Home মূল কাগজ সাক্ষাৎকার

0 69

মাহমুদুল আনোয়ার রিয়াদ
আর্কিটেক্ট পার্টনার, ডি ডব্লিউ ফোর আর্কিটেক্টস

সাক্ষাৎকার : মির্জা মাহমুদ আহমেদ

আপনার বেড়ে ওঠা এবং স্থপতি হওয়ার গল্পটা কেমন ছিল?
আমি গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলে পড়েছি। এইচএসসি ঢাকা কলেজে। তারপর বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগে। স্কুলে থাকতেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম স্থপতি হব। ছবি আঁকতাম, লোগো, ব্লক দিয়ে জিনিসপত্র বানানোর ঝোঁক ছিল। স্থাপত্য পড়ার আগ্রহটা সেখান থেকেই এসেছে। আমাদের সময়ে শুধু বুয়েটেই স্থাপত্য বিষয়ে পড়াশোনা করা যেত। বুয়েটে চান্স না পেলে আমি হয়তো বিদেশে পড়তে যেতাম। আমি শুধু বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগেই ভর্তি-পরীক্ষা দিয়েছিলাম।
আমার বেড়ে ওঠাটা ধানমন্ডি এলাকায়। ওই এলাকায় আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ, জার্মান কালচারাল সেন্টার, রাশিয়ান কালচারাল সেন্টার, ইন্ডিয়ান কালচারাল সেন্টার এবং আমেরিকান কালচারাল সেন্টার ছিল। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ছিল ব্রিটিশ কাউন্সিল। তখন কালচারাল সেন্টারগুলোতে নিয়মিত যেতাম। সেই সুবাদে দু-চারটা ভালো সিনেমা দেখার সুযোগ হয়েছে, বই পড়ার সুযোগ হয়েছে। পরবর্তী সময়ে যা আমার মনোজগৎ তৈরিতে দারুণভাবে সহায়তা করেছে। আমার আব্বা ব্যবসায়ী হলেও ভীষণ শিল্পমনস্ক মানুষ ছিলেন। যার ছাপ কিছুটা হলেও আমার ওপর পড়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে কী কাজ করছেন?
সম্প্রতি গ্রামীণ টেলিকম ট্রাস্টের হেডকোয়ার্টারের কাজ শেষ করলাম। এ ছাড়াও প্রাইম ব্যাংকের হেডকোয়ার্টারের কাজ করছি। যৌথভাবে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের হেডকোয়ার্টারের কাজও করছি। একই সঙ্গে ছোট-বড় মিলিয়ে বেশকিছু কাজ করছি।
বর্তমানে পৃথিবীর বিখ্যাত একজন স্থপতির সঙ্গে ঢাকায় একটা বড় প্রজেক্টে আমরা লোকাল পার্টনার হিসেবে কাজ করছি। প্রজেক্টটা তেজগাঁওয়ে হবে আশা করি। ডিজাইনের মাঝপথে আছে প্রকল্পটি। এই কাজটি আমাদের জন্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।
আমেরিকার একজন স্থপতির সঙ্গে আমরা আড়ংয়ের ইন্টেরিয়র ডিজাইন করছি। ধানমন্ডির ২ নং রোডে আড়ং একটা বড় আউটলেট করতে যাচ্ছে। কাজটি খুব ইন্টারেস্টিং হবে বলে আশা করছি। এছাড়া ঢাকার বাইরেও কিছু কাজ করছি।
সেইলর, আড়ং, কিউরিয়াস ব্র্যান্ডের আউটলেটের ইন্টেরিয়র ডিজাইন আমরা করে থাকি। সম্প্রতি আমরা পিএমজি গ্যালারি নামে একটি বিল্ডিং ফিনিশড ম্যাটারিয়ালের শোরুমের কাজ করেছি। ওখানে টাইলস, বেসিন, কমোড ইত্যাদি পাওয়া যায়। আমরা একটা পুরনো ভাঙা ফ্যাক্টরিকে শোরুমে পরিণত করেছি। পিএমজি গ্যালারির কাজটা খুব ইন্টারেস্টিং। একটা পুরনো বিল্ডিংকে পুরোটা চেঞ্জ না করে সফেসটিকেটেড শোরুমে পরিণত করা হয়েছে।

বাংলাদেশে স্থাপত্যচর্চায় প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির জায়গাগুলো কী?
প্রায় ২৫ বছর ধরে স্থাপত্যচর্চা করছি। এর মধ্যে বাংলাদেশের স্থাপত্যের মান, অবস্থান অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আমরা যখন ’৯৫ সালে এই পেশায় আসি, তখন এ রকম ছিল না। বনানীতে একটা গ্যারেজের ভেতর আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠান শুরু করি। তখনও ভাবতাম না বাংলাদেশে এত মানুষ আর্কিটেকচার পড়বে, এত বিল্ডিং তৈরি হবে, এত আর্কিটেক্ট কাজ করবে। আমরা কোনো কিছু না বুঝেই প্যাশন থেকে স্থাপত্যপেশায় এসেছি। তখন কেউ জানতও না এই পেশার ভবিষ্যৎ কী হবে।
এই পেশাটা যখন দাঁড়িয়ে গেল তখন সবাই চিনল। অনেকেই এখন আর্কিটেক্ট হতে চায়। আমাদের সময়ে কোন বিষয়ে পড়ছি, সেটাই সাধারণ মানুষ বুঝত না। আমাদের আগের প্রজন্ম আরও বড় সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। এখনকার সমস্যাটা ভিন্ন। এখন অনেক বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থী আর্কিটেকচার পাস করে বেরোয়। কে যে ফ্ল্যারিশ করবে, কে যে কাজ করতে পারবে- কোনো ঠিক নেই। তার আগে আমরা বসে আছি জায়গা দখল করে। এছাড়া আমাদের এখানে কাজের ভলিউম বাড়ছে। বিদেশিদের অংশগ্রহণ বাড়বে। তাদের সঙ্গে কীভাবে প্রতিযোগিতা হবে? আমরা কি ওইরকম পরিশ্রম করতে প্রস্তুত? বিদেশিদের সঙ্গে কাজ করতে হলে বা প্রতিযোগিতা করতে হলে যথেষ্ট প্রস্তুতি নিতে হবে। ওই প্রস্তুতি-পর্ব যদি উপভোগ না করা যায়, তাহলে লোকাল আর্কিটেকচারে একটা ধস নামবে। বাংলাদেশের আর্কিটেকচার খারাপ- এটা কোনোদিন কেউ বলেনি। আমাদের যথাযথ পরিকল্পনার অভাব, রাস্তাঘাট খারাপ, অবকাঠামো খারাপ। তবে আপনি যদি ইন্ডিভিজ্যুয়াল বিল্ডিংয়ে ফোকাস করেন, দেখবেন অনেক ভালো মানের বিল্ডিং তৈরি হচ্ছে। এই ভালোটা যে সারাজীবন থাকবে, ব্যাপারটা এমনও না। এজন্য প্রত্যেক প্রজন্মকে শ্রম দিতে হবে। আমাদের দেশে এখনও আবাসন-ব্যবসায়ীভিত্তিক আর্কিটেকচারেও ডিজাইনের কদর আছে। পৃথিবীর অনেক দেশে এমনটা নেই। আমাদের দেশের গ্রাহকরা ডিজাইনের ব্যাপারে অনেক সচেতন। কোনো ডেভেলপার কোম্পানি যদি ডিজাইনের ব্যাপারে অবহেলা করে, দেখা যায় তারা দীর্ঘ সময় মার্কেটে টিকতে পারে না। এটা একটা ইতিবাচক দিক। এই পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি। আমি মনে করি পরিশ্রম উপভোগ করার প্রজন্মটা আরও কিছুদিন থাকতে হবে। পরিশ্রমের মানসিকতা যত বেশি ধরে রাখা যাবে, ততই আমাদের জন্য মঙ্গল।

আমাদের স্থাপত্য যদি বিশ্বমানের হয়, তাহলে আমরা বিশ্বমানের নগর গড়ে তুলতে পারছি না কেন?
নাগরিক হওয়াটা কঠিন। নাগরিক হতে হলে শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে চলতে হবে। দেখবেন, সকালে যখন ঝাড়ুদার ঝাড়ু দেন, তখন ঢাকা বেশ পরিষ্কারই লাগে। আর সন্ধ্যার দিকে দেখবেন অবস্থা খুবই খারাপ।
প্রতিদিন আমরা এটাকে ডোরম্যাট বা পাপোশের মতো ব্যবহার করছি। এ রকম করলে উন্নতি হবে না, এটা নিশ্চিত। প্রিয় চাদর বা শালের মতো ব্যবহার করলে অন্যরকম ফল হবে। নিজের প্রয়োজনে আমরা ঢাকাকে টিস্যু পেপারের মতো ব্যবহার করছি। আমরা যদি এই শহরের যত্ন নিতে না পারি, তবে ঢাকাকে বাঁচানো যাবে না। শুধু সুউচ্চ ভবন বা ফ্লাইওভার করে কোনো কাজ হবে না।
আমাদের এখানে অন্য জেলা থেকে লোকজন আসে, এসে এটাকে যাচ্ছেতাইভাবে ব্যবহার করে। তার জন্মস্থানকেই সে বাড়ি মনে করে। ঢাকাকে ‘ওউন’ করার ব্যাপারটা থাকে না। শহর বড় একটা জীবন্ত সত্তা। এটাকে দেখভাল করার জন্য খুবই বড় এবং দক্ষ একটা সিস্টেম থাকা দরকার। যেটা আমাদের নেই। সিস্টেম ডেভেলপ না করে আপনি যত কিছুই করেন না কেন, সেটা ফলপ্রসূ হবে না।

0 172

মাহমুদা মোমেন
সিনিয়র ভাইস প্রেন্সিডেন্ট এন্ড হেড অব রিটেইল ফাইন্যান্স সেন্টার
ট্রাষ্ট ব্যাংক লিমিটেড

