Home মূল কাগজ ব্যক্তিত্ব

নূরুন্নবী চৌধুরী শাওন, এমপি
সভাপতি (ভারপ্রাপ্ত), রিহ্যাব


রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) রাজধানী ঢাকাকে সুপরিকল্পিত নগরায়ণে রূপান্তরের পাশাপাশি নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা আবাসন সমস্যা সমাধানে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। রিহ্যাব সদস্যদের প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্য হলো ঝুঁকিমুক্ত, পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত নগর গড়ে তোলা। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে সরকারের উন্নয়ন-সহযোগী হিসেবে কাজ করে চলেছে রিহ্যাব-সদস্যরা। শহরমুখী মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রয়োজন মেটাতে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে কাজ করে যাচ্ছে রিহ্যাবের ১,০৪২টি সদস্য-ডেভেলপার-প্রতিষ্ঠান। তাদের মেধা ও শ্রম দিয়ে পরিকল্পিত নগর নির্মাণে সচেষ্ট রয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ২০২১ সালের মধ্যে সবার জন্য সুপরিকল্পিত আবাসন নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর ও পরিকল্পিত বাসযোগ্য নগরী গড়ে তোলাই বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। সে চিন্তা মাথায় রেখে সরকার ও রিহ্যাব সদস্যদের নানামুখী কার্যক্রমে স্বল্প ও মধ্যবিত্তসহ সকলের জন্য একটি স্বপ্নীল আবাসনের স্বপ্ন পূরণে আমরা দৃঢ় প্রত্যয়ী।

রিহ্যাবের বিপুল কার্যক্রমে গত কয়েক দশক সহজে আবাসনের মালিকানা সৃষ্টিতে মানুষের আত্মনির্ভরতা সৃষ্টি করেছে। এছাড়া সরকারের রাজস্ব আয় ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা পালন কররে আসছে। রড, সিমেন্ট, টাইলসসহ ২৬৯ প্রকার লিংকেজ শিল্প প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে রিহ্যাব। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে আবাসন খাতের অবদান প্রায় ১৫ শতাংশ। এদেশে আবাসন শিল্প শুধু আবাসনই সরবরাহ করছে না, একই সাথে প্রায় ৩৫ লক্ষ শ্রমিকের ওপর নির্ভরশীল দুই কোটি মানুষের অন্নের যোগান দিচ্ছে। আবাসন খাত নতুন নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি করে দেশের উন্নয়নে শক্তিশালী ভূমিকা রেখে চলেছে। রিহ্যাব সদস্যদের আন্তরিক প্রচেষ্টার কারণেই আজ শহরগুলোতে স্কাই লাইনের পরিবর্তন হয়েছে।
সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমাদের আলাপ আলোচনা চলছে। কয়েকটি ব্যাংক সুদের হার কমিয়ে সিঙ্গেল ডিজিট সুদে হাউজিং লোন দিলেও এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে সিঙ্গেল ডিজিট সুদে হাউজিং লোনের কোনো ঘোষণা আসেনি। আমরা আশা করি সরকার এই বিষয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা দিবে। নিন্মবিত্ত ও মধ্যবিত্ত নাগরিকদের আবাসনের স্বপ্ন পূরণ করতে এবং আবাসন খাতে গতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আমরা ‘হাউজিং লোন’ নামে ২০ হাজার কোটি টাকার রিফিন্যান্সিং করার দাবি জানাচ্ছি। বর্তমানে ১৪ শতাংশের উপরে রেজিস্ট্রেশন ব্যয় রয়েছে। এটি কমিয়ে ৬-৭ শতাংশে নিয়ে আসলে আবাসন খাতে কিছুটা গতিশীলতা ফিরে আসবে। আবাসন খাত এগিয়ে গেলে নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা (বাসস্থান) পূরণে সহায়ক হবে। তার পাশাপাশি শিল্প-কারখানা বিকশিত হবে, ফলশ্রুতিতে সমৃদ্ধ হবে দেশের অর্থনীতি।
ক্রেতাদের সুবিধার কথা মাথায় রেখেই গত ১৭ বছর ধরে আমরা রিহ্যাব ফেয়ারের আয়োজন করে আসছি। আশা করি বিগত বছরগুলোর ধারবাহিকতায় এবারও একটি সফল ফেয়ার আমরা উপহার দিতে পারব। রিহ্যাব ফেয়ারের উদ্দেশ্যই হলো রিহ্যাব সদস্য এবং ক্রেতাদের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করা। এবারের ফেয়ার সাধ ও সাধ্যের মধ্যে মনের মতো ফ্ল্যাট বা প্লট খুঁজে নিতে ক্রেতাদের সাহায্য করবে।
আবাসন ব্যবসা অনেকটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আমাদের সদস্যদের থেকে জেনেছি, এই ব্যবসায় গতি এসেছে। আশা করি এই রিহ্যাব ফেয়ারের মাধ্যমে সেই গতিশীলতা আরও বৃদ্ধি পাবে।

