Home মূল কাগজ বিশেষ রচনা

নান্দনিক কিন্তু নির্মমতার সাক্ষী

আবুল হোসেন আসাদ
গ্লাডিয়েটরদের রক্ত, নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতা ছড়িয়ে আছে যে স্থাপত্যটির বুকের জমিনজুড়ে, অপূর্ব নির্মাণশৈলীর যে স্থাপত্যটি আজও মনুষ্যসৃষ্ট নয়নাভিরাম স্থাপত্যের এক সপ্তাশ্চর্য, তা হলো-রোমের কলোসিয়াম। রোমের শহরতলিতে অবস্থিত এটি। রোম থেকে ভ্যাটিকান পর্যন্ত যাওয়ার জন্য খোলা ছাদবিহীন ট্যুরিস্ট বাস রয়েছে অসংখ্য। এগুলোতে নির্দিষ্ট ফি’র বিনিময়ে পুরো দর্শনীয় এলাকা ভালো করে ঘুরে দেখা যায়। নির্দিষ্ট সময় পরপর বিরতি। বাস থেকে কলোসিয়ামের সামনে নামলাম। নিরাপত্তাবেষ্টনী পার হয়ে ঢুকে গেলাম কলোসিয়ামের ভেতরে। অনুভূতি-অসাধারণ। রোমের কলোসিয়ামের কথা শুনেছি, বইয়ে পড়েছি। প্রথমেই ওপরের দিকে ওঠা শুরু করলাম সিঁড়ি বেয়ে। পাথরের সিঁড়ি। একটু খাড়া। ধীরে ধীরে উঠতে থাকলাম। নতুন আবেশ। নতুন পরিবেশ। দুই চোখ মেলে দেখতে থাকি চারপাশ।
উপবৃত্তাকার ছাদবিহীন বিশাল একটি খোলা মঞ্চ এই কলোসিয়াম। ছয় একর জমির ওপর নির্মিত হয়েছে এটি। উচ্চতা প্রায় ৪৮ মিটার, দৈর্ঘ্য ১৮৮ মিটার এবং চওড়ায় ১৫৬ মিটার। প্রত্যেক তলায় ৮০টি করে তিনটি লেভেলে মোট ২৪০টি আর্চ আছে। ৮৬ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৫৪ মিটার প্রস্থের মেঝে আচ্ছাদিত কাঠ ও বালি দিয়ে। গ্লাডিয়েটরদের পশ্চাদপসরণে বাধার সৃষ্টি করত কলোসিয়ামের উপবৃত্তাকার উঁচু দেয়াল। প্রায় এক লাখ কিউবিক মিটারের বেশি ট্র্যাভারটাইন পাথর ব্যবহার করা হয়েছিল এই অ্যাম্ফিথিয়েটার নির্মাণে। ৫০ হাজার লোক একসঙ্গে বসে এখানে গ্লাডিয়েটরদের যুদ্ধ দেখতে পারত। আসন-ব্যবস্থাটি কয়েকটি ভাগে বিভক্ত ছিল। প্রথম লেভেলে তৎকালীন সিনেটররা বসতেন। সম্রাটের নিজস্ব সুসজ্জিত আনন বা মর্বেলের তৈরি বক্সটিও এই লেভেলে অবস্থিত ছিল। দ্বিতীয় লেভেলটি রোমান অভিজাত, যারা সিনেটের সদস্য ছিলেন না, তাদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। তৃতীয় লেভেলটিতে সাধারণ মানুষদের বসার ব্যবস্থা ছিল। তৃতীয় লেভেলটি আবার তিন ভাগে বিভক্ত ছিল। নিচের দিককার অংশটিতে ধনী ব্যক্তিরা বসতেন, মাঝের অংশটি মধ্যবিত্তরা বসতেন এবং উপরের অংশে কাঠ দিয়ে নির্মিত একটি কাঠামো ছিল, যেখানে দরিদ্রশ্রেণির মানুষ দাঁড়িয়ে খেলা উপভোগ করতেন। রোমান সাম্রাজ্যের সব নাগরিকের এই জায়গায় বিনামূল্যে প্রবেশাধিকার ছিল।
ভূগর্ভস্থ হাইপোজিয়াম তৈরি করা হয় নির্মাণের পরের দুই বছরে। এতে দুইতলা বিশিষ্ট ভূগর্ভস্থ খাঁচা এবং সুড়ঙ্গের মিলন ঘটানো হয় যেখানে মরণখেলা শুরুর আগে ধরে আনা বন্যপশু এবং অসহায় গ্লাডিয়েটদের রাখা হতো। খাঁচাগুলোতে চলাচলের জন্য অসংখ্য গোপন সুড়ঙ্গ-পথ ছিল। এসব সুড়ঙ্গ ছিল বিশাল আকারের। হাতির মতো বিশালাকার বন্যপ্রাণীও এ সুড়ঙ্গ-পথে চলাচল করতে পারত। কলোসিয়ামের আরেকটি দিক হচ্ছে, দর্শকদের ঠান্ডা বাতাস সরবরাহ করার জন্য এর ‘ভেলারিয়াম’ নামের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থা, যা ছিল দড়ির তৈরি ক্যানভাসের একটি আচ্ছাদন। এ আচ্ছাদনের মাঝখানে একটি ছিদ্র ছিল। আচ্ছাদনটি পুরো কলোসিয়ামের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আবৃত করত এবং বাতাস ধরে রাখার জন্য এর মধ্যখানে ঢালু রাখা হতো। বাতাস সরবরাহ সচল রাখার জন্য বিশেষ প্লাটফর্মে দাঁড়ানো পাঙ্খা-পুলাররা এই দড়ি নিয়ন্ত্রণ করত। কলোসিয়ামে অসংখ্য ভোমিটারিয়া বা প্যাসেজ ছিল, যা সারি সারি আসনের পাশ দিয়ে অবস্থিত ছিল। গ্রাউন্ড লেভেলে ৮০টি প্রবেশদ্বার ছিল। এর মধ্যে ৭৬টি ছিল সাধারণ দর্শকদের ব্যবহারের জন্য। তারা ভোমিটোরিয়াম দিয়ে নিজ আসনে পৌঁছাত। কলোসিয়াম বহু প্রাচীনকালে নির্মিত হলেও এর নির্মাণশৈলীতে রয়েছে অনন্য নিপুণতা। বর্তমান সময়ের প্রকৌশলীরা অনেক স্টেডিয়াম নির্মাণেও কলোসিয়ামের কাঠামো থেকে ধারণা নিয়ে থাকেন।
কলোসিয়াম পাথরের তৈরি। এটি মূলত শুরুতে তৈরি হয়েছিল একটি নাট্যশালা হিসেবে। ৭২ খ্রিস্টাব্দে এটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। ফেরিয়াস বংশের সম্রাট ভেসপাসিয়ান এটি নির্মাণ করেন। ভেসপাসিয়ানের মৃত্যুর পর নির্মাণকাজ শেষ করেন তার পুত্র টাইটাস। ধারণা করা হয়, ৭০ খ্রিস্টাব্দের দিকে ইহুদি বিদ্রোহের পর যুদ্ধবন্দি ইহুদি দাসদের দিয়ে এই কলোসিয়ামটি নির্মিত হয়েছে। ১০ বছর ধরে ৬০ হাজার ইহুদি দাসকে কাজে লাগিয়ে ৮০ খ্রিস্টাব্দে কলোসিয়ামের নির্মাণকাজ শেষ করেন টাইটাস। তিনি এটিকে অফিসিয়ালি ‘ফ্ল্যাভিয়ান অ্যাম্পিথিয়েটারিয়াম (গ্যালারি)’ নাম দিয়ে জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। একদম শুরুতে এটি খেলাধুলার জন্য ব্যবহৃত হতো এবং নাট্যশালার জন্য ব্যবহৃত হতো। কলোসিয়ামে নিয়মিত হতো পশুর লড়াই আর এগুলোর করুণ মৃত্যু দেখতে দেখতে একঘেয়েমি বোধ করেন সম্রাট টাইটাস। তাই পরিশেষে পশুর পরিবর্তে মানুষে-মানুষে লড়াইয়ের হিংস্র আর অমানবিক চিন্তা মাথায় আসে তার। এরপর থেকে শুরু হয় মানুষে-মানুষে, মানুষ-হিংস্র পশুতে জীবন-মরণের লড়াই আর মৃত্যুর করুণ ও বীভৎস কাহিনি। মল্লযুদ্ধ দিয়েই শুরু হয় গ্লাডিয়েটরদের খেলা এবং এই মল্লযুদ্ধের জন্য একজন আরেকজনকে কাঠের তরবারি দিয়ে আঘাত করতে থাকে। ‘গ্লাডিয়াস’ অর্থ খাটো তরবারি। এ তরবারি দিয়ে লড়াইকারীদের বলা হতো-গ্লাডিয়েটর। প্রথমদিকে যুদ্ধবন্দিদের দিয়েই লড়াই শুরু। এ লড়াই দুজনের মধ্যে চলত ততক্ষণ, যতক্ষণ-না একজনের মৃত্যু হতো। পরে প্রচলন হয় গ্লাডিয়েটরদের লড়াই। লড়াই চলাকালে কোনো এক গ্লাডিয়েটর আহত হয়ে পড়ে গেলে উল্লাসে ফেটে পড়ত পুরো কলোসিয়াম। মৃত্যুভয়ে ভীত, ক্ষত-বিক্ষত গ্লাডিয়েটর রেওয়াজ অনুযায়ী হাত তুলে সম্রাটের কাছে করুণা প্রার্থনা করত, প্রাণভিক্ষা চাইত। মঞ্জুর করা না-করা সম্পূর্ণ সম্রাটের মেজাজের ওপর নির্ভর করত। সম্রাট ক্ষমা করলে সে যাত্রায় বেঁচে যেত পরাজিত গ্লাডিয়েটর, আর না করলে নিশ্চিত মৃত্যু। অনেক সময় রোমান মহিলারা নামকরা গ্লাডিয়েটরদের প্রেমে পড়ে গৃহত্যাগও করতেন।
রোম থেকে রোমানরা চলে গেছে অনেক বছর আগে। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রয়ে গেছে আজও এই কলোসিয়াম। রোমান সাম্রাজ্যের সূতিকাগার ছিল এই রোম। নিরোর বাঁশি, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির স্মৃতিবিজড়িত ইতালি আর এই রোম। ইতালির এই রোম নগরীর কেন্দ্রবিন্দুতে নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতা, রক্ত, আর্তনাদ ও জীবন সংশয়ের অভিশাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কলোসিয়াম। কলোসিয়ামের মূল স্থাপত্যের দুই-তৃতীয়াংশই ধ্বংস হয়ে গেছে। এই কলোসিয়ামের মাটিতে মিশে আছে সেই সময়ের গ্লাডিয়েটরদের রক্ত। অজস্র বন্যপ্রাণীর করুণ মৃত্যু ও রক্ত। কলোসিয়ামের দেয়ালে কান পাতলে আজও বুঝি শোনা যায় সেই ভয়াবহতা ও নিষ্ঠুরতার শব্দ! তারপরও কলোসিয়াম আজও পৃথিবীর অন্যতম জনপ্রিয় একটি ট্যুরিস্ট-স্পট। ১৯৯০ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী অঞ্চলের স্বীকৃতি দেয় কলোসিয়ামকে। এটি পৃথিবীতে মনুষ্যসৃষ্ট আধুনিক সপ্তাশ্চর্যগুলোর একটি বলে নির্বাচিত হয় ২০০৭ সালে। কলোসিয়াম প্রাচীন স্থাপত্যশিল্পের এক অসাধারণ নিদর্শন, যা একই সঙ্গে রোমানদের হিংস্রতা আর নির্মাণশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন হয়ে টিকে আছে শত শত বছর ধরে।

