Home বাজার দর

ফাইজুল ইসলাম
সাম্প্রতিককালে বিশ্বে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি বা সংক্ষেপে ভিআর প্রযুক্তির বিরাট অগ্রগতি হয়েছে। ইংরেজি শব্দগুচ্ছ ভার্চুয়াল রিয়েলিটি অর্থ যা বাস্তব না হলেও বাস্তব বলে গণ্য। আগে ভিআর প্রযুক্তিতে ভারী ভারী সরঞ্জাম ব্যবহৃত হতো। এখন তা বহনযোগ্য ও ব্যয়সাশ্রয়ী। মোবাইল ও হেডসেট ব্যবহার করেই এই প্রযুক্তি থেকে পাওয়া যাচ্ছে এর উপকারিতা। এই কারণে এ ধরনের ডিভাইসের কেনাবেচা ক্রমেই বাড়ছে। এর কনটেন্টও হচ্ছে অধিক মানসমৃদ্ধ ও বাস্তবসম্মত। ভিআর প্রযুক্তির ব্যবহারিক ও বাণিজ্যিক আবেদনও আছে। যেমন- রিয়েল এস্টেটে তথা প্লট, ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট ব্যবসার প্রসারে এই প্রযুক্তির ব্যবহারের কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। রিয়েল এস্টেট এজেন্সিগুলো কাস্টমারদের আকর্ষণে এবং প্রপার্টিগুলো পরিদর্শনের খরচ কমাতে এখন ভিআর প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন অবলীলায়।
২০১৫ সাল থেকে ভিআর প্রযুক্তি রিয়েল এস্টেটসহ বিভিন্ন শিল্পে একটি নতুন মার্কেটিং কৌশল হিসেবে আবিভূত হয়েছে। এজেন্সিগুলো স্যামসাং ভিআর হেডসেটের মাধ্যমে আমেরিকার লসঅ্যাঞ্জেলেস, নিউইয়র্ক ও হামটনসহ অভিজাত শহরের মাল্টিমিলিয়ন ডলার মূল্যের অ্যাপার্টমেন্ট ও বাড়িগুলো তাদের ভিআইপি ক্রেতাদের দেখাতে শুরু করল। তারপর থেকে অসংখ্য ভিআর রিয়েল এস্টেট প্রজেক্ট তৈরি হতে থাকল। ভিআর প্রযুক্তিও বহুমুখী কর্মশক্তিসম্পন্ন ও ডাইনেমিক তথা গতিশীল হলো। বিশেষজ্ঞরা ভবিষ্যদ্বাণী করলেন এই বলে যে, রিয়েল এস্টেটে ভিআর প্রযুক্তির উত্থান হবে অপ্রতিরোধ্য। ২০২৫ সাল নাগাদ এই শিল্পে ভিআর/এআর সফটওয়্যার থেকে মোট আয় হবে ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। তারপরও এই শিল্পে এখনো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। এই চ্যালেঞ্জগুলো হলো হাইকোয়ালিটির কনটেন্ট তৈরি করা, কনটেন্ট তৈরিতে কম সময় নেয়া এবং হেডসেটের মূল্য ক্রয়সীমার মধ্যে রাখা ইত্যাদি।

রিয়েল এস্টেটে ভিআর প্রযুক্তির ব্যবহারিক আবেদন
রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় কয়েকটি ক্ষেত্রে ভিআর প্রযুক্তির প্রায়োগিক আবেদন রয়েছে। যেমন-
১. ভার্চুয়াল ট্যুরসঃ ব্যক্তিগত ব্যবহার বা ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য কোনো প্রপার্টি ক্রয় করা অনেক ঝক্কি-ঝামেলার ব্যাপার। এজন্য সময়ও লাগে অনেক। দিতে হয় সীমাহীন ধৈর্য্যের পরিচয়। যদি প্রপার্টি ও ক্রেতার ভৌগোলিক অবস্থান হয় ভিন্ন ও বেশি দূরত্বের, তাহলে তা ক্রয় করা হয়ে পড়ে আরও কঠিন। এক্ষেত্রে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি সময় ও অর্থ বাঁচাতে সহায়তা করে। রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে প্রজেক্ট এরিয়া ঘুরে আসা যায় কয়েক মুহুর্তের মধ্যে। প্রপার্টি সম্পর্কে প্রিভিউ বা একটি আগাম ধারণা দেওয়াও সম্ভব হয়। এ ধরনের রিয়েল এস্টেট ভার্চুয়াল ট্যুর প্রদর্শনের জন্য যে কোনো আধুনিক ভিআর হেডসেটই যথেষ্ট। সেই ট্যুর হতে পারে ৩৬০-ভিডিও ফরম্যাটে অথবা নৌ বা বিমান যাত্রার মধ্য দিয়েও তা দেখানো যেতে পারে, যা হবে আরো প্রাণবন্ত ও উপভোগ্য।
২. ভার্চুয়াল ভিজ্যুয়ালাইজেশনঃ রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় যেসব প্রপার্টি নির্মাণাধীন রয়েছে, ভিআর প্রযুক্তি তার বিক্রয়ের ক্ষেত্রেও ব্যাপক সহায়তা করতে পারে। মার্কেটিংয়ের কর্মী ও রিয়েল এস্টেট এজেন্টরা এ ধরনের হাউজিংয়ের বিজ্ঞাপনে বহু কষ্ট করে থাকেন। কেননা সেখানে দেখার মতো আসলে বাস্তব জিনিসের অভাব রয়েছে। কিন্তু ভার্চুয়াল ভিজ্যুয়ালাইজেশনের মাধ্যমে তা সহজে দেখানো যায়। স্থাপত্যগত থ্রিডি ভিজ্যুয়ালাইজেশন প্রপার্টির ভবিষ্যৎ চেহারা কেমন হবে তা প্রদর্শন করে অতি সহজে। এর ভেতর ও বাইরের ডিজাইনও প্রদর্শন করে চমৎকারভাবে।
৩. ভার্চুয়াল স্টেজিংঃ ম্লান দেয়াল, ফার্নিচারের অনুপস্থিতি, ডেকোরেশনের অভাব ইত্যাদি ক্ষেত্রে অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির সুযোগ কমে যায়। ১৯৮৫ সালের দিকে রিয়েল এস্টেট এজেন্সিগুলো ইন্টেরিয়র ডিজাইনারদের সহযোগিতা নিতে শুরু করেন। তাদের সাহায্যে প্রপার্টি শো বাড়াতে থাকেন। একেই বলা হয় ভার্চুয়াল স্টেজিং। তারা দেখলেন স্টেজিং করা হাউস বা ফার্নিচার দিয়ে সাজানো-গোছানো অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি হচ্ছে হু হু করে। এতে অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি হতে লাগছে ৮০ ভাগ কম সময়। এই পদ্ধতি ভার্চুয়াল শোকেসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে। তাছাড়া এমন সব উপাদান দিয়ে ভার্চুয়াল স্টেজিং করা হয়, যাতে তেমন একটা খরচ হয় না।
৪. ভি-কমার্সঃ প্রপার্টির স্টেজিংয়ের অন্য এক উপকারিতাও আছে। এতে রিয়েল এস্টেট এজেন্ট ও অ্যাপার্টমেন্ট মালিক উভয়ই একসঙ্গে উপকৃত হন। এজেন্টরা ব্যবসা করেন আর অ্যাপার্টমেন্ট মালিকরা অ্যাপার্টমেন্ট সাজাতে ভালো ধারণা পেয়ে যান। এজন্য ভার্চুয়াল ইন্টেরিয়র ডিজাইন হলো ভি-কমার্সেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

রিয়েল এস্টেটে ভার্চুয়াল রিয়েলিটির উপকারিতা

আমাদের জীবনযাপনকে আরো সহজ ও সুবিধাজনক করে তোলার জন্য আজ ভিআর প্রযুক্তির গুরুত্ব সর্বাধিক। কাজের পরিবেশ আরো টেকসই করতেও এর কোনো জুড়ি নেই। রিয়েল এস্টেটের মতো ব্যবসায় ভার্চুয়াল রিয়েলিটির বেশকিছু সুবিধা রয়েছে, যেমনঃ

১. সময়ের সাশ্রয়ঃ আমাদের জীবনে সময়ের চেয়ে কোনো কিছুই মূল্যবান নয়। ভার্চুয়াল রিয়েলিটিকে ধন্যবাদ। এতে নতুন সম্পদের অনুসন্ধান ও পর্যালোচনা সম্পন্ন হতে পারে দ্রুত প্রক্রিয়ায়। ভার্চুয়াল ট্যুরের মাধ্যমে দিনের পর দিন ও ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্লট ও ফ্ল্যাট পরিদর্শনের আর দরকার পড়ে না। ক্রেতা ও বিক্রেতা কোনো ঝুট-ঝামেলা ছাড়াই অফিসে বা বাসায় বসে যে কোনো সময় ভিআর হেডসেট ব্যবহার করে তার সমাধান করে ফেলতে পারেন।
২. অর্থের সাশ্রয়ঃ প্রথমে ভিআর প্রযুক্তিকে অনেকে ব্যয়বহুল মনে করতে পারেন। মনে হতে পারে, এটা একটা হাই-টেকনোলজির ব্যাপার। তার কারণ ভার্চুয়াল ট্যুরে লাগে মানসম্মত গ্রাফিকস ও কমার্শিয়াল ফিচার। কিন্তু এটা ব্যয়বহুল হলেও মূল্যবান মুনাফাও এনে দেয়। প্রিন্ট ও অনলাইন মিডিয়ায় বিজ্ঞাপনের পেছনে যে খরচ হয় তা কমিয়ে দেয়। খরচ কমিয়ে দেয় ভার্চুয়াল স্টেজিংয়ের ক্ষেত্রেও। রিয়েল এস্টেটের ইন্টেরিয়র ডিজাইন, ফার্নিচার প্লেসমেন্ট ইত্যাদি থ্রিডি মডেল ব্যবহার করে উপস্থাপন করা যেতে পারে। পৃথক লোকেশনে আবার এটাই পুনঃব্যবহারযোগ্যও বটে।
৩. আবেগ তৈরি করা্রঃ টুডি প্রিন্ট ভিজ্যুয়ালাইজেশনের মতো নয়, ভার্চুয়াল ট্যুরস আসলে মানুষকে এমনভাবে সম্পৃক্ত করে যাতে বাস্তব উপস্থিতির অনুভূতি দেয়। সেখানে কোনো তাড়াহুড়োর প্রয়োজন নেই। একজন দর্শকের জন্য এতে আছে ভ্রমণের মাধ্যমে এক ধরনের আবিষ্কারের অনুভূতি ও মিথস্ক্রিয়ার স্বাধীনতা। বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও দেখার মাধ্যমে অ্যাপার্টমেন্টের এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে খুব সহজেই প্রবেশ করা যায়। এর মাধ্যমে এক ধরনের চেতনা ও আবেগ জাগিয়ে তোলে ভিআর প্রযুক্তি।
৪. পৃথিবীব্যাপী ব্যবসা করা যায়ঃ ভিআর প্রযুক্তি আমাদের দূরত্ব কমিয়ে দেয়। এ কারণে প্রথম ভিআর ট্যুর-ই তাদের ক্লায়েন্ট বাড়াতে শুরু করে। এটা শুধু স্থানীয় পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকে না, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। পৃথিবী আজ অনেক বেশি কসমোপলিটন বা সংকীর্ণতামুক্ত। ক্রমেই বাড়ছে বিশ্বনাগরিকের সংখ্যা। মানুষ আজ একস্থান থেকে আরেক স্থানে যাচ্ছে সহজেই। এমনকি এক গোলার্ধ থেকে অন্য গোলার্ধেও যাচ্ছে। তাই রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় ভার্চুয়াল রিয়েলিটির আবেদনও বিশ্বময়।

