Home মূল কাগজ বিশেষ রচনা

কারিকা ডেক্স


আবদুল্লাহ আল মামুন
চট্টগ্রাম-কতটা প্রাচীন নগর? এ প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর কারও কাছেই নেই। তবে ঐতিহাসিকরা বলছেন চট্টগ্রামের বয়স হাজার বছর। ১০ হাজার বছর আগের নিদর্শনও মিলেছে চট্টগ্রামে। বিশ্বের খ্যাতিমান ভূগোলবিদ ও ঐতিহাসিকদের বর্ণনায়ও চট্টগ্রামের প্রাচীন ইতিহাসের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রাচীনতার স্নিগ্ধ ঘ্রাণ এই নগরের কাদা-মাটি-জলে। কিংবদন্তির এই নগরের বাঁকে বাঁকে ছড়িয়ে আছে ঐতিহাসিকতার ছোঁয়া।
বাংলা একাডেমি প্রকাশিত আবদুল হক চৌধুরী রচনাবলির ভূমিকায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. আবদুল করিম লিখেছেন, ‘চট্টগ্রাম শহরের ইতিহাস অনেক প্রাচীন। কতখানি প্রাচীন তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। শহর গড়ার ইতিহাস মানব সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। মানব সভ্যতার ঠিক কোন পর্যায়ে চট্টগ্রামে একটি শহর গড়ে ওঠে তা এখন নির্ধারণ কষ্টসাধ্য। চট্টগ্রাম শুধু শহর নয়, এটি একটি বন্দর শহর। অর্থাৎ এ শহরের উন্নতি-অবনতি বন্দরের সমৃদ্ধির সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রাগৈতিহাসিক নিদর্শন আবিষ্কৃত হওয়ার ফলে দেখা যায়, প্রায় ১০ হাজার বছর আগে নব্য প্রস্তর যুগে চট্টগ্রামে জনবসতি ছিল। ঐতিহাসিক তথ্যের আলোকে টলেমী, প্লীনির বিবরণের ওপর নির্ভর করে বলা যায়, চট্টগ্রাম শহর বা বন্দরের ইতিহাস দুই হাজার বছরের প্রাচীন।’

চট্টগ্রাম নামের উৎস
চট্টগ্রামের নামের উৎপত্তি নিয়ে ড. আহমদ শরীফ তার চট্টগ্রামের ইতিহাস বইয়ে লিখেছেন তিব্বতী সূত্রে চট্টগ্রামের প্রাচীন নাম পাওয়া যাচ্ছে জ্বালনধারা তপ্তজল সমন্বিত অঞ্চল। এখানে কিছুকাল বাস করেছিলেন বলে সিন্ধু দেশীয় বৌদ্ধ সিদ্ধ বাল পাদ জ্বালনন্ধরী নাম প্রাপ্ত হন। হয়তো অগ্নিতপ্ত জল ধারণ করে বলেই স্থানটি ‘জ্বালন্ধর’ নামে পরিচিত ছিল। সীতাকুন্ডে ও বাড়বকু্নডে এখনও তপ্তজল পর্বত গাত্র থেকে নিঃসৃত হয়। এরই আরবি-ফারসি নাম সম্ভবত ‘সামন্দর’। সাম (অগ্নি) অন্দরে আছে যে স্থানে সেটিই সামন্দর।
তিনি লিখেছেন, সামন্দর নামের প্রথম উল্লেখ পাই ইবন খুর্দাদবেহ’র বর্ণনায়। ইনি এ অঞ্চলকে ‘রুহম’ বা ‘রুহমি’ রাজার শাসনভুক্ত বলে উল্লেখ করেছেন। সামন্দরের দ্বিতীয় উল্লেখ মেলে ‘হুদুদুল আলম’ গ্রন্থে। এখানে রাজার নাম দহুম। এই দহুম ও রুহম ড. আহমদ হাসান দানীর মতে একই নামের বিকৃতি। ইনি বঙ্গাধিপ ধর্মপাল। হোদীওয়ালাও এ মত পোষণ করেন। আর এক কিংবদন্তি এই যে, আরাকান রাজ চূড়সিংহ চন্দ্র ৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম জয় করে সেখানে একটি জয়স্তম্ভ নির্মাণ করে তাতে ‘চিৎ তৌৎ গৌং’ (যুদ্ধ করা অনুচিত) এই বাণী উৎকীর্ণ হয়। এরই বিকৃত রূপ ‘চাটিগাঁও’। চট্টগ্রামে বৌদ্ধদের মতে, ‘চৈত্যগ্রাম’ থেকে চাটিগাম বা চট্টগ্রামের উৎপত্তি। হিন্দুদের ধারণা ‘চট্ট’ (কুলীন ব্রাহ্মণ)-দের নিবাস বলে চট্টল থেকে চট্টলা কিংবা চট্টগ্রাম হয়েছে। মুসলমানদের বিশ্বাস শাহ বদর আলম চাটি (মাটির আলোকবর্তিকা) জ্বালিয়ে জিন-পরীর কবল থেকে অঞ্চলটিকে মুক্ত করেন বলে স্থানটি চাটিগ্রাম বা চাটিগাঁও নামে অভিহিত হয়েছে। বার্নোলি বলেছেন, আরবি শাত (ব-দ্বীপ) ও গঙ্গা (নদী) থেকে অর্থাৎ গঙ্গার মুখস্থিত ব-দ্বীপ অর্থে আরব বণিকরা একে শাৎগাঙ বা শাৎগাঁও নামে অভিহিত করত এবং উচ্চারণ বিকৃতির ফলে চাটগাঁও, চাটিগাঁও এবং সংস্কৃতায়নের ফলে চট্টগ্রাম হয়েছে অনুমিত।

ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার

চিটাগং-এ এলএসএস ওম্যালি অনুমান করেছেন সংস্কৃত চর্তুগাম বা চারিগ্রাম থেকে ‘চাটিগাঁও’ নামের উৎপত্তি। ‘আহাদিসুল খাওয়ানীন’ লেখক খান বাহাদুর হামিদুল্লাহ খানের মতে, হোসেন শাহের (১৪৯৩-১৫১৯) পুত্র নুসরৎ শাহ ১৫১৩ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম জয় করে এর নাম দেন ‘ফতহ-ই-আবাদ’ এবং শায়েস্তা খান ১৬৬৬ সালে চট্টগ্রাম অধিকার করে আওরঙ্গজেবের অভিপ্রায়ক্রমে এর নাম রাখেন ‘ইসলামাবাদ’। পর্তুগিজ বণিকরা ‘পোর্টে গ্রান্ডো’ বলেই পরিচয় দিত। আল ইদ্রিসী কর্ণফুলীর নামানুসারে একে ‘কর্ণবুল’ নামে আখ্যায়িত করেন।
আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ তার ইসলামাবাদ বইয়ে উল্লেখ করেন চট্টগ্রামের শেষ মোগল শাসনকর্তা মোহাম্মদ রেজা খাঁর ভাই হাকিম মোহাম্মদ হোসেন খাঁ চট্টগ্রামে ভ্রমণে এসেছিলেন। তিনি তার ‘মখজনল আদবীয়া’ গ্রন্থে চট্টগ্রামের প্রাচীন নাম ‘শহরে সবজ’ বা ‘সবুজ শহর’ উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বৃক্ষলতা পরিপূর্ণ ও শস্য শ্যামল বলিয়াই উহার এরূপ নামকরণ হইয়াছিল।

প্রাগৈতিহাসিক যুগে চট্টগ্রাম
চট্টলতত্ত্ববিদ আবদুল হক চৌধুরী তার বন্দর শহর চট্টগ্রাম বইয়ে লিখেছেন ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুন্ডু পর্বতে প্রাগৈতিহাসিক যুগের কিছু নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়। এতে চট্টগ্রাম একটি সুপ্রাচীন দেশ হিসেবে প্রমাণিত হয়। সেখানে সুপ্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন নব্য প্রস্তর যুগের অশ্মীভূত কাঠের তৈরি হাতিয়ার ‘তলোয়ার’ আবিষ্কৃত হয়। এসব তলোয়ারের মধ্যে লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে চারটি, কলকাতা ও ঢাকা মিউজিয়ামে একটি করে তলোয়ার সংরক্ষিত আছে। এ থেকে ঐতিহাসিকরা ধারণা করেন, আট থেকে দশ হাজার বছর আগে দক্ষিণ আরবের গোলমাথা বিশিষ্ট জনগোষ্ঠী চট্টগ্রামে বসতি স্থাপন করেছিল। ঐতিহাসিক ম্যাককিন্ডল ও পার্জিটার সাহেব মনে করেন মহাভারতে বর্ণিত কিরাত রাজ্য ও গ্রিক ভৌগোলিকদের বর্ণিত কিরাদীয় রাজ্য বলে যে রাজ্যের উল্লেখ দেখা যায় চট্টগ্রাম সেই রাজ্যের অন্তর্গত ছিল।
ড. আহমদ শরীফ লিখেছেন স্থানীয় কিংবদন্তি সূত্রে জানা যায়, মহাভারতিক যুগে কর্ণের পুত্র বিকর্ণ চট্টগ্রামে রাজত্ব করতেন। তার রাজধানী ছিল কাঞ্চন নগর। পটিয়া ও ফটিকছড়ি থানা অঞ্চলে দুটো ‘কাঞ্চননগর’ আছে, সাতকানিয়া থানায় আছে ‘কাঞ্চনা’। এ তিনটিই বিকর্ণের রাজধানীর গৌরব দাবি করে।

