Home মূল কাগজ নগরোদ্যান

মির্জা মাহমুদ আহমেদ
পুরনো ঢাকার কথা মনে হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ঘিঞ্জি গলিপথ আর গায়ের ওপর গা লাগানো দালানকোঠায় ঠাসা রুদ্ধ এক জনপথের কথা ।
চিরচেনা এই দৃশ্যের বাইরে চতুভুর্জ আকৃতির একখন্ড সবুজ মাঠ খানিকটা অবাক-ই করে দেয়। মাঠ জুড়ে সবুজের সমারোহ চোখে দেয় স্বস্তি, মনে প্রশান্তি।
অথচ বছর দুয়েক আগেও দৃশ্যপটটা ঠিক এমন ছিলো না। ঢাকার অন্যসব পার্কের মতো লালবাগের এই মাঠটিতে উৎকট গন্ধের সাথে ছিলো ময়লা আবর্জনার স্তুপ। সামনের সড়কে ছিলো পিকআপ ভ্যান, রিক্সা, লেগুনার অবৈধ পার্কিং, বস্তি আর টং দোকানের সারি। সংস্কারে পুরোপুরি বদলে গিয়ে নতুন অবয়ব পেয়েছে পুরনো ঢাকার ঢাকেশ্বরী সড়কের শহীদ আব্দুল আলীম খেলার মাঠ। মাঠটিতে বালুর বদলে এখন দোল খাচ্ছে দৃষ্টিনন্দন সবুজ ঘাস। মাঠের চারপাশে লাগানো হয়েছে আমড়া, কামরাঙা, লটকনসহ দেশীয় ফল ফুলের নানা জাতের গাছ। সেখানে প্রজাপতি,ফড়িং, পাখিদের সাথে নিরন্তন খেলায় মেতে উঠছে শিশুরা।
সম্প্রতি মাঠটি ঘুরে দেখা গেছে, খেলার মাঠের মূল কাজ শেষ হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে হাঁটার পথ। এর নিচে আছে পানি নিষ্কাশনের সংযোগ ও ভূগর্ভস্থ পানি সংরক্ষনের ব্যবস্থা। মাটির নিচে ভূগর্ভস্থ পরিখায় সংরক্ষিত হবে পাঁচ লক্ষ লিটার বৃষ্টির পানি। ভূগর্ভে সংরক্ষিত এই পানি মাঠে ব্যবহার করা হবে। বাড়তি পানি পরিশোধন করে কফিশপ, পাবলিক টয়লেট, ব্যায়ামাগার এবং পাশ্ববর্তী মসজিদের চাহিদা পূরণ করা হবে। জরুরি প্রয়োজনে অগ্নিনির্বাপনের কাজেও ব্যবহার করা যাবে এই পানি। মাঠের উত্তর-পূর্ব দিকে করা হয়েছে একটি দোতলা ভবন। এর নিচতলায় করা হয়েছে ব্যায়ামাগার ও পাবলিক টয়লেট। দোতলায় একটি কফি শপ করা হয়েছে। কফিশপের সাথেই থাকছে পাঠাগার ও বই বিক্রয় কেন্দ্র। মাঠের উত্তরপাশে ক্রিকেট অনুশীলন করার জন্য পিচ আকৃতির একফালি জায়গা রাখা হয়েছে। পূর্ব দিকে রাখা হয়েছে শিশু কর্নার। সেখানে শিশুদের বিনোদনের ব্যবস্থা থাকবে। মাঠের চারপাশে লাগানো হয়েছে এলইডি বাতি। উদ্ধোধনের আগেই মাঠের চারপাশের অংশে বিভিন্ন বয়সী মানুষজন হাঁটাচলা করছেন। অনেকে বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন।
চকবাজার নিউমার্কেট রুটে চলাচলকারী লেগুনার লাইনম্যান হাবিব বৈশাখের তপ্ত রোদে গাছের ছায়ায় বসে খানিকটা জিরিয়ে নিচ্ছিলেন। কথায় কথায় জানালেন মাঠের আগের অবস্থার কথা। বললেন আগে মাঠে খেলা তো দূরে থাক, মাঠের পাশ দিয়ে হাঁটার পরিস্থিতি ছিল না। সন্ধ্যার পর এখানে মাদকসেবীরা অসামাজিক কার্যকলাপ চালাতো। মাঠ সংস্কারের পর আশপাশের পরিবেশ উন্নত হয়েছে।
মা রোকেয়া ইসলামের হাত ধরে ঘুরতে এসেছে ছোট্ট মিহিরিমা। লালবাগের স্থানীয় বাসিন্দা রোকেয়া জানালেন প্রায়ই মেয়েকে নিয়ে এখানে ঘুরতে আসেন তিনি। আগে মাঠের চারপাশে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং বখাটেদের উৎপাতের কারনে এদিকে আসতেন না। এছাড়া বছরের বেশিরভাগ সময়ই মাঠ দখল করে চলতো মেলা। সংস্কার কাজের পর মাঠের চারপাশের পরিবেশ উন্নত হয়েছে। আশেপাশের মানুষের আচরণেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে বলে জানান তিনি।
সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে সংস্কারের পর এই মাঠে যাতে মেলাসহ অনান্য কর্মকান্ড চলতে না পারে সেজন্য আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। স্থানীয়দের অনুরোধে মাঠটিতে শুধু ঈদের নামাজ পড়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
শহীদ আব্দুল আলীম খেলার মাঠের সংস্কার কাজ করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অঞ্চল-৩ (আজিমপুর)। জল সবুজে ঢাকা প্রকল্পের আওতায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে আওতাধীন এরকম আরও ১৯টি পার্ক এবং ১২টি খেলার মাঠের উন্নয়ন কাজ চলছে। আশা করা হচ্ছে এ বছরের শেষ নাগাদ পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।
‘জল সবুজের ঢাকা’ প্রকল্পের প্রধান স্থপতি রফিক আজম কারিকাকে বলেন আগে যেমন মনে করা হতো দেয়াল দিয়ে মাঠটিকে সুরক্ষিত করা যাবে এটা আসলে ভুল ধারণা। দেয়ালের কারনে মনোজাগতিক বাধা তৈরি হয়। দেয়াল থাকার ফলে নিদিষ্ট সময়ের পর এলাকাবাসী যখন মাঠটি আর ব্যবহার করতে পারতেন না। তখন সন্ধ্য্যার পর দেয়াল টপকে সেখানে দুষ্টুলোকেরা ঢুকতো। দেয়ালের আবডাল থাকায় দুস্কৃতিকারীদের জন্য মাঠটি দখল এবং অপকর্ম করা সহজ হতো। তাই আবদুল আলীম মাঠসহ জল সবুজের ঢাকা প্রকল্পের সব মাঠ ও পার্কের স্থাপত্য নকশা করার সময় দেয়াল উঠিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেই। দেয়াল তুলে দেয়ার ইতিবাচক দিকটি বোঝাতে সিটি কর্পোরেশনসহ সব মহলের কাছে আমার অনেক ঘাম ঝরাতে হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত আমি তাঁদের বোঝাতে পেরেছি। দেয়াল না থাকার ফলে স্থানীয়রা মাঠটি নিজেদের বলে ভাবছে, যখন ইচ্ছে তখন ব্যবহার করতে পারছে। মাঠে আগত দর্শনার্থীদের চোখ এক্ষেত্রে নিরাপত্তা রক্ষায় কাজ করবে। সেই সঙ্গে আছে সিসি ক্যামেরার নজরদারি।
খেলাধূলার বাইরে মাঠের বহুবিধ ব্যবহার প্রসঙ্গে রফিক আজম বলেন, আগে মাঠটিতে শুধু ফুটবল খেলা হতো। কিন্তু নতুন করে সংস্কার করার পর মাঠটিতে ফুটবল খেলার পাশাপাশি ক্রিকেট খেলার ব্যবস্থা থাকবে। শিশুদের খেলার জায়গা থাকবে, বড়দের হাঁটার জায়গা থাকবে, যারা স্বাস্থ্য সচেতন তাঁদের জন্য ব্যায়াম করার ব্যবস্থা থাকবে। পড়–য়াদের জন্য মাঠ সংলগ্ন ভবনের ওপরতলায় বই পড়ার ব্যবস্থা থাকবে। কফির কাপে চুমুক দিয়ে গল্প করা যাবে। ওয়াইফাই ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় কাজ সারা যাবে।
অতীতে এমন অনেক ভালো উদ্যোগ শুধুমাত্র রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে নষ্ট হয়ে গেছে এই মাঠটি সংরক্ষণে কি ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হবে এমন প্রশ্নের জবাবে রফিক আজম বলেন, মাঠটি দেখাশোনার জন্য স্থানীয় জনগনের অংশগ্রহনে একটি কমিটি করে দেয়া হবে। মাঠ সংলগ্ন বাড়িতে বসবাসরত নারী, পুরুষ, কিশোর, কিশোরী, খেলোয়াড়, মসজিদের ইমাম, জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় বরেণ্য ব্যাক্তি সেই কমিটির সদস্য হবেন।
মাঠটি রক্ষাবেক্ষনের জন্য মালি, পরিছন্নতা কর্মী, লাইব্রেরিয়ান, কফি শপের দোকানীও স্থানীয় পর্যায় থেকে নিয়োগ দেয়া হবে।
পরিকল্পিত নগর স্থাপত্য শিশু মনোজগতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে উলে­খ করে রফিক আজম বলেন, শহীদ আব্দুল আলীম খেলার মাঠটি শিশুদের জন্য একটি প্রাকৃতিক শিক্ষাদান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে। ছয় ঋতু সম্পর্কে জানতে তাকে আর বইয়ের কাছে যেতে হবে না। সে প্রকৃতি থেকেই ছয় ঋতু সম্পর্কে জানবে। গাছ চিনবে। ফুল চিনবে। গাছ থেকে ফল পেড়ে খাওয়ার যে অপরিসীম আনন্দ সেটা শিশুরা এখানে উপভোগ করতে পারবে। ঢাক গাছ থেকে যে ঢাকা নামের উৎপত্তি সেটা শিশুরা এই মাঠ থেকেই জানবে।
এখন থেকে পুরনো ঢাকার শিশু কিশোররা ড্রাগের পেছনে না ছুটে প্রজাপতির পেছনে ছুটবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যাক্ত করেন।
ছোট খাটো সংস্কার কাজ শেষ হলে এবং কফি শপ ব্যবস্থাপনায় মালয়েশিয়ান চেইন শপ সিক্রেট রেসিপির সঙ্গে চুক্তির বিষয়টি চূড়ান্ত হলে খুব শীঘ্রই দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেয়া হবে লালবাগের শহীদ আবদুল আলীম মাঠ। পুরনো ঢাকাবাসীর জন্য গর্বের বিষয় হবে এই মাঠটি। আর জল সবুজের ঢাকা প্রকল্পের পুরো কাজ শেষ হলে নগরবাসীর সামনে হাজির হবে নতুন এক সবুজাভ ঢাকা।

মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ

মির্জা মাহমুদ আহমেদ
চারদেয়ালে ঘেরা প্রতিষ্ঠানটির মূল ফটক পেরোতেই চোখ জুড়াবে সবুজ মাঠ। অপরিকল্পিত নগরায়ণের চাপে যখন নাগরিক প্রাণ রুদ্ধ, তখন এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির খোলা সবুজ প্রান্তর শিক্ষার্থীদের একটুখানি ছোটাছুটির ফুরসত এনে দেয়। মাঠ ধরে একটু এগোলেই মূল ভবনের সামনে ‘বিশ্বজয় ভাস্কর্য’। শিক্ষকের মুষ্টিবদ্ধ হাত যেন শিক্ষার্থীদের জানাচ্ছে বিশ্বজয়ের আহবান।
নিচতলায় শিশুদের ক্লাসরুম, করিডোর, বসার জায়গা সবই রঙিন। যেন রঙিন এক প্রজাপতি রাঙিয়ে দিয়ে গেছে পরম যত্নে। দ্বিতীয় তলা থেকে পঞ্চম তলার প্রতিটি করিডোর সাজানো হয়েছে বিষয়ভিত্তিক আয়োজন দিয়ে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস দিয়ে সাজানো ‘অপরাজেয় বাংলা’ গ্যালারিটি। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণসহ সেখানে ঠাঁই পেয়েছে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের সব উল্লেখযোগ্য ঘটনা। বাংলাদেশের গুণী কবি-সাহিত্যিকদের জীবনী ও আলোকচিত্র দিয়ে সাজানো ‘শিল্পাঙ্গন’ গ্যালারি। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে সাজানো হয়েছে ‘লোক ও কারুশিল্প কর্নার’। আর ‘সুরের ভুবন’ গ্যালারিটি সাজানো হয়েছে বাংলাদেশের প্রথিতযশা সংগীতশিল্পীদের জীবনী ও ছবি দিয়ে।
এ ছাড়াও বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও চলমান উন্নয়ন-কর্মকান্ডের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে ‘বিউটিফুল বাংলাদেশ’ ও ‘দুর্বার বাংলাদেশ’ গ্যালারিতে। মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ভ‚মিকা তুলে ধরা হয়েছে ‘সশস্ত্রবাহিনী’ নামক গ্যালারিটিতে। অন্যদিকে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য বিষয়ভিত্তিক মূল বিষয়গুলো সচিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে বিজনেস, স্পোর্টস ও লাইসিয়াম গ্যালারিতে।
পুরো প্রতিষ্ঠানের করিডোরগুলো ঘুরে দেখলে জাদুঘর ভেবে বসতে পারেন নতুন কেউ। যেখানে তুলে আনা হয়েছে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, গ্রামবাংলার অবারিত রূপসহ সশস্ত্র বাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। জাদুঘরের আদলে সাজানো ইতিহাস-ঐতিহ্যের এমন ছবি দেখে ও বর্ণনা পড়ে গতানুগতিক পাঠ্যবইয়ের বাইরেও শিক্ষার্থীরা শিখছে-জানছে নিজের মতো করে।
ভালো কাজের স্বীকৃতি আরও ভালো কাজ করার উৎসাহ জোগায়। সেই ধারণার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, সহশিক্ষা এবং শৃঙ্খলা ও নৈতিকতায় অসাধারণ পারদর্শিতার জন্য শ্রেণিশিক্ষকরা গ্রিনকার্ড দিয়ে উৎসাহিত করেন। প্রতি মাসে সর্বোচ্চ-সংখ্যক গ্রিনকার্ড পাওয়া শিক্ষার্থীরা আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে লাভ করে অধ্যক্ষের কাছ থেকে গোল্ডকার্ড।
স্কুল শাখার উপাধ্যক্ষ শায়েলা মনোয়ার কারিকাকে বলেন, ‘ভালো শিক্ষার্থী গড়ার পাশাপাশি ভালো মানুষও গড়তে চাই আমরা। তাই পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের পাশাপাশি যেসব শিক্ষার্থী শৃঙ্খলা ও নৈতিকতায় ভালো পারফরম্যান্স দেখায় তাদের গ্রিনকার্ড দেয়া হয়। এটি অর্জন করতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা গড়ে উঠেছে।’ ভালো ফলাফল ও আচরণে একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার মানসিকতাও তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি।
শায়েলা মনোয়ার জানান, পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতার কারণে স্কুলের শিক্ষার্থীরা প্রায়ই অশোভন উক্তি ও আচরণ করে থাকে। এগুলো প্রতিহত করতে প্রতিষ্ঠানটিতে ‘অ্যান্টি বুলিং স্কোয়াড’ গঠন করা হয়েছে। স্কোয়াডের নির্বাচিত প্রতিনিধি নিজেরা অশোভন উক্তি ও আচরণ করে না, অন্য সহপাঠীদেরও এ ধরনের আচরণ থেকে বিরত রাখে।
শিশু-কিশোরদের মনের আঙিনায় কত মধুর স্মৃতিই তো দোলা দিয়ে যায়, স্মরণীয় হয়ে থাকে নানা ঘটনা। অনেকের ভাবুক মনের বিকাশও হয় এ সময়েই। যথাযথ মূল্যায়ন বা পরিচর্চা না পেয়ে সেগুলো হারিয়েও যায় অনেক সময়। তাদের সেই ছোট ছোট ভাবনা ও স্মরণীয় ঘটনাগুলো ‘বন্দি’ করে রাখতে প্রতিষ্ঠানটিতে ‘আইডিয়া প্যাড’ নামে এক অভিনব ডায়েরি লেখার প্রচলন আছে। যেখানে শিক্ষার্থীরা নিজেদের স্মরণীয় মজার কোনো ঘটনা, ভাবনা, ভালোলাগা, মন্দলাগা ইত্যাদি লিখে রাখতে পারে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মানেই যেখানে চক-ব্ল্যাকবোর্ড আর টেবিল-বেঞ্চির কাঠখোট্টা জায়গা; শিক্ষকের চোখ রাঙানি আর কঠোর অনুশাসন সেখানে স্কুলে গ্যালারি, বিনোদন পার্ক, অ্যাম্পিথিয়েটার প্রতিষ্ঠা বা অ্যান্টি বুলিং স্কোয়াড ও আইডিয়া প্যাডের মতো অভিনব উদ্যোগের ভাবনা কার? জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির উপাধ্যক্ষ শায়েলা মনোয়ার জানান, অভিনব এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে কাজ করেছেন মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মেফতাউল করিম, অধ্যক্ষ লেফটেন্যান্ট কর্নেল সৈয়দ এ কে এম সাব্বির আহমেদ ও প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা-অধ্যক্ষ লেফটেন্যান্ট কর্নেল রিয়াজ আহমেদ।
যুগোপযোগী শিক্ষাদান পদ্ধতি, অত্যাধুনিক শিক্ষা উপকরণ, অভিজ্ঞ শিক্ষকমন্ডলী ও কঠোর শৃঙ্খলার কারণে প্রতিষ্ঠার অল্প সময়ের মধ্যেই অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে গেছে এ প্রতিষ্ঠানটি। বিগত বছরে অনুষ্ঠিত পিইসি, জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় শতভাগ পাসসহ এ প্রতিষ্ঠানের উল্লেখযোগ্য-সংখ্যক শিক্ষার্থী জিপিএ ফাইভ অর্জন করেছে। ২০১৭ সালের এইচএসসি পরীক্ষা এবং সহ-শিক্ষা কার্যক্রমে সাফল্যের ভিত্তিতে দেশের ৩১টি ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজের মধ্যে প্রথম রানার-আপ হয়ে সেনাবাহিনীপ্রধান ট্রফি অর্জন করার গৌরব অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতিষ্ঠানটির মূল ভবনের সামনে আড্ডা দেয়ার জন্য রয়েছে চমৎকার একটি জায়গা। জানা গেল, দেশের প্রথিতযশা সফল মানুষেরা মাঝে মাঝে এখানে এসে তাদের সফলতার গল্প শুনিয়ে যান। ‘স্বপ্নসিঁড়ি’ নামের এই আয়োজনে সম্প্রতি এখানে এসেছিলেন ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মর্তুজা।
জনবসতির তুলনায় মিরপুরে ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম বলে আক্ষেপ ছিল এখানকার বাসিন্দাদের। ২০১৪ সালে মিরপুর সেনানিবাসে ৩.৮৩ একর জমির ওপর মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেই আক্ষেপ অনেকটাই ঘুচেছে। বর্তমানে শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে ভালো মানুষ হওয়ার ব্রত নিচ্ছে চার হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী।

