Home মূল কাগজ সাক্ষাৎকার

রফিক আজম

চেন্নাই, ঢাকা, সিঙ্গাপুর বা অস্ট্রেলিয়ার কোনো শহরে রফিক আজমের কাজ সহজেই চেনা যায়। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের স্থপতিদের মধ্যে রফিক আজম তাঁর কাজের মাধ্যমে দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষভাবে পরিচিত হয়ে উঠেছেন। ওয়ার্ল্ড আর্কিটেকচার কমিউনিটি পুরস্কার, কেনেথ এফ ব্রাউন এশিয়া প্যাসিফিক কালচার অ্যান্ড আর্কিটেকচার ডিজাইন পুরস্কার, এআর অ্যাওয়ার্ড ফর ইমার্জিং আর্কিটেক্টস পুরস্কার, সাউথ এশিয়া আর্কিটেকচার কমেন্ডেশন পুরস্কারসহ স্থাপত্যে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পেয়েছেন।
অথচ রফিক আজম কখনো স্থপতি হতে চাননি। হতে চেয়েছিলেন চিত্রশিল্পী। এমনকি ১৯৭৬ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে ছবি আঁকায় তিনি ‘জওহরলাল নেহরু’ স্বর্ণপদক লাভ করেন। কিন্তু পরিবারের ইচ্ছায় বুয়েটে ভর্তি হতে হয় তাঁকে। স্থাপত্যের জ্ঞান আর শিল্পী মনের যোগসাজশে রফিক আজম বাংলাদেশের স্থাপত্যশিল্পে বিরাট পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের নানা দেশে রয়েছে তার দৃষ্টিনন্দন সব স্থাপনা। প্রকৃতির সঙ্গে বিরুদ্ধতা নয়, যেন প্রকৃতির ভেতর থেকেই গড়ে ওঠে এসব স্থাপনা।
রফিক আজমের জন্ম ও বেড়ে ওঠা পুরান ঢাকায়, লালবাগে। পরিবারেই ছিল সাংস্কৃতিক আবহ। ফলে পরিবার থেকেই তিনি শিল্পের শিক্ষাটা পেয়েছেন। নয় ভাইবোনের মধ্যে রফিক আজম ষষ্ঠ। মায়ের বাগান করার শখ ছিল। ভাই-বোনেরা গান করতেন, ছবি আঁকতেন, রাতের বেলায় সবাই মিলে গল্পের আসর বসাতেন। যৌথ জীবনযাপনের শিক্ষাটা তাঁর ছোটবেলার। বিচ্ছিন্নতার এ যুগে সবাই যখন আত্মকেন্দ্রিক জীবনযাপনে ব্যস্ত, রফিক আজমের স্থাপত্যশৈলী, তাঁর নির্মাণ আমাদের যূথবদ্ধতার প্রেরণা জোগায়। প্রথাগত স্থাপত্যের সঙ্গে রফিক আজমের স্থাপত্যের বেশকিছু অমিল রয়েছে। যেমন, তিনি স্থাপনা থেকে দেয়ালের ধারণা তুলে দিতে চান। নিরাপত্তার বিষয়টি ঠিকই থাকবে কিন্তু কোনো দেয়াল থাকবে না। মানুষে মানুষে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেয়াল একটি বড় মনোজাগতিক বাধা বলে মনে করেন তিনি। দেয়াল যেন দু’পাশের মানুষের মধ্যে এক বৈরিতা তৈরি করে এমনই ভাবনা তাঁর। এজন্য বসতবাড়ি থেকে দেয়াল উঠিয়ে দিয়েছেন তিনি। পথিকের জন্য বিশ্রামের জায়গা এবং খাবার পানির ব্যবস্থা রাখার চেষ্টা করেন। পথচলা মানুষ যেন দেয়াল দেখে বাড়ির মালিককে অন্য পক্ষ মনে না করে, বিরূপ না হয়, ওই বোধ যেন পথিকের মধ্যে তৈরি না হয়, সেটাই রফিক আজমের চাওয়া।
রফিক আজম জানলেন, গ্রামীণ বৈশিষ্ট্যকে শহুরে বহুতল ভবনে তুলে আনতে চান তিনি। যেমন, আগেকার গ্রামীণ বাড়িগুলোতে এক চিলতে উঠোন ছিল, পুকুর ছিল, ছিল ফুল ও সবজির বাগান। জাতি হিসেবে আমরা খুব অতিথিপরায়ণ। মেহমানদের জন্য বৈঠকঘর, বসার জায়গা ইত্যাদি থাকত। তাছাড়া পথিক এলে বিশ্রাম ও জলপানের ব্যবস্থা থাকত আমাদের গ্রামবাংলার বাড়িগুলোতে। বাতাসের প্রবাহ যাতে ঠিকঠাক পাওয়া যায়, এজন্য বাড়িগুলোর ডিজাইন সেভাবে করা হতো। তাছাড়া আলোর বিষয়টাও প্রাধান্য পেত তখনকার বাড়িগুলোতে। শহরে এখন বাড়ির জন্য অত জায়গা পাওয়া সম্ভব না। কেননা আমাদের শহরগুলো গড়ে উঠেছে পরিকল্পনাহীনতার মধ্য দিয়ে। উঠোন-পুকুরওয়ালা বাড়ির জায়গায় তরতর করে উঠে যাচ্ছে বহুতল ভবন।
স্থপতি হিসেবে রফিক আজমের যাত্রা শুরু হয় বুয়েটে তিনি যখন তৃতীয় বর্ষে পড়েন, তখন। তাদের নিজেদের বাড়ির ডিজাইন করতে দেওয়া হয়েছিল অন্য একজন স্থপতিকে। কিন্তু সেই স্থপতির ডিজাইন পছন্দ হয়নি রফিক আজমের মায়ের। তখন দায়িত্ব নেন রফিক আজম। ১৯৮৭ সালে নির্মিত বাড়িটিই সম্ভবত প্রথম বাড়ি যার দোতলায় বাগান আছে। মায়ের শখ ছিল বাগানের। রফিক আজম সেদিকে খেয়াল রেখে বাড়িটি সেভাবে ডিজাইন করেন। বাড়ির উঠোনে যেমন বসার জায়গা থাকে, তেমনই খোলা জায়গা রেখেছেন দোতলায়। অর্থাৎ, মায়ের ইচ্ছা পূরণের জন্য প্রথম বাড়ির ডিজাইন করেন রফিক আজম।
সবুজ স্থাপত্যের স্বপ্ন নিয়ে ১৯৯৫ সালে রফিক আজম গড়ে তুলেছেন নিজের প্রতিষ্ঠান ‘সাতত্য’। সাতত্য অর্থ প্রবহমানতা। তাঁর প্রতিষ্ঠানের অন্যতম লক্ষ্য হলো প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে আত্মিক সংযোগ স্থাপন করা।
সাতত্যের প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য নিয়ে রফিক আজম বলেন, ‘বাংলাদেশের স্থাপত্যের এক সমৃদ্ধ অতীত রয়েছে। একদম শুরু থেকে আমাদের হিন্দু ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির প্রচুর দৃষ্টিনন্দন মন্দির ছিল। স্থাপত্য হিসেবে এগুলো খুব উঁচু মানের। এরপর প্রাক মুঘল আমল থেকে ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল হয়ে স্বাধীনতার আগে পর্যন্ত আমাদের স্থাপত্যশিল্প দারুণ উন্নত। এসব স্থাপত্যে প্রতিটি সময়কে সফলভাবে ধরা রয়েছে। ১৯৫০ দশকের মাঝামাঝি থেকে ৬০-এর দশকের শেষ পর্যন্ত আধুনিক স্থাপত্য বিকশিত হয়েছে আমাদের এখানে। তখন আমাদের এখানে মাজহারুল ইসলাম, লুই আই কান, পল রুডলফ, কনস্টানটিনো ডজিডাসের মতো স্থপতিরা কাজ করেছেন। এরপর দুঃখজনকভাবে এ অগ্রযাত্রাটি থেমে যায়। সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশে শুরু হয় রাজনৈতিক অস্থিরতা। বিশ্বের অন্যান্য দরিদ্র দেশের মতো জলবায়ু, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের বিষয় আমলে না নিয়ে গড়ে উঠতে থাকে একের পর এক অপরিকল্পিত স্থাপনা। এ রকম একটা পরিপ্রেক্ষিতে স্থাপত্যশিল্পে আমাদের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে ও এটিকে কিছুটা সুশৃঙ্খল রূপ দিতেই সাতত্য যাত্রা শুরু করে।’
রফিক আজম যে সবুজের চর্চা করতে চান, তার জন্য সৌখিন নার্সারিতে যেতে হয় না। বাড়ির উঠোন, বাগানে যেসব উদ্ভিদ জন্মে, সেগুলোকেই তিনি নিয়ে আসেন বহুতল ভবনে। দেশে-বিদেশে নানা মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার পেয়েছেন রফিক আজম। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে খÐকালীন শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি ভারত, পাকিস্তান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্লাস নেন।
ঠাস বুনোটের এ শহরে রফিক আজম তাঁর কাজের ভেতরে মানুষের জন্য ফাঁকা জায়গা নির্মাণ করতে চান। তাঁর মতে, ওই শূন্যতার অনুভব আনতেই আশপাশে কিছু পূর্ণ স্থান দরকার পড়ে। কেননা, শূন্যতাকে বোঝার জন্য অন্যান্য অনুষঙ্গ লাগে। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আত্মিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য স্থাপত্যের ভ‚মিকাকে প্রাধান্য দেন তিনি।
বাংলাদেশের প্রকৃতির মধ্যে যে বৈচিত্র্য, রফিক আজম তার স্থাপত্যে সেসবই তুলে আনতে চান। ফলে, তাঁর স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে লক্ষ্য করা যায় বাংলার প্রকৃতির আদল। বহুতল ভবনের ওপরে পুকুর! সেখানে আবার ছোট্ট নৌকা রাখা! কে ভাবতে পেরেছিল এসব? রফিক আজম ভিন্নভাবে ভাবতে পেরেছেন বলেই বিশ্বের অনেক জায়গায় তাঁর দর্শনের প্রতিফলন দেখা যায় এখন। বাংলাদেশের স্থাপত্যও অনেকটা তাঁর কারণে বহির্বিশ্বে আলোচিত। নিসর্গের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপনে হঠাৎ দেখা যাবে ছাদের ফাঁকা জায়গা থেকে আলো আসছে, সূর্যের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ রাখেন তাঁর ভাবনায়। আলো ও বাতাসের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করেন রফিক আজম। তার স্থাপনাগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্যই সম্ভবত প্রকৃতির সঙ্গে এক ধরনের একাত্মতা। স্থাপনাগুলো ভেতরমুখী নয় যেন বহির্মুখী। রফিক আজম মনে করেন, ‘মানুষ কিন্তু সামগ্রিকভাবে প্রকৃতির অংশ। সুতরাং সবুজ প্রকৃতি এবং সতেজ বাতাস ছাড়া মানুষের টিকে থাকা অসম্ভব। সবুজ প্রকৃতি হলো অক্সিজেনের প্রধান উৎস।’
ব্যক্তিগত অনেক স্থাপনা নির্মাণ করেছেন তিনি, এখন পুরো শহরের মানুষের জন্য কিছু করতে চান। মানুষের সঙ্গে থেকে কাজ করে হতে চান মানুষের স্থপতি।
পুরনো ঢাকার বেশকিছু পার্ক নতুনভাবে তৈরি করছেন তিনি। পুরান ঢাকা বা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ওই প্রকল্পের নাম ‘জল সবুজে ঢাকা’। এ প্রকল্পে সর্বমোট ৩১টি পার্কের কাজ চলছে এর প্রধান স্থপতি রফিক আজম। এগুলোর মধ্যে তিনি সরাসরি যুক্ত আছেন ১৭টি পার্কের সঙ্গে।
রফিক আজম মনে করেন সমাজ ও রাষ্ট্র পরিবর্তনে রাজনৈতিক নেতারা সবচেয়ে বড় ভ‚মিকা রাখতে পারেন। স্থাপত্য সমাজ পরিবর্তনে কাজ করতে পারলেও এ শিল্পটিকে কাজ করতে হবে রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে থেকেই। ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে তিনি সব সাধারণ মানুষের বসবাসের উপযোগী একটি রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চান।

