমি যেটা করতাম যে ছুটি যখন ছিল উইকেন্ডে তখন শুটিং ¯পটে বসেও মডেল বানাতাম। আমি নিজের গাড়ি নিয়ে শুটিং ¯পটে যেতাম তো আমার গাড়িতে মডেলের পেপার, কাগজপত্র সব থাকত। ফাঁকে ফাঁকে যখন কাজ করতাম তখন সেই মডেলগুলো সবাই আগ্রহ নিয়ে দেখত। কারণ আমি যে ইউনিটে কাজ করতাম সেই ইউনিটের অনেকেরই আর্কিটেকচার নিয়ে ধারণা কম বা মডেলগুলা কম দেখেছেন। তো আমরা একবার একটা এলিমিনেটরি স্কুলের প্রজেক্ট করছিলাম।
ওটা দেখে হুমায়ূন আহমেদ বললেন, তুমি তো অনেক ভালো স্কুলের ডিজাইন করেছ, তুমি কী সত্যি সত্যি একটা স্কুলের ডিজাইন করবে? পুরো বিষয়টা আমার কাছে মনে হয়েছিল একটা দুষ্টামির মতো। আমি বললাম আমি তো এখনো ছাত্রী, আমি কীভাবে করব? তিমি বললেন এই জিনিসটাই তুমি করতে পার আমার ওখানে। নেত্রকোনায়। তারপর আমি সেখানকার জায়গাটা দেখতে গেলাম। পুরো বিষয়টাই আমার কাছে একটা চ্যালেঞ্জের মতো ছিল। কারণ প্রথমত হুমায়ূন আহমেদের প্রতিষ্ঠিত একটি স্কুল এবং ছাত্রজীবনেই আমি একটি কাজ করতে চাচ্ছি। একটা সুবিধা ছাত্রজীবনের আছে, এখন আমরা অনেক কিছু করতে পারি না, নিয়মের বাইরে যেতে পারি না। কিন্তু ছাত্রজীবনে কিন্তু আমরা অনেক স্বপ্ন দেখতে পেরেছি। এখন বিস্তারিত নিয়ম মানতে গিয়ে কিন্তু আমাদের অনেক স্বপ্ন চলে যায়। বাস্তবতা এসে স্বপ্নগুলোকে নষ্ট করে দেয়। ইঞ্চি আর ফিটের মধ্যে বাধা পড়ে যায়। স্টুডেন্ট প্রজেক্ট যেটা করেছিলেন সেটা ছিল ঢাকার স্কুল হিসেবে। আর আমি যখন গ্রামের একটা স্কুল করব ওখানে তো ফ্যান না-ও থাকতে পারে। তখন সেখানে বিদ্যুৎ ছিল না। তাই আমি ডিজাইনটা বিশেষভাবে করলাম। যাতে একটা বাচ্চা ঘর এবং বাহির দুই ধরনের সুবিধাই পায়। বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকায় এখনও যখন বিদ্যুৎ থাকে না তখনও তাদের কোনো সমস্যা থাকে না। আমি কেবল আর্কিটেকচারাল ড্রইংটা করে দিলাম। তখন আমি খুব স্বাধীনভাবে কাজ করেছিলাম। বাকি কাজটা করেছিলেন আমি যে দখিন হাওয়ায় আছি এই ভবনের যে স্থপতি ফললুল করিম। তিমি আমাকে অনেক স্নেহ করতেন। হুমায়ূন আহমেদের বন্ধু তিনি। তিনি আমাকে বললেন, তোমার স্বপ্ন অনুযায়ী আমাকে আর্কিটেচারাল ড্রয়িংটা শেষ করে দাও। তুমি যেটা চাও সেটাই করে দেব, কেবল স্ট্রাকচারটা আমি করে দেব। এভাবেই শেষ পর্যন্ত আমার স্বপ্ন অনুযায়ী স্কুলটা নির্মিত হয়।