অনুলিখন ও ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

কারিকা ডেক্স


নজরুল ইসলাম

মানব সভ্যতার ইতিহাসে নগর বিকাশ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি আদর্শ নগরের কিছু বৈশিষ্ট্য থাকতেই হয়। তার মধ্যে প্রথমই হলো শহরটি হতে হবে মানবিক। আদর্শ নগরীর আরও কিছু বিশেষণ আমরা ব্যবহার করি। যেমন- নিরাপদ নগরী অথবা সুবসতি নগরী, বৈষম্যহীন নগরী, সুন্দর নগরী, তিলোত্তমা নগরী ইত্যাদি। কিন্তু আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ধারণাটি হলো মানবিক শহর। এখন মানবিক শহর কীভাবে করা যায় বা কখনও ছিল কি না সেটাই আলোচ্য বিষয়। হ্যাঁ, এক সময় হয়তো ছিল, যখন সমাজে বৈষম্য ছিল কম। আদিযুগে, পাঁচ হাজার বছর পূর্বে হরপ্পা, ব্যাবিলন, মিসরের যে শহরগুলো ছিল, সেগুলোতে বৈষম্য বা শ্রেণিকাঠামো আমরা দেখি। একেবারে আদিযুগে মিসরীয় শহর, ব্যাবিলন, মেসোপটেমিয়া শহর অথবা মহেন্দ্রদার সিন্ধু অববাহিকার শহর, সেগুলোতে ছিল পুরোহিত এবং রাজাদের জন্য বিশাল ব্যবস্থা। তারা বিশেষ একটি জায়গায় প্রাসাদ-অট্টালিকায় বসবাস করত। তাদের যে মন্ত্রী বা পরিষদ তাদেরও বড় বড় বাড়ি থাকত। আরও থাকত প্রশস্ত রাস্তাঘাট। সাধারণ মানুষের জন্য শহরের প্রান্তে ছোট ছোট বাড়ি থাকত। এমন একটা শ্রেণিকাঠামোর মধ্যেই আদি শহরগুলো গড়ে উঠত। মধ্যযুগেও একই অবস্থা। আধুনিক যুগে শিল্পবিপ্লবের পরে যে শহর হলো, এখানেও অবশ্যই শ্রেণিবৈষম্য আছে, শাসকশ্রেণি এবং প্রজাশ্রেণির মধ্যে। দেড়-দুশ’ বছর আগে যে শহরগুলো তৈরি হয়েছে সেগুলো অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে হয়েছে। যেমন- প্যারিস, ওয়াশিংটন ডিসি। পরবর্তীকালে অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরা, ব্রাজিলের রাজধানী ব্রাসেলিয়া অথবা পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ। এটা আইয়ুব খানের সময়ে তৈরি হয়। খুব সুন্দর, সাজানো শহর। তারই একটা ছোট্ট আদল ছিল আমাদের শেরেবাংলা নগর। সংসদ ভবন, তার পাশেই ছিল মন্ত্রীদের বাসস্থান, সচিবদের বাসস্থান। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসস্থানও এখানেই ছিল। ইসলামাবাদ ভালো দেখায় বড় পরিসরে। শেরেবাংলা নগর ছোট পরিসরে। উচ্চপদস্থদের জন্য বৃহৎ আকারের  বাড়ি। মাঝারি কর্মচারীদের জন্য মাঝারি বাড়ি। নিন্মশ্রেণির কর্মচারীদের জন্য ছোট ছোট বাড়ি। সবচেয়ে ন্যূনতম বাড়িটা খুব সুন্দর। মানবিক শহরে কম বেতনে যারা কাজ করে, সব শ্রেণির নাগরিকের জন্য ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা থাকতে হবে। বাসস্থান, কর্মসংস্থানসহ যাতে তারা ন্যূনতম আয়ের পথ খুঁজে পায়। নারীদের নানা রকম সুযোগ-সুবিধা থাকতে হবে। তাদের ছেলে-মেয়েদের স্কুলের ব্যবস্থা থাকতে হবে। খেলার মাঠ এবং সামাজিক সংঘাত নিন্মপর্যায়ে  থাকতে হবে। সংঘাত না হওয়াই কাম্য। কিন্তু আমরা দেখি ঢাকা, মুম্বাই, কলকাতা ইত্যাদি শহর মিশ্র অর্থনীতির ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থায় গড়ে উঠেছে। সেখানে দেখা যায় অধিকাংশ মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করে। একটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মানুষ, যারা বস্তিবাসী, অতিদরিদ্র, তারা অত্যন্ত অমানবিক জীবনযাপন করে। বস্তিবাসীদের মাঝে মাঝেই উচ্ছেদ করা হয়। অত্যন্ত অমানবিক কাজ এটা। এসব গণতান্ত্রিক দেশেও হচ্ছে। ধনী দেশগুলো, যেমন- আমেরিকা, সেসব শহরেও কিন্তু বস্তি আছে। শ্রেণিকাঠামোর জন্যই হয়। তবে ওদের বস্তিসংখ্যা কম। মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত এদের সংখ্যাই বেশি। আমরা যদি সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর দিকে তাকাই, যেমন- চীন, রাশিয়া, সেখানে সবার জন্য ন্যূনতম ব্যবস্থাটা থাকে। একটা মানবিক পরিবেশ তৈরি করে। সেটা নিন্ম আয়ের দেশগুলোতে সম্ভব কিনা? বাংলাদেশে সম্ভব কিনা? ঢাকায় সম্ভব কিনা? ভারতে সম্ভব কিনা? পাকিস্তান, থাইল্যান্ডে সম্ভব কিনা? অর্থনৈতিক উন্নতি হলে নিন্মশ্রেণি উঠতে পারে, তারা ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা পায়। কিন্তু বৈষম্য থেকেই যায়। এখন দেখা যায় চীনেও বৈষম্য প্রচ-ভাবে বেড়ে গেছে। তারপরও ন্যূনতম মানদন্ডে থাকে।