লেখক : সাইক্লিস্ট ও সাইকেলে বিশ্বভ্রমণকারী

বঙ্গভবনের ভেতরের পাখি পরিবার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশপ্তক, ফার্মগেট মোড়ের ইলিশ, পটুয়াখালীতে জয় বাংলা ভাস্কর্যের শিল্পী হামিদুজ্জামান খান। আমাদের ভাস্কর্য-শিল্পে তার অসামান্য অবদান থাকলেও চিত্রকলায়ও তার দক্ষতা কম নয়। পড়াশোনা করেছেন চিত্রকলার ওপর। ভারতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন ভাস্কর্য বিষয়ে। ভাস্কর্য ও চিত্রকলা দুই মাধ্যমেই তিনি কাজ করে যাচ্ছেন সমান তালে। অগুণিত ভাস্কর্য গড়েছেন দেশে এবং বিদেশে। তার বেশিরভাগই করেছেন মুক্তিযুদ্ধকে বিষয় করে। কিছু ভাস্কর্য গড়েছেন স্পেসটাকে ইন্টারেস্টিং করার জন্য। শিল্পকলা একাডেমি থেকে পেয়েছেন চারটি পুরস্কার। ২০০৬ সালে পেয়েছেন একুশে পদক। সম্প্রতি বহুমাত্রিক এই শিল্পীর নামে ভাস্কর্য উদ্যান উদ্বোধন হলো গাজীপুর সামিট পাওয়ার প্ল্যাণ্টে। শিল্পী হামিদুজ্জামান খানের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মোহাম্মদ আসাদ

হামিদুজ্জামান ভাস্কর্য উদ্যান’ উদ্বোধন হলো। এটির বিশেষত্ব কী?
একটি ম্যুরাল বা দেয়ালচিত্র কেন্দ্র করে এই উদ্যানের সৃষ্টি। সাড়ে তিনশ ফুট দৈর্ঘ্য এবং ২২ উচ্চতার একটি দেয়ালচিত্র। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দেয়ালচিত্র। বহিরাঙ্গণে এত বড় দেয়ালচিত্র দেশের বাইরেও আমার চোখে পড়েনি।

এই উদ্যানের শুরুটা হলো কীভাবে?
সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজিজ খানের সঙ্গে আমি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছি। তিনি বিভিন্ন জায়গা থেকে আমাকে বহু জিনিস মেইল করেন। একবার আমাকে মেসেজ দিলেন একটা দেয়াল হচ্ছে, এখানে কিছু করা যায় কি না। আমার মাথায় বহুদিন ধরেই বহিরাঙ্গণের স্পেস চেইঞ্জ করার জন্য কাজের পরিকল্পনা চলছিল। বাড়ির সামনে, বাগানে একটা ভাস্কর্য থাকলে সে জায়গার চেহারাটাই বদলে যায়। সে-রকম অনেক কাজ করেছি। একটু বড় আকারের করার ইচ্ছা ছিল বহু দিনের। এই দেয়ালটা পেয়ে আমার স্বপ্নপুরণের একটা স্পেস পেলাম। এটা একটা পাওয়ার প্ল্যাণ্টের দেয়াল। আমি বলব, এটা শিল্পের প্রনোদানা, শিল্পকর্মেও অনুপ্রেরণা দেয়া। বিশাল এই কর্মযজ্ঞ পুরোপুরি শেষ করতে সময় লেগেছে এক বছর।

এত বড় একটি কাজ করতে গিয়ে স্বাধীনতা পেয়েছিলেন কেমন?
আমি যা চেয়েছি তাই হয়েছে। আজিজ খান সাহেব শুধু একজন বড় ব্যবসায়ী নয়, তিনি শিল্পের সমঝদার। সেই দেয়ালের কত যে পরিবর্তন করেছি তা বলে শেষ করা কঠিন। সাড়ে তিনশ ফুট লম্বা দেয়ালের মাঝে মাঝে পিলার দিয়ে খোপ খোপ। আমি এই খোপ খোপ ভরাট করে প্লেইন একটা দেয়াল বানিয়ে দিতে বললাম। আর উপরে জানালায় কালার প্লাস ছিল সেটা বাদ দিয়ে সাদা কাচ লাগিয়ে দিতে বললাম। তিনি ইঞ্জিনিয়ারকে এর সমাধান দিতে বললেন। ইঞ্জিনিয়ার বলল, এটা সম্ভব কিন্তু দেয়াল মোটা হয়ে যাবে। খরচ বাড়বে। আজিজ খান বললেন, খরচ যা-ই হোক, দেয়াল স্ট্রেইট করে দেন। এই দেয়ালটি ক্যানভাসে রূপান্তর করতে দেয়ালের পুরুত্ব দাঁড়াল ১৫ ইঞ্চি। সাড়ে তিনশ ফুট এই দেয়ালটি প্লাস্টার করে দেওয়ার পর আমি এটা নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম। বলে রাখা ভালো, গাজীপুরের কড্ডায় অবস্থিত সামিট পাওয়ার প্ল্যাণ্ট দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। ৪৬৪ মেগাওয়ার্ড বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী এই প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করা হয়েছে মাত্র নয় মাসে। তার জন্য আন্তর্জাতিক সম্মানও পেয়েছে। বিশাল এই প্রতিষ্ঠানের একটি বিশাল দেয়াল ইন্টারেস্টিং করার চেষ্টা করেছি আমি।

এই কাজে কী কী বিষয় স্থান পেয়েছে?
এটা একটা বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী ইন্ডাস্ট্রি। ইন্ডাস্ট্রির মেশিনপত্রের মূল অংশটিই চাকা। মেশিন চালু করলেই চাকা ঘুরতে থাকে। চাকা ঘুরলেই উৎপাদন। উৎপাদন মানে উন্নয়ন, এগিয়ে যাওয়া। বিদ্যুৎ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ হলো টারবাইন। আমি এই দেয়ালটিতে চাকা, টারবাইন দিয়ে সাজিয়েছি। নানা আকারের চাকা। কোথাও বড়, কোথাও ছোট, নানান আকারের। কোথাও আবার চাকার অংশবিশেষ। চাকাগুলো কোনোটা মার্বেল পাথরের, কোনোটা স্টেইনলেস স্টিলের, কোনোটা সাধারণ লোহার। চাকাগুলো পুনঃপুনঃ ব্যবহার করে ইন্টারেস্টিং করা হয়েছে। আরও বড় বিষয় হলো, কাজটিতে অনেক স্পেস আছে। বিদ্যুৎ তো একটা লাইন, ছুটে চলে। তাই নিচে একটা স্টিলের পাইপ দিয়ে লাইন বানিয়ে সাবজেক্টগুলোকে একটার সঙ্গে আরেকটার সম্পর্ক করলাম। পরস্পরের কাছাকাছি নিয়ে আসলাম।

কী কী উপকরণ ব্যবহার করেছেন এই দেয়ালে, সেগুলোর স্থায়িত্ব কেমন?
খোলা জায়গায় এই দেয়াল। রোদে পুড়বে, বৃষ্টিতে ভিজবে। এর জন্য আমি স্টোন ব্যবহার করেছি। এখানে গ্রানাইট পাথর ব্যবহার করেছি। কোনো-কোনোটায় পাথর কেটে নকশা করেছি। এক পাথরের ভেতর অন্য রঙের পাথর বসিয়েছি। তারপর স্টেইনলেস স্টিল আছে। লোহাও আছে। লোহার তৈরি চাকাগুলো লেকার দিয়ে ফিক্সড করে দেয়া হয়েছে। সবই রয়েল বোল্ট দিয়ে আটকে দেয়া হয়েছে। প্রথমে শেওলা ধরা দেয়ালে লাগানোর পর দেখতে তেমন ভালো দেখায়নি। পরে পুরো দেয়ালটাকে সাদা রঙ করার পর সাবজেক্টগুলো ফুটে উঠল। এই ম্যাটেরিয়াল সম্পর্কে আমার ভালো ধারণা আছে। এগুলো দীর্ঘসময় টিকে থাকবে।