সাক্ষাৎকার গ্রহণঃ মির্জা মাহমুদ আহমেদ

ব্যাংকের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করার চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে বলুন। কতোটা উপভোগ করেন?
ব্যাংকিং সেক্টরে প্রতিদিনই নতুন নতুন পরিবর্তন আসছে। একই সঙ্গে এনপিএল (নন পারফর্মিং লোন)বেড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ক্লাসিফাইড লোনের পরিমান ছিল ১,১৬,২৮৮ কোটি এবং এনপিএল (নন পারফর্মিং লোন) প্রায় ১২ শতাংশ, যা ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। দক্ষতার সঙ্গে লোন দেয়া এবং সেটা আবার যথাসময়ে ফেরত নিয়ে আসা বর্তমান সময়ে ব্যাংকসহ যেকোন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে আমরা কিন্তু চ্যালেঞ্জটাকে মোকাবিলাও করতে পারি। সুশাসন ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। ট্রাষ্ট ব্যাংকের বোর্ড অব ডিরেক্টরস থেকে শুরু করে ম্যানেজমেন্ট লেভেলে যারা আছেন তারা লোন দেয়ার ব্যাপারে খুবই স্বচ্ছতা বজায় রাখেন।
ট্রাষ্ট ব্যাংকের একজন কর্মী হিসেবে বলতে পারি, আমি খুবই ভাগ্যবান; কারণ কোনো লোনের ব্যাপারে আমাদের ওপর কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করা হয় না। লোন দেয়ার ব্যাপারে অযাচিত কোন চাপ আমাদের ফিল করতে হয়না। নিয়ম অনুযায়ী গ্রাহক লোন পাওয়ার উপযুক্ত হলেই কেবল লোন পাস করা হয়। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং সেক্টরে আরেকটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, প্রতিনিয়ত রেগুলেশন পরিবর্তিত হচ্ছে। গত বছর ঋণ পুনঃ তফসিলের ডাউন পেমেন্টের পরিমাণ যেটা ছিল সেটা পরিবর্তন করে হঠাৎ ২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। এটা ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। ঋণ পুনঃ তফসিলের পলিসি পরিবর্তন করে দেওয়ায় ব্যাংকের পোর্টফোলিও ভালো হচ্ছে কিন্তু পরবর্তী সময়ে ভালো ঋণগুলো মন্দ ঋণে পরিণত হওয়ার আশস্কা থেকে যাচ্ছে। এই ঋণগুলোকে নজরদারীতে রাখাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যাংকিং খাত অস্থিতিশীল থাকার পরও ট্রাষ্ট ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা এবার অনেক ভালো হয়েছে। আমাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পেরেছি। আশা করি, সামনের দিনগুলোতে আমরা আরও এগিয়ে যাব।এই অর্জন সম্ভব হয়েছে আমাদের ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট এবং বোর্ড অব ডিরেক্টরসদের পরিচালন দক্ষতার কারনে।


রিটেইল ব্যাংকিং এ ট্রাষ্ট ব্যাংক কোন কোন ক্ষেত্রগুলোতে ঋণ প্রদান করে? ট্রাষ্ট ব্যাংকের হোম লোন সম্পর্কে জানতে চাই?
রিটেইল ব্যাংকিংয়ে অন্য সব ব্যাংক যেসব খাতে ঋণ প্রদান করে, আমরাও সেসব খাতে ঋণ প্রদান করে থাকি। রিটেইলে আমরা হোম লোন, পারসনাল লোন, কার লোন দিয়ে থাকি। ট্রাষ্ট ব্যাংকের টোটাল রিটেইল পোর্টফোলিও প্রায় ৩,১০০ কোটি টাকা। এই পোর্টফোলিওর মধ্যে আমরা প্রায় ৬০০ কোটি টাকা হোম লোন দিয়েছি। ব্যাংকিং খাতে এনপিএল যেখানে ১২ শতাংশ, সেখানে আমাদের ব্যাংকের রিটেইল এনপিএল ২ শতাংশেরও কম। বর্তমান সরকার আবাসন সেক্টরকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি হোমলোনের সীমা ১.২০ কোটি থেকে বাড়িয়ে ২ কোটি করা হয়েছে। পূর্বাচল,উত্তরা তৃতীয় ফেজ, কেরানীগঞ্জে নতুন শহর গড়ে উঠছে। ট্রাষ্ট ব্যাংক এসব প্রকল্পে হোম লোন দিতে আগ্রহী। আমরা মনে করি হোম লোন বিতরণের মাধ্যমে আমরা একটা সিকিউরড সেগমেন্টে বিনিয়োগ করতে পারব। একই সাথে হোম লোন দেয়ার মাধ্যমে মানুষের স্থায়ী আবাস সৃষ্টিতে ট্রাষ্ট ব্যাংক ভূমিকা রাখতে পারবে। শহর এলাকার পাশাপাশি ট্রাষ্ট ব্যাংক ২০১৭ সাল থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে সব্বোর্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত হোম লোন দিচ্ছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে হোম লোন দেয়ার ক্ষেত্রে আমরা জমির মূল্যকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকি। বাজার যাচাই করে এবং রিপেমেন্ট বিহ্যেভিয়্যার দেখে আমরা পুরোদমে ইউনিয়ন পর্যায়ে হোমলোন দেয়া শুরু করবো।
আমানতকারীদের ট্রাষ্ট ব্যাংক কি কি সুবিধা দিচ্ছে?
ট্রাষ্ট ব্যাংকে বিভিন্ন ধরনের এফডিআর ডিপোজিট স্কিম আছে। ট্রাষ্ট অ্যাসুরেন্স ডিপোজিট স্কিম (টিএডিএস) নামে আমাদের একটা প্রোডাক্ট আছে। টিএডিএস ডিপোজিট স্কিমে আমানতের বিপরীতে গ্রাহককে ইন্সুরেন্স কাভারেজ দেয়া হয়। বিভিন্ন ইন্সুরেন্স কোম্পানির চেয়ে বেশি হারে আমরা ইন্সুরেন্স কাভারেজ দিচ্ছি।
এই ডিপোজিট স্কিমের সুবিধা হচ্ছে আমানতকারী যেকোন পরিমাণ আমানত গচ্ছিত রেখে মৃত্যুবরণ করলেও তাঁর মনোনীত ব্যক্তি মেয়াদ পূর্তিতে প্রতিশ্রুত সমুদয় অর্থ প্রাপ্ত হবেন এবং খুব দ্রুততম সময়ে কোন ভোগান্তি ছাড়াই মনোনীত ব্যক্তি এই অর্থ উত্তোলন করতে পারেন।
এছাড়া নারী-গ্রাহকদের জন্য ‘ট্রাষ্ট সৃষ্টি’ নামে আমাদের একটি প্রোডাক্ট আছে সেখানেও আমরা ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ইন্সুরেন্স কাভারেজ দিয়ে থাকি। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ট্রাষ্ট ব্যাংক ‘স্টুডেন্ট ব্যাংকিং’ চালু করেছে। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ডিপোজিট গ্রহণের পাশাপাশি ল্যাপটপ কেনার জন্য আমরা সহজ শর্ত ও স্বল্প সুদে ডিজিটাল লোন দিচ্ছি। ট্রাস্ট ব্যাংকে যাদের স্টুডেন্ট অ্যাকাউন্ট আছে তারা অভিভাবকের মাধ্যমে এই ডিজিটাল লোন সুবিধা নিতে পারেন।
পথশিশুদের ব্যাংকিং সেবার আওতায় নিয়ে আসতে আমরা নিরলস কাজ করে যাচ্ছি। এরই ধারাবাহিকতায় খুলনায় একটি কার্যক্রম পরিচালনা করছি।


ট্রাষ্ট ব্যাংক রিটেইল ব্যাংকিংয়ে বিশেষায়িত কী সেবা দিচ্ছে বা ভবিষত্যে কি ধরনের বিশেষায়িত সেবা দেয়ার পরিকল্পনা আছে?
ফ্রিল্যান্সারদের জন্য আমাদের একটি বিশেষায়িত লোন প্রোডাক্ট আছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সাথে একত্রিত হয়ে আমরা পরীক্ষামূলকভাবে প্রোডাক্টটি চালু করেছি। শিগগিরই প্রোডাক্টটি পুরোদমে চালু করার ইচ্ছা আছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় থেকে আইসিটি বিষয়ক কোর্স শেষ করে যারা উদ্যোক্তা হতে চায় তাদেরকে এই প্রোডাক্টের আওতায় লোন দেয়া হবে। ফ্রিল্যান্সাররা যাতে এসএমই লোনে শর্ত পূরণের ঝামেলা এড়িয়ে সহজে লোন নিতে পারেন, সেজন্যই এই প্রোডাক্টটি চালু করা। এই লোনের ক্ষেত্রে ট্রেড লাইন্সেসসহ বাড়তি কাগজপত্র জমা দেয়ার ঝামেলা থাকবে না। এই লোন সুবিধাটা চালু হলে তথ্য প্রযুক্তি খাতে যারা উদ্যোক্তা হতে চায় তারা দারুণভাবে উপকৃত হবে।

যেসব নারী ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ক্যারিয়ার গড়তে চায় তাদের প্রতি আপনার পরামর্শ কি?
আমি যখন ব্যাংকিং সেক্টরে কর্মজীবন শুরু করি তখন ব্যাংকে নারী কর্মীর সংখ্যা অনেক কম ছিল। এখন অনেক বেড়েছে। নারী-কর্মী বাড়ার পেছনে প্রধানত দুটি কারণ কাজ করেছে প্রথমত নারীরা তাদের মেধা ও দক্ষতা দিয়ে এই সেক্টরে কাজ করার যোগ্য হিসেবে নিজেদের তৈরি করেছেন। দ্বিতীয়ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্ট নারী-কর্মীদের ওপর আস্থা রাখছেন। আমাদের বর্তমান সামাজিক অবস্থা চিন্তা করলে আমি মনে করি ব্যাংকিং সেক্টরে কাজ করা নারীদের জন্য বেশ নিরাপদ। এখানে কাজের পরিবেশ খুব ভালো।
ব্যাংকিং সেক্টরে যারা ক্যারিয়ার গড়তে চায়, তাদের প্রতি আমার পরামর্শ হলো, অনেক বেশি পড়তে হবে, জানতে হবে এবং ডেডিকেশন দেখাতে হবে। সেই সঙ্গে সময়, সততা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করে যেতে হবে।

0 120

স্থপতি নবী নেওয়াজ খান
আর্কিটেক্ট পার্টনার, আর্কি গ্রাউন্ড
সহকারী সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট

সাক্ষাৎকার গ্রহণঃ মির্জা মাহমুদ আহমেদ

আপনার বেড়ে ওঠার গল্প শুনতে চাই। স্থপতি হওয়ার ভাবনাটা কবে এলো?
আমার জন্ম ঢাকায়। বেড়ে ওঠা কলাবাগান এলাকায়। উদয়ন স্কুল থেকে এসএসসি, ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি শেষে ভর্তি হলাম বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগে। স্থপতি হব বা স্থাপত্য পেশায় আসবো কখনো ভাবিনি আগে। ছোটবেলায় ভালো ছবি আঁকতাম, অনেক পুরস্কারও পেয়েছি। স্কুলে পড়ার সময় মা একবার বলেছিলেন,তোর তো ছবি আঁকার শখ। তুই বড় হয়ে স্থপতি হতে পারিস। বুয়েটে স্থাপত্য বিভাগে চান্স পাওয়ার পর দেখলাম আমার চাওয়া- পাওয়া, এসপিরেশন এবং চিন্তা ভাবনার সঙ্গে এ পেশাটা অনেকখানি মিলে যাচ্ছে।
এখন যখন চিন্তা করি,মায়ের ওই কথাটা খুব মনে পড়ে, নাড়া দেয়।
বুয়েটের সময়টা আমার কেটেছে শেরেবাংলা হলে। ৩১১ নাম্বার রুমে আমরা চার-পাঁচজন বন্ধু মিলে থাকতাম। সেখানেই লেখাপড়া, সেখানেই কাজ।
রাত জেগে মডেল বানানো, ডিজাইন করা, ড্রইং বানানো। হলে অনেক মজার স্মৃতি আছে আমার। একসঙ্গে কাজ করতে করতে মধ্যরাতে বের হয়ে যাওয়া। পলাশীর মোড়ে আড্ডা, পুরনো ঢাকায় কাবাব-পরোটা খাওয়া। একসঙ্গে মুভি দেখা। গভীর রাতে হলের ছাদে গিয়ে গান-বাজনা করা। হলে থাকার সুবাদে সুন্দর একটা সময় কেটেছে। সিনিয়র-জুনিয়ররা একই মনমানসিকতার হওয়ার কারণে একাডেমিক কাজে যেমনি সহায়তা পাওয়া যেত, তেমনি সময়টাও ছিলো খুব উপভোগ্য। যেটা এই সময়ে খুব অভাববোধ করি। আর্কিটেকচারে নলেজ শেয়ারিং খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটা ড্রইং সবাই দেখছে,মতামত দিচ্ছে, অনেকগুলো চোখ দিয়ে আমার মডেল বা ড্রইং জাস্টিফাই হচ্ছে-শেখাটা তখন আরও প্রগাঢ় হয়। একসঙ্গে কাজ করা স্থাপত্য পেশায় খুবই জরুরী। আমি এখন ব্র্যাকে শিক্ষকতা করছি। আমি আমার শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দেই যাতে ওরা একসঙ্গে কাজ করে। তাতে অনেকগুলো চোখ দিয়ে একটা জিনিস দেখা হয়, ভাবনার সমন্ধয় হয়, নানা রকম মতামত পাওয়া যায়, দৃষ্টিভঙ্গীটাও সমৃদ্ধ হয়।
আগা খান অ্যাওয়ার্ড ফর আর্কিটেকচার ২০১৯-এর সংক্ষিপ্ত তালিকায় থাকা আম্বার ডেনিম লুম শেড এবং আপনার সাম্প্রতিক কাজ সম্পর্কে জানতে চাই?
আম্বার ডেনিম লুম শেড আসলে আমাদের ফার্মের একটা প্রজেক্ট। ডেনিম লুম শেডের স্থাপত্য ভাবনাটা ছিলো আমার পার্টনার জুবায়ের হাসানের। সহযোগী হিসেবে ছিলাম আমি এবং লুৎফুল­াহিল মজিদ রিয়াজ। আমাদের তিনজনের প্রতিষ্ঠান-আর্কি গ্রাউন্ড। ডেনিম লুম শেড একটি পরিবেশবান্ধব কারখানা। এতে আমাদের ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্পের ছোট একটা মিজেন টাইপ বলতে পারেন। তাঁতশিল্পের বির্বতন এই কারখানাটিতে তুলে আনা হয়েছে। তাঁত থেকে শুরু করে সেমি অটোমেটেড মেশিন, ফুল অটোমেটেড মেশিন বস্ত্রখাতের ট্রান্সফরমেশনের সুন্দর একটা গল্প পাওয়া যায়।
বর্তমানে আমরা কিছু আবাসন প্রকল্প নিয়ে ব্যস্ত। সেইসঙ্গে মসজিদ প্রজেক্ট, গ্রিণ ফ্যাক্টরী বিল্ডিং, কর্মাশিয়াল অফিস প্রজেক্টের কাজ করছি। ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরী বিল্ডিংটা আমার ডিজাইন করা। ওদের পার্মানেন্ট ক্যাম্পাসটাও আমার ডিজাইনে তৈরি। লাইব্রেরি বিল্ডিংটার বিশেষত্ব হচ্ছে এর পুরো ম্যাটারিয়েলটা ছিলো হ্যান্ডমেইড। আমার উদ্দেশ্য ছিলো লো-কস্টের ম্যাটারিয়াল দিয়ে বিল্ডিংটা বানানো। একদিন সাইটে গিয়ে দেখলাম অযত্ন-অবহেলায় কিছু সুরকি পড়ে আছে। আমার ভাবনায় এলো এই সুরকিগুলোকে কিভাবে কাজে লাগানো যায়। সুরকিগুলোকে মর্টার দিয়ে গুলিয়ে একটা আস্তর করলাম। আস্তরণটা প্লাস্টারের মতোই যাকে আমরা আর্কিটেকচারের ভাষায় ‌‌‌’পেবেল ওয়াস টেকনিক’ বলে থাকি। এই প্রক্রিয়াতে সুরকিগুলোকে মর্টারে গুলিয়ে প্লাস্টারের মতো আস্তরণ তৈরি করা হয়। তারপর লেপা হয়। আস্তরণটা জমাট বাঁধার পর পানি দিয়ে ধোঁয়া হয়। পানি দিয়ে ধোঁয়ার পর সুরকির দানাগুলো বের হয়ে আসে। পুরো বিল্ডিংটা লাল অবয়ব ধারণ করে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, পুরো নকশাটা করা হয়েছে রিসাইকেল ম্যাটারিয়ালস ব্যবহার করে। ভবনের নকশা প্রক্রিয়াটিও পুরোটা ক্রাফটসম্যানশীপ নির্ভর। বিল্ডিংয়ের আউটার ইনার দুই জায়গাতেই একই ধরনের ম্যাটারিয়াল অর্থাৎ সুরকি দিয়ে ক্রাফটিং করা হয়েছে। পড়ে থাকা অব্যবহৃত সুরকি দিয়ে এত সুন্দর নকশা করা যায় এই বিল্ডিংটা না দেখলে কেউ বিশ্বাস-ই করবে না।
ঢাকার পরিবেশ রক্ষায় ‘গ্রীণ আর্কিটেকচার’ কি ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন?
আমাদের ট্রাডিশনাল স্থাপনা যেগুলো আছে গ্রাম বাংলার বা আদিবাসীদের আদি যে কাঠামোগুলো-সবই কিন্তু গ্রিণ। এসব স্থাপনা ‘গ্রিণ’ করার জন্য কোন বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হয়েছে ব্যাপারটা এমন নয়। এখনকার সময়ে যে কর্মাশিয়াল বিল্ডিং বা ফ্যাক্টরী বিল্ডিংগুলো হচ্ছে, সেগুলো কিন্তু অনেকখানি এনার্জী কনজ্যুম করছে। বিল্ডিংগুলোর স্ট্রাকচার এমনভাবে করা হয়েছে যাতে করে সবসময় এসি ছেড়ে রাখতে হচ্ছে। পানির অপচয় বেশি হচ্ছে। ইলেকট্রিসিটি বেশি খরচ হচ্ছে। এগুলো কিন্তু ভালো লক্ষণ না।
একটা বিল্ডিং কীভাবে এনার্জী এফিসিয়েন্ট করা যায়,ইকোনমিক্যালি কীভাবে আরও সাশ্রয়ী করা যায় বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেটা খুব জরুরী বিষয়। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সরকারও কিন্তু এখন ‘গ্রিণ বিল্ডিং’ নির্মাণে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। নির্মাণাধীন হাইরাইজ ভবনগুলোতে কীভাবে এসি, ইলেকট্রিসিটির ব্যবহার কমানো যায়, পানির অপচয় কিভাবে কমানো যায়, রেইন ওয়াটার কিভাবে হারভেস্ট করা যায়-এসব বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে সরকারের জোরালো নির্দেশনা আছে। ঢাকার প্রেক্ষাপট এবং গ্লোবাল প্রেক্ষাপটেও যদি বলি,বর্তমান সময়ে হাইরাইজ বিল্ডিং নির্মাণে অবশ্যই গ্রিণ সাসটেইনেবল হওয়া উচিত। একটা বিল্ডিংকে গ্রিণ বিল্ডিং হিসেবে দাঁড় করাতে বেশি কিছু করার প্রয়োজন নেই। যদি স্বাভাবিকভাবে একটা বিল্ডিং এর পশ্চিম দিকের তাপটা আটকাতে পারি, দক্ষিণের বাতাসটা আনতে পারি, উত্তরের আলোটা কাজে লাগাতে পারি, ইলেকট্রিসিটি ও পানির খরচ কমাতে পারি, তাহলে একটা বিল্ডিং এমনিতেই গ্রিণ হয়ে যায়। আমাদের এমনিতেই ন্যাচারাল রির্সোস কম । যতটুকু আছে, তাও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। এমন বাস্তবতায় স্থপতি হিসেবে এসব ন্যাচারাল রির্সোস ও পরিবেশ রক্ষায় আমাদের এগিয়ে আসা উচিত। আমাদের ভুলের কারণে বা অসচেতনতায় পৃথিবীর ক্ষতি হোক, মানুষের ক্ষতি হোক-সেটা চাই না। তাই সবারই উচিত যার যার জায়গা থেকে পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে আসা।

0 268

কামাল মাহমুদ
ভাইস প্রেসিডেন্ট, রিহ্যাব ও
কো-চেয়ারম্যান, রিহ্যাব উইন্টার ফেয়ার ২০১৯ স্ট্যান্ডিং কমিটি

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : মির্জা মাহমুদ আহমেদ

দেশে আবাসন ব্যবসার সার্বিক অবস্থা এখন কেমন?
সরকারি কর্মকর্তাদের ৫ শতাংশ সুদে যে গৃহঋণ দেয়া হচ্ছে, এর ফলে সরকারি কর্মকর্তারা রেডি ফ্ল্যাট কেনার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করছেন। স্বল্পসুদে গৃহঋণ অনুমোদন হওয়ার পর আবাসন ব্যবসায় সার্বিক প্রবৃদ্ধি ১০-১৫ শতাংশ বেড়েছে। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার ওপরে অনেক কিছু নির্ভর করে। অর্থনৈতিক অবস্থা যত গতিশীল হবে আবাসন ব্যবসার প্রসারও ততটা বাড়বে। আমাদের দেশে যারা ফ্ল্যাট কেনেন, তারা মূলত সরকারি ব্যাংক থেকে দীর্ঘমেয়াদী গৃহঋণ প্রত্যাশা করেন। যেকোনো অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকগুলো যদি সহায়তা করে তাহলে যারা ফ্ল্যাট কিনতে চান তাদের জন্য ভালো হয়। পৃথিবীর কোনো দেশেই গৃহঋণ-সুবিধা ছাড়া ফ্ল্যাট বিক্রি হয় না। উন্নত দেশগুলোতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এমন দীর্ঘমেয়াদী কিস্তি-ব্যবস্থা চালু আছে, যাতে ভাড়ার টাকার মাধ্যমেই কিস্তি পরিশোধ করা যায়। আমরা আশা করি, এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদী কিস্তি-সুবিধা বাস্তবায়নে সরকার এগিয়ে আসবে।

