Home বাজার দর

কারিকা ডেক্স


ইট
১ নম্বর ইট পরিবহন খরচ বাদে হাজার-প্রতি ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ২ নম্বর ইটের দাম হাজার-প্রতি ৮-৯ হাজার টাকা। মেট্রোসেম অটো ব্রিকস পরিবহন খরচ বাদে গ্রেড-১ সলিড ১১ হাজার টাকা ও গ্রেড-২ সলিড ৯,৫০০ টাকা এবং পিকেট ১০ হাজার টাকা, থ্রি হোল ১২ হাজার টাকা এবং টেন হোল ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বালি
রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে পরিবহন খরচসহ প্রতি ট্রাক (৫ টনি) সিলেট বালি বিক্রি হচ্ছে ১২,৩৫০ টাকা এবং আস্তর বালি বিক্রি হচ্ছে ৩,২০০ টাকায়।

সিমেন্ট
শাহ সিমেন্ট স্পেশাল ব্যাগ-প্রতি ৪৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। শাহ পপুলারের ব্যাগ-প্রতি দাম ৪৪০ টাকা। হোলসিম নরমাল ব্যাগ-প্রতি ৪৭০ থেকে ৪৮০ টাকা ও হোলসিম ওপিসির দাম ৫৩০ থেকে ৫৫০ টাকা। স্ক্যান ব্যাগ-প্রতি ৪১০ টাকা ও ডায়মন্ড ব্যাগ-প্রতি বিক্রি হচ্ছে ৪১০ থেকে ৪২৫ টাকা। সুপারক্রিট সিমেন্ট প্রতি বস্তা বিক্রি হচ্ছে ৩৯০ টাকা। ব্যাগ-প্রতি সেভেন রিং স্পেশাল ৪০০ টাকা, সেভেন রিং নরমাল ৩৮০ টাকা এবং সেভেন রিং গোল্ড ৪৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

রড
পরিবহন খরচ ছাড়া কেএসআরএমের প্রতি টন বিক্রি হচ্ছে ৬৬ হাজার টাকা। টন-প্রতি বিএসআরএম ৬৬ হাজার, জিপিএইচ ৬৪ হাজার এবং রহিম স্টিল ৬৬ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

মার্বেল ও গ্রানাইট
বিভিন্ন দেশ থেকে এগুলো আমদানি করা হয়। যেমন ইন্ডিয়া, নরওয়ে, ইতালি, টার্কিসহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ। মেঝে এবং দেয়াল সবখানে মার্বেল ও টাইলস ব্যবহার করা হয়। রান্নাঘরে চুলার নিচের যে স্পেস, আমাদের দেশে সেখানেই মার্বেলের ব্যবহার হয় বেশি। ইতালির মার্বেলকে বিভিন্ন আকৃতি দেয়া যায়। অন্যান্য ব্র্যান্ডের তুলনায় ইতালি এবং নরওয়ের মার্বেলের দাম একটু বেশি।
মার্বেল : ইন্ডিয়ান মার্বেল প্রতি বর্গফুটের দাম ১৫০ থেকে ৮৫০ টাকা। ইতালিয়ান ব্র্যান্ডের মার্বেলের প্রতি বর্গফুটের দাম ৫০০ থেকে ১,২৫০ টাকা। ইতালিয়ান ব্র্যান্ডের মধ্যে অরোরা, বায়ালজ গ্রিন, রোজালিয়া লাইট, মাসাকারার, সিলভার নোভা ইত্যাদি বেশ জনপ্রিয়। নরওয়ের মার্বেলের প্রতি বর্গফুটের দাম ৫৫০ থেকে ১,৩৫০ টাকা।
গ্রানাইট : ইন্ডিয়ান নরমাল গ্রানাইটের প্রতি বর্গফুটের দাম ৬০০ থেকে ৭৫০ টাকা, হেভি গ্রানাইট ১,০৫০ থেকে ১,৩৫০ টাকা। ইন্ডিয়ান গ্রানাইটের মধ্যে সিলভার পার্ল, সার্ফ হোয়াই, জাফরানা, মার্সেল এস, কারারা সিলেট ইত্যাদি বেশ পরিচিত।
ইতালিয়ান ব্র্যান্ডের মধ্যে রয়েছে ব্ল্যাক পার্ল, ইমারেল পার্ল, ব্লু পার্ল ইত্যাদি। এর প্রতি বর্গফুটের দাম পড়বে ৯৫০ থেকে ১,২৫০ টাকা। চায়না গ্রানাইট প্রতি বর্গফুটের দাম ৯০০ থেকে ১,০৫০ টাকা। নরওয়ে গ্রানাইট প্রতি বর্গফুটের দাম ৯০০ থেকে ১,৭৫০ টাকা।

টাইলস অ্যাডহেসিভ
খাদিম’স হাই বন্ড ২৫ কেজির দাম ৬৮৫ টাকা, টাইল ম্যাট ২৫ কেজি ৫১০ টাকা, টাইল মাস্টার ২৫ কেজি ৩৩৫ টাকা। খাদিম’স মারবেল গ্লু সাদা ২০ কেজি ৮৯০ টাকা ও ধূসর ২০ কেজি ৭৬৫ টাকা। খাদিম’স সিমেন্ট প্ল্যাস্টার ৫০ কেজি ৭০০ টাকা। খাদিম’স ফায়ার ফেড মর্টার ৫০ কেজি ১,৭০০ টাকা এবং টাইলস পয়েন্টিং (ওয়াটার প্রুফ) ১ কেজি ১২০ টাকা।

রঙ
বার্জারের ১৮.২ লিটারের বালতি-ভর্তি প্লাস্টিক ইমালশন বিক্রি হচ্ছে ৫,২০০ থেকে ৫,৫০০ টাকা। অ্যানামেল পেইন্ট প্রতি গ্যালন বিক্রি হচ্ছে ৯৬০ টাকা। এশিয়ান পেইন্টের ইন্টেরিয়র ওয়াল ফিনিশিংয়ের মধ্যে রয়েল গ্লিডার গোল্ড শেড ৪ লিটারের দাম ৫,৬০০ টাকা এবং ১ লিটারের দাম ১,৪৫০ টাকা। এক্সটেরিয়র ওয়াল ফিনিশিংয়ের মধ্যে অ্যাপেক্স আলটিমা ওয়েদার প্রুফ এমালশনের ১৮ লিটার ৮,২৮৫ টাকা, ৪ লিটার ১,৭৪০ টাকা এবং ১ লিটার বিক্রি হচ্ছে ৪৮০ টাকায়।
এশিয়ান এনামেল পেইন্টের মধ্যে অ্যাপকোলিট প্রিমিয়াম গ্লসের ১৮ লিটার ৬,০৭৫ টাকা, ৪ লিটার ১,২৫৫ টাকা এবং ১ লিটার বিক্রি হচ্ছে ৩৩৫ টাকায়।

আবিদুল ইসলাম চৌধুরী


সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিবেশ সচেতনতার বিষয়টি বেশ হইচই ফেলে দিয়েছে। দিন দিন মানুষ সচেতন হচ্ছেন। মানুষের চাল-চলন ও জীবনধারা কীভাবে পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলছে, সে ব্যাপারেও তাদের ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পরিবেশ রক্ষার বা সবুজায়নের এই প্রবণতা ফুটে উঠতে দেখা যায় তাদের ঘর-বাড়ি নির্মাণ-কৌশল ও তার ডিজাইনে। আর এই নির্মাণ-কৌশল ও ডিজাইনে রয়েছে নানা প্রকারভেদ, যেটা নির্ভর করে নির্মাণ-উপকরণ ও অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জার কুশলতার ওপর।

পরিবেশবান্ধব নির্মাণ-সামগ্রী
পরিবেশবান্ধব বাড়ির নকশা বা নির্মাণ করবেন? তাহলে শুরুটা হতে হবে সেই অনুযায়ী নির্মাণ-সামগ্রী ব্যবহারের মধ্য দিয়ে। আর তাই বাণিজ্যিক বা আবাসিক ভবন উভয় ক্ষেত্রে টেকসই নির্মাণ-সামগ্রীর জনপ্রিয়তা বেড়েই চলেছে।

দেয়ালনির্ভর বাড়ি
যেকোনো বাড়ির কাঠামোতে যেকোনো আবহাওয়ায় একটি স্থিতিশীল দেয়ালের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। যখন আপনি পরিবেশবান্ধব বাড়ি নির্মাণ করতে চাইবেন তখন দেয়ালগুলোও সেভাবে নির্মাণ করতে হবে। আর সেটা এমনভাবে হতে হবে যেন সময়ের সঙ্গে যায় এবং দীর্ঘদিন আপনাকে সুরক্ষা দিতে পারে। একটি পরিবেশবান্ধব বাড়ির দেয়াল থেকে বহুমুখী সুবিধা পাওয়া যায়। এজন্য দেয়াল নির্মাণ-সামগ্রী বাছাই করার কাজটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশবান্ধব দেয়াল শুধু বাড়ির কাঠামোই দাঁড় করায় না, এটা বাইরের পরিবেশ থেকে অভ্যন্তরীণ সুরক্ষার ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী সমাধানও বটে।

কৌব (চাঙ্গের ঘর)
টিকে থাকার নিজস্ব ব্যবস্থাপনার কারণে চাঙ্গের তৈরি ঘরগুলো আকারে ছোট হয়। মূলত এই চাঙ্গ জিনিসটি হলো মাটি, বালু আর খড়ের এক বিশেষ মিশ্রণ, যা প্রতিটি আলগা উপকরণগুলোকে জমাটবদ্ধ করে টেকসই কাঠামো প্রদান করে। হয়তো ভাবছেন এই মিশ্রণটি ভেঙে পড়বে যেকোনো সময়! জেনে রাখুন, চাঙ্গের মিশ্রণটির স্থায়িত্ব ৫০০ বছরের বেশি। কারণ হলো এর নান্দনিক কাঠামোর ছাদ ও মেঝে। অত্যন্ত সুনিপুণ কৌশলে বাঁশ-কাঠের ত্রিভুজাকৃতির কাঠামোতে খড়ের আস্তরণ দ্বারা তৈরি হয় এর ছাদ। ঘরের মেঝেতে ব্যবহৃত পাথুরে উঁচু আস্তরণের কারণে বাড়তি আর্দ্রতা তৈরি হয় না। ফলে দেয়াল থাকে অক্ষুণœ। তাছাড়া এই পরিবেশবান্ধব ঘর যেমন হয় অদাহ্য, তেমনি পোকামাকড়মুক্ত।

স্ট্র বেল
এটা এমন এক ধরনের ঘর, যার দেয়াল মূলত খড়ের গাদা দিয়ে তৈরি। তবে এটার ভিত্তি কৌব মডেলে তৈরি ঘরগুলোর মতো। ফলে এই ঘরগুলোতেও আর্দ্রতা হয় কম। পাথুরের ভিত্তির ওপর গড়ে ওঠা এই মডেলের ঘরগুলো প্রধানত দুটি কৌশলে তৈরি করা হয়। প্রথমটা হলো লোড বেয়ারিং টেকনিক। এক্ষেত্রে খড়ের গাদাগুলোকে বক্স আকৃতির খ- খ- বুনটে তৈরি করা হয়। বুনটগুলো হয় খুবই ভারী এবং শক্ত, যা মজবুত দেয়াল হিসেবে কাজ করে। সবশেষে দেয়ালের ওপর আস্তরণ দেয়া হয়। অপরটি হলো নন-লোড বেয়ারিং টেকনিক। মূলত কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরি ফ্রেমে মাঝখানটাতে খড়ের গাদাগুলো ঠেসে বসিয়ে দিয়ে তৈরি করা হয় এর দেয়ালগুলো। তাই ঘরের লোড খড়ের গাদার ওপরে থাকে না। শুধু দেয়াল হিসেবেই কাজ করে এই স্ট্র বেল। প্রকৃতপক্ষে টেকনিক্যাল কারণে নয়, বরং পরিবশেবান্ধব হওয়াতে এই স্ট্র বেল মডেলের ঘর জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

