Home মূল কাগজ নগরোদ্যান

নান্দনিক কিন্তু নির্মমতার সাক্ষী

আবুল হোসেন আসাদ
গ্লাডিয়েটরদের রক্ত, নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতা ছড়িয়ে আছে যে স্থাপত্যটির বুকের জমিনজুড়ে, অপূর্ব নির্মাণশৈলীর যে স্থাপত্যটি আজও মনুষ্যসৃষ্ট নয়নাভিরাম স্থাপত্যের এক সপ্তাশ্চর্য, তা হলো-রোমের কলোসিয়াম। রোমের শহরতলিতে অবস্থিত এটি। রোম থেকে ভ্যাটিকান পর্যন্ত যাওয়ার জন্য খোলা ছাদবিহীন ট্যুরিস্ট বাস রয়েছে অসংখ্য। এগুলোতে নির্দিষ্ট ফি’র বিনিময়ে পুরো দর্শনীয় এলাকা ভালো করে ঘুরে দেখা যায়। নির্দিষ্ট সময় পরপর বিরতি। বাস থেকে কলোসিয়ামের সামনে নামলাম। নিরাপত্তাবেষ্টনী পার হয়ে ঢুকে গেলাম কলোসিয়ামের ভেতরে। অনুভূতি-অসাধারণ। রোমের কলোসিয়ামের কথা শুনেছি, বইয়ে পড়েছি। প্রথমেই ওপরের দিকে ওঠা শুরু করলাম সিঁড়ি বেয়ে। পাথরের সিঁড়ি। একটু খাড়া। ধীরে ধীরে উঠতে থাকলাম। নতুন আবেশ। নতুন পরিবেশ। দুই চোখ মেলে দেখতে থাকি চারপাশ।
উপবৃত্তাকার ছাদবিহীন বিশাল একটি খোলা মঞ্চ এই কলোসিয়াম। ছয় একর জমির ওপর নির্মিত হয়েছে এটি। উচ্চতা প্রায় ৪৮ মিটার, দৈর্ঘ্য ১৮৮ মিটার এবং চওড়ায় ১৫৬ মিটার। প্রত্যেক তলায় ৮০টি করে তিনটি লেভেলে মোট ২৪০টি আর্চ আছে। ৮৬ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৫৪ মিটার প্রস্থের মেঝে আচ্ছাদিত কাঠ ও বালি দিয়ে। গ্লাডিয়েটরদের পশ্চাদপসরণে বাধার সৃষ্টি করত কলোসিয়ামের উপবৃত্তাকার উঁচু দেয়াল। প্রায় এক লাখ কিউবিক মিটারের বেশি ট্র্যাভারটাইন পাথর ব্যবহার করা হয়েছিল এই অ্যাম্ফিথিয়েটার নির্মাণে। ৫০ হাজার লোক একসঙ্গে বসে এখানে গ্লাডিয়েটরদের যুদ্ধ দেখতে পারত। আসন-ব্যবস্থাটি কয়েকটি ভাগে বিভক্ত ছিল। প্রথম লেভেলে তৎকালীন সিনেটররা বসতেন। সম্রাটের নিজস্ব সুসজ্জিত আনন বা মর্বেলের তৈরি বক্সটিও এই লেভেলে অবস্থিত ছিল। দ্বিতীয় লেভেলটি রোমান অভিজাত, যারা সিনেটের সদস্য ছিলেন না, তাদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। তৃতীয় লেভেলটিতে সাধারণ মানুষদের বসার ব্যবস্থা ছিল। তৃতীয় লেভেলটি আবার তিন ভাগে বিভক্ত ছিল। নিচের দিককার অংশটিতে ধনী ব্যক্তিরা বসতেন, মাঝের অংশটি মধ্যবিত্তরা বসতেন এবং উপরের অংশে কাঠ দিয়ে নির্মিত একটি কাঠামো ছিল, যেখানে দরিদ্রশ্রেণির মানুষ দাঁড়িয়ে খেলা উপভোগ করতেন। রোমান সাম্রাজ্যের সব নাগরিকের এই জায়গায় বিনামূল্যে প্রবেশাধিকার ছিল।
ভূগর্ভস্থ হাইপোজিয়াম তৈরি করা হয় নির্মাণের পরের দুই বছরে। এতে দুইতলা বিশিষ্ট ভূগর্ভস্থ খাঁচা এবং সুড়ঙ্গের মিলন ঘটানো হয় যেখানে মরণখেলা শুরুর আগে ধরে আনা বন্যপশু এবং অসহায় গ্লাডিয়েটদের রাখা হতো। খাঁচাগুলোতে চলাচলের জন্য অসংখ্য গোপন সুড়ঙ্গ-পথ ছিল। এসব সুড়ঙ্গ ছিল বিশাল আকারের। হাতির মতো বিশালাকার বন্যপ্রাণীও এ সুড়ঙ্গ-পথে চলাচল করতে পারত। কলোসিয়ামের আরেকটি দিক হচ্ছে, দর্শকদের ঠান্ডা বাতাস সরবরাহ করার জন্য এর ‘ভেলারিয়াম’ নামের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থা, যা ছিল দড়ির তৈরি ক্যানভাসের একটি আচ্ছাদন। এ আচ্ছাদনের মাঝখানে একটি ছিদ্র ছিল। আচ্ছাদনটি পুরো কলোসিয়ামের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আবৃত করত এবং বাতাস ধরে রাখার জন্য এর মধ্যখানে ঢালু রাখা হতো। বাতাস সরবরাহ সচল রাখার জন্য বিশেষ প্লাটফর্মে দাঁড়ানো পাঙ্খা-পুলাররা এই দড়ি নিয়ন্ত্রণ করত। কলোসিয়ামে অসংখ্য ভোমিটারিয়া বা প্যাসেজ ছিল, যা সারি সারি আসনের পাশ দিয়ে অবস্থিত ছিল। গ্রাউন্ড লেভেলে ৮০টি প্রবেশদ্বার ছিল। এর মধ্যে ৭৬টি ছিল সাধারণ দর্শকদের ব্যবহারের জন্য। তারা ভোমিটোরিয়াম দিয়ে নিজ আসনে পৌঁছাত। কলোসিয়াম বহু প্রাচীনকালে নির্মিত হলেও এর নির্মাণশৈলীতে রয়েছে অনন্য নিপুণতা। বর্তমান সময়ের প্রকৌশলীরা অনেক স্টেডিয়াম নির্মাণেও কলোসিয়ামের কাঠামো থেকে ধারণা নিয়ে থাকেন।
কলোসিয়াম পাথরের তৈরি। এটি মূলত শুরুতে তৈরি হয়েছিল একটি নাট্যশালা হিসেবে। ৭২ খ্রিস্টাব্দে এটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। ফেরিয়াস বংশের সম্রাট ভেসপাসিয়ান এটি নির্মাণ করেন। ভেসপাসিয়ানের মৃত্যুর পর নির্মাণকাজ শেষ করেন তার পুত্র টাইটাস। ধারণা করা হয়, ৭০ খ্রিস্টাব্দের দিকে ইহুদি বিদ্রোহের পর যুদ্ধবন্দি ইহুদি দাসদের দিয়ে এই কলোসিয়ামটি নির্মিত হয়েছে। ১০ বছর ধরে ৬০ হাজার ইহুদি দাসকে কাজে লাগিয়ে ৮০ খ্রিস্টাব্দে কলোসিয়ামের নির্মাণকাজ শেষ করেন টাইটাস। তিনি এটিকে অফিসিয়ালি ‘ফ্ল্যাভিয়ান অ্যাম্পিথিয়েটারিয়াম (গ্যালারি)’ নাম দিয়ে জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। একদম শুরুতে এটি খেলাধুলার জন্য ব্যবহৃত হতো এবং নাট্যশালার জন্য ব্যবহৃত হতো। কলোসিয়ামে নিয়মিত হতো পশুর লড়াই আর এগুলোর করুণ মৃত্যু দেখতে দেখতে একঘেয়েমি বোধ করেন সম্রাট টাইটাস। তাই পরিশেষে পশুর পরিবর্তে মানুষে-মানুষে লড়াইয়ের হিংস্র আর অমানবিক চিন্তা মাথায় আসে তার। এরপর থেকে শুরু হয় মানুষে-মানুষে, মানুষ-হিংস্র পশুতে জীবন-মরণের লড়াই আর মৃত্যুর করুণ ও বীভৎস কাহিনি। মল্লযুদ্ধ দিয়েই শুরু হয় গ্লাডিয়েটরদের খেলা এবং এই মল্লযুদ্ধের জন্য একজন আরেকজনকে কাঠের তরবারি দিয়ে আঘাত করতে থাকে। ‘গ্লাডিয়াস’ অর্থ খাটো তরবারি। এ তরবারি দিয়ে লড়াইকারীদের বলা হতো-গ্লাডিয়েটর। প্রথমদিকে যুদ্ধবন্দিদের দিয়েই লড়াই শুরু। এ লড়াই দুজনের মধ্যে চলত ততক্ষণ, যতক্ষণ-না একজনের মৃত্যু হতো। পরে প্রচলন হয় গ্লাডিয়েটরদের লড়াই। লড়াই চলাকালে কোনো এক গ্লাডিয়েটর আহত হয়ে পড়ে গেলে উল্লাসে ফেটে পড়ত পুরো কলোসিয়াম। মৃত্যুভয়ে ভীত, ক্ষত-বিক্ষত গ্লাডিয়েটর রেওয়াজ অনুযায়ী হাত তুলে সম্রাটের কাছে করুণা প্রার্থনা করত, প্রাণভিক্ষা চাইত। মঞ্জুর করা না-করা সম্পূর্ণ সম্রাটের মেজাজের ওপর নির্ভর করত। সম্রাট ক্ষমা করলে সে যাত্রায় বেঁচে যেত পরাজিত গ্লাডিয়েটর, আর না করলে নিশ্চিত মৃত্যু। অনেক সময় রোমান মহিলারা নামকরা গ্লাডিয়েটরদের প্রেমে পড়ে গৃহত্যাগও করতেন।
রোম থেকে রোমানরা চলে গেছে অনেক বছর আগে। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রয়ে গেছে আজও এই কলোসিয়াম। রোমান সাম্রাজ্যের সূতিকাগার ছিল এই রোম। নিরোর বাঁশি, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির স্মৃতিবিজড়িত ইতালি আর এই রোম। ইতালির এই রোম নগরীর কেন্দ্রবিন্দুতে নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতা, রক্ত, আর্তনাদ ও জীবন সংশয়ের অভিশাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কলোসিয়াম। কলোসিয়ামের মূল স্থাপত্যের দুই-তৃতীয়াংশই ধ্বংস হয়ে গেছে। এই কলোসিয়ামের মাটিতে মিশে আছে সেই সময়ের গ্লাডিয়েটরদের রক্ত। অজস্র বন্যপ্রাণীর করুণ মৃত্যু ও রক্ত। কলোসিয়ামের দেয়ালে কান পাতলে আজও বুঝি শোনা যায় সেই ভয়াবহতা ও নিষ্ঠুরতার শব্দ! তারপরও কলোসিয়াম আজও পৃথিবীর অন্যতম জনপ্রিয় একটি ট্যুরিস্ট-স্পট। ১৯৯০ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী অঞ্চলের স্বীকৃতি দেয় কলোসিয়ামকে। এটি পৃথিবীতে মনুষ্যসৃষ্ট আধুনিক সপ্তাশ্চর্যগুলোর একটি বলে নির্বাচিত হয় ২০০৭ সালে। কলোসিয়াম প্রাচীন স্থাপত্যশিল্পের এক অসাধারণ নিদর্শন, যা একই সঙ্গে রোমানদের হিংস্রতা আর নির্মাণশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন হয়ে টিকে আছে শত শত বছর ধরে।