ঐতিহাসিক যুগে চট্টগ্রাম
বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মিয়ানমার বা বার্মার আরাকান রাজ্য প্রাচীনকাল থেকেই এক দেশ হিসেবে পরিগণিত হতো। তখন চট্টগ্রাম ও আরাকান আদিম জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত ছিল।
ড. আহমদ শরীফ লিখেছেন, আরাকানের প্রাচীন ইতিহাস রাজোয়াং সূত্রে জানা যায়, খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকের মধ্যভাগে চন্দ্রসূর্য নামক মগধের এক সামন্ত (১৪৬ খ্রিস্টাব্দে) আদিম জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত ভূখ- চট্টগ্রাম ও আরাকান অধিকার করে সর্বপ্রথম একটি রাজ্য স্থাপন করেন এবং তিনি সেখানকার রাজা হন। তার রাজধানী ছিল আরাকানের ধান্যবতীতে। খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতক পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও আরাকান অখন্ড  রাজ্যরূপে শাসিত হয়েছিল।
আবদুল হক চৌধুরী তার বন্দর শহর চট্টগ্রাম বইয়ে লিখেছেন, ষষ্ঠ শতকে চট্টগ্রাম সমতটের খড়গ রাজবর্ষ ও সপ্তম শতকে দেবরাজ বংশের শাসনাধীন ছিল। অষ্টম শতকে রাজা ধর্মপালের রাজ্যভুক্ত হয় চট্টগ্রাম। নবম শতকে হরিকেল রাজ্যভুক্ত হয়। অষ্টম-নবম শতক থেকে আরব্য বণিকরা চট্টগ্রামে বাণিজ্যের জন্য আসা শুরু করে। দশম শতকে চট্টগ্রাম পুনরায় আরাকানের চন্দ্র রাজবংশের অধিকারভুক্ত হয়। এই শতকেই চট্টগ্রামে পন্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়। দশম শতকের শেষ দিকে ত্রিপুরা রাজ চেংথুম ফা সর্বপ্রথম স্বল্পকালের জন্য চট্টগ্রাম অধিকার করেন। একাদশ শতাব্দীতে ব্রহ্মদেশের রাজা অনরহট আরাকান, চট্টগ্রাম ও দক্ষিণ বঙ্গের বিস্তৃত অঞ্চল জয় করেন। ত্রয়োদশ শতকের প্রথমার্ধে চট্টগ্রামে রাজত্ব করেন দেব বংশীয় রাজা দামোদর দেব। ত্রয়োদশ শতকের মধ্যভাগে আরাকান রাজ অলংপিউ চট্টগ্রামসহ বঙ্গদেশের কিছু অংশ জয় করেন। এই শতকের শেষভাগে আরাকান রাজ মেংদি তার রাজ্য ব্রহ্মপুত্র তীর পর্যন্ত বিস্তার করেন। ত্রয়োদশ শতকের শেষ দিকে তাতারের খান অল্পকালের জন্য চট্টগ্রাম অধিকার করেছিলেন। চতুর্দশ শতকের প্রথম দিকে চট্টগ্রাম পুনরায় আরাকান রাজ্যভুক্ত হয়।
এরপর থেকে শুরু হয় সুলতানী আমল, আফগান আমল, আরকানী আমল, পর্তুগিজ ও মোগল আমল। এ সময়ে বিভিন্ন রাজা-বাদশাহর অধীনে শাসিত হয় চট্টগ্রাম।

হাজার বছরের পুরনো বন্দরনগর
আবুল মনসুর আহমদ তার বাংলাদেশের কালচার বইয়ে উল্লেখ করেন, ঐতিহাসিকদের সর্বসম্মত মত এই যে, খ্রিস্টপূর্ব দুই শতক থেকে ইয়েমেন ও ব্যাবিলনীয় অঞ্চলের অমুসলমান আরব নাবিকরা যখন পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের সঙ্গে ব্যবসাসূত্রে জড়িত হয়, তখন থেকেই চট্টগ্রাম ছিল তাদের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র।
৬৪ খ্রিস্টাব্দে রোমান ঐতিহাসিক প্লিনির রচিত ‘পেরিপ্লাস অব দ্য ইরিথেরিয়ান সি’ গ্রন্থেও চট্টগ্রাম বন্দরের বর্ণনা রয়েছে। এতে বলা হয়েছে গঙ্গা নদীর তীরে নদীর নামেই একটি বন্দরশহর আছে। এই স্থানে চন্দনকাঠ, মুক্তা ও অতি মিহি গ্যাঙ্গেটিক নামের মসলিন বস্ত্র আনা হয়। কথিত আছে, এই স্থানের কাছেই কোনো স্বর্ণখনি আছে। এখানে ক্যালটিস নামের স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন আছে। এই নদীর ঠিক অপর পাড়ে মোহনার কাছে সমুদ্রের মধ্যে একটি দ্বীপ আছে। উদীয়মান সূর্যের নিচে অবস্থিত সর্ব পূর্বের বসতি এলাকা এটি। এই দ্বীপটি শ্রীশে নামে খ্যাত।
ইতিহাস গবেষক আবদুল হক চৌধুরী লিখেছেন, প্লিনি বর্ণিত দুই হাজার বছর আগের চট্টগ্রামের প্রাচীন বন্দরের অবস্থান কোথায় ছিল তার কোনো স্মারক চিহ্ন নেই। তবে বর্ণনা থেকে অনুমান করা যায় শ্রীশে বা সন্দ্বীপ সোজা সন্দ্বীপ চ্যানেলের পূর্বদিকে আধুনিক সীতাকুন্ড থানার অন্তর্গত বাড়বকুন্ড থেকে দক্ষিণে কোথাও সম্ভবত চট্টগ্রামের সর্বপ্রাচীন বন্দর অবস্থিত ছিল।
আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ লিখেছেন, পর্তুগিজদের বাণিজ্য ব্যবসায়ের ফলেই ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে চট্টগ্রাম একটি সুবৃহৎ বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত হয়। গঙ্গার অপর তীরবর্তী সাতগাঁও তখন একটা প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল। পর্তুগিজরা এটাকে পোর্টো পিকোয়েনো বা ক্ষুদ্র বন্দর নামে অভিহিত করত। এর সঙ্গে তুলনায় তারা চট্টগ্রামকে পোর্টো গ্রান্ডো বা বৃহৎ বন্দর আখ্যা প্রদান করে।