রিয়েল এস্টেট ভিআরের উদাহরণ
ভার্চুয়াল স্টেজিং সেবার জন্য রিয়েল এস্টেট এজেন্সিগুলোতে রয়েছে রুমি প্লাটফর্ম। তারা হাউস স্টেজিংকে গুরুত্ব দেন যাতে তা দ্রত ও উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়। এর কল্যাণে শুধু রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীরাই নন, সাধারণ মানুষও তার নিজস্ব অ্যাপার্টমেন্ট বা বাড়ির ইন্টেরিয়র ডিজাইনার হিসেবে আর্বিভূত হতে পারেন।
যেহেতু প্রিন্ট ইমেজ বা ছবি আজ সেকেলে, এমনকি প্রথম যুগের ভার্চুয়াল রিয়েলিটি হোম ট্যুরগুলোও আজ আর যুগোপযোগী নয়, কেননা এটা ৩৬০ ডিগ্রি ক্যামেরা দিয়ে তৈরি, তাই অত্যাধুনিক ভিআর প্রযুক্তি ব্যবহার করাই শ্রেয়। এমন একটি প্রযুক্তির নাম ম্যাটেপোর্ট। এর মাধ্যমে থ্রিডি ক্যামেরার সাহায্যে তৈরি হয় চমৎকার হোম ট্যুর, যা ‘একের মধ্যে সব’ হিসেবে কাজ করে। এই বিশেষ ক্যামেরা ফোর কে রেজল্যুশনে রিয়েল এস্টেটের জন্য ভিআর ট্যুর উৎপাদনে সহায়তা করে।
যেসব প্রপার্টি নির্মাণাধীন, সেখানে বিশেষ করে ‘ভার্চুয়াল এক্সপেরিয়েন্স’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এর মাধ্যমে কনস্ট্রাকশন কোম্পানির জন্য তৈরি হয় ভিআর কনটেন্ট। এটা অসম্পূর্ণ অ্যাপার্টমেন্ট পরিদর্শন করে সুন্দরভাবে। আবার অনলাইন ব্যবহারের জন্য থ্রিডি ভিজ্যুয়ালাইজেশন খুবই সহজলভ্য। কিংবা অকুলাস রিফট ও এইচটিসি ভাইভের মতো ভিআর হেডসেটও পাওয়া যায় সহজেই।

কামরুজ্জামান কাজল
শীতের আমেজ শেষ হলো। বসন্তের রঙে সাজবে ঘর। কোকিলের কুহু-কুহু আর লিলুয়া বাতাসে মেতে উঠবে মন। মেতে ওঠা মনের সঙ্গে এবার না-হয় মেতে উঠুক ঘরের সাজসজ্জাও। বসন্তের বাতাসে হু-হু করে দোলা দিয়ে উঠুক ঘরের পর্দাগুলো। এই নরম আবহাওয়ায় বৈচিত্র্যময় পর্দায় সাজিয়ে তুলতে পারেন আপনার প্রিয় নিবাস। সেটা কীভাবে? পরামর্শ দিয়েছেন ফারজানা’স ব্লিজের স্বত্বাধিকারী ফারজানা গাজী।
তিনি জানান, বসার ঘর থেকে শুরু করে খাবার ঘর, ঘরে রাখা আসবাবের আকৃতি, দেয়ালের রঙ ও আসবাবের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে পর্দা বাছাই করা ভালো। অন্যদিকে আবহাওয়া বুঝে দুই সেট পর্দা বানিয়ে নিলে সুবিধা। মূলত গরম ও শীতকালের জন্য। গরমের জন্য বাছাই করুন হালকা রঙের পাতলা পর্দা, এতে বাতাস চলাচল সহজ হবে, গরমে পাবেন স্বস্তি। আর শীতে পর্দা অপেক্ষাকৃত মোটা বা ভারী কাপড়ের ও গাঢ় রঙের হওয়া উচিত। এ সময় ধুলাবালি বেশি হয়, তাই পর্দা ময়লা হলেও বোঝা যাবে না আর রুমে ঠান্ডাও লাগবে কম।

বসার ঘরে পর্দা
অতিথি আপ্যায়নে বসার ঘরটাই মুখ্য। পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে টিভি দেখা কিংবা অতিথিদের সঙ্গে সময় কাটানো হয় বসার ঘরেই। তাই বসার ঘরের পর্দায় মনোযোগী হতে হবে একটু বেশি।
এই ঘরে ব্যবহার করতে পারেন সিল্ক, সার্টিন, জর্জেট, ভেলভেট কিংবা কাতান কাপড়ের পর্দা। বসার ঘরের পর্দা মেঝে পর্যন্ত বড় হলে দেখতে সুন্দর লাগে। খাটো পর্দা ঘরের সঙ্গে মানায় না। তাই বসার ঘরে খাটো পর্দা না রাখাই ভালো। আর রঙ বাছাইয়ের চিন্তা যদি করতে হয়, তবে নির্বাচন করতে পারেন হালকা সবুজ, চকোলেট, নীল, গোলাপি কিংবা বাদামি রঙ। ইচ্ছে হলে একরঙা কাপড় ব্যবহার করতে পারেন। কিংবা চেক কাপড়েও ভালো মানাবে।

শোয়ার ঘর
ক্লান্ত শরীরে নিজেকে বিশ্রাম দিতে শোয়ার ঘরের ইন্টেরিয়রেও মনোযোগ দিতে হবে। শোয়ার ঘরের ক্ষেত্রে ভারী পর্দায় প্রাধান্য দিতে পারেন। কাপড় বাছাইয়ে মোটা কাপড় বাছাই করতে হবে। রঙ পছন্দের ক্ষেত্রে অফ হোয়াইট, গোলাপি বা হালকা সবুজকে প্রাধান্য দিতে পারেন।

সাজবে শিশুর ঘর
শিশুদের রঙিন দুনিয়া। সেটা তাদের কল্পনাতেও। আর বাস্তবে বাবা-মায়েরাও চান শিশুর ঘরটাকে সুন্দর করে রাঙিয়ে দিতে। সেই রাঙানোর ক্ষেত্রে মনোযোগ দিতে হবে রঙিন পর্দার দিকে। ছেলে-বাচ্চাদের ক্ষেত্রে নীল আর মেয়েদের ক্ষেত্রে পছন্দের তালিকায় রাখতে পারেন গোলাপি। তবে আপনার শিশুর পছন্দের দিকে আগে নজর দিন। নানা কার্টুন চরিত্র দিয়ে সাজিয়ে দিতে পারেন তার ঘরটি।

পর্দা শুধু ঘর সাজানোর অনুষঙ্গ হিসেবে নয়, এটি বহন করে আপনার রুচি ও ব্যক্তিত্ব। তাই বাসার সুবিধার্থে দুই সেট পর্দা রাখতে পারেন। একসেট সবসময় ব্যবহার করবেন। আরেক সেট রেখে দিতে পারেন অতিথিদের জন্য কিংবা বাড়িতে কোনো উৎসবের জন্য।
প্রতিদিন বা একদিন পরপর ভেজা কাপড়ে গ্রিল ও শুকনো কাপড়ে ফার্নিচার মুছে নিলে পর্দা কম ময়লা হয়।
যারা দেশি আমেজে ঘর সাজাতে চান, তারাও পর্দার দিকে মনোযোগী হতে পারেন। তাদের জন্য ভালো সমাধান হচ্ছে চেক, ব্লক প্রিন্ট, বাটিক ও নকশিকাঁথার পর্দা বেছে নেয়া। কারণ এ ধরনের পর্দায় ষোলআনা বাঙালিয়ানা ফুটিয়ে তোলা সম্ভব।
আপনার যে কক্ষে বেশি আলো-বাতাস খেলা করে সেই ঘরে দরজা-জানালায় হালকা রঙের নেটের পর্দা ভালো লাগবে। শুধু তা-ই নয়, ধুলাবালিতে নোংরা হলেও সমস্যা নেই, কারণ নেটের পর্দা ধুয়ে ফেলা সহজ।

আহসান রনি
চোখের সামনে ঘন গাঢ় সবুজ দেখতে কার-না ভালো লাগে। বিশেষ করে কম্পিউটারের সামনে একটানা তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ বারান্দা বা জানালার গ্রিল জড়িয়ে কাঁপতে থাকা কচি সবুজ পাতার দিকে তাকালেই যেন দু’চোখ জুড়িয়ে যায়। কিংবা পড়তে পড়তে, লিখতে লিখতে বা একাধারে কাজ করতে করতে যে একঘেয়েমি ও বিষণœতার ছাপ পড়ে চোখে-মুখে, তা দূর করতেও চাই চোখের সামনে শুধুই সবুজ আর সবুজ। সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখ মেলেই ঘরের দেয়ালজুড়ে সবুজ দেখতে পারাটা চোখ ও মনের শান্তি ভরপুর মিটিয়ে দেয়। আর সবুজের এসব অসম্ভব আবদার কেবল সম্ভব করতে পারে ভার্টিক্যাল গার্ডেন।
বাগান সৃজনের একটি বিশেষ পদ্ধতি ‘ভার্টিক্যাল গার্ডেন’, যেখানে অল্প জায়গায় অধিক গাছ রোপণ করে স্থানটি সবুজে সাজিয়ে তোলা যায়। যাদের ছাদে বা আঙিনায় বাগান করার সুযোগ নেই, তাদের জন্য ভার্টিক্যাল গার্ডেন বা উলম্ব^ বাগান ইদানীং খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। যদিও ভার্টিক্যাল গার্ডেন বাড়ির ছাদে কিংবা যেকোনো পরিসরেই করা সম্ভব, তবুও শহরের সবুজপ্রিয় মানুষ বিকল্প জায়গা না পেয়ে বারান্দা ও ঘরের দেয়ালকেই বেছে নিচ্ছে।
যেহেতু ভার্টিক্যাল গার্ডেনে স্তরে স্তরে বা ধাপে ধাপে তুলনামূলক কম দূরত্বে একটার পর একটা গাছ রোপণ করা হয়, তাই অগভীরমূলীয় প্রায় সব বীরুৎজাতির উদ্ভিদ ভার্টিক্যাল গার্ডেনের জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী। তবে রোদ বা আলো-বাতাসের প্রাপ্যতাভেদে অগভীরমূলীয় ফুল, সবজি, ফল কিংবা পাতাবাহারি গাছের চারা রোপণ করেও ভার্টিক্যাল গার্ডেন গড়ে তোলা যায়।
ছাদে বা বারান্দায়, যেখানে দিনে অন্তত ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা সরাসরি আলো পৌঁছে, সেসব জায়গায় চাইলেই ফুল বা শাক-সবজি লাগিয়ে ভার্টিক্যাল গার্ডেন গড়ে তোলা যায়। বিশেষত শীতের ফুল, যেমন- পিটুনিয়া, ভার্বেনা, ডায়ানথাস, এসটার, ফ্লক্স, সিলভিয়া, জিনিয়া ইত্যাদি ফুল দিয়ে সহজেই ভার্টিক্যাল গার্ডেন করা যায়। পাশাপাশি প্রায় সারা বছর ফোটে এমন ফুল যেমন মর্নিং ডোয়ার্ফ গøরি, পানিকা, চাইনিজ টগর ও পুর্তলিকা দিয়েও ভার্টিক্যাল গার্ডেন করা যায়। একইভাবে বারান্দা ও ছাদে ভার্টিক্যাল গার্ডেন করে তাতে শাক-সবজি লাগিয়েও ভালো ফলন পাওয়া যায়। টমেটো, চেরি টমেটো, লেটুস, ব্রোকলি, মরিচ, ক্যাপসিকাম, লালশাক, পালংশাক, ডাঁটাশাক ইত্যাদি শাক-সবজি সহজেই ভার্টিক্যাল গার্ডেন করে চাষাবাদ করা যায়।
ঘরের ভেতরে, লিভিং রুম বা অফিসেও চাইলে ছায়াবান্ধব পাতাবাহারি গাছ দিয়ে ভার্টিক্যাল গার্ডেন তৈরি করা যায়। মানিপ্ল্যান্ট, এলোকেশিয়া, ফার্ন, স্পাইডার, লিলি, এনথোরিয়াম, বোট লিলি, ড্রাসেনা, মেরেন্টা, মনস্টেরা ইত্যাদি গাছ দিয়ে ভার্টিক্যাল গার্ডেন করে অফিস বা বাসাবাড়ির ভেতরের দেয়ালগুলো নান্দনিকভাবে সাজিয়ে তোলা যায়। ইদানীং বিভিন্ন পদ্ধতিতে প্লাস্টিক, লোহা, স্টিল বা কাঠের ফ্রেম বানিয়ে দেয়ালে সেট করে তাতে পোর্টেবল টব ঝুলিয়ে ভার্টিক্যাল গার্ডেন তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি দেয়ালের ধাপে ধাপে সিমেন্টের স্থায়ী বেড বানিয়েও ভার্টিক্যাল গার্ডেন করা যায়। তবে আধুনিক পদ্ধতির ভার্টিক্যাল গার্ডেনের অনেক উপকরণ আমাদের দেশে উৎপাদন না হওয়ায় দেশের বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে বেশ খানিকটা খরচ পড়ে যায় উন্নত প্রযুক্তির ভার্টিক্যাল গার্ডেন সৃজনে। একই সঙ্গে দেশীয় প্রচলিত পদ্ধতিতে বাঁশ, কাঠ ও রডের মতো সহজলভ্য উপকরণ দিয়ে তুলনামূলক কম খরচেও ভার্টিক্যাল গার্ডেন করা সম্ভব। ভার্টিক্যাল গার্ডেনে যেহেতু পরিচিত ও দেশীয় সহজলভ্য গাছগুলোই রোপণ করা হয়, তাই এর যতœ ও পরিচর্যা-পদ্ধতি খুব একটা জটিল নয়। পরিমিত পানি ও প্রতি এক-দুই মাস অন্তর পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার, সার, ভিটামিন সরবরাহ করলেই গার্ডেন সবুজ ও সতেজ থাকে। এ ছাড়াও অটোমেটিক ড্রিপ ইরিগেশন সিস্টেম চালু করে তার সঙ্গে টাইমার কিংবা সেন্সর সেট করে সঠিক পানি-ব্যবস্থাপনা করা যায় ভার্টিক্যাল গার্ডেনে। আর একসঙ্গে যেহেতু পাশাপাশি অনেকগুলো গাছ থাকে, তাই রোগবালাই যেমন ছত্রাক বা ভাইরাসের আক্রমণ হলে তা দ্রæত ছড়ায়। ফলে আক্রান্ত গাছকে দ্রæত প্রতিস্থাপন করে সহজেই প্রতিকার পাওয়া সম্ভব। পাশাপাশি কিছু জৈব বালাইনাশক ও প্রাকৃতিক উপাদান থেকে তৈরি বায়ো পেস্টিসাইড স্প্রে করেও প্রতিকার পাওয়া সম্ভব।
ভার্টিক্যাল গার্ডেন আয়তনে বড় হলে মাটির পরিবর্তে কোকোডাস্ট, পার্লাইট, পিটমস, কম্পোস্ট কিংবা অর্ধেক মাটি অর্ধেক কোকোডাস্ট বা কম্পোস্ট মিশিয়েও গ্রোইং মিডিয়া তৈরি করা যায়। মাটিবিহীন ভার্টিক্যাল গার্ডেন একদিকে যেমন হালকা ও টেকসই হয়, অন্যদিকে কাদা-ময়লা ও রোগবালাইও তুলনামূলক কম হয়। পাশাপাশি হাইড্রোফোবিক বা জলচাষ পদ্ধতিতেও মাটিবিহীন ভার্টিক্যাল গার্ডেন করা যায়।