অনুলিখনঃ মেহেদী রাসেল

বঙ্গভবনের ভেতরের পাখি পরিবার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশপ্তক, ফার্মগেট মোড়ের ইলিশ, পটুয়াখালীতে জয় বাংলা ভাস্কর্যের শিল্পী হামিদুজ্জামান খান। আমাদের ভাস্কর্য-শিল্পে তার অসামান্য অবদান থাকলেও চিত্রকলায়ও তার দক্ষতা কম নয়। পড়াশোনা করেছেন চিত্রকলার ওপর। ভারতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন ভাস্কর্য বিষয়ে। ভাস্কর্য ও চিত্রকলা দুই মাধ্যমেই তিনি কাজ করে যাচ্ছেন সমান তালে। অগুণিত ভাস্কর্য গড়েছেন দেশে এবং বিদেশে। তার বেশিরভাগই করেছেন মুক্তিযুদ্ধকে বিষয় করে। কিছু ভাস্কর্য গড়েছেন স্পেসটাকে ইন্টারেস্টিং করার জন্য। শিল্পকলা একাডেমি থেকে পেয়েছেন চারটি পুরস্কার। ২০০৬ সালে পেয়েছেন একুশে পদক। সম্প্রতি বহুমাত্রিক এই শিল্পীর নামে ভাস্কর্য উদ্যান উদ্বোধন হলো গাজীপুর সামিট পাওয়ার প্ল্যাণ্টে। শিল্পী হামিদুজ্জামান খানের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মোহাম্মদ আসাদ

হামিদুজ্জামান ভাস্কর্য উদ্যান’ উদ্বোধন হলো। এটির বিশেষত্ব কী?
একটি ম্যুরাল বা দেয়ালচিত্র কেন্দ্র করে এই উদ্যানের সৃষ্টি। সাড়ে তিনশ ফুট দৈর্ঘ্য এবং ২২ উচ্চতার একটি দেয়ালচিত্র। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দেয়ালচিত্র। বহিরাঙ্গণে এত বড় দেয়ালচিত্র দেশের বাইরেও আমার চোখে পড়েনি।

এই উদ্যানের শুরুটা হলো কীভাবে?
সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজিজ খানের সঙ্গে আমি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছি। তিনি বিভিন্ন জায়গা থেকে আমাকে বহু জিনিস মেইল করেন। একবার আমাকে মেসেজ দিলেন একটা দেয়াল হচ্ছে, এখানে কিছু করা যায় কি না। আমার মাথায় বহুদিন ধরেই বহিরাঙ্গণের স্পেস চেইঞ্জ করার জন্য কাজের পরিকল্পনা চলছিল। বাড়ির সামনে, বাগানে একটা ভাস্কর্য থাকলে সে জায়গার চেহারাটাই বদলে যায়। সে-রকম অনেক কাজ করেছি। একটু বড় আকারের করার ইচ্ছা ছিল বহু দিনের। এই দেয়ালটা পেয়ে আমার স্বপ্নপুরণের একটা স্পেস পেলাম। এটা একটা পাওয়ার প্ল্যাণ্টের দেয়াল। আমি বলব, এটা শিল্পের প্রনোদানা, শিল্পকর্মেও অনুপ্রেরণা দেয়া। বিশাল এই কর্মযজ্ঞ পুরোপুরি শেষ করতে সময় লেগেছে এক বছর।

এত বড় একটি কাজ করতে গিয়ে স্বাধীনতা পেয়েছিলেন কেমন?
আমি যা চেয়েছি তাই হয়েছে। আজিজ খান সাহেব শুধু একজন বড় ব্যবসায়ী নয়, তিনি শিল্পের সমঝদার। সেই দেয়ালের কত যে পরিবর্তন করেছি তা বলে শেষ করা কঠিন। সাড়ে তিনশ ফুট লম্বা দেয়ালের মাঝে মাঝে পিলার দিয়ে খোপ খোপ। আমি এই খোপ খোপ ভরাট করে প্লেইন একটা দেয়াল বানিয়ে দিতে বললাম। আর উপরে জানালায় কালার প্লাস ছিল সেটা বাদ দিয়ে সাদা কাচ লাগিয়ে দিতে বললাম। তিনি ইঞ্জিনিয়ারকে এর সমাধান দিতে বললেন। ইঞ্জিনিয়ার বলল, এটা সম্ভব কিন্তু দেয়াল মোটা হয়ে যাবে। খরচ বাড়বে। আজিজ খান বললেন, খরচ যা-ই হোক, দেয়াল স্ট্রেইট করে দেন। এই দেয়ালটি ক্যানভাসে রূপান্তর করতে দেয়ালের পুরুত্ব দাঁড়াল ১৫ ইঞ্চি। সাড়ে তিনশ ফুট এই দেয়ালটি প্লাস্টার করে দেওয়ার পর আমি এটা নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম। বলে রাখা ভালো, গাজীপুরের কড্ডায় অবস্থিত সামিট পাওয়ার প্ল্যাণ্ট দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। ৪৬৪ মেগাওয়ার্ড বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী এই প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করা হয়েছে মাত্র নয় মাসে। তার জন্য আন্তর্জাতিক সম্মানও পেয়েছে। বিশাল এই প্রতিষ্ঠানের একটি বিশাল দেয়াল ইন্টারেস্টিং করার চেষ্টা করেছি আমি।

এই কাজে কী কী বিষয় স্থান পেয়েছে?
এটা একটা বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী ইন্ডাস্ট্রি। ইন্ডাস্ট্রির মেশিনপত্রের মূল অংশটিই চাকা। মেশিন চালু করলেই চাকা ঘুরতে থাকে। চাকা ঘুরলেই উৎপাদন। উৎপাদন মানে উন্নয়ন, এগিয়ে যাওয়া। বিদ্যুৎ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ হলো টারবাইন। আমি এই দেয়ালটিতে চাকা, টারবাইন দিয়ে সাজিয়েছি। নানা আকারের চাকা। কোথাও বড়, কোথাও ছোট, নানান আকারের। কোথাও আবার চাকার অংশবিশেষ। চাকাগুলো কোনোটা মার্বেল পাথরের, কোনোটা স্টেইনলেস স্টিলের, কোনোটা সাধারণ লোহার। চাকাগুলো পুনঃপুনঃ ব্যবহার করে ইন্টারেস্টিং করা হয়েছে। আরও বড় বিষয় হলো, কাজটিতে অনেক স্পেস আছে। বিদ্যুৎ তো একটা লাইন, ছুটে চলে। তাই নিচে একটা স্টিলের পাইপ দিয়ে লাইন বানিয়ে সাবজেক্টগুলোকে একটার সঙ্গে আরেকটার সম্পর্ক করলাম। পরস্পরের কাছাকাছি নিয়ে আসলাম।

কী কী উপকরণ ব্যবহার করেছেন এই দেয়ালে, সেগুলোর স্থায়িত্ব কেমন?
খোলা জায়গায় এই দেয়াল। রোদে পুড়বে, বৃষ্টিতে ভিজবে। এর জন্য আমি স্টোন ব্যবহার করেছি। এখানে গ্রানাইট পাথর ব্যবহার করেছি। কোনো-কোনোটায় পাথর কেটে নকশা করেছি। এক পাথরের ভেতর অন্য রঙের পাথর বসিয়েছি। তারপর স্টেইনলেস স্টিল আছে। লোহাও আছে। লোহার তৈরি চাকাগুলো লেকার দিয়ে ফিক্সড করে দেয়া হয়েছে। সবই রয়েল বোল্ট দিয়ে আটকে দেয়া হয়েছে। প্রথমে শেওলা ধরা দেয়ালে লাগানোর পর দেখতে তেমন ভালো দেখায়নি। পরে পুরো দেয়ালটাকে সাদা রঙ করার পর সাবজেক্টগুলো ফুটে উঠল। এই ম্যাটেরিয়াল সম্পর্কে আমার ভালো ধারণা আছে। এগুলো দীর্ঘসময় টিকে থাকবে।

উদ্যানের গল্পটা শুনতে চাই ।
বড় এই দেয়ালের পাশেই আছে আরও একশ ফুটের মতো দেয়াল। সেটাও এই দেয়ালের সঙ্গে লিং করালাম। দেয়ালের সামনে অনেকটুকু খোলা জায়গা পেলাম। সেখানে সবুজ ঘাস লাগিয়ে দেয়া হলো। বিশাল এই সবুজের মঝে মাঝে রয়েছে ভাস্কর্য। এখানে নানা আকৃতির, নানা রকম বিষয়ের ১২টি ভাস্কর্য। ভাস্কর্যের মধ্যে আছে এক শিশু বিদ্যুতের খুঁটির নিচে বসে বই পড়ছে। একাত্তরে লাশ পরে থাকা সেই রিকশা আছে। এগুলো লোহার। পাথরের আছে নানা রকমের শেইপ। সেগুলোর কোনো-কোনোটা বসার বেঞ্চি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।

আবদুল কৈয়ূম চৌধুরী

সম্প্রতি চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হলো রিহ্যাবের আবাসন মেলা। এই আয়োজন সামনে রেখে আবাসন খাতের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলতে কারিকার মুখোমুখি হয়েছিলেন সংগঠনটির চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি আবদুল কৈয়ূম চৌধুরী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আবদুল্লাহ আল মামুন

রিহ্যাব চট্টগ্রাম ফেয়ারের এবারের লক্ষ্য কি?

প্রতিবছরই আমরা মেলার আয়োজন করে থাকি। এবারের মেলার লক্ষ্য একটাই সেটা হচ্ছে, রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলো এক ছাদের নিচে বসে ব্র্যান্ডিং করা। গ্রাহকরাও একই ছাদের নিচে সব কোম্পানির প্রোডাক্ট সম্পর্কে জানতে পারবে। এছাড়া আবাসন খাতে বিভিন্ন সমস্যা আছে, দাবি দাওয়া আছে, সেগুলো মেলা চলাকালে নানান অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সরকারের কাছে তুলে ধরা।

চট্টগ্রামে আবাসন খাতের সার্বিক পরিস্থিতি এখন কেমন?
২০১৬ সাল থেকে আবাসন খাত আস্তে আস্তে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু যেভাবে ঘুরে দাঁড়াবে চিন্তা করেছিলাম সেভাবে দাঁড়াতে পারেনি। গতবছরের দিকে ঘুরে দাঁড়ানো শুরু করেছিল। কিন্তু সেভাবে গতি পায়নি। গতবছরও ব্যাংক ও অর্থলগ্নিকারী অনেক প্রতিষ্ঠান ৮ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে ঋণ দিয়েছিল। ফলে মানুষ ফ্ল্যাট কিনতে আগ্রহী হয়েছিল। এখন আবার বিভিন্ন ব্যাংক সুদের হার ৯ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যাংক ঋণে সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে আনা গেলে আবাসন খাত আবারো চাঙ্গা হয়ে উঠবে। তবে ফ্ল্যাট বিক্রি আগের চেয়ে বেড়েছে। মানুষের মধ্যে এখনো আস্থার সংকট রয়েছে। আমরা আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি।

আবাসন খাতে এখন প্রধান সমস্যাগুলো কী?
ফ্ল্যাটের নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) ফি ক্ষেত্র-বিশেষে ১৪ থেকে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত দিতে হয়। বিশ্বের কোথাও ৭ থেকে ৮ শতাংশের উপর নিবন্ধন ফি নেই। নিবন্ধন ফি বেশি হওয়ায় অনেকে ফ্ল্যাট কিনতে আগ্রহী হন না। এটা ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে আনতে পারলে গ্রাহকরা ফ্ল্যাট কিনতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন। এছাড়া ফ্ল্যাটের সেকেন্ডারি মার্কেট তৈরি করতে হবে। এ জন্য একটা ফ্ল্যাট যখন দু’বার বিক্রি হবে দ্বিতীয়বার বিক্রির ক্ষেত্রে নিবন্ধন ফি নূন্যতম পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। এখন নতুন ফ্ল্যাট বিক্রিতে যে নিবন্ধন ফি, পুরনো ফ্ল্যাট বিক্রিতেও একই নিবন্ধন ফি দিতে হয়। এটা ৩ থেকে ৪ শতাংশে নিয়ে আসলে এ খাতে নতুন বিনিয়োগ আসবে। এছাড়া গ্রাহকদের কম সুদে দীর্ঘ মেয়াদি কিস্তিতে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে মানুষ বাসা ভাড়ার টাকায় ফ্ল্যাটের মালিক হতে পারেন। এ খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনে সরকারের কাছে প্রস্তাব করেছিলাম আমরা। এছাড়া অপ্রদর্শিত টাকা বিনাপ্রশ্নে বিনিয়োগের সুযোগ দিতে হবে। এখন যে শর্তে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে এ শর্তে কেউ বিনিয়োগে আসছে না।