মানবিক হতে হলে শহরটা সহনশীল হতে হবে। শ্রেণিগত বৈষম্য, বর্ণগত বৈষম্য যেন না হয়। ধর্মগত সহনশীলতা বজায় রাখতে হবে। ভাষাগত বৈষম্যও যেন না থাকে। আমেরিকার মতো দেশে বর্ণবৈষম্য শুরু হয়েছে, আগেও ছিল, এটা কাম্য নয়। বৈষম্য কমিয়ে এনে দরিদ্র দেশের দরিদ্র শহরগুলোও মানবিক করা যায়। এর জন্য, কারো কারো বিশাল বিত্তের অধিকারী হওয়ার সুযোগ কমাতে হবে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যূনতম জীবনধারণের সুযোগ করে দিতে হবে। সেটা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান তো বটেই, সঙ্গে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। আর হলো নিরাপত্তা। নিরাপত্তা না থাকলে কোনো শহরই মানবিক হবে না। সেখানে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, গোষ্ঠীগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এটাই মানবিক শহরের প্রধান শর্ত। এখন যদি কেউ আমাকে প্রশ্ন করে, মানবিক শহর আপনি কোথায় দেখেছেন? এর সঠিক উত্তর কঠিন হবে। উন্নত বিশ্বে অনেক জায়গায় আছে। যেমন- অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, আমেরিকার কোনো কোনো জায়গায়, ইউরোপে, ইংল্যান্ডে তাদের ন্যূনতম ব্যবস্থাটা আছে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে ঢাকাকে আমরা মানবিক শহর বলতে পারি না। এখানে বিত্তের চমক কোনো কোনো জায়গায় আমরা দেখি। সেটা বাসস্থান, পরিবহন, গাড়ি-ঘোড়ায়, স্কুলের শিক্ষায় দেখা যায়। অধিকাংশ মানুষ সাধারণ, খুব কষ্টের জীবনযাপন করে। নিন্মবিত্ত, বস্তিবাসী দরিদ্র যারা,  তাদের জীবন দুর্বিষহ। সুতরাং তাদের কাছে এই শহরটা মানবিক নয়। আর যারা বিত্তবান, উচ্চবিত্ত তাদেরও যদি মানবতাবোধ থাকে তারাও কিন্তু এই বৈষম্যের শহরে আরামে থাকেন বলে মনে হয় না।