ভূ-গর্ভস্থ বাড়ি
অন্য বাড়িগুলোর চেয়ে বেশি পরিবেশবান্ধব হলো ভূ-গর্ভস্থ বাড়ির ডিজাইন। এই ডিজাইনে একমাত্র দরজা আর কিছু জানালা ছাড়া বাকি কাঠামো থাকে মাটির নিচে। প্রাকৃতিক ঝড়ঝাপটার কারণে বেশির ভাগ ভূ-গর্ভস্থ বাড়িগুলো হয় কংক্রিটের তৈরি। সাধারণত তিন ধরনের হয় ভূ-গর্ভস্থ বাড়ির কাঠামো। প্রথমত, সবচেয়ে বেশি যে নির্মাণশৈলী চোখে পড়ে, তা হলো পাহাড় আবৃত বাড়ি। এ ধরনের বাড়িগুলো হয় পাহাড়ের ঢিবির ভেতর বা ঢালুতে। দরজা-জানালাগুলো বাইরের দিকে রেখে বাকি ঘরটা পাহাড়ের ভেতর গড়ে তোলা হয়। দ্বিতীয়ত, যে নির্মাণশৈলীটি আছে, সেটা হলো কৃত্রিমভাবে নির্মিত পাহাড়ে ঘর বানানো। মাটির ঢিবিতে বা কৃত্রিম ঢালু তৈরি করে তার অভ্যন্তরে তৈরি হয় ঘরগুলো। সম্পূর্ণ ভূমির ওপর নির্মিত হওয়ায় কিছু জায়গায় আবার আলগা মাটির স্তর বসানো হয়। সর্বশেষ শৈলীটিই হলো সত্যিকারের ভূ-গর্ভস্থ বাড়ি। কারণ মাটি খুঁড়ে গর্ত করে পুরো বাড়িটি তৈরি হয় ভূমির নিচে। অবশ্য ছাদ নির্মাণ করা হয় ভূ-পৃষ্ঠের সামান্য ওপরে, যাতে আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে।

পরিবেশবান্ধব ছাদ নির্মাণ
পরিবেশবান্ধব বাড়ি নির্মাণের জন্য পরিবেশবান্ধব দেয়াল তৈরি করেছেন ভালো কথা। তবে ছাদটাও কেন নয়? বরং নানাবিধ ব্যবহার-উপযোগী ছাদ তৈরির মাধ্যমে আপনার বাড়ি হয়ে উঠবে অধিকতর পরিবেশবান্ধব।

ভূমি-আচ্ছাদিত ছাদ
পরিবেশবান্ধব বাড়ির জন্য ছাদে সবুজায়ন করাটা সর্বাগ্রে সবার মনে আসে। অনেকেই ছাদে বাগান করে থাকেন। তবে এক্ষেত্রে প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা ও কৌশল। যার অভাবে হয়তো বিফল হতে পারে পরিবেশবান্ধব করার প্রচেষ্টা। তাই ছাদ সবুজায়নের জন্য যে কয়েকটি উপায় নির্মাণ-প্রকৌশলীরা বাতলে দেন, তার মধ্যে সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন হলো ভূমি-আচ্ছাদিত ছাদ। বাড়ি নির্মাণের সময় ছাদের কংক্রিট স্তর থেকে ওপরের অংশে মাটির লেয়ার বসানোর স্থায়ী ট্রের কাঠামো তৈরি করা হয়। বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য থাকে কৃত্রিম পরিখা। যেটা পানি নিষ্কাশনের ক্ষেত্রেও কাজে লাগানো যায়। পুরো অবকাঠামোটা সম্পূর্ণ হয়ে গেলে মনে হবে ছাদের ওপর একটি সবুজ মাঠ।

সৌর ছাদ
অনেকেই হয়তো ভাবছেন এটা সিলিকনের প্যানেলগুলোর মতো। প্রকৃতপক্ষে এটা হলো সোলার সিঙ্গলস। যেটা একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে, আবার টাইলসের কাজও করবে। সিআইজিএস প্রযুক্তিতে বসানো এই সোলার সিঙ্গলসগুলোতে বাড়তি কোনো কপার বা অ্যালুমিনিয়াম ফ্রেম ব্যবহার করতে হয় না। ফলে টাইলসগুলো দেখলে বোঝাই যায় না যে এগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজ করে।

পরিবেশবান্ধব ইন্টেরিয়র ডিজাইন
এক্ষেত্রে প্রথমেই বলতে হয় মেঝের কথা। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব ও আরামদায়ক মেঝের ক্ষেত্রে তিন ধরনের উপকরণ দিয়ে মেঝে তৈরি করতে পারবেন। প্রথমটা হতে পারে বাঁশের তৈরি। বাজেট আর নান্দনিকতার জন্য গাছের চেয়ে বাঁশের তৈরি মেঝে এখন জনপ্রিয়। বাঁশের কাঁচামালকে প্রক্রিয়াজাত করে অনেকটা প্লাইউডের আকৃতি তৈরি করা হয়। সুদৃশ্য রঙ এবং বাহারি ডিজাইনের বাঁশের তৈরি মেঝে এখন ইন্টেরিয়র ডিজাইনের অন্যতম উপকরণ।
রান্নাঘর ও ডাইনিংয়ের জন্য সবচেয়ে উপযোগী হলো কর্কের তৈরি মেঝে। তুতগাছের বাকল হলো এর মূল উপকরণ। এটা টেকসই এবং পরিবর্তনযোগ্য। তুলনামূলক নমনীয় এবং পছন্দ অনুযায়ী ডিজাইনে তৈরি কর্কের মেঝে অত্যন্ত পরিবেশবান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত।
এরপর আসে কার্পেট ব্যবহারের বিষয়। পবিবেশবান্ধব ইন্টেরিয়র ডিজাইনে প্রাকৃতিক আঁশ থেকে তৈরি কার্পেট সবার আগে প্রাধান্য পায়। সেক্ষেত্রে প্রধান উপকরণ হলো পাট এবং পশম। পশমকে বিশেষভাবে বুননের মাধ্যমে তৈরি কার্পেট বেশ আরামদায়ক। মেঝেতে পানি ছড়ানো রোধ করতে এটা অনন্য। তাছাড়া সিসল গাছ ও সামুদ্রিক ঘাস থেকে প্রাপ্ত ফাইবার কার্পেট খুবই মনোরম ও টেকসই।
পরিবেশবান্ধব ইন্টেরিয়র ডিজাইন পূর্ণতা পায় বাড়ির ভেতরকার দেয়াল সাজানোর ওপর। দেয়ালের ভেতরকার অংশে গাছের টব রাখাটাকে সবুজবান্ধব সৌখিনতা বলতে পারেন। বিভিন্ন আকৃতির খোপ তৈরি করে গাছের টবগুলো রাখা যায়। ফলে ঘরে যেমন বিশুদ্ধ বায়ুর অভাব হয় না, তেমনি স্থান সংকুলানও হয়।
দেয়ালের রঙ ইন্টেরিয়র ডিজাইনে সবচেয়ে মৌলিক উপকরণ। আর পরিবেশবান্ধব ঘরে দেয়ালের রঙটাও হওয়া চাই ভোলাটাইল অর্গানিক কম্পাউন্ড (ভিওসি) মুক্ত। প্রচলিত রঙগুলো দেয়ালে লাগানোর পর ভিওসিযুক্ত বিষাক্ত কেমিক্যাল ছড়াতে থাকে। তাই পরিবেশবান্ধব বাড়ির ইন্টেরিয়র সাজাতে ‘ইকো-ফ্রেন্ডলি পেইন্টস’ ব্যবহারের বিকল্প নেই।

পরিবেশবান্ধব উপযোগ
শুধু পরিবেশবান্ধব বাড়ি সাজালেই হবে না, বাড়িতে ব্যবহার-উপযোগী মৌলিক উপকরণগুলোও যেন হয় পরিবেশবান্ধব সেদিকে নজর রাখা চাই।

তাপ নিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থা
বাড়িতে দু’ভাবে পবিবেশবান্ধব তাপ নিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থা রাখা যায়। প্রথমত, কম্পিউটার-নিয়ন্ত্রিত থার্মোস্ট্যাটের মাধ্যমে। এটি দিনের তাপ ও আলোর ওপর নির্ভর করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাপ সংরক্ষণ করে। ঘরের ভেতর প্রয়োজন অনুসারে এটা তাপ নিয়ন্ত্রণ করে ঘরকে ঠা-া ও গরম রাখে। দ্বিতীয়ত, জিওথার্মাল অ্যানার্জি সিস্টেমস। এর মাধ্যমে ঘরের মেঝেগুলোর নিচে একটা ফাঁপা অংশ তৈরি করা হয়। জেনারেটরের মাধ্যমে সে অংশে পানি সংরক্ষণ করে তাতে তাপ প্রয়োগ করে ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহার
ছাদে বাগানের জন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের যে ব্যবস্থা আছে, সেটাকে মূল পানির উৎস থেকে আলাদাভাবে সংরক্ষণ করা যায়। সাধারণ ধোয়ামোছার পানিকে প্রাকৃতিকভাবে রি-ট্রিটমেন্ট করে পুনরায় সেই কাজে ব্যবহার-উপযোগী করা যায়। এসব কাজের মূল শক্তির জোগান আসে বিদ্যুৎ থেকে। তাই ছাদে সোলার প্যানেল থেকে প্রাপ্ত বিদ্যুৎকে যথাযথ ব্যবহার করার ব্যবস্থা রাখা জরুরি। এক্ষেত্রে ঘরে স্বল্প ওয়াটের বাল্ব (সিএফএল) ব্যবহার করে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা সম্ভব।
পরিবেশ বাঁচলে মানুষ বাঁচবে। তাই মানুষ পরিবেশবান্ধব নির্মাণে দিন দিন মনোযোগ দিচ্ছে। ফলে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন আসছে পরিবেশবান্ধব বাড়ির ডিজাইনে। সবচেয়ে কম কার্বন নিঃসরণ করে এমন ডিজাইন তৈরির জন্য নির্মাণ-প্রকৌশলীরাও সচেষ্ট, যাতে কম খরচে পরিবেশবান্ধব একটি বাড়ি হতে পারে সবার জন্য।