সাবরিনা মিলি


বায়তুর রউফ মসজিদটি ঢাকার দক্ষিণ খান থানার ফায়দাবাদে অবস্থিত। স্থপতি মেরিনা তাবাসসুমের ডিজাইন ও সরাসরি তত্ত্বাবধানে মসজিদটি নির্মিত হয়েছে। যেখানে দেখা গেছে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রচলিত মসজিদগুলোর ধরণ থেকে আলাদা কিছু।

স্থাপত্য-বৈশিষ্ট্য
৭৫৪ বর্গমিটারের মসজিদটি দেখে কারো বুঝতে অসুবিধা হয় না যে এটি একটু ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নির্মিত। এ অঞ্চলের মানুষ মসজিদের যে চিরাচরিত চিত্রের সঙ্গে পরিচিত তা বায়তুর রউফ মসজিদে অনুপস্থিত। অর্থাৎ গম্বুজ বা মিনার এ মসজিদে নেই। চতুর্দিকে ৮টি পিলারেরে ওপর এটি নির্মিত। কিবলার দিকে ১৩ ডিগ্রি কোনাকুনি করা একটি পিলার রয়েছে। মসজিদে প্রাকৃতিক আলোবাতাস প্রবেশের যথেষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে। মসজিদটি এমনভাবে ডিজাইন করা যেন শীত বা গরমে বাইরের আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব ভেতরে বোঝা না যায়। এটির স্থাপত্যের বিশেষ দিক হলো, এর বায়ু চলাচল-ব্যবস্থা ও আলোর চমৎকার বিচ্ছুরণ, যা মসজিদের পরিবেশে ভিন্ন একটি মাত্রা যোগ করেছে। ব্যবহৃত সব উপকরণই স্থানীয়। সুলতানি আমলের মসজিদের অনুপ্রেরণায়  তৈরি হয়েছে এই স্থাপত্য।

স্থপতির গল্প
মেরিনা তাবাসসুম এর আগেও, ২০০৪ সালে স্থপতি কাশেফ মাহবুব চৌধুরীর সঙ্গে যৌথভাবে আগা খান পুরস্কারের জন্য চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছিলেন। যার অর্থমূল্য ১০ লাখ মার্কিন ডলার। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের তিনটি স্থাপত্য এ পুরস্কার জিতলেও সেগুলোর স্থপতি ছিলেন বিদেশি। অন্যদিকে বেশ কয়েকবার চূড়ান্ত মনোনয়ন পেলেও আগা খান পুরস্কার ঘরে তোলা হয়নি কোনো বাংলাদেশি স্থপতির। অবশেষে ২০১৬ সালে সে আকাক্সক্ষার অবসান ঘটে। ২০১৬ সালে আবু ধাবির ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট আল জাহিলি ফোর্টে মেরিনা তাবাসসুম ও বাকি পাঁচ বিজয়ীর হাতে পুরস্কার তুলে দেয়া হয়।

আগা খান পুরস্কার ও বায়তুর রউফ মসজিদ নিয়ে কারিকার সঙ্গে কথা বলেছেন স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম

baitur_raufআগা খান পুরস্কার সম্পর্কে জানতে চাই?
স্থাপত্য-দুনিয়ায় অত্যন্ত সম্মানজনক একটি স্বীকৃতি আগা খান পুরস্কার। তরুণ স্থপতিদের উদ্ভাবনী ধারণাকে স্বীকৃতি দিতে আগা খান ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক (একেডিএন) প্রতি তিন বছর পর পর এ পুরস্কার দিয়ে থাকে। এর জন্য স্থাপত্যক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব, পরিকল্পনা, ঐতিহাসিক বিষয়সমূহ ইত্যাদির ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। পাশাপাশি স্থাপত্যকলার মাধ্যমে সামাজিক প্রত্যাশা পূরণের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখেন বিচারকরা। জুরি বোর্ডের পক্ষ থেকে একজন মূল্যায়নকারী প্রতিটি প্রকল্প-এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি কমিটির কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়ার পর তা যাচাই-বাছাই করে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়।