কারিকা ডেক্স


ঘণ্টাখানেক জিপ হাঁকিয়ে আমরা আবার অল্প সময়ের জন্য থামি বড়সড় এক দহের কাছে। এখানকার জলের অবতলে শ্যাওলার সবুজ আস্তর। মাঝে মাঝে খৈ ফোটার মতো ঝিকিয়ে ওঠে চার-ছ’টি রুপালি মাছ। সারা দহজুড়ে ভাসছে অনেকগুলো মাছ ধরার নাও। মাঝিরা বাচ্চাদের মাশারির মতো দেখতে মস্ত সব জাল নিয়ে তাক করে আছে। জিপের দোদুল্যমানতায় তন্দ্রাচ্ছন্ন হতে হতে মনে হয় ডার্করুমে ফুটে ওঠা ফটোগ্রাফের প্রিন্টের মতো অবচেতনের আঁধারে ছবি হয়ে ভাসে এক তরুণী মাঝির নাও বেয়ে পসরা নিয়ে ভেসে যাওয়া আর জেলেদের জাল হাতে দহের জলে ওঁৎ পেতে বসে থাকা।
এদিকে দীর্ঘ ঘাসের সবুজে সয়লাব হয়ে আসা বিশাল এ মাঠে অনেকটা যেন উপত্যকার ব্যাপ্তি আছে। আমাদের জিপখানা মানচিত্রে আঁকা নদী রেখার মতো সড়ক ধরে ধীরলয়ে চলে। সমতলে চলে এসেছি বলে আমাদের আর পরস্পরের ওপর গড়িয়ে পড়ার কোনো সম্ভাবনা থাকে না। ফুয়াং এখন তার উচ্ছলতাকে কচ্ছপের গ্রীবার মতো মনের খোলে পুরে নিশ্চুপ হয়ে নখের বাসি রঙ খোঁটে। আমি জানালা দিয়ে দূর দিগন্তে মেঘমালার পানে ছুটে চলা নীল অরণ্য দেখি। দেখতে দেখতে প্রান্তরের ঘাসের রঙ বিবর্তিত হয়ে হালকা হরিতে রূপান্তরিত হয়। আমাদের গাড়িখানা এখন দু’পাশে ঘাসের ঘন বুনটে অযত্নে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বেড়ে ওঠা অজস্র হলদে রঙের ফুলের মাঝ দিয়ে বেয়ে যায়। মাঠে বোধ করি উজান-বিজান হাওয়া খেলে। আমরা যেতে যেতে ছবির ফ্রেমের মতো বর্গাকৃতির জানালা দিয়ে দীর্ঘ ঘাস ও হলুদ ফুলের নুয়ে পড়ে জড়িয়ে যাওয়া দেখি।
মাঠের দৃশ্যপটে এবার আসে ভিন্নতর ব্যঞ্জনা। এখন পথের দু’পাশে নানা আকৃতির ছোট-বড় বেশ কিছু জলাশয়। প্রাকৃতিক এ পুকুরগুলোর জল কালচে টোপাজ পাথরের মতোই টলটলে। চেয়ে থাকলে মনে হয় পানির ওপর তীব্র সূর্যালোকে উড়ছে রুপালি বর্ণের মিহি বাষ্প। প্রতিটি জলাশয়ে ভাসে একটি বা দুটি কেবল একজনের বসার উপযোগী অতি ক্ষুদ্র নৌকা। মাথাইল পরা মাঝিরা নাওগুলোতে বৈঠা হাতে অলস বসে থাকে। প্রান্তর থেকে বয়ে আসা শনশন হাওয়ায় তাদের নাওগুলো ধীরলয়ে দোলে। ফুয়াং আস্তে করে আমার হাত ছুঁয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সে আমাকে সামনের দিকে তাকাতে ইশারা করে। মনে হয় অতি প্রাচীন যুগের কোনো এক দুর্গের সদর দরজা আমাদের অভ্যর্থনা করতে ছুটে আসছে। জিপের পেছন সিটে বসে আমরা দু’জন ঘাড় বাঁকিয়ে কালো পাথরে গড়া পুরাতাত্ত্বিক দেউড়ির দিকে তাকাই। জিপখানা দ্রুত সিংহদুয়ার অতিক্রম করে দুর্গের ভেতর মহলে চলে আসে। আমি হঠাৎ করে কোনো ঐতিহাসিক স্থানে চলে আসার উত্তেজনায় চাপাস্বরে চেঁচিয়ে ড্রাইভারকে গাড়ি রুখতে বলি।

আমি ও ফুয়াং চারপাশে কালো পাথরের চৌদেয়ালে ঘেরা শত শত একরের কম্পাউন্ডের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে ঠিক বুঝতে পারি না কোথা থেকে এ পুরাতাত্ত্বিক কেল্লাটির পর্যবেক্ষণ শুরু করব? দুর্গের অন্দরমহল এমনই বিশাল যে, দু’পাশে দুটি সিংহদুয়ারকে ঘুলঘুলি মতো দুটি ছোট্ট জানালা বলে বোধ হয়। আমি এখানে কোনো প্রাসাদ, আস্তাবল, টাঁকশাল বা মন্দির বা মিনার নেই দেখে অবাক হই। ফুয়াংকে জিজ্ঞেস না করে পারি না যে, কেল্লাটি কি কোনো ভিয়েতনামিজ সম্রাটের প্রাসাদ ছিল? কতইবা এ সৌধের বয়স? আমার প্রশ্নে ফুয়াং চোখ বড় বড় করে তাকায়। সে ঠোঁট কামড়ে নতমুখী হয়ে দীর্ঘ ঘাসের আড়ালে ফুটে থাকা বেগুনি ফুলের দিকে তাকিয়ে আছে দেখে বুঝতে পারি আমার প্রশ্নের জবাব বলে কিছু তার জানা নেই। তাকে এ বিব্রতকর অবস্থা থেকে রেহাই দেয়ার জন্য বলি, ‘তুমি আমাকে এ চত্বরটি একটু ঘুরিয়ে দেখাবে না?’

লম্বা লম্বা ঘাস পায়ে দলে, চোরকাঁটা মাড়িয়ে বেগুনি ফুলদলের ভেতর দিয়ে পথ করে করে আমরা চত্বরের এক প্রান্তে অতিবৃহৎ এক দরদালানের পাথুরে ভিটার ওপর এসে দাঁড়াই। গৃহটির দেয়াল বলে কিছু আর অবশিষ্ট নেই, তবে দু’পাশে লতানো ড্রাগনের মূর্তি আঁকা বেশ কিছু সিঁড়ি বোধ করি দূরাগত যুগের পর্যটকদের দেখা দেয়ার জন্য এখনো টিকে আছে। আমি ও ফুয়াং একটি সিঁড়ির ধাপ ভেঙে ধীরলয়ে ওপরের দিকে উঠি। আমাদের দু’পাশে দুটি পাথরের ড্রাগন যেন রক্ষাকবচ হয়ে খরদৃষ্টিতে পরস্পরের দিকে তাকায়। ঘাসে ডানার দীর্ঘ ছায়া ফেলে চক্রাকারে উড়ে দুটি অতি বৃহৎ বাজপাখি। তারা দালানের ভিটার ওপর দিয়ে কেবলই উড়ে উড়ে অস্থির ক-র-র-র-র শব্দে ডাক ছাড়ে। মনে হয় মস্ত পাখি দুটি প্রাসাদের ভগ্নাবশেষে আমাদের ঘুরে বেড়ানো পছন্দ করছে না। আমরা সিঁড়ি বেয়ে ঘাসে নেমে এলে বাজ দুটি একটি সিংহ-দুয়ারের দিকে ওড়ে। এখন তারা দেউড়ির কার্নিশে বসে আবারো অস্থির ক-র-র-র-র আওয়াজ ছড়ায়। আমি সিংহ-দুয়ারের দিকে হেঁটে গিয়ে পাখি দুটির ছবি তুলতে গেলে ফুয়াং কিছুতেই আমাকে তা করতে দেয় না। সে জামার আস্তিন খামচে ধরে আমাকে ঠেকায়। আমি বিরক্ত হয়ে জানতে চাই, ‘ফুয়াং বিষয়টি কী?’ সে চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে বুঝি কোন গুপ্ত কথা বলছে এমনভাবে আমাকে জানায়, ‘সাবধান প্রাসাদের রাজা-রানীর আত্মা দেউড়ির শিখরে বসে আমাদের দেখছে!’ আমি যে তার বক্তব্য মোটেই বিশ্বাস করছি না তা বোধ করি আমার অভিব্যক্তিতে ধরা পড়ে। এতে ফুয়াং স্পষ্টত দুঃখিত হয়। সে নতমুখী হয়ে অভিমানে নিচের ঠোঁট কামড়ায়।

রাজা-রানীর আত্মা দুটিকে আলোকচিত্রে ধরা যায় না বটে, তবে খানিক কসরতে ফুয়াংকে রাজি করাতে পারি অন্য সিংহ-দুয়ারটি ঘুরে-ফিরে দেখার জন্য। এ দেউড়িতে এসেই মনে হয় পুরাকালে এটি হস্তীযুথ চলাচলের জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল। এখন এর উচ্চ ছাদ থেকে থোকায় থোকায় ঝুলছে বেশ ক’টি মৌচাক। এখানে আসা মাত্রই যেন চরাচরের নির্জনতা এসে আমাদের মাঝে সংক্রামিত হয়। আমি উল্টাদিকে তাকিয়ে কয়েকশ’ একর তফাতে একই সরলরেখায় তৈরি অন্য সিংহ-দুয়ারটির দিকে তাকাই। আর্চের মতো করে গড়া রাজকীয় দুয়ার দুটির দু’পাশে এক জোড়া নীল পাহাড়ের চূড়া পরস্পরের দিকে মুখোমুখি তাকিয়ে আছে। মনে হয় এখানে না এলে বুঝি পাহাড়দ্বয়কে একই সরলরেখায় দেখার অবকাশই হতো না। একঝাঁক মৌমাছি গুঞ্জন তুলে আমাদের পাশ দিয়ে সিংহ-দুয়ারের দিকে উড়ে গেলে আমরা আবার প্রকান্ কম্পাউন্ডের চরাচর সদৃশ চাতালে একাকী দাঁড়িয়ে থাকার অনুভূতিতে সচেতন হই। আমরা পরস্পরের দিকে তাকাই। ফুয়াং-এর নিশ্চুপতা থেকে মনে হয় সে এবার ফিরে যেতে চায়। কিন্তু আমি আরো খানিক পর্যটন না করে যেন তৃপ্তি পাই না।