স্বল্প ও মধ্য-আয়ের মানুষের বাসস্থান নিশ্চিতে সরকারের কি ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন?
সরকার সহযোগিতা না করলে কখনোই এটি সম্ভব নয়। সরকারের সাহায্য ছাড়া পৃথিবীর কোনো দেশেই স্বল্প ও মধ্য আয়ের মানুষের জন্য আবাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। দিন দিন জনসংখ্যা বাড়ছে। ভ‚মির পরিমাণ কমছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্লট বরাদ্দ দিচ্ছে। প্লট বরাদ্দ না দিয়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে যদি ভ‚মি দেওয়া হয় তাহলে ৩০ লাখ টাকার মধ্যে গ্রাহকদের ফ্ল্যাট দেওয়া সম্ভব।

মেলা থেকে ফ্ল্যাট কিনতে আগ্রহী ক্রেতাদের জন্য আপনার পরামর্শ কি?
গ্রাহকদের উদ্দেশ্যে বলবো ফ্ল্যাটের মূল্য এখনো সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। আবাসন খাতে কয়েক বছর মন্দা চলায় একেকজন ব্যবসায়ী অনেক জায়গায় আটকে ছিলেন। যার কারণে নূন্যতম মূল্য, অনেক ক্ষেত্রে লোকসান দিয়ে ফ্ল্যাট বিক্রি করে সে জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করছেন। সুতরাং মেলায় এসে গ্রাহকরা বুকিং দিলে ঠকবেন না। এক ছাদের নিচে সব নামিদামি প্রতিষ্ঠান থাকবে। আগামী পাঁচ বছর যেহেতু সরকার পরিবর্তনের কোন সম্ভাবনা নেই। সরকারও আবাসন খাত নিয়ে কাজ করছে। সুতরাং মার্কেট ভালোভাবে ঘুরে দাঁড়াবে। তখন লোকসান পুষিয়ে নিতে ফ্ল্যাটের দাম বেড়ে যেতে পারে। সুতরাং তাড়াতাড়ি ফ্ল্যাট কিনে নেওয়ায় হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

0 76

রবিউল হুসাইন
কবি ও স্থপতি

আমাদের ছেলেবেলায় তো আর্কিটেকচার ব্যপারটা কী জানতামই না। সবাই তখন রাজমিস্ত্রি দিয়েই বাড়ি বানিয়ে ফেলত! যদিও আমাদের ঝিনাইদহ শহরে তখন হাবিবুর রহমান নামে একজন আর্কিটেক্ট ছিলেন।
১৯৫৯ সালে আমি মেট্রিক পাশ করি। ’৬১ সালে আইএসসি পাশ করে বেরুনোর কথা। কিন্তু ফেল করার কারণে ৬২ সালে বেরুলাম। ঠিক সেই সময় ইপুয়েট (ইস্ট পাকিস্তান ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং টেকনোলজি) হলো। আহসানুল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে ইপুয়েট। স্বাধীনতার পর এটা হলো বুয়েট (বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং টেকনোলজি)। ইপুয়েট তখন আর্কিটেক্ট ফ্যাকাল্টি খুলল। ড. রশীদ ইপুয়েটের ভিসি ছিলেন। আর্ট কলেজের (পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট এবং অনুষদ) কাজ শুরু হয়। ওইটার সঙ্গে স্কুল অব আর্ট অ্যান্ড আর্কিটেকচার হওয়ার কথা ছিল। (ইপুয়েট) ইউনিভার্সিটি করতে গেলে মিনিমাম দুইটা ফ্যাকাল্টি লাগে। তখন ড. রশীদ ওখান থেকে আর্কিটেকচার ফ্যাকাল্টিটা ছিনিয়ে নিয়ে আসলেন! আমি ছবি-টবি ভালো আঁকতাম। বন্ধুদের একজন আমাকে বলল, ইপুয়েটে নতুন ফ্যাকাল্টি খোলা হচ্ছে। তুমি তো ছবি আঁকতে পারো, আর্কিটেকচার ফ্যাকাল্টিতে ভর্তি হয়ে যাও। এর আগে আমি মেডিকেলে ভর্তি হয়ে গেছিলাম প্রায়। অ্যালাউ হয়েছিলাম।
ইপুয়েটে ভর্তির আলাপের মধ্যেই আমার ওই বন্ধু বলল, এ বিষয়ে একটু পড়াশোনা করে এসো। আমি কুষ্টিয়ার ঝিনাইদহ থেকে আসা মানুষ। আর্কিটেকচারের বই কোথায় পাব? কুষ্টিয়ার পাবলিক লাইব্রেরিতে প্রত্যেকদিন সন্ধ্যাবেলা যাওয়ার অভ্যাস ছিল। খবরের কাগজ আর বই পড়তাম। ওইখানে হঠাৎ একদিন দেখি ইউএস আর্কিটেকচারের (অ্যামেরিকান স্থাপত্য) ওপর একটা বই। সেদিন আমার জীবনে প্রথম এবং শেষ চুরি চাদরের আড়ালে বই চুরি করে চলে এসেছি! ওই বই থেকে আমি ইউএস আর্কিটেকচার সম্পর্কে অনেক কিছু জানলাম। ভর্তির সময় আমার ইন্টারভিউ খুব ভালো হলো।
ইপুয়েটে সেকেন্ড ইয়ারে থাকতে আব্বা মারা গেলেন। আমরা নয় ভাইবোন। আমার ছোটভাইও বুয়েটে ভর্তি হয়েছে। আমার চাচা ভর্তি করিয়ে দিয়ে বললেন, তোমাদের ভর্তি করিয়ে দিলাম, কিভাবে পড়বে আমরা জানি না। পড়ার খরচ চালাতে আমি এক জায়গায় ড্রাফ্ট করার চাকরি নিলাম। প্রতি ঘণ্টায় এক টাকা বেতন। তিন ঘণ্টা চাকরি করতাম, তিন টাকায়। ৩০ দিনে ৯০ টাকা। তখন হোস্টেলের খরচ ৩০ টাকা দিলেই হতো। মাকে ১০/২০ টাকা করে পাঠাতাম। আমার ছোটভাই একসময় কেমিকেল কর্পোরেশনে স্কলারশিপ পেল। মাসে ১০০ টাকা। এতে ওর হয়ে যেত।
আমি সারাজীবন চাকরি করেই পড়েছি। ইপুয়েটের জীবনের শুরুর ক’বছর পয়সার অভাবে কোনো কোনোদিন সকালের নাস্তা করতে পারতাম না। পানি খেয়ে ক্লাসে যেতাম। দুপুরে ভাত খেতাম। অফিস থেকে ফিরে এসে সবচেয়ে শেষের খাবার আমি খেতাম। আমি যখন পাশ করে বের হই, তখন ক্যান্টিনের বেয়ারারা অনেক কান্নাকাটি করেছে। ওরা তো দেখেছে কত কষ্ট করে পড়েছি আমি।
মাজহার স্যার (স্থপতি মাজহারুল ইসলাম) ছিলেন আমাদের পার্ট-টাইম শিক্ষক। থার্ড ইয়ারের সময় তিনি এলেন জুরি (প্রজেক্টের বিচারক প্যানেলের জুরি) হিসেবে। আমি আমার ডিজাইন দেখাচ্ছি, ওইটা ছিল ঢাকা নিউ মার্কেটকে ডেভেলপমেন্ট করার একটা ক্লাস- প্রজেক্ট। হঠাৎ আমাদের ক্লাসটিচার এসে বললেন, রবিউল, মাজহারুল ইসলাম তোমার কাজ দেখে পছন্দ করেছেন। তুমি কি ওনার অফিসে কাজ করতে চাও?
থার্ড ইয়ার থেকেই আমি স্যারের অফিসে পার্ট-টাইম কাজ শুরু করে দিলাম। ৫০/৬০ টাকা বেতন দিতেন। যুদ্ধের সময় উনি চলে গেলেন কলকাতা। ওই নয়মাস তার অফিস আমি চালিয়েছি। তখন আমরা তিনজন ছিলাম আর্কিটেক্ট আমি, শামসুল ওয়ারেস আর অপরেশ দাস। আমরা সবাই ক্লাসমেট। মাজহারুল ইসলাম আমাকে বললেন, তুমি অফিস চালাবে। সে অনুযায়ী একটা কাগজে ক্লায়েন্টদের উদ্দেশে ঘোষণা এবং আমার জন্য একটা চেকবইয়ের সবগুলো পাতা (ব্যাংক চেক) সই করে দিয়ে গেলেন।
আমি মনে করি আমার জীবনের অন্যতম একটা অর্জন মাজহারুল ইসলামের সঙ্গে মেশা। উনি মূলত সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু প্যাশনে ও পেশায় পুরোমাত্রায় আর্কিটেক্ট। লেখাপড়া করেছেন অ্যামেরিকায়। আর্কিটেকচার মানে হলো সবদিক থেকে আপনাকে জানতে হবে, বুঝতে হবে। আর্কিটেকচার সম্পর্কে গ্যাটের একটা সংজ্ঞা আছে ‘আর্কিটেকচার ইজ এ ফ্রোজেন মিউজিক’। আর মিউজিক হলো লিকুইড আর্কিটেকচার। এটা আমাদের মাজহারুল ইসলামের মধ্যে দেখেছি। ওনার সব দিকে লক্ষ্য ছিল সাহিত্য, সংগীত, রাজনীতি, নগর পরিকল্পনা কোনোটাতে কমতি নেই। কথা-বার্তা, চাল-চলন সব মিলিয়ে তাকে একজন ফিলোসফার-আর্কিটেক্ট বলা যেতে পারে।
মাজহারুল ইসলাম বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ আর্কিটেক্ট। তিনি চট্টগ্রামের সন্তান। তার সবচেয়ে বড় অবদান আমাদের সংসদ ভবন। ফকা চৌধুরী তখন পাকিস্তানের স্পিকার এবং পূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৫৯ সালে ঠিক হয় যে, পাকিস্তানের দুটো রাজধানী হবে। মূল রাজধানী ইসলামাবাদে। দ্বিতীয় রাজধানী ঢাকায়। ঢাকাকে রাজধানী হিসেবে সাজাতে আর্কিটেক্ট দরকার। ফকা চৌধুরী মাজহারুল ইসলামকে ডেকে পাঠিয়ে বললেন, তুমি কাজটা করো। মাজহারুল ইসলাম তার বিচক্ষণতা ও উদারতার পরিচয় দিয়ে বললেন, এত বড় কাজ আমি না করে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কোনো বড় স্থপতি দিয়ে করলে এটা দেশের জন্য ভালো, আমাদের স্থপতিদের জন্যও ভালো। স্থাপত্যশিক্ষার জন্যও ভালো। মাজহারুল ইসলামের প্রস্তাব করা তিন স্থপতির মধ্যে পরে অ্যামেরিকার লুই আই কান কাজটা পান।
মাজহারুল ইসলাম লুই আই কানের সঙ্গে লনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলেছেন। আমরা দেখেছি। মাজহারুল ইসলাম ব্রিক (লাল ইটের) বিল্ডিংয়ের জন্য কিন্তু পাইওনিয়ার আমাদের দেশে। সংসদ ভবন করার ক্ষেত্রে কিছু ব্যপারে লুই আই কানকে মাজহারুল ইসলাম পরামর্শ দিয়েছেন। আমরা যেতাম, দেখতাম। মাজহারুল ইসলামের সঙ্গে থেকে শামসুল ওয়ারেস, আবদুর রশীদ, মাহবুব হোসেন খান, আমির হোসেন আমরা অনেক কাজ করেছি।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মাজহারুল ইসলাম ফিরলে আমরা ভাবছিলাম প্রতিষ্ঠানটা আরও প্রসারিত হবে। কিন্তু তিনি সেটা আর করেননি। তখন অ্যানিমি প্রোপার্টি দেখাশোনা করার জন্যে আমাদের একটা কমিটি করে দেওয়া হলো। এর মধ্যে আমি ছিলাম, আলমগীর কবীর আর শামসুল ওয়ারেস ছিলেন। আলমগীর কবিরকে আমরা এমডি বানালাম, সেইভাবে কাজ এগোত থাকল। এরপর শামসুল ওয়ারেস চলে গেল ইউনিভার্সিটিতে। আলমগীর মস্কোপন্থী বাম রাজনীতি করত। একপর্যায়ে (৭৫/৭৬ সালে) শহীদুল্লাহ সাহেব বললেন যে, আপনি আমার সঙ্গে আসেন। তারপর থেকে তার সঙ্গে কাজ করা। একসময় উনিও আলাদা হয়ে গেলেন। আমি আমার মতো আছি।
সারাদেশে আমার অনেক কাজ ছড়ানো-ছিটানো আছে। এর মধ্যে বার্ক বিল্ডিং আমার খুব প্রিয় কাজ। এটার বৈশিষ্ট্য হলো, সব কিছু ইটের তৈরি। ছাদে আড়াআড়ি ইট দিয়ে আর মাঝখানে রড দিয়ে ঢালাই করা। সিঁড়িও তাই। সেজন্য এটা আমার খুব পছন্দের কাজ। ভেবেছিলাম এটার জন্য আগা খান পুরস্কার পাব। পাইনি। দুর্ভাগা মানুষ তো আমি!
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তি ও স্বাধীনতা তোরণ (নীলক্ষেত অংশে) ডিজাইন করেছি। আমি অনেক ব্রিকের (ইটের) কাজ করেছি। বিশ্বব্যাংকের একটা কৃষিভিত্তিক প্রজেক্ট করেছিলাম। ওটাকে বলে ‘ব্রিক ভল্ট’। সাত’শ নাকি কত জায়গাতে এটা রিপিট হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গেইট, কিছু বিল্ডিং, ভাসানি হল, বঙ্গবন্ধু হল, শেখ হাসিনা হল, খালেদা জিয়া হল, দেশের সবচেয়ে উঁচু শহীদ মিনার, কিছু কিছু হাউজিং ও একাডেমিক বিল্ডিং ডিজাইন করেছি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াজেদ মিয়া সায়েন্স কমপ্লেক্স করেছি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটরিয়াম ও একাডেমিক ভবন কমপ্লেক্স করেছি। হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের মধ্যে স্বাস্থ্য বিভাগের একটা ভবনের কাজ চলছে। দিনাজপুরের হাজী দানেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের গেইট, বিকেএসপি, দিনাজপুরের এইট লেন্থ সুইমিং পুলসহ কমপ্লেক্স করেছি। সাভার বিকেএসপির শুটিং রেঞ্জের ডিজাইন করেছি। চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ইউনিভার্সিটির ডিজাইন করেছি। তিনটা মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ডিজাইন করেছি। সামনেও হয়তো সুযোগ পেলে আরও কিছু করব। দেশের জন্য। দেশের স্থাপত্য-শিল্পের সমৃদ্ধির জন্য কাজ করে যেতে চাই।
অনুলিখন : সোহরাব শান্ত