আবুল হোসেন আসাদ: বিশ্ব-অভিযাত্রী ও সাইক্লিস্ট


নান্দনিক স্থাপত্যটির সবকিছুই লাল। এ যেন লাল রঙ-রাজ্যের এক নান্দনিক কিল্লা। নাম তার লালকিল্লা। অনুপম নির্মাণশৈলী, অলংকরণ ও শিল্পসত্তার অপূর্ব এক উৎকর্ষের প্রতীক এই লালকিল্লা। পারসিক এবং ভারতীয় স্থাপত্যরীতিতে তৈরি এই কিল্লা মুঘলদের অনবদ্য কীর্তি। লাল বেলেপাথর দিয়ে এই কিল্লা তৈরি হয়েছে বলে এর নাম হয়েছে লালকিল্লা।
কী বিশাল এই কিল্লা। আর ব্যাপক জায়গাজুড়ে এর বিস্তৃতি। কী উঁচু আর সুপ্রশস্ত এই লাল রঙের কিল্লাটি দেখামাত্রই মন ভরে যায়।
যমুনার পাড়ে গড়ে ওঠা কিল্লাটি তিনশ’ বছরেরও আগে হলেও অতীতের ইতিহাস হয়ে আজও লাল রঙে ছড়িয়ে দিচ্ছে আপন মহিমা। যমুনা সরে গেছে আজ দূরে। নেই আর কিল্লার সেই সময়ের রাজকীয় জৌলুস। মুঘল সামাজ্যের গৌরবগাথা নেই সত্য, তবুও সময়ের সাক্ষী হয়ে লালকিল্লার লাল পাথরের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে অতীত ইতিহাস। সেই ইতিহাসের পাতা ধরে জানা যায়, এই লালকিল্লার নির্মাণকাজ শুরু হয় সম্রাট শাহজাহানের আমলে, ১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে। শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষার সব ব্যবস্থাই পাকাপাকি ছিল তখন কিল্লাটিতে। নিরাপত্তার ছিল না কোনো ত্রুটি। কিল্লার বাইরের প্রাচীর নির্মিত হয়েছিল পাষাণের মতো প্রচন্ড কঠিন লাল পাথর দিয়ে। কিল্লার বাইরের দেয়াল পুরো মসৃণ আর খাড়া। শত্রুবাহিনী যাতে কিল্লা দখল করতে না পারে কিংবা কিল্লার কাছে ঘেঁষতে না পারে সেজন্য কিল্লার বাইরের প্রাচীর-দেয়ালের চারদিকে গভীর ও প্রশস্ত পরিখা খনন করা হয়েছিল। যমুনা নদীর পানিতে সে পরিখা পরিপূর্ণ থাকত সবসময়। আর পরিখার পানির ওপর দিয়ে ইট-পাথরের তৈরি সেতু পার হয়ে মিলত কিল্লায় প্রবেশের প্রধান ফটক বা দরজা। দরজাসমেত পুরো গেটটির নির্মাণশৈলী এককথায় অসাধারণ। মূলত গেটটি একটি কমপ্লেক্সের মতো। নাম লাহোরি গেট।

লালকিল্লায় সেই সময় মুঘল সম্রাটরা সপরিবারে বসবাস করতেন। তাই কিল্লাটিকে আশীর্বাদধন্য বা ‘কিল্লা-ই-মুবারক’ নামে অভিহিত করা হতো প্রথমদিকে। কিল্লাটির প্রতিরক্ষা জোরদারের জন্য ‘সালিমগড় কিল্লা’ নামে অন্য একটি কিল্লার সঙ্গে লালকিল্লার উত্তর-পূর্ব কোণের প্রাচীর যুক্ত ছিল। সালিমগড় কিল্লাটি নির্মাণ করেছিলেন ইসলাম শাহ সুরি, ১৫৪৬ সালে। সম্রাট শাহজাহানের নতুন রাজধানী ছিল শাহজাহানাবাদ। যেটি ছিল দিল্লির সপ্তম নগরী। আর সেটিরই রাজপ্রাসাদ ছিল এই লালকিল্লা। কিল্লাটি ছিল মুঘল সা্ম্রাজ্যের রাজধানী। পরে সম্রাট শাহজাহান এই রাজধানী সরিয়ে নেন আগ্রা শহরে। দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ্ জাফর ছিলেন শেষ মুঘল সম্রাট। ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত তিনিও এই কিল্লাতেই বসবাস করেছেন। সিপাহী বিপ্লবের ব্যর্থতার পর দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ্ জাফর ১৭ সেপ্টেম্বর ১৮৫৭ সালে লালকিল্লা ত্যাগ করেন। পরে আবার লালকিল্লায় ফেরেন তিনি, তবে ব্রিটিশ বন্দি হিসেবে। ততদিনে গঙ্গা-যমুনায় অনেক পানি গড়িয়েছে। ইংরেজরা ২৭ জানুয়ারি ১৮৫৮ সালে বাহাদুর শাহ্ জাফরের বিচার করে এই লালকিল্লাতেই এবং ওই বছরের ৭ অক্টোবর তাকে মিয়ানমারে (বার্মা) নির্বাসন দন্ড দেয় ব্রিটিশরা। তারপর থেকে ব্রিটিশরা লালকিল্লাকে ক্যান্টনমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে, ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত। ভারতের স্বাধীনতাকামী আজাদ হিন্দ ফৌজ ১৯৪৫ সালে পরাজয় বরণ করলে ব্রিটিশরা স্বাধীনতাকামী যুদ্ধবন্দিদের বিচার করে এই লালকিল্লাতে বসে। ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে এই কিল্লা জড়িয়ে আছে নিবিড়ভাবে। তাই প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী লালকিল্লায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। আর ইউনেস্কো এই কিল্লাটিকে বিশ্ব-ঐতিহ্যের স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ২০০৭ সালে। লালকিল্লার বেশিরভাগ জায়গা অর্থাৎ ৭৫ ভাগ স্থান ব্যবহার করছে এখন ভারতীয় সেনাবাহিনী আর বাকি ২৫ ভাগ জায়গা দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে।
লালকিল্লার মূল ফটক বা লাহোরি গেট পেরোলেই সামনে একটি ছোট্ট বাজার। বাজারটি একটি নান্দনিক কমপ্লেক্সের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তার দু’পাশের দেয়াল ঘিরে গড়ে উঠেছে। বাজারটিতে রয়েছে ছোট ছোট স্টলের সাজানো দোকান। এসব দোকানে শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন রাজ্যের পণ্য, শৌখিন হস্তশিল্প এবং স্যুভেনির। কিছুটা এগোলেই দেখা যায় নহবতখানা। যেটি এখন ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের জাদুঘর। এ জাদুঘরের গ্যালারিতে থরে থরে সাজানো রয়েছে পুরনো দিনের তরবারি, বর্ম ও তীর-ধনুক থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রামের নানা উপকরণ। জাদুঘর থেকে বের হলে চোখে পড়ে সবুজ একটি প্রাঙ্গণ। প্রাঙ্গণ পেরোলেই দেখা মেলে দিওয়ান-ই-আম ভবন। আমজনতা বা সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্রাট দেখা দিতেন এখানে বসেই। তিনি বসতেন ‘ঝরোখা’ নামের অলংকৃত উঁচু সিংহাসনে। সেটি এখন রয়েছে স্বচ্ছ কাচের ভেতরে সংরক্ষিত অবস্থায় এই দিওয়ান-ই-আম ভবনেই। দিওয়ান-ই-আমের নির্মাণশৈলী অপরূপ। এর তিন দিকেই খোলামেলা। দেখতে অনেকটা বৈঠকখানার মতো। দিওয়ান-ই-আমের খিলানগুলো নান্দনিক কারুকার্যময়। সারাটা ভবনজুড়েই রয়েছে তৎকালীন স্থাপত্যশৈলীর চমৎকারিত্ব ও পেশাদারিত্বের ছাপ। সামনের দিকে রয়েছে সবুজ খোলা প্রান্তর।
মমতাজ মহল এখন পরিবর্তিত হয়েছে লালকিল্লা প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরে। মমতাজ মহলের অবস্থান কিল্লার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে। পাথরে খোদাই করা আরবি লেখা, বিভিন্ন আরবি পান্ডুলিপি ও চিত্রকলা থেকে শুরু করে মুঘল সম্রাটদের আদেশনামা, সম্রাটদের ব্যবহার করা নানা জিনিসপত্র ও তরবারি রয়েছে জাদুঘরের গ্যালারিতে। শেষ মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ্ জাফরের পোশাক, চেয়ারসহ নানা উপকরণও বাদ যায়নি জাদুঘরটির সংগ্রহশালা থেকে।
রঙমহল নামটি শুনলেই বোঝা যায় তবলার তা ধিন ধিন সুরেলা আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে নূপুরের ধ্বনি, যা জড়িয়ে রয়েছে ভবনটির সঙ্গে। সে সময় বিনোদনের জন্য বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন হতো বৈঠকখানার মতো এই রঙমহলে। রঙমহল ভবনটির ঠিক সামনে রয়েছে একটি পুকুর। পুকুরটির মাঝে রয়েছে চমৎকার ফোয়ারা।
খাসমহল এর অবস্থান রঙমহলের পাশেই। আর খাসমহলের সঙ্গে রয়েছে দিওয়ান-ই-খাস। এই দিওয়ান-ই-খাস ভবনের স্তম্ভগুলো নির্মিত হয়েছে শ্বেত-পাথরে। সেই স্তম্ভগুলোতে রয়েছে বিচিত্র ও মনোমুগ্ধকর রঙ-বেরঙের চিত্রিত ফুলের নকশা খোদাই করে বসানো। পুরো ভবনটাই শ্বেত-পাথরের তৈরি এবং চারপাশ খোলা।
হাম্মামখানা বা গোসলখানা দিওয়ান-ই-খাসের সঙ্গে লাগোয়া। মতি মসজিদ রয়েছে হাম্মামখানার একটু দূরে, পশ্চিম প্রান্তে। লালকিল্লা নির্মাণের অনেক পর এই মতি মসজিদ নির্মিত হয়েছে। আর সম্পূর্ণ শ্বেত-পাথরে তৈরি ছোট্ট এই মসজিদটিতে রয়েছে তিনটি গম্বুজ। মসজিদটির নির্মাণকাল ১৬৫৯ সাল। ব্যক্তিগত মসজিদ হিসেবে সম্রাট শাহজাহানের ছেলে আওরঙ্গজেব এটি নির্মাণ করেন।
নান্দনিক স্থাপত্যের আরেকটি হলো নহর-ই-বেহেস্ত বা স্বর্গবাগানের জলের ধারা। হায়াত বক্স বাগ বা জীবন-প্রদায়ী উদ্যানও বেশ নজরকাড়া, যা লালকিল্লার ভেতরের সবুজের শোভাকে করেছে সুষমা্মন্ডিত। এছাড়াও লালকিল্লার প্রাঙ্গণে রয়েছে হিরামহল, জাফরমহল, আসাদ বুর্জ, শাহ বুর্জ মিনার, বিশাল জলাধার এবং তার মাঝে থাকা নানান নান্দনিক কক্ষ, যেগুলো লালকিল্লার ভেতরের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণে।

 

তানজিম হাসান
স্থপতি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর


রাজধানীর আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নতুন ভবনের দিকে তাকালেই যে কারোর দৃষ্টি আটকে যায়। শুধু নান্দনিকতা দিয়েই নয়, ভবনটি তার ভিন্ন বিশেষত্ব দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে হৃদয়ে ধারণ করেন এমন মানুষকে চোখের পলকেই কাছে টেনে নিয়ে যায়। ভবনটির এমন গুণের রসদদাতা এক স্থপতি-দম্পতি তানজিম হাসান ও নাহিদ ফারজানা। এই দম্পতি তাদের মেধার সর্বোচ্চ স্ফূরণ ঘটিয়ে তৈরি করেছেন এর নকশা। যে নকশার বাস্তবায়নে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রকাশ ঘটেছে এক অনন্য উচ্চতা নিয়ে। সম্প্রতি স্থপতি তানজিম হাসান এই মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন কারিকার সঙ্গে। কথোপকথনের চুম্বক অংশ তুলে ধরেছেন মো. জগলুল হায়দার