দুর্গ প্রাচীরের এক স্থানে এক সময় বুঝি ওপরে ওঠার সিঁড়ি ছিল। এখন তা খানিক ভগ্ন, ঘাস ও ঝোপঝাড়ে ঢাকা। আমি সাহস করে জিন্সের হাঁটু ছেঁচড়ে পাঁচ ধাপ ওপরে উঠি। প্রায় বারো ফুট উঁচু প্রাচীরটি এখন প্রায় নাগালের মাঝে। আমি নিচের দিকে তাকিয়ে ফুয়াংকে উৎসাহিত করি। সে কিঞ্চিৎ ইতস্তত করে বিশ্বস্ত নারীদের মতো আমাকে অনুসরণ করে। ফুয়াং অ্যাথলেটিক গোছের মেয়ে। যথাকিঞ্চিৎ চড়াই-উৎরাই ভাঙা তার জন্য তেমন কিছু চ্যালেঞ্জ না। যদিও প্রয়োজন ছিল না, তারপরও বোধ করি শিভালরিবশত আমি তার বাহু ধরে টেনে ওপরে ওঠাই। এ টানাপোড়েনে তার প্যান্টে টাকিন করা টি-শার্টটি বেরিয়ে আসে। আমি চকিতে না পড়া কোনো গ্রন্থের হঠাৎ পাতা উল্টিয়ে ভেতরকার ছবিটি দেখে ফেলার মতো তার ক’টি দেশের মসৃণতা দেখতে পাই। সে আমার দিকে লাজুক হেসে দ্রুত টি-শার্ট কোমরে গুঁজে। সিঁড়ির বাকি ক’টি ধাপ অতিক্রম করা আমাদের জন্য তুলনামূলকভাবে সহজ হয়। আমরা অবশেষে কালো পাথরে গড়া প্রাচীরের ওপর এসে দাঁড়াই। শত শত বছরের পুরনো এ দেয়ালটি আকারে প্রশস্ত। দুটি ভিনদেশী মানব-মানবীর এখানে একত্রে দাঁড়িয়ে থাকতে তেমন কিছু অসুবিধা হয় না। আমরা প্রাচীর থেকে অল্প দূরে সোনালি ধানক্ষেতে মহিষের পিটে চড়ে এক রাখালকে বাঁশি বাজাতে দেখি।

আমরা দেয়াল ধরে হেঁটে হেঁটে বেশ খানিকটা দূরে চলে এসে নিচের দিকে তাকালে আমার গা ঈষৎ শিরশির করে। প্রাচীর সংলগ্ন বহির্ভাগের জমির খাদের মতো নিম্নতা দেখে আন্দাজ করি এখানে হয়তো হাজার বছর আগে জলভরা গড়খাই ছিল। যে উপত্যকা খানিক আগে জিপযোগে অতিক্রম করে এসেছি আমার দৃষ্টি সেখানে চলে যায়। মনে হয় এমন প্রসারিত তেপান্তর ইতিপূর্বে কখনো চাক্ষুষ করিনি। প্রায় সমতল বিপুল এ প্রান্তরে ফুটে আছে হাজারো হলুদাভ ফুল। মাঝেমধ্যে গুচ্ছ গুচ্ছ বেগুনি ফুলের আভাস নিসর্গপটে এনেছে রঙের বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনা। আমি উপত্যকার দু’পাশে প্রকৃতির সুরক্ষা প্রাচীর হয়ে দাঁড়ানো দু’সারি নীল পর্বতের পানে তাকাই। কল্পনা করি, হয়তো হাজার বছর আগে এরূপ উচ্চতায় দাঁড়িয়ে কোনো নাম না জানা রাজপুরুষ রাজস্থানি টাপেস্ট্রীতে গাঁথা আয়নার মতো ছোট ছোট জলাশয়ে যেন বটের পাতায় তৈরি ছোট ছোট নৌকার মৃদুমন্দ ভাসা দেখে প্রকৃতির অগ্নিজলে নিজেকে অবগাহন করে নিয়েছিলেন। আমার ভ্রমণ সঙ্গিনীর বোধকরি ধ্যানস্থ হওয়ার ধাত নেই। ফুয়াং চোখেমুখে এক রাশ অস্থিরতা নিয়ে দেয়ালের ওপর দিয়ে টুকটুক করে হাঁটে। আমি তার সহযাত্রী হয়ে পাশে পাশে চলার চেষ্টা করি। বহু দূরের নীল পাহাড় থেকে বুঝিবা উলুক-ঝুলুক বাতাস এসে আমাদের দেহমনে ঝাপটা হানে। আমরা স্বেচ্ছায় নিতান্ত আত্মরক্ষার তাগিদে পরস্পরের হাত ধরে ভারসাম্য রক্ষা করি।

আমরা কেল্লার কম্পাউন্ডে একটু ঘুরপথে দেউড়ির দিকে আসতে গেলে চোখে পড়ে লালচে ইটে গাঁথা এক মন্দিরের ভগ্নস্তূপ। জিপের কাছে এসে দেখি একদল পথচলা মানুষ  জনা আষ্টেক আটপৌরে পোশাকের ভিয়েতনামিজ থিয়েটারে দুর্গাদাসকে দেখার মতো করে বিদেশি সংস্থার তেল চিক্ষণ জিপটিকে দেখছে। আমি ও ফুয়াং গাড়ির কাছাকাছি আসতেই তারা ফুয়াংকে আমার কথা জিজ্ঞেস করে। পথচলা দলটিতে একজন মাত্র প্রৌঢ়। বাকিরা সবাই তরুণ বয়সের পুরুষ। দু’জন মলিন হ্যাট পরা যুবক অনেকটা পাল্কির মতো দেখতে কাঠের কাঠামো বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পাল্কিতে রাখা অনেকগুলো জল পুতুল, লোহিত ও সোনালি বর্ণের ড্রাগন এবং ঝলমলে মাছ। অন্য একজন তরুণ বাঁকে করে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে মাদুর। প্রৌঢ় চোখের পাতা নাচিয়ে আমাকে পুতুলগুলো দেখতে ইশারা করেন। ফুয়াং ব্যাখ্যা করে জানায়, ‘আজ রাতে প্রান্তরের একটি জলাশয়ে চিত্রিত মাদুরের দৃশপট টাঙিয়ে এ মানুষগুলো জল পুতুলের নাচ দেখবে।’ প্রৌঢ় যেন আমাকে আরো কিছু বলতে চান। কিন্তু ফুয়াং অস্থির হয়ে পড়ে। বাজ দুটি আবার চক্রাকারে আমাদের জিপের ওপর দিয়ে উড়ছে। জল পুতুলের কুশীলবরা সবার ভুরু কুঁচকে কপালে হাত রেখে আকাশে উড়ন্ত পাখি দুটির দিকে তাকায়। চিলের হাত থেকে মুরগির বাচ্চাকে ঝাঁকায় ঢেকে বাঁচানোর মতো ফুয়াং আমার আস্তিন টেনে জিপে তোলে। ড্রাইভার যেন অপেক্ষায়ই ছিল, আমাদের সিটে বসা মাত্রই সে গাড়ি স্টার্ট দেয়। আমি জানালা দিয়ে পেছন ফিওে দেখি পাল্কিভরা নাচের নটঘট নিয়ে পুতুল খেলার কারিগররা অবাক হয়ে আমাদের সহসা চলে যাওয়া দেখছে।

 