0 74

তানজিম হাসান সেলিম
স্থপতি

বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে পড়াশোনা শেষ করে দেশেই কাজ শুরু করি। কিন্তু খুব একটা সুবিধা করতে পারছিলাম না। মনে হয়েছিল দেশের চেয়ে বাইরে কাজ করলেই ভালো করব। সেই চিন্তা থেকে আবুধাবি চলে যাই। সেখানে কাজ করতে করতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নকশা করি। আর এই কাজের মাধ্যমেই যেন দেশে আমার পুনর্জাগরণ হলো! আমার স্ত্রী স্থপতি নাহিদ ফারজানা; তিনিও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রকল্পে কাজ করেছেন। জাদুঘরের কাজ করতে গিয়ে দেশে ফিরে পরিবারের সঙ্গে এক হওয়া এবং খুব অর্থপূর্ণ একটা কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে অন্যরকম আনন্দ হচ্ছিল।
২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসের দিকে বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ট্রাস্টি বোর্ড যৌথভাবে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নকশা আহবান করে। প্রতিযোগিতায় আমিও অংশ নিই। ওই বছরের ডিসেম্বরে ফলাফল প্রকাশ হয়। আমার কাজটা নির্বাচিত হয়। আবুধাবির চাকরি ছেড়ে ২০১০-এর শুরুতে দেশে চলে আসি। ওই বছরের মাঝামাঝিতে জাদুঘর ট্রাস্টি বোর্ডের সঙ্গে আমার চুক্তি হয়। তারপর প্রায় আট বছর এই কাজেই লেগে থাকি। ২০১৭ সালের ১৬ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উদ্বোধন হয়। বাংলাদেশের মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ মিশে আছে। সেদিক থেকে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরও একটা বড় আবেগের জায়গা। নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ; বিশেষত মুক্তিযোদ্ধারা যখন প্রশংসা করেন, আবেগতাড়িত হয়ে যাই। আরেকটা স্বীকৃতি হচ্ছে অনেক শ্রদ্ধেয় স্থপতিরাও কাজটার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। অনেক সহযোগিতাও করেছেন। আমার জীবনের এখন পর্যন্ত করা সবচেয়ে বড় কাজ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, যা নিয়ে আমি গর্ব করি।
একটা রাষ্ট্র্র ভৌগোলিকভাবে আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্রে প্রথমে যেটা কাজ করে, তা হলো দ্রোহ। পশ্চিম পাকিস্তানের অনেক শৃঙ্খল আমরা মানিনি। এই দ্রোহটা আমার কাছে খুব মূল্যবান মনে হয়। দ্রোহ থেকেই পরবর্তী বিদ্রোহের স্পিরিটটা নেওয়া হয়েছে বলে আমি মনে করি। দ্রোহ বিষয়টা সার্বজনীন। এটাকে কোনো বয়স, লিঙ্গ, জাতি, ধর্ম বা ভৌগোলিক সীমারেখা দিয়ে আটকানো যায় না। এই দ্রোহকে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে প্রকাশের চিন্তা ছিল। এ রকম অনেক চিন্তার সমন্বয় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। এর মধ্যে অন্যতম হলো একটা সেমি-পাবলিক স্পেস রাখা। জাদুঘরে যে শ্রেণি-পেশার মানুষই আসুক, ভবনের ভেতরের একটা অংশ পর্যন্ত যেন ঢুকতে পারে। এরপর গ্যালারি দেখতে চাইলে টিকেট কেটে ঢুকবে। ওখানে একটা উন্মুক্ত অ্যাম্পিথিয়েটারও আছে, যেখানে নানা অনুষ্ঠান করা যায়।
এ রকম একটা কাজ করা একজন স্থপতির জন্য বিশাল সুযোগ। আমার ভেতরে এক ধরনের তাড়না ছিল যে, কীভাবে এটাকে আমরা এমন একটা জায়গায় নিতে পারি, যেখানে একই সঙ্গে বাংলাদেশের সংস্কৃতি, পারিপার্শ্বিকতা ও ভাবধারা সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিকতাও থাকে; থাকে সার্বজনীনতাও। আমার চিন্তা ছিল, এটা যেন পুরো দুনিয়ার মুক্তিসংগ্রামীদের আবেগের জায়গাটা ধরতে পারে। বিশেষত, আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের যে সংগ্রাম, রাজনৈতিক নেতাদের কূটনৈতিক তৎপরতা, সামরিক বাহিনীর ভূমিকা এবং সাধারণ মানুষকে প্রশিক্ষিত করায় ভূমিকা নেওয়া সবগুলো বিষয়ই ধরার একটা প্রয়াস। ভাগ্যক্রমে আমরা খুব কম সময়ে; মাত্র ৯ মাসে স্বাধীনতা পেয়েছি। কিন্তু এই ৯ মাসে অনেক জীবন গেছে, অনেক রক্ত ঝরেছে। অনেক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। যে হারিয়েছে, তার দুঃখ আমরা মুছতে পারব না। অনেক মানুষ আছে, যারা হয়তো সে অর্থে স্বীকৃত নন কিন্তু যুদ্ধে তার অনেক অবদান আছে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এসে তারা যেন অনুভব করে যে, এটা তার আবেগের জায়গা।
আমার ছবি আঁকার অভ্যাসটা স্থাপত্যের জায়গায় এক ধরনের সুবিধা দিয়েছে। আর্কিটেকচারের ক্ষেত্রে পরিকল্পনাটা বাস্তবতার সঙ্গে মিলতে হয়, আর্টের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা একটু বেশি। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের পরিকল্পনা করতে গিয়ে কিছু বিষয় হয়তো মনের মতো করতে পারিনি। সেগুলোর আক্ষেপ থেকে হোক, অপূর্ণতা থেকে হোক কিছু ছবি এঁকেছি। আমার ছবির প্রদর্শনীও হয়েছে। আমি পেশাদার চিত্রশিল্পী নই। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় এটা আমার একটা স্বাধীনতা। ছোটবেলায় যখন ছবি আঁকতাম, তখন পরিবার থেকে খুব একটা উৎসাহ দেওয়া হতো না। বিশেষ করে প্রাণীর ছবি আঁকা নিয়ে সামাজিক নিরুৎসাহের এক ধরনের প্রভাব ছিল। তখন আমি মেশিনারিজ, গাড়ি এ ধরনের জিনিসপত্র আঁকতে শুরু করি, যা পরবর্তীতে আমাকে অনেক সহায়তা করেছে।
মজার ব্যাপার হলো, স্থাপত্য সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিল না। এমনকি ভর্তি হওয়ার পরও তেমন অনুভূতি কাজ করত না। এটা আসলে ঘটনাক্রমে হয়ে গেছে! আমার পরিকল্পনা ছিল পদার্থবিজ্ঞানে পড়া। তা যদি না-ও হয়, নিদেনপক্ষে কম্পিউটার সায়েন্স বা ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং। বাবা বললেন, দেশের বাইরে যাওয়া যাবে না। দেশেই থাকতে হবে। বাইরে যাওয়ার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েও বাবার আপত্তিতে যাওয়া হয়নি। দেশে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার মতো যতটুকু পড়া বা প্রস্তুতি নেওয়া দরকার সেটা আমার ছিল না। আমার এক বন্ধু বলল, তুমি যেহেতু ছবি-টবি আঁকতে পারো, বুয়েটের জন্য প্রস্তুতি নাও। ফরম কিনে পরীক্ষা দেই। টিকে যাই। ভর্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি আর্কিটেকচার (স্থাপত্য) বিষয়টা সম্পর্কে তেমন কিছু জানতাম না। বাংলাদেশে যে এত বড় বড় স্থাপনা রয়ে গেছে তাও অনুধাবন করিনি। পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি স্থাপনা আমাদের সংসদ ভবন, লুই আই কানের করা। এর সামনে দিয়ে কত গিয়েছি, সেভাবে এর মর্মার্থ অনুধাবন করিনি। এটা আসলে এক ধরনের ট্রেইনিং-ওরিয়েন্টেশন ছাড়া বোঝা কঠিন। আর্টের মধ্যে সবচেয়ে জটিল অংশটাই হলো আর্কিটেকচার। ফটোগ্রাফি বলেন, পেইন্টিং বলেন, পারফর্মিং আর্ট বা ফাইন আর্ট বলেন; সিনেমা বা স্কাল্পচার এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জটিল অংশ হচ্ছে আর্কিটেকচার। আর্কিটেকচার করলে আপনাকে বাস্তবের সঙ্গে যুক্ত হতেই হবে। আপনাকে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মুখোমুখি দাঁড়াতেই হবে। এটাকে কাঠামো দিতে হবে, এটার একটা যান্ত্রিক ব্যবস্থা লাগবে। মানুষ এটাকে ব্যবহার করবে। নিরাপত্তার ব্যাপারও আছে।
আমার মতে, আমাদের দেশের সেরা ভবনগুলোর মধ্যে সংসদ ভবন অবশ্যই এক নম্বর। মাজহারুল ইসলামকে বাংলাদেশের আধুনিক স্থাপত্যের পথিকৃৎ বলা যেতে পারে। ওনার করা যে স্থাপনাগুলো আছে প্রত্যেকটিই খুব ডিফিকাল্ট। ন্যাশনাল আর্কাইভ ভবন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্ট কলেজ বিল্ডিং (চারুকলা ভবন) তার উল্লেখযোগ্য কাজ।
একটা সময় আমাদের দেশে বাইরের বিশ্ববিখ্যাত স্থপতিরা এসে কাজ করতেন। তারা নতুন ও বৈশ্বিক চিন্তা-ভাবনা এখানকার স্থাপনায় যোগ করেছেন। মাজহারুল ইসলামের সময় করা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি উদাহরণ হিসেবে আসতে পারে। ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পল রুডলফের করা। মাজহারুল ইসলামের পরামর্শে তখন নামকরা আর্কিটেক্টদের এ দেশে আনা হয়েছে। লুই আই কানও তার প্রস্তাবিত আর্কিটেক্টদেরই একজন।
স্থাপনার মধ্য দিয়ে একটা শহরের অনেক কিছুই বোঝা সম্ভব। একটা দেশের উন্নতি বোঝা যায়। কারণ রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক বিভিন্ন রকম প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একটা ভবন তৈরি হয়। যে কমিউনিটি বা দেশে ভবনটা হচ্ছে ওইটা ওই জায়গাটার একটা স্যাম্পলের মতো। যেখান থেকে ধারণা নেওয়া যায়, এরা আর্টে, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বা কালচারে কেমন। এটা একটা সার্বজনীন চিন্তা। যদি গ্রিকদের কথা বলি, রোমান, ইজিপটেশিয়ান বা চাইনিজদের কথা বলি, ওদের প্রত্নতাত্তিক নিদর্শনের মধ্যে কিন্তু ভবন আসেই। এসব ভবন দেখে তাদের ধর্মীয় চিন্তা থেকে শুরু করে সামাজিক অবস্থান, জীবনযাপন প্রণালী, তাদের পেশা-দক্ষতা সবকিছু সম্পর্কে ধারণা করা যায়।
আমার নিজের কিছু কাজের কথা যদি বলি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নিয়েই পড়েছিলাম ২০১৭-এর শুরুর দিক পর্যন্ত। গত সাত বছরে আমি তেমন বড় কাজ করিনি। কিছু ছোট ছোট কাজ গুরুত্ব দিয়ে করেছি। ঢাকার গ্রীনরোডে একটা অ্যাপার্টমেন্ট প্রজেক্ট করেছি পারিল ভিউ। ৮৪টা অ্যাপার্টমেন্ট আছে ওখানে। ওইটা একটা অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স, তবে নিচে কমার্শিয়াল স্পেসও আছে। আন্তর্জাতিক কিছু কম্পিটিশনে অংশ নিয়েছি। কিছু ফ্যাক্টরি ডিজাইন-ডেভেলপমেন্টের কাজ করেছি।
বর্তমানে বগুড়ায় অটিস্টিক বাচ্চাদের জন্য ‘প্রয়াস’ নামে একটা স্কুলের কাজ করছি। স্কুলটা নির্মাণকাজ শুরু হবে শিগগিরই। আরেকটা প্রাইভেট ক্যান্সার হাসপাতালের কাজ করছি। এটা ঢাকার সাভারে হবে। ‘প্রয়াস’ স্কুলটার কাজের বিনিময়ে আমি তেমন কোনো টাকা-পয়সা নিচ্ছি না, সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই করছি।