তরুণ এই স্থপতির মুক্তিযুদ্ধ দেখার সুযোগ না হলেও মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে রয়েছে গভীর গবেষণা। তারই আলোকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তিনি বলেন, সংগঠিত একটি সামরিক শক্তির সঙ্গে ছিল সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা। এটা শক্তিশালী ছিল। কারণ সামরিক বাহিনীর সদস্যরা যখন যুদ্ধ করে তখন সেটার প্রেক্ষাপট দাঁড়ায় এক রকম, আর যখন ডাক্তার, রিকশাচালক ও ছাত্ররা হাতে অস্ত্র ধরেছে সেটা কিন্তু কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। একটি জনগোষ্ঠীর ওপর এর প্রভাব খুব জটিল ও অস্বাভাবিকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। সাইক্লোন, বন্যা ও মহামারি ইত্যাদি যেমন সাধারণ জনগোষ্ঠীর জন্য জটিল ঘটনা, যুদ্ধও ঠিক তেমনটি। সব সময় একটা জনগোষ্ঠী যুদ্ধ দেখতে চায় না। তারা শান্তি চায়। তারপরও হঠাৎ হঠাৎ যুদ্ধ এসে যায়। নিঃসন্দেহে যেকোনো জনগোষ্ঠির জন্য যুদ্ধ একটি অভিশাপ। বাংলাদেশের মতো শান্তিপ্রিয় মানুষ যে এই অবস্থায় অবতীর্ণ হয়েছিল সেটাই একটা অদ্ভুত ব্যাপার। এই শান্তিপ্রিয় মানুষগুলোই অস্ত্র হাতে নিতে বাধ্য হয়েছে, তারা অশুভ শক্তি দ্বারা কী পরিমাণ নিষ্পেষিত হলে সেটা বুঝতে হবে। আমার জন্ম মুক্তিযুদ্ধের পরে হলেও পত্র-পত্রিকা ও মিডিয়ার বদৌলতে এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারি। আমরা ভৌগলিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যুদ্ধ করেছি এবং সেটা অর্জন করতে পেরেছি। কিন্তু সত্যিকার স্বাধীনতা এখনও অর্জিত হয়নি। সাধারণ মানুষের পূর্ণাঙ্গ অধিকার প্রতিষ্ঠা পায়নি। মানুষের ওপর শোষণ এখনও চলছে। শোষকের চেহারা পাল্টালেও পাল্টায়নি শোষণের চেহারা।

তানজিম হাসান, স্থপতি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, আমাদের দেশে অনেক সুপরিচিত মুক্তিযোদ্ধা আছে। খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা আছে। তারা সব সময় সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও বাহ্বা পায়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে এমন অনেক সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল যাদের কোনো পরিচিতি নেই। কেউ তাদের চিনেনও না বা স্মরণও করেন না। অথচ মুক্তিযুদ্ধে তাদেরও ছিল অগ্রণী ভূমিকা। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে তাদের অসামান্য অবদানকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নির্মাণকাল প্রসঙ্গে তানজিম হাসান বলেন, যখন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মাণের দেখভালের দায়িত্ব দেয়া হয়, আমি এই দায়িত্বকে আমানত হিসেবে মনে করেছি। বাংলাদেশ সরকারের ও জনগণের টাকার কোনো অপব্যবহার যেন না হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রেখেছি। কোনো মালামাল বা উপকরণ সুষ্ঠুভাবে ব্যবহার হচ্ছে কি না পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছি।
তিনি জানান, ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নকশা প্রণয়নের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। তখন তিনি আবুধাবিতে ছিলেন। সেখান থেকে দেশে ফিরে এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। পরে জানতে পারেন প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান লাভ করেছেন। যেটি ছিল তার জন্য আশাতীত প্রাপ্তি। তিনি চাকরি ছেড়ে দেশে চলে আসেন।
তরুণ এই স্থপতি বলেন, নকশাটি নিয়ে তাকে গভীরভাবে কাজ করতে হয়েছে। জীবনের সব দক্ষতাকে এখানে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। নকশাটিকে প্রাথমিক রূপদান করতেই তাকে কাজ করতে হয়েছে তিন মাস। নকশা নির্বাচিত হওয়ার পর এর পূর্ণাঙ্গতা আনতে ২০১০ সাল থেকে আরও এক বছর কাজ করতে হয়েছে। নির্মাণ-কাঠামোয় নকশার বাস্তবায়নে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দিতে হয়েছে। তবে আসল জায়গায় একটুও ছাড় দেয়া হয়নি।
তানজিম হাসান বলেন, বাংলাদেশের অস্তিত্ব ভৌগলিক ও রাজনৈতিকভাবে অর্জিত হয়েছে একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। স্বাধীনতা যুদ্ধের দীর্ঘ সময় পরে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এই দেশের মাটিতে গড়ে উঠেছে। এই জাদুঘর হয়তো কখনোই এই দেশের মানুষের যে ত্যাগ-তিতীক্ষা আর হাহাকারের পূর্ণাঙ্গতা ধারণ করতে পারবে না। কিন্তু যেকোনো মূল্যে এই জনগোষ্ঠীর আশা-আকাঙ্খা আর অনুভূতির ধারক ও বাহক হয়ে এই বাংলার মাটিতে কাল নিরবধি বহমান থাকবে। এই জাদুঘরের সঙ্গে যেমন মিশে আছে এদেশের সংগ্রামী সত্ত্বা তেমনি আছে যুদ্ধের ভয়াবহতার শিকার সর্বস্তরের মানুষের ক্ষতচিহ্ন।
তিনি বলেন, স্থাপনাটির মূলকেন্দ্রে আছে একটি গোলাকার শূণ্যস্থান, যা যুদ্ধের বিভীষিকাহৃত সর্বস্ব প্রাণের উপমা। দর্শক এর গ্যালারি পরিদর্শনের প্রতি মুহূর্তে অবগত থাকবেন এই শূণ্যতাকে ঘিরে। সর্বশেষে যাত্রা সমাপ্ত হবে একটি আত্মজিজ্ঞাসার স্থানে। যা হবে আগামীর পথচলার শক্তি। উপরে উন্মুক্ত আকাশ, নিচে শিখা চির-অম্লান। মাঝখানে মানুষ। এরই মাঝে মানুষ খুঁজে পাবেন তার চিরন্তন সত্ত্বাকে। এখানে আগুনটা হলো শক্তি। যেকোনো দ্রোহের চিহ্ন হলো আগুন। মানুষ প্রথমেই যুদ্ধ করেনি। আগে দ্রোহ করেছে। তারপর আস্তে আস্তে যোদ্ধা হয়ে উঠেছে। এছাড়া লাঠিয়াল ও মিছিল এই দুটোও দ্রোহের চিহ্ন। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এর চিহ্ন রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। লাঠিয়ালরা যেমন একসময় জমিদারের পক্ষে যুদ্ধ করে আবার একসময় দেশের পক্ষেও যুদ্ধ করে। লাঠিয়ালরা দ্রোহী। তাদের একটা বিশেষত্ব আছে।
স্বপ্নবাজ এই স্থপতি বলেন, জাদুঘরটি যখন নির্মাণ করা হয় তখন তার সব সময় মনে হয়েছে তার চেয়ে কমবয়সীরা যখন এখানে আসবে তখন তারা তাদের আত্মজিজ্ঞাসার জায়গা খুঁজে পাবেন এই জাদুঘরে। তারা এখান থেকে অতীতের সব বিষয় জানতে পারবে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সেই তথ্য স্থানান্তর করতে এই জাদুঘর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে।
তানজিম হাসান আরও বলেন, এমন চিন্তা-চেতনার ভবন আর কোথাও নেই। চেতনার শক্তি হিসেবে কাজ করবে ভবনটি। ভবনে সবাইকে আহ্বান করা হয়েছে একটা বোধে আসার জন্য। এই জাদুঘরের কাছে গেলেই একটা বোধ কাজ করে। সারা পৃথিবী কিন্তু যুদ্ধমুক্ত নয়। মানবিক বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে জাদুঘরটি দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াবে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, দেশের সীমানার গন্ডি পেরিয়ে পৃথিবীর নিষ্পেষিত মুক্তিকামী মানুষের জন্য এই জাদুঘরটি হতে পারে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

কারিকা ডেক্স


আবাসন খাতের শেকড় হচ্ছে নির্মাণ-সামগ্রী। শেকড় ছাড়া একটি গাছ যেমন পত্র-পল্লবে বিকশিত হতে পারে না, তেমনি নির্মাণ-সামগ্রীর পর্যাপ্ত সরবরাহ ছাড়া আবাসন খাত এক কদমও সামনে অগ্রসর হতে পারে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, বদ্ধমূল এই ধারণা থেকেই নির্মাণ-সামগ্রী ব্যবসার উদ্ভব ঘটেছে। বাংলাদেশে এ ব্যবসার শুরুটা সাধারণের কাছে স্বচ্ছ মনে না হলেও বর্তমানে এর অনেক কিছুই স্পষ্ট ও দৃশ্যমান। এ দেশে এক সময় এ ব্যবসার হাত ধরেই আত্মপ্রকাশ ঘটেছে অনেক শীর্ষ ব্যবসায়ীর। বিষয়টি অনস্বীকার্য যে, তাদেরই অনুপ্রেরণায় এ ব্যবসা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের আনাচে-কানাচে। বর্তমানে এর প্রসার ও সহজলভ্যতার ব্যাপ্তি এতটাই ছড়িয়ে পড়েছে যে, নির্মাণ-সামগ্রীর জন্য এখন আর কাউকেই দৌড়ঝাঁপ করতে হয় না বড় শহর বা গঞ্জে। যে কেউ চাইলেই তার গন্ডির মধ্যে থেকে তার চাহিদামাফিক নির্মাণ-সামগ্রী সংগ্রহ করতে পারেন।

             

সম্প্রতি কারিকার এক অনুসন্ধানে বের হয়ে এসেছে নির্মাণ-সামগ্রী ব্যবসার বেশকিছু আশাব্যঞ্জক তথ্য। সেই তথ্যানুসারে বলা যায়, বর্তমানে সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন যেকোনো ব্যক্তি এ ব্যবসার সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করে অনায়াসে মাসপ্রতি আয় করতে পারেন কমপক্ষে ৩০ হাজার টাকা। তবে এর বিপরীতে তাকে পুুঁজি বিনিয়োগ করতে হবে কমপক্ষে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা। রাজধানীর আশপাশে থাকা জেলা শহরে অবস্থিত ছোট্ট পরিসরের নির্মাণ-সামগ্রীর দোকানের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে রড বাবদ ৫০-৭০ হাজার, সিমেন্ট বাবদ ৫০ হাজার, সিলেট বালি, আস্তর বালি ও ভিটি বালি বাবদ ১০ হাজার, ইট বাবদ ৫০ হাজার, দোকান ভাড়া, আসবাবপত্র, ট্রেড লাইসেন্স ও আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ ২০ হাজার আর বাকি ২০ হাজার টাকা হাতে রাখতে হবে। ব্যবসায়ী-মহলের পরামর্শ, হালকা বাকিতে পুঁজি-ঘাটতি কাটাতে জরুরি মুহূর্তে ব্যবসার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে সতর্কতা হিসেবে এ ব্যবস্থা। ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে নির্মাণ-সামগ্রীর অধিকাংশ কোম্পানি দোকানে দোকানে এসে মালামাল সরবরাহের অর্ডার নিয়ে যায়। বিশেষ করে সিমেন্ট উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো। এক্ষেত্রে লেনদেনের স্বচ্ছতা থাকলে এক চালান মাল বিক্রি করে টাকা পরিশোধ করলে পরবর্তী সময়ে আবার নগদ ছাড়াই মাল পাওয়া যায়। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো এমন সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে। যে কারণে নির্মাণ-সামগ্রীর ব্যবসার ধারাবাহিকতা ধরে রাখলে এখন আর বড় ধরনের পুঁজি বিনিয়োগ করতে হয় না ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের। তবে তার আগে ব্যবসায়ীকে লেনদেনের স্বচ্ছতা প্রমাণ করতে হবে। ব্যবসায়ীরা আরও জানান, মাসপ্রতি গড়ে ২০ গাড়ি ইট, ৫ টন রড, ১৫-২০ গাড়ি সিলেট বালি, আস্তর বালি, ভিটি বালি, ২-৪ গাড়ি পাথর-কণা ও ৫০০ ব্যাগ সিমেন্ট বিক্রি করতে পারলে এর বিপরীতে তারা সাকুল্যে লাভ গুনতে পারেন ৩০ হাজার টাকা। এ ক্ষেত্রে তাদের অনুসরণ করতে হয় ক্রেতাদের কাছে মাল নগদে বিক্রি করার কৌশল। তবে নির্মাণকাজের মৌসুমে (অক্টোবর থেকে মার্চ) নির্মাণ-প্রকল্প এলাকায় একটু খোঁজ-খবর রাখলে ওই পরিমাণের চেয়ে আরও বেশি মালামাল বিক্রি করা সম্ভব বলে তারা মনে করেন। অধিকাংশ ব্যবসায়ীর অভিমত, সততা ও স্বচ্ছতা থাকলে কম বিনিয়োগ করেও পুরোদমে এ ব্যবসা করা সম্ভব। তবে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।