উদ্যানের গল্পটা শুনতে চাই ।
বড় এই দেয়ালের পাশেই আছে আরও একশ ফুটের মতো দেয়াল। সেটাও এই দেয়ালের সঙ্গে লিং করালাম। দেয়ালের সামনে অনেকটুকু খোলা জায়গা পেলাম। সেখানে সবুজ ঘাস লাগিয়ে দেয়া হলো। বিশাল এই সবুজের মঝে মাঝে রয়েছে ভাস্কর্য। এখানে নানা আকৃতির, নানা রকম বিষয়ের ১২টি ভাস্কর্য। ভাস্কর্যের মধ্যে আছে এক শিশু বিদ্যুতের খুঁটির নিচে বসে বই পড়ছে। একাত্তরে লাশ পরে থাকা সেই রিকশা আছে। এগুলো লোহার। পাথরের আছে নানা রকমের শেইপ। সেগুলোর কোনো-কোনোটা বসার বেঞ্চি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।

সামসুল ওয়ারেস

স্মৃতি সৌধের ধারণাটা আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বরই উনি ঘোষণা দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে একটা জাতীয় সৌধ নির্মাণ করতে হবে। স্মৃতি সৌধের ইটের কাজ বঙ্গবন্ধুর আমলেই শুরু হয়। পরে ১৯৭৮ সালে একটি নকশা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয় গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও স্থাপত্য অধিদপ্তর থেকে। বাংলাদেশের সব স্থপতিদের কাছে আহবান করা হয় নকশা। সেখানে বেশকিছু নকশা জমা পড়ে। এ প্রতিযোগিতায় আমিও একজন বিচারক ছিলাম। স্থপতি মাজহারুল ইসলাম ছিলেন বিচারকমণ্ডলীর চেয়ারম্যান। যতদূর মনে পড়ে, সেবার ২৫ থেকে ৩০টি নকশা জমা পড়ে। সেই নকশাগুলোর মধ্যে আমরা কোনটাই পছন্দ করতে পারিনি। আমরা তখন সরকারকে বললাম এই প্রতিযোগিতা যেন আবার আহবান করা হয়। দ্বিতীয়বারের প্রতিযোগিতায় প্রায় ৫০টির মত নকশা জমা পড়ে। আমরা একই বিচারকমণ্ডলী মিলে সেগুলোর বিচার করি। এর মধ্যে স্থপতি সৈয়দ মইনুল হোসেনের কাজটাই আমাদের পছন্দ হয়েছিল।
১৯৭৯ সাল থেকে স্মৃতি সৌধের কাজ শুরু হয়ে যায়। সৈয়দ মইনুল হোসেন স্থাপত্য নকশার কাজ করেন। আর স্ট্রাকচারাল নকশার কাজটা করেন আমাদের নামকরা প্রকৌশলী শেখ মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। তবে সামগ্রিকভাবে স্ট্রাকচারাল নকশা ও আর্কিটেকচারাল নকশার সম্পূর্ণ চিন্তা ভাবনা স্থপতি সৈয়দ মইনুল হোসেনের। সব মিলিয়ে এখানে ৮৪ একর জমি ছিল। পরে আরো ২৪ একর জমি যোগ করা হয়। সৌধটির নির্মাণ ১৯৮২ সালে সম্পূর্ণ হয় ।
স্মৃতি সৌধের ভেতর সাতটা অংশ আছে। সাতটি জোড়া ত্রিভুজ একটির পেছনে আরেকটি বসিয়ে পুরো বিষয়টা দাঁড় করানো হয়। সবচেয়ে সামনে যেটি আছে, সেটির নিচের অংশটা কম চওড়া কিন্তু উচুঁ সবচেয়ে বেশি। উচ্চতা ১৫০ ফিট। এর পরেরটা একটু খাটো, কিন্তু চওড়ায় একটু বেশি। এভাবে এর পরেরটা আরো খাটো, আবার প্রস্থ বেশি। একটা বই যেমন অর্ধেকটা খুললে একটা এঙ্গেল হয়, সেরকম ত্রিভুজের কম্পোজিশন করে সাত জোড়া ত্রিভুজ বাসানো হয়েছে স্মৃতি সৌধে।
সাতটি স্তম্ভের কারণ হচ্ছে এর মাধ্যমে আমাদের মুক্তি সংগ্রামের সাতটি ধাপ চিহ্নিত করা। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্ন সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ছাপ্পান্ন সালে শাসনতন্ত্রের অধিকারের দাবিতে আন্দোলন, ৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলন, ছিষট্টিতে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা, উনসত্তরে গণ আন্দোলন এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এই সাতটা ভাগ।
এই স্মৃতি সৌধকে সামনে থেকে দেখলে এটাকে বক্ররেখার মতো মনে হয়। ডানের অর্ধেক ও বাঁয়ের অর্ধেক সমান ও একইরকম। এই সিমেট্রিক্যাল নকশা একটা বক্ররেখা তৈরি করে। কিন্তু এখানে কোন বক্ররেখা নেই, সবই সোজা লাইন। ভিজ্যুয়াল ইলিউশনের কারণে বক্ররেখা মনে হয়। যেকোনো শিল্পের মধ্যে একটা যাদুকরী ব্যাপার থাকতে হয়। তা নাহলে সেটা শিল্প হয় না। সেই যাদুকরী ব্যাপারটা এখানে আছে। এটার সামনে থেকে পাশে গেলে সবকিছুর পরিবর্তন হয়ে যায়। পাশের সাথে সামনে দেখা দৃশ্যের কোন মিল নেই। এটা কংক্রিটে নির্মিত একটি সৌধ। কিন্তু এর মধ্যে আছে এক ধরনের পবিত্রতা। সুন্দর করে পালিশ করা কিছু নেই এতে। এই ধরনের কাজের জন্য স্মৃতি সৌধে একটা বার্তা রয়েছে। আমরা যে স্বাধীনতা পেয়েছি সেটা মনে রাখতে হবে এবং আমরা যে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার একটা অবস্থানে এসেছি সেটা এই স্থাপত্যের সামনে দাঁড়ালে মনে আসে।
স্মৃতি সৌধের শুরুতেই আমরা দেখতে পাই লাল ইটের ব্যবহার। এ ঐতিহ্য আমাদের অনেক পুরনো। আমাদের বাংলাদেশে প্রায় চার হাজার বছর আগেও ইটের ব্যবহার হতো। যেমন উয়ারি-বটেশ্বরে আমরা দেখছি প্রায় চার হাজার বছর আগেই ইট ছিল। আমাদের দেশীয় উপাদান দিয়েই কাজটা আমরা করতে চেয়েছিলাম। আমরা যদি চাইতাম এটা মার্বেল দিয়ে মোড়ানো হোক, তাহলে মার্বেল আনতে হত পাকিস্তান, ভারত কিংবা ইতালি থেকে। তাহলে তো আমাদের দেশের জিনিস দিয়ে তৈরি হতো না। এটা একটা উদ্দেশ্য ছিল, আমরা যাই তৈরি করি না কেন, যতটা পারা যায় সেটা যেন আমাদের দেশের সামগ্রী দিয়েই তৈরি হয়। ইট কম খরচে হয় এবং এটা সহজে আমাদের এখানে পাওয়া যায়। এর আগে স্থপতি লুই আই কান আমাদের সংসদ ভবন কংক্রিট দিয়ে করেছেন, মাজহারুল ইসলাম চারুকলা ইনিস্টিটিউটে বা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইটের ব্যবহার করেছেন মুক্তিযুদ্ধের অনেক আগেই। তাই আমরা মনে করেছি, ইটটাই আমাদের সঠিক উপাদান। আমাদের এই স্মৃতি সৌধ নির্মাণে খরচ হয়েছে তিন কোটি টাকার মত। এমন একটি অসাধারণ স্থাপত্যের জন্য এ খরচ বেশি নয়।
সত্তরের দশকে তৈরি আমাদের স্মৃতি সৌধ আজও সমসাময়িক বিশ্বের একটি স্থাপত্য। বিদেশি অতিথিরা এ দেশে এলে এখানে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। তারাও মুগ্ধ হন এই স্থাপত্যের নির্মাণ শৈলী দেখে। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় অনেক গর্বের এই স্থাপত্য যুগ যুগ ধরে প্রেরণা দেবে বাঙালিকে।
লেখক: স্থপতি, অধ্যাপক

কারিকা ডেক্স


আবদুল্লাহ আল মামুন
চট্টগ্রাম-কতটা প্রাচীন নগর? এ প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর কারও কাছেই নেই। তবে ঐতিহাসিকরা বলছেন চট্টগ্রামের বয়স হাজার বছর। ১০ হাজার বছর আগের নিদর্শনও মিলেছে চট্টগ্রামে। বিশ্বের খ্যাতিমান ভূগোলবিদ ও ঐতিহাসিকদের বর্ণনায়ও চট্টগ্রামের প্রাচীন ইতিহাসের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রাচীনতার স্নিগ্ধ ঘ্রাণ এই নগরের কাদা-মাটি-জলে। কিংবদন্তির এই নগরের বাঁকে বাঁকে ছড়িয়ে আছে ঐতিহাসিকতার ছোঁয়া।
বাংলা একাডেমি প্রকাশিত আবদুল হক চৌধুরী রচনাবলির ভূমিকায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. আবদুল করিম লিখেছেন, ‘চট্টগ্রাম শহরের ইতিহাস অনেক প্রাচীন। কতখানি প্রাচীন তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। শহর গড়ার ইতিহাস মানব সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। মানব সভ্যতার ঠিক কোন পর্যায়ে চট্টগ্রামে একটি শহর গড়ে ওঠে তা এখন নির্ধারণ কষ্টসাধ্য। চট্টগ্রাম শুধু শহর নয়, এটি একটি বন্দর শহর। অর্থাৎ এ শহরের উন্নতি-অবনতি বন্দরের সমৃদ্ধির সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রাগৈতিহাসিক নিদর্শন আবিষ্কৃত হওয়ার ফলে দেখা যায়, প্রায় ১০ হাজার বছর আগে নব্য প্রস্তর যুগে চট্টগ্রামে জনবসতি ছিল। ঐতিহাসিক তথ্যের আলোকে টলেমী, প্লীনির বিবরণের ওপর নির্ভর করে বলা যায়, চট্টগ্রাম শহর বা বন্দরের ইতিহাস দুই হাজার বছরের প্রাচীন।’