নগরে বাতিঘর

রুখসানা মিলি
একটা সময় পর্যন্ত কাদা দেখলেই আরিয়ানা লাফ দিয়ে দূরে সরে যেত। আর এখন কাদামাটি নিয়ে মনের আনন্দে খেলায় মেতে ওঠে সে। কাদা দিয়ে ছোট্ট হাঁড়ি, একটা পুতুল বা আরও নানান আকার দিতে এখন আরিয়ানা সানন্দে আগ্রহী।
মেগাসিটি ঢাকার নাগরিক জীবনের চাপে যতকিছু হারিয়ে গেছে, তার মধ্যে অন্যতম শিশুদের খেলাধুলা-সামাজিকতা-প্রকৃতিঘনিষ্ঠ জীবন। আর সে কারণেই বেশিরভাগ শিশুর সময় কাটে ট্যাব অথবা অন্য কোনো প্রযুক্তিপণ্যের সঙ্গে। প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার জন্য স্কুলের বাইরে ঢাকার শিশুদের আলাদা একটা জগৎ আছে এমন সংখ্যা নগণ্য।
এখন স্কুল হোক বা বাসা খেলার মাঠ নেই বললেই চলে। লেখাপড়ার ক্ষেত্রেও কতটা শিখল তা নয়, বেশিরভাগ অভিভাবকই গুরুত্ব দেন কত নম্বর পেল সেটির ওপর। একটি ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ফেরদৌসি আক্তার বলেন, ‘বিজ্ঞান বিষয়ে প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বেশিরভাগ খারাপ করেছে।’ কারণ হিসেবে তিনি জানান, ওদেরকে আমি যখন বেগুন বা নারকেল গাছ বা আমগাছ বলি, অনেক শিশুই তার পুরোপুরি অর্থ বুঝতে পারে না। কারণ প্রকৃতির সঙ্গে ওদের পরিচয় খুব সামান্য। এ কারণেই আমরা অভিভাবকদের উৎসাহিত করি শিশুকে প্রকৃতিঘনিষ্ঠ করতে।
এসব বিষয় উপলব্ধি করেই যাত্রা শুরু করেছে বাতিঘর সাংস্কৃতিক বিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠান। যেখানে আরিয়ানার মতো অনেক শিশুই কাদা দিয়ে খেলার শৈশব ফিরে পেয়েছে।
বাতিঘরের উদ্যোক্তারা জানান, বৈরী সময় আর পরিবেশের ভেতরে থেকেও শিশুদের মন-বুদ্ধি-স্বভাব যেন বিকশিত হতে পারে, তাদের ভেতরে ন্যায়নীতির শুভবোধ, রুচিবোধ আর সৌন্দর্য্যবোধ কিছুটা হলেও যেন জন্মে, তারই প্রয়াস চালানো আমাদের লক্ষ্য।
নাচ-গান-অভিনয়-আবৃত্তি-অংকন এমন নির্দিষ্ট কোনো সাংস্কৃতিক চর্চার বা শিক্ষার আবর্তে বন্দি থাকে না বাতিঘরের শিশুরা।
উদ্যোক্তাদের মতে, শিশুদের শুধু একেকটি চারুবিদ্যায় দক্ষ করে তোলাই নয়, কবিতায়, গানে, অভিনয়ে, ছবি আঁকায়, নাচে আর কথায় তারা যেন নিজেদের প্রকাশ করার আনন্দ পায় সেটাই বাতিঘরের চাওয়া। গতানুগতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো একটি বা দুটি বিষয় শেখানো নয়, বরং অনেকগুলো বিষয়ের সঙ্গে প্রাথমিক পরিচয় করিয়ে দিতে চাই আমরা। যাতে করে সে নিজেই ঠিক করে নিতে পারে তার গতিপথ।
একটা যথাযথ সামাজিক পারিপাশ্বিক অবস্থায় শিশুদের শৈশব শেখার পরিবেশ দিতে এ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে সন্তুষ্ট অভিভাবকরাও। এমনকি নানান সামাজিক অপরাধ সম্পর্কে শিশুকে অবহিত করা এবং সেসব পরিস্থিতিতে কীভাবে নিজেকে সামলে চলতে হবে বা সেখানে কোনটা ঠিক কোনটা ভুল এমন বিষয়গুলো সম্পর্কেও গল্পের ছলে শিশুকে অবহিত করা হয়। প্রতিভা বিকাশের মঞ্চ হিসেবে শিশুদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক উপস্থাপনার কার্যক্রমও পরিচালনা করে প্রতিষ্ঠানটি। বাতিঘরের বাতিদের নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তাসের দেশ নাটকের সফল মঞ্চায়নও হয়েছে।
ছয় বছরে পড়েছে বাতিঘর সাংস্কৃতিক বিদ্যালয়। ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও চট্টগ্রামেও একটি শাখা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
আরিয়ানার মা তাসলিমা সুলতানা বলেন, ‘আরিয়ানা আমাদের একমাত্র সন্তান। আমি ও আমার স্বামী দুজনই চাকরি করি। বাতিঘর আমার সন্তানকে এমন একটা শৈশব এনে দিয়েছে, যেটা আমরা পেয়েছিলাম। খেলার সাথী, খেলা, বই পড়া, গাছের সঙ্গে, ফুলের সঙ্গে, পাখির সঙ্গে বড় হওয়া। বাতিঘর থেকে ওদের গাছ-পাখি-ফুল আলাদা করে চেনানো হয়। আরিয়ানার মতো আরও অনেক শিশু এখানে এসে খুদের ভাত, নানান রকম ফল আর অনেক দেশি খাবারের সঙ্গে প্রথমবার স্বাদ পেয়েছে।’
তাসলিমা আরও বলেন, ‘এখন শিশুদের সময় কাটানোর মাধ্যম হিসেবে ট্যাব বা অন্য ডিভাইস দিয়ে দেয়া হয়। বাতিঘরে বই পড়ার অভ্যাসও গড়ে তোলা হয়। আমরা অনেকেই শিক্ষাজীবনে বা কর্মজীবনে এসে কোনো প্রেজেন্টেশন দিতে গিয়ে নানান সমস্যায় পড়ি। বাতিঘর শিশুদের নিয়মিত উপস্থাপনার আয়োজন করে। ফলে ওদের জড়তা, ভয় দূর হয়ে যায় সহজেই। সব মিলিয়ে কেবল নম্বর আর পরীক্ষা ছাড়াও শিশুরা শিখতে শিখতে যে বড় হতে পারে, সেই জায়গাটুকু তৈরি করতেই আমি আমার সন্তানকে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত রেখেছি।’

0 33

সোহরাব শান্ত

খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে ঋতুনির্ভর কৃষিকাজ মাথায় রেখে বাংলা সন ‘বঙ্গাব্দ’ চালু হয়েছিল। পয়লা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন। মুগল সম্রাট আকবর এই সনের প্রবর্তক। একটা সময় গ্রামীণ জীবনে এই সনের ব্যাপক প্রভাব ছিল। কৃষিনির্ভর গ্রামগুলোতে প্রভাব রয়েছে এখনও। শহুরে মানুষের জীবনে বাংলা সনের কার্যকারিতা কম। তবে বাংলা বর্ষ উদ্যাপনের উৎসবের বর্ণচ্ছটা দিন দিন বাড়ন্ত। গ্রামীণ মানুষের জীবনে যা চিরায়ত কিছু আনুষ্ঠানিকতা আর মেলায় সীমাবদ্ধ, শহরে তা ব্যাপক সার্বজনীন আনন্দ-উৎসব।
পয়লা বৈশাখের উৎসবকে ঘিরে বদ্ধ পরিবেশে হাঁসফাস করতে থাকা মানুষগুলো বেরিয়ে পড়ে নতুন দিনের স্বপ্ন নিয়ে। নতুন পোশাক পড়ে গানে গানে আহবান জানায় নতুন দিনের সূর্যকে। পুরনো সবকিছু ঝেড়ে ফেলে উচ্ছাসে-আনন্দে অংশ নেন বাংলা নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রায়। আনন্দপ্রিয় বাঙালি পয়লা বৈশাখে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। এদিন সকালবেলা পান্তা ভাত খাওয়া একটি ‘ফ্যাশনে’ পরিণত হয়েছে।
পয়লা বৈশাখের উৎসবে মাততে অনেকেই কেনাকাটা করে। বাংলা নববর্ষে সাধারণত সব শ্রেণি এবং বয়সের মানুষ ঐতিহ্যবাহী বাঙালি পোশাক পরিধান করে। নববর্ষকে স্বাগত জানাতে তরুণীরা লালপেড়ে সাদা শাড়ি, হাতে চুড়ি, খোপায় ফুল, গলায় ফুলের মালা এবং কপালে টিপ পরে; আর ছেলেরা পরে পাজামা ও পাঞ্জাবি। কেনাকাটায় তাই প্রাধান্য পায় এসব পোশাক।
রাজধানীতে অত্যন্ত জাঁকজমকভাবে নববর্ষ উদ্যাপিত হয়। পয়লা বৈশাখের প্রভাতে উদীয়মান সূর্যকে স্বাগত জানানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় নববর্ষের উৎসব। ঢাকার রমনা উদ্যানের বটমূলে খুব ভোরে নগরবাসী সমবেত হয়। নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে শিল্পীরা সঙ্গীত পরিবেশন করেন। ছায়ানটের উদ্যোগে জনাকীর্ণ রমনার বটমূলে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আগমনী গান ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো…’র মাধ্যমে নতুন বর্ষকে বরণ করা হয়। ১৩৭২ বঙ্গাব্দে (১৯৬৫ সাল) ছায়ানট প্রথম এ উৎসব শুরু করে। রমনা উদ্যানে বৈশাখী উৎসবের অনুষ্ঠানমালা এক মিলনমেলার সৃষ্টি করে। নববর্ষের প্রথম প্রভাতে রমনা উদ্যান ও এর চারপাশের এলাকায় উচ্ছল জনস্রোত সৃষ্টি হয় জাতীয় বন্ধন।
পয়লা বৈশাখ সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ছাত্রছাত্রীদের রাজপথে বের করা মঙ্গল শোভাযাত্রা বর্তমানে পয়লা বৈশাখের অন্যতম অনুষঙ্গ। বাংলা নববর্ষে প্রাণের জোয়ারে জেগে ওঠা মানুষের অন্যতম আকর্ষণ থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ঘিরে। মঙ্গল শোভাযাত্রা বর্তমানে বিশ্ব-স্বীকৃত একটি বিষয়। মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ঘিরে জাতীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ, টিএসসি এবং চারুকলাসহ সমগ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা পরিণত হয় বিশাল জনসমুদ্রে। ১৯৮৯ সাল থেকে শুরু হয়ে এখন এ শোভাযাত্রা নববর্ষ উদ্যাপন সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। শোভাযাত্রায় বহন করা হয় চিরায়ত লোকজ মোটিফের মঙ্গল-প্রতীক। বর্ণিল এ আয়োজনে আরও থাকে নানা আকৃতির মুখোশ, পাখিসহ গ্রামীণ সংস্কৃতির নানা উপাদান। জাতিসংঘের সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর মঙ্গল শোভাযাত্রাকে তাদের ‘রিপ্রেজেনটেটিভ লিস্ট অব ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’র তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। ইউনেষ্কো মঙ্গল শোভাযাত্রাকে মূল্যায়ন করেছে অন্যায় ও অকল্যাণের বিরুদ্ধে সত্য, ন্যায় ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের মানুষের সাহসী সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে। ধর্ম, বর্ণ, জাতি, লিঙ্গ নির্বিশেষে দেশের সব মানুষের একই চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণের বিষয়টিও ইউনেস্কোর স্বীকৃতি লাভের ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছে।
বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ছাড়িয়ে বর্তমানে কর্পোরেট অফিসগুলোতেও আয়োজন হয় নানা অনুষ্ঠান। বিনিময় হচ্ছে ‘শুভ বাংলা নববর্ষ’ লেখা বাহারি নকশার কার্ড। অপরদিকে বৈশাখী বাণিজ্যের অংশ হিসেবে নববর্ষকে ঘিরে পোশাক-গহনার দোকান, রেস্তরাঁ, ইলেকট্রনিক-পণ্য উৎপাদনকারী ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি-পণ্য উৎপাদনকারী ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান নানা অফার দেয়। বিশেষত পোশাকের দোকানগুলো সেজে ওঠে নতুন সাজে। পয়লা বৈশাখকে কেন্দ্র করে রাজধানীর প্রায় প্রতিটি বিপণিবিতানেই ওঠানো হয় নতুন শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, কুর্তা, ফতুয়া, টি-শার্ট, পাঞ্জাবি ও ওড়না। এ সময়টায় পোশাকের বাজারে থাকে সাদা-লালের দাপট। উজ্জ্বল রঙের পোশাক-পরিচ্ছদের উপস্থিতিও বেশ নজর কাড়ে।
পুরাতন বছরের লেনদেন শেষ করে নতুন হিসাব শুরু করতে একসময় নববর্ষে গ্রাম-মফস্বল ও শহরের ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানগুলো হালখাতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করত। অর্থাৎ পয়লা বৈশাখে নতুন খাতায় লেনদেনের তথ্য লেখা শুরু হতো। দেনা মেটানো এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আগত ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করানো হতো। বর্তমানে তা ভিন্ন আঙ্গিকে অনেক জায়গায় পালন হচ্ছে। পুরান ঢাকায় এখনও হালখাতা অনুষ্ঠান হয়।
বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষে বাংলা একাডেমি, নজরুল ইনন্সিটিউট, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, ছায়ানট, বুলবুল ললিতকলা একাডেমি, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিএসসিআইসি), নজরুল একাডেমি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনন্সিটিউশন প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান এবং দেশের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে।
নববর্ষকে উৎসবমুখর করে তোলে বৈশাখী মেলা। নানা আয়োজনের মধ্যে মেলা এখনো পয়লা বৈশাখের বড় আকর্ষণ, তা শহর হোক বা গ্রামে। পয়লা বৈশাখের মেলা মূলত সার্বজনীন লোকজ মেলা। এ মেলা অত্যন্ত আনন্দঘন হয়ে থাকে। শহরাঞ্চলে নগর-সংস্কৃতির আমেজেও এখন বৈশাখী মেলা বসে এবং এই মেলা বাঙালিদের কাছে এক অনাবিল মিলনমেলায় পরিণত হয়।