সাবরিনা মিলি


নিত্যনতুন যেসব প্রযুক্তির কল্যানে জীবন-যাপন অনেকটা সহজ এবং আরামদায়ক হয়ে উঠেছে, ভিআরএফ তার মধ্যে একটি।
ভিআরএফ মানে ভেরিয়েবল রেফ্রিজারেন্ট ফ্লো বা ভেরিয়েবল রেফ্রিজারেট ভলিউম। এটা এক ধরনের এইসভিআইসি প্রযুক্তি। ১৯৮২ সালে ডাইকিন ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডকর্তৃক উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তি অনেকটা সেন্ট্রাল এসি সিস্টেমের মতো। তবে এক্ষেত্রে পাওয়া যায় কিছু বাড়তি সুবিধা। ধরা যাক, একটি শপিংমলে ৫০টি দোকান আছে। সেখানে যদি সেন্ট্রাল এসি ব্যবহার করা হয় তাহলে সব জায়গায় একই তাপমাত্রা থাকবে। কিন্তু ভিআরএফের মাধ্যমে মেশিন একটা হলেও সেটা দিয়েই প্রত্যেক দোকানের তাপমাত্রা আলাদাভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে ইনডোরের জন্য একটা আর আউটডোরের জন্য আরেকটা বক্স থাকবে। এটার মাধ্যমে সাড়ে ১৭ টন থেকে শুরু করে হাজার টন পর্যন্তও ইনডোর থেকে বাতাস বের করা সম্ভব। এর মাধ্যমে তিন রুমের জন্য তিনটি এসির বদলে একটা মেশিন দিয়েই কাজ চালানো যায়, যেটা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে কেন্দ্রীয়ভাবে। মোবাইল ফোন দিয়েও তাপমাত্রা ঠিক করে নেয়া যাবে সুবিধামতো।

মো. সিফাত বিন আমিন, এইচভিএসির সহকারী মহাব্যবস্থাপক, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ।

এই ধরনের প্রযুক্তি বড় পরিসরে ব্যবহার করা হয়েছে এর আগে। এখন সেটা দুই হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাটেও কাজে লাগানো সম্ভব। ব্যাপারটা বাংলাদেশে খুব একটা পরিচিত হয়ে না উঠলেও দুই-এক বছরের মধ্যেই সর্বসাধারণের কাছে পৌঁছে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে উদ্যোক্তাদের।
রাজধানীর অভিজাত হোটেল সোনারগাঁও কিংবা শেরাটনে ব্যবহার করা হয়েছে চিলার সিস্টেম, যেটা বেশ পুরনো প্রযুক্তি। ১৯৮২ সালে আবিষ্কার হওয়ার পর এটার কার্যকারিতা দেখে স্যামসাং-এলজির মতো প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলো আগ্রহ প্রকাশ করে।

কেন এই প্রযুক্তি ভবনে ব্যবহার করবেন?
উদ্যোক্তাদের দাবি, ভিআরএফ ব্যবহারে ৪০ শতাংশ কম বিদ্যুত লাগবে। ধরা যাক, একটা ফ্ল্যাটের তিন রুমে তিনটি এসি। এক্ষেত্রে একেকটি রুম থেকে যদি ৪০ শতাংশ বিদ্যুত বাঁচানো যায় তাহলে সব মিলিয়ে সাশ্রয়ের খাতাটা বেশ ভারীই হবে। শুধু তা-ই নয়, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটা মেশিনের মাধ্যমে তিন বেডরুমসহ ড্রইং-ডাইনিং সবখানে ঠান্ডা বাতাস পৌঁছে দেয়া সম্ভব। যেখানে সাধারণ এসিতে বাইরের মেশিনের সঙ্গে ভেতরেরটির সংযোগকারী পাইপের দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ ১৫ মিটার রাখা যায় সেখানে এই প্রযুক্তিতে ২২৫ মিটার পর্যন্ত দূরে মূল মেশিন রাখা সম্ভব। আপনি চাইলে আপনার মেশিনটি ছাদেও বসাতে পারবেন। ফলে ভবনের বাহ্যিক সৌন্দর্য্য রক্ষা করা পাবে অনায়াসে।
ভিআরএফের কাজ সেন্ট্রাল এসির মতো হলেও এটার ব্যবহার তুলনামূলক অনেক সহজ। সেন্ট্রাল এসির ক্ষেত্রে মোটা পাইপ ব্যবহার করতে হলেও এক্ষেত্রে চিকন পাইপ দিয়ে কাজ চালানো সম্ভব। কুলিং টাওয়ারের পরিবর্তে ছাদে একটা মেশিন রাখলেই থাকছে না আর কোনো বাড়তি ঝামেলা।
সাধারণ এসির তুলনায় এই প্রযুক্তির দাম কিছুটা বেশি। একটি বাসায় প্রতি টন এসির জন্য এখন খরচ করতে হয় প্রায় ৫৫ হাজার টাকা। কিন্তু ভিআরএফের ক্ষেত্রে প্রতি টনে খরচ পড়বে ৮৮ হাজার টাকা। কিন্তু ভিআরএফের উদ্যোক্তারা বলছেন, সাধারণ এসির ক্ষেত্রে যেখানে বড়জোর পাঁচ বছর পর্যন্ত কোনো মেরামত ছাড়া চালানো সম্ভব, ভিআরএফের ক্ষেত্রে সেই মেয়াদটা ২০ বছরের বেশি। সব মিলিয়ে হিসেবে করে দেখা গেছে, পুরো সিস্টেমের খরচ ৭/৮ মাসের মধ্যে এর ক্রেতা তুলে ফেলতে পারবেন।

বাংলাদেশে ভিআরএফ
ভিআরএফ বাংলাদেশে গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছতে শুরু করে বছর তিনেক আগে। বর্তমানে গার্মেন্টস ভবনগুলোতে এর ব্যবহার শুরুর চেষ্টা চলছে। আন্তর্জাতিক উদ্যোগের কারণে গার্মেন্টস ভবনগুলো গ্রিন বিল্ডিং না হলে ক্রেতারা অর্ডার দিতে অনীহা দেখায়। সে কারণেই গার্মেন্টস-মালিকরা ভিআরএফের ব্যাপারে আগ্রহী হতে পারেন। কারণ সাধারণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় প্রচুর পরিমাণে সিএফসি গ্যাস নির্গত হয়। ভিআরএফে যেটা অনুপস্থিত।
বাংলাদেশে ভিআরএফ প্রযুক্তি ব্যবহারে বর্তমানে এগিয়ে আছে গুলশান-বনানী এলাকার বাণিজ্যিক ভবনগুলো। তার পরেই আছে গার্মেন্টস কারখানা। এরপর হোটেল-রেস্টুরেন্ট আর হাসপাতাল। চট্টগ্রামের জিপিএইচ ইস্পাতের দশতলা কর্পোরেট অফিস ও ফ্যাক্টরি বিল্ডিংয়ে বর্তমানে এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। সেখানে বসানো হয়েছে প্রায় সাড়ে ৬০০ টনের ভিআরএফ। এছাড়া চট্টগ্রামেই কেএসআরএমের একটি ভবনেও ব্যবহার করা হয়েছে এই প্রযুক্তি। ফেনীতে নকশী টাওয়ার নামে একটি প্রজেক্টের নির্মাণ-কাজ চলছে, যেখানে একই সঙ্গে থাকছে হোটেল, হাসপাতাল ও শপিং কমপ্লেক্স। এমন ধরনের প্রজেক্ট বাংলাদেশে এই প্রথম যেখানে ব্যবহার করা হচ্ছে ভিআরএফ।
এইচভিএসির সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. সিফাত বিন আমিন কারিকাকে বলেন, ‘প্রাণ-আরএফএল কোম্পানি তাদের পণ্যের গুণগত মানের মাধ্যমে বাজারে শীর্ষস্থানে থাকতে চায়। এর আগে আমরা চিলার নিয়ে কাজ করেছি। গত তিন বছর এই ভিআরএফ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভিআরএফ প্রযুক্তির মেইটেনেন্সের দরকার হয় কয়েকটা ক্ষেত্রে। প্রথমত ফিল্টার পরিষ্কার করতে হয়। এছাড়া পাওয়ার লাইন মেশিন যেখানে বসানো হয় সে জায়গার কোনো সমস্যা হতে পারে। সেক্ষেত্রে প্রাণ-আরএফএল তাদের ক্রেতাদের প্রথম এক বছর বিনামূল্যে সার্ভিস দিয়ে থাকে। এরপর চুক্তিতে আসতে হয়। একটা নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে কোম্পানি এই সার্ভিস দিয়ে থাকে। টাকার অঙ্কটা এলাকা ও মেশিনের টনের ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়।’

কামরুজ্জামান কাজল


ইট-পাথরে মুড়ে থাকি সারাক্ষণ। ঘরে-কর্মক্ষেত্রে। কিন্তু মন আকুল হয়ে থাকে একটুকু সবুজের জন্য। ঘর তো আমরা নানাভাবেই সাজাই। কিন্তু একটু পরিকল্পনা করে যদি ঘর সাজাই তাহলে আমাদের ছোট্ট নীড়েও দেখা মিলবে সবুজের। প্রশান্তিতে থাকবে আমাদের চোখ-মন।
সবুজে কীভাবে সাজিয়ে নেব ঘরটাকে? নানান দিকনির্দেশনা দিয়েছেন ফারজানা’স ব্লিজ-এর সত্ত্বাধিকারি ফারজানা গাজী। তিনি জানান, ইচ্ছা আর চেষ্টা থাকলে নিজের ঘরটিকে সাজিয়ে তুলতে পারেন বাহারি উদ্ভিদ দিয়ে। ছায়ায় বেঁচে থাকে এমন অনেক উদ্ভিদ ঘরের ভেতরে টবে লাগানো যায়। এসবের (ইনডোর প্ল্যান্টস) মধ্যে আইভি লতা, পাতাবাহার, মানি প্ল্যান্ট, ফাইলো ডেনড্রন, ড্রাসেনা, ক্রোটন, বাহারি কচু, পাম, অ্যানথুরিয়াম, ডাইফেনবেকিয়া, ম্যারান্টা, মনস্টেরা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