লেখক : সাইক্লিস্ট ও সাইকেলে বিশ্বভ্রমণকারী

কারিকা প্রতিবেদক
সিডনির বিখ্যাত অপেরা হাউসের আদলে রাজধানীর হাতিরঝিলে নির্মিত হবে ‘ঢাকা অপেরা’। অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহরের অপেরা হাউসের মতোই মনোমুগ্ধকর বিনোদন আর সৌন্দর্য উপভোগ করা যাবে হাতিরঝিলে।
১০ একর জায়গার ওপর নির্মিত এ প্রকল্পটি হবে আন্তর্জাতিকমানের বিনোদন ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় এ নিয়ে কাজ শুরু করেছে শিল্পকলা একাডেমি। প্রকল্পের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে হাতিরঝিলের ওপর ভাসমান উন্মুক্ত মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। এখানে একই সঙ্গে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পারবেন দর্শকরা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজ করছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সহায়তায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর অপেরা হাউসের অবকাঠামো নির্মাণ করছে। এখানে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা যাবে। ছাদখোলা মুক্তমঞ্চের কাছেই ১০ তলা অত্যাধুনিক গাড়ি পার্কিং ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এ ভবনে গাড়ি পার্কিংয়ের সুবিধা ছাড়াও একটি সম্মেলন কক্ষ থাকবে। এতে থাকবে হাতিরঝিলের ইতিহাস-সংক্রান্ত জাদুঘর, রেস্টুরেন্ট ও অন্যান্য সুবিধা।
সূত্র জানায়, ৯ দশমিক ৪৭৭ একর জমির ওপর নির্মিত হবে হাতিরঝিল সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। প্রায় ৪ লাখ বর্গফুট জায়গার ওপর এ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রণয়নের জন্য ইতোমধ্যে একাধিক দেশি-বিদেশি স্থপতি কাজ করছেন। এতে ৩ থেকে ৫ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতাসম্পন্ন মূল মিলনায়তন থাকবে। এ ছাড়াও থাকবে আরও দুটি মিনি মিলনায়তন। যে দুটির ধারণক্ষমতা হবে ৩০০ থেকে ৫০০ দর্শকের। ঝড়বৃষ্টি বা রোদ থেকে রক্ষার জন্য উন্মুক্ত মঞ্চের ওপরে ছাউনি থাকবে। যার ফলে সারা বছর দিন-রাত এখানে বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান করা যাবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা। প্রকল্প-এলাকায় থাকবে একটি বিশেষ স্যুভিনিয়র শপ। যেখানে বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির নানা ধরনের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্য প্রদর্শনীর জন্য তুলে ধরা হবে। এখানে সমকালীন বিভিন্ন চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর ব্যবস্থা থাকবে। এ ছাড়া নতুন শিল্পীদের জন্য প্রশিক্ষণ একাডেমিও গড়ে তোলা হবে ঢাকা অপেরা হিসেবে নির্মিত হাতিরঝিল সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে।
গত ১ জুলাই ২৩তম জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংস্কৃৃতি প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ বলেন, ‘হাতিরঝিলে ১০টি মিলনায়তনসমৃদ্ধ ঢাকা অপেরা হাউস নির্মাণ করা হবে। এটি হবে শিল্পের বিকাশে এই সরকারের আমলে আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন। শিল্পের সব ধরনের শাখায় বিচরণের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা সেখানে থাকবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকা অপেরা হাউসের ডিজাইন ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিজাইনটি দেখেছেন। চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য শিগগিরই আমরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করব। তিনি অনুমোদন দিলেই আমরা কাজ শুরু করব। সংস্কৃতির সব শাখাকে সঙ্গে নিয়েই হাতিরঝিলে নির্মিতব্য ঢাকা অপেরা হাউসকে কেন্দ্র করে একটি সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে তুলতে চায় সরকার।’

বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় বিপাকে চট্টগ্রামবাসী

আবদুল্লাহ আল মামুন

বন্দর সংযোগ-সড়ক বা পিসি রোড। চট্টগ্রাম নগরের এ সড়কটির অধিকাংশজুড়ে কার্পেটিংয়ের কোনো চিহ্ন নেই। সড়কজুড়ে তৈরি হয়েছে ছোট-বড় গর্ত। গাড়ি উল্টে ঘটছে দুর্ঘটনা। গর্তে পড়ে গাড়ি বিকল হয়ে তৈরি হচ্ছে যানজট। অথচ চট্টগ্রাম বন্দরের অধিকাংশ ট্রাক ও লরি চলাচল করে এ সড়ক দিয়ে। শুধু পিসি রোড নয়, টানা বর্ষণ ও জলাবদ্ধতায় বেহাল দশা নগরের অধিকাংশ সড়কের। গত নয় অর্থবছরে এসব সড়কের সংস্কার ও উন্নয়নে সিটি করপোরেশন ব্যয় করেছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। এর পরও এ বর্ষায়ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নগরের ২০০ কিলোমিটার সড়ক। তবে বিশেষজ্ঞদের দাবি, নিম্নমানের কাজ ও পানি নিষ্কাশন-ব্যবস্থা ঠিক না থাকায় প্রতিবছর বর্ষায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়ে নগরের সড়কগুলো।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, ‘টানা বর্ষণে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম নগরের সড়কগুলো। সৃষ্টি হয়েছে ছোট-বড় খানাখন্দ। এসব সড়ক মেরামতের জন্য করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগ অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। কিন্তু অতিবৃষ্টি ও থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলোর মেরামতের কাজে বিঘ্ন ঘটছে। সময়ও বেশি লাগছে।’ নগরবাসীর সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন মেয়র।
সরেজমিন নগরের সড়কগুলো ঘুরে দেখা যায়, টাইগারপাস থেকে কদমতলী মোড়-এ সড়কের সিআরবি এলাকায় তৈরি হয়েছে বড় গভীর গর্ত। সিএনজি অটোরিকশা আটকে বিকল হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া কদমতলী সিআরবি সড়কেরও একই দশা। নগরের অক্সিজেন মোড়ে বৃষ্টিতে তৈরি হওয়া গর্তে আটকে গেছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা। তা তুলতে গলদঘর্ম হতে হয় চালককে। ওই মোড়ে সড়কের কার্পেটিং উঠে গেছে। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে (অক্সিজেন-কুয়াইশ সংযোগ সড়ক) সড়কের দুই পাশে কোনো কার্পেটিং নেই। পুরো সড়ক খানা-খন্দকে ভরা। অটোরিকশাচালক রহিম উল্লাহ বলেন, ‘এক বছর ধরে সড়ক ভেঙে গেছে। এবারের বৃষ্টিতে ভাঙা সড়ক ডোবায় পরিণত হয়েছে। বৃষ্টি হলে গাড়ি চালানো যায় না।’
জাকির হোসেন সড়কের ওয়্যারলেস মোড় ও খুলশী এলাকায় তৈরি হয়েছে ছোট-বড় গর্ত। একই চিত্র নগরের আমবাগান সড়কেও। উন্নয়নকাজ চলমান থাকা পিসি রোড ও আগ্রাবাদ এক্সেস রোডে তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে যানবাহন। বিমানবন্দর সড়কের সিমেন্ট-ক্রসিং ও সল্টগোলা এলাকায়ও তৈরি হয়েছে গর্ত। দীর্ঘদিন ধরে চলাচল-অনুপযোগী হয়ে পড়ে আছে আরাকান সড়কের একাংশ। শাহ আমানত সেতু সংযোগ-সড়কেও তৈরি হয়েছে একাধিক গর্ত।
সিটি করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, নগরের মোট সড়কের পরিমাণ ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার। প্রতিবছর বর্ষায় এসব সড়কের একাংশ ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়ে। দুর্বিষহ হয়ে পড়ে নাগরিক জীবন। নগরের সড়কগুলো রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নে গত অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৫০০ কোটি টাকার বেশি। মূলত নগরের ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো সংস্কারের পাশাপাশি পুরনো সড়ক নতুন করে নির্মাণ করা হয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ব্যয় হয়েছিল ৪২০ কোটি টাকা। এ ছাড়া ২০১৩-১৪ অর্থবছর থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত চারটি অর্থবছরে সড়কের রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নে ব্যয় হয়েছে ৫০১ কোটি টাকা। ওই সময়ে মেরামত করা হয়েছিল ৩৭৭ কিলোমিটার সড়ক। এত ব্যয়ের পরও টেকসই হচ্ছে না নগরের সড়কগুলো।
এ প্রসঙ্গে পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহসভাপতি ও সড়ক-পরিবহন বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া বলেন, ‘নগরের সড়কগুলোর সংস্কার ও উন্নয়নে কাজ গুনগত হয় না। আবার যে কাজ হয় তাতে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় না। নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার তো আছেই। ফলে সংস্কারের বছরখানেকের মধ্যেই রাস্তা ভেঙে যাচ্ছে।’
প্রতি বর্ষায় সড়ক নষ্ট হয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া বলেন, ‘বৃষ্টি তো শুধু চট্টগ্রামে হচ্ছে না। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও হয়। কিন্তু কোথাও তো সংস্কারের এক বছরের মধ্যে সড়ক নষ্ট হয়ে যায় না। তাহলে এখানে কেন নষ্ট হয়। ঠিকভাবে কাজ করলে একটি সড়ক অন্তত ৫ থেকে ৭ বছর অক্ষত থাকার কথা। সড়ক কেন খারাপ হচ্ছে, এ জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় অবশ্যই আনতে হবে। না হলে প্রতি বছর টাকা খরচ হবে। কিন্তু দুর্ভোগ থেকে যাবে।’
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সংস্কারের পরও সড়ক ভেঙে যাওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কারণ দায়ী। পানির পাইপ স্থাপনে দীর্ঘদিন ধরে ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়ি, নগরে পণ্যবাহী ভারী যানবাহন চলাচল, জলাবদ্ধতাসহ বিভিন্ন কারণে সংষ্কারের পরও সড়কগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাই সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং বিআরটিএ ও ট্রাফিক বিভাগের কার্যকর ভূমিকা ছাড়া এই অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।’