অনুলিখনঃ সোহরাব শান্ত

0 65

প্যাট্রিক ডি রোজারিও স্থপতি, ম্যানেজিং পার্টনার, সিনথেসিস আর্কিটেক্টস

আপনার বেড়ে ওঠার গল্প শুনতে চাই। সময়টা কেমন ছিল?
আমার জন্ম ঢাকার লালবাগে, তবে বেড়ে ওঠা শ্যামলীতে। ওই এলাকায় বেশিরভাগ মানুষই ছিল সরকারি কর্মকর্তা। কিন্তু আমার বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী। তখন শ্যামলীর রিং রোড ছিল ঢাকার শেষ প্রান্ত। এরপর থেকেই ছিল নদীর শুরু। এখন তো আর ধারে-কাছে নদী নেই। এখনকার আশুলিয়া যেমন, ওই জায়গাটা ছিল তেমনই। এখানে শ্যামলী ক্লাব মাঠ ছিল। ছোটবেলার বেশিরভাগ সময় আমার খেলাধুলাতেই গেছে। তাই পড়ালেখাকেন্দ্রিক স্মৃতি অনেক কম। আমরা পাঁচ ভাই ও এক বোন। সে কারণে দুরন্তপনাটা ছিল অনেক বেশি। তাছাড়া আমাদের পুরো এলাকাতেই খেলাপাগল মানুষ ছিল। এনাম সাহেব, যিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের বড় কর্মকর্তা, এছাড়া ক্রিকেটার মোহাম্মদ রফিক, এখন অবসরে, তিনিও কিন্তু আমাদের এলাকার। যে সময়টার কথা বলছি সেটা আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে নব্বইয়ের দশক। এই যে অজান্তেই প্রকৃতির সঙ্গে বেড়ে ওঠা, এটা কিন্তু পরবর্তী সময়ে স্থাপত্য পেশায় আসার পর অনেক কাজে দিয়েছে। বছরের কোন সময়ের পাতার রঙ কেমন হয়, কখন পাতায় ধুলো পড়ে এসব আমরা জেনেছি। তাই শুধু বইয়ের জ্ঞান নিয়েই কাজ করতে হয়নি। বরং নিজের জানা বিষয়গুলোকে বইয়ের জ্ঞান দিয়ে ঝালিয়ে নিতে পেরেছি।

কর্মজীবনের শুরুটা কীভাবে করেছিলেন?
বুয়েটে ভর্তি হওয়ার আগে আমরা আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টে কোচিং করতে যেতাম। সেখানে গিয়ে সেই ডিপার্টমেন্টের পরিবেশ দেখে ভালো লেগে যায়। তখনই প্রতিজ্ঞা করলাম, পড়লে এখানেই পড়ব। স্থপতি হিসেবে কর্মজীবনের শুরুটা হয়েছিল ছাত্রজীবনেই। বাসাতেই টুকটাক কাজ শুরু করি। আমরা সচ্ছল পরিবার ছিলাম। রিকশা বা স্কুটারে করে বুয়েটে যেতে পারতাম কিন্তু বাবা-মা বাসের ভাড়াটাই দিতেন। সেটা ছিল আমাদের জন্য অনেক বড় শিক্ষা। আমি সেই সময় অনেক মডেল তৈরি করতাম। ফার্মে ফার্মে ঘুরে বেড়াতাম, খুঁজতাম কোথায় প্রফেশনাল মডেল করা যায়। এভাবে কাজের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা অর্জন হতে থাকে, যেটা পরবর্তী জীবনে অনেক কাজে লাগে।
একটা মজার অভিজ্ঞতার কথা বলি। ওয়ারেস স্যার (স্থপতি শামসুল ওয়ারেস) একটা বাড়ির ডিজাইন করেন বারিধারাতে। আমরা তখন সেকেন্ড ইয়ারে। তিনি বললেন মডেলটা বানাতে হবে। স্যার তো সময় দিতে পারতেন না। আমরা তিন-চারজন তার অফিসে কাজ করি; স্যার শুধু ড্রইং দিয়ে চলে যান। একটা স্টাডি মডেল পর্যন্ত ছিল না। সেটাই ছিল প্রথম মডেল এবং সেটাই ক্লায়েন্টের কাছে দেখানো হবে। তাই আমাদের সেটা সেভাবেই বানানো হয়েছিল। এটা ছিল আমাদের জন্য দারুণ এক অভিজ্ঞতা।