এবার রিহ্যাব উইন্টার ফেয়ারে কী ধরনের আয়োজন থাকছে?
এবারের মেলায় সব ধরনের আয়োজনই থাকছে। সাধ ও সাধ্যের মধ্যে সবার প্রত্যাশা অনুয়ায়ী ফ্ল্যাট পাওয়া যাবে এবারের রিহ্যাব ফেয়ারে। মধ্যবিত্ত পরিবার, যারা ষাট থেকে আশি লাখের মধ্যে ফ্ল্যাট চাচ্ছেন- তাদের জন্য অনেক ফ্ল্যাট থাকবে। এ ছাড়া উচ্চবিত্তদের জন্য দুই থেকে চার কোটি টাকার ফ্ল্যাটও মেলায় পাওয়া যাবে। নিম্নবিত্তদের জন্যও এলাকাভেদে ৩০ লক্ষ টাকার ফ্ল্যাটও বিক্রি হবে। এ ছাড়াও এবারের মেলায় রেডি ফ্ল্যাট অনেক বেশি থাকবে। ২০১৩ সালের পরে এবারই অনেক বেশিসংখ্যক আবাসন প্রতিষ্ঠান রিহ্যাব উইন্টার ফেয়ারে অংশগ্রহণ করছে।

ঢাকার ওপর প্রতিনিয়ত চাপ বাড়ছে। ঢাকার বাইরে পরিকল্পিত আবাসন গড়তে রিহ্যাব কী কাজ করছে?
আগামী দশ বছরে আবাসন গড়ার মতো আর কোনো জমি ঢাকায় থাকবে না। ঢাকায় জমির সংকট তৈরি হবে। ঢাকার বাইরে পরিকল্পিত আবাসন গড়তে সরকারের পক্ষ থেকে রিহ্যাবের মাধ্যমে যদি আবাসন ব্যবসায়ীদের জমি দেয়া হয়, তাহলে আমরা মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের জন্য পরিকল্পিত আবাসন গড়ে তুলতে পারব। সেই সঙ্গে জনসংখ্যার তুলনায় আবাসনের যে সংকট-সেটাও কাটিয়ে উঠতে পারব।

আবাসন ব্যবসা প্রসারে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলে মনে করেন?
বর্তমানে গৃহঋণে সরল সুদের প্রবর্তন করা জরুরি বলে মনে করি। কিছু কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান আছে, যারা প্রথমে ঋণ দেয়ার সময় সুদের হার ১০ শতাংশ বললেও একটা পর্যায়ে সুদের হার ১৩ শতাংশ থেকে ১৪ শতাংশে নিয়ে যায়। হাউজ বিল্ডিং ফিন্যান্স করপোরেশনসহ রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকগুলো সরল সুদে গৃহঋণ দেয়। ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সরল সুদে গৃহঋণ দেয়, তবে গ্রাহকের জন্য বোঝা হবে না।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রেশন ফি কমানোর ঘোষণা দিয়েছেন। আবাসন খাতের প্রসারে প্রজেক্ট লোন, থোক বরাদ্দ ও দীর্ঘমেয়াদী গৃহঋণের ব্যবস্থা করলে আবাসন খাত আবার ঘুরে দাঁড়াবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

মোহাম্মদ আবদুর রশিদ টিপু
রাজধানী ঢাকাসহ ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলো রয়েছে আগুনের ঝুঁকিতে। চলতি বছর ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টা ও বনানীর এফ আর টাওয়ারে সংঘটিত ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের প্রাণ গেছে শতাধিক মানুষের। ফলে আবাসিক, দাপ্তরিক ও বাণিজ্যিক ভবনসহ কল-কারখানায় অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি এখন খুবই গুরুত্ব দিয়ে ভাবা হচ্ছে। কীভাবে আগুন থেকে নিরাপদ থাকা যাবে-এ সম্পর্কে কারিকা’র সঙ্গে কথা বলেছেন দেশের একমাত্র সার্টিফায়েড অগ্নিনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আবদুর রশিদ টিপু। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা স্টেট ইউনিভার্সিটির কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং আর্কিটেকচার অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে প্রথম সার্টিফায়েড ফায়ার সেফটি ইঞ্জিনিয়ার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সোহরাব শান্ত

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অগ্নিনিরাপত্তার দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান কেমন?
আগুন লাগার ঘটনা যেকোনো সময়ই ঘটতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে উন্নত দেশগুলো এসব ব্যাপারে সচেতন। তারা যেকোনো ভবনের অগ্নিপ্রতিরোধ ব্যবস্থায় জোর দেয়। ফলে যেকোনো অগ্নিকান্ডকে সহজে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারে এবং ওইসব দেশে প্রাণহানিও অনেক কম।
অগ্নিনিরাপত্তার দিক দিয়ে গড়পড়তায় আমাদের দেশের অবস্থান খুব ভালো- তা বলা যাবে না। তবে গার্মেন্টস সেক্টর এর ব্যতিক্রম। বাংলাদেশের প্রায় সব গার্মেন্টস কারখানা এখন অনেক সুরক্ষিত। সাভারের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর কারখানাগুলো অগ্নিনিরাপত্তায় ব্যাপক সতর্কতামূলক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তবে ভারী শিল্প-কারখানাগুলো এদিক দিয়ে অনেক পিছিয়ে আছে। বাণিজ্যিক ভবনসহ অন্যান্য ভবনেও অগ্নিনিরাপত্তায় ঘাটতি আছে।

অগ্নিনিরাপত্তায় ঘাটতির কারণ কী বলে মনে করেন? এ থেকে উত্তরণের উপায় কী?
অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটা ব্যয়বহুল ব্যাপার। আমাদের দেশের ভবন মালিক বা কারখানার মালিকরা খরচের ভয়ে এ দিকটিতে ততটা গুরুত্ব দেন না। আবার অনেক কারখানা মালিক তা করতে গিয়ে খরচ মেটাতে হিমশিম খান। এর কারণ হলো দক্ষ ফায়ার সেফটি ইঞ্জিনিয়ার এবং দক্ষ লোকবলের অভাব। যারা বাংলাদেশে ফায়ার সেফটি নিয়ে কাজ করেন, তাদের স্বল্প জ্ঞান ও অনেক ক্ষেত্রে ওভার ডিজাইনের কারণে খরচ বেড়ে যায়। আবার সঠিক ডিজাইনেরও ভুলভাবে স্থাপনের কারণে সিস্টেম কাজ করে না। তাই কারখানার মালিকদের উচিত একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ ফায়ার সেফটি ইঞ্জিনিয়ার দ্বারা ডিজাইন করা। এতে খরচ কমবে এবং সিস্টেমও কাজ করবে। পাশাপাশি দেশে ফায়ার সেফটির ওপর প্রাতিষ্ঠানিক কোর্স চালু করতে হবে। এতে দেশে গড়ে উঠবে দক্ষ ফায়ার সেফটি ইঞ্জিনিয়ার।

অগ্নিকান্ডের কারণ কী কী?
বৈদ্যুতিক ত্রুটির পাশাপাশি সিগারেটের আগুন, গ্যাসের চুলা, গ্যাস সিলিন্ডার, রাসায়নিক দ্রব্য, বিস্ফোরণ, আগুন নিয়ে খেলা ও অসতর্কতাসহ নানা কারণে ঘটে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড। বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও রান্নার সরঞ্জাম, ওয়াশিং মেশিন, হিটার, ড্রায়ার, এয়ার কন্ডিশনার, ফ্যান, রাসায়নিক গ্যাস, প্রাকৃতিক গ্যাস ও এলপি গ্যাসের কারণে আগুন লাগতে পারে। ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক তারও অগ্নিকান্ডের কারণ হয়। বৈদ্যুতিক তারের লুজ কানেকশন, প্ল্যাগ ওভার লোডেড, পুরনো বৈদ্যুতিক ইকুইপমেন্ট ব্যবহার ইত্যাদি অগ্নিকান্ডের কারণ হতে পারে। এছাড়া যেকোনো দাহ্য বস্তুর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বড় অগ্নিকান্ডের কারণ হতে পারে। পাইপলাইনের মাধ্যমে বা সিলিন্ডার ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে অসতর্কতায় রান্নাঘরে গ্যাস জমে থাকলে দেয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বালালে এমনকি মশা মারার ব্যাট চালু করলেও আগুন লাগতে পারে। এছাড়া বজ্রপাত থেকেও আগুনের সূত্রপাত হতে পারে।