খালিদ জামিল


যারা ভবনের নকশা করেন তাদের মনে রাখতে হয় বেশকিছু বিষয়। সবচেয়ে বেশি কাজে লাগাতে হয় কল্পনাশক্তিকে। তবে বর্তমান সময়ে ভবনের নকশার ক্ষেত্রে সেটাকে আইকন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি নিজের সৃষ্টির যাতে সর্বোচ্চ ব্যবহার মানুষ করতে পারে খেয়াল রাখতে হয় সেদিকেও। স্থপতি স্টিভেন হল তার ফার্মের নকশায় নির্মিত বেইজিংয়ের আবাসিক ও বাণিজ্যিক কমপ্লেক্স লিঙ্কড হাইব্রিডের উদাহরণ টেনে বলেন, ‘আপনি ব্যাপারটা কোনোভাবেই বুঝবেন না যদি এর ওপর, ভেতর এবং চারদিক সম্পর্কে না জানেন।’
হল বলছেন, ‘এই স্থাপনা একটি ‘আল্ট্র গ্রিন প্রজেক্ট’, যেখানে রয়েছে ৬৫৫টি জিওথারমাল দেয়াল। এগুলো কমপ্লেক্সের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। আবহাওয়ার কথা বিবেচনায় নিয়েই এই বিষয়গুলো রাখতে হয়েছে।
রেইকজাভিক’স হারপা কনসার্ট হল ও কনফারেন্স সেন্টারের উদাহরণও আসতে পারে এখানে। এই স্থাপনাটি স্থাপত্য ফার্ম হেনিং লারসন, বাটেরিও ও শিল্পী ওলাফুর ইলিয়াসনের যৌথ প্রচেষ্টায় তৈরি। অ্যাসাইমেট্রিক্যাল ধাঁচের এই স্থাপনাতে ব্যবহার করা হয়েছে এলইডি-অ্যালুমিনেটেড কাচ আর স্টিলের ইট। যে-কারণে প্রতিদিন সন্ধ্যায় স্থাপনাটি আভির্ভূত হয় অন্যরকম সৌন্দর্য নিয়ে। বিশ্বের এমন সেরা ১০ স্থাপনা নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজনের ১ম পর্ব।

১. হারপা কনসার্ট হল
রেইজাভিক আইল্যান্ড
হেনিং লারসন আর্কিটেক্ট এবং বাতেরিও আর্কিটেক্ট (২০১১)
আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়ার বেশ আগে থেকেই এই কনসার্ট হল আইল্যান্ডের চেহারাই বদলে দেয়। এক সময়ের ঘুমন্ত সৈকত যেন জেগে ওঠে। এর বিভিন্ন রঙের কাচ মানুষকে মোহিত করার ক্ষমতা রাখে। আর সে-কারণেই একে দেখতে স্থানীয়রা তো বটেই, বাইরে থেকেও মানুষ আসেন। শিল্পী ওলাফুর এলিসনের ক্রিস্টাল লাইন শেলটা পুরো স্থাপনার সঙ্গে মানিয়েছে অদ্ভুতভাবে। সাগরতীরে রাতে যখন এলইডি লাইটগুলো জ্বলে ওঠে, সেই সৌন্দর্য অবর্ণনীয়।

২. বুর্জ খলিফা
দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত
স্কিডমোর, ওইংস অ্যান্ড মেরিল (২০১০)
মরুভূমির বুকে সবকিছুকে পেছনে ফেলে যেন মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে ২,৭১৭ ফুট উচ্চতার এই সুপার টাওয়ার। বাগিয়ে নিয়েছে বিশ্বের উচ্চতম ভবনের তকমা। ১৬২তলা এই ভবনটিতে অফিস থেকে শুরু করে বাসা, রেস্টুরেন্ট এমনকি একটি আরমানি হোটেলও রয়েছে। অবজারভেশন ডেকটা ১২৪তলায়। কেবল উচ্চতার দিক দিয়ে নয়, নকশার আরো অনেক দিক দিয়ে পৃথিবীর অন্যান্য স্থাপনাকে পেছনে ফেলেছে। স্টিলের ফ্রেমের ওপর গ্লাস-কার্টেন দেয়াল, যেটা আরবের প্রখর সূর্য থেকে ভবনের ভেতরটা রক্ষা করে। নিচ থেকে ধীরে ধীরে ওপরের দিকে ভবনটি ‘ওয়াই’ আকৃতি ধারণ করেছে।

৩. গার্ডেন্স বাই দ্য বে
সিঙ্গাপুর
উইলকিনসন আয়ের আর্কিটেক্টস, গ্র্যান্ট অ্যাসোসিয়েটস (২০১২)
২০১২ সালের ওয়ার্ল্ড আর্কিটেকচার ফেস্টিভ্যালে ‘বিল্ডিং অব দ্য ইয়ার’ মনোনীত হয় গার্ডেন্স বাই দ্য বে। মেরিনা বে ডিস্ট্রিক্টে প্যারাবোলিক আকৃতির বোটানিক্যাল গার্ডেন এটা। শুকনো এবং বর্ষা দুই মৌসুমের কথা মাথায় রেখেই এই নকশা করে উইলকিনসন আয়ের আর্কিটেক্টস। যে-কারণে তৃণভূমি কিংবা পাহাড়ি বনের মতোই আকর্ষণ এখানে। ভার্টিক্যাল বাগানটি তৈরিতে খুব বড় কিছু অবশ্য করেনি গ্র্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস। দর্শকদের হাঁটার জন্য শুধু এলিভেটেড ওয়াকওয়ের ব্যবস্থা করা আছে, যেটা গিয়ে মিলেছে ‘সুপার স্ট্রিটের’ সঙ্গে। সঙ্গেই রয়েছে কয়েকটি জায়গায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের জন্য সোলার প্যানেল।

৪. লিঙ্কড হাইব্রিড
বেইজিং
স্টিভেন হল আর্কিটেক্টস (২০০৯)
এটা মূলত আটটি টাওয়ারের সমন্বয়। প্রত্যেকটি পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত। আবাসিক ও বাণিজ্যিক দুই ধরনের কাজেই এটা ব্যবহৃত হয়। একুশ শতকের নগর উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রাকে মাথায় রেখেই নির্মাণ করা হয়েছে এই স্থাপনা। অভিজাত আবাসিক অংশটি যাতে স্থাপনার বাকি অংশ থেকে আলাদা না হয়ে পড়ে সেজন্য নিচতলায় খোলা প্যাসেজ রাখা হয়েছে। পাবলিক স্পেস যেমন বাগান, দোকান, রেস্টুরেন্ট এবং স্কুলগুলোতে যাওয়ার জন্য সব অংশ থেকেই রাখা হয়েছে পায়ে-চলার পথ। বাসিন্দা আর বাইরে থেকে আসা মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য রয়েছে কাচ আর ইস্পাতের মিশেলে তৈরি কয়েকটি সেতুও।

৫. দ্য শার্ড
লন্ডন
রেনজো পিয়ানো বিল্ডিং ওয়ার্কশপ (২০১২)
লন্ডনে আয়োজিত সর্বশেষ সামার অলিম্পিক যারা দেখেছেন তাদের কাছে ৭২তলাবিশিষ্ট এই ভবন পরিচিতই মনে হবে। পশ্চিম ইউরোপের সবচেয়ে উঁচু ভবন এটি। টেমস নদীর তীরে দাঁড়িয়ে ব্রিটিশ রাজধানীর স্কাইলাইনকে নতুন রূপ দিয়েছে এই বহুতল ভবন। কাচের আউটলাইনটার আটটি কোণ থাকায় শহরের প্রতিটা দিক যেমন এখান থেকে দেখা যায়, তেমনি ভেতরে সূর্যের আলো ঢুকতে পারে ভালোভাবেই। অফিস, অ্যাপার্টমেন্ট, রেস্টুরেন্ট আর হোটেল এ সবকিছু থাকায় ভবনটাকে বলা হয় ‘ভার্টিক্যাল ভিলেজ’। এ ছাড়া শহরটা অন্যভাবে দেখার জন্যও এখানে আসেন অনেকে। যেকোনো দিকে এখান থেকে দেখা যায় ৪০ মাইল পর্যন্ত।

 

খালিদ জামিল


ইউরোপের জ্ঞান আর অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হওয়ায় আমস্টারডামের জনসংখ্যা বাড়ছে দ্রুতগতিতে। শহরের সিটি কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০৪০ সালের মধ্যে আমস্টারডামে আরও দেড় লাখ মানুষ বাইরে থেকে এসে যুক্ত হবে স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে। শহরের পরিকল্পনাকারীরা যদি এই অতিরিক্ত মানুষের কথা মাথায় রেখে মাস্টারপ্ল্যান নতুন করে সাজাতে না পারেন, তবে এই বিপুল জনসংখ্যার চাপ সামাজিক এবং অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বেশ বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
মাস্টারকার্ড পরিচালিত ২০১৫ গ্লোবাল ডেস্টিনেশন সিটি ইনডেক্সের তথ্য বলছে, আমস্টারডাম শিপহোল এয়ারপোর্টের মাধ্যমে এই শহর সে বছর যে পরিমাণ আন্তর্জাতিক যাত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে, সেটা ইউরোপের মধ্যে পঞ্চম।
এসব কারণেই আমস্টারডামের সিটি কাউন্সিল তাদের শহরের আয়তন বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সেগুলোকে একসঙ্গে বলা হচ্ছে ‘স্ট্রাকচারাল ভিশন আমস্টারডাম-২০৪০ সিটি মাস্টারপ্ল্যান’। শহরের নকশাকে নতুন করে সাজানো, বাইরের সঙ্গে আরও সহজ যোগাযোগ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে শহরকে নিয়ন্ত্রণ এবং শহরের মধ্যে চলাচলের জন্য আরও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এই পরিকল্পনার অন্যতম অংশ। শহরে জনসংখ্যার ঘনত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন বাণিজ্যিক ও আবাসিক অংশ নির্মাণ করা হবে, যেগুলো সংযুক্ত হবে একটি রিংরোডের মাধ্যমে।