চট্টগ্রাম নামের উৎস
চট্টগ্রামের নামের উৎপত্তি নিয়ে ড. আহমদ শরীফ তার চট্টগ্রামের ইতিহাস বইয়ে লিখেছেন তিব্বতী সূত্রে চট্টগ্রামের প্রাচীন নাম পাওয়া যাচ্ছে জ্বালনধারা তপ্তজল সমন্বিত অঞ্চল। এখানে কিছুকাল বাস করেছিলেন বলে সিন্ধু দেশীয় বৌদ্ধ সিদ্ধ বাল পাদ জ্বালনন্ধরী নাম প্রাপ্ত হন। হয়তো অগ্নিতপ্ত জল ধারণ করে বলেই স্থানটি ‘জ্বালন্ধর’ নামে পরিচিত ছিল। সীতাকুন্ডে ও বাড়বকু্নডে এখনও তপ্তজল পর্বত গাত্র থেকে নিঃসৃত হয়। এরই আরবি-ফারসি নাম সম্ভবত ‘সামন্দর’। সাম (অগ্নি) অন্দরে আছে যে স্থানে সেটিই সামন্দর।
তিনি লিখেছেন, সামন্দর নামের প্রথম উল্লেখ পাই ইবন খুর্দাদবেহ’র বর্ণনায়। ইনি এ অঞ্চলকে ‘রুহম’ বা ‘রুহমি’ রাজার শাসনভুক্ত বলে উল্লেখ করেছেন। সামন্দরের দ্বিতীয় উল্লেখ মেলে ‘হুদুদুল আলম’ গ্রন্থে। এখানে রাজার নাম দহুম। এই দহুম ও রুহম ড. আহমদ হাসান দানীর মতে একই নামের বিকৃতি। ইনি বঙ্গাধিপ ধর্মপাল। হোদীওয়ালাও এ মত পোষণ করেন। আর এক কিংবদন্তি এই যে, আরাকান রাজ চূড়সিংহ চন্দ্র ৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম জয় করে সেখানে একটি জয়স্তম্ভ নির্মাণ করে তাতে ‘চিৎ তৌৎ গৌং’ (যুদ্ধ করা অনুচিত) এই বাণী উৎকীর্ণ হয়। এরই বিকৃত রূপ ‘চাটিগাঁও’। চট্টগ্রামে বৌদ্ধদের মতে, ‘চৈত্যগ্রাম’ থেকে চাটিগাম বা চট্টগ্রামের উৎপত্তি। হিন্দুদের ধারণা ‘চট্ট’ (কুলীন ব্রাহ্মণ)-দের নিবাস বলে চট্টল থেকে চট্টলা কিংবা চট্টগ্রাম হয়েছে। মুসলমানদের বিশ্বাস শাহ বদর আলম চাটি (মাটির আলোকবর্তিকা) জ্বালিয়ে জিন-পরীর কবল থেকে অঞ্চলটিকে মুক্ত করেন বলে স্থানটি চাটিগ্রাম বা চাটিগাঁও নামে অভিহিত হয়েছে। বার্নোলি বলেছেন, আরবি শাত (ব-দ্বীপ) ও গঙ্গা (নদী) থেকে অর্থাৎ গঙ্গার মুখস্থিত ব-দ্বীপ অর্থে আরব বণিকরা একে শাৎগাঙ বা শাৎগাঁও নামে অভিহিত করত এবং উচ্চারণ বিকৃতির ফলে চাটগাঁও, চাটিগাঁও এবং সংস্কৃতায়নের ফলে চট্টগ্রাম হয়েছে অনুমিত।

ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার

চিটাগং-এ এলএসএস ওম্যালি অনুমান করেছেন সংস্কৃত চর্তুগাম বা চারিগ্রাম থেকে ‘চাটিগাঁও’ নামের উৎপত্তি। ‘আহাদিসুল খাওয়ানীন’ লেখক খান বাহাদুর হামিদুল্লাহ খানের মতে, হোসেন শাহের (১৪৯৩-১৫১৯) পুত্র নুসরৎ শাহ ১৫১৩ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম জয় করে এর নাম দেন ‘ফতহ-ই-আবাদ’ এবং শায়েস্তা খান ১৬৬৬ সালে চট্টগ্রাম অধিকার করে আওরঙ্গজেবের অভিপ্রায়ক্রমে এর নাম রাখেন ‘ইসলামাবাদ’। পর্তুগিজ বণিকরা ‘পোর্টে গ্রান্ডো’ বলেই পরিচয় দিত। আল ইদ্রিসী কর্ণফুলীর নামানুসারে একে ‘কর্ণবুল’ নামে আখ্যায়িত করেন।
আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ তার ইসলামাবাদ বইয়ে উল্লেখ করেন চট্টগ্রামের শেষ মোগল শাসনকর্তা মোহাম্মদ রেজা খাঁর ভাই হাকিম মোহাম্মদ হোসেন খাঁ চট্টগ্রামে ভ্রমণে এসেছিলেন। তিনি তার ‘মখজনল আদবীয়া’ গ্রন্থে চট্টগ্রামের প্রাচীন নাম ‘শহরে সবজ’ বা ‘সবুজ শহর’ উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বৃক্ষলতা পরিপূর্ণ ও শস্য শ্যামল বলিয়াই উহার এরূপ নামকরণ হইয়াছিল।

প্রাগৈতিহাসিক যুগে চট্টগ্রাম
চট্টলতত্ত্ববিদ আবদুল হক চৌধুরী তার বন্দর শহর চট্টগ্রাম বইয়ে লিখেছেন ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুন্ডু পর্বতে প্রাগৈতিহাসিক যুগের কিছু নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়। এতে চট্টগ্রাম একটি সুপ্রাচীন দেশ হিসেবে প্রমাণিত হয়। সেখানে সুপ্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন নব্য প্রস্তর যুগের অশ্মীভূত কাঠের তৈরি হাতিয়ার ‘তলোয়ার’ আবিষ্কৃত হয়। এসব তলোয়ারের মধ্যে লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে চারটি, কলকাতা ও ঢাকা মিউজিয়ামে একটি করে তলোয়ার সংরক্ষিত আছে। এ থেকে ঐতিহাসিকরা ধারণা করেন, আট থেকে দশ হাজার বছর আগে দক্ষিণ আরবের গোলমাথা বিশিষ্ট জনগোষ্ঠী চট্টগ্রামে বসতি স্থাপন করেছিল। ঐতিহাসিক ম্যাককিন্ডল ও পার্জিটার সাহেব মনে করেন মহাভারতে বর্ণিত কিরাত রাজ্য ও গ্রিক ভৌগোলিকদের বর্ণিত কিরাদীয় রাজ্য বলে যে রাজ্যের উল্লেখ দেখা যায় চট্টগ্রাম সেই রাজ্যের অন্তর্গত ছিল।
ড. আহমদ শরীফ লিখেছেন স্থানীয় কিংবদন্তি সূত্রে জানা যায়, মহাভারতিক যুগে কর্ণের পুত্র বিকর্ণ চট্টগ্রামে রাজত্ব করতেন। তার রাজধানী ছিল কাঞ্চন নগর। পটিয়া ও ফটিকছড়ি থানা অঞ্চলে দুটো ‘কাঞ্চননগর’ আছে, সাতকানিয়া থানায় আছে ‘কাঞ্চনা’। এ তিনটিই বিকর্ণের রাজধানীর গৌরব দাবি করে।

ঐতিহাসিক যুগে চট্টগ্রাম
বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মিয়ানমার বা বার্মার আরাকান রাজ্য প্রাচীনকাল থেকেই এক দেশ হিসেবে পরিগণিত হতো। তখন চট্টগ্রাম ও আরাকান আদিম জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত ছিল।
ড. আহমদ শরীফ লিখেছেন, আরাকানের প্রাচীন ইতিহাস রাজোয়াং সূত্রে জানা যায়, খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকের মধ্যভাগে চন্দ্রসূর্য নামক মগধের এক সামন্ত (১৪৬ খ্রিস্টাব্দে) আদিম জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত ভূখ- চট্টগ্রাম ও আরাকান অধিকার করে সর্বপ্রথম একটি রাজ্য স্থাপন করেন এবং তিনি সেখানকার রাজা হন। তার রাজধানী ছিল আরাকানের ধান্যবতীতে। খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতক পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও আরাকান অখন্ড  রাজ্যরূপে শাসিত হয়েছিল।
আবদুল হক চৌধুরী তার বন্দর শহর চট্টগ্রাম বইয়ে লিখেছেন, ষষ্ঠ শতকে চট্টগ্রাম সমতটের খড়গ রাজবর্ষ ও সপ্তম শতকে দেবরাজ বংশের শাসনাধীন ছিল। অষ্টম শতকে রাজা ধর্মপালের রাজ্যভুক্ত হয় চট্টগ্রাম। নবম শতকে হরিকেল রাজ্যভুক্ত হয়। অষ্টম-নবম শতক থেকে আরব্য বণিকরা চট্টগ্রামে বাণিজ্যের জন্য আসা শুরু করে। দশম শতকে চট্টগ্রাম পুনরায় আরাকানের চন্দ্র রাজবংশের অধিকারভুক্ত হয়। এই শতকেই চট্টগ্রামে পন্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়। দশম শতকের শেষ দিকে ত্রিপুরা রাজ চেংথুম ফা সর্বপ্রথম স্বল্পকালের জন্য চট্টগ্রাম অধিকার করেন। একাদশ শতাব্দীতে ব্রহ্মদেশের রাজা অনরহট আরাকান, চট্টগ্রাম ও দক্ষিণ বঙ্গের বিস্তৃত অঞ্চল জয় করেন। ত্রয়োদশ শতকের প্রথমার্ধে চট্টগ্রামে রাজত্ব করেন দেব বংশীয় রাজা দামোদর দেব। ত্রয়োদশ শতকের মধ্যভাগে আরাকান রাজ অলংপিউ চট্টগ্রামসহ বঙ্গদেশের কিছু অংশ জয় করেন। এই শতকের শেষভাগে আরাকান রাজ মেংদি তার রাজ্য ব্রহ্মপুত্র তীর পর্যন্ত বিস্তার করেন। ত্রয়োদশ শতকের শেষ দিকে তাতারের খান অল্পকালের জন্য চট্টগ্রাম অধিকার করেছিলেন। চতুর্দশ শতকের প্রথম দিকে চট্টগ্রাম পুনরায় আরাকান রাজ্যভুক্ত হয়।
এরপর থেকে শুরু হয় সুলতানী আমল, আফগান আমল, আরকানী আমল, পর্তুগিজ ও মোগল আমল। এ সময়ে বিভিন্ন রাজা-বাদশাহর অধীনে শাসিত হয় চট্টগ্রাম।