দেশ-বিদেশের ৩৮৪টি স্থাপনাকে পেছনে ফেলে প্রথমে সেরা ১৯টি প্রকল্পের মধ্যে এবং সবশেষে আপনার ডিজাইনকৃত বায়তুর রউফ মসজিদ এ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। আপনার অনুভূতি কী?
আমি অত্যন্ত সম্মানিত বোধ করছি। এর জন্য নির্বাচিত হতেও যেতে হয় ধাপে ধাপে ও অত্যন্ত কঠোর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। আমি অনেক আনন্দিত, কারণ স্থাপত্যশিল্প নিয়ে যে সাধনা করেছি তার স্বীকৃতি পাওয়া গেছে। আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার শুধু ভালো কাজের স্বীকৃতি পাওয়া বা শুধু বিজয়ীদের জন্যই নয় বরং তরুণ স্থপতিদের জন্যও বেশ অনুপ্রেরণাদায়ক। এই পুরস্কার  বাংলাদেশের জন্যও অনেক বড় একটি অর্জন। আমি মনে করি, এ অর্জন আমাদের স্থাপত্য-সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করবে।

মসজিদের ডিজাইনের সময় আপনি কোন বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিয়েছেন?
আমি আমার কাজের মাধ্যমে আমাদের স্থাপত্য-চর্চায় শিকড়ের ভাষাকে তুলে আনার চেষ্টা করেছি। তাই মসজিদটি ডিজাইনের সময় স্থানীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস, জলবায়ু ইত্যাদির কথা মাথায় রেখেছি। সুলতানি আমলের মসজিদের অনুপ্রেরণায় তৈরি হয়েছে এই স্থাপত্য। মসজিদটি ১৩ শতাব্দীর পূর্বের বাঙালি স্থাপত্যরীতিতে নির্মাণ করা হয়েছে। এর বিশেষত্বগুলোর একটি হচ্ছে আধ্যাত্মিক মানের নামাজের স্থান। আমি আলো, বাতাস, শব্দ আর ফাঁকা জায়গাগুলো নিয়ে কাজ করেছি যাতে ভেতরে যারা নামাজ পড়বেন তাদের জন্য উপযুক্ত একটা পরিবেশ সৃষ্টি হয়। নামাজের স্থানটিকেই বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। চিরাচরিত ডোম এবং মিনারের অনুপস্থিতি মসজিদটিকে প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে। তার উত্তরে আমি বলব, এটাই প্রথম মসজিদ যেটাতে কোনো চিরাচরিত প্রতীক তথা ডোম বা মিনার নেই। কিবলার দিকে ফিরে জামাতবদ্ধ নামাজ পড়ার ক্ষেত্রে মসজিদটি বেশ বড়সংখ্যক মানুষকে জায়গা দিতে সক্ষম। একটি মসজিদের যে মৌলিক চাহিদা থাকে তা এই ডিজাইনে রাখার  চেষ্টা করা হয়েছে। এটি নির্মাণের ব্যয় এসেছে স্থানীয় ব্যক্তিবর্গ তথা বিভিন্ন উৎস-মাধ্যমে আসা অনুদান থেকে, যা মসজিদটির অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি। মসজিদটির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য এটি পরিবেশবান্ধব। নামাজের স্থানসহ অন্য সব স্থানে প্রাকৃতিক আলোবাতাস প্রবেশের যথেষ্ট ব্যবস্থাও রয়েছে।

মসজিদটি নির্মাণে কী ধরনের উপকরণ ও উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে?
সবই স্থানীয় উপকরণ। প্রধান উপকরণ হিসেবে ইট এবং কাঠামোগত ভিত নির্মাণে রেইনফোর্সড কংক্রিট ব্যবহৃত হয়েছে। দুই তলায় ওঠার সিঁড়িগুলো তৈরি হয়েছে ছিদ্রযুক্ত লোহার শিট দিয়ে।