আপনার উল্লেখযোগ্য কিছু কাজ সম্পর্কে জানতে চাই।
সত্যি বলতে, আমি আমার আগের দিনগুলো অনেক মিস করি। এখন ছয় হাজার বর্গফুটের অফিস হয়েছে। কিন্তু শুরুটা করেছিলাম ৪০০ বর্গফুট দিয়েই। এখন তো ড্রইং করে দিচ্ছি, ওরা বানিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। একটা সময় একটা গ্যারেজের ওপর কাজ শুরু করেছিলাম। তখন আমাদের কাছে কিছুই ছিল না। পলাশ ভাইয়ের সঙ্গে ভিস্তারা আর্কিটেক্টসে সহকারী স্থপতি ছিলাম। বসুন্ধরা সিটি প্রজেক্ট পর্যন্ত ছিলাম। তারপর আলাদাভাবে কাজ শুরু করি ২০০০-২০০১ সালের দিকে।
বে ডেভেলপমেন্টের কাজ দিয়ে আমাদের শুরু। ওদের একটা ভবনের রেনোভেশন করছিলাম। সেটা চলার সময় একজন আমাকে ফোন করে বললেন, আমাকে দিয়ে একটা প্রজেক্ট তিনি বানাতে চান চৌমুহনীতে। তাকে আমি চিনতাম না। প্রথমদিন আসার সময় অনেক খাবার নিয়ে এলেন। আমি ভাবলাম এটাই কি ফি হিসেবে এনেছেন নাকি! তিনি মিনার প্রকাশনীর মালিক, চৌমুহনীতে তার অনেক সুনাম আছে। তো চৌমুহনীতে মিনার প্রকাশনীর একটা বাণিজ্যিক ভবনের কাজ আমরা প্রথম শুরু করলাম। আমরা ফি’র কথা বলার আগেই তিনি বললেন, আপনাদের ফি সম্পর্কে জানি, একটু বেশি হয়ে যায়, তারপরও আমার কাজটা করে দেন। সেটাই ছিল আমাদের প্রথম আর্কিটেকচারাল প্রজেক্ট। তিনি আমাদের কাছে আসতেন, ড্রইং নিয়ে যেতেন, ইঞ্জিনিয়ার আসত, আমরাও যেতাম। তখনকার সময় যোগাযোগব্যবস্থাও এত ভালো ছিল না। এদিকে আমাদের বড় একটা কাজ শুরু হয়ে যায়। গুলশান অ্যাভিনিউয়ে বে গ্যালারি।
তখন একটা নিয়ম ছিল, যেটাকে আমরা ‘১৯৬৬ রুল’ বলি। তখনকার সময়ে ভবনগুলো দেখবেন অনেকটা বাক্স আকৃতির। তেমন কিছু করতে না পেরে আমরা আমাদের প্রজেক্টটাকে ৩০ ফুট পেছনে নিয়ে গেলাম। সেটা দেখেই ক্লায়েন্টের মাথা খারাপ! তারা ভাবল এক ট্রিটমেন্টেই কোটি কোটি টাকা লোকসান হয়ে যাচ্ছে। আমি বললাম, আগে বিল্ডিংটা আমরা তৈরি করি তারপর দেখেন কী দাঁড়ায়। কমপ্ল্যায়েন্স বিল্ডিংয়ের ধারণা নিয়ে আমরা কাজটা শুরু করি। সেই সময়ে এর চর্চা খুব একটা ছিল না। তাই এ ধরনের ডিজাইনে বলতে গেলে আমরাই ছিলাম পাইওনিয়ারদের একজন। আমরা সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করলাম। বড় উচ্চতার ভবনটাতে সবার জন্য যাতে পর্যাপ্ত পার্কিং থাকে, সেই ব্যবস্থা থাকল। ২৬ কাঠার একটা প্লটে আমরা প্রতি ফ্লোরে মাত্র একটা করে বাণিজ্যিক ইউনিট রাখলাম। তার মানে প্রত্যেকে প্রচুর জায়গা পেল। এই প্লটের তিনদিকেই রাস্তা, তাই আলো-বাতাস প্রবেশের যাতে ভালো ব্যবস্থা থাকে, সেদিকটা খেয়াল রাখলাম। যে-কারণে ইউনিসেফ, আইএমএফ, আইডিএলসির মতো করপোরেট প্রতিষ্ঠান এই ফ্লোরগুলো নেয়ার জন্য বেশ আগ্রহী হয়ে উঠল। এরপর স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড গ্রুপ এসে পুরো ভবনটাই কিনে নিতে চায়, প্রস্তাব দেয় ৩৫ কোটি টাকার। নির্মাণের পরপরই সেটা সেরা আর্কিটেকচারাল অ্যাওয়ার্ড পেল। পরে মেলবোর্নের প্রদর্শনীতে গেল। এ কারণেই প্রজেক্ট শুরুর আগে আমি ক্লায়েন্টকে বুঝিয়েছিলাম, জায়গা ছাড়লেও যদি ভালো মানের কিছু তৈরি করা যায়, তাহলে সেটার চাহিদা থাকবেই এবং সেটা থেকে ভালো অঙ্কের মুনাফাও তৈরি করা যাবে। হয়েছিলও তাই। এই প্রজেক্টটা ছিল আমাদের জন্য একটা বড় প্লাটফর্ম। এর মাধ্যমে চ্যালেঞ্জটাও কিন্তু অনেক বেড়ে গিয়েছিল।
আরও একটা ভালো প্রজেক্ট আমাদের গুলশান-২-এর ৫৬ নম্বর রোডে, ওয়েস্ট উড অ্যাপার্টমেন্ট। এটাও বে ডেভেলপমেন্টেরই ছিল। সেই সময় আমরাই বোধহয় ২১ কাঠা জমির ওপর ছাদবাগান করলাম। আরও অনেকেই এটা করেছে, কিন্তু আমাদেরটা ১০ কাঠা আয়তনের, যেটা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড়। সেটা বেশ আকর্ষণীয় প্রজেক্ট ছিল। আমরা এখানে লিফট বা উচ্চতা নিয়ে কাজ করেছি। গ্রাউন্ড ফ্লোরটাকে যেন পার্কিং মনে না হয়। সেটাকে যেন প্রবেশপথ হিসেবেই ব্যবহার করা যায়, সেদিকে খেয়াল রাখা হয়েছে। প্রতিটা অ্যাপার্টমেন্টের আলাদা প্রাইভেসি আছে। আবার কমন স্পেসও রাখা হয়েছে। লিফট থেকে শুরু করে লবি কিংবা করিডোরগুলো ব্যবহার করা হয়েছে এক্ষেত্রে। তিনটা ব্লকের মাঝখানে সিঁড়ি আর লিফট বসিয়ে সবাই যাতে নিজস্ব আলাদা এরিয়া পায়, সেই ব্যবস্থা করা হয়েছে।
আমাদের আরেকটা প্রজেক্ট আছে বনানীতে, মুনসট্রি। এটাও আমার পছন্দের একটা কাজ, যেটাও প্রদর্শনীতে গেছে। এখানে আমরা এলিভেটেড গ্রাউন্ড ফ্লোর তৈরি করেছি। গ্রাউন্ড ফ্লোরের প্রবেশপথটা সাড়ে আট ফুট উঁচুতে উঠিয়েছি। আস্তে আস্তে উপরের দিকে ওঠানো হয়েছে বলে আপনি বুঝতে পারবেন না যে এত ওপরে উঠে গেছেন। পুরো পার্কিং লটের ছাদটায় বাগান করা হয়েছে। ঘরের লিভিং রুমের কাচ দিয়ে আপনি সেই বাগান দেখতে পাবেন, বাগানের পরিবেশটা পাবেন। পুরো ভবনটা এই লনকে ঘিরে করা হয়েছে। উপরে পুল আছে। এটার আরেকটা মজার বিষয় হলো, দুটো পুরনো বড় গাছ ছিল। উত্তর দিকে একটা আমগাছ আর দক্ষিণে কৃষ্ণচ‚ড়া। শর্ত ছিল, এই দুই গাছের কিছু করা যাবে না, আর আমরা তেমনটা চাইওনি। তাই ভবনটাকে এমনভাবে করা হলো, যাতে গাছগুলো এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
এছাড়া উত্তরা আড়ং বেশ কয়েকটা পুরস্কারও পেয়েছে। আমরা জানি আড়ং মানে হলো মেলা, চারিদিকে বিভিন্ন ধরনের পণ্য পাওয়া যায়, যেটা একটা হরাইজন্টাল ধরনের জার্নি। এটাকে কীভাবে ভার্টিক্যালি আনা যায় সেটাই ছিল চ্যালেঞ্জ। জায়গাটা অনেক ছোট ছিল। ৬২ ফুট চওড়া, কিন্তু লম্বায় প্রায় ১৬০ ফুট। আইডিয়াটা নিয়ে আমরা ওদের জুরি বোর্ডের সঙ্গে বসেছি, এমনকি স্যার ফজলে হাসান আবেদের সঙ্গে কথা হয়েছে এবং তিনি বেশ পছন্দ করেন ব্যাপারটা। আমরা একটা জার্নিরই নকশা করেছিলাম।
সাম্প্রতিক কাজের মধ্যে রয়েছে বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, যেটা রাজশাহীতে হচ্ছে। প্রায় ৭৫ বিঘা জমির ওপর পুরো ক্যাম্পাসটার নকশাই আমরা করছি। বেশ মজা নিয়ে কাজ করছি। ২৫ হাজার শিক্ষার্থীর ক্যাম্পাস হবে সেখানে। তিনটা ধাপে হবে এই বিশ্ববিদ্যালয়। প্রথম ধাপে থাকবে ছয় হাজার শিক্ষার্থী। তারপর সেটা বাড়বে।
এছাড়া চট্টগ্রামে আমাদের কাজের শুরু হয়েছে স্যানমারের মাধ্যমে। এরপর কক্সবাজারেও কাজ করেছি। চট্টগ্রামে হাইড পার্ক, রয়েল ব্রিজ এগুলো বেশ ভালো প্রজেক্ট। দেশের বাইরে কাজ করারও অভিজ্ঞতা আমাদের আছে। উজবেকিস্তানের তাসখন্দে করা হয়েছে সেই প্রজেক্টটা। এক্ষেত্রে একটু সমস্যা হয়েছিল। ওটা ছিল তাদের প্রেসিডেন্ট হাউজের পথে। রাম ডেভেলপমেন্টসের অধীনে কনডোমিনিয়াম বিল্ডিং প্রজেক্ট ছিল সেটা। ভিন্ন ধরনের পরিবেশে, ভিন্ন ধরনের মানুষের ভিন্ন ধরনের রুচির সঙ্গে পরিচিত হয়েছি, সব মিলিয়ে দারুণ একটা ভালোলাগা অভিজ্ঞতা। তাসখন্দ কিন্তু বেশ ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে। সেই সঙ্গে ওদের বিল্ডিং কোডও আলাদা। আমাদের রাজউকের মতো ওদের যে কর্তৃপক্ষ আছে, তাদেরও বেশ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আছে। সেসবও আমাদের সামলাতে হয়েছে। কারণ কেবল প্রজেক্টের নকশা করা নয়, সেটার অনুমোদন করানোর দায়িত্বও ছিল আমার ওপর।

বলতে গেলে একটা বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে আমাদের নগর যাচ্ছে। এর মধ্যে আপনার সৃষ্টিগুলো কী বার্তা দেয়?
আসলে সত্যের চর্চা করতে পারলে কোনো সমাজেই কিন্তু বিশৃঙ্খলা থাকে না। আপনি যদি পৃথিবীর উন্নত সমাজব্যবস্থাগুলোর দিকে তাকান, দেখবেন তারা কিছুটা হলেও এই সত্যের চর্চা করে। আমাদের এই জিনিসটার অভাব। ঢাকার জন্য কিন্তু ১৯৯৫ সালে একটা স্ট্র্যাকচার প্ল্যান করা হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল ২০১০ সালের মধ্যে সেটা বাস্তবায়ন করা। ২০১৮ সালে এসেও সেটার ১৫ শতাংশ করতে পারিনি। সবকিছুর ভালো-খারাপ দুই দিকই থাকে। পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা বড় রাস্তা নিয়েছি কিন্তু সেটার দুই ধারে যে জলাধার থাকার কথা ছিল সেটা আর মনে রাখিনি। বরং জমিগুলো ভরাট করে সেগুলো বিক্রি করে দিয়েছি।

ছোটবেলা থেকে এই শহরে বেড়ে ওঠা আপনি যে নগরের স্বপ্ন দেখেন সেটা কি হয়েছে?
অবশ্যই হয়নি। নগর মানে ইট-পাথরের কোনো জঞ্জাল নয়। নগরের আত্মা থাকতে হবে। আমার মনে হয় আমরা সেটাই মিস করছি এবং সেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ইট-পাথর সিঙ্গাপুরেও আছে। কিন্তু সেখানে একটা ভালোলাগা আছে। সেখানে আপনি যদি আইনের মধ্যে থাকেন, তাহলে কেউ বিরক্ত করবে না। সমস্যা হচ্ছে আমরা সম্ভবত জাতিগতভাবেই ব্যবস্থাপনায় অনেক বেশি দুর্বল। আমরা খুব সহজে রক্ত গরম করে ফেলি। কিছু জায়গায় কিন্তু ঠান্ডা মাথার কাজও দরকার।

মো. শেখ সাদী, চেয়ারম্যান, এশিওর গ্রুপ


কৈশোরের দুরন্ত, চঞ্চল আর মেধাবী ছেলে মো. শেখ সাদী। জন্ম ১৯৭৮ সালে, কুষ্টিয়ায়। শৈশব কেটেছে গ্রামেই। তখন থেকেই কিভাবে মানুষের উন্নয়নে কাজ করা যায় সে স্বপ্ন দেখতেন। মেধাবী ছাত্র হওয়ায় ছিলেন সবার স্নেহভাজন। স্কুলজীবনে এলাকার দানবীর হিসেবে খ্যাত আলাউদ্দিন সাহেবকে দেখে মুগ্ধ হতেন। হতেন অনুপ্রাণিত। সৎ উপায়ে ব্যবসা করার দৃঢ় মানসিকতার শুরু তখন থেকেই। খুব অল্প বয়স থেকেই মো. শেখ সাদী দূরদর্শী, নির্ভীক হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ঢাকা কলেজ থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নেন এমবিএ ডিগ্রি। লেখাপড়া শেষে চাকুরি নয়, চেয়েছেন উদ্যোক্তা হতে। আবাসন খাতের নানা অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনার প্রতি লক্ষ্য রেখেই ২০০৭ সালের ১৯ জানুয়ারি তিনি শুরু করেন এশিউর গ্রুপের প্রথম প্রতিষ্ঠান এশিউর প্রোপার্টিজ লিমিটেড। এই ব্যবসায় ক্রেতা ও জমির মালিক উভয় পক্ষের চরম ভোগান্তির বিষয়ে সচেতন ছিলেন শেখ সাদী। তাই উভয় পক্ষকে সন্তুষ্ট রেখে ব্যবসা করার দৃঢ় চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন তিনি। ব্যবসায়িক জীবনে অক্লান্ত পরিশ্রম, নিষ্ঠা, সততা ও দূরদর্শিতাই ছিল তার শক্তি। প্রতিষ্ঠানের সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, সুন্দর কর্মময় পরিবেশ সৃষ্টি, ক্রেতা ও জমির মালিকের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিপত্রের শর্ত অনুযায়ী যথাসময়ে সকল কার্য সম্পাদন এসব বিষয়ে ছিলেন শুরু থেকেই সতর্ক দৃষ্টি রেখেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সবার সন্তুষ্টি প্রয়োজন। কারণ তাদের সন্তুষ্ট না রাখলে ক্রেতার সন্তুষ্টির ব্যাপারে তারা আন্তরিক হবে না। আর ক্রেতাকে সন্তুষ্ট করতে না পারলে সব চেষ্টাই বৃথা। আর তাই অফিসের কর্মীদের জন্য নিয়মিত কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়। নিজেই সবার সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন। ফলে মালিক-কর্মচারী ভেদাভেদ ভুলে সবার মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। উন্নত হয় কাজের পরিবেশ। গ্রাহকসেবার ক্ষেত্রেও এশিওর প্রোপার্টিজ লিমিটেডের সব কর্মী অত্যন্ত যত্নবান। বর্তমানে এশিউর গ্র“পের তিনটি ডেভেলপার কোম্পানির অধীনে ১২৫টি আবাসিক ও সাতটি বাণিজ্যিক প্রকল্প বিভিন্ন মেয়াদে সহস্রাধিক গ্রাহককে হস্তান্তরের জন্য চলমান রয়েছে।
ইতিমধ্যে ‘আইএসও ৯০০১ : ২০১৫ কিউএমএস সার্টিফিকেট’ অর্জনের মাধ্যমে এশিওর গ্রুপ সুপরিচিত ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় প্রায় ২০০বিঘা জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে হয়েছে ‘এশিওর এগ্রো কমপ্লেক্স’।
ব্যক্তিগত জীবনে স্ত্রী এবং দু’সন্তান নিয়ে সুখী পরিবার মো. শেখ সাদীর। নানা জনউন্নয়নমূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন নিয়মিত।
সাক্ষাৎকার : ফারিয়া মৌ

কারিকা ডেক্স


ইসমাইল ফারুক চৌধুরী (মে. জে. অব.)
নির্বাহী পরিচালক
মিরপুর সিরামিক ওয়ার্কস লিমিটেড ও খাদিম সিরামিক লিমিটেড