বিবেকবোধ থাকতে হবে। বঙ্গবন্ধু যেটা চেয়েছিলেন। স্বাধীন দেশের সংবিধানে তিনি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা চেয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, সবার সমান অধিকার থাকবে, বাকস্বাধীনতা থাকবে। তিনি চেয়েছিলেন সব বাংলাদেশির জন্য জাতীয়তাবাদ। বাঙালি হোক, আদিবাসী হোক সবার জন্য সমব্যবস্থা। আরেকটি হলো ধর্মনিরপেক্ষতা। আমাদের চারটি প্রধান ধর্ম। এরা যেন একসঙ্গে বসবাস করতে পারে। এভাবে মানবিক দেশ, মানবিক শহর করতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু।

তবে অনেক দিক থেকেই কিন্তু আমাদের ঢাকা শহর মানবিক। এখানে ধর্মীয় উন্মাদনা অনেক দেশের তুলনায় কম। আমেরিকা, ইউরোপ এমনকি ভারতের তুলনাতেও কম। গণতান্ত্রিক চেষ্টা আছে। সমাজতান্ত্রিক আকাংক্ষা ছিল, চেষ্টা ছিল। কিন্তু এগোতে পারছে না। আবার দূরে সরে যাচ্ছে। এক সময় পুরান ঢাকায় ধনী-গরিব-মধ্যবিত্ত সব কাছাকাছি, পাশাপাশি বাস করত। তখন বরং শহরটা আরও মানবিক ছিল। ঢাকা একশ’ বছর আগে বোধহয় আরও মানবিক ছিল। মানবিক শহর হতে হলে গণতান্ত্রিক হতে হবে, সমাজতান্ত্রিক হতে হবে এবং অবশ্যই ধর্মনিরপেক্ষ শহর হতে হবে। আর জাতীয়তাবোধ থাকতেই হবে।

 

0 850

‘নিউইয়র্ক শহর; আসলে এর কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। একটা সময় ছিল যখন লোকে বলাবলি করত, ওয়ালস্ট্রিটের এসব ইমারত নিউইয়র্কের বারোটা বাজিয়ে ছাড়বে; আর এর ঠিক এক প্রজন্ম আগে ওই লোকেদেরই বলতে শুনতাম, রকফেলার সেন্টার নিউইয়র্কের বারোটা বাজাবে। বাস্তবে তেমন কিছুই ঘটেনি। ওই বহুতল ইমারতগুলো যে একে-অন্যের গা-ঘেঁষাঘেঁষি করে, আকাশ ফুঁড়ে, সোজা ওপরের দিকে উঠে গেছে, তারও কারণ আছে। মানুষ নিজেও তো একে অপরের কাছাকাছিই থাকতে চায়!’ কথাগুলো যিনি বলেছেন তিনি আর কেউ ননÑ স্বয়ং ফিলিপ জনসন।