ছোট-বড় ভবনগুলোকে অগ্নিকান্ড থেকে রক্ষায় কী করা উচিত?
চারটি বিষয় বিবেচনা করে ভবন নির্মাণ করলে আমরা সহজেই ভয়াবহ অগ্নিকান্ড থেকে রক্ষা পেতে পারি-
১. অগ্নিপ্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ফায়ার প্রটেকশন
২. ফায়ার অ্যালার্ম সিস্টেম
৩. আগুনকে আবদ্ধ করে রাখার ব্যবস্থা ও
৪. নিরাপদ বহির্গমন পথ।
অগ্নিপ্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ফায়ার প্রটেকশনের মধ্যে ‘স্প্রিংকলার সিস্টেম’ অন্যতম। অগ্নিকান্ডে স্প্রিংকলার সিস্টেম একটি সক্রিয় অগ্নিসুরক্ষা পদ্ধতি। এই সিস্টেম পর্যাপ্ত পানিপ্রবাহ দ্বারা পরিচালিত। সিস্টেমটি বৃহৎ বাণিজ্যিক ভবন, হাসপাতাল, হোটেল, শিল্প-কারখানা, ঘরবাড়ি এবং ছোট ভবনে স্থাপন করা যায়। যদিও পদ্ধতিটি ব্যয়বহুল, সারা বিশ্বে এই পদ্ধতি ব্যবহার হচ্ছে। অ্যামব্রোস গডফ্রে ১৭২৩ সালে প্রথম সফল স্বয়ংক্রিয় স্প্রিংকলার সিস্টেম তৈরি করেন। আমেরিকায় ১৮৭৪ সাল থেকে স্প্রিংকলার সিস্টেম ব্যবহার শুরু হয়। উন্নত বিশ্বে স্প্রিংকলার সিস্টেম স্থাপনে টোটাল কনস্ট্রাকশন খরচের মাত্র ১ শতাংশ খরচ হয়। আমাদের দেশে খরচ হয় প্রায় ২ থেকে আড়াই শতাংশ। কারণ আমাদের দেশে সব সরঞ্জাম বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। অগ্নিপ্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ফায়ার প্রটেকশনে আরেকটি বিষয় হলো-স্ট্যান্ডপাইপ সিস্টেম, যা ফায়ার পাম্পের সঙ্গে পাইপের মাধ্যমে সংযুক্ত করা থাকে।
ফায়ার অ্যালার্ম সিস্টেম প্রাণহানি রোধে খুবই কার্যকর। কোনো ভবনে আগুন লাগলে, কেউ যদি দেখতে পায়, তাহলে সেই ব্যক্তি অ্যালার্ম সুইচে চাপ দিলে সেন্ট্রালি বেল বেজে উঠবে এবং লোকজন সহজে ভবনে আগুন ছড়ানোর আগেই বের হয়ে আসতে পারবে। ফায়ার ডিটেকশন সিস্টেম আগুন লাগার প্রাক্কালে ধোঁয়াকে শনাক্ত করে এবং ফায়ার অ্যালার্ম কন্ট্রোল প্যানেলে সংকেত পৌঁছায়। এতে করে সহজেই মানুষ অগ্নিকান্ডের উৎপত্তিস্থল এবং অগ্নিকান্ড সম্পর্কে অবগত হতে পারে।
আগুনকে আবদ্ধ করে রাখার ব্যবস্থা (ফায়ার কনটেইনমেন্ট) হলো, যে কক্ষে বা ফ্লোরে আগুন লাগে সেখানেই আগুনকে আটকে রাখার ব্যবস্থা। অর্থাৎ আগুনকে ছড়াতে না দেওয়া। এর জন্য ফায়ার ডোর স্থাপন এবং ফ্লোর টু ফ্লোর পেনিটেশন বন্ধ করা উচিত। তাতে সহজেই এক ফ্লোর থেকে অন্য ফ্লোরে আগুন যেতে পারবে না।
নিরাপদ বহির্গমন পথ বা বের হয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেক ভবনের ফ্লোর থেকে সিঁড়ি যদি আলাদা করা থাকে, তাহলে লোকজন নিরাপদে ও সহজে ভবন থেকে অক্ষত অবস্থায় বের হয়ে আসতে পারবে।
এই চারটি বিষয় মেনে বহুতল ভবন, কল-কারখানা, হোটেল, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, আবাসিক ভবন ইত্যাদি নির্মাণ করা হলে আমাদের দেশে বড় ধরনের অগ্নিকান্ড ঘটার ঝুঁকি কমে যাবে। আগুন লাগলেও কোনো প্রাণহানি ঘটবে না। দেশের সরকারি ও বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ফায়ার প্রটেকশন এবং ডিটেকশনের আওতায় আনা উচিত। বিভিন্ন ভবনে এই সুবিধা না থাকলে এসব ভবনের অভ্যন্তরে অবস্থানকারী কেউ জানতে পারবে না আকস্মিক অগ্নিকান্ডের তথ্য।

অগ্নিকান্ড রোধে সচেতনতার বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখেন?
অগ্নিদুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেতে সবাইকে সচেতন হতে হবে। ফায়ার ব্রিগেডসহ জনগণকে অধিক সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। বর্তমানে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে অগ্নিকান্ডের খবর আসছে। তাই সিলিন্ডার ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার পরিহার করতে হবে। গ্যাস সিলিন্ডারে সাংকেতিকভাবে মেয়াদ উল্লেখ থাকে। যেমন সিল্ডিারের গায়ে ই২২ লেখা থাকলে বুঝতে হবে ওই সিলিন্ডারটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার তারিখ ২০২২ সালের জুন মাস। এলপিজি বছরকে মোট চারটি ভাগে ভাগ করে। সেগুলো হলো-A, B,C ও D
Aমানে জানুয়ারি থেকে মার্চ, B মানে এপ্রিল থেকে জুন,Cমানে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর এবং D মানে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর। মেয়াদের তারিখ এই কোড অনুযায়ীই নির্ধারণ করা হয়ে থাকে।

0 557

ড. মো. মাকসুদ হেলালী
অধ্যাপক, যন্ত্রকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : মির্জা মাহমুদ আহমেদ

শুধু রাজধানী ঢাকাতেই নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিনিয়ত গড়ে উঠছে বহুতল ভবন। জানতে চাই, সামগ্রিকভাবে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটুকু শক্তিশালী বা দুর্বল বলে মনে করেন?
পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা খারাপ, সেটা বলা যাবে না। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আমেরিকায় প্রতি বছর প্রতি লাখে অগ্নিদুর্ঘটনায় একজন মানুষ মারা যায়। রাশিয়াতে এই সংখ্যা সাতজন। ভারতে ১.৮ জন। মালয়েশিয়ায় ০.৪ এবং বাংলাদেশে এই সংখ্যা ০.১ জন। সেই তুলনায় আমাদের দেশে অগ্নিদুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার রাশিয়ার সত্তর ভাগের একভাগ, আমেরিকার দশভাগের একভাগ, ভারতের আঠারো ভাগের একভাগ ও মালয়েশিয়ার চারভাগের একভাগ। আমাদের দেশে অগ্নিদুর্ঘটনায় প্রতি লাখে যে পরিমাণ মানুষ মারা যায়, তার সংখ্যাটা অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় অনেক কম।

বনানীর এফ আর টাওয়ারসহ সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটল। এর পেছনের কারণগুলো কী?
বিশ্বে শতকরা ৬০ ভাগের বেশি অগ্নিকান্ড ঘটে অসতর্কতার কারণে। আমাদের দেশে ইলেকট্রিক্যাল শর্টসার্কিট থেকেই বেশিরভাগ অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত হয়ে থাকে। ওয়্যারিংয়ের ভুল, নিম্নমানের ইলেকট্রিক্যাল সরঞ্জামের ব্যবহার, অদক্ষ লোক দিয়ে ওয়্যারিং এবং অতিরিক্ত লোডের কারণে শর্টসার্কিট হয় এবং সেখান থেকে আগুন লাগে। নতুন ভবনের নকশা করার সময় যে ধরনের ওয়্যারিং করা হয়, পরবর্তী সময়ে এর লোড ক্রমান্বয়ে যুক্ত হতে থাকে। লোড বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারের সক্ষমতাও যে বাড়াতে হবে, ব্যাপারটা খেয়াল করা হয় না। এ কারণেও অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। এ ছাড়াও ইলেকট্রিক্যাল গুডসের কোয়ালিটিও অনেক ক্ষেত্রে উন্নত নয়। ইলেকট্রনিকস গুডস কেনার সময়ও আমরা মান দেখে কিনি না।
বাসাবাড়ি ও রান্নাঘরে অগ্নিকান্ডের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষের অসতর্কতার কারণেই ঘটে থাকে। সিগারেটের আগুন থেকেও অনেক সময় অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটে।

আপনি অগ্নিদুর্ঘটনা কবলিত এফ আর টাওয়ার পরিদর্শন করেছিলেন। ওই ভবনের অগ্নিপ্রতিরোধ ব্যবস্থায় কী কী ঘাটতি দেখতে পেয়েছেন?
বহুতল ভবনের অগ্নিপ্রতিরোধ ব্যবস্থায় কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। প্রথমত, ধোঁয়াটা যাতে না ছড়ায়। দ্বিতীয়ত, আগুন লাগার পর মানুষ যাতে নিরাপদে বেরিয়ে আসতে পারে, সেই ব্যবস্থা বা পথ রাখতে হবে। তৃতীয়ত, আগুন লাগলে দ্রুত শনাক্তকরণ করে ফায়ার অ্যালার্ম বাজতে হবে। এফ আর টাওয়ারে এই তিনটির কোনোটাই ছিল না। আগুন লাগার পর ভবনে ধোঁয়া প্রতিরোধে যে ধরনের ব্যবস্থা থাকার কথা, সেটা এফ আর টাওয়ারে ছিল না। যে কারণে ধোঁয়াটা খুব দ্রুত ছড়িয়ে গেছে। ভবনের ভুল নকশার কারণে ধোঁয়াগুলো সিঁড়ি, লিফট ও লবিতে চলে এসেছে। এগুলো একটা চিমনি হিসেবে কাজ করেছে। গ্লাসের তৈরি যে ফ্যাকেড ছিল, সেটার ডিজাইনটাও ভুল ছিল। যেভাবে ফ্যাকেডের ডিজাইন করা উচিত ছিল সেভাবে হয়নি। ফলে আগুন এক ফ্লোর থেকে আরেক ফ্লোরে ছড়িয়ে গেছে। মানুষের বের হওয়ার জন্য যে জরুরি সিঁড়ি ছিল, সেটা যথাযথ স্থানে ছিল না। কোনো কোনো ফ্লোরে জরুরি ফায়ার এক্সিট বন্ধ ছিল। ফায়ার ডোরসহ ফায়ার সেপারেশন ছিল না। আগুন শনাক্তকরণে ডিটেক্টর, অ্যালার্ম, হাইড্রেন্ট সিস্টেম- এগুলো কিছুই ছিল না।

ফায়ার কোড প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতাগুলো কোথায় বলে মনে করেন?
আমাদের দেশে ‘ভবন নির্মাণ আইন’ বা ফায়ার কোড মানার প্রবণতা তৈরি হয়নি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আইন মানা হয় না। যারা ভবন তদারকির দায়িত্বে আছেন তারা সবাই অনুমতি দেন শর্ত সাপেক্ষে। কিন্তু শর্তগুলো মানা হলো কিনা- পরে আর তদারকি করা হয় না। ভবনের নকশা জমা দেয়ার পর নকশাতে ভুল আছে কিনা, সেটা বলা হয় না। শুধু শর্ত মেনে ভবন নির্মাণ করার কথা বলা হয়। কারণ ভবনের নকশা বুঝে অনুমতি দেয়ার জনবল নেই। এখন বলা হচ্ছে, ভবনের নকশা তদারকি করার জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে আউটসোর্সিং করা হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব লোকবল থাকতে হবে। যারা দায়বদ্ধ হবে। নকশা তদারকির দায়িত্ব আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হলে দায়বদ্ধতা নিয়ে সমস্যা হবে বলে আমি মনে করি। এ ছাড়াও ভবন ব্যবহারের আগে ‘অকুপেন্সি সার্টিফিকেট’ নেয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেটা মানা হয় না। এটা আইনের পরিপন্থী।
আমাদের দেশে সবাই কাজ করে কিন্তু যার যে কাজ সেটা বাদ দিয়ে অন্য কাজে বেশি ব্যস্ত। রাজউক ভবনের নকশা তদারকি না করে বড় বড় ফ্ল্যাট বানিয়ে বিক্রি করে। রেগুলেটরি বডি হিসেবে রাজউকের কাজ হচ্ছে ভবনের নকশা তদারকি করা। ফায়ার সার্ভিসের দায়িত্ব অগ্নিনির্বাপণ- সেই দায়িত্ব তারা যথাযথভাবে পালন করছে। তদারকির দায়িত্ব অন্য কোনো সংস্থাকে দেয়া উচিত। ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডে বলা আছে, ভবন তদারকির জন্য আলাদা সংস্থা থাকবে। সেই সংস্থা তো তৈরি হয়নি। বিল্ডিং রেগুলেশন বডি তৈরি হওয়া উচিত, যারা ভবন তদারকি করবে। অগ্নিনির্বাপণ ছাড়াও ফায়ার ডিজাইন বোঝার জন্য দক্ষ লোক তৈরি করতে হবে। এজন্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।
এছাড়া আমি মনে করি, ভবন অনুমোদনসহ সব নাগরিক সুবিধা প্রদানের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের কাছে থাকা উচিত। বাইরের দেশগুলোতে অগ্নিনির্বাপণসহ নগরের সব দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের ওপর ন্যস্ত থাকে।