স্বাধীনতার পূর্বে কলকারখানা, রাস্তাঘাট, অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এসব দিক দিয়ে এ অঞ্চল ছিল অনেক পিছিয়ে। সেই সময়, পঞ্চাশ দশকের শেষের দিকে বিখ্যাত ব্যবসায়ী তাবানী পরিবারের পক্ষে দুই সহোদর আরিফ ওয়ালী মোহাম্মদ তাবানী ও রশীদ ওয়ালী মোহাম্মদ তাবানী জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের তৈরি মেশিনের সমন্বয়ে বেসরকারিভাবে গড়ে তোলেন মিরপুর সিরামিক ওয়ার্কস লি.। যা এখনো পরিবেশবান্ধব সিরামিক, ইট, ব্লক, ক্লিংকার, পেভার এবং সাধারণ ফ্লোর ও রুফ টাইলস উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে। এছাড়াও উলে­খযোগ্য পণ্যের মধ্যে রয়েছে ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিকস, আর্কিটেকচারাল ওয়াল টাইলস, ফেন্সি স্ক্রিন, পেভার্স টাইলস, রুফ টাইলস ইত্যাদি।

আমরা মনে করি বাজারে টিকতে হলে পণ্যের গুনগত মান, দৃষ্টিনন্দন ডিজাইন এবং ক্রেতাসন্তুটি অর্জন অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহকের চাহিদা পুরণে গবেষণা চালিয়ে নতুন নতুন উদ্ভাবনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিকমানের টাইলস বাজারে নিয়ে আসা প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যেই এগিয়ে চলেছে মিরপুর সিরামিকস।
মিরপুর সিরামিক ওয়ার্কস লিমিটেড রপ্তানি ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য ‘জাতীয় রপ্তানি ট্রফি ১৯৯৬-৯৭’ অর্জন করেছে। দেশে উলে­খযোগ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও আমরা অবদান রেখে চলেছি।
আমাদের ব্রিকস দিয়ে তৈরি হয়েছে বাঙালির বীরত্বগাঁথা স্বাধীনতার প্রতীক শহীদ মিনার, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, জাতীয় সংসদ ভবন ইত্যাদি উলে­খযোগ্য স্থাপনা।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও মিরপুর সিরামিকস ও খাদিম সিরামিকের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারণ এটি ব্যবহারে বারবার রঙ ও প্লাস্টারের বাড়তি খরচ বেঁচে যায়। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদান থেকে তৈরি, তাই একবার ব্যবহার করেই আজীবন প্রকৃত বৈশিষ্ট্য বজায় থাকে।

গ্রাহকের সুবিধার জন্য দেশজুড়ে পণ্য সরবরাহ করতে ডিলার ও নিজস্ব শো-রুমের মাধ্যমে বিক্রয় ও বিতরণ করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেয়া হয়। ফলে দেশের অধিকাংশ গ্রাহকের চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে। এ ছাড়াও বিশেষ করে বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশসমূহে এর চাহিদা ব্যাপক। এক্ষেত্রে সরকারের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি আরো বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশে একমাত্র মিরপুর সিরামিকস দীর্ঘদিন ধরে তৈরি করে আসছে সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব ও অত্যাধুনিক মৈশিনে তৈরি সিরামিক ব্রিকস। আর্কিটেক্ট ও ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদার কারণে এবং সিরামিক শিল্পে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে সিরামিক ব্রিকসের পাশাপাশি আগামী প্রজন্মের সিরামিক টাইলস, যেমন বিভিন্ন ডিজাইনের ওয়াল ও ফ্লোর টাইলস তৈরির পরিকল্পনা আমাদের আছে। এছাড়াও মিরপুর সিরামিকের সহযোগী-প্রতিষ্ঠান খাদিম সিরামিকস দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিকমানের সিরামিক-সামগ্রী তৈরি করছে। সম্প্রপ্তি খাদিম সিরামিক বাজারে নিয়ে এসেছে বিশ্বখ্যাত স্প্যানিশ টাইল্স Diseno ও Europa সিরিজ, যা ঘরের ভিতরে এবং বাইরে ব্যবহার-উপযোগী। এছাড়াও খাদিম সিরামিক তৈরি করছে টাইলস্ ফিটিংয়ে চিরদিনের বন্ধন খাদিম’স টাইল অ্যাডহেসিভ।

কারিকা ডেক্স


এম এম জসিম উদ্দিন
হেড অব অপারেশন, বসুন্ধরা এলপি গ্যাস

বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় একটি শিল্পগ্রুপ বসুন্ধরা। এলপি গ্যাসখাতে আপনাদের বিনিয়োগের পেছনে কী চিন্তা কাজ করেছে?
শুধু এলপি গ্যাস নয়, বাংলাদেশে শিল্পায়নের বহু খাতই আমরা প্রথম শুরু করেছি। বাংলাদেশের সিমেন্ট, কাগজসহ অন্য অনেক শিল্প আগে আমদানি-নির্ভর ছিল। এই আমদানি-নির্ভরতা কাটাতে আমরা এসব শিল্প স্থাপন করি।
এলপি গ্যাসখাতে বাংলাদেশের প্রথম ও সর্ববৃহৎ বেসরকারি বিনিয়োগ বসুন্ধরা এলপি গ্যাস। এর পেছনে কাজ করেছে বসুন্ধরা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান সাহেবের দূরদৃষ্টি। আমরা শুরু করি ১৯৯৯ সালে। বিপিসির পরে আমরাই প্রথম বেসরকারি খাত যারা এলপি গ্যাসে বিনিয়োগ করে। চলতি বছরের শেষে আমরা এখন দ্বিতীয় প্ল্যান্ট শুরু করতে যাচ্ছি। এ প্ল্যান্ট উদ্বোধনের ফলে আমাদের উৎপাদন-ক্ষমতা এখনকার চেয়ে দ্বিগুণে রূপ নেবে।

বর্তমানে বাংলাদেশে এলপি গ্যাসের বাজার কী রকম?
আমাদের এ-খাতে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি আছে ৪০ শতাংশ। আগে উপশহর এলাকায় এলপি গ্যাসের প্রচলন বেশি ছিল। বসুন্ধরাই সর্বপ্রথম ছোট ছোট দোকানে এলপি গ্যাসের প্রচলন শুরু করে। আমরা তাদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছি যে এটি রান্নার অন্যতম অনুসঙ্গ। আমরা তাদের উপযোগী করে সিলিন্ডারে এলপি গ্যাস বিক্রি শুরু করি।
শুধু ব্যবসার জন্য আমরা এ খাতে এগিয়ে আসিনি। আমাদের একটি সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা রয়েছে। কারণ একটি দেশের পরিবেশের স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় রাখার জন্য ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশে আছে মাত্র ৬ শতাংশ। যে কারণে আমাদের গাছ কেটে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ নেই। সরকারও এ-বিষয়ে এখন মনোযোগী হয়েছে।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে, বর্তমানে এলপি গ্যাসের দাম অনেক কমে এসেছে। যদি কেউ লাকড়ি কিনে ব্যবহার করে তাহলে এলপি গ্যাসের চেয়ে বেশি খরচ পড়বে। তাই দিনে দিনে এ-খাতের বাজার বিস্তৃত হচ্ছে। প্রয়োজন বাড়ছে বলেই মানুষ এ গ্যাসের ওপর ঝুঁকে পড়ছে। আগামীতে এ-খাতের বাজার আরো বাড়বে বলে আমি বিশ্বাস করি।

বর্তমানে আবাসিক খাতে গ্যাস-সংযোগ বন্ধ করার ঘোষণা এসেছে। এটি এলপি গ্যাস খাতের ওপর কিভাবে প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন?
আবাসিক খাতে এলপি গ্যাস ব্যবহারের কিছু সুবিধা আছে। আবার অসুবিধাও আছে। কারণ বহুতল ভবনে গ্যাস-সংযোগ দিতে গেলে উঁচু জায়গায় গ্যাস নেয়া একটি চ্যালেঞ্জ। আমরাই সর্বপ্রথম এলপি গ্যাসের ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্ল্যান্ট করেছি। ইতিমধ্যে আমরা রাজউকের প্রকল্প ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনির কয়েকটি প্রকল্পে এ-ধরনের কাজে হাত দিয়েছি। আমরা সিলিন্ডার-ব্যাংক স্থাপন করেছি। এই ব্যাংক থেকে গ্যাস ঘরে ঘরে পৌঁছে যাবে। গ্যাস রিচার্জ করলেই হবে। এর জন্য আমরা ছোট ছোট পাঁচ টনের সিলিন্ডারবাহী ট্যাংকার কিনেছি। আবাসনখাতে এলপি গ্যাস ব্যবহার আমাদের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে বলে আমি মনে করি। এক্ষেত্রে সরকার আমাদের ব্যাপক সহযোগিতা করছে।

এলপি গ্যাসের দাম বেশি এমন একটি অভিযোগ শোনা যায়…
একসময় অন্য জ্বালানির চেয়ে এলপি গ্যাসের দাম বেশি ছিল। বর্তমানে বারো কেজির প্রতি সিলিন্ডার মাত্র ১,০০০ থেকে ১,১০০ টাকায় পাওয়া যায়। আগের চেয়ে সিলিন্ডার-প্রতি প্রায় ৫০০ টাকা কমে গেছে। এখন এটি অনেক সাশ্রয়ী ও ভোক্তাবান্ধব হয়েছে।

এলপি গ্যাসের নিরাপত্তা বিষয়টিও উল্লেখ করতে হয়। এটি বিস্ফোরণের ভয় আছে...
নিরাপত্তার বিষয়টি ভোক্তার ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে। সিলিন্ডারটি যথাযথভাবে সিল করা হয়েছে কিনা সেটি ভালো করে দেখতে হবে। বসুন্ধরার ওপর ভোক্তাদের আস্থা আছে। দেশে সিলিন্ডার টেস্ট করার একমাত্র প্রতিষ্ঠানটি আমাদের। এটি অন্য কোম্পানিও ব্যবহার করে। আমাদের এ কারখানাটি মংলায় অবস্থিত। আমাদের ভোক্তা-গৃহিনিদের প্রতি আমার অনুরোধ, ভালো কোম্পানির সিলিন্ডার ব্যবহার করুন। সিলিন্ডারের সিল-ক্যাপটি যথাযথভাবে আছে কিনা সেটি পরীক্ষা করে দেখবেন। আমরা এক্ষেত্রে হলোগ্রামিক স্টিকার ব্যবহার করি।

এলপি গ্যাস নিয়ে আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
ভবিষ্যতে বেশি পরিমাণ উৎপাদনে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে। এছাড়া আমরা এলপি গ্যাসের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে চাই। বেশি পরিমাণ উৎপাদন করা গেলে দামও কমে আসবে।

বাজেটে সরকারের কাছে কোনো প্রস্তাব রাখছেন আপনারা?
এ খাতের জন্য আমাদের কিছু কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। এসব বিষয়ে শুল্ক কমানোর প্রস্তাব দিয়েছি আমরা। আমরা জানি সরকার এ-খাতের প্রতি মনোযোগী। তাই এলপি গ্যাসকে জনগণের আরো কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য সরকার উদ্যোগী হবে বলে মনে করছি।