জেনে নিন সবুজে ঘর সাজানোর কিছু উপায়-
• ঘরের প্রবেশ পথে ক্যাকটাস বা রোদ ছাড়া টবে বাঁচতে পারে এমন কিছু গাছ লাগানো যায়। এতে অতিথিরা বাড়িতে আসা মাত্রই আপনার সুরুচির পরিচয় পাবেন।
• গৃহের সৌন্দর্যের মূল ব্যাপারটি যেন বসার ঘরকে কেন্দ্র করে। আমরা এই বসার ঘরটিতে কত রকমের দেশি-বিদেশি শো-পিস দিয়েই তো সাজাই। কিন্তু প্রাকৃতিক দিক চিন্তা করে একবার যদি সবুজ গাছ-পাতা ও ফুল দিয়ে সাজাতে পারি তাহলে একই সঙ্গে ঘরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব-উভয়েরই সমন্বয় ঘটবে। আর বসার ঘরে মানিপ্ল্যান্ট বা ছোট আকৃতির গাছ থাকলে দেখতেও বেশ ভালো লাগবে।
•  আপনার বাসার খাবার ঘরটিতে যদি ছোট একটা টবে লেটুস বা ধনেপাতার মতো গাছ রোপণ করতে পারেন তাহলে এর সুগন্ধে খাবার সময় আপনার ভালোলাগাটা বাড়বে। এছাড়া অন্য কোনো গাছের ব্যবহারও বাড়িয়ে দিতে পারে আপনার ডাইনিং রুমের সৌন্দর্য।
•  শোবার ঘরের বিছানার পাশে সামান্য ফাঁকা জায়গা থাকলে সেই জায়গাটাও কাজে লাগাতে পারেন। সেখানে এমন কোনো গাছ লাগাতে পারেন, যা কিনা একই সঙ্গে ঘরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি আপনার বিশেষ কোনো কাজেও লাগবে। যেমন তুলসীর মতো ছোট্ট গাছটিই লাগিয়ে দেখুন কি চমৎকার কাজে আসবে তার চাক্ষুস প্রমাণ পেয়ে যাবেন। ঘরে তুলসীগাছ থাকলে মশার আনাগোনা রীতিমত কমে যায়। আবার কখনো কখনো থাকেও না। অন্যদিকে ঠা-া-কাশিতে তুলসীর রস বেশ উপকারি।
• আপনার রান্নাঘরে যদি কিঞ্চিত জায়গা থাকে তাহলে সেখানেই একটা মরিচ গাছ লাগিয়ে দিন। নিজের হাতে লাগানো গাছের দুটি মরিচ সালাদ করে খেয়ে দেখুন কি অমায়িক তৃপ্তি পাচ্ছেন! সুতরাং এই স্বাদ নিতে ভুল করবেন না যেন।

•  আধুনিক অ্যাপার্টমেন্টগুলোতে বসবাসকারী মানুষের উঠোনের চাহিদা মেটাতে ভরসা করতে হয় ছোট্ট বারান্দার মাধ্যমে। এখানকার ছোট পরিসরটুকু কাজে লাগিয়ে আপনি পেতে পারেন খানিক প্রশান্তি। পছন্দমতো গাছ কিনে এনে গাছে গাছে ভরে তুলুন আপনার অবসরে একটু প্রশান্তির আশ্রয়স্থলটুকু। যেন ভোরে ঘুম ভেঙে এখানে এসেই সারাদিনের জন্য অন্তত কিছুটা হলেও জীবনীশক্তি সঞ্চয় করে নিতে পারেন।
•  যদি আপনার নিজের একটা বাড়ি থাকে তাহলে তো সোনায় সোহাগা। চাইলেই ছাদে আপনি আপনার পছন্দের ফল-ফুল কিংবা ঔষধি গাছও লাগাতে পারেন।

একটু বুদ্ধি খাটিয়ে আমরা যদি ঘরে কিছু ঔষধি গাছ রাখতে পারি তাহলে ঘরের দূষিত বাতাস থেকেও মুক্তি মিলবে। ঘরে কিছু স্বাস্থ্যকর গাছ রাখলে তা ঘরের বাতাস থেকে ক্ষতিকর পদার্থ শুষে নিয়ে স্বাস্থ্যকর আবহাওয়া তৈরি করতে সাহায্য করে। এমনই কিছু গাছের কথা জেনে নিন-
মানি প্ল্যান্ট
ঘরের ফ্রিজ কিংবা অন্যান্য যন্ত্র যা থেকে প্রতিনিয়ত সিএফসি গ্যাস নির্গত হয়, তা আমাদের বুকে ব্যথা এবং গলার খুসখুসে কাশির জন্য দায়ী। এমনকি এই সামান্য গ্যাসও বুকে ব্যথা ও গলা খুসখুস তৈরি করে। প্যান স্টেটের গবেষকদের মতে, বাসাবাড়িতে মানি প্ল্যান্ট রাখলে এটি ক্ষতিকারক সিএফসি এবং ওজোন গ্যাস শুষে নিয়ে আমাদের রক্ষা করে। তাই ঘরে রাখুন এই মানি প্ল্যান্ট।

পুদিনা
ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব নিউরোসায়েন্সের একটি গবেষণায় জানা যায়, পুদিনা গাছ মস্তিষ্ককে সচল রাখতে এবং স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। এর সঙ্গে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ এবং ওজন নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে ঘরের কোণে রাখা পুদিনা গাছ।

ইংলিশ আইভি
বেশিক্ষণ কম্পিউটার বা অন্যান্য মেশিন ব্যবহার করলে আমাদের মাথাব্যথা শুরু হয়। এর কারণ হচ্ছে, কম্পিউটার বা অন্যান্য মেশিন থেকে কিছু উদ্বায়ী কেমিক্যাল বাতাসে মিশে যায় যা আমাদের নিঃশ্বাসের সঙ্গে মস্তিষ্কে যায় এবং মাথাব্যথার সৃষ্টি করে। ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়ার একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ইংলিশ আইভিনামক এই গাছটি বাতাস থেকে ক্ষতিকর কেমিক্যাল শুষে নেয়। ফলে ঘরের ভেতরকার বাতাস থাকে স্বাভাবিক। তাই ঘরের একটি সুন্দর টবে লাগিয়ে দিতে পারেন এই গাছটি।

লেমন বাম
আমরা যখন মানসিক চাপে থাকি তখন এই লেমন বামনামক গাছটি আমাদের সাহায্য করবে। ওহিও স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষণা অনুযায়ী, এই গাছে রয়েছে একপ্রকার সুগন্ধ যা মস্তিষ্কে এন্ডোরফিন-নামক ভালোলাগার হরমোনের নিঃসরণ ঘটায়। এই হরমোন মানুষের মানসিক চাপ বা দুঃখ কমিয়ে হাসিখুশি করে তুলতে সাহায্য করে।

বাটারফ্লাই পাম গাছ
আমাদের দেশে এটি খুবই জনপ্রিয় একটি ঘরোয়া গাছ। বাসার দরজা-জানালা খোলা রাখার ফলে আশেপাশের ক্ষতিকর দূষিত বাতাস ঘরে ঢুকলে এই গাছটি সেই বাতাস শোধন করতে সাহায্য করে। তাই ঘরের এক কোনে রাখতে পারেন এই গাছটি।

সঙ্গে একটু সচেতনতা
গৃহসজ্জায় গাছ লাগাতে হলে একটু বাড়তি সতর্কতারও প্রয়োজন আছে। লক্ষ্য রাখতে হবে যেন টবের গোড়ায় পানি না জমে। এছাড়া গাছগুলো যদি ছায়ায় রাখা হয় তাহলে সময় করে মাঝে মাঝে আপনার সুবিধামতো সময়ে গাছকে কিছু সময়ের জন্য রোদে দিতে পারেন। এতে আপনার গাছগুলো আরো বেশি ভালো থাকবে।

খালিদ জামিল


পরিবেশগত বা অন্য কোনো কারণে একটি বিশেষসংখ্যক মানুষের পুনর্বাসনের চাহিদা থেকে এসেছে ‘পাবলিক হাউজিং’য়ের ধারণা। এটার উদ্দেশ্য বেশ ইতিবাচক হলেও সব ক্ষেত্রে পাবলিক হাউজিং সাফল্য পায়নি। সত্যি বলতে, প্রথম দিকের হাউজিং প্রজেক্টগুলোর একটিকেও সফল বলা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে ওইসব এলাকায় অপরাধের হার বেড়ে গেছে কিংবা জমজমাট হয়ে উঠেছে মাদক-ব্যবসা। সবচেয়ে বড় সমস্যাটা হলো, হঠাৎ করে একটি এলাকায় নতুন একটি হাউজিং প্রজেক্ট গড়ে উঠলে সেখানকার নতুন বাসিন্দারা আশপাশের মানুষের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন না।
তবে ভিন্ন দৃষ্টান্তও আছে। কিছু প্রজেক্ট রীতিমতো প্রমাণ করেছে স্থাপত্যবিদ্যা এর আওতার বাইরের অনেক প্রশ্নেরও উত্তর দিতে পারে। এদিক দিয়ে এগিয়ে থাকা পৃথিবীর সেরা তিন পাবলিক হাউজিং প্রজেক্ট নিয়ে এবারের আয়োজন।

১. কুয়াইসাইড ভিলেজ, কানাডা
এ প্রজেক্টে মোট ১৯টি আবাসিক ইউনিট রয়েছে, যার মধ্যে পাঁচটি আলাদাভাবে সীমিত আয়ের মানুষের ক্রয়সীমার মধ্যেই রাখা হয়েছে। সামাজিক পার্থক্যকে কমিয়ে আনার চিন্তা থেকেই নেয়া হয় এমন উদ্যোগ। প্রতিটি ইউনিট ১ থেকে ৩ বেডরুমের অ্যাপার্টমেন্ট এবং সবগুলোই হুইল চেয়ার প্রবেশের উপযোগী করে তৈরি।

যে বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণে প্রজেক্টটি সেরা
• পুরো প্রজেক্টটি করা হয়েছে এক হাজার বর্গমিটারের মধ্যে, যাতে শক্তির সাশ্রয় হয়।
• স্থানীয় বাজার থেকে শুরু করে বাসস্টপ, রেস্টুরেন্ট ও পার্কসহ এমন সবকিছুই পায়ে হাঁটা দূরত্বে। তাই মূল শহুরে জীবন থেকে এখানকার বাসিন্দাদের কখনোই আলাদা হতে হয় না।
• হাউজিংয়ে রয়েছে ২৩২ বর্গমিটার কমন স্পেস আর ৬০ বর্গমিটার বাণিজ্যিক অংশ।
•হাউজিংয়ের কমন রান্নাঘর, লন্ড্রি আর ডাইনিং রুমও আছে যেখানে বিভিন্ন উপলক্ষে সিনেমা প্রদর্শন করা হয়।
•সব ইউনিট তৈরিতেই ব্যবহৃত হয়েছে এই সাইটেই পাওয়া পুরনো উপকরণ। যেমন- রঙিন কাচ, কাঠের দরজা, ওক কাঠের মেঝে ইত্যাদি।
• যেসব পরিবারে বাচ্চা আছে তাদের জন্য নিচের দিকের ইউনিটগুলো বরাদ্দ করা হয়েছে। শিশুদের জন্য আলাদাভাবে নিরাপদ খেলার জায়গারও বন্দোবস্ত আছে এখানে।
• ওপরের দিকের বাসাগুলো থেকে ভ্যানকুয়েভার ডাউন-টাউন আর পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখা যায়।
• প্রায় সব ইউনিটের মূল দরজাই উঠোনের মতো একটা জায়গার দিকে মুখ করা, যেখানে ফুলের বাগান করা হয়েছে। এখানে বাসিন্দারা নিজেদের খাওয়ার জন্য সবজিও উৎপাদন করতে পারে।
• হাউজিংয়ের অনেককিছুই নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হয়। তবে বাসিন্দাদের নিজেদের মতো করে জীবনযাপন করতে সমস্যা হয় না। সবার পারিবারিক গোপনীয়তার বিষয়টি মাথায় রেখেই এ হাউজিংয়ের নকশা করা হয়েছে।
• সাধারণ হাউজিংয়ের মতো এখানে ডাস্টবিন নেই। বর্জ্যরে ধরন ভেদে আলাদা বিন রাখা আছে। প্রতিটির ওপর লেবেল লাগানো রয়েছে, যাতে সবাই বুঝতে পারে কোথায় কী ফেলতে হবে।
• পানির অপচয় রোধ করতে বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে পয়ঃনিষ্কাশন-ব্যবস্থা। রান্নাঘরের সিঙ্ক, বাথটাব ও লন্ড্রিতে যে পানিটা খরচ হয়, সেটা পুনরায় ব্যবহার করা হয় টয়লেট ফ্ল্যাশ করার কাজে।
• এ হাউজিং প্রজেক্টে বাস করেন সমাজের নানা স্তরের মানুষ। তবে সবাইকে একত্রিত করতে সপ্তাহে অন্তত একবার একটা উৎসবের মতো আয়োজন করা হয়।