ধন্যবাদ আপনাকে।
আপনাকেও ধন্যবাদ।

0 495

কায়সার হামিদ
ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও হেড অব রিটেইল বিজনেস
আইপিডিসি ফাইন্যান্স লিমিটেড

আইপিডিসি ফাইন্যান্স লিমিটেড বেসরকারি খাতে বাংলাদেশের প্রথম আর্থিক প্রতিষ্ঠান। মাত্র তিন বছর আগেও প্রতিষ্ঠানটির লোন পোর্টফলিও ছিল সাড়ে চারশ থেকে পাঁচশ কোটি টাকা, বর্তমানে তা পাঁচ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। গত কয়েক বছরে আইপিডিসির মুনাফাও বেড়েছে কয়েকগুন। এ বছর অর্ধ-বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি গত বছরের তুলনায় ৬০ ভাগের বেশি মুনাফা করেছে। দেশের অর্থনীতি ও আইপিডিসির বর্তমান কার্যক্রম নিয়ে কারিকাকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও হেড অব রিটেইল বিজনেস কায়সার হামিদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মির্জা মাহমুদ আহমেদ।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করার চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে বলুন। কতটা উপভোগ করেন?
বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে গ্রাহকের সঙ্গে কোনো ফার্স্ট রিলেশন (ট্র্যান্সেকশনাল একাউন্ট) থাকে না। ব্যাংকই সব সময় গ্রাহকের সঙ্গে ‘ফার্স্ট রিলেশনশিপ’ করে থাকে। ব্যাংকের গ্রাহককে কাস্টোমাইজ সার্ভিস দেয়ার জন্যই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সর্ম্পক তৈরি করতে পারে। সেক্ষেত্রে ব্যাংকের থেকে বেশি বা সমান রেটে ডিপোজিট নিয়ে ব্যাংকের সমান রেটে লোন দেয়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান যেহেতু একই ধরনের প্রোডাক্ট নিয়ে কাজ করে সেহেতু আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষেত্রবিশেষে বিশেষায়িত সেবা প্রদান করতে হয়। তা না হলে ব্যাংক ছেড়ে গ্রাহক কোনোদিনই আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সেবা নিতে আগ্রহী হবেন না। ব্যাংকের প্রোডাক্টগুলো খুবই গতানুগতিক ও গৎবাঁধা। ডাক্তার, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, গৃহিনী, কৃষক সহ সব পেশার মানুষদের জন্য ব্যাংক একই ধরনের সেবা দিয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাজ করার সুযোগ আছে। গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী তারা কাস্টোমাইজ প্রোডাক্ট তৈরি করতে পারে। আর কাস্টোমাইজ প্রোডাক্ট পেলে গ্রাহক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সেবা নিতে আগ্রহী হয়।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করার চ্যালেঞ্জ হিসেবে বলতে হয় আপনি যদি চ্যালেঞ্জ না নেন তাহলে চ্যালেঞ্জ উপভোগ করার ক্ষেত্র তৈরি হয় না। একই ধরনের কাজ করে ভালো কোনো ফলাফল আশা করা যায় না। এটা সম্ভব না। অসাধারণ সাফল্য পেতে হলে চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। এ-কথা যেমন ব্যক্তিজীবনে প্রযোজ্য তেমনি প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রেও। চ্যালেঞ্জের সঙ্গে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, সহজ পদ্ধতি এবং গ্রাহক বান্ধব সেবা থাকতে হবে। এগুলো সমন্বয় করতে না পারলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভালো করা, বিশেষত ব্যাংকের থেকে ভালো করা, খুবই দুঃসাধ্য।
ব্যাংক বা লিজিং কোম্পানির মতো প্রতিষ্ঠানে যারা ক্যারিয়ার গড়তে চায়, তাদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?
ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান, দুই জায়গাতেই আমি কাজ করেছি। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করার ফলে আমার কাজ শেখার পরিধি এবং কাজের স্বাধীনতাটাও অনেক বেশি ছিল। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ব্যাংককে যেহেতু অনেক বেশি দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়, তাই সেখানে শেখার জায়গাটা কম। আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে যেহেতু গ্রাহকের সঙ্গে সেকেন্ড রিলেশনশিপ গড়তে হয় তাই গ্রাহকের জন্য বাড়তি কিছু করতেই হবে। যাদের ক্রিয়েটিভিটি আছে, যারা কাস্টোমার ফোকাসড এবং আউট অব দ্য বক্স কাজ করতে চায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান তাদের ক্যারিয়ার গড়ার বড় ক্ষেত্র হতে পারে। আমাদের দেশ এখন একটা গ্রোয়িং স্টেজে আছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের ওপরে। প্রত্যেকের মাথাপিছু আয়ও বেড়েছে। এরকম সময়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিকাশ খুবই সম্ভাবনাময়। অনেক ধরনের নতুন নতুন প্রোডাক্ট আনার সুযোগ আছে। সুতরাং লিজিং কোম্পানিতে যারা ক্যারিয়ার গড়তে চায় তাদের জন্য এটা একটা বড় সুযোগ।

আইপিডিসির বর্তমান কার্যক্রম সম্পর্কে বলুন। অর্থায়নের ক্ষেত্রে কোন খাতকে আপনারা প্রাধান্য দিচ্ছেন?
আইপিডিসি এ বছর সেরা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ক্যাটেগরিতে ডি এইচ এল ডেইলি স্টার ‘বাংলাদেশ বিজনেস অ্যাওয়ার্ড’ জিতেছে। প্রায় এক’শর কাছাকাছি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে আমরা এই সম্মাননা অর্জন করেছি। এ ছাড়াও আমরা সম্প্রতি ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স প্রদত্ত ‘বেস্ট রিটেইল ফাইন্যান্স অ্যাওয়ার্ড’, বেস্ট সাপ্লাই চেইন অ্যাওয়ার্ডসহ অনেকগুলো অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছি। আইপিডিসির ফোকাস হচ্ছে তরুণ, নারী এবং আর্থিক সেবা সুবিধার গণ্ডির বাইরের জনগোষ্ঠী। বর্তমানে বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৬৫ ভাগের বয়স ত্রিশের নিচে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে তরুণ জাতি বাংলাদেশ। এরকম একটি দেশের প্রোডাক্ট, সার্ভিসেস, জব সবকিছু যদি আপনি তরুণ জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে করেন, তার মানে হচ্ছে আপনি দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন না। আইপিডিসির ব্র্যান্ডিং, কালার, কার্যক্রম, লোগো, ম্যানেজমেন্ট, বিজনেস মডেল, ডিজিটাল অ্যাপ্রোচ, প্রোডাক্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস সবকিছুই তরুণবান্ধব! আমরা মনে করি, আজকের যে বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী, তারাই আগামী ১০ বছরে লিডিং পজিশনে যাবে এবং অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখবে। এই উদীয়মান তরুণদের অগ্রযাত্রায় সকল আর্থিক সমস্যার ওয়ান স্টপ সলিউশন হতে চায় আইপিডিসি। আমরা ছোট ছোট ডিপোজিট স্কিম করেছি, যেগুলোর সুবিধা গ্রাহকেরা ডিজিটাল পদ্ধতির মাধ্যমে নিতে পারে। আমাদের লোন প্রসেসিং এবং লোন-সুবিধাগুলো সম্পূর্ণ অ্যাপ-বেজড করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
দেশে সরকারি-বেসরকারি অনেক ব্যাংক। এর বাইরে আইপিডিসির মতো ফিন্যান্স কোম্পানিগুলো অর্থনীতিতে আলাদা কী ভূমিকা রাখছে?
ঢাকার বাইরে আর্থিক সুবিধা সহজলভ্য করা, দীর্ঘমেয়াদী ঋণ-সুবিধা দেয়া, নারী ও তরুণবান্ধব প্রোডাক্ট তৈরি করা এসব ক্ষেত্রে আইপিডিসি অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করছে। এ ছাড়াও আইপিডিসি একটি টেকনোলজি ফ্রেন্ডলি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। নিকট ভবিষ্যতে দেশে ব্যবসার ক্ষেত্রে টেকনোলজি গেম চেঞ্জার হিসেবে কাজ করবে। যে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি যত শক্তিশালী, তারা ব্যবসায়িক দিক থেকে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে থাকবে। এ বছরের সেপ্টেম্বরে আমাদের নতুন কোর ব্যাংকিং সিস্টেম আসছে। আমরা কাস্টোমার ম্যানেজমেন্টের জন্য সিআরএম (কাস্টোমার রিলেশনশিপ ম্যানেজমেন্ট) সফটওয়্যার নিয়েছি। ঢাকার বাইরে থেকে সহজে যাতে গ্রাহক লোনের জন্য আবেদন করতে পারে সেজন্য লোন অরিজিনেশন সিস্টেম ইনস্টল করেছি। সেলস ডিপার্টমেন্টকে পুরো ডিজিটালাইজ করা হচ্ছে। এই ডিজিটালাইজেশনটা কিন্তু এখনও সব ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান নয়। এজন্য অন্যদের থেকে আইপিডিসি এগিয়ে আছে বলে আমি মনে করি।

আশিক ইমরান
প্রিন্সিপাল আর্কিটেক্ট অ্যান্ড সিইও, ফিআলকা

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : মির্জা মাহমুদ আহমেদ

স্থপতি হিসেবে আপনার শুরুটা কেমন ছিল?
স্থাপত্য বিষয়ে আমি স্নাতকোত্তর করেছি ১৯৯৩ সালে। অধুনালুপ্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি রাজ্য বেলারুশ থেকে। ১৯৯৪-এর শেষের দিকে দেশে ফিরে এসেই নিজস্ব আর্কিটেক্ট ফার্ম শুরু করি। কিন্তু এটা ছিল খুবই স্ট্রাগলিং। চট্টগ্রামে সে-সময় তেমন আর্কিটেক্ট ছিল না। ভালো কাজও তেমন হতো না। বেশিরভাগ কাজ করতেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা। হাতেগোনা কয়েকজন আর্কিটেক্ট ছিলেন তখন। তার মধ্যে আমি একজন।