শহরের ঘনত্ব বাড়ানো, উন্নয়ন এবং জমি পুনরুদ্ধার
শহরকে নতুন করে সাজানোর মাধ্যমে বিভিন্ন অংশের ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। জমি পুনরুদ্ধারের এই প্রক্রিয়া বিশ্বের অনেক শহরেই করা হয়। তবে আমস্টারডামের মতো এত বড় পরিসরে এমনটা হওয়ার দৃষ্টান্ত নেই। আমস্টারডামের এই ‘স্ট্রাকচারাল ভিশন আমস্টারডাম-২০৪০’ মেগা প্রজেক্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে আধুনিক নগরপরিকল্পনার দিক দিয়ে সেটা অন্যান্য শহরের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
এই মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় সাতটি বিশেষ কর্মপরিকল্পনা রয়েছে, যেগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে শহরের বাসিন্দাদের জীবনযাপন বর্তমানের তুলনায় আরও সহজ হয়ে উঠবে। সেই বিশেষ কর্মপরিকল্পনার মধ্যে একটি হলো আমস্টারডামের ঘনত্ব বাড়ানো। ২০৪০ সালের মধ্যে ৭০ হাজার নতুন ভবন নির্মাণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আবাসিক ভবনের পাশাপাশি থাকবে স্কুল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং খেলাধুলার সুযোগ-সুবিধা। তবে সব ক্ষেত্রেই ভূমির সর্বোচ্চ ব্যবহার আর বহুমুখী ব্যবহারযোগ্য ভবন নির্মাণের দিকে লক্ষ্য রাখা হবে।
ভূমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার আরেকটা উপায় হলো বাণিজ্যিক অঞ্চল নতুনভাবে গড়ে তোলা। একই এলাকায় বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন গড়ে তোলারও পরিকল্পনা করা হচ্ছে, অনেকটা সাম্প্রতিক আমস্টারডামের পোর্ট সিটির মতো। ২০৩০ সালের মধ্যে শহরের ওয়াটার ফ্যাসিলিটিতে ১৯ হাজার মানুষের বাসস্থান গড়ে তোলা সম্ভব হবে, যেটা সংযুক্ত থাকবে সামুদ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে।
রিং রোডের মধ্যকার শহরের অংশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করা বেশ বড় চ্যালেঞ্জ। এই সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে গোটা শহর একটা মেট্রোপলিটন অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা হবে। তার জন্য এই যোগাযোগ ব্যবস্থার মূল অংশগুলোতে বিশেষ বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিটি কাউন্সিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী শহরের মূল অংশগুলোর সামাজিক পরিবেশের উন্নয়ন করা হবে দোকান এবং খাবার সরবরাহের ধরনের উন্নয়ন ও ভিন্নতা আনার মাধ্যমে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আরও আছে –
• শহরের এক অংশের সঙ্গে অন্য অংশের সংযোগের জায়গাগুলোতে সবুজ অঞ্চল বাড়ানো।
• শহরকে মোটা দাগে দ্বিখ-িত করা আইজে ওয়াটারওয়েকে নতুন করে সাজানো।
•  শিপহোল বিমানবন্দরের কাছে সেন্ট্রাল আমস্টারডামে জুইডাস বাণিজ্যিক অঞ্চলের উন্নয়ন।
• ২০২৮ সামার অলিম্পিককে সামনে রেখে দুটি ভিন্ন নগর-পরিকল্পনা।
জুইডাসে শীর্ষ স্থপতিরা ভবিষ্যতের নগর গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছেন। যেমন- রেম কোলহ্যাস করছেন আমস্টারডাম আরএআই হোটেলের নকশা। আরএআই কনভেনশন সেন্টারের এক্সপেনশন হিসেবে নির্মিত হচ্ছে এই হোটেল, যার নকশা মূলত উলম্ব অংশের ওপর কিউব আকৃতির স্থাপনা। শহরের এই অংশে এমন দারুণ কিছু স্থাপনা গোটা এলাকার চেহারাই বদলে দিচ্ছে।
আমস্টারডামের নুর্ড ডিস্ট্রিক্টে মূল জলপথের উত্তরে নতুন ইওয়াইই ফিল্ম ইনস্টিটিউট এবং ক্রান্সপোর বিল্ডিং এই অঞ্চলকে সৃজনশীলতার হটস্পটে পরিণত করেছে। আমস্টারডাম যদি এভাবেই নিজেকে সাজিয়ে এবং বিভিন্ন অংশের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে একটি মেট্রোপলিটনে রূপান্তরিত হতে পারে, তাহলে স্মার্ট ও অভিনব নগর উন্নয়নের দিক দিয়ে সারা বিশ্বের জন্য রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত হবে।

কীভাবে আমস্টারডাম এর বিভিন্ন অংশকে সংযুক্ত করছে?
মেট্রোপলিটন শহরে রূপান্তরকরণের মাধ্যমে শহরের প্রত্যেক অংশের সঙ্গে সুষ্ঠু যোগাযোগ গড়ে তুলতে হবে। সেজন্য হাঁটার পথ, সাইকেলের পথ আর গণপরিবহন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। সেই সঙ্গে এই নতুন স্মার্ট সিস্টেমের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে আমস্টারডামের বাসিন্দা থেকে শুরু করে এই শহরে বেড়াতে আসা সবাইকে। ‘স্ট্রাকচারাল ভিশন আমস্টারডাম-২০৪০’ পরিকল্পনার একটি অন্যতম অংশ এই গণপরিবহনের রুট সংস্কার। পাশাপাশি আরও পার্ক এবং বাইসাইকেল লেন নির্মাণ করা হবে। যতটা সম্ভব কমিয়ে ফেলা হবে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা।
সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদন বলছে, এখানকার আঞ্চলিক গণপরিবহন ব্যবস্থায় বিভিন্ন ধরনের সীমাবদ্ধতা আছে। তবে যেসব প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে, তাতে ২০৪০ সালের মধ্যে একটি প্রশস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা অবশ্যই গড়ে তোলা সম্ভব। গোটা শহরের যেকোনো জায়গা থেকে বাস বা ট্রেন ব্যবহার আরও সুবিধাজনক করতে স্টেশনের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
জুইডাস এবং দক্ষিণ-পূর্ব আমস্টারডাম শহরের কেন্দ্র এবং বিমানবন্দরের কাছে হওয়ায় এই অংশের বাণিজ্যিক ও আবাসিক উন্নয়নকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। দক্ষিণ অংশে এরই মধ্যে বড় আকারের প্রজেক্ট বাস্তবায়নের কাজ চলছে। ২০৪০ সালের মধ্যে পরিকল্পনা পুরোপুরি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সবকিছুই শিপহোল বিমানবন্দরের বর্ধিতকরণ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত। একই সঙ্গে জুইডাসের কেন্দ্রেই নতুন একটি রেলস্টেশনের নির্মাণ কাজ চলমান, যেটা হবে গোটা শহরের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম রেল যোগাযোগের কেন্দ্র। শহরের বাকি অংশগুলোর সঙ্গে তো বটেই, এই স্টেশন নেদারল্যান্ডসের অন্যান্য অংশ এমনকি পশ্চিম ইউরোপের অনেক শহরের সঙ্গেও যোগাযোগ সহজতর করতে রাখবে অনন্য ভূমিকা।
অন্যদিকে বেসরকারি উদ্যোগে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য বেশ কয়েকটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। সংখ্যায় সেগুলো ডজনখানেকের বেশি। যেমন ‘ইয়েলার’ মোবাইল অ্যাপ নিয়ে বর্তমানে একটি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, যেটার মাধ্যমে একজন ভ্রমণকারী আরেকজন ভ্রমণকারীর সঙ্গে নিজের ক্যাব শেয়ার করতে পারেন। ‘উইগো’ নামের আরেকটি অ্যাপের মাধ্যমে যার গাড়ি নেই, তিনি একজন গাড়ির মালিক, যার গাড়িটি কিছু সময়ের জন্য দরকার হচ্ছে না, তার কাছ থেকে ভাড়া নিতে পারেন। এছাড়া ‘মোবিপার্ক’ পার্কিং প্ল্যাটফর্ম অ্যাপের মাধ্যমে ধারে-কাছে কোথাও পার্কিংয়ের সুবিধা থাকলে সেটার খোঁজ পাওয়া যায়। যে-কারণে গাড়ি পার্ক করার জন্য এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করে চালকদের সময় নষ্ট করতে হয় না।
আশা করা হচ্ছে, আমস্টারডামে গাড়িতে যাতায়াতের জন্য যে পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহৃত হয়, ২০৪০ সালের মধ্যে সেটার ৬০-৯০ শতাংশ জোগান আসবে উইন্ডমিল, বায়োগ্যাস কিংবা সৌরবিদ্যুতের মতো প্রকৃতিবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস থেকে। ২০৪০ সালের পর শহরের খালগুলোতে কেবল বৈদ্যুতিক শব্দবিহীন নৌযান চলাচলের অনুমতি থাকবে। এর মাধ্যমে আমস্টারডামে পুরনো ইউরোপের মতো পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হবে। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে এটাকে রূপান্তরিত করা হবে স্মার্ট শহরে।

নাগরিক অভিজ্ঞতা নিয়ে নতুন ভাবনা : আমস্টারডাম স্মার্ট শহর প্রকল্প
টেকসই উন্নয়ন নিয়ে চিন্তাভাবনার সময়ে আমস্টারডামের এই প্রকল্প বিশ্বের সেরা প্রকল্পগুলোর একটি বলেই উল্লেখ করা যেতে পারে। যেকোনো স্মার্ট সিটি গড়ে তোলার জন্য সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ের উদ্যোগের ক্ষেত্রে সমন্বয় প্রশ্নে এই শহর হতে পারে আদর্শ। তাই ‘স্ট্রাকচারাল ভিশন আমস্টারডাম-২০৪০’ প্রকল্পকে যদি হার্ডওয়্যার বলা হয়, ‘আমস্টারডাম স্মার্ট শহর প্রকল্প’কে বলতে হবে সফটওয়্যার।
এই পরিকল্পনা মূলত আমস্টারডাম সিটি কাউন্সিলের। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে প্রায় ১০০ স্থানীয় মিউনিসিপ্যালিটিস, বাণিজ্যিক, আবাসিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শুধু আমস্টারডাম নয়, এরা একই সঙ্গে ৭৫টি শহরকে স্মার্ট শহর হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে।
‘সিটি-জেন’ নামের একটি পাইলট প্রকল্প চালু করা হয়েছে, যেটার মাধ্যমে একই অঞ্চলের বাসিন্দারা নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী সবুজ জ্বালানি একে অন্যের সঙ্গে শেয়ার করতে পারেন।
২০১৬ সালে আমস্টারডামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়, যেটার নাম ‘আইবেকন অ্যান্ড আইওটি (Internet of things) লিভিং ল্যাব’। এর মাধ্যমে শহরে প্রায় দেড় মাইল পায়ে চলার পথ একটি নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হয় যাতে পথচারী সহজে গন্তব্য খুঁজে পায়। ‘স্মার্ট সিটিজেন’ প্রকল্পের আওতায় শহরের নাগরিকরা সাশ্রয়ী দামের কিছু সেন্সরের মাধ্যমে আশপাশের পরিবেশ দূষণ এবং শব্দের মাত্রা সংগ্রহ করে শহরে ওপেন ডাটা প্রোগ্রামের সঙ্গে শেয়ার করতে পারে। তাতে মানুষ পরিবেশ সম্পর্কে আরও সচেতন হচ্ছে। গাড়ি কিংবা গণপরিবহনের বদলে চলাচলের জন্য সাইকেল ব্যবহারের প্রতি হয়ে উঠছে আগ্রহী।
স্মার্ট শহর পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এর সঙ্গে স্মার্ট নাগরিকদের সম্পৃক্ত করা। তারাই মূলত সৃষ্টিশীল এই মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে।