২. সাভনারি হেইম্যানস পাবলিক হাউজিং, ব্রাসেলস
এটা শতভাগই পাবলিক হাউজিং স্কিম, যেটা নির্মাণ করেছে এমডিডব্লিউ আর্কিটেকচার। ব্রাসেলসের গার্ডেন প্যালেস থেকে মাত্র আধা মাইল দূরে এর অবস্থান। নির্মাণ করা হয়েছে মূলত এক সময়ের সাবান কারখানাকে রূপান্তর করে। বর্তমানে এখানে আছে ৪২টি হাউজিং ইউনিট। মানের দিক থেকে অবশ্য সবগুলো এক পর্যায়ের নয়। আছে ১ থেকে ৬ বেডরুমের অ্যাপার্টমেন্টও। কোনোটিকে বলতে হবে চিলেকোঠা, কোনোটি আবার ডুপ্লেক্স। এ ভিন্নতা গোটা কমপ্লেক্সের ভবনগুলোকে আরো বৈচিত্র্যপূর্ণ করে তুলেছে। কোনো কোনো অংশ একেবারেই নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে। কিছুক্ষেত্রে আবার আগেরটার খানিকটা পরিবর্তন করে দেয়া হয়েছে নতুন রূপ। এ বৈচিত্র্যই জানান দেয় ব্রাসেলসের মতো একটি শহরের নানান শ্রেণির মানুষের কথা।
প্রজেক্টটিতে রয়েছে নানা ধরনের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা। লাইব্রেরি, ছোট বাগান, খেলার মাঠ, ত্রিমাত্রিক ল্যান্ডস্কেপ পার্ক আর হাঁটার জন্য রাস্তা। সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য আছে বিশেষ ব্যবস্থা। পুরো কমপ্লেক্সটি কাচের আবরণ দিয়ে ঘেরা। যে কারণে সারাবছর এর প্রতি বর্গমিটার উষ্ণ রাখতে খরচ হয় মাত্র ১৫ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ। ছাদে রয়েছে ৬০ বর্গমিটার আয়তনের সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল। বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্যও আছে বিশেষ ব্যবস্থা। রান্না আর গোসলের পানিও সংরক্ষণ করা হয় টয়লেটে ব্যবহারের জন্য। এক সময় যেটা সাবান কারখানার চিমনি ছিল সেটা এখন বেজমেন্টের ভেন্টিলেশন সিস্টেমের অন্যতম অংশ।
হাউজিং কমপ্লেক্সটি ঘনবসতিপূর্ণ হলেও একসঙ্গে শহরের কেন্দ্রে কীভাবে বাস করা যায় সেটা এখানকার বাসিন্দারা দেখিয়েছেন দারুণভাবেই।


৩. কুইনটামনোরি হাউজিং, চিলি
এটা কুইনটামনোরি এলেমেন্টা কোম্পানি নির্মিত প্রথম বিখ্যাত হাউজিং প্রজেক্ট। চিলির স্থপতি আলেজান্দ্র্রো আরাভেনাকে সরকার দায়িত্ব দিয়েছিল ৫ হাজার বর্গমিটারের মধ্যে ১০০ পরিবারের বসবাসের বন্দোবস্ত করার। ওই পরিবারগুলো চিলিতে ৩০ বছর ধরে অবৈধভাবে বাস করে আসছিল। কঠিন এই কাজটার প্রত্যেক পর্যায়ে তিনি দারুণ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন।

অসুবিধাগুলো
• শহরের এমন একটা জায়গায় এর অবস্থান, যে-কারণে জমির দাম অনেক বেশি। তারপরও আলেজান্দ্রো চেয়েছেন প্রজেক্টের সব বাসিন্দা যেন শহরের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারে। এছাড়া প্রজেক্টের অবস্থানের কারণে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এখানে থাকা সব ধরনের সম্পদের দামই বাড়ছে দ্রুতগতিতে। প্রজেক্ট বাস্তবায়নের সময় এ বিষয়টাও মাথায় রাখা হয়েছে।
• প্রতি পরিবারকে সরকার ৭,৫০০ ডলার করে ভাতা দেয়, যেটা ওই জমি ও অবকাঠামোর দাম পরিশোধের জন্য যথেষ্ট নয়। আর বাজেট কম থাকায় প্রজেক্ট নির্মাণ করতে হয় ৩০ বর্গমিটারের মধ্যে।
• প্রত্যেকের জন্য আলাদা বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে গেলে দরকার হচ্ছিল অতিরিক্ত জমির। ভার্টিক্যাল হাউজিংয়ে জায়গা লাগছিল প্রচুর। কিন্তু আলেজান্দ্রো এমনভাবে জমির ব্যবহার করলেন যাতে যতটুকু জমির ওপর ঘর বানানো হয়, তারচেয়ে দ্বিগুণ জায়গা পাওয়া যায় ভেতরে।

সমাধান
• প্রথমত তারা ভুলেই গেল, এগুলো কোনো মধ্যবিত্ত পরিবারের ঘর হবে। যেন তাদের বাজেট ৭ হাজার ৫০০ নয়, ৭ লাখ ৫০০ ডলার!
• প্রতিটা বাড়ি হলো ৭২ বর্গমিটারের মধ্যে, অথচ এর অর্ধেক টাকা দেয়ার মতো ক্ষমতাও পরিবারগুলোর ছিল না। প্রথমে বাড়িতে একেবারেই মৌলিক বিষয়গুলো রাখা হলো, যেমন- রান্নাঘর, বাথরুম, দুই ঘরের মধ্যকার বিভাজন, সিঁড়ি ইত্যাদি।
• বাড়িগুলো কেবল নিচতলা আর দোতলা বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়, যাতে দুইতলার বেশি কেউ বাড়ি তুলতে না পারে। তবে প্রতিটি বাড়ির সঙ্গে তার সমপরিমাণ জায়গা খালি রাখা হয়েছে, যাতে এর মালিক পরবর্তীতে প্রয়োজন ও আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় নিজের বাসস্থানের আয়তন বাড়িয়ে নিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে নিজের বাড়ির নকশা আর রঙও এর ক্রেতারা পছন্দ করে নেয়ার সুযোগ পেয়েছেন।

প্রজেক্টের ধরনের কারণে বাসিন্দারা এটাকে নিজেদের সম্পদ ধরে নিয়ে যতেœর সঙ্গে ব্যবহার করেন। নির্মাণের এক বছরের মাথায় প্রতিটি ইউনিটের দাম হয়ে যায় দ্বিগুণেরও বেশি।

সাবরিনা মিলি


ঢাকা সেনানিবাসের কাছেই গড়ে উঠেছে বিজয় রাকিন সিটি। এটাকে বলা হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের কনডোমিনিয়াম প্রজেক্ট বা ‘গেইটেড কমিউনিটিসিটি’।অত্যাধুনিক এই আবাসন প্রকল্পে থাকছে আলো-বাতাসের যুগলবন্দি আর মুক্ত পথ চলার নিরাপদ সুব্যবস্থা।
রাজধানীর মিরপুর ১০ থেকে প্রকল্পটি ১০ মিনিটের দূরত্ব। অভিজাত এলাকা গুলশান থেকে ২০ মিনিট, বনানী থেকে ১৫ আর বিমানবন্দর থেকে মাত্র ৩০ মিনিটেই যাওয়া যাবে রাকিন সিটিতে।
এখানে আছে বিশ্বমানের একটি করে নার্সারি, প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি স্কুল। এছাড়া আছে ছয় তলা সুদৃশ্য মসজিদ, ১২ তলা সুবিশাল কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, ১২ তলা কমিউনিটি বিল্ডিংসহ ব্যাংক, এটিএম বুথ, চারটি খেলারমাঠ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত সুইমিংপুল, টেনিস ও বাস্কেটবল কোর্ট এবং সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থাসহ সকল সুবিধা।
কমার্শিয়াল কমপ্লেক্সটির প্রতি ফ্লোরে থাকছে চারটি করে ইউনিট।এগুলোকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ‘এ’ ক্যাটাগরিতে আছে ১৮৭২ বর্গফুট, ‘বি’ক্যাটাগরিতে ১৫৫৩ বর্গফুট। অন্য একটি ভবনে আছে ৮হাজার বর্গফুটের ফ্লোর। এই প্রজেক্টে অবশ্য কোনো হোটেল রাখা হয়নি।
রাকিন সিটি গড়ে তোলা হচ্ছে ৫০ বিঘা জমির ওপর,যার ৪০ শতাংশের বেশি জায়গা খালি থাকবে। আবাসিক ভবনের সংখ্যা ৩৬। বিল্ডিং কোড মেনে নির্মিত প্রতিটি ভবন ১৫তলা বিশিষ্ট। প্রতিটিতে থাকবে ছাদ বাগান। এছাড়া দুটি করে লিফট ও সিঁড়ি আর অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা তো আছেই।প্রকল্পের প্রায় ৬০শতাংশ উন্মুক্তজায়গা  এবং ৬০ ফুট প্রশস্ত রাস্তা, থাকছে টাইলস নির্মিত ফুটপাতও। এখানে রয়েছে পরিকল্পিত গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। রাকিন সিটিকে ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং করা হবে সিসিটিভি ক্যামেরা দিয়ে।
রাকিন সিটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের চিফ অপারেটিং অফিসার কারিকাকে বলেন, ‘সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ-ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে নিজস্ব ডেসকোসাব স্টেশন আছে আমাদের রকল্পে। গ্যাস ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে রয়েছে নিজস্ব এলপিজি সাপ্লাই নেটওয়ার্ক। নিজস্ব সুয়্যারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ব্যবস্থাও (এসটিপি) রয়েছে এখানে।’
তিনি জানান, চলতি বছরের শেষের দিকেই ফ্ল্যাট হস্তান্তর শুরু হবে।

তাসনুভা রাইসা


সাধারণ মানুষ ‘আকাশ’কে আকাশ বলে কিন্তু একজন স্থপতি আকাশকে বলবে নীলিমা, তাদের দৃষ্টির সুদূরে সেটি শুধু আকাশ না, এটি একটা রঙ, যা বদলায় মেঘে বা রোদে। আর যে আকাশকে নীলিমা বলে, সে যখন কোনো স্থাপনার নকশা করেন, তার ভেতর দিয়েই সেই নীলিমা কীভাবে উপভোগ করা যায়, সেই ভাবনা দিয়ে স্থাপনায় সাহিত্য রচনা করেন। স্থপতি সুদূরের পিয়াসী, তারা কোথাও কোনো স্থাপনা থাকলে সেটাও দেখেন আর না থাকলেও দেখেন, কী হতে পারে শূন্য জায়গায়? ‘They Look up’. স্থপতিদের কাজকে চিহ্নিত করার জন্য আমেরিকা ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্ট ২০১৪ সালের শেষের দিকে আবার একটি ক্যাম্পেইনও চালায় ‘I Look up’ নামে যার মূল উদ্দেশ্য ছিল স্থপতির কাজকে চিহ্নিত করা। জীবনের চারপাশ ছুড়ে স্থপতিরা বিস্তৃত।
স্থাপত্য এবং ভ্রমণ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যে স্থপতিকে চেনে, সে জানে কেন তিনি সন্ধান করেন, কেন ভ্রমণ করেন। খাঁচার ভেতর অচিন পাখির আসা-যাওয়াটাকে মনবেড়ি দিয়ে পায়ে বেঁধে রাখতে জানে।
স্থপতি ভ্রমণের উদ্দেশ্য ও পছন্দ তা আলাদা, এ লেখায় স্থপতিদের প্রিয় কিছু স্থান নিয়ে আলোচনা করা হলো-

স্থাপত্য উদ্ভাবনের জন্য শিকাগো

The mother art is Architecture. Without Architecture of our own we have no soul of our own civilization.