সাম্প্রতিক সময়ে আপনার উল্লেখযোগ্য কাজ সম্পর্কে জানতে চাই।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বেশ কিছু প্রজেক্টের কাজ করছি এখন। সিটি করপোরেশনের সেবক (পরিছন্নতাকর্মী) যারা আছেন তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সরকার একটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ওখানে বেশ বড় একটা কমিউনিটি বাস করে। ছয়’শর মতো ফ্ল্যাট তৈরি করা হচ্ছে সেখানে। এ ছাড়াও নাগরিক যে সুযোগ-সুবিধাগুলো আছে, সেগুলো নিশ্চিতে স্কুল, সংস্কৃতিচর্চাকেন্দ্র ও পরিছন্নতাকর্মীদের নিজস্ব ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণ করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে একটা টাউনশিপের মতো হবে সেটি। এ ছাড়াও গণপূর্ত বিভাগের আরেকটি কাজ করছি। শপিং কাম এন্টারটেইনমেন্ট কমপ্লেক্স। ওখানে শপিংমলের পাশাপাশি সিনেপ্লেক্স, ফুডকোর্ট এবং শুধু শিশুদের বিনোদনের জন্য দুটি ফ্লোর থাকবে। কমপ্লেক্সটির নির্মাণ-কাজ শেষ হলে চট্টগ্রামবাসীর জন্য দারুণ এক বিনোদনের জায়গা তৈরি হবে বলে মনে করছি। তাছাড়া বিভিন্ন ডেভেলপার কোম্পানির হয়ে বেশ কিছু রেসিডেনশিয়াল ও প্রাইভেট ভিলার স্থাপত্য-নকশার কাজ করছি।

ভবনের নকশা করার ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জলবায়ু কতটুকু প্রাধান্য পায়?
স্থপতি হিসেবে আমাদের নৈতিক দায়িত্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যগুলোকে রক্ষা করা এবং এর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা। পাহাড় এবং চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিষয়গুলো, আমার ডিজাইনে আমি সবসময় রাখার চেষ্টা করি।

পরিকল্পিত চট্টগ্রাম নগরী গড়ে তুলতে কী করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
চট্টগ্রাম নগরী তো ইতোমধ্যে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। আমাদের যে মাস্টারপ্ল্যানগুলো ছিল সেগুলোর কোনোটাই বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে শহরটা অপরিকল্পিতই রয়ে গেছে। তারপর যখন অনেক স্থপতি চট্টগ্রামে কাজ করা শুরু করলেন, ঠিক তখনই একটা সচেতনতার জায়গা তৈরি হলো। এখন চট্টগ্রামে প্রায় দেড়’শর মতো স্থপতি কাজ করছেন।
আমরা যখন সিডিএ, সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন স্থানে কথা বলি তখন পরিকল্পিত নগরী গড়ার ব্যাপারে ‘প্রেশার গ্রুপ’ হিসেবে কাজ করি। ইতোমধ্যে যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেছে। ভবিষ্যতে এ ক্ষতিটুকু সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখার জন্য যা যা করণীয়-আমরা সেই চেষ্টাই করছি।
আমাদের চট্টগ্রাম নগরীতে এখন যেটার বেশি অভাব সেটা হচ্ছে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ও ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট। অনেকগুলো নতুন রাস্তা করা দরকার। রিং রোড করা দরকার। অবশ্য এর মধ্যে অনেকগুলো সড়ক নির্মাণাধীন আছে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, আউটার রিংরোডের নির্মাণ-কাজ চলছে। শহরের ভেতরে অনেকগুলো ইন্টারনার্ল রোডের নির্মাণ-কাজ চলছে। এগুলো হয়ে গেলে আশা করা যায় আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে কিছুটা ভালো অবস্থায় ফিরবে চট্টগ্রাম। টানেলের কাজ হচ্ছে এবং কর্ণফুলীর ওপারে যে দক্ষিণ চট্টগ্রাম-শহরের আরেকটা অংশ, সেই দক্ষিণ চট্টগ্রামের সঙ্গে কানেকটিভিটিতে টানেল একটা বিশাল ভূমিকা রাখবে।
দুটো বিশাল ইকোনমিক জোন হচ্ছে চট্টগ্রামের মীরসরাই এবং আনোয়ারায়। সেখানে বিপুল পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ আসবে বলে আমরা আশা করছি। আমাদের এখানে অবকাঠামোগত অনেক সমস্যা আছে। প্রয়োজনের তুলনায় আমাদের যে পরিমাণ সড়ক দরকার তার অর্ধেকও নেই। এ ছাড়াও ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট না থাকার ফলে কর্মদিবসে যানজটে অচল হয়ে যায় শহর। এই সমস্যাগুলো নিয়ে আমরা কথা বলছি। ধীরে ধীরে হয়তো-বা সমস্যাগুলোর উন্নতি হবে।
আশার কথা হচ্ছে, চট্টগ্রাম নগরীর পরিকল্পিত উন্নয়নে আরেকটা মাস্টারপ্ল্যান হাতে নেয়া হয়েছে। ২০২০ সাল থেকে ২০৪১ সাল পর্যন্ত ২১ বছর মেয়াদী এই মাস্টারপ্ল্যানে অনেক কিছু একীভূত করা হয়েছে, যেটা যুগোপযোগী। একটি আধুনিক সচল শহর গড়তে যা যা উপাদান প্রয়োজন তার সবই আছে এই মাস্টারপ্ল্যানে। আমরা আশা করব এই মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়িত হবে এবং এর ফলে চট্টগ্রাম একটি বিশ্বমানের উন্নত শহরে রূপান্তরিত হবে। চট্টগ্রাম বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। সরকারি নথিতে বাণিজ্যিক রাজধানী। দেশের প্রধানতম বন্দরনগরী। এ-রকম একটা গুরুত্বপূর্ণ শহর এতদিন অবহেলিত ছিল-এটা একেবারেই অপ্রত্যাশিত। আশার কথা হচ্ছে, দেরিতে হলেও সরকার চট্টগ্রামের উন্নয়নে মনোযোগী হয়েছে। আশা করি অচিরেই ইতিবাচক ফলাফল দেখা যাবে।
আমরা এখন শহরমুখী জনস্রোত কমানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। এজন্য উপজেলা পর্যায়ে যদি কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিকল্পিত আবাসনের ব্যবস্থা করা যায় তাহলে শহরমুখী জনস্রোত কমবে। আর এজন্য মাস্টারপ্ল্যানে সুনির্দিষ্ট কিছু পরিকল্পনা আছে। এ নিয়ে সরকারের কর্মসূচিও আছে।

 

লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর রহমান
পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স), ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতর

চকবাজারের চুড়িহাট্টার রাসায়নিক গুদামে আগুন লাগার পর বনানীর এফআর টাওয়ারের অগ্নিদুর্ঘটনা। একের পর এক ধারাবাহিক অগ্নিদুর্ঘটনা ফায়ার সার্ভিসসহ পুরো দেশবাসীকে কতটা আশঙ্কায় ফেলেছিল, সচেতন মানুষমাত্রই জানেন। ধারাবাহিক অগ্নিদুর্ঘটনার পুরো ধকল সামলিয়েছে ‘দ্য লাইফ সেভিংস ফোর্স’ খ্যাত বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাঁচিয়েছে বহু প্রাণ ও মূল্যবান সম্পদ। অগ্নিনির্বাপণে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জসহ অগ্নিদুর্ঘটনা ও সচেতনতার নানা বিষয় নিয়ে কারিকার সঙ্গে কথা বলেছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের নবনিযুক্ত পরিচালক (অপারেশন্স অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর রহমান।

ঢাকার মতো জনবহুল শহরে অগ্নিনির্বাপণের চ্যালেঞ্জগুলো কী?
আমরা জানি, ঢাকা শহরের বেশিরভাগ স্থাপনা অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। একটি ভবনের সঙ্গে গা লাগিয়ে আরেকটি ভবন। এসব ক্ষেত্রে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। চকবাজারের ঘটনায় আমরা দেখেছি, পুরান ঢাকার আবাসিক ভবনগুলোতে কীভাবে অবৈধভাবে রাসায়নিক মজুদ করা হয়েছে। সেখানে আগুন লাগলে নেভানো কষ্টসাধ্য। পুরান ঢাকায় একই সঙ্গে পানির অপ্রতুলতাও রয়েছে। সেখানকার সড়ক ও গলিপথগুলোও প্রশস্ত নয়। অপ্রশস্ত সড়ক ও গলিপথের কোনো স্থাপনায় আগুন লাগলে সেখানে ফায়ার সার্ভিসের ইউনিটগুলো যেতে পারে না। আর যানজটের সমস্যা তো আছেই। যানজটের কারণে অনেক সময় আমাদের দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছতে দেরি হয়। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে অগ্নিনির্বাপণে প্রতিনিয়ত আমাদের কাজ করে যেতে হয়।

এই চ্যালেঞ্জ উত্তরণে আপনারা কী ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছেন?
হঠাৎ লাগা আগুনের বিরুদ্ধে যাতে ন্যূনতম ২০ মিনিট প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়, সেজন্য বহুতল আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনসহ যেকোনো স্থাপনায় নিজস্ব ফায়ার ফাইটিং সিস্টেম গড়ে তোলার ওপর আমরা এখন জোর দিচ্ছি। এ ছাড়াও ইউএনডিপির সহায়তায় ফায়ার সার্ভিসে আধুনিক প্রযুক্তির অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম যুক্ত হচ্ছে। অন্যদিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অগ্নিকান্ডের খবর পেয়ে যাতে আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছতে পারি, সেজন্য বর্তমানে আধুনিক রেডিও সেট, অত্যাধুনিক ভিএইচএফ প্রযুক্তির রেডিও ব্যবহার করা হচ্ছে। মোবাইল ফোন প্রযুক্তিও তথ্য আদান-প্রদানে আমাদের অনেক সহায়তা করছে। যানজটের কারণে যাতে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছতে দেরি না হয়, সেজন্য নির্ধারিত ফায়ার স্টেশন ছাড়াও মহাখালী-বাংলামোটরসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আমাদের ফায়ার ফাইটিং ইউনিট সবসময় প্রস্তুত আছে।