রাজধানীর তিন সড়কে রিকশা বন্ধের উদ্যোগ

কারিকা প্রতিবেদক
জুনের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) বৈঠকে ‘ঢাকা মহানগরীর অবৈধ যানবাহন দূর/বন্ধ, ফুটপাত দখলমুক্ত ও অবৈধ পার্কিং বন্ধে’ একটি কমিটি গঠন করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। কমিটিকে দুই মাসের মধ্যে সড়কে শৃঙ্খলা আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি। সে অনুযায়ী গত ৭ জুলাই থেকে তিন সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধের নির্দেশ দেন কমিটির আহবায়ক ডিএসসিসির মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। মেয়রের নির্দেশের পর গাবতলী থেকে আজিমপুর অর্থাৎ মিরপুর রোড ও সায়েন্স ল্যাব থেকে শাহবাগ পর্যন্ত এবং প্রগতি সরণির কুড়িল থেকে বাড্ডা, রামপুরা, খিলগাঁও হয়ে সায়েদাবাদ পর্যন্ত সড়কে রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়। রাজধানীর তিন সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধের প্রতিবাদে ৮ ও ৯ জুলাই কয়েক হাজার রিকশাচালক ও মালিক সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কুড়িল, বাড্ডা, রামপুরা ও মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার বিভিন্ন স্থানে রাস্তায় জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে একনেকের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রিকশার জন্য আলাদা লেন তৈরির নির্দেশ দিলে অবরোধ তুলে নেন তারা। এর আগে রিকশা-শ্রমিকদের অবরোধ চলাকালীন ডিএসসিসির মেয়র সাঈদ খোকন নগর ভবনে তাদের চায়ের দাওয়াত দিলেও কাঙ্খিত সাড়া মেলেনি।
রাজধানীর তিন সড়কে রিকশা বন্ধের পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি-তর্কে সরগরম হয়ে উঠেছিল সোশ্যাল মিডিয়া, বিশেষ করে ফেসবুক। রাজধানীর যানজট কমাতে রিকশা বন্ধের সিদ্ধান্ত কতটুকু কাজে আসবে-এ নিয়ে সংশয় আছে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মনে। যাত্রী-রিকশাচালক উভয়ের জন্য বিকল্প যাতায়াত ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে রিকশা বন্ধের আহবান জানান বেশিরভাগ ফেসবুক ব্যবহারকারী।
দ্রুতগামী সড়কে রিকশার মতো অযান্ত্রিক যান যে যানবাহনের গতি কমিয়ে দেয়, সে বিষয়ে কারো দ্বিমত নেই। তবে রিকশা বন্ধের আগে সংশ্লিষ্ট সড়কগুলোতে পর্যাপ্ত গণপরিবহনের ব্যবস্থা করার আহবান জানান ভুক্তভোগীরা।
এদিকে স্বল্প দূরত্বের পথ পায়ে হেঁটে চলতে নগরবাসীর প্রতি আহবান জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। তিনি বলেছেন, ‘এতে স্বাস্থ্য ভালো থাকবে।’ রাজধানী ঢাকার তিনটি সড়কে রিকশা বন্ধের প্রসঙ্গে সাঈদ খোকন বলেন, ‘যানজটের অন্যতম একটি কারণ রিকশা। পৃথিবীর কোনো শহরে এত রিকশা নেই। আপাতত দুটি সড়কে রিকশা বন্ধ করা হয়েছে। রিকশা যেভাবে চালানো হয়-এটা অমানবিক। দু-তিনজন রিকশায় ওঠে আর সেটা চালিয়ে নিয়ে যান একজন চালক। এভাবে চলতে পারে না। রিকশা-চালকরা অন্য কাজ করতে পারেন।’
মেয়র বলেন, ‘আমরা রিকশায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। মাত্র ৫০০ গজ দূরত্বের জন্য রিকশায় বসে পড়ি। রাইড শেয়ারিং পরিবহন চলছে। উবার চলছে, পাঠাও চলছে। ধীরে ধীরে রিকশাটাকে ছেড়ে দিতে পারি। এজন্য আমরা সার্কুলার বাস চালু করছি।’
রিকশা বন্ধের সিদ্ধান্তে নাগরিক এবং যাত্রীদের সাময়িক কিছু অসুবিধা হতে পারে বলে স্বীকার করেছেন ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম। ৬ জুলাই নগর ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে আতিক বলেন, ‘দীর্ঘস্থায়ী সুবিধার জন্য সাময়িক অসুবিধা মেনে নিতে হবে। হয়তো কারও কিছু অসুবিধা হবে। বড় কিছু পেতে গেলে আমাদের অবশ্যই কিছু বিষয়ে ছাড় দিতেই হবে।’

কার-ফ্রি সড়ক নিয়ে ভাবছে উত্তর সিটি করপোরেশন
ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতাধীন এলাকার নির্দিষ্ট কিছু স্থানে যানবাহন-ফ্রি তথা যানবাহনমুক্ত সড়ক নিয়ে ভাবছে ডিএনসিসি। কার-ফ্রি সেসব সড়ক উন্মুক্ত থাকবে শিশু-কিশোরদের জন্য। শিশুদের শারীরিক ও মেধাবিকাশের প্রয়োজনে খেলাধুলার পরিবেশ দিতে এই উদ্যোগ সহায়ক হবে বলে আশা বিশেষজ্ঞদের। গত ২ জুলাই রাজধানীর গুলশানে ডিএনসিসি কার্যালয়ে এক কর্মশালায় উদ্যোগের সম্ভাব্যতা নিয়ে আলোচনা করেন নগর-পরিকল্পনাবিদ ও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা। নগরীর সৌন্দর্যবর্ধন ও নগর-পরিকল্পনা নিয়ে এ কর্মশালার আয়োজন করা হয়। ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে ডিএনসিসির বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তারা এ কর্মশালায় অংশ নেন।
কর্মশালায় প্রধান বিশেষজ্ঞ হিসেবে নগর-পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। এ-সময় নগর-বিশেষজ্ঞরা জানান, পরীক্ষামূলকভাবে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে মাসের প্রথম শুক্রবার কার-ফ্রি ডে হিসেবে পালন করা হচ্ছে। এভাবে রাজধানীর অন্য এলাকায়ও সপ্তাহের বা মাসের নির্দিষ্ট কিছু দিনে কার-ফ্রি ডের আয়োজন করা যেতে পারে।
নগর-পরিকল্পনাবিদরা বলেন, শহরে শিশুদের জন্য খেলার মাঠ বা অন্য স্থানের অনেক অভাব। যেগুলো আছে, বেশিরভাগই আবার সংস্কারের অভাবে খেলাধুলার অযোগ্য। যানবাহনের ভয়ে শিশুরা বাসার নিচের সড়কেও হাঁটাচলা করতে পারে না। এমন সমস্যার সমাধানে কার-ফ্রি ডে দারুণ এক সমাধান হতে পারে বলে আশা বিশেষজ্ঞদের।
কর্মশালায় ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘সিটি করপোরেশন তার দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট রয়েছে। তবে নগরবাসীকেও সুনাগরিক হতে হবে। একজন সুনাগরিক যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলতে পারেন না; একজন সুনাগরিক ফুটওভার ব্রিজ দিয়ে রাস্তা পার হবেন; ট্রাফিক আইন মেনে চলবেন। শিশুদের বিকাশে তাদের খেলাধুলার সুযোগ দিতে হবে। তারা তাদের মতো অবাধ বিচরণ করবে-কোনো ধরনের ভয় ছাড়া। তাদের সেই পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের সবার।’