নদী দখলকারীরা নির্বাচন ও ঋণ পাওয়ার অযোগ্য/ ‘তুরাগ নদকে’ জীবনসত্তা ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট

মির্জা মাহমুদ আহমেদ
ঢাকার বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী তীর অবৈধ দখলমুক্ত করতে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে মার্চ পর্যন্ত অভিযান চালায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। প্রথম দফায় চার পর্বের উচ্ছেদ অভিযানে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ তীরে ১ হাজার ৮৪৩টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে।
১২ দিন বিরতির পর গত ৫ মার্চ থেকে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ তীরে দ্বিতীয় দফা উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ জানায়, দ্বিতীয় দফার এ উচ্ছেদ অভিযান চলবে ২৮ মার্চ পর্যন্ত।
বুড়িগঙ্গা নদীর তীর সংলগ্ন কামরাঙ্গীর চরের হুজুরপাড়া, আশ্রাফাবাদ, সাইনবোর্ড, খোলামোড়া ঘাট, লালবাগ কিল­ার মোড়, শশ্মানঘাট, লোহার ব্রিজ, ঝাউচর ও তুরাগ তীরবর্তী বসিলা ঢাকা উদ্যান ও কেরানীগঞ্জের মধু সিটি এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। উচ্ছেদ অভিযানে বেশ কয়েকটি বহুতল ভবনসহ অনেক আধা পাকা স্থাপনা ও সীমানা দেয়াল উচ্ছেদ করা হয়। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংক হাজারীবাগ শাখার নিকট দায়বদ্ধ একটি ভবনও ভেঙ্গে দেয়া হয়।
উচ্ছেদ অভিযান পরিদর্শনে এসে নৌ-পরিবহন সচিব মোঃ আবদুস সামাদ নদীতীর উদ্ধার অভিযানে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বনের কথা বলেন। এছাড়া যত প্রভাবশালী লোকই হোক না কেন দল-মত-নির্বিশেষে এবং প্রভাব প্রতিপত্তি বিবেচনা না করে নদীতীরে সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেন ঢাকা নদী বন্দরের যুগ্ন পরিচালক একেএম আরিফ উদ্দিন।
সরেজমিন কামরাঙ্গীর চরের আশ্ররাফাবাদ, হুজুরপাড়া, সাইনবোর্ড, খোলামুড়া এলাকা ঘুরে দেখা গেছে যেসব জায়গায় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে সেখানে ভবনের ধংস্বস্তুপ পড়ে আছে। এদিক সেদিক ভবনের ভাঙ্গা ইট সুরকি পড়ে থাকতে দেখা গেছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, অবৈধ জায়গা উদ্ধার করতে গিয়ে বিআইডব্লিউটিএ তাঁদের বৈধ স্থাপনাও ভেঙ্গে দিয়েছে। বৈধ কাগজপত্র থাকলেও বিআইডব্লিউটিএ সেসব দেখেনি এবং উচ্ছেদের আগে তাঁদের নোটিশ দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। বসিলা ব্রিজের নিচে একটি আধা-পাকা বাড়ির মালিক জমিলাতুন নেসা অভিযোগ করে বলেন, তাঁর স্বামী জনৈক ইসহাক মিঞার কাছ থেকে ১৯৭৭ সালে আড়াই কাটা জমি কিনেন। তাঁদের কাছে দলিলও আছে। কিন্তু কয়েকদিন আগে বিআইডব্লিউটিএ অবৈধ স্থাপনা দাবি করে তাঁর বাড়ি ভেঙ্গে দিয়ে গেছে।
ঢাকা নদী বন্দরের যুগ্ন পরিচালক একেএম আরিফ উদ্দিন সাংবাদিকদের জানান, বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদীর উদ্ধারকৃত জায়গায় ওর্য়াকওয়ে নির্মাণ করা হবে। বৃক্ষরোপন করে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলার পাশাপাশি পথচারীদের বসার জন্য বেঞ্চ থাকবে। বিনোদনের জন্য ৩টি ইকোপার্ক নির্মাণ করা হবে। এছাড়াও নদীতীর দখল করে যাতে ব্যবসায়িক মালামাল ওঠা-নামা না করতে পারে এজন্য নদীতীরে ১৯টি আরসিসি জেটি নির্মাণ করা হবে।
উদ্ধার অভিযান চলছে কর্ণফুলীতেও
ঢাকার বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ তীরে উদ্ধার অভিযান চালানোর পাশাপাশি চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীতেও উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে চট্রগ্রাম জেলা প্রশাসন।
৪ ফ্রেরুয়ারি কর্ণফুলী নদীতীরে শুরু হওয়া প্রথম দফার প্রথমদিনের উচ্ছেদ অভিযানে সাম্পান সমবায় সমিতির কার্যালয়, যাত্রী ছাউনি, বিআইডব্লিউটিএ’র লোহার স্থাপনা, কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্সের অবৈধ স্থাপনাসহ প্রায় ৫০টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। চট্রগ্রাম জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায় প্রথম দফার ৫ দিনের উচ্ছেদ অভিযানে সদরঘাট থেকে বারিক বিল্ডিং পর্যন্ত প্রায় ২৩০টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে ১০ একর ভূমি। কর্ণফুলী নদীতীরের ভূমি উদ্ধারের পর সেখানে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করছে জেলা প্রসাশন। এরপর দ্বিতীয় দফায় পতেঙ্গা থেকে চাক্তাই পর্যন্ত উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল মন্নান জানান, সরকারের সবুজ সংকেত পেলে উদ্ধারকৃত জায়গায় বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। ওয়াকওয়ে, বিনোদন কেন্দ্র ও হাতিরঝিলের আদলে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করা হবে। যেখানে মানুষ স্বস্তির বাতাস নিতে পারবে। মুক্ত থাকবে যান্ত্রিক কোলাহল থেকে।
এদিকে নগরীর মাঝির ঘাট এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান পরির্দশনে এসে ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী বলেছেন, কর্ণফুলী নদীর তীরে গড়ে উঠা কোনো অবৈধ স্থাপনা থাকবে না। ধীরে ধীরে সব স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে। উচ্ছেদ করতে গিয়ে যারা হুমকি দিচ্ছেন তারা কেউ পার পাবে না। হুমকি দিলে উচ্ছেদ অভিযানের গতি আরও বাড়বে।
হাইকোর্টের রায়ে গতি পায় উদ্ধার অভিযান
ঢাকার তুরাগ নদকে ‘জীবন্ত সত্তা’ ঘোষণা করে দেশের সকল নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয় রক্ষার জন্য জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে ‘আইনগত অভিভাবক’ ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘মাইলফলক’ এই রায়ে নদী দখলকারীদের নির্বাচন করার ও ঋণ পাওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। নদী রক্ষা কমিশন যাতে নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয় রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে, সেজন্য আইন সংশোধন করে ‘কঠিন শাস্তির’ ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে সরকারকে। পাশাপাশি জলাশয় দখলকারী ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণকারীদের তালিকা প্রকাশ, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দেশের সব নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয়ের ডিজিটাল ডেটাবেইজ তৈরি এবং সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প-কারখানায় নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি নিতে বলা হয়েছে হাই কোর্টের রায়ে।
তুরাগ নদী রক্ষায় একটি রিট মামলার বিচার শেষে ৩ ফ্রেরুয়ারি রোববার বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের হাই কোর্ট বেঞ্চ ঐতিহাসিক এ রায় দেয়।
হাইকোর্টের এই রায়ের পর বুড়িগঙ্গায় চলমান উচ্ছেদ অভিযান গতি পায়। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ছাড়াও দেশের অনান্য নদ নদী উদ্ধারে জোরালো অভিযান শুরু করে জেলা প্রশাসন।
হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের একটি রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে তুরাগ নদীর অবৈধ দখলদারদের নাম ও স্থাপনার তালিকা হাই কোর্টে দাখিল করেছিল বিচার বিভাগীয় একটি তদন্ত কমিটি। ওই তালিকায় আসা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিরা পরে এ মামলায় পক্ষভুক্ত হন।