0 1206
কারিকা ডেস্ক :
নিজের একটি ফ্ল্যাট কে না চান! আপনার জন্যই এক অঙ্কের সুদ নিয়ে অপেক্ষা করছে কয়েকটি ব্যাংক। আবেদন করে সহজ শর্তে আপনি পেতে পারেন ১ কোটি ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ। পাশাপাশি মিলছে ২৫ বছর পর্যন্ত ঋণ পরিশোধের সুযোগ। এই ঋণেই একটি স্বপ্নের ফ্ল্যাটের মালিক হতে পারেন আপনি।
ব্যাংকগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে আইএফআইসি, ব্র্যাক, ইস্টার্ন, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইডিএলসিসহ আরও কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এক অঙ্কের সুদে গৃহঋণ বা হোম লোন দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ২০১৫ সালের পয়লা জানুয়ারি গৃহায়ণ খাতে ঋণের সীমা গ্রাহকপ্রতি বাড়িয়ে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা করা হয়; আগে যা ছিল ১ কোটি টাকা। এ ছাড়া ঋণ ও মূলধন অনুপাত ৭০: ৩০ করা হয়। অর্থাৎ ১ কোটি টাকার ফ্ল্যাটে ব্যাংক ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন করতে পারবে। বাকি ৩০ লাখ টাকা জোগান দিতে হবে গ্রাহককে। তবে একজন গ্রাহককে কোনোভাবেই ১ কোটি ২০ লাখ টাকার বেশি ঋণ দিতে পারবে না ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নির্দেশনার পরই মূলত ব্যাংকগুলো গৃহঋণ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করে।
ব্যাংকগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্যাংকগুলো অনেক আগে থেকেই গৃহঋণ দিয়ে এলেও ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে আইএফআইসি ব্যাংক প্রথম কম সুদে এই ঋণ নিয়ে আসে। ব্যাংকটি সে সময়ে ১১ দশমিক ৯৫ শতাংশ সুদে গৃহঋণ দেওয়া শুরু করে; যে সময়ে অন্য ব্যাংকগুলোতে সুদের হার ছিল ১৫ শতাংশের বেশি। পরে একই বছরের আগস্টে ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ ও ডিসেম্বরে সুদহার কমিয়ে ৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ করে ব্যাংকটি।
ব্যাংকটি গত মার্চ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ১০০ গ্রাহককে গৃহঋণ দিয়েছে। এ খাতে ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। ঋণের সুবিধাভোগীদের মধ্যে বড় অংশই বাড়ির মালিক ও চাকরিজীবী। এ ছাড়া কিছু ব্যবসায়ীও এই ঋণ নিয়েছেন।
আইএফআইসি ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ব্যাংকটির ঋণের ৪০ শতাংশ গেছে রাজধানীর বাইরে। ৬০ শতাংশ গেছে রাজধানী ও আশপাশে। শুধু বরিশাল অঞ্চলের ৫০ গ্রাহক ১৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন।
যোগাযোগ করা হলে আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ আলম সারওয়ার বলেন, ‘সুদের হারের কারণে গ্রাহকেরা ফ্ল্যাট কেনার চিন্তাই করতেন না। ব্যাংক হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব ছিল গ্রাহককে এ বিষয়ে সহায়তা করার। আকর্ষণীয় সুদের হার দিয়ে সেবা চালুর পরই আমরা ভালো সাড়া পাচ্ছি। আমাদের পর অন্য ব্যাংকগুলোও একই সেবায় গেছে। এতে গ্রাহকদের এখন নিজের একটি ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে।’
জানা যায়, কেউ অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ টেকওভার করলে আইএফআইসি ব্যাংক তাঁকে ৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিচ্ছে। এ ছাড়া বাড়তি ঋণের ক্ষেত্রেও একই সুদ। এতে কোনো প্রসেসিং মাশুলও নেই। তবে নতুন ঋণের ক্ষেত্রে ১ শতাংশ প্রসেসিং মাশুল ও সুদের হার ১১ দশমিক ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। গ্রাহকভেদে কম সুদেও ঋণ মিলতে পারে। নতুন ঋণে ছয় মাস অতিরিক্ত সময়ও মিলবে ঋণ পরিশোধে। একই সুবিধা মিলছে অন্য ব্যাংকগুলোতেও। তবে গ্রাহকভেদে সুদের হারের ভিন্নতা হতে পারে।
ব্যাংকগুলো সূত্রে জানা গেছে, শুধু গত মার্চ মাসেই আইএফআইসি ব্যাংক ৮৫ কোটি টাকা, ইস্টার্ন ব্যাংক প্রায় ৪০ কোটি টাকা ও ব্র্যাক ব্যাংক ৮০ কোটি টাকা গৃহঋণ দিয়েছে। ব্র্যাক ব্যাংক এ খাতে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে।

0 1029
কারিকা ডেস্ক : উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক বলেছেন, প্রত্যেক সেক্টরে কাজ শুরু হয়েছে। আগামী ৪ বছরে ঢাকা শহর বদলে যাবে।
রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনের চামেলী হলে সম্প্রতি ‘শক্তিশালী, কার্যকর সিটি করপোরেশন ও নিরাপদ, নারীবান্ধব ঢাকা মহনগর’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ আন্দোলনের উপ-পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটি এ মতবিনিময় সভা আয়োজন করে।
আনিসুল হক বলেন, অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমি এবং আমার পরিষদ অত্যন্ত ঘনবসতির এই সিটি করপোরেশনের উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। এখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৮৫ হাজার মানুষ বাস করে। এদের সব নাগরিকসেবা নিশ্চিত করা সহজ নয়। এসব সমস্যা কাটাতে অন্তত ৪-৫ বছর সময় দরকার।
তিনি বলেন, পরিষ্কার করা ও বাতি জ্বালানো ছাড়া মেয়রের তেমন কোনো কাজ নেই। সব জায়গার মশা মারার ক্ষমতাও এই পরিষদের নেই। সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রয়োজনীয় পাবলিক টয়লেট বসানোর জায়গাও পাওয়া যাচ্ছে না। পয়ঃনিষ্কাশন, পানি সরবরাহ, পুলিশের উপর নিয়ন্ত্রণ, আবাসন এসব কোনো কিছুর উপরই মেয়রের নিয়ন্ত্রণ নেই।
তিনি আরও বলেন, সিটি করপোরেশন এলাকা জুড়ে গড়ে ওঠা দেওয়ালগুলো এখানকার পরিবেশ রক্ষায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকা শহরের আবহাওয়া এতোটাই খারাপ যে, এখানকার ২৫ ভাগ শিশু ফুসফুসের গুরুতর রোগ ও সমস্যায় আক্রান্ত। দেওয়ালগুলো ভেঙে ফেলা সম্ভব হলে মহানগর অনেকটাই খোলামেলা হবে। আমরা সিটি করপোরেশন থেকে দেওয়ালগুলো ভেঙে ফেলার চেষ্টা করছি। অথচ সিভিল এভিয়েশন দেওয়াল নির্মাণ করছে।
আনিসুল হক বলেন, সিটি করপোরেশন এলাকায় ৬০০ সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। আগামী ৩ মাসের মধ্যে আরও ৪০০ বসানো হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী এটি উদ্বোধন করতে পারেন। ক্যামেরার পাশাপাশি এলএডি লাইট লাগানো হচ্ছে। কাঠবিড়ালি পার্ক, প্রজাপতি পার্ক ও খেলার মাঠের ব্যবস্থা হচ্ছে। এতে আগামী ৬-৯ মাসের মধ্যে মহিলারা নিরাপদে রাস্তায় চলাচল করতে পারবে। কেই তাদের যৌন হয়রানি করার সাহস দেখাবে না।
তিনি বলেন, এখন কোনো ঠিকাদারকে অফিসে আসতে হয় না। তাদের বাসায় চেক পৌছে দেওয়া হয়। এখন সিটি করপোরেশনে ই-টেন্ডারিং চালু করা হয়েছে। সিটি করপোরেশনে তিনদিনের মধ্যে ফাইলে নোট দেওয়ার বিধান চালু করা হয়েছে।
গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখাত পরিচালনা করে সিন্ডিকেট। একটি বাস পরিচালনায় শ্রমিক-কর্মচারিদের বেতন ভাতা বাবদ যদি ২০০ টাকা অফিসিয়িালি খরচ হয় তবে সিন্ডিকেটের জন্য লাগে ৭০০ টাকা। ফ্রানঞ্চাইজ পদ্ধতিতে নতুন করে ৩০০০ বাস নামানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, এখন মেয়েরা বাসে চলতে পারে না। তাদের কোমর ধরে বাসে তোলা হয়। নতুন বাস নামানো সম্ভব হলে এসব সমস্যা অনেকটাই কেটে যাবে।
অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বেগম, উত্তর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকার কাউন্সিলর রাশেদা আখতার ঝর্ণা, মাসুদা আক্তার, হাবিবুর রহমান মিজান প্রমুখ। মতবিনিময় সভার সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম।

0 916
কারিকা ডেস্ক :
রাজধানীতে বসেছে পাঁচ দিনের মধুমেলা। মতিঝিলে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশন (বিসিক) প্রাঙ্গণে আয়োজিত এ মেলায় দেশীয় মধুর ব্র্যান্ড ও মৌচাষিরা অংশ নিয়েছেন। মেলা থেকে ক্রেতারা বিশেষ ছাড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি দরে কিনতে পারছেন বিভিন্ন ফুলের মধু।
বিসিক আয়োজিত এ মেলায় ২০টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। রোববার মেলার উদ্বোধন করেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া। এ সময় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হামিদুর রহমান ও বিসিকের চেয়ারম্যান মো. হজরত আলী উপস্থিত ছিলেন।
মেলায় অংশ নেওয়া মৌচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশে এখন সবচেয়ে বেশি মধু আহরিত হয় সরিষার ফুল থেকে। এর পাশাপাশি লিচু, কালিজিরা, মৌরি, ধনে, তিসিসহ বিভিন্ন ফুলের মধুও সংগ্রহ করা হয়।
মেলায় প্রতি কেজি সরিষা ফুলের মধু ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, কালিজিরা ফুলের মধু ৭৫০-৯০০ টাকা, লিচু ফুলের মধু ৪০০-৪৫০ টাকা, মৌরি ও তিসির মধু ৪০০ টাকা দরে বিক্রি করছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
বিসিকের হিসাবে, দেশে বছরে ৭ থেকে ৮ হাজার টন মধু উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে সুন্দরবন থেকে আসে প্রায় ২ হাজার টন। তিন বছর ধরে বছরে ৫০ হাজার টন করে উৎপাদন বাড়ছে।
বিসিকের মৌচাষ প্রকল্পের পরিচালক খোন্দকার আমিনুজ্জামান বলেন, দেশে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়। এর মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ থেকে এখন মধু আহরণ করা হচ্ছে। তাই শুধু সরিষা থেকেই মধুর উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব।
মধুমেলা চলবে আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত মেলা সবার জন্য উন্মুক্ত। এতে মধুর পাশাপাশি মধু ও আমের জেলি, ঘি, বেলের শরবত তৈরির গুঁড়াসহ বিভিন্ন পণ্য কিনতে পারবেন ক্রেতারা।
বিসিক জানায়, ১৯৭৭ সালে সংস্থাটি মৌচাষের কার্যক্রম শুরু করে। দেশে বর্তমানে আমদানি করা অ্যাপিস মেলিফেরা এবং দেশজ প্রজাতির অ্যাপিস সেরেনা মৌমাছি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বাক্সে পালন করে মধু আহরণ করা হয়।