তরুণ স্থপতিদের উদ্দেশে যদি কিছু বলেন…
স্থাপত্যবিদ্যাকে শুধু রুটি-রুজির যোগানদাতা হিসেবে নয়, এটাকে আমি নিয়েছি নেশা হিসেবে। আমি মনে করি তরুণ স্থাপত্যবিদদেরও বিষয়টিকে সেভাবেই নেয়া উচিত। সেই সঙ্গে শুধু চর্চার বিষয় হিসেবে না দেখে এর মধ্যকার গভীর অর্থগুলো উপলব্ধি করতে হবে। ভাবতে হবে দেশের জন্য। বাংলাদেশের জন্য কী ধরনের স্থাপত্য উপযোগী সেটা নিয়ে চিন্তা করা প্রয়োজন। এই বিষয়টি নিয়ে খুব পর্যাপ্ত কাজ হয়নি আমাদের। একই সঙ্গে ঢাকার বাইরের বিষয়গুলো নিয়েও ভাবতে হবে। সবাই যদি দেশের এক শতাংশ মানুষের জন্য কাজ করতে চান তবে সুযোগটা স্বাভাবিকভাবেই কম পাওয়া যাবে। অন্যদিকে বাকি ৯৯ শতাংশ মানুষ থাকবে অন্ধকারেই। কোনো  পেশার লক্ষ্যই দেশের এক শতাংশ মানুষের জন্য হওয়া উচিত নয়। স্থাপত্যবিদ্যার ক্ষেত্রটিকে বিস্তৃত করা দরকার। ঢাকার বাইরে ছোট শহরগুলোর দিকে নজর দিতে হবে। দেশ ও মানুষের কাছে থাকতে হবে অঙ্গীকারাবদ্ধ, যেটার শুরু নিজের দেশকে চেনা ও গভীর শিকড়সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা করার মধ্য দিয়ে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন আ জ ম নাছির উদ্দীন। একই বছরের ৬ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে শপথ গ্রহণ এবং ২৬ জুলাই সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২৫ জুলাই পূর্ণ হলো দায়িত্ব গ্রহণের এক বছর। এক বছরে গৃহীত বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের মূল্যায়ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কারিকা’র মুখোমুখি হয়েছেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন।
সাক্ষাৎকার আবদুল্লাহ আল মামুন

সিটি মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের এক বছর পূর্ণ হলো। কেমন উপভোগ করেছেন?
এক বছর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। এবার পুরোদমে কাজ শুরু করার পালা। তবে আমি বসে থাকিনি। একটি বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে রাত-দিন কাজ করেছি। সিটি করপোরেশনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছি। স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেছি। দীর্ঘদিনের জমে থাকা জঞ্জাল দূর করেছি। কিছু পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। কিছু শুরুর পথে। আশা করছি বাকি সময়ে আমি আমার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারব।