উভয়পক্ষের দীর্ঘ শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট নদী রক্ষায় গত ৩ ফ্রেরুয়ারি রায় ঘোষণা করে। সেদিন তুরাগ নদীকে ‘লিগ্যাল পারসন’ বা ‘জুরিসটিক পারসন’ ঘোষণা করা হয়, যা দেশের সব নদ-নদীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে বলে রিটকারীপক্ষের আইনজীবী জানান।
‘প্যারেন্স প্যট্রিয়া জুরিসডিকশনের আওতায় আদালত তুরাগ নদকে জীবন্ত সত্তা, জুরিসটিক ও লিগ্যাল পারসন হিসেবে ঘোষণা করছে।’ রায়ে বলা হয়েছে, দেশের সকল নদ-নদী খাল-বিল জলাশয় রক্ষার জন্য ‘পারসন ইন লোকো পেরেনটিস’ বা ‘আইনগত অভিভাবক’ হবে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। ফলে দেশের সকল সকল নদ-নদী খাল-বিল জলাশয়ের সুরক্ষা, সংরক্ষণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, শ্রীবৃদ্ধিসহ সকল দায়িত্ব বর্তাবে নদী রক্ষা কমিশনের ওপর।
এছাড়া দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদকে নিজের এলাকার নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয়ের অবৈধ দখলদারদের চিহ্নিত করে তাদের নামের তালিকা জনসম্মুখে ও পত্রিকায় প্রকাশ, জাতীয় বা স্থানীয়- কোনো ধরনের নির্বাচনে প্রার্থীর বিরুদ্ধে নদী দখলের অভিযোগ থাকলে তাকে নির্বাচনের অযোগ্য ঘোষণা, দেশের সকল সরকারি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতি দুই মাসে কমপক্ষে এক ঘণ্টা ‘নদী রক্ষা, সুরক্ষা, দূষণ প্রতিরোধ’, নদ-নদীর প্রয়োজনীতার বিষয়ে সচেতনতামূলক পাঠদানের ব্যবস্থাসহ নদীরক্ষায় রায়ে আরও কিছু নির্দেশনা দিয়েছে হাইকোর্ট।
রায়ের একটি অনুলিপি প্রধানমন্ত্রীর কাছেও পাঠাতে বলেছে আদালত, যাতে এ রায়ের ভিত্তিতে তিনি অবৈধ দখলকারী বা স্থাপনা নির্মাণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক
ফ্যান্টাসি কিংডম, ঢাকার নিকটস্থ সাভারের আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় গড়ে উঠেছে এই আনন্দময় জগৎ। ২০ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত পার্কটি প্রথমে থিমপার্ক পরিচয়ে যাত্রা করে, সেটা ছিল ২০০২ সাল। পরবর্তী সময়ে অ্যামিউজমেন্ট পার্ক হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পায়। এখন এটি একটি বিনোদনের আলাদা জগৎ বলাই উত্তম। পার্কটির প্রতিষ্ঠাতা কনকর্ড গ্রপ। বিশাল এই বিনোদন জোনে প্রবেশ করে একটি দিন কাটিয়ে দেয়া যায় অনায়াসেই।
ফ্যান্টাসি কিংডমে প্রবেশ করে প্রথমেই হেরিটেজ পার্ক। এখানে রয়েছে বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নানা নিদর্শন। এ পার্কটিতে জাতীয় স্মৃতিসৌধ, আহ্সান মঞ্জিল, চুনাখোলা মসজিদ, কান্তজির মন্দির, জাতীয় সংসদ ভবন, ষাটগম্বুজ মসজিদ, পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, সীতাকোট বিহার, পুটিয়া রাজবাড়ি ও গ্রিক মেমোরিয়ালসহ ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের রেপ্লিকা নিয়েই গড়ে উঠেছে। দেশের অনেক বৃহৎ এবং প্রাচীন স্থাপনা এমন ছোট এবং নিখুঁত যে চমকে যেতে হয়। মনে হয় ঘুরে ঘুরে সারাটা দিন দেখি কান্তজির মন্দির, স্মৃতিসৌধ এসব। সামনেই বিরাট এক নাগরদোলা। নাগরদোলায় চড়ে আপনার আকাশ দেখার অভিজ্ঞতা হবে। এছাড়া আছে রাইড, লেক, কোনো পাইপ ছাড়াই ট্যাপ দিয়ে পানি পড়ার দৃশ্য। আছে পালকি, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, রিকশাসহ বাংলার ঐতিহ্যবাহী নানা উপকরণ।
এরপর বিশাল ফটক পেরিয়ে ফ্যান্টাসি কিংডম। এখানে প্রবেশ করেই আপনি হারিয়ে যাবেন বিপুল এক আনন্দজগতে। কোথাও গাড়ির ধাক্কার শব্দ, কোথাও রাইডে চড়ার আনন্দ-চিৎকার। কোথাও বিশালাকার ডাইনোসর পানি খাচ্ছে। কোথাও প্রিন্স আশু আর প্রিন্সেস লিয়া দাঁড়িয়ে। মাথার ওপর দিয়ে চিৎকার করে ছুটে যাচ্ছে রোলার কোস্টার। হ্যাঁ, মজার মজার সব রাইড এখানেই। ছোটদের জন্য আছে ঘোড়ার গাড়ি, অ্যারোপ্লেনসহ মজার আরও অনেক কিছু। বড়দের উত্তেজনাকর রাইডের মধ্যে আছে জায়ান্ট ফেরিস হুইল, জুজু ট্রেন, হ্যাপি ক্যাঙ্গারু, বাম্পার কার, ম্যাজিক কার্পেট, সান্তা মারিয়া, জিপ অ্যারাউন্ড, পানি অ্যাডভেঞ্চার, ইজি ডিজি। রাইড ছাড়াও খাবারের পর্যাপ্ত দোকান রয়েছে। আনন্দ-উল্লাসের ফাঁকে ভেতরেই সেরে নিতে পারেন দুপুরের খাবার।
ফ্যান্টাসি কিংডম শেষ করে চলে যেতে পারেন ওয়াটার কিংডমে। ফ্যান্টাসি কিংডমের শেষ প্রান্তে মাটির নিচ দিয়ে মনোমুগ্ধকর ও আকর্ষণীয় ভার্চুয়াল অ্যাকুয়ারিয়াম টানেল পার হয়ে প্রবেশ করতে হয় ওয়াটার কিংডমে। সেই পথের দুই পাশে ভেসে বেড়াচ্ছে তিমি-হাঙরসহ নানা সামুদ্রিক প্রাণী। সুড়ঙ্গপথের অপর প্রান্তে উঠেই চোখে পড়বে রিসোর্ট আটলান্টিকস। এ রিসোর্টে চাইলে আসা যায় অবকাশযাপনে, সারাদিন পার্ক ঘুরে রাতে রিসোর্ট থেকে যাওয়াও আরেক সুখের অভিজ্ঞতা। এ রিসোর্টে অবকাশযাপনকারী ফ্যান্টাসি কিংডম, ওয়াটার কিংডম ও হেরিটেজ পার্কের মনোরম সৌন্দর্য ও রাইড উপভোগ করার সুযোগ পাবেন বিনাখরচে। ইকোনমি, ডিলাক্স, সুপার ডিলাক্স ও স্যুট এই চার ধরনের রুম রয়েছে রিসোর্টে।
রিসোর্টটিতে আধুনিক সুযোগ-সুবিধার মধ্যে রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুম, ক্যাবল টিভি, রেস্টুরেন্ট, ক্রেডিট কার্ড সুবিধা, সাইবার ক্যাফে, টেলিফোন, কার পার্কিং, লন্ড্রি সার্ভিস, কনফারেন্স সেন্টারসহ অনেক কিছু। এছাড়া বিনোদনের জন্য রয়েছে ডলবি ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেম হল, বিলিয়ার্ড, পুল ও এয়ার হকিসহ বিভিন্ন রকম গেমের আয়োজন। রিসোর্ট আটলান্টিসে আগত অতিথিদের জন্য রয়েছে বার-বি-কিউ নাইট ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের চমৎকার সব আয়োজন। আরও রয়েছে রুম ভাড়ার সঙ্গে সকালের নাশতা। এই রিসোর্ট থেকে চোখে পড়ে ওয়াটার কিংডমের সৌন্দর্য। রিসোর্টের তিন পাশে জলাশয়। কোথাও বৃষ্টি ঝরছে, কোথাও সমুদ্রের ঢেউ। কোথাও এমনি এমনি পানি। ওয়াটার কিংডমের ভাষায় এখানে আছে স্পাইড ওয়ার্ল্ড, ফ্যামিলি পুল, টিউব স্পাইড, লেজি রিভার, মাল্টি স্পাইড, ওয়াটার ফল, ডুম স্পাইড, লস্ট কিংডম, ড্যান্সিং জোনসহ মজাদার সব রাইড। দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে পার্কটিতে রয়েছে পুরুষ ও মহিলাদের জন্য দুটি আলাদা চেঞ্জ রুম ও লকারের ব্যবস্থা। দর্শনার্থীরা নিজেদের সঙ্গে অতিরিক্ত কাপড় ও তোয়ালে আনতে পারেন। এছাড়া এখানে তোয়ালে ও সুইম স্যুট ভাড়া নেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। কেনাকাটা ও খাওয়া-দাওয়ার জন্য রয়েছে গিফট শপ, একাধিক ফুডকোর্ট ও আইসক্রিম শপ।
ফ্যান্টাসি কিংডম সপ্তাহের সাত দিনই খোলা থাকে। সাধারণ দিনগুলোতে বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এবং সরকারি ছুটির দিনগুলোতে সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত।
গাড়ি নিয়ে ঢাকা থেকে রওনা দিলে আশুলিয়ার জামগড়া সহজেই চলে যাওয়া যায়। ফ্যান্টাসি কিংডম প্রধান সড়কের পাশে হওয়ায় খুঁজে পেতে অসুবিধা হয় না। যারা বাসে যেতে চায়, তাদের জন্য রয়েছে ঢাকার মতিঝিল থেকে মঞ্জিল বাস সার্ভিস। মঞ্জিল বাস মহাখালী, কাকলী, উত্তরা, টঙ্গী, কামারপাড়া হয়ে ফ্যান্টাসি কিংডমের প্রবেশমুখে এসে থামে। এছাড়াও মহাখালী ও মিরপুর থেকে সরাসরি বাস পাওয়া যায়। সাভার রুটে সাভার গিয়ে আবার অন্য বাসে ফ্যান্টাসি কিংডমে যাওয়া যায়।