কারিকা প্রতিবেদক
নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে রাজধানীর পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলো। রাতের অন্ধকারে ভেঙে ফেলা হচ্ছে এসব স্থাপনা। সম্প্রতি পুরান ঢাকার জাহাজ বাড়ি ভেঙে ফেলায় এই শঙ্কা আরও বেড়েছে। উচ্চ আদালত এসব ভবনের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করে সেটা রক্ষণাবেক্ষণের নির্দেশ দেওয়ার পরও সেই আদেশ মানছে না দায়িত্বশীল কেউ।
রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকমতো কাজ করছে না বলে অভিযোগ করেছে হেরিটেজ স্থাপনা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো। তাদের দাবি, অতিদ্রুত নিরাপত্তা না বাড়ালে প্রভাবশালীদের ‘আক্রমণে’ হারিয়ে যাবে পুরান ঢাকার সব ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা।
ঈদের আগের দিন রাতে পুরান ঢাকার চক সার্কুলার রোডের ‘জাহাজ বাড়ি’ ভেঙে ফেলা হয়। ভবনটি ভাঙার সময় আরবার স্টাডি গ্রুপের প্রধান নির্বাহী তাইমুর ইসলাম চকবাজার থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। তখন পুলিশ গিয়ে ভবনটি ভাঙার কাজ বন্ধ করে দিলেও শেষ পর্যন্ত বাড়িটি রক্ষা করা যায়নি। পুলিশও এর সঙ্গে জড়িত কাউকে আটক করেনি।
এর আগে সূত্রাপুর থানা ভবনসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বেশ কয়েকটি হেরিটেজ বাড়ি ভাঙা শুরু হলে পুলিশের সহযোগিতায় তা বন্ধ করা হয়। কিন্তু জাহাজ বাড়ি রক্ষা করতে না পারায় সংশ্লিষ্টদের মনে শঙ্কা বেড়েছে।
২০০৯ সালের ২ ফ্রেরুয়ারী পুরান ঢাকার চারটি অঞ্চলকে ঢাকার ঐতিহ্য বা হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করে রাজউক। গেজেটে ৯৩টি স্থাপনা ও ১৩টি সড়ককে ঐতিহ্যবাহী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ২০১৭ সালে হেরিটেজের সংখ্যা ৭৫টিতে নামিয়ে আনা হয়। ১৩টি সড়কও তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।
রাজউকের তালিকাকে ক্রুটিপূর্ণ দাবি করে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা নিয়ে কাজ করা আরবান স্টাডি গ্রুপ। ২০০৪ সালে নিজেদের উদ্যোগে ঢাকার প্রায় ২ হাজার ৭০০ ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার তালিকা তৈরি করে সংগঠনটি। এর মধ্যে গ্রেড-১ ও ২-এ ২ হাজার ২০০ ভবন রয়েছে। এই তালিকা রাজউক, সিটি করপোরেশন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরে জমা দিয়ে কোনও লাভ হয়নি। পরে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সংরক্ষণের দাবিতে ২০১২ সালে উচ্চ আদালতে রিট করে আরবান স্টাডি গ্রুপ।
রিটের রায়ে আদালত বলেন, কোন কোন ভবন ঐতিহ্যবাহী ও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন তার তালিকা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত আরবান স্টাডি গ্রুপের খসড়া তালিকাভুক্ত ভবনে কোনো প্রকার পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করা যাবে না। তালিকাভুক্ত এসব বাড়ি বা স্থাপনা নির্মাণের নকশা অনুমোদন না দিতে রাজউককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তালিকাভুক্ত এসব স্থাপনা যথাযথ আছে কিনা তা পরীক্ষার জন্য একটি উপদেষ্টা কমিটি করতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওই কমিটিকে তিন মাস পরপর কাজের অগ্রগতি প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে হবে। ওই তালিকায় গ্রেড-১-এ জাহাজ বাড়িটিও অন্তর্ভুক্ত আছে।
খোদ রাজধানীতে জাহাজ বাড়ির মতো ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়া প্রসঙ্গে স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সবসময় ঐতিহ্য এবং হেরিটেজ সংরক্ষণের প্রতি দরদী হওয়ার কথা বলে আসছে। তারপরও জাহাজ বাড়ির মতো ঐতিহ্যবাহী ভবন ভেঙে দেয়ার মতো ঘটনা প্রমাণ করছে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সংরক্ষণে সিরিয়াস না।
জাহাজ বাড়ি ভাঙা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আরবান স্টাডি গ্রুপের প্রধান নির্বাহী তাইমুর ইসলাম বলেন, ‘এটা স্পষ্ট, ঐতিহ্যবাহী ভবনগুলো নিয়ে এখন প্রভাবশালীরা অঘোষিত যুদ্ধই ঘোষণা করেছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর, রাজউক ও পুলিশ কেউ আদালতের আদেশ মানছে না। ভবনগুলো ভাঙার ক্ষেত্রে দস্যুদের মতো আচরণ করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘শঙ্কায় আছি যেভাবে ভবনগুলো ভাঙা হচ্ছে, তাতে ঐতিহ্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে যাবে। আর রাজউক যে গেজেট করেছে, প্রত্নতত্ত্ব আইন অনুযায়ী সেটা তারা করতে পারে না।’
জানা গেছে, উনিশ শতকের মাঝামাঝিতে নির্মিত এই ভবনটি ঢাকার প্রথম বাণিজ্যিক ভবন হিসেবে বিবেচিত হতো। ওই ভবনের বিভিন্ন দোকানের ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভবনটি ওয়াকফ এস্টেট হিসেবে ছিল। তারা নিয়মিত ওয়াকফ প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রতিনিধিকে ভাড়া দিয়ে আসছিলেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘জাহাজ বাড়ি’ ভবনটি তৈরি করা হয়েছে আনুমানিক ১৮৭০ সালে। ভবনের মালিক ১৯২০ সালে বদু হাজির নামে ওয়াকফ সম্পত্তি করে দিয়ে যান। বদু হাজির মৃত্যুর পর তার বড় সন্তান ফেকু হাজি ভবনটির দায়িত্বে ছিলেন। ফেকু হাজির মৃত্যুর পর তার বড় ছেলে হাজি আবদুল হক ভাঙার আগ পর্যন্ত ভবনটি তত্ত্ববধায়ন করছিলেন।
তিনতলা ‘জাহাজ বাড়ি’র দোতলায় নকশা করা রেলিং, ছাদওয়ালা টানা বারান্দা ছিল। আর অবয়বজুড়ে ছিল নানা রকম কারুকাজসমৃদ্ধ। কোনাকৃতি আর্চের সারি, কারুকাজ করা কার্নিশ। কলামে ব্যবহার করা হয়েছে আয়নিক ও করিন্থিয়ান ক্যাপিটাল। ভবনের পশ্চিম প্রান্তে আর্চ ও কলামের সঙ্গেও নানা রকম অলংকরণের ব্যবহার দেখা যায়। সব মিলিয়ে এই ভবনটিতে যে ধরনের অলংকরণের ব্যবহার রয়েছে, তা একে এক অনন্য মাত্রা দিয়েছে। এই ধরনের অলংকরণ পুরান ঢাকায় আর কোনো ভবনে দেখা যায় না। সেদিক থেকে এর নান্দনিক গুরুত্বের জন্যই ভবনটি সংরক্ষণ করার প্রয়োজন ছিল বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