এক বছরের গৃহীত কাজকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
আসলে মূল্যায়ন বা বিচারের জন্য এক বছর যথেষ্ট সময় নয়। তবুও কিছু কাজ তো করেছি। চট্টগ্রাম পাহাড়ে ঘেরা সুবজ নগর। দীর্ঘদিন বিলবোর্ডের জঞ্জালে ঢাকা ছিল এই সবুজ নগর। বিভিন্ন বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে বিলবোর্ডগুলো অপসারণ করেছি। এখন চারিদিকে অবারিত সবুজ। এ নগর আর বিলবোর্ডের জঞ্জালে ভরে উঠতে পারবে না। জলাবদ্ধতা নিরসনে ১১৬টি খাল থেকে প্রায় ২০ হাজার ঘনমিটার মাটি ও আবর্জনা উত্তোলন করা হয়েছে, যা অতীতে কখনও হয়নি। দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিচ্ছন্ন নগর গড়ে তুলতে দিনের পরিবর্তে রাতে আবর্জনা পরিষ্কার কাজ শুরু করেছি। ১ আগস্ট থেকে ঘরে ঘরে গিয়ে আবর্জনা সংগ্রহ করা হবে। প্রাথমিকভাবে ৭টি ওয়ার্ডে শুরু করা হবে। পরবর্তীতে পাঁচ ধাপে নগরের ৪১টি ওয়ার্ডে তা বাস্তবায়ন করা হবে। নগরের বিভিন্ন মোড় আলোকিত করতে ১৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নগরের ১৭৫টি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন মেটাল হ্যালাইড বাতি স্থাপন করা হয়েছে। ৭৫ কিলোমিটার নতুন সড়ক আলোকায়নের আওতায় আনা হয়েছে। নতুন করে ৬০ কিলোমিটার সড়ক কার্পেটিং করা হয়েছে। কাঁচা রাস্তা পাকা করা হয়েছে ২৭ কিলোমিটার। স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ৭৭ জন চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সিটি করপোরেশন পরিচালিত স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে ফি ৩০ টাকা থেকে কমিয়ে ১০ টাকা করা হয়েছে। সিটি করপোরেশনের হাসপাতালে প্রতিবন্ধী কর্নার ও দন্ত্য বহির্বিভাগ চালু করা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে উন্নত পাঠদান নিশ্চিত করতে শিক্ষা নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে। থমকে থাকা আবাসন প্রকল্পগুলোসহ আয়বর্ধক প্রকল্পগুলো সচল করা হয়েছে। নান্দনিক চট্টগ্রাম গড়ে তোলার জন্য একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা আগামী দুই বছরের মধ্যে চট্টগ্রামকে সাজিয়ে তুলবেন। এর বাইরেও অনেকগুলো পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এখন এক বছর কী করেছি তার বিচারের ভার নগরবাসীর হাতে।

নির্বাচনের আগে জলাবদ্ধতামুক্ত চট্টগ্রাম গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এক বছরে নগরকে জলাবদ্ধতামুক্ত করতে কী করেছেন?
তাৎক্ষণিকভাবে চাইলে জলাবদ্ধতামুক্ত করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সমন্বিত উদ্যোগ। তবুও নগরবাসীর দুর্ভোগ লাঘবে প্রায় ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে নগরের ১১৬টি খাল থেকে মাটি উত্তোলন করা হয়েছে। নালা-নর্দমা পরিষ্কার করা হয়েছে। যার কারণে এবার ভয়াবহ জলাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হয়নি। পানি উঠলেও স্থায়ী হয়নি। খুব দ্রুত নেমে গেছে। বহদ্দারহাটের বারইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত নতুন খাল খননের কাজ এ অর্থবছরে শুরু হবে। নতুন আরও দুটি খাল খননের প্রকল্প তৈরি করা হচ্ছে। পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও সংসদ সদস্য জিয়াউদ্দিন বাবলুর সঙ্গে আলোচনা করে মদুনাঘাট থেকে নেভাল পর্যন্ত কর্ণফুলী নদীর পাড়ে বেড়িবাঁধ ও সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ২৬টি খালের মুখে স্লুইচ গেট বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি সিটি করপোরেশনের সহায়তায় বাস্তবায়ন করবে পানি উন্নয়ন বোর্ড। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে জলাবদ্ধতা অনেকাংশকে কমে যাবে। পাহাড়ঘেরা এ শহরের সবচেয়ে বড় সমস্যা সিলট্রেশন। বৃষ্টি হলেই বৃষ্টির পানির সঙ্গে বালি ও মাটি এসে খাল-নালা ভরাট হয়ে যায়। তাই জাইকার অর্থায়নে পাহাড়ের পাদদেশে প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