কারিকা প্রতিবেদকঃ


১৯০৯ সাল। ঢাকা তখন রাজধানী, নতুন প্রদেশ পূর্ববঙ্গের। বিচিত্র গাছপালায় সুশোভিত করতে হবে ঢাকার পথঘাট, উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ। এই গুরুদায়িত্ব নিয়েই তখন ঢাকায় আসেন লন্ডনের কিউ বোটানিক গার্ডেনের অন্যতম কর্মী রবার্ট লুইস প্রাউডলক। বলধার প্রকৃতিপ্রেমিক জমিদার নরেন্দ্রনারায়ণ রায়ও ঠিক একই সময়েই শুরু করেন তাঁর অমর সৃষ্টি ‘সাইকি’ বাগানের কাজ। নিজেই ছিলেন সাইকির স্থপতি, শিল্পী ও বিশেষজ্ঞ। সাইকি ছিলেন গ্রিক পৌরাণিক উপাখ্যানের প্রেমের দেবতা ‘কিউপিডের’ পরমা সুন্দরী স্ত্রীর নাম। সাইকি মানে আত্মা, যা দেবরাজ ‘জুপিটার’ কর্তৃক অমরত্ব লাভ করেছিল। নরেন্দ্রনারায়ণ রায় প্রায় ২৭ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে ১৯৩৬ সালে সাইকি বাগানের কাজ শেষ করেন। তারপর সিবিলিও গড়ে তোলেন। কিন্তু বৃক্ষপ্রেমী এই জমিদারের মৃত্যুর পর থেকেই বাগানটির ক্রান্তিকাল শুরু হয়। প্রায় ১০০ বছরের ব্যবধানে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে বাগানটির জৌলুস আর কমতে থাকে বাগানের সমৃদ্ধ উদ্ভিদপ্রজাতির সংগ্রহ।

আমরা জানি, নানা কারণে আজ বলধা গার্ডেন বিপন্ন। অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং অযত্ন -অবহেলা ও অদূরদর্শিতা এ বাগানের দুস্প্রপ্য উদ্ভিদগুলো হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। ইতোমধ্যেই অনেক দুর্লভ বৃক্ষ হারিয়ে গেছে। গত কয়েক বছরে এই সংখ্যা আরও অনেক বেড়েছে। দেশের প্রকৃতিপ্রেমিক লেখক ও বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে বলধা গার্ডেন সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে আসছে। গুরুত্বপূর্ণ এই বাগানের চারপাশে অনেক সুউচ্চ স্থাপনা তৈরি হওয়ায় সেখানকার উদ্ভিদবৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। পাশাপাশি বর্ষায় সুয়ারেজের উপচেপড়া ময়লা পানিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার কারণেও প্রতি বছর অনেক গাছপালার মৃত্যু হচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে এখানকার বিলুপ্ত গাছের তালিকা প্রতিনিয়তই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অচিরেই এই বাগান ধ্বংস হবে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
দেশের উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও নিসর্গীদের মতে, মূল গাছগুলো অক্ষত রেখে এবং বর্তমান বাগানকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করে চারাকলমের মাধ্যমে বাগানের গাছগুলো অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে বলধা গার্ডেনের আদলে আরেকটি বাগান তৈরি করা উচিত। তাহলে বাগানটি নিশ্চিত বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে। হারিয়ে যাবে না বাগানের দুস্প্রাপ্য গাছগুলো।
আমরা মনে করি, দেশের কোনো সুবিধাজনক স্থানে এ বাগানের সব উদ্ভিদপ্রজাতি নিয়ে হুবহু আরেকটি বাগান তৈরি করে দেশের শত বছরের ঐহিত্য এই বাগানটি রক্ষা করা সম্ভব। এজন্য উপযুক্ত স্থান হতে পারে ঢাকার অদূরে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান বা সংলগ্ন এলাকা। সেখানে বলধা বাগানের জন্য পরিমাণমতো জায়গা নিয়ে বিদ্যমান নকশায় সৃজন করা যায় আরেকটি নতুন বলধা গার্ডেন। এর জন্য প্রয়োজন হবে একটি বিশেষ নার্সারি এবং কয়েকজন সুদক্ষ মালি। তবে খেয়াল রাখতে হবে কোনোভাবেই যেন উদ্যানের পুরনো নকশার বিকৃতি না ঘটে, আদি উদ্যানও অবহেলার শিকার না হয়। কারণ সংরক্ষণের নামে বাগানের নাম ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পরিবর্তন বাঞ্ছনীয় নয়।

বলধা গার্ডেনের বর্তমান হতশ্রী রূপ দেখে খুব সহজেই অনুমান করা যায়, বাগানটি লোকবল ও অর্থ সঙ্কটে ভুগছে। বাগানের সর্বত্র অযত্নের ছাপ। সংরক্ষিত সাইকি অংশের পরিস্থিতিও বেশ নাজুক। স্বল্প সংখ্যক মালি নিয়ে শুধু গাছগুলো বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। চারপাশের উঁচু দালানে প্রায় ঢাকা পড়েছে বাগানটি। দিনের আলোয়ও পেছনের দিকটা বেশ অন্ধকার। সিবিলি অংশে সারাদিনই দর্শনার্থীদের ভিড়। এই দর্শনার্থীরা মূলত অন্য মতলবে এখানে আসেন। অপ্রয়োজনীয় মানুষের বিক্ষিপ্ত পদচারণা বাগানের গাছগুলোকে বিপন্নতর করে তুলছে। প্রশ্ন হলো, বলধা গার্ডেনের মতো এমন স্পর্শকাতর একটি স্থাপনা কেন টিকিটের বিনিময়ে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হলো! তবুও যারা এখানে বেড়াতে আসেন তারা যদি সত্যিকার অর্থে বৃক্ষের সমঝদার হতেন তাহলে কোনো প্রশ্ন ছিল না। উপরন্তু নিত্যদিনের এই অনিয়ন্ত্রিত জনস্রোত উদ্যানের বিপন্ন গাছগুলোর মৃত্যুকেই শুধু ত্বরান্বিত করছে। এই বাগানের অর্জিত অর্থ ছাড়া কি বন বিভাগের চলছিল না? আবার এখানকার অর্জিত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হলেও বাগান রক্ষণাবেক্ষণে তার সিকিভাগও ব্যয় হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা অচিরেই এসব আত্মঘাতী কাজের সমাপ্তি ঘটবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাগানটি বাঁচিয়ে রাখতে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
বিকল্প বলধা গার্ডেন প্রতিষ্ঠায় সরকারি এবং বেসরকারি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে বিষয় সংশ্লিষ্ট গবেষক এবং বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হলে কাঙ্ক্ষিত সফলতা আসবে বলে মনে করি।

বাগানের উল্লেখযোগ্য সংগ্রহঃ 
বলধা গার্ডেনের সর্বমোট আয়তন শূন্য দশমিক ১ হেক্টর হলেও সাইকি অংশ দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে যথাক্রমে ১০০ ও ৪৫ মিটার। সিবিলি অংশ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হলেও সাইকি সংরক্ষিত। উভয় বাগানে সর্বমোট ৮৭ পরিবারের ৭২০ প্রজাতির ১৭ হাজার উদ্ভিদ ছিল বলে জানা যায়। সাইকি অংশে প্রায় ৪৫০ প্রজাতির উদ্ভিদের বিরলতম সংগ্রহ গড়ে তোলা হয়েছিল। প্রবেশপথের দু’পাশে প্রথমেই শাপলা ও পদ্মপুকুর। সেখানে ১২ প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ রয়েছে। দুর্লভ শাপলার মধ্যে হলুদ শাপলা ও থাই-বেগুনি শাপলা উল্লেখযোগ্য। আরেকটু সামনেই ডানদিকে রোজক্যাকটাস, প্যাপিরাস, কনকসুধা। বাঁ দিকে আছে ঘৃতকুমারী। তারপর ঔষধি গাছ-গাছড়া, আমাজন পদ্ম, পদ্ম, অর্কিড ঘর, হংসলতা, তার পাশেই জমিদারের বাড়ি ও জাদুঘর। তার দক্ষিণ পাশেই জ্যাকুইনিয়া, শারদমল্লিকা, কণ্টকলতা, গুস্তাভা, হিং, শ্বেতচন্দন, সাইকাস, স্বর্ণ অশোক, কুর্চি, ভুর্জপত্র। ডানদিকে ক্যাকটাসের দুর্লভ সংগ্রহ নিয়ে একটি ঘর। এখানে ক্যাকটাস ঘরের সংখ্যা ৩টি, পটিংঘর একটি, ছায়াঘর দুটি, অর্কিডঘর একটি। মাঝখানে আছে চারদিকে তাকসমেত পিরামিড আকৃতির একটা ঘর। তাকগুলোতে থরে থরে সাজানো ক্যাকটাস। একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে ছায়াঘর। সেখানে নানা জাতের ফার্ন, ফার্নঘরের ভেতর কৃত্রিম সুড়ঙ্গের মাধ্যমে চমৎকার পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। স্বর্ণ অশোকের পাশেই সাদা ও গোলাপি রঙের ক্যামেলিয়া, তারপর রাজ অশোক। দক্ষিণ দিকের দেয়ালের পাশে ছোট জাতের কয়েকটি পাম। ছোট-বড় মিলিয়ে সাইকিতে ১৬ প্রজাতির পাম রয়েছে। সাইকির বিরলতম সংগ্রহের মধ্যে আরও আছে লতাচালতা, ক্যানেঙ্গা, ঈশের মূল, নবমল্লিকা, ওলিওপ্রেগরেন্স, জিঙ্গো বাইলোবা, অ্যারোপয়জন, র‌্যাভেনিয়া, আফ্রিকান বকুল, নাগলিঙ্গম, উদয়পদ্ম, রাজ অশোক ইত্যাদি।

সিবিলি বাগানের বিশেষত্ব হচ্ছে এর প্রবেশপথ। কারণ প্রবেশপথের দু’পাশ উদয়পদ্মে সুসজ্জিত। এ পথ একেবারে উত্তরপ্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। এছাড়াও মনোলোভা সব ক্যামেলিয়ার ঘর এ বাগানেই। এখানেও চারপাশে ঘোরানো পথ আছে। বাঁ পাশে পুকুরের কোনায় আছে সুউচ্চ মুচকুন্দ আর ডানপাশে পোর্টল্যান্ডিয়া। আরেকটু এগোলে চোখে পড়বে কলকে, অ্যারোপয়জন, কপসিয়া, হলদু, দেবকাঞ্চন, কনকসুধা, কনকচাঁপা, লতা জবা, স্কারলেট কর্ডিয়া, কাউফল। শঙ্খনিধি পুকুরে নানান জাতের জলজ ফুলের চাষ হয়। সারাবছরই কিছু না কিছু ফুল থাকে। পুকুরের চারপাশে তাক আছে, দু’পাশে আছে শানবাঁধানো ঘাট। পথের শেষ প্রান্তে আছে কয়েকটি দুর্লভ রাজ অশোক, তারপর বাঁ দিকে ঘুরলে আফ্রিকান টিউলিপ (রুদ্রপলাশ), গড়শিঙ্গা, ক্যামেলিয়ার ঘর, দেয়াল লাগোয়া পশ্চিম পাশে আছে একসারি ক্যানেঙ্গা ও ইয়ক্কা, দু’জাতের কেয়া ইত্যাদি। এ বাগানে দুটি ঘর আছে, একটিতে থাকে অর্কিড, অন্যটি চারাগাছের ভান্ডার। শঙ্খনিধি পুকুরের পশ্চিম পাড়ের দোতলা ঘরটি এখন পরিত্যক্ত। এখানে আরও আছে মাধবী, অশোক, লুকলুকি, পান্থপাদপ, শতায়ু উদ্ভিদ, পাখিফুল, কৃষ্ণবট ইত্যাদি। এ বাগানের গোলাপ এক সময় উপমহাদেশে প্রসিদ্ধ ছিল।