হাজার বছরের পুরনো বন্দরনগর
আবুল মনসুর আহমদ তার বাংলাদেশের কালচার বইয়ে উল্লেখ করেন, ঐতিহাসিকদের সর্বসম্মত মত এই যে, খ্রিস্টপূর্ব দুই শতক থেকে ইয়েমেন ও ব্যাবিলনীয় অঞ্চলের অমুসলমান আরব নাবিকরা যখন পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের সঙ্গে ব্যবসাসূত্রে জড়িত হয়, তখন থেকেই চট্টগ্রাম ছিল তাদের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র।
৬৪ খ্রিস্টাব্দে রোমান ঐতিহাসিক প্লিনির রচিত ‘পেরিপ্লাস অব দ্য ইরিথেরিয়ান সি’ গ্রন্থেও চট্টগ্রাম বন্দরের বর্ণনা রয়েছে। এতে বলা হয়েছে গঙ্গা নদীর তীরে নদীর নামেই একটি বন্দরশহর আছে। এই স্থানে চন্দনকাঠ, মুক্তা ও অতি মিহি গ্যাঙ্গেটিক নামের মসলিন বস্ত্র আনা হয়। কথিত আছে, এই স্থানের কাছেই কোনো স্বর্ণখনি আছে। এখানে ক্যালটিস নামের স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন আছে। এই নদীর ঠিক অপর পাড়ে মোহনার কাছে সমুদ্রের মধ্যে একটি দ্বীপ আছে। উদীয়মান সূর্যের নিচে অবস্থিত সর্ব পূর্বের বসতি এলাকা এটি। এই দ্বীপটি শ্রীশে নামে খ্যাত।
ইতিহাস গবেষক আবদুল হক চৌধুরী লিখেছেন, প্লিনি বর্ণিত দুই হাজার বছর আগের চট্টগ্রামের প্রাচীন বন্দরের অবস্থান কোথায় ছিল তার কোনো স্মারক চিহ্ন নেই। তবে বর্ণনা থেকে অনুমান করা যায় শ্রীশে বা সন্দ্বীপ সোজা সন্দ্বীপ চ্যানেলের পূর্বদিকে আধুনিক সীতাকুন্ড থানার অন্তর্গত বাড়বকুন্ড থেকে দক্ষিণে কোথাও সম্ভবত চট্টগ্রামের সর্বপ্রাচীন বন্দর অবস্থিত ছিল।
আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ লিখেছেন, পর্তুগিজদের বাণিজ্য ব্যবসায়ের ফলেই ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে চট্টগ্রাম একটি সুবৃহৎ বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত হয়। গঙ্গার অপর তীরবর্তী সাতগাঁও তখন একটা প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল। পর্তুগিজরা এটাকে পোর্টো পিকোয়েনো বা ক্ষুদ্র বন্দর নামে অভিহিত করত। এর সঙ্গে তুলনায় তারা চট্টগ্রামকে পোর্টো গ্রান্ডো বা বৃহৎ বন্দর আখ্যা প্রদান করে।

কারিকা ডেক্স


ঘণ্টাখানেক জিপ হাঁকিয়ে আমরা আবার অল্প সময়ের জন্য থামি বড়সড় এক দহের কাছে। এখানকার জলের অবতলে শ্যাওলার সবুজ আস্তর। মাঝে মাঝে খৈ ফোটার মতো ঝিকিয়ে ওঠে চার-ছ’টি রুপালি মাছ। সারা দহজুড়ে ভাসছে অনেকগুলো মাছ ধরার নাও। মাঝিরা বাচ্চাদের মাশারির মতো দেখতে মস্ত সব জাল নিয়ে তাক করে আছে। জিপের দোদুল্যমানতায় তন্দ্রাচ্ছন্ন হতে হতে মনে হয় ডার্করুমে ফুটে ওঠা ফটোগ্রাফের প্রিন্টের মতো অবচেতনের আঁধারে ছবি হয়ে ভাসে এক তরুণী মাঝির নাও বেয়ে পসরা নিয়ে ভেসে যাওয়া আর জেলেদের জাল হাতে দহের জলে ওঁৎ পেতে বসে থাকা।
এদিকে দীর্ঘ ঘাসের সবুজে সয়লাব হয়ে আসা বিশাল এ মাঠে অনেকটা যেন উপত্যকার ব্যাপ্তি আছে। আমাদের জিপখানা মানচিত্রে আঁকা নদী রেখার মতো সড়ক ধরে ধীরলয়ে চলে। সমতলে চলে এসেছি বলে আমাদের আর পরস্পরের ওপর গড়িয়ে পড়ার কোনো সম্ভাবনা থাকে না। ফুয়াং এখন তার উচ্ছলতাকে কচ্ছপের গ্রীবার মতো মনের খোলে পুরে নিশ্চুপ হয়ে নখের বাসি রঙ খোঁটে। আমি জানালা দিয়ে দূর দিগন্তে মেঘমালার পানে ছুটে চলা নীল অরণ্য দেখি। দেখতে দেখতে প্রান্তরের ঘাসের রঙ বিবর্তিত হয়ে হালকা হরিতে রূপান্তরিত হয়। আমাদের গাড়িখানা এখন দু’পাশে ঘাসের ঘন বুনটে অযত্নে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বেড়ে ওঠা অজস্র হলদে রঙের ফুলের মাঝ দিয়ে বেয়ে যায়। মাঠে বোধ করি উজান-বিজান হাওয়া খেলে। আমরা যেতে যেতে ছবির ফ্রেমের মতো বর্গাকৃতির জানালা দিয়ে দীর্ঘ ঘাস ও হলুদ ফুলের নুয়ে পড়ে জড়িয়ে যাওয়া দেখি।
মাঠের দৃশ্যপটে এবার আসে ভিন্নতর ব্যঞ্জনা। এখন পথের দু’পাশে নানা আকৃতির ছোট-বড় বেশ কিছু জলাশয়। প্রাকৃতিক এ পুকুরগুলোর জল কালচে টোপাজ পাথরের মতোই টলটলে। চেয়ে থাকলে মনে হয় পানির ওপর তীব্র সূর্যালোকে উড়ছে রুপালি বর্ণের মিহি বাষ্প। প্রতিটি জলাশয়ে ভাসে একটি বা দুটি কেবল একজনের বসার উপযোগী অতি ক্ষুদ্র নৌকা। মাথাইল পরা মাঝিরা নাওগুলোতে বৈঠা হাতে অলস বসে থাকে। প্রান্তর থেকে বয়ে আসা শনশন হাওয়ায় তাদের নাওগুলো ধীরলয়ে দোলে। ফুয়াং আস্তে করে আমার হাত ছুঁয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সে আমাকে সামনের দিকে তাকাতে ইশারা করে। মনে হয় অতি প্রাচীন যুগের কোনো এক দুর্গের সদর দরজা আমাদের অভ্যর্থনা করতে ছুটে আসছে। জিপের পেছন সিটে বসে আমরা দু’জন ঘাড় বাঁকিয়ে কালো পাথরে গড়া পুরাতাত্ত্বিক দেউড়ির দিকে তাকাই। জিপখানা দ্রুত সিংহদুয়ার অতিক্রম করে দুর্গের ভেতর মহলে চলে আসে। আমি হঠাৎ করে কোনো ঐতিহাসিক স্থানে চলে আসার উত্তেজনায় চাপাস্বরে চেঁচিয়ে ড্রাইভারকে গাড়ি রুখতে বলি।

আমি ও ফুয়াং চারপাশে কালো পাথরের চৌদেয়ালে ঘেরা শত শত একরের কম্পাউন্ডের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে ঠিক বুঝতে পারি না কোথা থেকে এ পুরাতাত্ত্বিক কেল্লাটির পর্যবেক্ষণ শুরু করব? দুর্গের অন্দরমহল এমনই বিশাল যে, দু’পাশে দুটি সিংহদুয়ারকে ঘুলঘুলি মতো দুটি ছোট্ট জানালা বলে বোধ হয়। আমি এখানে কোনো প্রাসাদ, আস্তাবল, টাঁকশাল বা মন্দির বা মিনার নেই দেখে অবাক হই। ফুয়াংকে জিজ্ঞেস না করে পারি না যে, কেল্লাটি কি কোনো ভিয়েতনামিজ সম্রাটের প্রাসাদ ছিল? কতইবা এ সৌধের বয়স? আমার প্রশ্নে ফুয়াং চোখ বড় বড় করে তাকায়। সে ঠোঁট কামড়ে নতমুখী হয়ে দীর্ঘ ঘাসের আড়ালে ফুটে থাকা বেগুনি ফুলের দিকে তাকিয়ে আছে দেখে বুঝতে পারি আমার প্রশ্নের জবাব বলে কিছু তার জানা নেই। তাকে এ বিব্রতকর অবস্থা থেকে রেহাই দেয়ার জন্য বলি, ‘তুমি আমাকে এ চত্বরটি একটু ঘুরিয়ে দেখাবে না?’