সেক্ষেত্রে বহুতল আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনে নিজস্ব ফায়ার ফাইটিং সিস্টেম গড়ে তুলতে কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি বলে আপনি মনে করেন?
ছয়তলার বেশি কোনো ভবন নির্মাণ করলে ফায়ার সার্ভিস থেকে অনুমতি নিতে হয়। অনুমতি নেয়া বাধ্যতামূলক। এছাড়া বহুতল আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনে নিজস্ব ফায়ার ফাইটার, ভালো মানের ফায়ার ডোরসহ ফায়ার এক্সিট রুট, ফায়ারপ্রুফ সিলিং, আলাদা পাওয়ার সাপ্লাই সিস্টেমসহ ইমার্জেন্সি লিফট, ফায়ার এক্সটিংগুইশার, ফায়ার অ্যালার্ম, হোস পাইপ, ফায়ার হাইডেন্ট সিস্টেম ইত্যাদি থাকতে হবে।

রেগুলেটরি বডি হিসেবে ফায়ার সার্ভিসকে বিচারিক ক্ষমতা দেয়ার কথা শোনা যাচ্ছিল অনেকদিন থেকে। বিষয়টির অগ্রগতি কেমন হলো?
আগামী মাস থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে ফায়ার সার্ভিসের মোবাইল কোর্ট পরিচালনার বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ার পথে। এর ফলে অগ্নিনির্বাপণ আইন লঙ্ঘনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে দায়ীদের শাস্তি দিতে পারবে ফায়ার সার্ভিস। সেই সঙ্গে স্থাপনা পরিদর্শন করে নোটিস দেয়ার নিয়মিত কার্যক্রমও অব্যাহত থাকবে।

বনানীর এফআর টাওয়ারে অগ্নিকান্ডের পর অগ্নিনির্বাপণ সামগ্রী কেনার হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। তখন অনেকেই নিম্নমানের সামগ্রী কিনে প্রতারিত হয়েছেন। অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের মান দেখভালের জন্য ফায়ার সার্ভিসের কোনো তদারকি কি আছে?
না, বর্তমানে এ নিয়ে কোনো কার্যক্রম নেই। তবে আপনি যেহেতু বিষয়টি উত্থাপন করলেন, এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া যায় কিনা, আমি মহাপরিচালক মহোদয়ের সঙ্গে কথা বলব। অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম কেনার সময় ক্রেতা যদি একটু সচেতন থাকেন, একটু দাম বেশি হলেও ভালো ব্র্যান্ডের সরঞ্জাম কেনেন, তাহলে আর নিম্নমানের পণ্য কেনার ঝুঁকি থাকে না।
আমি মনে করি গণমাধ্যম, ফায়ার সার্ভিস অধিদফতর- সবার সমন্বিত প্রচেষ্টায় জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হবে। তখন আমরা অগ্নিজনিত দুর্ঘটনা অনেকাংশেই কমিয়ে আনতে পারব বলে আশা রাখি।

আপনাকে ধন্যবাদ।
আপনাকেও ধন্যবাদ।

0 667

মুস্তফা খালিদ পলাশ
স্থপতি

কৌস্তুভ ইসলাম : শিল্পের নানা দিকে আপনার বিচরণ। আপনি স্থপতি, চিত্রকর, লেখক; আপনি গান করেন, আমরা জানি অসাধারণ সেতার বাজান। এভাবে শুরু করি আপনার বাবা কে এম জি মুস্তাফা এবং মা আফরোজ মুস্তাফা দুজনেই তো চিত্রকর এবং সাংস্কৃতিককর্মী ছিলেন। নানা গুণী মানুষের সমাগম হতো আপনাদের বাড়িতে। আপনাদের বাড়িটা ছিল একটা কালচারাল হাবের মতো…
মুস্তাফা খালিদ পলাশ : এখনো তা-ই আছে। আসলে সন্তান কীভাবে গড়ে উঠবে, তা বাবা-মা’র ওপর নির্ভর করে। লেখাপড়া তো একটা গৎ-বাঁধা বিষয়, সবার জীবনেই আসে। ওটাকে পূর্ণ করতে হয়। কিন্তু এর বাইরে অনেক কিছু থাকে, যে জিনিসগুলো একমাত্র বাবা-মাই পারে তার সন্তানের মধ্যে প্রোথিত করতে। আমার বাবা একজন সঙ্গীতপ্রিয় মানুষ ছিলেন। নিজে বাঁশি বাজাতেন। আমার বোন, যে বেঁচে নেই, বাসার মধ্যে গান গাইতো, আমি সেতার বাজাতাম, আমার ছোটভাই গান করতো, গিটার বাজাতো। বাসার পরিবেশটাই এমন ছিল যে, সন্ধ্যার সময় খেলাধুলার পর পড়ালেখা করার আগে একটু গান-বাজনায় বসতাম আমরা। এটা একটা কালচার ছিল। সেটা করতে গিয়ে আমার পাড়ার যে বন্ধুবান্ধব ছিল, তারা কিন্তু আমার বাবারও বন্ধুর মতো হয়ে গিয়েছিল। আমরা সবাই একসঙ্গে ওসব করতাম।
কৌস্তুভ ইসলাম : নিঃসন্দেহে একটা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে আপনি বেড়ে উঠেছেন। গানের জগত, ছবি আঁকা ও লেখালেখির জগত এসবকে ছাপিয়ে স্থাপত্য-জগতে আসার অর্থাৎ আপনার স্থপতি হয়ে ওঠার গল্পটা জানতে চাই।
মুস্তাফা খালিদ পলাশ : আসলে আমার স্থপতি হওয়ার কথা ছিল না। শখও ছিল না। এখনো নেই (হাসি)। স্থাপত্যকে যে খুব উপভোগ করি সেটাও কিন্তু না। আমি উপভোগ করি অন্যান্য মাধ্যম। আমার ভালো লাগে ছবি আঁকতে, গান-বাজনা করতে। স্থাপত্যের চাইতে আমার মনে এগুলোই বেশি দাগ কাটে।
তিরিশ বছর ধরে স্থাপত্য-চর্চা করে আসছি; সঙ্গে পড়ালেখা। সব মিলিয়ে ছত্রিশ-সাঁইত্রিশ বছর ধরে এটার সঙ্গে জড়িত। স্থাপত্য পড়তে হয়েছে এ কারণে যে, আমি যেহেতু শিল্পী-দম্পতির সন্তান; শিল্পীদের যে সাংসারিক টানাপোড়েন থাকে, সেটা ছিল। যদি দেখি যে বাবা-মা’র কষ্ট হচ্ছে ঠিকভাবে সংসার চালাতে, তখন কিন্তু একটা দ্বৈততা বা দ্বদ্ব তৈরি হয় নিজের মধ্যে। আমি তারপরও চেয়েছিলাম শিল্পী হতে। বুয়েটে পরীক্ষা দেয়ার পর অনেক ইচ্ছা ছিল আমি যেন চান্স না পাই (হাসি)। তাহলেই একমাত্র আমি চারুকলায় ভর্তি হতে পারব। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমি আর্কিটেকচারে চান্স পাই। তারপরও আমি ছবি আঁকাটা ছাড়িনি। এখনো আমি চারুকলার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমি স্থপতিদের সঙ্গে ততটা মিশতে পারি না, যতটা পারি চারুকলার যারা আমার বন্ধু রয়েছে, তাদের সঙ্গে। বন্ধু ও গুরুজনরা অসম্ভব স্নেহ করেন আমাকে। একজন ‘অযোগ্য শিল্পী’ হিসেবে আমাকে তারা খুব ভালোভাবেই গ্রহণ করে নিয়েছে। যার কারণে এশিয়ান বিয়েনাল হোক বা যেকোনো ন্যাশনাল এক্সিবিশন হোক সব জায়গায় আমার ডাক পড়ে, একজন চিত্রকর হিসেবে। আবার যেসব সাংগঠনিক কাজ আছে, সেগুলোর সঙ্গেও যুক্ত থাকি সবসময়। তো সেই পরিবারের আমি একজন গর্বিত সদস্য। আর সার্টিফিকেটের জোরে তো স্থাপত্য-চর্চা করছিই!
কৌস্তুভ ইসলাম : আর্কিটেক্ট হিসেবে যখন কাজ শুরু করলেন, গোল ছিল কি না কোনো, সেটা কি এচিভ করা গেছে?
মুস্তাফা খালিদ পলাশ: হ্যাঁ গোল তো ছিল। বিশেষ ভাবে আমি বলব শুদ্ধচর্চা। শুদ্ধচর্চা মানে আমার যদি সেই ঐতিহ্য থাকতো, যেখান থেকে আমি আমার আর্কিটেকচারকে টেনে ওই সূত্রে গাঁথতে পারতাম, তাহলে আমি সেটা নিয়েই কাজ করতে বলতাম। কিন্তু আমাদের মালা গাঁথা শুরুই হয়েছে আমাদের পার্লামেন্ট ভবনের লকেট থেকে, ওই লকেট থেকেই আমরা সুতা ধরতে শুরু করেছি। নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছি অনেকেই। অগ্রজ হিসেবে আমি বলি বশিরুল হক স্যারের কথা, মাজহারুল ইসলাম স্যার তো আছেনই। তার সঙ্গে কাজ করেছেন উত্তম কুমার সাহা, এরকম অনেকেই সাইফুল-উল হক আছেন। উনারা কিন্তু একটা যোগসুত্রের মধ্য দিয়ে যেতে চেয়েছেন। ওই পথেই আমরা হাঁটছি। আমি খুবই আশাবাদী। মডার্নিজম, সঙ্গে লোকাল কনটেক্সট ধরেই কাজ হচ্ছে। একটা সময় কিন্তু অনেক উলটাপালটা কাজ করেছি, আমিও করেছি। অন্যরাও করেছে। মডার্ন কিন্তু কনটেক্সটের সঙ্গে যায় না। এটলিস্ট লোকাল কনটেক্সটকে তো অ্যাড্রেস করতে হবে। আর্কিটেকচারাল যে কনটেক্সট ইস্যু, সেটা ইন্টারন্যাশনাল হতেই পারে, কিন্তু লোকাল কনটেক্স মানে ক্লাইমেটকে তো কনসিডার করতে হবে। এখন সেটা আগে কম ছিল, এখন আস্তে আস্তে আমরা সচেতন হচ্ছি। আমরা বুঝতে পারছি যে আর্কিটেক্টের সাস্টেনেবল ইস্যুতে অ্যাড্রেস করার আছে, সেফটি ইস্যুতে অ্যড্রেস করার আছে। তো সেই গোলটাই ছিল আসলে; শুদ্ধ চর্চা করব। খুব সাকসেসফুলি হ্যান্ডেলড। আমি খুবই হ্যাপি যে আমার দেশের আর্কিটেক্টরা এখন সত্যিকার সিম্পল মডার্ন জিনিস নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে।

মুস্তাফা খালিদ পলাশ-এর দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হবে ‘কারিকা’ ঈদসংখ্যায়