খালিদ জামিলঃ


দ্য মেনিয়াপলিস স্কাল্পচার গার্ডেন, যুক্তরাষ্ট্রঃ
কানাডার ধার ঘেঁষে অবস্থিত আমেরিকার অঙ্গরাজ্য মিনেসোটা। এই মিনেসোটার মাথার মুকুট বলা হয় মেনিয়েস স্কাল্পচার গার্ডেনকে। বাগানটি গড়ে উঠেছে মূলত একটি ভাস্কর্যকে কেন্দ্র করে। চামচের আদলে তৈরি একটি সেতু, তার ওপর একটি চেরি ফল। এটি বর্তমানে গোটা মিনেসোটা রাজ্যেরই আইকন হিসেবে বিবেচিত। মার্কিন ভাস্কর ক্লেস ওলডেনবার্গ তার স্বকীয়তা আর অদ্ভুত চিন্তাভাবনার জন্য বিখ্যাত। তার স্ত্রী চোজে ভ্যান বার্গেনও বেশ কয়েকটি বড় ভাস্কর্য নির্মাণ করে পরিচিতি পেয়েছেন। যেগুলোর মধ্যে শিকাগোর ব্যাটকলাম অন্যতম। তাদেরকেই এই মেনিয়াপলিস বাগানের জন্য একটি ঝরনাভিত্তিক ভাস্কর্য নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়। ওলডেনবার্গের কাজে এর আগের বেশ কয়েক বছর ধরেই চামচ আকৃতির প্রাধান্য ছিল। ধারণাটা তিনি পেয়েছিলেন ১৯৬২ সালের একটি কাজে। এরই ধারাবাহিকতায় একটা বিশাল আকৃতি দেওয়া হয় মেনিয়াপলিস প্রজেক্টে। তার ওপর চেরি বসিয়ে দেওয়ার আইডিয়াটা অবশ্য নেওয়া হয়েছে চতুর্দশ লুইসের কাছ থেকে।

খালিদ জামিল


শালিমার গার্ডেন, পাকিস্তানঃ
পারসিয়ান আদলের এই বাগানটি নির্মাণ করেছিলেন মোগল সম্রাট শাহজাহান। বর্তমান লাহোরে এর অবস্থান। ১৬৪১ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়। সময় লাগে এক বছর। পুরো প্রজেক্টটির তত্ত্বাবধানে ছিলেন খলিলুল্লা খান। তার সঙ্গে ছিলেন আলি মারদান খান ও মোল্লা আলাওল মুলক তুনি। শালিমার আয়তাকার যেটি নকশাকাটা ইটের উঁচু প্রাচীরে বেষ্টিত। পুরো বাগানটি উত্তর-দক্ষিণে ৬৫৮ আর পূর্ব-পশ্চিমে ২৫৮ মিটার। ১৯৫৮ সালে শালিমার গার্ডেনসহ লাহোর ফোর্টকে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ইউনেস্কো কনভেনশন অনুযায়ী ১৯৭২ সাল থেকে সংস্থাটি বিশ্বের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের সংরক্ষণের কাজ করে আসছে।