কারিকা ডেস্ক:
রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় হার্ডওয়্যার পণ্য প্রদর্শনী ‘বাংলাদেশ আইসিটি এক্সপো ২০১৬’। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস) এ মেলার আয়োজন করেছে। গতকাল মঙ্গলবার বিআইসিসির মিডিয়া বাজারে মেলা উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ বলেন, হার্ডওয়্যার পণ্যের আমদানি কমিয়ে কীভাবে তা দেশে উৎপাদন করা যায়, তাই এই মেলার লক্ষ্য। এ জন্য সরকার ও বেসরকারি খাত একসঙ্গে মিলে কাজ করবে। আর এভাবে দেশের আইসিটি খাত এগিয়ে যাবে।
সংবাদ সম্মেলনে বিসিএসের সভাপতি এ এইচ এম মাহফুজুল আরিফ বলেন, হার্ডওয়্যার খাতে উদ্যোক্তা তৈরি এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশ আইসিটি এক্সপোর আয়োজন করা হয়েছে। সম্মেলনে আরও বক্তৃতা করেন আইসিটি সচিব শ্যাম সুন্দর শিকদার, মাইক্রোসফট বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোনিয়া বশির কবির এবং ডেলের কান্ট্রি ম্যানেজার আতিকুর রহমান।
মেলায় ৫৯টি প্যাভিলিয়ন ও ৭০টি স্টল থাকছে। এ ছাড়া তরুণ উদ্ভাবকদের জন্য থাকছে ইনোভেশন জোন। মেলায় তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ১৪টি সেমিনার ও কর্মশালা হবে। শিশুদের জন্য আছে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা।
‘মিট ডিজিটাল বাংলাদেশ’ স্লোগান নিয়ে এই মেলা চলবে ৫ মার্চ পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মেলা খোলা থাকবে সবার জন্য। মেলা আয়োজনে সহযোগিতা করছে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল, বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ, কন্ট্রোলার অব সার্টিফায়িং অথরিটি, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিস (বেসিস), ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি) এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কল সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিং। বিস্তারিত: www.ictexpo.com.bd

কারিকা ডেস্ক : রাজধানীতে বাড়ির মালিকদের মাধ্যমে ভাড়াটেদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের কাজ থেকে পুলিশকে বিরত থাকার অনুরোধ জানিয়ে উকিল নোটিশ পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। এ ছাড়া এ তথ্য সংগ্রহের আইনগত ভিত্তি কী, তা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লিখিতভাবে জানাতে বলা হয়েছে নোটিশে।
আইন ও স্বরাষ্ট্রসচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারকে মঙ্গলবার রেজিস্ট্রার ডাকে ওই নোটিশ পাঠানো হয়। পরে জ্যোতির্ময় বড়ুয়া সাংবাদিকদের বলেন, এভাবে ব্যক্তিগত তথ্য চাওয়ার কোনো আইনি ভিত্তি পুলিশের নেই। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব না পেলে তিনি আদালতে সুরক্ষা চাইবেন।
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া আরও বলেন, নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয় তথ্য পুলিশ যেভাবে সংগ্রহ করছে, তার অপব্যবহার হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা আছে। এসব তথ্য যদি কোনো ভুল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে পড়ে, তাহলে ব্যক্তির ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা আছে। সংবিধানে নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার যে অধিকার দেওয়া হয়েছে, পুলিশের এ উদ্যোগে সেটাও লঙ্ঘিত হতে পারে।
মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, রাজধানীর সব বাড়ির মালিক ও ভাড়াটেকে তাঁদের তথ্য দিয়ে ১৫ মার্চের মধ্যে পুলিশের সরবরাহ করা ফরম পূরণ করে থানায় জমা দিতে হবে। জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ দমন এবং নিরাপদ ঢাকা গড়তে এসব তথ্য হালনাগাদ করে একটি তথ্যভান্ডার করা হবে বলে কমিশনার জানান।
ওই সংবাদ সম্মেলনে কমিশনার আরও বলেন, রাজধানীর সব বাসায় ফরম পাঠানো হয়েছে। যাঁরা এখনো ফরম পাননি, তাঁরা থানায় যোগাযোগ করে ফরম সংগ্রহ করবেন। প্রতিটি থানাকে তার আওতাধীন প্রত্যেক ভাড়াটে ও বাড়ির মালিকের সব তথ্য সংগ্রহ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মহল্লা, হোল্ডিং, লেনভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করা হবে। একজন ভাড়াটে চলে গেলে নিকটস্থ থানাকে তিনি জানিয়ে যাবেন, তাঁর নাম কেটে দেওয়া হবে এবং নতুন ভাড়াটের তথ্য যুক্ত করা হবে।
পুলিশের সরবরাহ করা ফরমে বাড়ির মালিক/ভাড়াটের নাম, পিতার নাম, জন্মতারিখ, স্থায়ী ঠিকানা, বৈবাহিক অবস্থা, মোবাইল ফোন, পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর, পেশা-কর্মস্থল, পরিবারের সদস্যদের নাম, গৃহকর্মীর নাম-ঠিকানাসহ কিছু তথ্য চাওয়া হয়েছে।
এর আগেও বিভিন্ন থানা থেকে তথ্য চেয়ে বাড়ি বাড়িতে ফরম পাঠানো হয়েছিল। তবে বেশির ভাগ বাড়ির মালিক ও ভাড়াটে পুলিশকে তথ্য দেননি। পুলিশের দেওয়া সর্বশেষ হিসাবে রাজধানীতে দুই লাখের বেশি ফরম বিতরণ করা হয়েছিল।

0 1484

রাজধানীতে বৃষ্টি হলেই রাস্তাঘাটে পানি জমে যাওয়া নিত্যদিনের ঘটনা। তাই আকাশে মেঘ জমলেই নগরবাসীরা থাকেন আতঙ্কে। অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিতে ডুবে যায় রাজধানীর অনেক এলাকা। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানি জমতে যে সময় লাগছে, তার থেকে বেশি সময় লাগছে পানি সরতে। বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা দুষছেন ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ ব্যবস্থাকে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বহু বছর ধরে এ সমস্যা চলতে থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যাপারটি আমলে নিচ্ছে না। ভুক্তভোগীরা বারবার অভিযোগ করার পরও সিটি করপোরেশন এবং ঢাকা ওয়াসা আশ্বাস দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করতে পারছে না। ঢাকাকে শতভাগ পয়ঃনিষ্কাশনের আওতায় আনার জন্য ২০১২ সালে ঢাকা ওয়াসা যে মহাপরিকল্পনা হাতে নেয়, দুই বছর পার হতে চললেও তার কোনো অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

সিটি করপোরেশনের বক্তব্য, সঠিকভাবে পানি নিষ্কাশন হচ্ছে না। তাই সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। সাধারণ মানুষ পলিথিন ও প্লাস্টিকজাতীয় সামগ্রী যত্রতত্র ফেলার কারণে ড্রেনেজ ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতিদিন সকালে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দিয়ে পরিষ্কার করেও লাভ হচ্ছে না।
রাজধানীর মিরপুরের পশ্চিম শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা তোফায়েল হোসেন তুষার। পড়েন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি বলেন, ‘এ এলাকার ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ লাইনের ত্র“টির জন্য প্রতিনিয়তই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। হালকা বৃষ্টিই হাঁটু পানি হওয়ার জন্য যথেষ্ট। ড্রেন দিয়ে তো পানি যায়-ই না, বরং ড্রেনের ময়লা ওই পানির সঙ্গে মিশে যায়। স্যুয়ারেজ লাইনের ঢাকনা খুলে রাখলেও পানি যায় না, বরং মল-মূত্র ভেসে ওঠে।’

তুষার আক্ষেপ করে বলেন, ‘একবার পানি জমলে পানি নামতে কয়েকদিন লেগে যায়। দুর্গন্ধে এলাকা দিয়ে চলাচল তো দূরের কথা, বাড়িতেও নাক চেপে থাকতে হয়। বিশেষ করে গলির ভেতরের বাসিন্দাদের খুবই সমস্যা হয়। রাস্তার চাপকলের পানিতেও ড্রেন-স্যুয়ারেজের ময়লা চলে আসে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সমাধান চাইলেও এখন পর্যন্ত দুর্ভোগ কমেনি।’