আবুল হোসেন আসাদ


কিছুটা দূর থেকে তাকাতেই চোখ ধাঁধিয়ে যায় পদ্মফুলাকৃতির শুভ্র-সফেদ স্থাপত্যের সৌন্দর্যে। এ যেন মার্বেল, ইট, বালু, পাথর আর সিমেন্টের সমন্বয়ে পৃথিবীর বুকে পদ্মফুলের এক অপার্থিব সুন্দরের সূচনা। হঠাৎ মনে হতে পারে এটি বুঝি সিডনির অপেরা হাউজ। কিন্তু পরক্ষণেই সবুজ প্রান্তরে চোখ পড়লে ভুল ভেঙে যায়, সঙ্গে ভরে যায় নয়নও। সবুজ প্রান্তরের মাঝখানে পদ্মফুলের বিশাল বিশাল সাদা রঙের পাপড়িগুলোর অপরূপ শোভা নিমিষেই সৌন্দর্য পিপাসুর মনে জ্বালা ধরিয়ে দেয়। এই পদ্মফুল-সদৃশ স্থাপত্যটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আধ্যাত্মিক ও আত্মিক এক সম্পর্কের কথা; জড়িয়ে আছে এক ধর্ম-বিশ্বাসের কথা। সেটি হলো বাহাই ধর্ম-বিশ্বাস। পদ্মফুল স্থাপত্যটি মূলত একটি মন্দির বা টেম্পল, যা বাহাই সম্প্রদায়ের উপাসনালয়। বাহাই সম্প্রদায়ের লোকেরা এই মন্দির নির্মাণ করেছে। ফারিবোর্জ সাহাবা এই টেম্পলের প্রধান স্থপতি। ২৪ ডিসেম্বর ১৯৮৬ সাল, এই স্থাপত্যটি টেম্পল হিসেবে উপাসনার জন্য খুলে দেয়া হয়। পদ্মফুল-সদৃশ দেখতে বলে স্থাপত্যশিল্পটির নাম হয়েছে পদ্ম মন্দির বা লোটাস টেম্পল।
বাহাই বিশ্বাস হচ্ছে এক ঈশ্বরবাদী বিশ্বাস। বর্তমানকালের ইরান অর্থাৎ তৎকালীন পারস্য দেশে ঊনবিংশ শতাব্দীতে এই ধর্মের উৎপত্তি ঘটে। বাহাউল্লাহ (নভেম্বর ১২, ১৮১৭ মে ২৯, ১৮৯২) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ধর্ম-বিশ্বাসই হলো বাহাই বিশ্বাস বা বাহাই ধর্ম। বাহাই ধর্ম পৃথিবীর একটি নবীনতম ধর্ম। যে ধর্ম সব ধর্মের মানুষকে স্বাগত জানায়। সব ধর্মের মানুষ একযোগে এখানে ধর্মচর্চা করতে পারে কেবল ধ্যানের মাধ্যমে। বাহাই ধর্ম-বিশ্বাসকে এক অর্থে বলা চলে আধ্যাত্মিকতার আন্দোলন বা ধ্যানের একটি ভিন্নমাত্রা। ঐক্যবদ্ধতা সম্পর্কেও বাহাই ধর্মে আলোচনা করা হয়।
পদ্মফুল বা লোটাস নকশার মাধ্যমে বাহাই ধর্মের সরলতা তুলে ধরার জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল এই টেম্পল। কিন্তু নকশাটি এখন তার নিজস্ব স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যেই বেশি দ্যুতি ছড়াচ্ছে। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুভূতি প্রতিফলিত করার জন্য ভারতীয় স্থাপত্যশৈলীর দিক খেয়াল রেখেই পদ্মফুল নকশার প্রণয়ন করা হয়েছিল। কারণ টেম্পল দেখতে আসার সময় ভারতীয়রা যাতে তাদের সুপরিচিত ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িত বিষয়ের মিল খুঁজে পায় এবং একই সঙ্গে লোটাস টেম্পলের শৈলী, প্রতীক চিত্র ও দৃশ্যায়ন যাতে বাহাই ধর্ম-বিশ্বাস সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণা দেয়। পদ্মফুল ভারতীয়দের কাছে খুবই সুপরিচিত ও পবিত্র একটি ফুল। পঙ্কজ নামে পদ্মফুল নানা ভারতীয় ভাষায় রয়েছে, যা পঙ্কিল জল বা পা’কে জন্মে কিন্তু নিষ্কলুষিত ও বিশুদ্ধ থাকে। ব্রহ্মা বা ঈশ্বরের আসনস্থান হচ্ছে পদ্মফুল যেটি রয়েছে পুরাণে এবং গৌতম বুদ্ধের জীবনীতেও ব্যাপকভাবে রয়েছে এই পদ্মফুল। এ ছাড়াও পদ্মফুলের মোটিফে রয়েছে পার্সি স্থাপত্যশিল্পের বৈশিষ্ট্য।

ইরানে বাহাউল্লাহর জন্ম হলেও তার সমাধি রয়েছে ইসরায়েলে। বাহাই ধর্মের অনুসারীরা রয়েছে সারা পৃথিবীজুড়ে প্রায় ৬০ লাখ। লোটাস টেম্পল দেখতে প্রতি বছর প্রায় ৪০ হাজার লোক এখানে আসে। এটি ভারতের রাজধানী নতুন দিল্লির নেহরু প্যালেসের পাশঘেঁষা বিস্তৃত জায়গার সবুজ গাছপালার মাঝে অবস্থিত। দূর থেকে দেখলেও লোটাস টেম্পলকে এক কাব্যিক স্থাপত্যশিল্পই মনে হয়। পদ্মফুলের মোট ২৭টি পাপড়ি রয়েছে পরিকাঠামোতে। নয়টি করে পদ্ম-পাপড়ি মোট তিনটি স্তরে সাজানো। বাইরের পাপড়িগুলোর ফাঁক গলে আকাশের দিক সূর্যের আলো টেম্পলের মাঝে ঢোকে এবং এই আলো মৃদুভাবে ছড়িয়ে পড়ে টেম্পলজুড়ে। নয়টি পুকুর লোটাস টেম্পলকে বুকে আগলে রেখেছে পানির ওপর। যাতে মনে হয় সত্যিকারের একটি পদ্মফুল বিরাজ ইট-পাথরের পাষাণ প্রাচীর উপেক্ষা করে। পাপড়ির বাইরের অংশ মার্বেল দ্বারা আবৃত। গ্রিসের পেন্টেলি পর্বত থেকে এই মার্বেলগুলো আনা হয়েছিল।
টেম্পলের ভেতরের সুবিশাল জায়গাটিকে নির্মাণকালীন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা করা আর্থিকভাবে সম্ভবপর না হওয়ায় তখন প্রাকৃতিকভাবে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা এখনো অটুট। দিনের বেলায় সূর্যের আলো পদ্ম পাপড়ির ফাঁক গলে মৃদুভাবে টেম্পলের ভেতরে প্রবেশ করে, মেঘাচ্ছন্ন দিন বা সূর্যের আলো না থাকলেও যাতে টেম্পলের ভেতরে মৃদু আলো থাকে তার বিকল্প ব্যবস্থাও রয়েছে। গোলাকার টেম্পলটির ভেতরে সুবিশাল ফাঁকা জায়গায় বেঞ্চি পাতা রয়েছে। বেঞ্চিগুলোর সামনের দিক অর্থাৎ পশ্চিম দিকে রয়েছে একটি স্টেজ। স্টেজে ভাষণ দেয়ার জন্য রয়েছে একটি ডায়াস। বেঞ্চগুলো পাতা হয়েছে কায়মনে বসে ধ্যান করার জন্য। টেম্পলে ঢোকার সময় গাইড বলে দেয়, যার যার স্রষ্টার কাছে কায়মনে প্রার্থনা করার জন্য এবং চুপচাপ কিছুক্ষণ ধ্যান করার জন্য। প্রায় এক হাজার তিনশ লোক একসঙ্গে টেম্পলের ভেতরে প্রার্থনা করতে পারে। লোটাস টেম্পলের ভেতরে চিৎকার করলে বা জোরে কথা বললে পাপড়িসদৃশ দেয়ালে কথাগুলো প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। জুতা খুলতে হয় টেম্পলে প্রবেশের আগেই। অবশ্য সেজন্য টেম্পলের পক্ষ থেকেই জুতা রাখার জন্য ব্যাগও দেয়া হয়। বাহাই ধর্ম-বিশ্বাস সম্পর্কে এবং টেম্পলে প্রবেশের যাবতীয় নিয়ম-কানুন গাইডরা আগেভাগেই কয়েকটি ভাষায় জানিয়ে দেয়। লোটাস টেম্পলে প্রবেশের জন্য কোনো টিকিট লাগে না বা টাকা-পয়সার বিষয় জড়িত নেই। সবচেয়ে বড় কথা হলো, টেম্পল-প্রাঙ্গণটি পরিচ্ছন্ন, নির্মল ও সবুজে সবুজে আচ্ছাদিত। অপূর্ব এই স্থাপত্যটিকে বাইরে থেকে কৃত্রিম উজ্জ্বল আলোকছটায় উদ্ভাসিত করা হয় রাতের বেলায়। পাপড়ির বাইরের প্রান্তগুলোয় তখন উজ্জ্বল আলোর বর্ণালিতে অসাধারণ এক রূপের সৃষ্টি হয় নিকষ গাঢ় অন্ধকারের মাঝে।

লেখক : সাইক্লিস্ট ও বিশ্ব-অভিযাত্রী

কারিকা ডেক্স


ইট
১ নম্বর ইট পরিবহন খরচ বাদে হাজার-প্রতি ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ২ নম্বর ইটের দাম হাজার-প্রতি ৮-৯ হাজার টাকা। মেট্রোসেম অটো ব্রিকস পরিবহন খরচ বাদে গ্রেড-১ সলিড ১১ হাজার টাকা ও গ্রেড-২ সলিড ৯,৫০০ টাকা এবং পিকেট ১০ হাজার টাকা, থ্রি হোল ১২ হাজার টাকা এবং টেন হোল ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বালি
রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে পরিবহন খরচসহ প্রতি ট্রাক (৫ টনি) সিলেট বালি বিক্রি হচ্ছে ১২,৩৫০ টাকা এবং আস্তর বালি বিক্রি হচ্ছে ৩,২০০ টাকায়।

সিমেন্ট
শাহ সিমেন্ট স্পেশাল ব্যাগ-প্রতি ৪৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। শাহ পপুলারের ব্যাগ-প্রতি দাম ৪৪০ টাকা। হোলসিম নরমাল ব্যাগ-প্রতি ৪৭০ থেকে ৪৮০ টাকা ও হোলসিম ওপিসির দাম ৫৩০ থেকে ৫৫০ টাকা। স্ক্যান ব্যাগ-প্রতি ৪১০ টাকা ও ডায়মন্ড ব্যাগ-প্রতি বিক্রি হচ্ছে ৪১০ থেকে ৪২৫ টাকা। সুপারক্রিট সিমেন্ট প্রতি বস্তা বিক্রি হচ্ছে ৩৯০ টাকা। ব্যাগ-প্রতি সেভেন রিং স্পেশাল ৪০০ টাকা, সেভেন রিং নরমাল ৩৮০ টাকা এবং সেভেন রিং গোল্ড ৪৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

রড
পরিবহন খরচ ছাড়া কেএসআরএমের প্রতি টন বিক্রি হচ্ছে ৬৬ হাজার টাকা। টন-প্রতি বিএসআরএম ৬৬ হাজার, জিপিএইচ ৬৪ হাজার এবং রহিম স্টিল ৬৬ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

মার্বেল ও গ্রানাইট
বিভিন্ন দেশ থেকে এগুলো আমদানি করা হয়। যেমন ইন্ডিয়া, নরওয়ে, ইতালি, টার্কিসহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ। মেঝে এবং দেয়াল সবখানে মার্বেল ও টাইলস ব্যবহার করা হয়। রান্নাঘরে চুলার নিচের যে স্পেস, আমাদের দেশে সেখানেই মার্বেলের ব্যবহার হয় বেশি। ইতালির মার্বেলকে বিভিন্ন আকৃতি দেয়া যায়। অন্যান্য ব্র্যান্ডের তুলনায় ইতালি এবং নরওয়ের মার্বেলের দাম একটু বেশি।
মার্বেল : ইন্ডিয়ান মার্বেল প্রতি বর্গফুটের দাম ১৫০ থেকে ৮৫০ টাকা। ইতালিয়ান ব্র্যান্ডের মার্বেলের প্রতি বর্গফুটের দাম ৫০০ থেকে ১,২৫০ টাকা। ইতালিয়ান ব্র্যান্ডের মধ্যে অরোরা, বায়ালজ গ্রিন, রোজালিয়া লাইট, মাসাকারার, সিলভার নোভা ইত্যাদি বেশ জনপ্রিয়। নরওয়ের মার্বেলের প্রতি বর্গফুটের দাম ৫৫০ থেকে ১,৩৫০ টাকা।
গ্রানাইট : ইন্ডিয়ান নরমাল গ্রানাইটের প্রতি বর্গফুটের দাম ৬০০ থেকে ৭৫০ টাকা, হেভি গ্রানাইট ১,০৫০ থেকে ১,৩৫০ টাকা। ইন্ডিয়ান গ্রানাইটের মধ্যে সিলভার পার্ল, সার্ফ হোয়াই, জাফরানা, মার্সেল এস, কারারা সিলেট ইত্যাদি বেশ পরিচিত।
ইতালিয়ান ব্র্যান্ডের মধ্যে রয়েছে ব্ল্যাক পার্ল, ইমারেল পার্ল, ব্লু পার্ল ইত্যাদি। এর প্রতি বর্গফুটের দাম পড়বে ৯৫০ থেকে ১,২৫০ টাকা। চায়না গ্রানাইট প্রতি বর্গফুটের দাম ৯০০ থেকে ১,০৫০ টাকা। নরওয়ে গ্রানাইট প্রতি বর্গফুটের দাম ৯০০ থেকে ১,৭৫০ টাকা।