চেনা বামনের যেমন পৈতে লাগে না, তেমনি আধুনিক স্থাপত্যকলার এই দিকপালকেও নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। শুধু এটুকু বলে রাখা যায়, ফিলিপ জনসন ২০ শতকের আমেরিকান স্থাপত্যকলার সেরা এক সৃজনী প্রতিভা। একেবারেই ব্যতিক্রমী এক আরবান স্কাইলাইন গড়ে তোলা আর তা মর্ম দিয়ে অনুধাবন করার ক্ষেত্রে জনসনের কোনো জুড়ি মেলা ভার। এদিকটায় তার অবদান তার গড়া ইমারতের মতোই আকাশছোঁয়া। এখানেই শেষ নয়, বহুমুখী সৃজনশীলতার সমন্বয় ঘটেছিল তার মধ্যে। যাকে বলে বহুমুখী প্রতিভা। ইতিহাসবিদ, কিউরেটর, স্থপতিÑ নানামুখী পরিচয় তার। এসবের মধ্যে জীবনভর স্থাপত্যকলাই তাকে মাতিয়ে রেখেছে বেশি। আর তার পরবর্তী প্রজন্মের পর প্রজন্মে রয়ে গেছে তার স্থাপত্যরীতির প্রভাব। ফিলিপ জনসনের জন্ম ১৯০৬ সালে। বেড়ে ওঠেন ওহাইওর ক্লিভল্যান্ডে। হাইস্কুলের পাঠ চুকিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন হার্ভার্ড কলেজে। সেখানে পড়েছিলেন ধ্র“পদী সাহিত্য নিয়ে। ১৯২০-এর দশকের শেষার্ধে এসে নতুন এক ভালোবাসায় ডুব দেন তিনি। তার সব প্রেম আর মনোযোগ কেড়ে নেয় স্থাপত্যকলা আর আধুনিক নন্দনকলা। মাত্র ২৬ বছর বয়সেই Museum of Modern Art’s new architecture department-এর পরিচালকের পদ অলঙ্কৃত করেন। স্থাপত্যকলায় নতুনত্ব ও বৈচিত্র্য আনার মানসে আলফ্রেড এইচ বার জুনিয়র ও হেনরি রাসেল হিচকককে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন ইউরোপে, বিশেষত জার্মানিতে। সেখান থেকে ফিরে ১৯৩২ সালে Museum of Modern Art-এ ‘The International Style : Architecture Since 1922’ নামে করলেন এক যুগান্তকারী যৌথ প্রদর্শনী। সেই প্রদর্শনীকে আমেরিকায় আধুনিক স্থাপত্যকলার গোড়াপত্তন হিসেবে গণ্য করা হয়।