মৌচাক এলাকার বাসিন্দা ব্যবসায়ী লোকনাথ চন্দ্র রায় কারিকাকে বলেন, ‘বৃষ্টিতে পানি জমলে হাঁটু পর্যন্ত প্যান্ট উঠিয়ে কর্মস্থলে যেতে হয়। পর্যাপ্ত পানি-নিষ্কাশন-ব্যবস্থা না থাকা, জরাজীর্ণ রাস্তা সংস্কার না হওয়া এবং কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই আমাদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়।’

ভারী বর্ষণের দিনগুলোতে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, রাস্তায় বৃষ্টির পানি উঠে যাওয়ায় ধানমি র রায়েরবাজার, মিরপুরের শেওড়াপাড়া, মোহাম্মদপুরের কিছু এলাকা, যাত্রাবাড়ী, শনিরআখড়া, রায়েরবাগ, জুরাইনসহ বেশকিছু এলাকার শিক্ষার্থীরা জুতা হাতে নিয়ে হাঁটুসমান পানি পার হয়ে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও ময়লা পানিতে পথশিশুরা সাঁতার কাটছে।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান প্রকৌশলী মো. এমদাদুল ইসলাম কারিকাকে বলেন, ‘বর্জ্য-ব্যবস্থাপনাসহ সংশ্লিষ্ট কাজ সিটি করপোরেশনের। রাজউক এর সহায়ক ভূমিকা পালন করে। যেমন- কোথায় ময়লা ফেলতে হবে, কোথায় রি-স্টোর করতে হবে এসব বিষয়ে আমরা পরামর্শ দেই।’

পানি নিষ্কাশন ও খালগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অবিশ্বাস্য মনে হলেও একথা সত্য, আগে যেখানে প্রাকৃতিক উপায়ে বর্জ্য নিষ্কাশন হতো, নতুন নতুন আবাসিক এলাকা হওয়ার ফলে তা ব্যাহত হচ্ছে।’
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য-ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন বিপন কুমার সাহা জানান, ড্রেনেজ লাইনে যতক্ষণ ময়লা থাকে, ততক্ষণ আমরা লাইন পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করি। স্যুয়ারেজ থেকে মলমূত্রসহ ময়লা পানি যদি উপচে পড়ে, তবে তা ঠিক করার দায়িত্ব ওয়াসার।

ড. মোহাম্মদ সাব্বির মোস্তফা খান
বিভাগীয় প্রধান, পানিস¤পদ কৌশল বিভাগ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)

ঢাকা শহরে সামান্য বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট ডুবে যাচ্ছে। জলাবদ্ধতা বলতে মূলত বৃষ্টির পানি পড়ার পর সেগুলো ঠিকমতো নিষ্কাশন না হওয়াকেই বোঝায়। আমি মনে করি ঢাকা শহরে গত ১০-১৫ বছর আগে জলাবদ্ধতা-পরিস্থিতি এর চেয়ে আরও খারাপ ছিল। বৃষ্টি হলেই ওইসব এলাকা প্লাবিত হতো। এখন ঢাকা ওয়াসা কিছু ইম্প্র“ভমেন্ট বিষয় হাতে নিয়েছে। ঢাকা ওয়াসার যে ড্রেনেজ ক্যানেলগুলো আছে সেগুলো প্রতিনিয়ত রক্ষণাবেক্ষণের দরকার হয়। কিন্তু এ বছরগুলোতে সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ওই ড্রেনেজ ক্যানেলগুলোতে ময়না-আবর্জনা জমে অনেকাংশে বন্ধ হয়ে গেছে। অরিজিনাল যে ক্যাপাসিটি ছিল পানিকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য সেই ক্যাপাসিটি আর নেই। ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনে হয় চাচ্ছেন পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাটা সিটি করপোরেশনের হাতে ছেড়ে দিতে। উনি নাকি একটা চিঠিও দিয়েছেন এটা সিটি করপোরেশনের হাতে দিতে। কিন্তু আমি মনে করি এটার ম্যান্ডেট আছে ওয়াসারই।

কারিকা প্রতিবেদক

0 980

পৃথিবীকে মানুষের বাসযোগ্য করা, উন্নততর জীবন ও পরিবেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শ্রমজীবী মানুষের ভূমিকা প্রধান হলেও ভবন-নির্মাণে বেশিরভাগ সময়ই শ্রমিকরা কাজ করেন নিরাপত্তা-উপকরণ ছাড়া। ফলে কর্মক্ষেত্রের পরিবেশের উন্নয়ন ঘটিয়ে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে মনে করছেন এ খাত-সংশ্লিষ্টরা।

বর্তমানে বাংলাদেশে নির্মাণ-শ্রমিকরা বেশিরভাগ সময় কাজ করে কোনো প্রকার নিরাপত্তা উপকরণ ছাড়া। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা নেওয়া হলেও বাংলাদেশে এ বিষয়ে ভবন-মালিকদের অনীহা শুরু থেকেই।

মোহাম্মদপুরের নির্মাণ-শ্রমিক কমলের কাছে নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পেটের দায়ে কাজ করি, সেখানে আবার নিরাপত্তা কী? মালিক ঠিকভাবে টাকা দিলেই চলবে।’ তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাদের বিষয়ে কেউ ভাবে না।’

তবে বিভিন্ন সংগঠন নানা সময় এ বিষয়ে সোচ্চার হন। সম্প্রতি নির্মাণ-শ্রমিকদের কাজের পরিবেশের উন্নতি ঘটানোসহ সব নির্মাণ-শ্রমিককে বাধ্যতামূলক বীমার আওতাভুক্ত করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ বিল্ডিং অ্যান্ড উড ওয়ার্ক ফেডারেশন এবং বাংলাদেশ সংযুক্ত বিল্ডিং অ্যান্ড উড ওয়ার্ক ফেডারেশন। সেইসঙ্গে শ্রম আইন অনুযায়ী সব প্রাপ্ত সুবিধার অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।

বাংলাদেশ সংযুক্ত বিল্ডিং অ্যান্ড উড ওয়ার্ক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক রিপন চৌধুরী বলেন, ‘বিশ্ব শ্রম-সংস্থার হিসাব অনুযায়ী প্রতি বছর ২০ লাখ শ্রমিক কর্মস্থলে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়। কর্মস্থলগুলোতে ২৭ হাজারের মতো দুর্ঘটনা ঘটে। কিন্তু শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পায় না।’ তিনি শ্রমিকদের কল্যাণের জন্য তাদের বীমার আওতায় আনার দাবি জানান।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) তথ্যমতে, নির্মাণখাতে কাজ করতে গিয়ে গত বছর মারা যান ৯৫ শ্রমিক। ২০১২ সালে কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন এ খাতের ১০০ শ্রমিক। ২০১১ সালে সংখ্যাটা ছিল ১২১। আর তিন বছরে আহত হয়েছে ২০৬ নির্মাণ-শ্রমিক।

অপরদিকে, বাংলাদেশ অকুপেশনাল সেফটি হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ফাউন্ডেশনের (ওএসএইচই) তথ্য বলছে, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় গত বছর ১২১, ২০১২ সালে ২৪ ও ২০১১ সালে ১০৫ নির্মাণ-শ্রমিক প্রাণ হারান। এ তিন বছরে আহত হন ১৭২ জন। আর সেফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটির হিসাবে ২০১২ সালে ১১৩, ২০১১ সালে ১৮৩ ও ২০১০ সালে ১৪২ নির্মাণ-শ্রমিক দুর্ঘটনায় নিহত হন। কিন্তু বাস্তবে এর সংখ্যা অনেক বেশি বলে মনে করেন এ খাত-সংশ্লিষ্টরা।
আহত বা নিহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ ঠিকভাবে দেওয়া হয় নাÑ এ নিয়ে বিস্তর অভিযোগ আছে। আইনে শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের কথা বলা থাকলেও তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় সেটি আন্তর্জাতিক শ্রম আইনকে সমর্থন করে না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক নূর খান লিটন বলেন, ‘শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ না দেওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক। এটা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন।’

ইমারত নির্মাণ-শ্রমিক ইউনিয়নের (ইনসাব) সাধারণ সম্পাদক আবদুল রাজ্জাক বলেন, ‘শ্রমিকদের কাজের ক্ষেত্রে সচেতন হতে হবে এবং যথাযথ নিরাপত্তার সঙ্গে কাজ করতে হবে। সরকার যেন শ্রম আইনের বিধিমালা প্রণয়ন করে শ্রমিকদের জীবন রক্ষায় মনোযোগী হয়।’
আশার কথা হলো, নির্মাণ-শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণের জন্য একটি আধুনিক ইনস্টিটিউট নির্মাণ করতে যাচ্ছে আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাব।

রিহ্যাব সূত্রে জানা গেছে, দেশের অভ্যন্তরে কমপক্ষে ১০ লাখ নির্মাণ-শ্রমিক আছেন, যাদের অধিকাংশেরই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই নির্মাণ-শ্রমিকদের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে সারাবিশ্বে ৮০ থেকে ৯০ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করেন। এর মধ্যে ৩০ শতাংশই নির্মাণ-শ্রমিক। ওই ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষণ নিয়ে শ্রমিকরা দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশেও যেতে পারবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছেন রিহ্যাব নেতারা।