লম্বা লম্বা ঘাস পায়ে দলে, চোরকাঁটা মাড়িয়ে বেগুনি ফুলদলের ভেতর দিয়ে পথ করে করে আমরা চত্বরের এক প্রান্তে অতিবৃহৎ এক দরদালানের পাথুরে ভিটার ওপর এসে দাঁড়াই। গৃহটির দেয়াল বলে কিছু আর অবশিষ্ট নেই, তবে দু’পাশে লতানো ড্রাগনের মূর্তি আঁকা বেশ কিছু সিঁড়ি বোধ করি দূরাগত যুগের পর্যটকদের দেখা দেয়ার জন্য এখনো টিকে আছে। আমি ও ফুয়াং একটি সিঁড়ির ধাপ ভেঙে ধীরলয়ে ওপরের দিকে উঠি। আমাদের দু’পাশে দুটি পাথরের ড্রাগন যেন রক্ষাকবচ হয়ে খরদৃষ্টিতে পরস্পরের দিকে তাকায়। ঘাসে ডানার দীর্ঘ ছায়া ফেলে চক্রাকারে উড়ে দুটি অতি বৃহৎ বাজপাখি। তারা দালানের ভিটার ওপর দিয়ে কেবলই উড়ে উড়ে অস্থির ক-র-র-র-র শব্দে ডাক ছাড়ে। মনে হয় মস্ত পাখি দুটি প্রাসাদের ভগ্নাবশেষে আমাদের ঘুরে বেড়ানো পছন্দ করছে না। আমরা সিঁড়ি বেয়ে ঘাসে নেমে এলে বাজ দুটি একটি সিংহ-দুয়ারের দিকে ওড়ে। এখন তারা দেউড়ির কার্নিশে বসে আবারো অস্থির ক-র-র-র-র আওয়াজ ছড়ায়। আমি সিংহ-দুয়ারের দিকে হেঁটে গিয়ে পাখি দুটির ছবি তুলতে গেলে ফুয়াং কিছুতেই আমাকে তা করতে দেয় না। সে জামার আস্তিন খামচে ধরে আমাকে ঠেকায়। আমি বিরক্ত হয়ে জানতে চাই, ‘ফুয়াং বিষয়টি কী?’ সে চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে বুঝি কোন গুপ্ত কথা বলছে এমনভাবে আমাকে জানায়, ‘সাবধান প্রাসাদের রাজা-রানীর আত্মা দেউড়ির শিখরে বসে আমাদের দেখছে!’ আমি যে তার বক্তব্য মোটেই বিশ্বাস করছি না তা বোধ করি আমার অভিব্যক্তিতে ধরা পড়ে। এতে ফুয়াং স্পষ্টত দুঃখিত হয়। সে নতমুখী হয়ে অভিমানে নিচের ঠোঁট কামড়ায়।

রাজা-রানীর আত্মা দুটিকে আলোকচিত্রে ধরা যায় না বটে, তবে খানিক কসরতে ফুয়াংকে রাজি করাতে পারি অন্য সিংহ-দুয়ারটি ঘুরে-ফিরে দেখার জন্য। এ দেউড়িতে এসেই মনে হয় পুরাকালে এটি হস্তীযুথ চলাচলের জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল। এখন এর উচ্চ ছাদ থেকে থোকায় থোকায় ঝুলছে বেশ ক’টি মৌচাক। এখানে আসা মাত্রই যেন চরাচরের নির্জনতা এসে আমাদের মাঝে সংক্রামিত হয়। আমি উল্টাদিকে তাকিয়ে কয়েকশ’ একর তফাতে একই সরলরেখায় তৈরি অন্য সিংহ-দুয়ারটির দিকে তাকাই। আর্চের মতো করে গড়া রাজকীয় দুয়ার দুটির দু’পাশে এক জোড়া নীল পাহাড়ের চূড়া পরস্পরের দিকে মুখোমুখি তাকিয়ে আছে। মনে হয় এখানে না এলে বুঝি পাহাড়দ্বয়কে একই সরলরেখায় দেখার অবকাশই হতো না। একঝাঁক মৌমাছি গুঞ্জন তুলে আমাদের পাশ দিয়ে সিংহ-দুয়ারের দিকে উড়ে গেলে আমরা আবার প্রকান্ কম্পাউন্ডের চরাচর সদৃশ চাতালে একাকী দাঁড়িয়ে থাকার অনুভূতিতে সচেতন হই। আমরা পরস্পরের দিকে তাকাই। ফুয়াং-এর নিশ্চুপতা থেকে মনে হয় সে এবার ফিরে যেতে চায়। কিন্তু আমি আরো খানিক পর্যটন না করে যেন তৃপ্তি পাই না।

দুর্গ প্রাচীরের এক স্থানে এক সময় বুঝি ওপরে ওঠার সিঁড়ি ছিল। এখন তা খানিক ভগ্ন, ঘাস ও ঝোপঝাড়ে ঢাকা। আমি সাহস করে জিন্সের হাঁটু ছেঁচড়ে পাঁচ ধাপ ওপরে উঠি। প্রায় বারো ফুট উঁচু প্রাচীরটি এখন প্রায় নাগালের মাঝে। আমি নিচের দিকে তাকিয়ে ফুয়াংকে উৎসাহিত করি। সে কিঞ্চিৎ ইতস্তত করে বিশ্বস্ত নারীদের মতো আমাকে অনুসরণ করে। ফুয়াং অ্যাথলেটিক গোছের মেয়ে। যথাকিঞ্চিৎ চড়াই-উৎরাই ভাঙা তার জন্য তেমন কিছু চ্যালেঞ্জ না। যদিও প্রয়োজন ছিল না, তারপরও বোধ করি শিভালরিবশত আমি তার বাহু ধরে টেনে ওপরে ওঠাই। এ টানাপোড়েনে তার প্যান্টে টাকিন করা টি-শার্টটি বেরিয়ে আসে। আমি চকিতে না পড়া কোনো গ্রন্থের হঠাৎ পাতা উল্টিয়ে ভেতরকার ছবিটি দেখে ফেলার মতো তার ক’টি দেশের মসৃণতা দেখতে পাই। সে আমার দিকে লাজুক হেসে দ্রুত টি-শার্ট কোমরে গুঁজে। সিঁড়ির বাকি ক’টি ধাপ অতিক্রম করা আমাদের জন্য তুলনামূলকভাবে সহজ হয়। আমরা অবশেষে কালো পাথরে গড়া প্রাচীরের ওপর এসে দাঁড়াই। শত শত বছরের পুরনো এ দেয়ালটি আকারে প্রশস্ত। দুটি ভিনদেশী মানব-মানবীর এখানে একত্রে দাঁড়িয়ে থাকতে তেমন কিছু অসুবিধা হয় না। আমরা প্রাচীর থেকে অল্প দূরে সোনালি ধানক্ষেতে মহিষের পিটে চড়ে এক রাখালকে বাঁশি বাজাতে দেখি।

আমরা দেয়াল ধরে হেঁটে হেঁটে বেশ খানিকটা দূরে চলে এসে নিচের দিকে তাকালে আমার গা ঈষৎ শিরশির করে। প্রাচীর সংলগ্ন বহির্ভাগের জমির খাদের মতো নিম্নতা দেখে আন্দাজ করি এখানে হয়তো হাজার বছর আগে জলভরা গড়খাই ছিল। যে উপত্যকা খানিক আগে জিপযোগে অতিক্রম করে এসেছি আমার দৃষ্টি সেখানে চলে যায়। মনে হয় এমন প্রসারিত তেপান্তর ইতিপূর্বে কখনো চাক্ষুষ করিনি। প্রায় সমতল বিপুল এ প্রান্তরে ফুটে আছে হাজারো হলুদাভ ফুল। মাঝেমধ্যে গুচ্ছ গুচ্ছ বেগুনি ফুলের আভাস নিসর্গপটে এনেছে রঙের বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনা। আমি উপত্যকার দু’পাশে প্রকৃতির সুরক্ষা প্রাচীর হয়ে দাঁড়ানো দু’সারি নীল পর্বতের পানে তাকাই। কল্পনা করি, হয়তো হাজার বছর আগে এরূপ উচ্চতায় দাঁড়িয়ে কোনো নাম না জানা রাজপুরুষ রাজস্থানি টাপেস্ট্রীতে গাঁথা আয়নার মতো ছোট ছোট জলাশয়ে যেন বটের পাতায় তৈরি ছোট ছোট নৌকার মৃদুমন্দ ভাসা দেখে প্রকৃতির অগ্নিজলে নিজেকে অবগাহন করে নিয়েছিলেন। আমার ভ্রমণ সঙ্গিনীর বোধকরি ধ্যানস্থ হওয়ার ধাত নেই। ফুয়াং চোখেমুখে এক রাশ অস্থিরতা নিয়ে দেয়ালের ওপর দিয়ে টুকটুক করে হাঁটে। আমি তার সহযাত্রী হয়ে পাশে পাশে চলার চেষ্টা করি। বহু দূরের নীল পাহাড় থেকে বুঝিবা উলুক-ঝুলুক বাতাস এসে আমাদের দেহমনে ঝাপটা হানে। আমরা স্বেচ্ছায় নিতান্ত আত্মরক্ষার তাগিদে পরস্পরের হাত ধরে ভারসাম্য রক্ষা করি।