টাইলস অ্যাডহেসিভ
খাদিম’স হাই বন্ড ২৫ কেজির দাম ৬৮৫ টাকা, টাইল ম্যাট ২৫ কেজি ৫১০ টাকা, টাইল মাস্টার ২৫ কেজি ৩৩৫ টাকা। খাদিম’স মারবেল গ্লু সাদা ২০ কেজি ৮৯০ টাকা ও ধূসর ২০ কেজি ৭৬৫ টাকা। খাদিম’স সিমেন্ট প্ল্যাস্টার ৫০ কেজি ৭০০ টাকা। খাদিম’স ফায়ার ফেড মর্টার ৫০ কেজি ১,৭০০ টাকা এবং টাইলস পয়েন্টিং (ওয়াটার প্রুফ) ১ কেজি ১২০ টাকা।

রঙ
বার্জারের ১৮.২ লিটারের বালতি-ভর্তি প্লাস্টিক ইমালশন বিক্রি হচ্ছে ৫,২০০ থেকে ৫,৫০০ টাকা। অ্যানামেল পেইন্ট প্রতি গ্যালন বিক্রি হচ্ছে ৯৬০ টাকা। এশিয়ান পেইন্টের ইন্টেরিয়র ওয়াল ফিনিশিংয়ের মধ্যে রয়েল গ্লিডার গোল্ড শেড ৪ লিটারের দাম ৫,৬০০ টাকা এবং ১ লিটারের দাম ১,৪৫০ টাকা। এক্সটেরিয়র ওয়াল ফিনিশিংয়ের মধ্যে অ্যাপেক্স আলটিমা ওয়েদার প্রুফ এমালশনের ১৮ লিটার ৮,২৮৫ টাকা, ৪ লিটার ১,৭৪০ টাকা এবং ১ লিটার বিক্রি হচ্ছে ৪৮০ টাকায়।
এশিয়ান এনামেল পেইন্টের মধ্যে অ্যাপকোলিট প্রিমিয়াম গ্লসের ১৮ লিটার ৬,০৭৫ টাকা, ৪ লিটার ১,২৫৫ টাকা এবং ১ লিটার বিক্রি হচ্ছে ৩৩৫ টাকায়।

আবিদুল ইসলাম চৌধুরী


সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিবেশ সচেতনতার বিষয়টি বেশ হইচই ফেলে দিয়েছে। দিন দিন মানুষ সচেতন হচ্ছেন। মানুষের চাল-চলন ও জীবনধারা কীভাবে পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলছে, সে ব্যাপারেও তাদের ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পরিবেশ রক্ষার বা সবুজায়নের এই প্রবণতা ফুটে উঠতে দেখা যায় তাদের ঘর-বাড়ি নির্মাণ-কৌশল ও তার ডিজাইনে। আর এই নির্মাণ-কৌশল ও ডিজাইনে রয়েছে নানা প্রকারভেদ, যেটা নির্ভর করে নির্মাণ-উপকরণ ও অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জার কুশলতার ওপর।

পরিবেশবান্ধব নির্মাণ-সামগ্রী
পরিবেশবান্ধব বাড়ির নকশা বা নির্মাণ করবেন? তাহলে শুরুটা হতে হবে সেই অনুযায়ী নির্মাণ-সামগ্রী ব্যবহারের মধ্য দিয়ে। আর তাই বাণিজ্যিক বা আবাসিক ভবন উভয় ক্ষেত্রে টেকসই নির্মাণ-সামগ্রীর জনপ্রিয়তা বেড়েই চলেছে।

দেয়ালনির্ভর বাড়ি
যেকোনো বাড়ির কাঠামোতে যেকোনো আবহাওয়ায় একটি স্থিতিশীল দেয়ালের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। যখন আপনি পরিবেশবান্ধব বাড়ি নির্মাণ করতে চাইবেন তখন দেয়ালগুলোও সেভাবে নির্মাণ করতে হবে। আর সেটা এমনভাবে হতে হবে যেন সময়ের সঙ্গে যায় এবং দীর্ঘদিন আপনাকে সুরক্ষা দিতে পারে। একটি পরিবেশবান্ধব বাড়ির দেয়াল থেকে বহুমুখী সুবিধা পাওয়া যায়। এজন্য দেয়াল নির্মাণ-সামগ্রী বাছাই করার কাজটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশবান্ধব দেয়াল শুধু বাড়ির কাঠামোই দাঁড় করায় না, এটা বাইরের পরিবেশ থেকে অভ্যন্তরীণ সুরক্ষার ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী সমাধানও বটে।

কৌব (চাঙ্গের ঘর)
টিকে থাকার নিজস্ব ব্যবস্থাপনার কারণে চাঙ্গের তৈরি ঘরগুলো আকারে ছোট হয়। মূলত এই চাঙ্গ জিনিসটি হলো মাটি, বালু আর খড়ের এক বিশেষ মিশ্রণ, যা প্রতিটি আলগা উপকরণগুলোকে জমাটবদ্ধ করে টেকসই কাঠামো প্রদান করে। হয়তো ভাবছেন এই মিশ্রণটি ভেঙে পড়বে যেকোনো সময়! জেনে রাখুন, চাঙ্গের মিশ্রণটির স্থায়িত্ব ৫০০ বছরের বেশি। কারণ হলো এর নান্দনিক কাঠামোর ছাদ ও মেঝে। অত্যন্ত সুনিপুণ কৌশলে বাঁশ-কাঠের ত্রিভুজাকৃতির কাঠামোতে খড়ের আস্তরণ দ্বারা তৈরি হয় এর ছাদ। ঘরের মেঝেতে ব্যবহৃত পাথুরে উঁচু আস্তরণের কারণে বাড়তি আর্দ্রতা তৈরি হয় না। ফলে দেয়াল থাকে অক্ষুণœ। তাছাড়া এই পরিবেশবান্ধব ঘর যেমন হয় অদাহ্য, তেমনি পোকামাকড়মুক্ত।

স্ট্র বেল
এটা এমন এক ধরনের ঘর, যার দেয়াল মূলত খড়ের গাদা দিয়ে তৈরি। তবে এটার ভিত্তি কৌব মডেলে তৈরি ঘরগুলোর মতো। ফলে এই ঘরগুলোতেও আর্দ্রতা হয় কম। পাথুরের ভিত্তির ওপর গড়ে ওঠা এই মডেলের ঘরগুলো প্রধানত দুটি কৌশলে তৈরি করা হয়। প্রথমটা হলো লোড বেয়ারিং টেকনিক। এক্ষেত্রে খড়ের গাদাগুলোকে বক্স আকৃতির খ- খ- বুনটে তৈরি করা হয়। বুনটগুলো হয় খুবই ভারী এবং শক্ত, যা মজবুত দেয়াল হিসেবে কাজ করে। সবশেষে দেয়ালের ওপর আস্তরণ দেয়া হয়। অপরটি হলো নন-লোড বেয়ারিং টেকনিক। মূলত কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরি ফ্রেমে মাঝখানটাতে খড়ের গাদাগুলো ঠেসে বসিয়ে দিয়ে তৈরি করা হয় এর দেয়ালগুলো। তাই ঘরের লোড খড়ের গাদার ওপরে থাকে না। শুধু দেয়াল হিসেবেই কাজ করে এই স্ট্র বেল। প্রকৃতপক্ষে টেকনিক্যাল কারণে নয়, বরং পরিবশেবান্ধব হওয়াতে এই স্ট্র বেল মডেলের ঘর জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

ভূ-গর্ভস্থ বাড়ি
অন্য বাড়িগুলোর চেয়ে বেশি পরিবেশবান্ধব হলো ভূ-গর্ভস্থ বাড়ির ডিজাইন। এই ডিজাইনে একমাত্র দরজা আর কিছু জানালা ছাড়া বাকি কাঠামো থাকে মাটির নিচে। প্রাকৃতিক ঝড়ঝাপটার কারণে বেশির ভাগ ভূ-গর্ভস্থ বাড়িগুলো হয় কংক্রিটের তৈরি। সাধারণত তিন ধরনের হয় ভূ-গর্ভস্থ বাড়ির কাঠামো। প্রথমত, সবচেয়ে বেশি যে নির্মাণশৈলী চোখে পড়ে, তা হলো পাহাড় আবৃত বাড়ি। এ ধরনের বাড়িগুলো হয় পাহাড়ের ঢিবির ভেতর বা ঢালুতে। দরজা-জানালাগুলো বাইরের দিকে রেখে বাকি ঘরটা পাহাড়ের ভেতর গড়ে তোলা হয়। দ্বিতীয়ত, যে নির্মাণশৈলীটি আছে, সেটা হলো কৃত্রিমভাবে নির্মিত পাহাড়ে ঘর বানানো। মাটির ঢিবিতে বা কৃত্রিম ঢালু তৈরি করে তার অভ্যন্তরে তৈরি হয় ঘরগুলো। সম্পূর্ণ ভূমির ওপর নির্মিত হওয়ায় কিছু জায়গায় আবার আলগা মাটির স্তর বসানো হয়। সর্বশেষ শৈলীটিই হলো সত্যিকারের ভূ-গর্ভস্থ বাড়ি। কারণ মাটি খুঁড়ে গর্ত করে পুরো বাড়িটি তৈরি হয় ভূমির নিচে। অবশ্য ছাদ নির্মাণ করা হয় ভূ-পৃষ্ঠের সামান্য ওপরে, যাতে আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে।

পরিবেশবান্ধব ছাদ নির্মাণ
পরিবেশবান্ধব বাড়ি নির্মাণের জন্য পরিবেশবান্ধব দেয়াল তৈরি করেছেন ভালো কথা। তবে ছাদটাও কেন নয়? বরং নানাবিধ ব্যবহার-উপযোগী ছাদ তৈরির মাধ্যমে আপনার বাড়ি হয়ে উঠবে অধিকতর পরিবেশবান্ধব।

ভূমি-আচ্ছাদিত ছাদ
পরিবেশবান্ধব বাড়ির জন্য ছাদে সবুজায়ন করাটা সর্বাগ্রে সবার মনে আসে। অনেকেই ছাদে বাগান করে থাকেন। তবে এক্ষেত্রে প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা ও কৌশল। যার অভাবে হয়তো বিফল হতে পারে পরিবেশবান্ধব করার প্রচেষ্টা। তাই ছাদ সবুজায়নের জন্য যে কয়েকটি উপায় নির্মাণ-প্রকৌশলীরা বাতলে দেন, তার মধ্যে সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন হলো ভূমি-আচ্ছাদিত ছাদ। বাড়ি নির্মাণের সময় ছাদের কংক্রিট স্তর থেকে ওপরের অংশে মাটির লেয়ার বসানোর স্থায়ী ট্রের কাঠামো তৈরি করা হয়। বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য থাকে কৃত্রিম পরিখা। যেটা পানি নিষ্কাশনের ক্ষেত্রেও কাজে লাগানো যায়। পুরো অবকাঠামোটা সম্পূর্ণ হয়ে গেলে মনে হবে ছাদের ওপর একটি সবুজ মাঠ।

সৌর ছাদ
অনেকেই হয়তো ভাবছেন এটা সিলিকনের প্যানেলগুলোর মতো। প্রকৃতপক্ষে এটা হলো সোলার সিঙ্গলস। যেটা একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে, আবার টাইলসের কাজও করবে। সিআইজিএস প্রযুক্তিতে বসানো এই সোলার সিঙ্গলসগুলোতে বাড়তি কোনো কপার বা অ্যালুমিনিয়াম ফ্রেম ব্যবহার করতে হয় না। ফলে টাইলসগুলো দেখলে বোঝাই যায় না যে এগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজ করে।