কারিকা ডেক্স


আমার নিজের অভিজ্ঞতায় ঢাকার বাইরে, বিদেশের অনেকগুলো শহরের কথা বলা যায়। তবে আমার কাছে বেশি প্রাসঙ্গিক মনে হয় ঢাকার পর ব্যাঙ্কক। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাঙ্কক। ঢাকায় আমি সারাজীবনই ছিলাম, কয়েক বছর বাদে। ব্যাঙ্ককে আমি চার বছর বসবাস করেছি। ১৯৮২ থেকে ১৯৮৬ এই সময়টায়। আশির দশকের প্রথম দিকে ব্যাঙ্কক বিশাল একটি শহর ছিল তা কিন্তু নয়। তবে ঢাকার চেয়ে বড় ছিল। তখন ঢাকায় ছিল প্রায় ১৫ লাখ মানুষ। ব্যাঙ্ককে ২৫-৩০ লাখ মানুষ। গত ৩০ বছরে এখন ব্যাঙ্ককে পৌনে দুই কোটি মানুষ, ঢাকায়ও পৌনে দুই কোটি। পরিবহনের কথা যদি বলি সেই সময়ে ব্যাঙ্ককে ব্যক্তিগত মোটরগাড়ির প্রচলন ছিল এবং জনপ্রিয় ছিল। তখন থাইল্যান্ড আয়ের দিক থেকে উঠে এসেছিল। ব্যাঙ্কক আরও বেশি এগিয়েছিল। ব্যাঙ্কক থাইল্যান্ডের সবচেয়ে বড় শহর। সেখানে দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর চিয়াংমাই অনেক ছোট। চিয়াংমাই থেকে প্রায় ৩০ গুণ বড় ব্যাঙ্কক। ঢাকা হলো বাংলাদেশের রাজধানী, বৃহত্তম শহর। দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার লোকসংখ্যা আড়াই থেকে তিনগুণ বেশি। ব্যাঙ্কক শহরও ঢাকার মতো দেশের কেন্দ্রে অবস্থান। থাইল্যান্ডের কেন্দ্রে হলো ব্যাঙ্কক, বাংলাদেশের কেন্দ্রে হলো ঢাকা। আশির দশকে ঢাকায় পরিবহন বলতে কিছু পাবলিক বাস ছিল, বিআরটিসি বাস। সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ার মতো ছিল রিকশা। এখনও আছে রিকশা। এখন দুই সিটি করপোরেশন মিলে প্রায় পাঁচ লাখ রিকশা। সেই সময়ে দুই লাখের মতো রিকশা ছিল। আর ছিল বেবিট্যাক্সি। এছাড়া আর ছিল প্রাইভেট গাড়ি। প্রাইভেট গাড়ির সংখ্যা ব্যাঙ্ককের তুলনায় অনেক কম ছিল। আমি ব্যাঙ্কক শহরের বাইরে বসবাস করতাম। এআইটি, এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, সেখানে অধ্যাপনা করতাম। সেটা ব্যাঙ্কক শহরের কেন্দ্র থেকে ৪০ কিমি দূরে। সেখান থেকে আমার গাড়ি চালিয়ে ব্যাঙ্ককে যেতে ৪৫ মিনিট লাগত। ১৯৮৬ সালে যখন আমি ব্যাঙ্কক থেকে চলে আসি, তখন কিন্তু অনেক সময় লাগত। তখন এত বেশি গাড়ি হয়ে গিয়েছিল, আগে ওই ৪০ কিলোমিটার রাস্তা ৪৫ মিনিট লাগত। চার বছরে সেটা আড়াই ঘণ্টা সময়ে পৌঁছানো যেত। তখন ব্যাঙ্কক ছিল খুব যানজটের শহর। এখন যেমনটা বলি ঢাকাকে। সেখান থেকে ব্যাঙ্কক কিন্তু উত্তরণ হয়েছে। সেটা কীভাবে পারল তারা? এই যে গণপরিবহন বা বাস ট্রানজিট তারা প্রভূত উন্নয়ন সাধন করেছে। একটা হলো প্রাইভেট গাড়ি সহজ চলাচলের জন্য তারা ১২ লেনের হাইওয়ে করেছে। ১২ লেন কেন কোথাও কোথাও আরও বেশি। নিচে ১২ ওপরে ৬ এই ১৮ লেনের রাস্তা। এগুলো হলো গাড়ির জন্য। নিচে দিয়ে বাস চলত। গাড়ি নিচে নিয়ে এবং ওপর দিয়ে। তার ফলে শহরতলি থেকে কেন্দ্রে যাওয়া, এয়ারপোর্ট থেকে কেন্দ্রে যাওয়া  সময়টা অনেক সাশ্রয় হতো। আরও পরে ব্যাঙ্কক শহরে বড় রকমের গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু হয়। সেটা হলো স্কাই ট্রেন। মাথার ওপর দিয়ে ট্রেন। সেটা প্রথম দিকে এতটা জনপ্রিয় ছিল না। পরে খুব জনপ্রিয় হয়েছে। এখন সেখানে স্কাই ট্রেন, মেট্রো ট্রেন হচ্ছে। এক্সওয়ে এগুলো তো আছেই। সেখানে সবই মোটরচালিত যানবাহন। ট্রেন তো আছেই, রিকশা নেই। সিএনজি অটোরিকশা যেটাকে বলি, সেটাকে ওরা বলে টুকটুক। তিন চাকার এই বাহন আছে প্রচুর। এখন গাড়ির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় মনে হয় টুকটুকের সংখ্যা কম। টুকটুক মিটারে চলে এবং খুব নিয়মের মধ্যে। আরেকটা বাহন ব্যাঙ্ককে ইউনিক সেটা হলো মোটরবাইক ট্যাক্সি। মোটরসাইকেলই ভাড়ায় চলে। এটাকেই ট্যাক্সি বলে। একজন যাত্রী নেয়। এটা আমি যখন প্রথম যাই তখনই দেখেছি। পরে আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এই বাহন চালকদের আলাদা পোশাকও আছে। বাহক পুরুষ, যাত্রী মেয়ে এতে কোনোই অসুবিধা নেই এবং খুবই নিরাপদ। খুবই স্বস্তিতে চলাফেরা করতে পারে। হাইওয়েতে এটা ওরা অনুমোদন দেয় না। হাইওয়ের পাশের লোকাল রোড এবং অলিগালিতে এই বাহন চলে। ব্যাঙ্ককের বিশেষ একটা পরিবহন এই মোটরসাইকেল ট্যাক্সি। ব্যক্তিগত সাইকেল আছে, তবে কম। আর আছে টেম্পো বা লেগুনা। পিকআপ কনভার্ট করে লেগুনা তৈরি করেছে। খুব নিরাপদ, সব নতুন ঝরঝরে গাড়ি। একটি বড় শহরের জন্য সবচেয়ে বেশি যেটা জরুরি সেটা হলো ট্যাক্সি। ব্যাঙ্কক শহরে যে কোনো জায়গায় যে কোনো সময়ে ট্যাক্সি পাওয়া যায়। দুই রকমের ট্যাক্সি তখন ছিল, এখনও হয়তো আছে। একটি চলে মিটারে। অন্যটি দরদাম করে। কয়েকটা কোম্পানির হাজার হাজার ট্যাক্সি। বিভিন্ন রঙের সেসব ট্যাক্সি হাত দেখানো মাত্রই সামনে এসে থামে। মানুষের আয়ের তুলনায় এই ট্যাক্সি খুবই সাশ্রয়ী। আমাদের এখানে ট্যাক্সি অত্যন্ত দুর্মূল্য। আয়ের লোক না হলে, বাধ্য না হলে, বিপদে না পড়লে ট্যাক্সিতে ওঠে না। আমাদের এখানে সংখ্যাও কম, দামও বেশি। ব্যাঙ্ককে বাস সার্ভিসও সুন্দর। আমাদের এখানের মতো শত শত কোম্পানি নেই। মাত্র দু’চারটি কোম্পানি বাস সার্ভিস দিয়ে থাকে। একটি হলো বিএমএ, ব্যাঙ্কক মেট্রোপলিটন অখরিটি। সেখানে এসি গাড়িই বেশি। সেসব বাসে খুব আরামে চলাচল করা যায়। মিনিবাসও আছে, তবে কম। এসব কারণে দুই কোটি মানুষ খুব সহজে চলাচল করতে পারছে। আরেকটা বিষয় যেটা ঢাকায় হতে পারত। সেটা হচ্ছে ব্যাঙ্ককের খালে অসংখ্য যানবাহন চলাচল করে। ওদের বড় একটি নদী আছে। নদীটির দুই তীরেই ব্যাঙ্কক শহর গড়ে উঠেছে। একদিকে মূল শহর, অন্যদিকে কেরানীগঞ্জের মতো নতুন শহর। সেই নদীতে প্রচুর নৌবাস চলাচল করে। ঢাকায় দু’বার চেষ্টা করল ওয়াটারবাস চালাতে। একটা-দুইটা করে ছাড়ে আবার বন্ধ করে দেয়। এখানের পরিকল্পনা একেবারে দুর্বল। খামাখাই একটু বেশি দামের ওয়াটারবাস আনে। সাধারণ নৌকার মতো থাকলেই চলে। সঙ্গে একটু ছাউনি, ইঞ্জিনচালিত হলে মানুষ চলাচল করতে পারে। এখানে দুই কোটি টাকার বাস দরকার নেই। দশ লাখ টাকার নৌযান হলেই হয়। ব্যাঙ্ককের নদীতে শত শত সাধারণ নৌবাস। নদী পারাপারের জন্য আছে, দূরে যাওয়ার জন্য আছে। বেড়ানোর জন্য আছে। এখানে আমি বলব ব্যাঙ্কক থেকে বাংলাদেশের অনেক শেখার আছে। দুটি শহর প্রায় একই রকম। আমাদেরটি চারশ’ বছরের পুরনো। ওদেরটা তিনশ’ বছরের পুরনো। দুটি শহরই সমতল। তবে ওদের অর্থনৈতিক অবস্থা অনেক ভালো। যে কারণে ওরা উন্নতমানের ট্রান্সপোর্ট গ্রহণ করতে পারে।
একটা শহর বাসযোগ্য করতে হলে একটা হলো গাড়ি-ঘোড়া যানবাহন, আরেকটা হলো ট্রাফিক ব্যবস্থা ম্যানেজমেন্ট। ভালো যোগাযোগ ক্ষেত্রে ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থাটাই আসল। এটা থাইল্যান্ডে অত্যন্ত ভালো, সুচারু এবং নিয়মের বাইরে চলা যাবে না, একেবারেই না। এক সময় ছিল থাইল্যান্ডের পুলিশ দুর্নীতির আশ্রয় নিত। মাঝে মাঝে ঘুষ নিয়ে ছেড়ে দিত। এখন নেই বললেই চলে। নিয়মের মধ্যে সবাইকে চলতে হবে। লেনের গাড়ি লেনে চলতে হবে। যেখানে-সেখানে ক্রস করা যাবে না। অটোমেটিক সিগন্যাল, টাইমার সিগন্যাল। কতক্ষণ পর সবুজ বাতি জ্বলবে তা তো দেখাই যায়। ঢাকায় সিগন্যাল বাতি থাকলেও এর ব্যবহার নেই। ব্যাঙ্ককে ট্রাফিক আইন মানতেই হবে। একেবারেই মানতে হবে। এর বিকল্প হতেই পারে না। আমি চার বছর ব্যাঙ্কক শহরে গাড়ি চালিয়েছি। আমাকে দু’বার জরিমানা দিতে হয়েছে। প্রথমবার হলো আমি ইউটার্ন নিয়েছি যেখানে ইউটার্ন নেয়ার কথা নয়। আমি বুঝতে পারিনি। পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে পুলিশ এসে বলে তুমি তো এই কাজ করেছ। আমি জরিমানা দিতে বাধ্য হলাম। আরেকবার আমি লেন চেঞ্জ করেছি শুধু। ইনার লেন থেকে মাঝখানের লেনে চলে এসেছি। আমি লেন চেইঞ্জ করেছি। আমাকে ধরেছে, জরিমানা দিতে বাধ্য হয়েছি। এর আর কোনো বিকল্প নেই।
একটা জিনিস বলা খুব দরকার বাস বা পাবলিক পরিবহনকে প্রাধান্য দিতে হবে। ব্যাঙ্ককের প্রধান সড়কের একটা লেন আছে বাসের জন্য। এখানে আর কেউ আসতে পারবে না। বাস লেন নির্দিষ্ট করে দেওয়া। ওখানে কোনো যানবাহন আসতে পারবে না। এলেও বাস আসার আগে সরে যেতে হবে। ব্যাঙ্ককের সব রাস্তাই চওড়া। তবে ব্যাঙ্ককের একেবারে কেন্দ্রে জ্যাম নেই বলব না, বলব এখানে যানবাহন খুব স্লো চলে। উল্টাপাল্টা আসার কোনো উপায় নেই। এই পথটুকু স্লো গতিতে এগোতে হবে। এটা অল্প কিছু জায়গায়। এটা তো বাস বা গাড়ির বেলায়। স্কাই ট্রেন, মেট্রো রেল কিন্তু গতিতেই থাকে। বলেছিলাম শহরের অসংখ্য খাল ওরা পরিবহনের যোগ্য করে তুলেছে। ওই পানিতে পা রাখা যাবে না। ময়লা পানি। কিন্তু যাত্রীবাহী নৌকা চলে। ইঞ্জিনচালিত নৌকা শাঁ শাঁ করে যাচ্ছে অথবা মালামাল নিয়ে যাচ্ছে। ব্যাঙ্ককে আরেকটি বিষয় নদী ও খালগুলোতে নৌকার ওপর বাজার। নৌকার ওপর ফলের বাজার, ফুলের বাজার, তরিতরকারির বাজার। এটা আমাদের এখানে হতে পারত। ব্যাঙ্ককের পরিবহনে আধুনিকায়ন হয়েছে। গণপরিবহনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশৃঙ্খলামুক্ত করা হয়েছে। কঠিন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সব যানবাহন যন্ত্রচালিত। রিকশা বলে কিছু নেই। মিক্স ট্রান্সপোর্ট বলে কিছু নেই, গতি কম আর বেশি বলে কিছু নেই। আরেকটা বিষয় পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা। ব্যাঙ্ককে পার্কিং ব্যবস্থা না থাকলে হাসপাতাল বা শপিং সেন্টার করার পারমিশনই দেবে না। শহরে রয়েছে পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা। এর বাইরে পার্কিং করার উপায় নেই।
আমাদের এখানে যে পরিকল্পনাটা হয় সেটা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয় না। আর আইন মানতে বাধ্য করতেই হবে। তা না হলে হবে না। যদি বিশৃঙ্খল হয়, আইন বহির্ভূত চলে, আইন মানানো না যায়, তাহলে কিছুতেই উন্নতি হবে না। ঢাকায় এখন খুবই বিশৃঙ্খল অবস্থা। পরিবহনের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত দুর্বল। যদিও একটা মহাপরিকল্পনা আছে স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান (এসটিপি)। এটা ২০০৬ সালে করেছিল। অনুমোদন দিয়েছিল ২০০৯ সালে। আবার সেটাকে রিভাইজ করেছে। প্রথমে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের অর্থায়নে করেছিল। পরে আবার জাইকার অর্থায়নে করেছে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে হয়তো ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি হবে। কিন্তু সে দীর্ঘ মেয়াদটা অনেক সুদূরে, কাছাকাছি হচ্ছে না। কারণ ওখানে আছে ছয়টি মেট্রোলাইন। মাথার ওপর দিয়ে অথবা পাতাল দিয়ে যাবে। বাস ট্রাফিক ট্রানজিট হবে চারটি মনে হয়। কমিউটার ট্রেন সার্ভিস হবে, ওয়াটারওয়ে হবে। কিন্তু এই হবে হবে শুনি আজকে ৯-১০ বছর। শুরু হয়েছে মাত্র একটি মেট্রো লাইনের। সেটাও এক বছরে অতি সামান্য অগ্রগতি হয়েছে। যে দক্ষতার সঙ্গে এটা পরিচালিত হচ্ছে বা অদক্ষতার সঙ্গে। তাতে ভয় হয় পাঁচ বছরে একটা লাইন শেষ হবে কি না। কিন্তু হওয়া উচিত ওই পরিকল্পনা মতে ছয়টি লাইন। তারপর এই যে দেড়-দুইশ’ বাস কোম্পানি আছে, সেটাকে একটা শৃঙ্খলার মধ্যে আনার কথা আমরা শুনি। পরিকল্পনায় এটা বলা হয়েছে। সেটা করতে পারছে না। কিছু করতে গেলেই রাজনৈতিক একটা আন্দোলন শুরু হয়। পরিবহন খাতে যারা স্বার্থসংশ্লিষ্ট তারা এমন একটা বিশৃঙ্খলা তৈরি করে সরকার ভয় পেয়ে সরে যায়। তার মানে পরিবহন খাতটা গোটা জনগণকে, শহরবাসীকে, সরকারকেও জিম্মি করে রেখেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি অদূর ভবিষ্যতে হবে বলে আমার মনে হয় না। এসটিপি এবং ঢাকা মাস্টারপ্ল্যান, রাজউক যেটা করেছে। এই দুটো যদি পাশাপাশি রেখে সরকার বা কর্তৃপক্ষ যারা আছে তারা যদি গভীর মনোনিবেশ করে, প্রশাসন বা শাসন যদি নগরশাসন ব্যবস্থার উন্নতি করতে পারে, তাহলে কিছু হবে। তা নাহলে দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগ পোহাতেই হবে ঢাকাবাসীকে।