বয়স যখন মধ্য তিরিশ, তখন জনসন হার্ভার্ডে ফিরে গিয়ে স্থাপত্যনকশার ওপর পড়াশোনা শুরু করেন স্থপতি মার্সেল ব্র“য়ারের অধীনে। ১৯৪০-এর দশকের শেষ দিকে ডিগ্রি নিয়েই নেমে পড়েন বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের ইমারত আর লোকজনের বাড়িঘরের নকশা তৈরির কাজে। তার প্রথম এবং সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছে কানেকটিকাটে তার নিজের শহর নিউ ক্যানানের জগদ্বিখ্যাত গ্লাস হাউস বা গ্লাস টাওয়ার। এক আধা গ্রামীণ নিসর্গের পটভূমিতে এ-হচ্ছে এক মর্মর প্রাসাদ, যার বাইরের দিকের কাঠামো ইস্পাতের। এটির আদলে আরও কিছু ভবন তৈরি করে তিনি লোকের নজর কাড়েন। ১৯৫০-এর দশকটি জনসনের জন্য ছিল যাকে বলে পয়মন্ত এক দশক। এসবের মধ্যে বিশেষভাবে বলতে হয় নিউইয়র্কের সিগ্রাম ভবনের কথা। বলাবাহুল্য, এটি তিনি নির্মাণ করেন তারই ভাবগুরু মাইজ ফন ডার রোহের সঙ্গে যৌথভাবে। একের পর এক নিসর্গ ও প্রকৃতিবান্ধব নয়নশোভন ভবন-স্থাপত্যে তাক লাগাতে থাকেন জনসন। লোহা, কাচ, ইট-কাঠ তার হাতে পেতে যায় ভাষা, গরিমা আর লালিত্য; সেই সঙ্গে পায় টেকসই কাঠামোÑ যেখানে বাস্তব কল্পনাকেও হার মানায়। অবশ্য ১৯৬০-এর দশকে এসে ভাবগুরু মাইজ ফন ডার রোহের প্রভাব ছেড়ে সৃষ্টির নতুন পথে হাঁটা শুরু হলো। অনেক ব্যক্তিগত ঢংয়ের নকশার ভেতর ইতিহাসের নানা উপাদান জুড়ে দিয়ে খিলান, গম্বুজ আর আলিশান সব ইমারত গড়ে তুলতে থাকেন। ওই সময়টায় নেব্রাস্কা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেলডন আর্ট গ্যালারি, নিউইয়র্কের স্টেট থিয়েটার, মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্টসহ নানা জায়গায় তার কাজের প্রদর্শনী চলতে থাকে। ১৯৬৭ থেকে ১৯৯১ সময়টা জনসনের জন্য ছিল সবচেয়ে সুফলা সময়। এই সময়ে তিনি যেসব স্থাপত্য নকশা ও ইমারত গড়েন সেগুলোর মধ্যেÑ মিনিয়াপোলিসের আইডিএস টাওয়ার, ক্রিস্টাল ক্যাথিড্রাল বা স্ফটিকের ক্যাথিড্রাল, টেক্সাসের সেন্ট বাসিল চ্যাপেল, স্পেনের মাদ্রিদে ‘গেট অব ইউরোপ’ বা ‘পোয়ের্তা দে ইউরোপা’, পিটার্সবার্গে পিপিজি প্যালেস, পেট্রয়েট সেন্টার, আটলান্টার পিচ ট্রি টাওয়ার, ওয়ান ডেট্রয়েট সেন্টার, নিউইয়র্কের সিগ্রাম ভবন, পালাসের থ্যাংকস-গিভিং স্কয়ার। এ রকম আরও কত কত নাম! ২০০৫ সালে ৯৮ বছর বয়সে মারা যান আধুনিক স্থাপত্যকলার এই কবি। আর দুটি বছর বেশি বাঁচলে জীবনের সেঞ্চুরিটা হয়ে যেত তার। তাতে কী! নগরে নিসর্গে কাচে-কংক্রিটের উত্তুঙ্গ খিলানে-গম্বুজে-ইমারতের চূড়ায় পতপত করে উড়ছে তার প্রতিভার ধ্বজা।

জুয়েল মাজহার

0 967

বিংশ শতাব্দীতে এসে যেসব স্থপতি স্থাপত্যশিল্পের চেহারা পাল্টে দিয়েছেন, তেমন ১৫ জন প্রভাব বিস্তারকারী স্থপতি নির্বাচন করেছে ‘কলারকোট’। নির্বাচিত সেই স্থপতিদের নিয়ে ধারাবাহিক আয়োজনের ত্রয়োদশ কিস্তি ছাপা হলো এ-সংখ্যায়

বিশ্ববিখ্যাত নির্মাণশিল্পী ফনডাজিওয়ান রেনজো পিয়ানো একাধারে একজন স্থাপত্যবিদ, শিল্পী ও স্থাপত্যকলার শিক্ষাগুরু এবং প্রকল্প পরিকল্পনাকারী। যদিও অনেক পাঠক নামের শেষে পিয়ানো থাকায় প্রথম দর্শনে হয়তো একজন পিয়ানো-বাদকের পরিচিতিমূলক আখ্যান তুলে ধরছি বলে ভ্রমে পড়ে যেতে পারেন।