পরিবেশবান্ধব ইন্টেরিয়র ডিজাইন
এক্ষেত্রে প্রথমেই বলতে হয় মেঝের কথা। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব ও আরামদায়ক মেঝের ক্ষেত্রে তিন ধরনের উপকরণ দিয়ে মেঝে তৈরি করতে পারবেন। প্রথমটা হতে পারে বাঁশের তৈরি। বাজেট আর নান্দনিকতার জন্য গাছের চেয়ে বাঁশের তৈরি মেঝে এখন জনপ্রিয়। বাঁশের কাঁচামালকে প্রক্রিয়াজাত করে অনেকটা প্লাইউডের আকৃতি তৈরি করা হয়। সুদৃশ্য রঙ এবং বাহারি ডিজাইনের বাঁশের তৈরি মেঝে এখন ইন্টেরিয়র ডিজাইনের অন্যতম উপকরণ।
রান্নাঘর ও ডাইনিংয়ের জন্য সবচেয়ে উপযোগী হলো কর্কের তৈরি মেঝে। তুতগাছের বাকল হলো এর মূল উপকরণ। এটা টেকসই এবং পরিবর্তনযোগ্য। তুলনামূলক নমনীয় এবং পছন্দ অনুযায়ী ডিজাইনে তৈরি কর্কের মেঝে অত্যন্ত পরিবেশবান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত।
এরপর আসে কার্পেট ব্যবহারের বিষয়। পবিবেশবান্ধব ইন্টেরিয়র ডিজাইনে প্রাকৃতিক আঁশ থেকে তৈরি কার্পেট সবার আগে প্রাধান্য পায়। সেক্ষেত্রে প্রধান উপকরণ হলো পাট এবং পশম। পশমকে বিশেষভাবে বুননের মাধ্যমে তৈরি কার্পেট বেশ আরামদায়ক। মেঝেতে পানি ছড়ানো রোধ করতে এটা অনন্য। তাছাড়া সিসল গাছ ও সামুদ্রিক ঘাস থেকে প্রাপ্ত ফাইবার কার্পেট খুবই মনোরম ও টেকসই।
পরিবেশবান্ধব ইন্টেরিয়র ডিজাইন পূর্ণতা পায় বাড়ির ভেতরকার দেয়াল সাজানোর ওপর। দেয়ালের ভেতরকার অংশে গাছের টব রাখাটাকে সবুজবান্ধব সৌখিনতা বলতে পারেন। বিভিন্ন আকৃতির খোপ তৈরি করে গাছের টবগুলো রাখা যায়। ফলে ঘরে যেমন বিশুদ্ধ বায়ুর অভাব হয় না, তেমনি স্থান সংকুলানও হয়।
দেয়ালের রঙ ইন্টেরিয়র ডিজাইনে সবচেয়ে মৌলিক উপকরণ। আর পরিবেশবান্ধব ঘরে দেয়ালের রঙটাও হওয়া চাই ভোলাটাইল অর্গানিক কম্পাউন্ড (ভিওসি) মুক্ত। প্রচলিত রঙগুলো দেয়ালে লাগানোর পর ভিওসিযুক্ত বিষাক্ত কেমিক্যাল ছড়াতে থাকে। তাই পরিবেশবান্ধব বাড়ির ইন্টেরিয়র সাজাতে ‘ইকো-ফ্রেন্ডলি পেইন্টস’ ব্যবহারের বিকল্প নেই।

পরিবেশবান্ধব উপযোগ
শুধু পরিবেশবান্ধব বাড়ি সাজালেই হবে না, বাড়িতে ব্যবহার-উপযোগী মৌলিক উপকরণগুলোও যেন হয় পরিবেশবান্ধব সেদিকে নজর রাখা চাই।

তাপ নিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থা
বাড়িতে দু’ভাবে পবিবেশবান্ধব তাপ নিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থা রাখা যায়। প্রথমত, কম্পিউটার-নিয়ন্ত্রিত থার্মোস্ট্যাটের মাধ্যমে। এটি দিনের তাপ ও আলোর ওপর নির্ভর করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাপ সংরক্ষণ করে। ঘরের ভেতর প্রয়োজন অনুসারে এটা তাপ নিয়ন্ত্রণ করে ঘরকে ঠা-া ও গরম রাখে। দ্বিতীয়ত, জিওথার্মাল অ্যানার্জি সিস্টেমস। এর মাধ্যমে ঘরের মেঝেগুলোর নিচে একটা ফাঁপা অংশ তৈরি করা হয়। জেনারেটরের মাধ্যমে সে অংশে পানি সংরক্ষণ করে তাতে তাপ প্রয়োগ করে ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহার
ছাদে বাগানের জন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের যে ব্যবস্থা আছে, সেটাকে মূল পানির উৎস থেকে আলাদাভাবে সংরক্ষণ করা যায়। সাধারণ ধোয়ামোছার পানিকে প্রাকৃতিকভাবে রি-ট্রিটমেন্ট করে পুনরায় সেই কাজে ব্যবহার-উপযোগী করা যায়। এসব কাজের মূল শক্তির জোগান আসে বিদ্যুৎ থেকে। তাই ছাদে সোলার প্যানেল থেকে প্রাপ্ত বিদ্যুৎকে যথাযথ ব্যবহার করার ব্যবস্থা রাখা জরুরি। এক্ষেত্রে ঘরে স্বল্প ওয়াটের বাল্ব (সিএফএল) ব্যবহার করে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা সম্ভব।
পরিবেশ বাঁচলে মানুষ বাঁচবে। তাই মানুষ পরিবেশবান্ধব নির্মাণে দিন দিন মনোযোগ দিচ্ছে। ফলে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন আসছে পরিবেশবান্ধব বাড়ির ডিজাইনে। সবচেয়ে কম কার্বন নিঃসরণ করে এমন ডিজাইন তৈরির জন্য নির্মাণ-প্রকৌশলীরাও সচেষ্ট, যাতে কম খরচে পরিবেশবান্ধব একটি বাড়ি হতে পারে সবার জন্য।

আবুল হোসেন আসাদ: বিশ্ব-অভিযাত্রী ও সাইক্লিস্ট


নান্দনিক স্থাপত্যটির সবকিছুই লাল। এ যেন লাল রঙ-রাজ্যের এক নান্দনিক কিল্লা। নাম তার লালকিল্লা। অনুপম নির্মাণশৈলী, অলংকরণ ও শিল্পসত্তার অপূর্ব এক উৎকর্ষের প্রতীক এই লালকিল্লা। পারসিক এবং ভারতীয় স্থাপত্যরীতিতে তৈরি এই কিল্লা মুঘলদের অনবদ্য কীর্তি। লাল বেলেপাথর দিয়ে এই কিল্লা তৈরি হয়েছে বলে এর নাম হয়েছে লালকিল্লা।
কী বিশাল এই কিল্লা। আর ব্যাপক জায়গাজুড়ে এর বিস্তৃতি। কী উঁচু আর সুপ্রশস্ত এই লাল রঙের কিল্লাটি দেখামাত্রই মন ভরে যায়।
যমুনার পাড়ে গড়ে ওঠা কিল্লাটি তিনশ’ বছরেরও আগে হলেও অতীতের ইতিহাস হয়ে আজও লাল রঙে ছড়িয়ে দিচ্ছে আপন মহিমা। যমুনা সরে গেছে আজ দূরে। নেই আর কিল্লার সেই সময়ের রাজকীয় জৌলুস। মুঘল সামাজ্যের গৌরবগাথা নেই সত্য, তবুও সময়ের সাক্ষী হয়ে লালকিল্লার লাল পাথরের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে অতীত ইতিহাস। সেই ইতিহাসের পাতা ধরে জানা যায়, এই লালকিল্লার নির্মাণকাজ শুরু হয় সম্রাট শাহজাহানের আমলে, ১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে। শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষার সব ব্যবস্থাই পাকাপাকি ছিল তখন কিল্লাটিতে। নিরাপত্তার ছিল না কোনো ত্রুটি। কিল্লার বাইরের প্রাচীর নির্মিত হয়েছিল পাষাণের মতো প্রচন্ড কঠিন লাল পাথর দিয়ে। কিল্লার বাইরের দেয়াল পুরো মসৃণ আর খাড়া। শত্রুবাহিনী যাতে কিল্লা দখল করতে না পারে কিংবা কিল্লার কাছে ঘেঁষতে না পারে সেজন্য কিল্লার বাইরের প্রাচীর-দেয়ালের চারদিকে গভীর ও প্রশস্ত পরিখা খনন করা হয়েছিল। যমুনা নদীর পানিতে সে পরিখা পরিপূর্ণ থাকত সবসময়। আর পরিখার পানির ওপর দিয়ে ইট-পাথরের তৈরি সেতু পার হয়ে মিলত কিল্লায় প্রবেশের প্রধান ফটক বা দরজা। দরজাসমেত পুরো গেটটির নির্মাণশৈলী এককথায় অসাধারণ। মূলত গেটটি একটি কমপ্লেক্সের মতো। নাম লাহোরি গেট।

লালকিল্লায় সেই সময় মুঘল সম্রাটরা সপরিবারে বসবাস করতেন। তাই কিল্লাটিকে আশীর্বাদধন্য বা ‘কিল্লা-ই-মুবারক’ নামে অভিহিত করা হতো প্রথমদিকে। কিল্লাটির প্রতিরক্ষা জোরদারের জন্য ‘সালিমগড় কিল্লা’ নামে অন্য একটি কিল্লার সঙ্গে লালকিল্লার উত্তর-পূর্ব কোণের প্রাচীর যুক্ত ছিল। সালিমগড় কিল্লাটি নির্মাণ করেছিলেন ইসলাম শাহ সুরি, ১৫৪৬ সালে। সম্রাট শাহজাহানের নতুন রাজধানী ছিল শাহজাহানাবাদ। যেটি ছিল দিল্লির সপ্তম নগরী। আর সেটিরই রাজপ্রাসাদ ছিল এই লালকিল্লা। কিল্লাটি ছিল মুঘল সা্ম্রাজ্যের রাজধানী। পরে সম্রাট শাহজাহান এই রাজধানী সরিয়ে নেন আগ্রা শহরে। দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ্ জাফর ছিলেন শেষ মুঘল সম্রাট। ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত তিনিও এই কিল্লাতেই বসবাস করেছেন। সিপাহী বিপ্লবের ব্যর্থতার পর দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ্ জাফর ১৭ সেপ্টেম্বর ১৮৫৭ সালে লালকিল্লা ত্যাগ করেন। পরে আবার লালকিল্লায় ফেরেন তিনি, তবে ব্রিটিশ বন্দি হিসেবে। ততদিনে গঙ্গা-যমুনায় অনেক পানি গড়িয়েছে। ইংরেজরা ২৭ জানুয়ারি ১৮৫৮ সালে বাহাদুর শাহ্ জাফরের বিচার করে এই লালকিল্লাতেই এবং ওই বছরের ৭ অক্টোবর তাকে মিয়ানমারে (বার্মা) নির্বাসন দন্ড দেয় ব্রিটিশরা। তারপর থেকে ব্রিটিশরা লালকিল্লাকে ক্যান্টনমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে, ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত। ভারতের স্বাধীনতাকামী আজাদ হিন্দ ফৌজ ১৯৪৫ সালে পরাজয় বরণ করলে ব্রিটিশরা স্বাধীনতাকামী যুদ্ধবন্দিদের বিচার করে এই লালকিল্লাতে বসে। ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে এই কিল্লা জড়িয়ে আছে নিবিড়ভাবে। তাই প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী লালকিল্লায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। আর ইউনেস্কো এই কিল্লাটিকে বিশ্ব-ঐতিহ্যের স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ২০০৭ সালে। লালকিল্লার বেশিরভাগ জায়গা অর্থাৎ ৭৫ ভাগ স্থান ব্যবহার করছে এখন ভারতীয় সেনাবাহিনী আর বাকি ২৫ ভাগ জায়গা দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে।
লালকিল্লার মূল ফটক বা লাহোরি গেট পেরোলেই সামনে একটি ছোট্ট বাজার। বাজারটি একটি নান্দনিক কমপ্লেক্সের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তার দু’পাশের দেয়াল ঘিরে গড়ে উঠেছে। বাজারটিতে রয়েছে ছোট ছোট স্টলের সাজানো দোকান। এসব দোকানে শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন রাজ্যের পণ্য, শৌখিন হস্তশিল্প এবং স্যুভেনির। কিছুটা এগোলেই দেখা যায় নহবতখানা। যেটি এখন ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের জাদুঘর। এ জাদুঘরের গ্যালারিতে থরে থরে সাজানো রয়েছে পুরনো দিনের তরবারি, বর্ম ও তীর-ধনুক থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রামের নানা উপকরণ। জাদুঘর থেকে বের হলে চোখে পড়ে সবুজ একটি প্রাঙ্গণ। প্রাঙ্গণ পেরোলেই দেখা মেলে দিওয়ান-ই-আম ভবন। আমজনতা বা সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্রাট দেখা দিতেন এখানে বসেই। তিনি বসতেন ‘ঝরোখা’ নামের অলংকৃত উঁচু সিংহাসনে। সেটি এখন রয়েছে স্বচ্ছ কাচের ভেতরে সংরক্ষিত অবস্থায় এই দিওয়ান-ই-আম ভবনেই। দিওয়ান-ই-আমের নির্মাণশৈলী অপরূপ। এর তিন দিকেই খোলামেলা। দেখতে অনেকটা বৈঠকখানার মতো। দিওয়ান-ই-আমের খিলানগুলো নান্দনিক কারুকার্যময়। সারাটা ভবনজুড়েই রয়েছে তৎকালীন স্থাপত্যশৈলীর চমৎকারিত্ব ও পেশাদারিত্বের ছাপ। সামনের দিকে রয়েছে সবুজ খোলা প্রান্তর।
মমতাজ মহল এখন পরিবর্তিত হয়েছে লালকিল্লা প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরে। মমতাজ মহলের অবস্থান কিল্লার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে। পাথরে খোদাই করা আরবি লেখা, বিভিন্ন আরবি পান্ডুলিপি ও চিত্রকলা থেকে শুরু করে মুঘল সম্রাটদের আদেশনামা, সম্রাটদের ব্যবহার করা নানা জিনিসপত্র ও তরবারি রয়েছে জাদুঘরের গ্যালারিতে। শেষ মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ্ জাফরের পোশাক, চেয়ারসহ নানা উপকরণও বাদ যায়নি জাদুঘরটির সংগ্রহশালা থেকে।
রঙমহল নামটি শুনলেই বোঝা যায় তবলার তা ধিন ধিন সুরেলা আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে নূপুরের ধ্বনি, যা জড়িয়ে রয়েছে ভবনটির সঙ্গে। সে সময় বিনোদনের জন্য বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন হতো বৈঠকখানার মতো এই রঙমহলে। রঙমহল ভবনটির ঠিক সামনে রয়েছে একটি পুকুর। পুকুরটির মাঝে রয়েছে চমৎকার ফোয়ারা।
খাসমহল এর অবস্থান রঙমহলের পাশেই। আর খাসমহলের সঙ্গে রয়েছে দিওয়ান-ই-খাস। এই দিওয়ান-ই-খাস ভবনের স্তম্ভগুলো নির্মিত হয়েছে শ্বেত-পাথরে। সেই স্তম্ভগুলোতে রয়েছে বিচিত্র ও মনোমুগ্ধকর রঙ-বেরঙের চিত্রিত ফুলের নকশা খোদাই করে বসানো। পুরো ভবনটাই শ্বেত-পাথরের তৈরি এবং চারপাশ খোলা।
হাম্মামখানা বা গোসলখানা দিওয়ান-ই-খাসের সঙ্গে লাগোয়া। মতি মসজিদ রয়েছে হাম্মামখানার একটু দূরে, পশ্চিম প্রান্তে। লালকিল্লা নির্মাণের অনেক পর এই মতি মসজিদ নির্মিত হয়েছে। আর সম্পূর্ণ শ্বেত-পাথরে তৈরি ছোট্ট এই মসজিদটিতে রয়েছে তিনটি গম্বুজ। মসজিদটির নির্মাণকাল ১৬৫৯ সাল। ব্যক্তিগত মসজিদ হিসেবে সম্রাট শাহজাহানের ছেলে আওরঙ্গজেব এটি নির্মাণ করেন।
নান্দনিক স্থাপত্যের আরেকটি হলো নহর-ই-বেহেস্ত বা স্বর্গবাগানের জলের ধারা। হায়াত বক্স বাগ বা জীবন-প্রদায়ী উদ্যানও বেশ নজরকাড়া, যা লালকিল্লার ভেতরের সবুজের শোভাকে করেছে সুষমা্মন্ডিত। এছাড়াও লালকিল্লার প্রাঙ্গণে রয়েছে হিরামহল, জাফরমহল, আসাদ বুর্জ, শাহ বুর্জ মিনার, বিশাল জলাধার এবং তার মাঝে থাকা নানান নান্দনিক কক্ষ, যেগুলো লালকিল্লার ভেতরের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণে।