আমরা কেল্লার কম্পাউন্ডে একটু ঘুরপথে দেউড়ির দিকে আসতে গেলে চোখে পড়ে লালচে ইটে গাঁথা এক মন্দিরের ভগ্নস্তূপ। জিপের কাছে এসে দেখি একদল পথচলা মানুষ  জনা আষ্টেক আটপৌরে পোশাকের ভিয়েতনামিজ থিয়েটারে দুর্গাদাসকে দেখার মতো করে বিদেশি সংস্থার তেল চিক্ষণ জিপটিকে দেখছে। আমি ও ফুয়াং গাড়ির কাছাকাছি আসতেই তারা ফুয়াংকে আমার কথা জিজ্ঞেস করে। পথচলা দলটিতে একজন মাত্র প্রৌঢ়। বাকিরা সবাই তরুণ বয়সের পুরুষ। দু’জন মলিন হ্যাট পরা যুবক অনেকটা পাল্কির মতো দেখতে কাঠের কাঠামো বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পাল্কিতে রাখা অনেকগুলো জল পুতুল, লোহিত ও সোনালি বর্ণের ড্রাগন এবং ঝলমলে মাছ। অন্য একজন তরুণ বাঁকে করে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে মাদুর। প্রৌঢ় চোখের পাতা নাচিয়ে আমাকে পুতুলগুলো দেখতে ইশারা করেন। ফুয়াং ব্যাখ্যা করে জানায়, ‘আজ রাতে প্রান্তরের একটি জলাশয়ে চিত্রিত মাদুরের দৃশপট টাঙিয়ে এ মানুষগুলো জল পুতুলের নাচ দেখবে।’ প্রৌঢ় যেন আমাকে আরো কিছু বলতে চান। কিন্তু ফুয়াং অস্থির হয়ে পড়ে। বাজ দুটি আবার চক্রাকারে আমাদের জিপের ওপর দিয়ে উড়ছে। জল পুতুলের কুশীলবরা সবার ভুরু কুঁচকে কপালে হাত রেখে আকাশে উড়ন্ত পাখি দুটির দিকে তাকায়। চিলের হাত থেকে মুরগির বাচ্চাকে ঝাঁকায় ঢেকে বাঁচানোর মতো ফুয়াং আমার আস্তিন টেনে জিপে তোলে। ড্রাইভার যেন অপেক্ষায়ই ছিল, আমাদের সিটে বসা মাত্রই সে গাড়ি স্টার্ট দেয়। আমি জানালা দিয়ে পেছন ফিওে দেখি পাল্কিভরা নাচের নটঘট নিয়ে পুতুল খেলার কারিগররা অবাক হয়ে আমাদের সহসা চলে যাওয়া দেখছে।

 

0 1472
কারিকা ডেস্ক :
নিজের একটি ফ্ল্যাট কে না চান! আপনার জন্যই এক অঙ্কের সুদ নিয়ে অপেক্ষা করছে কয়েকটি ব্যাংক। আবেদন করে সহজ শর্তে আপনি পেতে পারেন ১ কোটি ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ। পাশাপাশি মিলছে ২৫ বছর পর্যন্ত ঋণ পরিশোধের সুযোগ। এই ঋণেই একটি স্বপ্নের ফ্ল্যাটের মালিক হতে পারেন আপনি।
ব্যাংকগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে আইএফআইসি, ব্র্যাক, ইস্টার্ন, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইডিএলসিসহ আরও কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এক অঙ্কের সুদে গৃহঋণ বা হোম লোন দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ২০১৫ সালের পয়লা জানুয়ারি গৃহায়ণ খাতে ঋণের সীমা গ্রাহকপ্রতি বাড়িয়ে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা করা হয়; আগে যা ছিল ১ কোটি টাকা। এ ছাড়া ঋণ ও মূলধন অনুপাত ৭০: ৩০ করা হয়। অর্থাৎ ১ কোটি টাকার ফ্ল্যাটে ব্যাংক ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন করতে পারবে। বাকি ৩০ লাখ টাকা জোগান দিতে হবে গ্রাহককে। তবে একজন গ্রাহককে কোনোভাবেই ১ কোটি ২০ লাখ টাকার বেশি ঋণ দিতে পারবে না ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নির্দেশনার পরই মূলত ব্যাংকগুলো গৃহঋণ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করে।
ব্যাংকগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্যাংকগুলো অনেক আগে থেকেই গৃহঋণ দিয়ে এলেও ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে আইএফআইসি ব্যাংক প্রথম কম সুদে এই ঋণ নিয়ে আসে। ব্যাংকটি সে সময়ে ১১ দশমিক ৯৫ শতাংশ সুদে গৃহঋণ দেওয়া শুরু করে; যে সময়ে অন্য ব্যাংকগুলোতে সুদের হার ছিল ১৫ শতাংশের বেশি। পরে একই বছরের আগস্টে ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ ও ডিসেম্বরে সুদহার কমিয়ে ৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ করে ব্যাংকটি।
ব্যাংকটি গত মার্চ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ১০০ গ্রাহককে গৃহঋণ দিয়েছে। এ খাতে ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। ঋণের সুবিধাভোগীদের মধ্যে বড় অংশই বাড়ির মালিক ও চাকরিজীবী। এ ছাড়া কিছু ব্যবসায়ীও এই ঋণ নিয়েছেন।
আইএফআইসি ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ব্যাংকটির ঋণের ৪০ শতাংশ গেছে রাজধানীর বাইরে। ৬০ শতাংশ গেছে রাজধানী ও আশপাশে। শুধু বরিশাল অঞ্চলের ৫০ গ্রাহক ১৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন।
যোগাযোগ করা হলে আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ আলম সারওয়ার বলেন, ‘সুদের হারের কারণে গ্রাহকেরা ফ্ল্যাট কেনার চিন্তাই করতেন না। ব্যাংক হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব ছিল গ্রাহককে এ বিষয়ে সহায়তা করার। আকর্ষণীয় সুদের হার দিয়ে সেবা চালুর পরই আমরা ভালো সাড়া পাচ্ছি। আমাদের পর অন্য ব্যাংকগুলোও একই সেবায় গেছে। এতে গ্রাহকদের এখন নিজের একটি ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে।’
জানা যায়, কেউ অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ টেকওভার করলে আইএফআইসি ব্যাংক তাঁকে ৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিচ্ছে। এ ছাড়া বাড়তি ঋণের ক্ষেত্রেও একই সুদ। এতে কোনো প্রসেসিং মাশুলও নেই। তবে নতুন ঋণের ক্ষেত্রে ১ শতাংশ প্রসেসিং মাশুল ও সুদের হার ১১ দশমিক ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। গ্রাহকভেদে কম সুদেও ঋণ মিলতে পারে। নতুন ঋণে ছয় মাস অতিরিক্ত সময়ও মিলবে ঋণ পরিশোধে। একই সুবিধা মিলছে অন্য ব্যাংকগুলোতেও। তবে গ্রাহকভেদে সুদের হারের ভিন্নতা হতে পারে।
ব্যাংকগুলো সূত্রে জানা গেছে, শুধু গত মার্চ মাসেই আইএফআইসি ব্যাংক ৮৫ কোটি টাকা, ইস্টার্ন ব্যাংক প্রায় ৪০ কোটি টাকা ও ব্র্যাক ব্যাংক ৮০ কোটি টাকা গৃহঋণ দিয়েছে। ব্র্যাক ব্যাংক এ খাতে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে।

0 1310
কারিকা ডেস্ক : উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক বলেছেন, প্রত্যেক সেক্টরে কাজ শুরু হয়েছে। আগামী ৪ বছরে ঢাকা শহর বদলে যাবে।
রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনের চামেলী হলে সম্প্রতি ‘শক্তিশালী, কার্যকর সিটি করপোরেশন ও নিরাপদ, নারীবান্ধব ঢাকা মহনগর’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ আন্দোলনের উপ-পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটি এ মতবিনিময় সভা আয়োজন করে।
আনিসুল হক বলেন, অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমি এবং আমার পরিষদ অত্যন্ত ঘনবসতির এই সিটি করপোরেশনের উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। এখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৮৫ হাজার মানুষ বাস করে। এদের সব নাগরিকসেবা নিশ্চিত করা সহজ নয়। এসব সমস্যা কাটাতে অন্তত ৪-৫ বছর সময় দরকার।
তিনি বলেন, পরিষ্কার করা ও বাতি জ্বালানো ছাড়া মেয়রের তেমন কোনো কাজ নেই। সব জায়গার মশা মারার ক্ষমতাও এই পরিষদের নেই। সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রয়োজনীয় পাবলিক টয়লেট বসানোর জায়গাও পাওয়া যাচ্ছে না। পয়ঃনিষ্কাশন, পানি সরবরাহ, পুলিশের উপর নিয়ন্ত্রণ, আবাসন এসব কোনো কিছুর উপরই মেয়রের নিয়ন্ত্রণ নেই।
তিনি আরও বলেন, সিটি করপোরেশন এলাকা জুড়ে গড়ে ওঠা দেওয়ালগুলো এখানকার পরিবেশ রক্ষায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকা শহরের আবহাওয়া এতোটাই খারাপ যে, এখানকার ২৫ ভাগ শিশু ফুসফুসের গুরুতর রোগ ও সমস্যায় আক্রান্ত। দেওয়ালগুলো ভেঙে ফেলা সম্ভব হলে মহানগর অনেকটাই খোলামেলা হবে। আমরা সিটি করপোরেশন থেকে দেওয়ালগুলো ভেঙে ফেলার চেষ্টা করছি। অথচ সিভিল এভিয়েশন দেওয়াল নির্মাণ করছে।
আনিসুল হক বলেন, সিটি করপোরেশন এলাকায় ৬০০ সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। আগামী ৩ মাসের মধ্যে আরও ৪০০ বসানো হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী এটি উদ্বোধন করতে পারেন। ক্যামেরার পাশাপাশি এলএডি লাইট লাগানো হচ্ছে। কাঠবিড়ালি পার্ক, প্রজাপতি পার্ক ও খেলার মাঠের ব্যবস্থা হচ্ছে। এতে আগামী ৬-৯ মাসের মধ্যে মহিলারা নিরাপদে রাস্তায় চলাচল করতে পারবে। কেই তাদের যৌন হয়রানি করার সাহস দেখাবে না।
তিনি বলেন, এখন কোনো ঠিকাদারকে অফিসে আসতে হয় না। তাদের বাসায় চেক পৌছে দেওয়া হয়। এখন সিটি করপোরেশনে ই-টেন্ডারিং চালু করা হয়েছে। সিটি করপোরেশনে তিনদিনের মধ্যে ফাইলে নোট দেওয়ার বিধান চালু করা হয়েছে।
গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখাত পরিচালনা করে সিন্ডিকেট। একটি বাস পরিচালনায় শ্রমিক-কর্মচারিদের বেতন ভাতা বাবদ যদি ২০০ টাকা অফিসিয়িালি খরচ হয় তবে সিন্ডিকেটের জন্য লাগে ৭০০ টাকা। ফ্রানঞ্চাইজ পদ্ধতিতে নতুন করে ৩০০০ বাস নামানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, এখন মেয়েরা বাসে চলতে পারে না। তাদের কোমর ধরে বাসে তোলা হয়। নতুন বাস নামানো সম্ভব হলে এসব সমস্যা অনেকটাই কেটে যাবে।
অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বেগম, উত্তর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকার কাউন্সিলর রাশেদা আখতার ঝর্ণা, মাসুদা আক্তার, হাবিবুর রহমান মিজান প্রমুখ। মতবিনিময় সভার সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম।