যা-ই হোক, ১৯৩৭ সালে ইতালির জেনোয়ায় জন্মগ্রহণকারী এই গুণী শিল্পী ফোরেন্স এবং মিলানে শিালাভ করেন এবং সেখানে তিনি তৎকালীন বিখ্যাত স্থাপত্যশিল্পী ফ্রাঙ্কো আলবিনির মতো শিক্ষকের সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পান। আলবিনির সান্নিধ্যে থাকার সময় তিনি ১৯৬০ সালে প্রথম ছাত্র আন্দোলনের অভিজ্ঞতা লাভ করেন।

নির্মাতা-পরিবারে জন্মগ্রহণের সুযোগে রেনজো পিয়ানো প্রায়ই তার পিতা কার্লোসের নির্মাণ প্রকল্প-এলাকা পরিদর্শনে যেতেন। ফলশ্রুতিতে তিনি স্থাপত্যশিল্পে একাধারে ব্যবহারিক ও পুঁথিগত অভিজ্ঞতা লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি মিলানের পলিটেকনিকো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৫ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত সহোদর ভাই ইরমান্নোর সঙ্গে যৌথভাবে তার পরীক্ষামূলক বিভিন্ন কাজের জন্য একাধিকবার গ্রেট ব্রিটেন ও আমেরিকা সফর করেন।

দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ১৯৭১ সালে তিনি যৌথভাবে রিচার্ড রজারের সঙ্গে লন্ডনে পিয়ানো ও রজার্স নামে নির্মাণশিল্পের জন্য অফিস স্থাপন করেন। এর পরপর তিনি পমপিডিও সেন্টার নির্মাণ-প্রতিযোগিতার জন্য বিজয়ী হন এবং পরবর্তী সময়ে প্যারিসে পাড়ি জমান। এর মধ্যে তিনি ৭০ দশকের প্রথম থেকে ৯০ পর্যন্ত এটলিয়ার পিয়ানো এবং রাইস নামের একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন এবং যৌথভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত।

১৯৮১ সালে সারা দুনিয়ায় সাড়া জাগানো রেনজো পিয়ানো বিল্ডিং ওয়ার্কশপ (জচইড) প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বর্তমানে এর কর্মচারীর সংখ্যা ১৫০ জন। এর অফিস রয়েছে প্যারিস, জেনোয়া ও নিউইয়র্কে।

জচইড পৃথিবীব্যাপী দুর্লভ ও মূল্যবান সব স্থাপত্য-নকশা প্রণয়ন করে পৃথিবীবাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। জচইড-এর উল্লেখযোগ্য স্থাপত্যকর্মের মধ্যে মেনিল কালেকশন ইন হাউসটন, দ্য টার্মিনাল ফর কানসাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট ইন ওসাকা, দ্য ফাউন্ডেশন বেইলার মিউজিয়াম ইন ব্যাসেল, দ্য জিন ম্যারি জিবাউ কালচারাল সেন্টার ইন ক্যালেডোনিয়া, পোর্টসড্যামার প্লাজ ইন বার্লিন, দ্য রিডেভেলপমেন্ট অব দ্য জেনোয়া হারবার, দ্য অডিটোরিয়াম ‘পারকো ডিলা মিউজিকা’ ইন রোম, দ্য নাশের স্কাল্পচার সেন্টার ইন ডালাস, দ্য এক্সটেনশন অব দ্য হাই মিউজিয়াম অব আর্ট ইন আটলান্টা, মর্গান লাইব্রেরি অব নিউইয়র্ক, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস হেডকোয়ার্টার্স, দ্য ক্যালিফোর্নিয়া একাডেমি অব সায়েন্স ইন সানফ্রান্সিসকো, দ্য মডার্ন উইং অব আর্ট ইনস্টিটিউট অব শিকাগো, লসঅ্যাঞ্জেলেস কান্ট্রি মিউজিয়াম অব আর্ট এবং দ্য ইসাবেলা স্টুয়ার্ট গার্ডনার মিউজিয়াম অব বোস্টন বিশেষভাবে তাদের খ্যাতির আলোকে উজ্জ্বল করেছে।