মিলছে না পাঁচ হাজার কোটি টাকার চলমান প্রকল্পের সুফল

আবদুল্লাহ আল মামুন

১৫ জুন। দুপুর দেড়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম নগরে বৃষ্টি হয় ২২ মিলিমিটার। আষাঢ়ের প্রথম বর্ষণে ডুবে যায় নগরের একাংশ। কোথাও হাঁটু-পানি, কোথাও আবার কোমর-পানি। বর্ষার ভারি বর্ষণে কী হবে-তা নিয়ে শঙ্কায় নগরবাসী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও এবারও জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে রেহাই মিলছে না নগরবাসীর। তবে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলছেন, খাল ও নালা-নর্দমা খনন করায় বৃষ্টি হলে পানি আগের মতো জমবে না।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন বিগ্রেডের সদর দপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভীর মাজহার সিদ্দিকী সাংবাদিকদের বলেন, ‘নগরের খালগুলোর যে প্রশস্ততা থাকার কথা-তা নেই। বিভিন্ন জায়গায় খালের জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এতে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। অবৈধ স্থাপনা থাকলে প্রকল্প বাস্তবায়নের সুফল পাওয়া যাবে না।’
শিগগিরই খালের জায়গা দখল করে গড়ে ওঠা সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে বলেও জানানো হয়।
জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের অতিরিক্ত প্রকল্প-পরিচালক ও সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু সাদাত মোহাম্মদ তানভীর বলেন, ‘নগরে পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকার কারণে ভারী বর্ষণের পরপরই সড়কে পানি জমে যায়। তবে প্রকল্পের কাজ শুরুর আগে যেখানে এক-দুদিন পানি জমে থাকত, এখন দেড়-দুই ঘণ্টার মধ্যে পানি নেমে যাচ্ছে। আগামী দিনেও এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যে পানি নেমে যাবে।’
জলাবদ্ধতা-সমস্যা নিরসনে বিভিন্ন পদক্ষেপের পাশাপাশি স্থানীয় কাউন্সিলরসহ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের আগস্টে ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে সিডিএর ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’শীর্ষক একটি প্রকল্পের অনুমোদন দেয় একনেক। অনুমোদনের পৌনে দুই বছর পার হলেও এখনো পর্যন্ত নগরবাসীকে আশার আলো দেখাতে পারছে না সিডিএ।
প্রকল্প অনুমোদনের প্রায় আট মাস পর গত বছরের এপ্রিলে খাল ও নালা-নর্দমার খননকাজ শুরু হয়। প্রকল্পের অধীনে ৩৬টি খাল খননের কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ১৩টি খাল খনন হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ আছে মাত্র এক বছর। কিন্তু প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ১৫ শতাংশ। এই সময়ে ব্যয় হয়েছে ৪১৮ কোটি টাকা। আগামী বছরের জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে।
আষাঢ়ের প্রথম বর্ষণে নগরের চকবাজার, প্রবর্তক মোড়, জিইসি মোড়, ষোলশহর দুই নম্বর গেইট, মুরাদপুর মোড়, আগ্রাবাদ, হালিশহর, খুলশী, ওয়ারলেস মোড়, বহদ্দারহাট, বাদুরতলা, শুলকবহর, কাতালগঞ্জ, বাকলিয়া, ষোলশহর আল ফালাহ গলিসহ বিভিন্ন এলাকা হাঁটু থেকে কোমর-পানিতে তলিয়ে যায়।
গত ২৪ মে রাতে ১৫ মিলিমিটারের অল্প বৃষ্টিতেই চট্টগ্রাম নগরের প্রবর্তক মোড়, দুই নম্বর গেট, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, চকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু পরিমাণ পানি জমে যায়। এর আগে, গত ২ এপ্রিল রাতে বৃষ্টিতে নগরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বর্ষা মৌসুমের আগেই জলাবদ্ধতা হওয়ায় পরদিন ৩ এপ্রিল নগর ভবনে জরুরি বৈঠকে বসেন সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলররা। ওই বৈঠকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীর গতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা।
প্রকল্প-সূত্র জানায়, প্রকল্পের অধীনে ৩৬টি খাল খনন করা হবে। তিন পর্যায়ে নগরের খালগুলো খনন ও সংস্কার করা হচ্ছে। প্রথম দফায় গুরুত্ব অনুযায়ী ১৬টি আবর্জনা পরিষ্কার কাজ চলছে। এর মধ্যে রয়েছে মহেশখাল, বির্জা খাল, ডোমখালী খাল, চাক্তাই খাল, খন্দকিয়া খাল, রাজাখালী খাল, চাক্তাই সংযোগ খাল, মহেশখালী খাল, মির্জাখাল, নোয়াখাল, ফিরিঙ্গীবাজার খাল, কলাবাগিচা খাল, সদরঘাট খাল, নাছির খাল, বামনশাহী খাল ও হিজরা খাল। গত বছর খালগুলো থেকে ১ কোটি ২৫ লাখ ৮৮ হাজার ঘনফুট এবং চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ৪২ লাখ ঘনফুট মাটি উত্তোলন করা হয়েছে। বাকি খালগুলো থেকে পরবর্তী পর্যায়ে মাটি উত্তোলন করা হবে।
তবে সরেজমিন চাক্তাইখাল ঘুরে দেখা গেছে, খালটি খনন করা হয়েছে দাবি করা হলেও খালটির অধিকাংশ এলাকাই আবর্জনায় ভরাট হয়ে আছে। খালটির চকবাজার ধুনিরপুল এলাকায় আবর্জনার স্তরের ওপর হেঁটে পার হচ্ছে শিশুরা। একই অবস্থা খালটির মিয়াখান নগর ব্রিজ ও কোরবানিগঞ্জ এলাকায়ও।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক কাউন্সিলর মো. জামাল হোসেন বলেন, ‘প্রতিবছর বর্ষায় জলাবদ্ধতার কারণে খাতুনগঞ্জ-চাক্তাইয়ের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হাজার কোটি টাকার পণ্য নষ্ট হয়ে যায়। এবারও জলাবদ্ধতার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। কারণ চাক্তাইখালের অনেক জায়গা আবর্জনায় ভরাট হয়ে আছে। বর্ষা চলে এসেছে অথচ এখনো এসব আবর্জনা অপসারণ করা হয়নি।’
ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশের (আইইবি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান দেলোয়ার মজুমদার বলেন, ‘সিডিএ অপরিকল্পিতভাবে প্রকল্প নেওয়ার কারণে দৃশ্যমান কোনো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। গত বছর প্রকল্পের কাজ শুরুর সময় সিডিএর তৎকালীন চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম বলেছিলেন, ‘‘আগামী (২০১৯ সাল) বর্ষাতেই নগরবাসী সুফল পাবেন।’’ কিন্তু এবার কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। সামনের দিনগুলোতেও সুফল পাওয়ার দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে না। জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজে সিডিএর পূর্ব-অভিজ্ঞতা না থাকায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।’

চট্টগ্রাম নগরে জলাবদ্ধতার ১২ কারণ
চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০১৮ সালের এপ্রিল থেকে কাজ শুরু করে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। কাজ করতে গিয়ে জলাবদ্ধতার অন্তত ১২টি কারণ চিহ্নিত করেছে তারা। গত ৪ মে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় কারণগুলো উপস্থাপন করা হয়। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-নগরের খালগুলো অবৈধভাবে দখল হয়ে যাওয়া, পরিষ্কারের পরও নিয়মিতভাবে খালে ময়লা ফেলা, কর্ণফুলী নদী ও সাগরের সঙ্গে যুক্ত খালগুলোর মুখে জোয়ার প্রতিরোধক (টাইডাল রেগুলেটর) ফটকের স্বল্পতা, সেবা সংস্থাগুলোর পাইপের জন্য পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া, খাল ও নালা-নর্দমার মধ্যে সংযোগে ক্রুটি থাকা, বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য পর্যাপ্ত ড্রেনেজ-ব্যবস্থা না থাকা, সঠিক বর্জ্যব্যবস্থাপনা অনুসরণ না করা, ইমারত-বিধি না মেনে ভবন নির্মাণ ও জমির অপব্যবহার, অপরিকল্পিতভাবে বন উজাড় এবং পাহাড় কাটা, বালুর ফাঁদ (সিল্ট ট্র্যাপ) কার্যকর না থাকা ও শিল্পকারখানার বর্জ্য অনিয়ন্ত্রিতভাবে নিষ্কাশন করা। এসব কারণে ভারী বর্ষণের পর নগরের পানি নালা-নর্দমা ও খালের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে দ্রæত নদীতে পৌঁছতে না পারার ফলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে বলে জানানো হয়।