‘ক্লিন সিটি, গ্রিন সিটি’ ছিল আপনার স্লোগান। এ স্লোগান বাস্তবায়নে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?
ক্লিন সিটি গড়তে ইতোমধ্যে নগরীকে বিলবোর্ডমুক্ত করা হয়েছে। এখন চট্টগ্রামের যেদিকে তাকান সবুজ দৃশ্য আপনার চোখে পড়বে। রাতের বেলা আবর্জনা অপসারণ করায় ভোরে চট্টগ্রাম নগর থাকে ঝকঝকে-তকতকে। পূর্ণাঙ্গ ক্লিন সিটি গড়ে তুলতে নগরবাসীদেরও সচেতন হতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ডোর টু ডোর আবর্জনা সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হবে। এটি সফল হলে আশা করছি ক্লিন সিটির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাবে চট্টগ্রাম। আর গ্রিন সিটি গড়ে তুলতে ইতোমধ্যে একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার সঙ্গে সিটি করপোরেশনের চুক্তি হয়েছে। তারা আগামী দুই বছরের মধ্যে সড়কের দুইপাশে ফুটপাত ঘেঁষে বাগান এবং সবুজায়ন করবে। এছাড়া রাস্তার মোড়ে আধুনিক ফোয়ারা স্থাপন, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ভাস্কর্য স্থাপন, সড়কের দুইপাশে হালকা নান্দনিক বিন স্থাপন, মোড়ের কাছাকাছি আধুনিক যাত্রী ছাউনি নির্মাণ ও শৌচাগার নির্মাণসহ নান্দনিক চট্টগ্রাম বাস্তবায়নে বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে।

চট্টগ্রাম নগরের উন্নয়নে ভবিষ্যৎ কী পরিকল্পনা রয়েছে আপনার?
বাসযোগ্য চট্টগ্রাম গড়ে তুলতে তিন বছরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছর থেকে ধাপে ধাপে তিন অর্থবছরে শতভাগ উন্নয়ন করা হবে। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ডোর টু ডোর বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নগরীকে বিউটিফিকেশনের আওতায় আনা হবে। আগামী তিন বছরের মধ্যে এলইডি লাইটিংয়ের মাধ্যমে পুরো নগরীকে আলোকায়ন করা হবে। এছাড়া পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে সব কাঁচা ও ইটের রাস্তা কার্পেটিং করা। ভঙ্গুর সেতু-কালভার্ট মেরামত ও সংস্কার। বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন সেতু ও রাস্তা নির্মাণ। খাল খনন প্রকল্প, ভূমি ও পাহাড়ের ক্ষয়রোধে প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণ। সড়ক দ্বীপ বনায়ন, ফুটপাত উন্নয়ন, যাত্রী ছাউনি ও গণশৌচাগার ইত্যাদি নির্মাণ। সাহায্য সংস্থার অর্থায়নে স্মার্ট সিটি, খাল খনন ও অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন। এসব পরিকল্পনা ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে ৪০ ভাগ, ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে ৫০ ভাগ এবং ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে অবশিষ্ট ১০ ভাগ বাস্তবায়ন করা হবে। এছাড়া নগরের উন্নয়নে ছয়টি মেগা প্রকল্পসহ বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে চট্টগ্রাম হবে সত্যিকার অর্থে একটি আধুনিক ও মডেল নগরী।

মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
কারিকাকেও ধন্যবাদ।

0 745

আব্দুল কৈয়ূম চৌধুরী
ভাইস প্রেসিডেন্ট, রিহ্যাব ও
চেয়ারম্যান, রিহ্যাব চট্টগ্রাম রিজিওনাল কমিটি