তবে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, এখনকার শ্রমিকরা তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন। পাশাপাশি কিছু প্রতিষ্ঠানও শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়ে যথেষ্ট উদার ও সচেষ্ট।

কারিকা প্রতিবেদক

0 1144

নির্মাণ-সামগ্রী অর্থাৎ লোহা, পাথর, ইট মানুষের আয়ুষ্কালের তুলনায় বেশিদিন টিকে থাকে। তাই বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন শাসকের শাসনকালে স্থাপত্যশিল্পের বাস্তবায়ন তাদের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রকালীন সামগ্রিক অবস্থা, ক্ষমতা ও উন্নয়নের সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে সে-তুলনায় দরিদ্র দেশে স্থাপত্যশিল্পের প্রসার খুব স্বাভাবিকভাবেই অপ্রতুল।

ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের উপাচার্য অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশে পেশা হিসেবে স্থপতি নবীন পর্যায়ে আছে। প্রথম যারা স্থপতি হিসেবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে বের হয়েছিল তাদের কাজের বয়স সব মিলিয়ে ৪০ বছরের বেশি হবে না। এর আগে অন্যরা এ কাজটি করতো। তাই বলা যায় এখনও এ পেশাটি পুরোপুরি শক্ত অবস্থানে যায়নি।’

বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের স্থাপত্যশিল্পের কাজ হয়েছে। পঞ্চাশের দশকে তৈরি হওয়া ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি’ এখনও এক কালজয়ী স্থাপত্যকর্ম। এমনকি বাংলাদেশের স্থাপত্য-ইতিহাসে বৈপ্লবিক ডিজাইনের নিদর্শন এ-ভবনগুলো দেখলেই বোঝা যায় স্থাপত্য কত সুন্দর হতে পারে। আরেকটি অনন্য সৃষ্টি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। পাহাড়ঘেরা অপূর্ব স্থাপত্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, যার রক্ষণাবেক্ষণ বর্তমানে সর্বনি¤œ পর্যায়ে। আগারগাঁওয়ের ন্যাশনাল লাইব্রেরিও দারুণ এক স্থাপত্যের চিহ্ন। এসব ভবনের নকশা তৈরি করেছিলেন বাংলাদেশের কালজয়ী নন্দিত স্থপতি মাজহারুল ইসলাম।

তবে ১৯৪৭ সাল-পরবর্তী সময়ে বিদেশি স্থপতিরা সরকারের বিভিন্ন নির্মাণকাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং সে-সময় প্রকৌশল পাশ করে বিদেশে স্থাপত্য বিষয়ে পড়ার জন্য চলে যান অনেকেই। যুক্তরাষ্ট্রের সেরা সব কিংবদন্তি-স্থপতি মাজহারুল ইসলামের সহপাঠী ছিলেন। বাংলাদেশে তার কাজ শুরুর প্রাক্কালে সরকারি স্থাপত্যকর্ম পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল প্রকৌশলীদের ওপর। তারা দুই-এক পাতায় কয়েকটি ছক একে পুরো ডিজাইন সম্পন্ন করতেন। ওই সময় এ রীতির বিরুদ্ধে তিনি যুদ্ধ করেছেন। উন্নত দেশের ডিজাইন অবিকল প্রয়োগ কিংবা উন্নত দেশের স্থাপত্যের সরাসরি ব্যবহার তার নকশায় কখনো দেখা যায়নি। তাই এত বছর পরও বাংলাদেশের মাটিতে তার স্থাপত্য আধুনিক স্থাপত্য হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে। বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু তার স্থাপত্যের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল। তবে শুধু যে অনেক আগে থেকেই হয়ে আসছে এমনটা কিন্তু নয়।

বসুন্ধরা সিটি কমপ্লেক্স, গ্রামীণফোন ভবন, হাতিরঝিল সবই আমাদের দেশের তরুণ স্থপতিদের কাজ। গ্রামে কাঁদামাটি, বাঁশ দিয়ে অদ্ভুত সুন্দর সুন্দর আকর্ষণীয় ভবন তৈরি করছেন তারা। জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, ‘বর্তমানে নকশা প্রণয়ন থেকে শুরু করে নানা ধরনের স্থাপত্য-সংক্রান্ত কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে প্রযুক্তি। এটা খুব ভালো লক্ষণ। নকশায় তো এখন ব্যবহৃত হচ্ছে সফটওয়্যার। সেদিক থেকে বলা যায় যে প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে। এছাড়া বর্তমানে অনেক ভবন-মালিক কিংবা অ্যাপার্টমেন্ট-ক্রেতা আগে থেকেই অ্যানিমেশন-প্রযুক্তির সাহায্যে নিজের বাড়ি কিংবা অ্যাপার্টমেন্টের সব দেখে নিচ্ছেন। এখনও যে পর্যায়ে প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে বাংলাদেশে, তা উন্নত দেশের সঙ্গে তুলনা করলে আমরা এক কাতারেই আছি।’

সম্প্রতি গ্রামীণ ব্যাংকের গ্রামীণ মানুষের জন্য আবাসন-প্রকল্পের জন্য তৈরিকৃত বাড়ি, যা চারটি কংক্রিটের খুঁটির ওপর নির্মিত, এটি স্থাপত্যে বিশ্বের সেরা সম্মানসূচক আগাখান পুরস্কার পেয়েছে প্রকল্পটি। দেশে প্রথম ত্রিমাত্রিক কাঠামো নকশায় সুউচ্চ গ্রামীণ ব্যাংক ভবন, চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন, প্রশিকা ভবন তৈরি করেছেন বাংলাদেশের স্থপতিরা। সরকারিভাবে বর্তমানে প্রচুর স্থাপত্যকর্ম বাস্তবায়িত হচ্ছে। বর্তমানে স্থপতি ছাড়া কেউ বাড়ি বানানোর কথা চিন্তাও করেন না। গ্রামে পর্যন্ত এখন স্থপতিরা বাড়িঘরের ডিজাইন করছেন। প্রতিনিয়ত দেশের বাইরে ভ্রমণ করায় দেশবাসীর দৃষ্টিভঙ্গিতে বিরাট পরিবর্তন এসেছে এবং তাদের কাছে দেশের স্থপতি এবং স্থাপত্যের মূল্যায়ন বেড়েছে। আর এসব কাজে বর্তমানে বেড়েছে প্রযুক্তির ব্যবহার। একটা সময় ছিল যখন হাতে-কলমে ডিজাইন করে সেটি বড় করে প্রিন্ট করা হতো। সেটিই হতো মূল নকশা। এখন সেটি থেকে বেরিয়ে আধুনিক সব সফটওয়্যার দিয়ে দারুণ সব ডিজাইন করছেন স্থপতিরা।

বাংলাদেশে স্থাপত্য ও পরিকল্পনা শিক্ষার শুরুটা হয়েছিল প্রথম ১৯৬১ সালে। তৎকালীন আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (বর্তমানে বুয়েট) টেক্সাসের এঅ্যান্ডএম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় রিচার্ড ব্রুম্যানকে শিক্ষক করে মাত্র ছয়জন শিক্ষার্থী নিয়ে স্থাপত্যশিক্ষার যে পদচারণ, আজ তার রূপরেখার পরিবর্তন ঘটেছে। দিন দিন দেশের আর্থসামাজিক চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এ শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা যেমন বাড়ছে, ঠিক তেমনি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ছাড়াই একের পর এক তৈরি হচ্ছে স্থাপত্য ও পরিকল্পনা বিভাগ। দেশে বর্তমানে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অনুমোদন পাওয়া অনেকেই স্থাপত্য বিভাগ চালু করে তাদের শিক্ষার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

অন্য শিক্ষাব্যবস্থার থেকে একটু আলাদা হওয়ার কারণে এখানে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও শিল্পসত্তার যোগসূত্রের বিকাশে সম্পূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে ঢেলে সাজাতে হয়, যেখানে প্রয়োজনীয় সব ধরনের আধুনিক প্রযুক্তি বিদ্যমান থাকা জরুরি। বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট (আইএবি) কর্তৃক প্রণীত বিভাগসমূহের বিশেষ করে বলা যায় আমাদের তরুণ স্থপতিদের কৃতিত্ব ও সফলতা। তারা সব শিল্প-মাধ্যমে বিশ্বমানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মৌলিক সৃষ্টিশীলতায় মগ্ন। স্থাপত্যে সফল হওয়ার পাশাপাশি চলচ্চিত্র নির্মাণ, অভিনয়, সঙ্গীত, সাহিত্য, নাটক, নৃত্য, চিত্রশিল্প, অভ্যন্তরীণ সাজ-সজ্জা, নিসর্গ রচনা ইত্যাদি বহু বিষয়ে ব্যপ্ত এবং কুশলতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন।

কারিকা প্রতিবেদক