ঢাকার কাছেই রূপগঞ্জে পাঁচ তরুণের স্বপ্নকানন

রুখসানা মিলি

প্রয়োজন পূরণ করার ‘অজুহাতে’ প্রকৃতিকে ‘প্রায় বিদায়’ করে দিয়ে প্রিয় নগরী ঢাকা হয়ে উঠেছে কংক্রিটের জঙ্গল। প্রতিযোগিতায় ছুটে চলা জীবনের ক্লান্তি ধুয়ে একটু সজীবতা ফিরিয়ে আনতে পারে ফুল-পাখি-আকাশ-সবুজ-খোলা প্রান্তর-নির্জনতা-ভরা প্রকৃতি। ঢাকার খুব কাছেই এমন সব প্রাকৃতিক আয়োজন নিয়ে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে জিন্দা পার্ক।
খোলা সবুজ মাঠের পাশে একটি লাইব্রেরি ভবন। কমিউনিটি স্কুল এবং কমিউনিটি ক্লিনিক, মসজিদ, রেস্টুরেন্ট-সব নির্মাণই সাধারণ তবে অনন্য। গাছের ডালে তৈরি মাঁচানে পা ঝুলিয়ে বসে অনায়াসে কাটিয়ে দেয়া যাবে কিছু সময়। কিংবা ছোট্ট স্বচ্ছ জলের দ্বীপটিতে প্যাডেল বোটে করে নামা বা লেকের পানিতে বোটে ঘুরে বেড়ানো নিঃসন্দেহে আনন্দ দেবে। নানান রকম গাছের সারি, সবুজ ঘাস, রঙ্গনের সারি, মাটির রাস্তা বোলাবে শাস্তির পরশ।
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা রাইসুল ইসলাম জানান, বাচ্চাদের নিয়ে প্রায়ই তারা এখানে আসেন। প্রকৃতির উদারতায় প্রতিবারই ফেরত যান নতুন সজীবতা নিয়ে। ঢাকায় প্রায় বন্দি থাকা সন্তানেরা এখানে এসে পাখির সঙ্গে ফুলের সঙ্গে মেতে ওঠে অপার আনন্দে। মাটি, ঘাসের সঙ্গে ওদের মিতালি আনন্দ দেয় তাকেও।
অনেকে আবার ঘুরতে আসেন দলবেঁধে। এমনকি পিকনিক বা অন্যান্য আয়োজন নিয়ে বড় দলও আসে। উদ্যোক্তারা জানান, সারা বছরই দর্শনার্থীরা থাকেন। তবে ছুটির দিনগুলোতে ভিড় বেশি হয়।
ঢাকার আশেপাশের আরও যেসব রিসোর্ট বা পার্ক গড়ে উঠেছে, সেগুলোর সঙ্গে জিন্দা পার্কের মূল পার্থক্য হলো, এই পার্কটি দর্শনার্থীদের কেবল প্রশান্তি জোগাচ্ছে না, পাশাপাশি হয়ে উঠেছে ওই গ্রামের মানুষের সহায়ও। সমিতির পক্ষ থেকে প্রয়োজন অনুসারে ক্ষুদ্রঋণ দেয়া হয়। শিশুদের জন্য পড়ার ব্যবস্থাও রয়েছে ওখানকার স্কুলটিতে।
আশির দশকে মাত্র ৬০টাকা পুঁজি আর আশেপাশের মানুষের জীবনের ইতিবাচক পরিবর্তনের ছোঁয়া আনার স্বপ্ন নিয়ে পাঁচ কিশোরের হাত ধরে যাত্রা শুরু করে ‘অগ্রপথিক ­পল্লী সমিতি’। সেই পাঁচ কিশোরের সংগঠনের উদ্যোগেই এখন গড়ে উঠেছে ১০০ বিঘার এই ‘শান্তি কানন’।
জিন্দা পার্কের স্বপ্নদ্রষ্টা তবারক হোসেন কুসুম জানান, শান্তিনিকেতনের আদলে এই পার্কের নাম রাখার পরিকল্পনা ছিল : শান্তি কানন। তবে গ্রামের নামানুসারে আশেপাশের লোকের দেয়া নামেই পার্কটি ‘জিন্দা পার্ক’ নামে পরিচিত পেয়েছে।
পার্কটিকে ঘিরে যে জিন্দা গ্রামের দেখা পাওয়া যাবে, তাকে আদর্শ গ্রাম বলা যায়। সামাজিক উদ্যোগে বদলে যাওয়ার উদাহরণ এই গ্রামটি। কুসুম বলেন, ‘ব্যক্তিগত উদ্যোগে আমরা এভাবে এগিয়ে চলেছি। সরকারি উদ্যোগ থাকলে আরও বিস্তৃত হওয়া সম্ভব।’ সারাদেশে একই আদলে এগিয়ে গেলে সব গ্রামই আদর্শ গ্রাম হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
জিন্দা পার্কে রয়েছে ২৫০ প্রজাতির ২৫ হাজারেরও বেশি গাছ। আছে হরেক রকম ফুলের সমারোহ। নানা পাখির বাস এই পার্কে। তবে শীতে আসে অনেক অতিথি পাখি। সব মিলিয়ে পাখিদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে পার্কটি।
পার্কটিতে আছে একটি রেস্টুরেন্ট। ‘মহুয়া স্ন্যাকস অ্যান্ড মহুয়া ফুড’ নামের এই রেস্টুরেন্টে দর্শনার্থীরা পাবেন দেশীয় সব খাবার।
পার্কে ঢুকতে চাইলে ১০০ টাকা দিয়ে টিকিট কাটতে হবে। আছে পর্যাপ্ত পার্কিং-ব্যবস্থাও। পার্কের অবস্থান নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে। ব্যক্তিগত গাড়ি না থাকলে পূর্বাচল ৩০০ফিট রাস্তার কুড়িল বিশ্বরোড থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা দিয়ে যাওয়া যাবে। সময় লাগতে পারে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট। এ ছাড়াও রয়েছে বিআরটিসির বাসে যাওয়া-আসার ব্যবস্থা।

মির্জা মাহমুদ আহমেদ
পুরনো ঢাকার কথা মনে হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ঘিঞ্জি গলিপথ আর গায়ের ওপর গা লাগানো দালানকোঠায় ঠাসা রুদ্ধ এক জনপথের কথা ।
চিরচেনা এই দৃশ্যের বাইরে চতুভুর্জ আকৃতির একখন্ড সবুজ মাঠ খানিকটা অবাক-ই করে দেয়। মাঠ জুড়ে সবুজের সমারোহ চোখে দেয় স্বস্তি, মনে প্রশান্তি।
অথচ বছর দুয়েক আগেও দৃশ্যপটটা ঠিক এমন ছিলো না। ঢাকার অন্যসব পার্কের মতো লালবাগের এই মাঠটিতে উৎকট গন্ধের সাথে ছিলো ময়লা আবর্জনার স্তুপ। সামনের সড়কে ছিলো পিকআপ ভ্যান, রিক্সা, লেগুনার অবৈধ পার্কিং, বস্তি আর টং দোকানের সারি। সংস্কারে পুরোপুরি বদলে গিয়ে নতুন অবয়ব পেয়েছে পুরনো ঢাকার ঢাকেশ্বরী সড়কের শহীদ আব্দুল আলীম খেলার মাঠ। মাঠটিতে বালুর বদলে এখন দোল খাচ্ছে দৃষ্টিনন্দন সবুজ ঘাস। মাঠের চারপাশে লাগানো হয়েছে আমড়া, কামরাঙা, লটকনসহ দেশীয় ফল ফুলের নানা জাতের গাছ। সেখানে প্রজাপতি,ফড়িং, পাখিদের সাথে নিরন্তন খেলায় মেতে উঠছে শিশুরা।
সম্প্রতি মাঠটি ঘুরে দেখা গেছে, খেলার মাঠের মূল কাজ শেষ হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে হাঁটার পথ। এর নিচে আছে পানি নিষ্কাশনের সংযোগ ও ভূগর্ভস্থ পানি সংরক্ষনের ব্যবস্থা। মাটির নিচে ভূগর্ভস্থ পরিখায় সংরক্ষিত হবে পাঁচ লক্ষ লিটার বৃষ্টির পানি। ভূগর্ভে সংরক্ষিত এই পানি মাঠে ব্যবহার করা হবে। বাড়তি পানি পরিশোধন করে কফিশপ, পাবলিক টয়লেট, ব্যায়ামাগার এবং পাশ্ববর্তী মসজিদের চাহিদা পূরণ করা হবে। জরুরি প্রয়োজনে অগ্নিনির্বাপনের কাজেও ব্যবহার করা যাবে এই পানি। মাঠের উত্তর-পূর্ব দিকে করা হয়েছে একটি দোতলা ভবন। এর নিচতলায় করা হয়েছে ব্যায়ামাগার ও পাবলিক টয়লেট। দোতলায় একটি কফি শপ করা হয়েছে। কফিশপের সাথেই থাকছে পাঠাগার ও বই বিক্রয় কেন্দ্র। মাঠের উত্তরপাশে ক্রিকেট অনুশীলন করার জন্য পিচ আকৃতির একফালি জায়গা রাখা হয়েছে। পূর্ব দিকে রাখা হয়েছে শিশু কর্নার। সেখানে শিশুদের বিনোদনের ব্যবস্থা থাকবে। মাঠের চারপাশে লাগানো হয়েছে এলইডি বাতি। উদ্ধোধনের আগেই মাঠের চারপাশের অংশে বিভিন্ন বয়সী মানুষজন হাঁটাচলা করছেন। অনেকে বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন।
চকবাজার নিউমার্কেট রুটে চলাচলকারী লেগুনার লাইনম্যান হাবিব বৈশাখের তপ্ত রোদে গাছের ছায়ায় বসে খানিকটা জিরিয়ে নিচ্ছিলেন। কথায় কথায় জানালেন মাঠের আগের অবস্থার কথা। বললেন আগে মাঠে খেলা তো দূরে থাক, মাঠের পাশ দিয়ে হাঁটার পরিস্থিতি ছিল না। সন্ধ্যার পর এখানে মাদকসেবীরা অসামাজিক কার্যকলাপ চালাতো। মাঠ সংস্কারের পর আশপাশের পরিবেশ উন্নত হয়েছে।
মা রোকেয়া ইসলামের হাত ধরে ঘুরতে এসেছে ছোট্ট মিহিরিমা। লালবাগের স্থানীয় বাসিন্দা রোকেয়া জানালেন প্রায়ই মেয়েকে নিয়ে এখানে ঘুরতে আসেন তিনি। আগে মাঠের চারপাশে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং বখাটেদের উৎপাতের কারনে এদিকে আসতেন না। এছাড়া বছরের বেশিরভাগ সময়ই মাঠ দখল করে চলতো মেলা। সংস্কার কাজের পর মাঠের চারপাশের পরিবেশ উন্নত হয়েছে। আশেপাশের মানুষের আচরণেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে বলে জানান তিনি।
সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে সংস্কারের পর এই মাঠে যাতে মেলাসহ অনান্য কর্মকান্ড চলতে না পারে সেজন্য আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। স্থানীয়দের অনুরোধে মাঠটিতে শুধু ঈদের নামাজ পড়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
শহীদ আব্দুল আলীম খেলার মাঠের সংস্কার কাজ করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অঞ্চল-৩ (আজিমপুর)। জল সবুজে ঢাকা প্রকল্পের আওতায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে আওতাধীন এরকম আরও ১৯টি পার্ক এবং ১২টি খেলার মাঠের উন্নয়ন কাজ চলছে। আশা করা হচ্ছে এ বছরের শেষ নাগাদ পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।
‘জল সবুজের ঢাকা’ প্রকল্পের প্রধান স্থপতি রফিক আজম কারিকাকে বলেন আগে যেমন মনে করা হতো দেয়াল দিয়ে মাঠটিকে সুরক্ষিত করা যাবে এটা আসলে ভুল ধারণা। দেয়ালের কারনে মনোজাগতিক বাধা তৈরি হয়। দেয়াল থাকার ফলে নিদিষ্ট সময়ের পর এলাকাবাসী যখন মাঠটি আর ব্যবহার করতে পারতেন না। তখন সন্ধ্য্যার পর দেয়াল টপকে সেখানে দুষ্টুলোকেরা ঢুকতো। দেয়ালের আবডাল থাকায় দুস্কৃতিকারীদের জন্য মাঠটি দখল এবং অপকর্ম করা সহজ হতো। তাই আবদুল আলীম মাঠসহ জল সবুজের ঢাকা প্রকল্পের সব মাঠ ও পার্কের স্থাপত্য নকশা করার সময় দেয়াল উঠিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেই। দেয়াল তুলে দেয়ার ইতিবাচক দিকটি বোঝাতে সিটি কর্পোরেশনসহ সব মহলের কাছে আমার অনেক ঘাম ঝরাতে হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত আমি তাঁদের বোঝাতে পেরেছি। দেয়াল না থাকার ফলে স্থানীয়রা মাঠটি নিজেদের বলে ভাবছে, যখন ইচ্ছে তখন ব্যবহার করতে পারছে। মাঠে আগত দর্শনার্থীদের চোখ এক্ষেত্রে নিরাপত্তা রক্ষায় কাজ করবে। সেই সঙ্গে আছে সিসি ক্যামেরার নজরদারি।
খেলাধূলার বাইরে মাঠের বহুবিধ ব্যবহার প্রসঙ্গে রফিক আজম বলেন, আগে মাঠটিতে শুধু ফুটবল খেলা হতো। কিন্তু নতুন করে সংস্কার করার পর মাঠটিতে ফুটবল খেলার পাশাপাশি ক্রিকেট খেলার ব্যবস্থা থাকবে। শিশুদের খেলার জায়গা থাকবে, বড়দের হাঁটার জায়গা থাকবে, যারা স্বাস্থ্য সচেতন তাঁদের জন্য ব্যায়াম করার ব্যবস্থা থাকবে। পড়–য়াদের জন্য মাঠ সংলগ্ন ভবনের ওপরতলায় বই পড়ার ব্যবস্থা থাকবে। কফির কাপে চুমুক দিয়ে গল্প করা যাবে। ওয়াইফাই ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় কাজ সারা যাবে।
অতীতে এমন অনেক ভালো উদ্যোগ শুধুমাত্র রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে নষ্ট হয়ে গেছে এই মাঠটি সংরক্ষণে কি ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হবে এমন প্রশ্নের জবাবে রফিক আজম বলেন, মাঠটি দেখাশোনার জন্য স্থানীয় জনগনের অংশগ্রহনে একটি কমিটি করে দেয়া হবে। মাঠ সংলগ্ন বাড়িতে বসবাসরত নারী, পুরুষ, কিশোর, কিশোরী, খেলোয়াড়, মসজিদের ইমাম, জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় বরেণ্য ব্যাক্তি সেই কমিটির সদস্য হবেন।
মাঠটি রক্ষাবেক্ষনের জন্য মালি, পরিছন্নতা কর্মী, লাইব্রেরিয়ান, কফি শপের দোকানীও স্থানীয় পর্যায় থেকে নিয়োগ দেয়া হবে।
পরিকল্পিত নগর স্থাপত্য শিশু মনোজগতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে উলে­খ করে রফিক আজম বলেন, শহীদ আব্দুল আলীম খেলার মাঠটি শিশুদের জন্য একটি প্রাকৃতিক শিক্ষাদান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে। ছয় ঋতু সম্পর্কে জানতে তাকে আর বইয়ের কাছে যেতে হবে না। সে প্রকৃতি থেকেই ছয় ঋতু সম্পর্কে জানবে। গাছ চিনবে। ফুল চিনবে। গাছ থেকে ফল পেড়ে খাওয়ার যে অপরিসীম আনন্দ সেটা শিশুরা এখানে উপভোগ করতে পারবে। ঢাক গাছ থেকে যে ঢাকা নামের উৎপত্তি সেটা শিশুরা এই মাঠ থেকেই জানবে।
এখন থেকে পুরনো ঢাকার শিশু কিশোররা ড্রাগের পেছনে না ছুটে প্রজাপতির পেছনে ছুটবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যাক্ত করেন।
ছোট খাটো সংস্কার কাজ শেষ হলে এবং কফি শপ ব্যবস্থাপনায় মালয়েশিয়ান চেইন শপ সিক্রেট রেসিপির সঙ্গে চুক্তির বিষয়টি চূড়ান্ত হলে খুব শীঘ্রই দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেয়া হবে লালবাগের শহীদ আবদুল আলীম মাঠ। পুরনো ঢাকাবাসীর জন্য গর্বের বিষয় হবে এই মাঠটি। আর জল সবুজের ঢাকা প্রকল্পের পুরো কাজ শেষ হলে নগরবাসীর সামনে হাজির হবে নতুন এক সবুজাভ ঢাকা।

মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ

মির্জা মাহমুদ আহমেদ
চারদেয়ালে ঘেরা প্রতিষ্ঠানটির মূল ফটক পেরোতেই চোখ জুড়াবে সবুজ মাঠ। অপরিকল্পিত নগরায়ণের চাপে যখন নাগরিক প্রাণ রুদ্ধ, তখন এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির খোলা সবুজ প্রান্তর শিক্ষার্থীদের একটুখানি ছোটাছুটির ফুরসত এনে দেয়। মাঠ ধরে একটু এগোলেই মূল ভবনের সামনে ‘বিশ্বজয় ভাস্কর্য’। শিক্ষকের মুষ্টিবদ্ধ হাত যেন শিক্ষার্থীদের জানাচ্ছে বিশ্বজয়ের আহবান।
নিচতলায় শিশুদের ক্লাসরুম, করিডোর, বসার জায়গা সবই রঙিন। যেন রঙিন এক প্রজাপতি রাঙিয়ে দিয়ে গেছে পরম যত্নে। দ্বিতীয় তলা থেকে পঞ্চম তলার প্রতিটি করিডোর সাজানো হয়েছে বিষয়ভিত্তিক আয়োজন দিয়ে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস দিয়ে সাজানো ‘অপরাজেয় বাংলা’ গ্যালারিটি। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণসহ সেখানে ঠাঁই পেয়েছে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের সব উল্লেখযোগ্য ঘটনা। বাংলাদেশের গুণী কবি-সাহিত্যিকদের জীবনী ও আলোকচিত্র দিয়ে সাজানো ‘শিল্পাঙ্গন’ গ্যালারি। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে সাজানো হয়েছে ‘লোক ও কারুশিল্প কর্নার’। আর ‘সুরের ভুবন’ গ্যালারিটি সাজানো হয়েছে বাংলাদেশের প্রথিতযশা সংগীতশিল্পীদের জীবনী ও ছবি দিয়ে।
এ ছাড়াও বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও চলমান উন্নয়ন-কর্মকান্ডের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে ‘বিউটিফুল বাংলাদেশ’ ও ‘দুর্বার বাংলাদেশ’ গ্যালারিতে। মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ভ‚মিকা তুলে ধরা হয়েছে ‘সশস্ত্রবাহিনী’ নামক গ্যালারিটিতে। অন্যদিকে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য বিষয়ভিত্তিক মূল বিষয়গুলো সচিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে বিজনেস, স্পোর্টস ও লাইসিয়াম গ্যালারিতে।
পুরো প্রতিষ্ঠানের করিডোরগুলো ঘুরে দেখলে জাদুঘর ভেবে বসতে পারেন নতুন কেউ। যেখানে তুলে আনা হয়েছে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, গ্রামবাংলার অবারিত রূপসহ সশস্ত্র বাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। জাদুঘরের আদলে সাজানো ইতিহাস-ঐতিহ্যের এমন ছবি দেখে ও বর্ণনা পড়ে গতানুগতিক পাঠ্যবইয়ের বাইরেও শিক্ষার্থীরা শিখছে-জানছে নিজের মতো করে।
ভালো কাজের স্বীকৃতি আরও ভালো কাজ করার উৎসাহ জোগায়। সেই ধারণার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, সহশিক্ষা এবং শৃঙ্খলা ও নৈতিকতায় অসাধারণ পারদর্শিতার জন্য শ্রেণিশিক্ষকরা গ্রিনকার্ড দিয়ে উৎসাহিত করেন। প্রতি মাসে সর্বোচ্চ-সংখ্যক গ্রিনকার্ড পাওয়া শিক্ষার্থীরা আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে লাভ করে অধ্যক্ষের কাছ থেকে গোল্ডকার্ড।
স্কুল শাখার উপাধ্যক্ষ শায়েলা মনোয়ার কারিকাকে বলেন, ‘ভালো শিক্ষার্থী গড়ার পাশাপাশি ভালো মানুষও গড়তে চাই আমরা। তাই পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের পাশাপাশি যেসব শিক্ষার্থী শৃঙ্খলা ও নৈতিকতায় ভালো পারফরম্যান্স দেখায় তাদের গ্রিনকার্ড দেয়া হয়। এটি অর্জন করতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা গড়ে উঠেছে।’ ভালো ফলাফল ও আচরণে একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার মানসিকতাও তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি।
শায়েলা মনোয়ার জানান, পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতার কারণে স্কুলের শিক্ষার্থীরা প্রায়ই অশোভন উক্তি ও আচরণ করে থাকে। এগুলো প্রতিহত করতে প্রতিষ্ঠানটিতে ‘অ্যান্টি বুলিং স্কোয়াড’ গঠন করা হয়েছে। স্কোয়াডের নির্বাচিত প্রতিনিধি নিজেরা অশোভন উক্তি ও আচরণ করে না, অন্য সহপাঠীদেরও এ ধরনের আচরণ থেকে বিরত রাখে।
শিশু-কিশোরদের মনের আঙিনায় কত মধুর স্মৃতিই তো দোলা দিয়ে যায়, স্মরণীয় হয়ে থাকে নানা ঘটনা। অনেকের ভাবুক মনের বিকাশও হয় এ সময়েই। যথাযথ মূল্যায়ন বা পরিচর্চা না পেয়ে সেগুলো হারিয়েও যায় অনেক সময়। তাদের সেই ছোট ছোট ভাবনা ও স্মরণীয় ঘটনাগুলো ‘বন্দি’ করে রাখতে প্রতিষ্ঠানটিতে ‘আইডিয়া প্যাড’ নামে এক অভিনব ডায়েরি লেখার প্রচলন আছে। যেখানে শিক্ষার্থীরা নিজেদের স্মরণীয় মজার কোনো ঘটনা, ভাবনা, ভালোলাগা, মন্দলাগা ইত্যাদি লিখে রাখতে পারে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মানেই যেখানে চক-ব্ল্যাকবোর্ড আর টেবিল-বেঞ্চির কাঠখোট্টা জায়গা; শিক্ষকের চোখ রাঙানি আর কঠোর অনুশাসন সেখানে স্কুলে গ্যালারি, বিনোদন পার্ক, অ্যাম্পিথিয়েটার প্রতিষ্ঠা বা অ্যান্টি বুলিং স্কোয়াড ও আইডিয়া প্যাডের মতো অভিনব উদ্যোগের ভাবনা কার? জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির উপাধ্যক্ষ শায়েলা মনোয়ার জানান, অভিনব এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে কাজ করেছেন মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মেফতাউল করিম, অধ্যক্ষ লেফটেন্যান্ট কর্নেল সৈয়দ এ কে এম সাব্বির আহমেদ ও প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা-অধ্যক্ষ লেফটেন্যান্ট কর্নেল রিয়াজ আহমেদ।
যুগোপযোগী শিক্ষাদান পদ্ধতি, অত্যাধুনিক শিক্ষা উপকরণ, অভিজ্ঞ শিক্ষকমন্ডলী ও কঠোর শৃঙ্খলার কারণে প্রতিষ্ঠার অল্প সময়ের মধ্যেই অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে গেছে এ প্রতিষ্ঠানটি। বিগত বছরে অনুষ্ঠিত পিইসি, জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় শতভাগ পাসসহ এ প্রতিষ্ঠানের উল্লেখযোগ্য-সংখ্যক শিক্ষার্থী জিপিএ ফাইভ অর্জন করেছে। ২০১৭ সালের এইচএসসি পরীক্ষা এবং সহ-শিক্ষা কার্যক্রমে সাফল্যের ভিত্তিতে দেশের ৩১টি ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজের মধ্যে প্রথম রানার-আপ হয়ে সেনাবাহিনীপ্রধান ট্রফি অর্জন করার গৌরব অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতিষ্ঠানটির মূল ভবনের সামনে আড্ডা দেয়ার জন্য রয়েছে চমৎকার একটি জায়গা। জানা গেল, দেশের প্রথিতযশা সফল মানুষেরা মাঝে মাঝে এখানে এসে তাদের সফলতার গল্প শুনিয়ে যান। ‘স্বপ্নসিঁড়ি’ নামের এই আয়োজনে সম্প্রতি এখানে এসেছিলেন ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মর্তুজা।
জনবসতির তুলনায় মিরপুরে ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম বলে আক্ষেপ ছিল এখানকার বাসিন্দাদের। ২০১৪ সালে মিরপুর সেনানিবাসে ৩.৮৩ একর জমির ওপর মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেই আক্ষেপ অনেকটাই ঘুচেছে। বর্তমানে শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে ভালো মানুষ হওয়ার ব্রত নিচ্ছে চার হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী।