রিহ্যাবের নবনির্বাচিত কমিটি কী কী বিষয়ে গুরুত্ব দিবে?
বর্তমান আবাসন ব্যবসায় যে স্থবিরতা চলছে সেটা থেকে উত্তরণের জন্য যেসব প্রতিবন্ধকতা আছে সেগুলো নিয়ে আমরা কাজ করব। এখন আমরা দুটি প্রতিবন্ধকতা নিয়ে কাজ করছি। প্রথমত সরকারি প্রতিবন্ধকতা, দ্বিতীয়ত চট্টগ্রাম বিভাগের প্রতিবন্ধকতা। সরকারি প্রতিবন্ধকতাগুলোর বিষয়ে আমরা ইতিমধ্যে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্রস্তাবনা পেশ করেছি। চট্টগ্রামের প্রতিবন্ধকতার মধ্যে সিডিএ’র সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে চাই। এছাড়া আমাদের সদস্যদের মধ্যে কার কী সমস্যা আছে সেগুলো চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে এগোতে চাই।

আবাসনকে গতিশীল ও ক্রেতাবান্ধব করার জন্য কী কী পদক্ষেপ গ্রহন করছেন?
কিছু আবাসন ব্যবসায়ীর প্রতি ক্রেতাদের আস্থার সংকট আছে। সেই সংকট থেকে উত্তরণ করাই আমাদের অন্যতম কাজ। গত পাঁচ-ছয় বছরে ক্রেতারা তেমনভাবে অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয় করে নি। এখন কিন্তু ক্রেতার অভাব নেই। তবে আস্থার সংকটের কারণে তারা সিদ্বান্ত গ্রহন করতে পারছেন না। সেজন্য আমাদের করণীয় হচ্ছে রিহ্যাবকে ব্র্যান্ডিং করা। সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম করার পরিকল্পনা গ্রহন করেছি। বর্তমানে চট্টগ্রামে রিহ্যাবের সদস্যসংখ্যা প্রায় ৯০। অথচ আবাসন প্রতিষ্ঠান আছে ২০০-এর বেশি। রিহ্যাব-সদস্যরা ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ আইন মেনে ভবন নির্মাণ করে থাকে। অথচ ব্যক্তি-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মনীতির কোনো তোয়াক্কা না করেই ভবন নির্মাণ করছে। তাই আমরা চাচ্ছি সকল আবাসন ব্যবসায়ীকে অবশ্যই রিহ্যাব মেম্বার হতে হবে। অন্যথায় গ্রাহক হয়রানি রোধ করা সম্ভব হবে না। আমরা সরকারের কাছে গৃহায়ন নীতিমালা করার জন্য প্রস্তাব করেছি।

নিরাপদ ও বাসযোগ্য নগর বিনির্মাণের ক্ষেত্রে আপনাদের পরিকল্পনা কী?
নিরাপদ ও বাসযোগ্য নগর বিনির্মাণ রিহ্যাবের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সিটি কর্পোরেশন, সিডিএ, নগর-পরিকল্পনাবিদ ও অন্যান্য সহযোগী প্রতিষ্ঠনের সমন্বিত প্রচেষ্টায় একটি সুন্দর ও বাসযোগ্য নগর করা সম্ভব। বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরে প্রায় ৬৫ লাখ লোক বাস করে। আগামী ১০ বছরে এই সংখ্যা দ্বিগুন হবে। অপরদিকে সিডিএ’র বিভিন্ন কমিটিতে রিহ্যাবের প্রতিনিধি যুক্ত করতে হবে। আমরা দীর্র্ঘদিন ধরেই এ বিষয়ে সিডিএ’র সাথে কথা বলছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সুরাহা হয়নি। তবে ইতিমধ্যে প্রথমবারের মতো সিটি কর্পোরেশন রিহ্যাব-প্রতিনিধি যুক্ত করেছেন। সেজন্য মাননীয় মেয়র আ জ ম নাসির উদ্দীনকে আমরা ধন্যবাদ জানাই। আমাদের যেমন কৃষিজমি প্রয়োজন তেমনি আধুনিক নগরায়ণের জন্য বর্তমান সিটির আশেপাশের এলাকাগুলোকেও সিটির আওতাভুক্ত করা অপরিহার্য।
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : সাইফুল ইসলাম