0 1195
কারিকা ডেস্ক :
রাজধানীতে বসেছে পাঁচ দিনের মধুমেলা। মতিঝিলে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশন (বিসিক) প্রাঙ্গণে আয়োজিত এ মেলায় দেশীয় মধুর ব্র্যান্ড ও মৌচাষিরা অংশ নিয়েছেন। মেলা থেকে ক্রেতারা বিশেষ ছাড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি দরে কিনতে পারছেন বিভিন্ন ফুলের মধু।
বিসিক আয়োজিত এ মেলায় ২০টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। রোববার মেলার উদ্বোধন করেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া। এ সময় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হামিদুর রহমান ও বিসিকের চেয়ারম্যান মো. হজরত আলী উপস্থিত ছিলেন।
মেলায় অংশ নেওয়া মৌচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশে এখন সবচেয়ে বেশি মধু আহরিত হয় সরিষার ফুল থেকে। এর পাশাপাশি লিচু, কালিজিরা, মৌরি, ধনে, তিসিসহ বিভিন্ন ফুলের মধুও সংগ্রহ করা হয়।
মেলায় প্রতি কেজি সরিষা ফুলের মধু ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, কালিজিরা ফুলের মধু ৭৫০-৯০০ টাকা, লিচু ফুলের মধু ৪০০-৪৫০ টাকা, মৌরি ও তিসির মধু ৪০০ টাকা দরে বিক্রি করছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
বিসিকের হিসাবে, দেশে বছরে ৭ থেকে ৮ হাজার টন মধু উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে সুন্দরবন থেকে আসে প্রায় ২ হাজার টন। তিন বছর ধরে বছরে ৫০ হাজার টন করে উৎপাদন বাড়ছে।
বিসিকের মৌচাষ প্রকল্পের পরিচালক খোন্দকার আমিনুজ্জামান বলেন, দেশে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়। এর মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ থেকে এখন মধু আহরণ করা হচ্ছে। তাই শুধু সরিষা থেকেই মধুর উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব।
মধুমেলা চলবে আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত মেলা সবার জন্য উন্মুক্ত। এতে মধুর পাশাপাশি মধু ও আমের জেলি, ঘি, বেলের শরবত তৈরির গুঁড়াসহ বিভিন্ন পণ্য কিনতে পারবেন ক্রেতারা।
বিসিক জানায়, ১৯৭৭ সালে সংস্থাটি মৌচাষের কার্যক্রম শুরু করে। দেশে বর্তমানে আমদানি করা অ্যাপিস মেলিফেরা এবং দেশজ প্রজাতির অ্যাপিস সেরেনা মৌমাছি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বাক্সে পালন করে মধু আহরণ করা হয়।

কারিকা ডেস্ক:
রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় হার্ডওয়্যার পণ্য প্রদর্শনী ‘বাংলাদেশ আইসিটি এক্সপো ২০১৬’। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস) এ মেলার আয়োজন করেছে। গতকাল মঙ্গলবার বিআইসিসির মিডিয়া বাজারে মেলা উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ বলেন, হার্ডওয়্যার পণ্যের আমদানি কমিয়ে কীভাবে তা দেশে উৎপাদন করা যায়, তাই এই মেলার লক্ষ্য। এ জন্য সরকার ও বেসরকারি খাত একসঙ্গে মিলে কাজ করবে। আর এভাবে দেশের আইসিটি খাত এগিয়ে যাবে।
সংবাদ সম্মেলনে বিসিএসের সভাপতি এ এইচ এম মাহফুজুল আরিফ বলেন, হার্ডওয়্যার খাতে উদ্যোক্তা তৈরি এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশ আইসিটি এক্সপোর আয়োজন করা হয়েছে। সম্মেলনে আরও বক্তৃতা করেন আইসিটি সচিব শ্যাম সুন্দর শিকদার, মাইক্রোসফট বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোনিয়া বশির কবির এবং ডেলের কান্ট্রি ম্যানেজার আতিকুর রহমান।
মেলায় ৫৯টি প্যাভিলিয়ন ও ৭০টি স্টল থাকছে। এ ছাড়া তরুণ উদ্ভাবকদের জন্য থাকছে ইনোভেশন জোন। মেলায় তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ১৪টি সেমিনার ও কর্মশালা হবে। শিশুদের জন্য আছে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা।
‘মিট ডিজিটাল বাংলাদেশ’ স্লোগান নিয়ে এই মেলা চলবে ৫ মার্চ পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মেলা খোলা থাকবে সবার জন্য। মেলা আয়োজনে সহযোগিতা করছে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল, বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ, কন্ট্রোলার অব সার্টিফায়িং অথরিটি, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিস (বেসিস), ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি) এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কল সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিং। বিস্তারিত: www.ictexpo.com.bd

কারিকা ডেস্ক : রাজধানীতে বাড়ির মালিকদের মাধ্যমে ভাড়াটেদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের কাজ থেকে পুলিশকে বিরত থাকার অনুরোধ জানিয়ে উকিল নোটিশ পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। এ ছাড়া এ তথ্য সংগ্রহের আইনগত ভিত্তি কী, তা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লিখিতভাবে জানাতে বলা হয়েছে নোটিশে।
আইন ও স্বরাষ্ট্রসচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারকে মঙ্গলবার রেজিস্ট্রার ডাকে ওই নোটিশ পাঠানো হয়। পরে জ্যোতির্ময় বড়ুয়া সাংবাদিকদের বলেন, এভাবে ব্যক্তিগত তথ্য চাওয়ার কোনো আইনি ভিত্তি পুলিশের নেই। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব না পেলে তিনি আদালতে সুরক্ষা চাইবেন।
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া আরও বলেন, নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয় তথ্য পুলিশ যেভাবে সংগ্রহ করছে, তার অপব্যবহার হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা আছে। এসব তথ্য যদি কোনো ভুল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে পড়ে, তাহলে ব্যক্তির ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা আছে। সংবিধানে নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার যে অধিকার দেওয়া হয়েছে, পুলিশের এ উদ্যোগে সেটাও লঙ্ঘিত হতে পারে।
মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, রাজধানীর সব বাড়ির মালিক ও ভাড়াটেকে তাঁদের তথ্য দিয়ে ১৫ মার্চের মধ্যে পুলিশের সরবরাহ করা ফরম পূরণ করে থানায় জমা দিতে হবে। জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ দমন এবং নিরাপদ ঢাকা গড়তে এসব তথ্য হালনাগাদ করে একটি তথ্যভান্ডার করা হবে বলে কমিশনার জানান।
ওই সংবাদ সম্মেলনে কমিশনার আরও বলেন, রাজধানীর সব বাসায় ফরম পাঠানো হয়েছে। যাঁরা এখনো ফরম পাননি, তাঁরা থানায় যোগাযোগ করে ফরম সংগ্রহ করবেন। প্রতিটি থানাকে তার আওতাধীন প্রত্যেক ভাড়াটে ও বাড়ির মালিকের সব তথ্য সংগ্রহ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মহল্লা, হোল্ডিং, লেনভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করা হবে। একজন ভাড়াটে চলে গেলে নিকটস্থ থানাকে তিনি জানিয়ে যাবেন, তাঁর নাম কেটে দেওয়া হবে এবং নতুন ভাড়াটের তথ্য যুক্ত করা হবে।
পুলিশের সরবরাহ করা ফরমে বাড়ির মালিক/ভাড়াটের নাম, পিতার নাম, জন্মতারিখ, স্থায়ী ঠিকানা, বৈবাহিক অবস্থা, মোবাইল ফোন, পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর, পেশা-কর্মস্থল, পরিবারের সদস্যদের নাম, গৃহকর্মীর নাম-ঠিকানাসহ কিছু তথ্য চাওয়া হয়েছে।
এর আগেও বিভিন্ন থানা থেকে তথ্য চেয়ে বাড়ি বাড়িতে ফরম পাঠানো হয়েছিল। তবে বেশির ভাগ বাড়ির মালিক ও ভাড়াটে পুলিশকে তথ্য দেননি। পুলিশের দেওয়া সর্বশেষ হিসাবে রাজধানীতে দুই লাখের বেশি ফরম বিতরণ করা হয়েছিল।