১৯৮৯ সালে স্থাপত্যশৈলীতে অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রেনজো পিয়ানো রিবা রয়্যাল গোল্ড মেডেল পুরস্কার, ১৯৯৫ সালে প্রিমিয়াম ইমপেরিয়াল ইন টোকিও, ১৯৯৮ সালে প্রিজকার আর্কিটেকচার পুরস্কার এবং ২০০৮ সালে এআইএ গোল্ড মেডেল অব দ্য আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস লাভ করেন।

বর্তমানে পিয়ানো পৃথিবীর যেসব বিখ্যাত স্থাপনার সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য কাজ করছেন সেগুলো হলোÑ ক্যামব্রিজের ফগ মিউজিয়াম (ম্যাসাচুসেটস), নিউইয়র্কে অবস্থিত কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস, দ্য লন্ডন ব্রিজ টাওয়ার, তুরিনের সান পাওলো টাওয়ার ইত্যাদি।

ব্যক্তিগত জীবনে চার সন্তানের জনক এই বিখ্যাত নির্মাণশিল্পী দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে তার নির্মাণ-দর্শনে ইন্দ্রজালের মতো মুগ্ধ করে রেখেছেন পুরো পৃথিবীর মানুষকে। নিজ কর্মের দায়বদ্ধতা থেকে বয়োবৃদ্ধ এই মানুষটি এখনও নতুন প্রজন্মের স্থাপত্যের শিক্ষার্থীদেরকে প্রতিবছর শিক্ষাদান করে চলেছেন নিরলসভাবে।

রেনজো পিয়ানোর ৫ কীর্তি

দ্য স্যার্ড স্কাইস্কিপার
২০১২ সালে সম্পন্ন লন্ডন ব্রিজ সংলগ্ন দ্য স্যার্ড স্কাইকিপার হলো ইউরোপের উচ্চতম ভবন। ২০১৩-এর ১ ফেব্রুয়ারি এটা সাধারণের জন্য উন্মূক্ত করে দেয়া হয়। এই ভবন শুধু ইতালীয় স্থাপত্যের প্রতীক নয়, রেনজো পিয়ানোর বিশেষ সৃষ্টির প্রতীকও।

সেন্ট্রাল জর্জ পামপিডু
প্যারিসে অবস্থিত সেন্ট্রাল জর্জ পামপিডু যৌথভাবে নকশা করেন পিয়ানো এবং রিজার্চ রগার। ১৯৭৭ সালে সম্পন্ন হওয়া এ স্থাপনায় রয়েছে পাঠাগার, গ্যালারি এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশনার জন্য একাধিক হলরুম।

ক্যালিফোর্নিয়া অ্যাকাডেমি অব সাইন্স
সানফ্রান্সিসকোতে অবস্থিত ‘দ্য ক্যালিফোর্নিয়া অ্যাকাডেমি অব সাইন্স’ প্রকৃতির ইতিহাস নিয়ে দুনিয়াজুড়ে জনপ্রিয় এক যাদুঘর। এই ভবন শক্তি-স্বয়ম্বর এবং এর সবুজ ছাদ প্রাকৃতিক নানা উদ্ভিদের আবাসস্থল হিসেবে বিবেচিত।

ত্যাজিবেও কালচারাল সেন্টার
স্প্যাসিফিক দ্বীপের রাজধানী নোমিওতে অবস্থিত দ্য জেন-ম্যারি ত্যাজিবেও ক্যালচারাল সেন্টার হলো পিয়ানো-সৃষ্ট আরেকটি অসাধারণ ক্ষুধিত নিশ্চল সাংস্কৃতিক আকর্ষণ। এতে রয়েছে প্রদর্শনী কেন্দ্র, পাঠাগার এবং বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্র।

ফনডেসান বেয়েলা
সুইজারল্যান্ডের বাসেলের কাছে অবস্থিত ফনডেসান বেয়েলা জনগণের জন্য উন্মূক্ত এক গ্যালারি। যে গ্যালারির শিল্পকর্ম সংগ্রহ হয়েছে ব্যক্তি উদ্যোগে, এর সংগ্রাহক আর্নেস্ট বেয়েলা ও হিলডা কানজ। এ স্থাপনা সম্পন্ন হয় ১৯৯৭ সালে।

এম. এম. আলী