নগরে বাতিঘর

রুখসানা মিলি
একটা সময় পর্যন্ত কাদা দেখলেই আরিয়ানা লাফ দিয়ে দূরে সরে যেত। আর এখন কাদামাটি নিয়ে মনের আনন্দে খেলায় মেতে ওঠে সে। কাদা দিয়ে ছোট্ট হাঁড়ি, একটা পুতুল বা আরও নানান আকার দিতে এখন আরিয়ানা সানন্দে আগ্রহী।
মেগাসিটি ঢাকার নাগরিক জীবনের চাপে যতকিছু হারিয়ে গেছে, তার মধ্যে অন্যতম শিশুদের খেলাধুলা-সামাজিকতা-প্রকৃতিঘনিষ্ঠ জীবন। আর সে কারণেই বেশিরভাগ শিশুর সময় কাটে ট্যাব অথবা অন্য কোনো প্রযুক্তিপণ্যের সঙ্গে। প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার জন্য স্কুলের বাইরে ঢাকার শিশুদের আলাদা একটা জগৎ আছে এমন সংখ্যা নগণ্য।
এখন স্কুল হোক বা বাসা খেলার মাঠ নেই বললেই চলে। লেখাপড়ার ক্ষেত্রেও কতটা শিখল তা নয়, বেশিরভাগ অভিভাবকই গুরুত্ব দেন কত নম্বর পেল সেটির ওপর। একটি ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ফেরদৌসি আক্তার বলেন, ‘বিজ্ঞান বিষয়ে প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বেশিরভাগ খারাপ করেছে।’ কারণ হিসেবে তিনি জানান, ওদেরকে আমি যখন বেগুন বা নারকেল গাছ বা আমগাছ বলি, অনেক শিশুই তার পুরোপুরি অর্থ বুঝতে পারে না। কারণ প্রকৃতির সঙ্গে ওদের পরিচয় খুব সামান্য। এ কারণেই আমরা অভিভাবকদের উৎসাহিত করি শিশুকে প্রকৃতিঘনিষ্ঠ করতে।
এসব বিষয় উপলব্ধি করেই যাত্রা শুরু করেছে বাতিঘর সাংস্কৃতিক বিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠান। যেখানে আরিয়ানার মতো অনেক শিশুই কাদা দিয়ে খেলার শৈশব ফিরে পেয়েছে।
বাতিঘরের উদ্যোক্তারা জানান, বৈরী সময় আর পরিবেশের ভেতরে থেকেও শিশুদের মন-বুদ্ধি-স্বভাব যেন বিকশিত হতে পারে, তাদের ভেতরে ন্যায়নীতির শুভবোধ, রুচিবোধ আর সৌন্দর্য্যবোধ কিছুটা হলেও যেন জন্মে, তারই প্রয়াস চালানো আমাদের লক্ষ্য।
নাচ-গান-অভিনয়-আবৃত্তি-অংকন এমন নির্দিষ্ট কোনো সাংস্কৃতিক চর্চার বা শিক্ষার আবর্তে বন্দি থাকে না বাতিঘরের শিশুরা।
উদ্যোক্তাদের মতে, শিশুদের শুধু একেকটি চারুবিদ্যায় দক্ষ করে তোলাই নয়, কবিতায়, গানে, অভিনয়ে, ছবি আঁকায়, নাচে আর কথায় তারা যেন নিজেদের প্রকাশ করার আনন্দ পায় সেটাই বাতিঘরের চাওয়া। গতানুগতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো একটি বা দুটি বিষয় শেখানো নয়, বরং অনেকগুলো বিষয়ের সঙ্গে প্রাথমিক পরিচয় করিয়ে দিতে চাই আমরা। যাতে করে সে নিজেই ঠিক করে নিতে পারে তার গতিপথ।
একটা যথাযথ সামাজিক পারিপাশ্বিক অবস্থায় শিশুদের শৈশব শেখার পরিবেশ দিতে এ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে সন্তুষ্ট অভিভাবকরাও। এমনকি নানান সামাজিক অপরাধ সম্পর্কে শিশুকে অবহিত করা এবং সেসব পরিস্থিতিতে কীভাবে নিজেকে সামলে চলতে হবে বা সেখানে কোনটা ঠিক কোনটা ভুল এমন বিষয়গুলো সম্পর্কেও গল্পের ছলে শিশুকে অবহিত করা হয়। প্রতিভা বিকাশের মঞ্চ হিসেবে শিশুদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক উপস্থাপনার কার্যক্রমও পরিচালনা করে প্রতিষ্ঠানটি। বাতিঘরের বাতিদের নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তাসের দেশ নাটকের সফল মঞ্চায়নও হয়েছে।
ছয় বছরে পড়েছে বাতিঘর সাংস্কৃতিক বিদ্যালয়। ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও চট্টগ্রামেও একটি শাখা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
আরিয়ানার মা তাসলিমা সুলতানা বলেন, ‘আরিয়ানা আমাদের একমাত্র সন্তান। আমি ও আমার স্বামী দুজনই চাকরি করি। বাতিঘর আমার সন্তানকে এমন একটা শৈশব এনে দিয়েছে, যেটা আমরা পেয়েছিলাম। খেলার সাথী, খেলা, বই পড়া, গাছের সঙ্গে, ফুলের সঙ্গে, পাখির সঙ্গে বড় হওয়া। বাতিঘর থেকে ওদের গাছ-পাখি-ফুল আলাদা করে চেনানো হয়। আরিয়ানার মতো আরও অনেক শিশু এখানে এসে খুদের ভাত, নানান রকম ফল আর অনেক দেশি খাবারের সঙ্গে প্রথমবার স্বাদ পেয়েছে।’
তাসলিমা আরও বলেন, ‘এখন শিশুদের সময় কাটানোর মাধ্যম হিসেবে ট্যাব বা অন্য ডিভাইস দিয়ে দেয়া হয়। বাতিঘরে বই পড়ার অভ্যাসও গড়ে তোলা হয়। আমরা অনেকেই শিক্ষাজীবনে বা কর্মজীবনে এসে কোনো প্রেজেন্টেশন দিতে গিয়ে নানান সমস্যায় পড়ি। বাতিঘর শিশুদের নিয়মিত উপস্থাপনার আয়োজন করে। ফলে ওদের জড়তা, ভয় দূর হয়ে যায় সহজেই। সব মিলিয়ে কেবল নম্বর আর পরীক্ষা ছাড়াও শিশুরা শিখতে শিখতে যে বড় হতে পারে, সেই জায়গাটুকু তৈরি করতেই আমি আমার সন্তানকে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত রেখেছি।’