 

তানজিম হাসান
স্থপতি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর


রাজধানীর আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নতুন ভবনের দিকে তাকালেই যে কারোর দৃষ্টি আটকে যায়। শুধু নান্দনিকতা দিয়েই নয়, ভবনটি তার ভিন্ন বিশেষত্ব দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে হৃদয়ে ধারণ করেন এমন মানুষকে চোখের পলকেই কাছে টেনে নিয়ে যায়। ভবনটির এমন গুণের রসদদাতা এক স্থপতি-দম্পতি তানজিম হাসান ও নাহিদ ফারজানা। এই দম্পতি তাদের মেধার সর্বোচ্চ স্ফূরণ ঘটিয়ে তৈরি করেছেন এর নকশা। যে নকশার বাস্তবায়নে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রকাশ ঘটেছে এক অনন্য উচ্চতা নিয়ে। সম্প্রতি স্থপতি তানজিম হাসান এই মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন কারিকার সঙ্গে। কথোপকথনের চুম্বক অংশ তুলে ধরেছেন মো. জগলুল হায়দার

তরুণ এই স্থপতির মুক্তিযুদ্ধ দেখার সুযোগ না হলেও মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে রয়েছে গভীর গবেষণা। তারই আলোকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তিনি বলেন, সংগঠিত একটি সামরিক শক্তির সঙ্গে ছিল সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা। এটা শক্তিশালী ছিল। কারণ সামরিক বাহিনীর সদস্যরা যখন যুদ্ধ করে তখন সেটার প্রেক্ষাপট দাঁড়ায় এক রকম, আর যখন ডাক্তার, রিকশাচালক ও ছাত্ররা হাতে অস্ত্র ধরেছে সেটা কিন্তু কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। একটি জনগোষ্ঠীর ওপর এর প্রভাব খুব জটিল ও অস্বাভাবিকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। সাইক্লোন, বন্যা ও মহামারি ইত্যাদি যেমন সাধারণ জনগোষ্ঠীর জন্য জটিল ঘটনা, যুদ্ধও ঠিক তেমনটি। সব সময় একটা জনগোষ্ঠী যুদ্ধ দেখতে চায় না। তারা শান্তি চায়। তারপরও হঠাৎ হঠাৎ যুদ্ধ এসে যায়। নিঃসন্দেহে যেকোনো জনগোষ্ঠির জন্য যুদ্ধ একটি অভিশাপ। বাংলাদেশের মতো শান্তিপ্রিয় মানুষ যে এই অবস্থায় অবতীর্ণ হয়েছিল সেটাই একটা অদ্ভুত ব্যাপার। এই শান্তিপ্রিয় মানুষগুলোই অস্ত্র হাতে নিতে বাধ্য হয়েছে, তারা অশুভ শক্তি দ্বারা কী পরিমাণ নিষ্পেষিত হলে সেটা বুঝতে হবে। আমার জন্ম মুক্তিযুদ্ধের পরে হলেও পত্র-পত্রিকা ও মিডিয়ার বদৌলতে এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারি। আমরা ভৌগলিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যুদ্ধ করেছি এবং সেটা অর্জন করতে পেরেছি। কিন্তু সত্যিকার স্বাধীনতা এখনও অর্জিত হয়নি। সাধারণ মানুষের পূর্ণাঙ্গ অধিকার প্রতিষ্ঠা পায়নি। মানুষের ওপর শোষণ এখনও চলছে। শোষকের চেহারা পাল্টালেও পাল্টায়নি শোষণের চেহারা।

তানজিম হাসান, স্থপতি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, আমাদের দেশে অনেক সুপরিচিত মুক্তিযোদ্ধা আছে। খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা আছে। তারা সব সময় সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও বাহ্বা পায়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে এমন অনেক সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল যাদের কোনো পরিচিতি নেই। কেউ তাদের চিনেনও না বা স্মরণও করেন না। অথচ মুক্তিযুদ্ধে তাদেরও ছিল অগ্রণী ভূমিকা। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে তাদের অসামান্য অবদানকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নির্মাণকাল প্রসঙ্গে তানজিম হাসান বলেন, যখন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মাণের দেখভালের দায়িত্ব দেয়া হয়, আমি এই দায়িত্বকে আমানত হিসেবে মনে করেছি। বাংলাদেশ সরকারের ও জনগণের টাকার কোনো অপব্যবহার যেন না হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রেখেছি। কোনো মালামাল বা উপকরণ সুষ্ঠুভাবে ব্যবহার হচ্ছে কি না পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছি।
তিনি জানান, ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নকশা প্রণয়নের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। তখন তিনি আবুধাবিতে ছিলেন। সেখান থেকে দেশে ফিরে এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। পরে জানতে পারেন প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান লাভ করেছেন। যেটি ছিল তার জন্য আশাতীত প্রাপ্তি। তিনি চাকরি ছেড়ে দেশে চলে আসেন।
তরুণ এই স্থপতি বলেন, নকশাটি নিয়ে তাকে গভীরভাবে কাজ করতে হয়েছে। জীবনের সব দক্ষতাকে এখানে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। নকশাটিকে প্রাথমিক রূপদান করতেই তাকে কাজ করতে হয়েছে তিন মাস। নকশা নির্বাচিত হওয়ার পর এর পূর্ণাঙ্গতা আনতে ২০১০ সাল থেকে আরও এক বছর কাজ করতে হয়েছে। নির্মাণ-কাঠামোয় নকশার বাস্তবায়নে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দিতে হয়েছে। তবে আসল জায়গায় একটুও ছাড় দেয়া হয়নি।
তানজিম হাসান বলেন, বাংলাদেশের অস্তিত্ব ভৌগলিক ও রাজনৈতিকভাবে অর্জিত হয়েছে একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। স্বাধীনতা যুদ্ধের দীর্ঘ সময় পরে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এই দেশের মাটিতে গড়ে উঠেছে। এই জাদুঘর হয়তো কখনোই এই দেশের মানুষের যে ত্যাগ-তিতীক্ষা আর হাহাকারের পূর্ণাঙ্গতা ধারণ করতে পারবে না। কিন্তু যেকোনো মূল্যে এই জনগোষ্ঠীর আশা-আকাঙ্খা আর অনুভূতির ধারক ও বাহক হয়ে এই বাংলার মাটিতে কাল নিরবধি বহমান থাকবে। এই জাদুঘরের সঙ্গে যেমন মিশে আছে এদেশের সংগ্রামী সত্ত্বা তেমনি আছে যুদ্ধের ভয়াবহতার শিকার সর্বস্তরের মানুষের ক্ষতচিহ্ন।
তিনি বলেন, স্থাপনাটির মূলকেন্দ্রে আছে একটি গোলাকার শূণ্যস্থান, যা যুদ্ধের বিভীষিকাহৃত সর্বস্ব প্রাণের উপমা। দর্শক এর গ্যালারি পরিদর্শনের প্রতি মুহূর্তে অবগত থাকবেন এই শূণ্যতাকে ঘিরে। সর্বশেষে যাত্রা সমাপ্ত হবে একটি আত্মজিজ্ঞাসার স্থানে। যা হবে আগামীর পথচলার শক্তি। উপরে উন্মুক্ত আকাশ, নিচে শিখা চির-অম্লান। মাঝখানে মানুষ। এরই মাঝে মানুষ খুঁজে পাবেন তার চিরন্তন সত্ত্বাকে। এখানে আগুনটা হলো শক্তি। যেকোনো দ্রোহের চিহ্ন হলো আগুন। মানুষ প্রথমেই যুদ্ধ করেনি। আগে দ্রোহ করেছে। তারপর আস্তে আস্তে যোদ্ধা হয়ে উঠেছে। এছাড়া লাঠিয়াল ও মিছিল এই দুটোও দ্রোহের চিহ্ন। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এর চিহ্ন রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। লাঠিয়ালরা যেমন একসময় জমিদারের পক্ষে যুদ্ধ করে আবার একসময় দেশের পক্ষেও যুদ্ধ করে। লাঠিয়ালরা দ্রোহী। তাদের একটা বিশেষত্ব আছে।
স্বপ্নবাজ এই স্থপতি বলেন, জাদুঘরটি যখন নির্মাণ করা হয় তখন তার সব সময় মনে হয়েছে তার চেয়ে কমবয়সীরা যখন এখানে আসবে তখন তারা তাদের আত্মজিজ্ঞাসার জায়গা খুঁজে পাবেন এই জাদুঘরে। তারা এখান থেকে অতীতের সব বিষয় জানতে পারবে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সেই তথ্য স্থানান্তর করতে এই জাদুঘর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে।
তানজিম হাসান আরও বলেন, এমন চিন্তা-চেতনার ভবন আর কোথাও নেই। চেতনার শক্তি হিসেবে কাজ করবে ভবনটি। ভবনে সবাইকে আহ্বান করা হয়েছে একটা বোধে আসার জন্য। এই জাদুঘরের কাছে গেলেই একটা বোধ কাজ করে। সারা পৃথিবী কিন্তু যুদ্ধমুক্ত নয়। মানবিক বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে জাদুঘরটি দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াবে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, দেশের সীমানার গন্ডি পেরিয়ে পৃথিবীর নিষ্পেষিত মুক্তিকামী মানুষের জন্য এই জাদুঘরটি হতে পারে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।