সাক্ষাৎকার গ্রহনঃ ফারুক আহমেদ


প্রশ্ন : বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প। আমরা কি এটা তৈরি করতে সক্ষম? রোসাটমের পক্ষ থেকে এ ক্ষেত্রে কী ধরনের সহযোগিতা পাওয়া যাবে?
উত্তর : বাংলাদেশের এরই মধ্যে পারমাণবিক কেন্দ্রে কাজ করার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ, পেশাদার ব্যক্তি রয়েছেন। যদিও আইএইএ বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ সেই দেশগুলোর কাতারে পড়ে, যারা সবে নিজেদের পারমাণবিক বিদ্যুৎশিল্প গড়ে তুলতে শুরু করেছে। এ কারণেই রাশিয়া ও বাংলাদেশের যৌথ লক্ষ্য হলো বিশেষজ্ঞদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে উন্নয়নের উচ্চাকাঙ্খা  রয়েছে বাংলাদেশের এবং এ জন্য দেশটির দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন রয়েছে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র (এনপিপি) নির্মাণে, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সৃষ্টি এবং ব্যয়িত জ্বালানি, তেজস্ক্রিয় বর্জ্যরে ইস্যুগুলোর সমাধান এবং এনপিপির কার্যক্রম স্থগিতসহ দক্ষ কর্মীদের প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অর্জনের ক্ষেত্রে রোসাটম এনপিপি নির্মাণে অভিজ্ঞতা, বিশেষজ্ঞ মতামত ও সার্বিক বিষয়টির যে কোনো ইস্যুতে সমাধানের ব্যাপারে পরামর্শ ও সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।
কার্যত প্রশিক্ষণের বিষয়টি এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। আমরা ইতোমধ্যে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কয়েক বছরের প্রশিক্ষণের জন্য রোসাটমের কোটায় রাশিয়ায় প্রশিক্ষণের আমন্ত্রণ জানিয়েছি। এর আওতায় প্রথম ব্যাচ আগামী বছরই তাদের গ্রাজুয়েশন শেষ করবে।
শিক্ষার্থীদের ন্যাশনাল রিসার্চ নিউক্লিয়ার ইউনিভার্সিটি এমইপিএইচআই ও এর শাখাগুলোয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। প্রথমে তারা রাশিয়ান ভাষায় একটি প্রস্তুতিমূলক কোর্স সম্পন্ন করে এবং তারপর ‘পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র : নকশার কাজ, কার্যকলাপ ও প্রকৌশল’-এ বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ব্রিটিশ কোম্পানি কিউএস-এর করা তালিকায় ২০১৬ সালের জুন মাসে প্রথমবারের মতো ব্রিকস জোটের দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে শীর্ষ ৫০টির মধ্যে উঠে এসেছে এমইপিএইচআই-এর নাম। বর্তমানে ৩০টি দেশের ৯ শতাধিক শিক্ষার্থী এমইপিএইচআই-এ পড়ালেখা করছে।
পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের নকশা ও নির্মাণের পাশাপাশি রোসাটম সমন্বিত কিছু সুযোগও দিচ্ছে, যার মধ্যে পারমাণবিক অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং আইএইএ’র নির্দেশনা অনুযায়ী পরমাণু নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রতিষ্ঠা, স্থানীয় ব্যবসার সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন, জ্বালানি সরবরাহ, পারমাণবিক কেন্দ্রের কার্যক্রম ও রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যয়িত জ্বালানি ব্যবস্থাপনা এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর কর্মসূচি অন্যতম।

প্রশ্ন : নির্মাণে সহায়তা দেবে কে?
উত্তর : রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি হচ্ছে ২০১১ সালের ২ নভেম্বর স্বাক্ষরিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে আন্তঃসরকার সহযোগিতা চুক্তির আওতায়। প্রকল্পটি এএসই গ্রুপ বাস্তবায়ন করছে, যা রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রোসাটমের অধীনস্থ একটি প্রতিষ্ঠান। ২০১৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর এএসই গ্রুপ ভিভিইআর-১২০০ চুল্লিসহ দুই ইউনিটের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্ত্র নির্মাণে সাধারণ চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি রাজধানী ঢাকা থেকে ১৬০ কিলোমিটার দূরে পদ্মা নদীর পূর্ব তীরে তৈরি হচ্ছে।
বিশ্বের পারমাণবিক প্রকৌশল ব্যবসায় এএসই একটি নেতৃস্থানীয় কোম্পানি, বৈশ্বিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ বাজারের ৩০ শতাংশেরও বেশি যার দখলে। বিশ্বের ১৫টি দেশে এর প্রতিনিধি ও সক্রিয় কার্যালয় কার্যক্রমে রয়েছে; বিদেশে প্রকল্পগুলোর ৮০ শতাংশেরও বেশি কোম্পানির অধীনে বাস্তবায়িত হয়েছে।
তার ওপর এএসই তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করে এবং যেকোনো প্রকার জটিল প্রকৌশলগত স্থাপনায় পুরোমাত্রায় ইপিসি, ইপিসি (এম) ও পিএমসি সেবা দিয়ে থাকে। জটিল প্রকৌশলগত স্থাপনা মাল্টি-ডি নির্মাণ প্রকল্পে প্রশাসনের জন্য উদ্ভাবনী ব্যবস্থা তৈরি ও উৎসাহ দিয়ে থাকে এএসই, যাতে করে বাজেট, সময়সীমা ও মানের মতো বিষয়গুলো ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকর প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করা যায়।

প্রশ্ন : কী নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করা হবে?
উত্তর : আমরা মনে করি, বাংলাদেশের সরবরাহকারীদের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরাসরি সংশ্লিষ্ট থাকা উচিত; এতে শুধু ব্যত্যয় ঘটবে উপকরণের ক্ষেত্রে, যার মান হতে হবে রাশিয়ার মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং আইএইএ’র নির্দেশনা অনুযায়ী। উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে সামগ্রী সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হবে।
এ ব্যাপারে এএসই গ্রুপ ও বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি) প্রাক-দরপত্র কনফারেন্সের আয়োজন করা হয়েছে। বাংলাদেশি পণ্য উৎপাদনকারী ও সরবরাহকারীদের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সংশ্লিষ্ট করার লক্ষ্যে এর আয়োজন করা হয়। এই কনফারেন্সের আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে রাশিয়ার পক্ষ থেকে পণ্যের গুণগত মান ও চাহিদাসহ দরপত্র জমাদানকারী ও শর্তাবলি অন্যতম ছিল। মূল নির্মাণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন আগামী সেপ্টেম্বর নাগাদ শুরু হবে।
এই পর্যায়ে এসে নির্মাণ কার্যক্রমে পণ্য সরবরাহকারী ও উপকরণ নির্বাচনসহ বালু, সিমেন্ট, ইস্পাত, নিম্নচাপের পাইপলাইন ও গোলাকৃতির ধাতব পণ্য নির্বাচন প্রয়োজন।

প্রশ্ন : মান নিয়ন্ত্রণ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?
উত্তর : বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রতিটা দশাই আইএইএ ও জাতীয় নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিএইআরএ-এর মাধ্যমে যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। ২০১৬ সালের ২১ জুন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ (বিএইআরএ) রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণস্থলে প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম শুরুর জন্য বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনকে (বিএইসি) লাইসেন্স ইস্যু করে। নির্মাণ এলাকায় ৬৩টি পর্যবেক্ষণ, যার মধ্যে মাটি, বায়ু ও ভূকম্পন-সংক্রান্ত পর্যালোচনাসহ পরিবেশের ওপর এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রভাব বিচার করেই ওই লাইসেন্স ইস্যু করা হয়। একই সময়ে বিএইআরএ বাছাইকৃত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্পেরও অনুমোদন দেয়।

প্রশ্ন : বাংলাদেশে পারমাণবিক চুল্লি ও অন্যান্য উপকরণ সরবরাহের পদ্ধতি কী হবে?
উত্তর : ভারী এবং/অথবা বড় আয়তনের উপকরণের প্রতিটা সরবরাহই একটা করে বিশেষ কারিগরি কার্যক্রম। এএসই বিশেষজ্ঞরা এই সরবরাহের বিভিন্ন উপায় নিয়ে বিচার-বিবেচনা করেছেন। নদীপথে উপকরণ সরবরাহকেই আমরা সবচেয়ে অনুকূল বলে বিবেচনা করেছি। সেন্ট পিটার্সবার্গে মহাসাগরগামী জাহাজে চুল্লি তোলা হবে, যা মোংলা বন্দরে খালাস করা হবে। সেখান থেকে নদীপথে নৌকায় করে নির্মাণস্থলে নিয়ে যাওয়া হবে। পণ্য খালাসের জন্য রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণস্থলে একটি বিশেষ জেটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

প্রশ্ন : নতুন এই প্রযুক্তিতে কীভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে?
উত্তর : রাশিয়ার পরিকল্পনায় নির্মিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় হালকা পানির ভিভিইআর-টাইপ চুল্লি, নিম্নচাপে সাধারণ পানির চুল্লি ব্যবহার হয়ে থাকে। ফিনল্যান্ড, বেলারুশ এবং অন্য দেশগুলোয় ভিভিইআর-টাইপ চুল্লির পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়নের বিভিন্ন দশায় রয়েছে। এ ধরনের চুল্লিতে নিউট্রন উৎপাদক এবং চুল্লি ঠান্ডা করা উভয় কাজেই পানির ব্যবহার হয়।
বিশ্বজুড়ে ভিভিইআর-টাইপ চুল্লি সবচেয়ে নিরাপদ বলে বিবেচিত এবং রাশিয়ার পারমাণবিক শিল্পের উন্নয়ন কর্মসূচির ভিত্তিতে তৈরি করা হয়। পঞ্চাশ বছরের কার্যক্রমে ভিভিইআর-টাইপ চুল্লির (ভিভিইআর-৪৪০, ভিভিইআর-১০০০) পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য এবং আন্তর্জাতিক বিদ্যুতের বাজারে প্রতিযোগিতামূলক বলে প্রমাণিত হয়েছে, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র শিল্পে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করেছে এবং এর ক্রমাগত উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উপস্থাপন করেছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের শক্তি উৎপাদন ইউনিটটি হবে ভিভিইআর-১২০০ চুল্লি ভিত্তিক, যা তৃতীয় (থ্রি-প্লাস) প্রজন্মের প্রযুক্তি। নতুন প্রযুক্তির এই ইউনিটগুলোয় কারিগরি ও আর্থিক সূচকগুলোর উন্নতি সাধিত হয়েছে, যাতে করে পুরোপুরি নিরাপদ কার্যক্রম এবং ফুকুশিমা পরবর্তী আইএইএ-এর মান পুরোপুরি নিশ্চিত হয়েছে। ভিভিইআর-১২০০ রাশিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী চুল্লি এবং এর তিনটি বিশেষ সুবিধা রয়েছে : উচ্চ কার্যকারিতা, টেকসই এবং নিরাপদ। ভিভিইআর-১২০০-এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যা টর্নেডো, হারিকেন, ভূমিকম্প, বিমান দুর্ঘটনাসহ বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ আঘাতে সর্বোচ্চ বাধার সৃষ্টি করে।
পরোক্ষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তি সরবরাহ পুরোপুরি বিঘ্নিত হলেও কাজ করতে সক্ষম, কার্যকর ব্যবস্থা অথবা অপারেটরের হস্তক্ষেপ ছাড়াই এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুরো নিরাপত্তা দিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যদি অন্য সব শক্তি সরবরাহের উৎস বিকল হয়ে পড়ে, তাহলে পরোক্ষ তাপ অপসারণ ব্যবস্থা (পিএইচআরএস) চুল্লির কেন্দ্র থেকে দীর্ঘমেয়াদে তাপ অপসারণ নিশ্চিত করে। দুর্ঘটনার সময় মূল দ্রবীভূতকারী ডিভাইস (সিএমএলডি) বা ‘কোর ক্যাচার’ কেন্দ্রের গলিত উপকরণগুলোকে থান্ডা করবে। এই ডিভাইস প্রতিরক্ষামূলক শেলের অখন্ডতা নিশ্চিত করে এবং এতে করে ব্যাপক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেও পরিবেশে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ছড়িয়ে পড়া রহিত হয়।

প্রশ্ন : পরিবেশের ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে?
উত্তর : দিনে দিনে কার্বন ডাই-অক্সাইডের নিঃসরণ বাড়ছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন শিল্প এর অন্যতম উৎস। তারপরও আমাদের ভবিষ্যতের ওপর বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সঠিক পছন্দের সরাসরি প্রভাব থাকবে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার তথ্য অনুসারে, বর্তমানে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে ৩৮ শতাংশ ‘সবুজ’ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে এবং এই প্রেক্ষাপটে মানবজাতির ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার হিসাব মতে, ৪৫ বছরের কার্যক্রমে বিশ্বের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ৫৬ গিগাটন কার্বন ডাই-অক্সাইডের নিঃসরণ এড়াতে পেরেছে। বর্তমান হারের বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই পরিমাণ বিশ্বজুড়ে দুই বছরের নিঃসরণের সমপরিমাণ। রাশিয়া ও বিদেশে নির্মিত রাশিয়ার নকশা করা সব পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এই হিসাবে অন্তুর্ভুক্ত করে দেখা গেছে, ২০৩০ সাল নাগাদ বার্ষিক কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের পরিমাণ ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন টন প্রতিরোধ সম্ভব, যা বিশ্বের গাড়ি খাতের বার্ষিক নিঃসরণের ৮০ শতাংশ। রূপকার্থে বলতে গেলে, আমাদের বিশুদ্ধ বায়ু সেবনের সুযোগ করে দিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ‘পৃথিবীর ফুসফুসে’ পরিণত হতে পারে।