-Frank lloyed wright
আধুনিক আমেরিকান জীবনযাপনের দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা শিকাগো থেকে এবং শুরু করেন আমেরিকার স্থাপত্যকে সামনে নিয়ে আসা স্থপতি ফ্রাংক লয়েড রাইট। শিকাগোর ওক পার্ক স্টুডিওতে বসে স্থপতি রাইটের উদ্ভাবন ‘প্রেইরি স্টাইল’ শিকাগোর স্থাপত্য ও নকশার জন্য ছড়িয়ে পড়া বিশ্বখ্যাতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। বিশ্বে তথা আমেরিকায় রাইটের স্থাপত্যকর্মের সিংহভাগ এই শিকাগো শহর আর শহরতলিতে। তার নকশায় ‘দ্য রুকারি লাইট কোর্ট’ শিকাগোর অন্যতম ল্যান্ডমার্ক স্থাপনা, যার ভেতরের আলো ঝলমলে ইন্টেরিয়র সজ্জাও তিনি করেছেন, এছাড়া রবি হাউজ, ইউনিটি টেম্পলের রয়েছে আলাদা নান্দনিকতা। শিকাগো সিটিতে ‘ফ্রাংক লয়েড রাইট ট্রাস্ট’ একটি ট্যুরও পরিচালনা করে তার এসব স্থাপত্যের গল্পগুলো, ভাবনাগুলো, চেতনাগুলো, উদ্ভাবন, নান্দনিকতাগুলো তরুণ স্থপতি এবং দর্শনার্থীদের ভেতর ছড়িয়ে দিতে।
এই শিকাগোকে বলা হয় ‘City of Skyscrapers’ ১৮৭১ সালে শহরটিতে আগুন লেগে ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হলে ওই সময়ে ইন্স্যুরেন্স ভবনের জন্য ১০তলা ভবন নির্মাণের মাঝ দিয়ে উঁচু ভবন নির্মাণের যাত্রাশুরু। তারপর থেকেই উঁচু দালানের স্থাপত্যচর্চায় নানা নিরীক্ষার জন্য শিকাগো খ্যাতি অর্জন করে স্থপতি ফ্রাংক লয়েড রাইটের হাত ধরে এবং পরে স্ট্রাকচারাল আর্টিস্ট এফ আর খানের যুগান্তকারী উদ্ভাবন শিকাগোর সুউচ্চ ভবনগুলো আকাশ ছুঁতে চাইল। নির্মিত হলো জন হ্যানকুক সেন্টার, সিয়ার্স টাওয়ার, যা ২৫ বছর ধরে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন হিসেবে পরিচিত ছিল। এই সময়ে চমক জাগানো বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ভবনের মধ্যে একুয়া টাওয়ারকে দেখলে একে ভবনের চেয়ে ভাস্কর্য বলে মনে হবে বেশি। আরও আছে স্পারটাস ইনস্টিটিউট ভবনের গøাসের জ্যামিতিক প্যাটার্নের ব্যবহার, যা শিকাগোর স্থাপত্যের উদ্ভাবনী স্থাপত্যশৈলীরই নিদর্শন।

ব্রাসিলিয়ায় পরিকল্পিত নান্দনিকতা

When we strive to become better than we are, everything around us becomes better too.

-Paulo coelho
বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিক পাউলো কোয়েলহোর জন্ম, বেড়ে ওঠা ব্রাজিলে, তার পজিটিভ দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে অনুপ্রাণিত, আর ব্রাজিলের রাজধানী ব্রাসিলিয়াকে নান্দনিক রূপ দেয়ার ক্ষেত্রে ব্রাজিলিয়ান স্থপতি অস্কার নেইমারও চেয়েছিলেন তাঁর শহরটির জন্য সুন্দর পরিকল্পনা। তাঁর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন প্রচেষ্টায় শহরের স্থাপত্যশৈলীর পরিকল্পিত বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে।
পঞ্চাশ পরবর্তী আধুনিক স্থাপত্যচর্চায় ব্রাজিলের রাজধানী ‘ব্রাসিলিয়া’য় গৌরবোজ্জ্বল সব নিরীক্ষণ করেছেন স্থপতি অস্কার নেইমার। ‘ক্যাথেড্রাল মেট্রোপলিতানার’ মুকুটসদৃশ স্থাপনায় ১৬টা প্যারাবলিক কংক্রিট কলাম দেখলে মনে হবে স্বর্গের দিকে ক্রমেই ধাবমান। পাশেই রয়েছে ব্রাজিলের জাতীয় জাদুঘরের আইকনিক সাদা ডোম বিল্ডিং, যাকে এক নজর দেখলে সাই-ফাই মুভির কোনো একটি স্থান বলেও ভ্রম হতে পারে। ব্রাজিলিয়ার প্রেসিডেন্ট ভবন, সংসদীয় ভবন, বিচারিক আদালত ভবন এই তিনটি ভবন মিলে গড়ে উঠেছে ‘থ্রি পাওয়ারস স্কয়ার’, যার স্থাপত্য নকশায় ছিলেন যৌথভাবে লুসিও কস্টা এবং অস্কার নেইমার।
ব্রাসিলিয়া ট্যুরের সময় নেইমারের সবচেয়ে সুন্দর সৃষ্টির ভেতর-বাইরের স্বাদ না নিলেই নয়, তা হলো প্রেসিডেন্টের অফিসিয়াল আবাসস্থল ‘Palacio da Avarado’।

 

একুশ শতকের গগনচুম্বী স্থাপত্যের বিলাসবহুল দুবাই

আরব সাগর ঘেঁষা দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতের পরিচিতি ধনী দেশ হিসেবে আর তার উৎস প্রাকৃতিক সম্পদ তেলের খনি। কিন্তু দেশটির নীতিনির্ধারক শুধু তেলের খনির সমৃদ্ধতাকে অবলম্বন না করে দেশটির পর্যটন শিল্পে বিপুল বিনিয়োগ করলেন। এর কেন্দ্রবিদুতে মরুভুমির বুকে জেগে ওঠা দুবাই। ইতিহাস বলে, আমরাও জানি কোনো দেশের নগর, মহানগর গৌরবান্বিত হয় আইকনিক স্থাপত্যের কারণে। প্রাচীন সভ্যতার আইকনিক স্থাপত্য মরুভুমির বুকে গড়া ওঠা পিরামিড আর এই আধুনিক যুগেও মরুভুমির বুকে আকাশছোঁয়া অবিশ্বাস্য কীর্তির সাক্ষী দুবাই। নিঃসন্দেহে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সবচেয়ে দর্শনীয় ও আকর্ষণীয় স্থান হলো বুর্জ খলিফা (Burj Khalifa)। এটি বিশ্বের সর্বোচ্চ স্কাইস্ক্রেপার বা গগনচুম্বী দালান। দালানটির উচ্চতা ৮২৯.৮ মিটার। স্কাইস্ক্রেপারটি বাড়ি, হোটেল এবং অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর স্থাপত্য নকশায় ছিলেন স্থপতি আদ্রিয়ান স্মিথ, তাঁর ফার্ম স্কিডমোর, ওয়িংস অ্যান্ড মেরিল গগনচুম্বী দালানের নানা উদ্ভাবন এর পথপ্রদর্শক।
দালানটির ১২৪তলার ওপরের অবজারভেশন ডেক থেকে ৩৬০ ডিগ্রি ভিউতে আপনি দেখতে পারবেন পুরো দুবাই এক পাশে ধু-ধু মরুভূমি আর একপাশে ফেনীল সমুদ্র। রাতে রঙিন আলোয় ঝলমলে দুবাই শহর আর তার রাস্তাগুলো সৌন্দর্যের এক নতুন দরজা খুলে দেয়।
সমুদ্রের তীর থেকে ২৮০ মিটার সমুদ্রের ভেতরে কৃত্রিম দ্বীপের ওপর আরবের পুরনো পালতো

লা জাহাজের কাঠামোর অনুকরণে বানানো হয়েছে ৭ তারকা হোটেল বুর্জ আল আরব। প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক আরবীয় স্থাপত্যের ধারণা পেতে চাইলে যেতে হবে বাসতাকিয়া (Bastakiya)। বাস্তাকিয়ার উইন্ড টাওয়ারগুলো দেখে বোঝা যায়, কীভাবে প্রাচীন দুবাইয়ের মানুষের বিদ্যুৎ সরবরাহের আগে তাদের ঘরগুলোকে শীতল রাখত। বাস্তাকিয়ার কিছু ঐতিহাসিক ঘর এখন জাদুঘর এবং গ্যালারি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আর গ্যালারিগুলোতে দেখা যায় পুরনো পেইন্টিং, হ্যান্ডক্রাফটসসহ বিভিন্ন প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী জুয়েলারি। এছাড়াও দুবাই মিউজিয়াম স্থাপত্য নিয়ে আলাদা একটা ভাব আছে, সেটিও দেখার মতোই বিষয়। দুবাইয়ের অসাধারণ এই মিউজিয়ামটি অবস্থিত আল-ফাহিদি দুর্গে, যার নির্মাণকাল

১৭৮৭ সাল। এটি আরব আমিরাতের সবচেয়ে প্রাচীন স্থাপত্যশিল্প।

 

মুরিশ স্থাপত্যের মারাক্কেশ
মারাক্কেশ, মরক্কোর সবচেয়ে সুন্দর এবং স্টাইলিশ শহর হিসেবে স্বীকৃত। এখানে সুউচ্চ টাওয়ার বিল্ডিং নেই, নেই আলো ঝলমলে শপিং কমপ্লেক্স, কিন্তু শহরের মুরিশ স্থাপত্যশৈলী নিদর্শনগুলো একে করেছে ঋদ্ধ। প্রাচীন মুরিশ মদিনা, মনোমুগ্ধকর প্রাসাদ, বারো থেকে সতের শতকে স্থাপিত মোহনীয় মসজিদ, বিশেষ করে বেন ইউসুফ মাদ্রাসার স্থাপত্য নকশার বিশদ কারুকার্য অতুলনীয়। সবকিছু মিলিয়ে মরক্কোর রাজধানী না হওয়া সত্তে¡ও এর স্থাপত্যচর্চায় উৎসাহীরা এই শহরের আকর্ষণকে অগ্রাহ্য করতে পারেন না।

 

গার্ডেন সিটি, সিঙ্গাপুর

নগরে বসবাস করা মানে এই নয় যে, কংক্রিটের জঙ্গলে বসবাস করা। পরিকল্পিত সবুজের ছোঁয়া ব্যস্ত নগর জীবনে প্রশান্তি এনে দিতে পারে। উঁচু দালানে বসবাস করেও উপভোগ করা যায় প্রকৃতির উদারতা।
গার্ডেন সিটি হিসেবে পরিচিত সিঙ্গাপুরের সবুজ স্থাপত্য এখন পৃথিবীব্যাপী গবেষণার বিষয়। তাদের স্থাপনা, শপিং কমপ্লেক্স, হোটেল, থিম পার্ক, চিড়িয়াখানা কোথায় নেই সবুজের ছোঁয়ার বাস্তবায়ন।
১৯৬৫ সালে স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর দেশের সরকার সারাদেশজুড়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করে। পরিচিত ছিল জেলেদের গ্রাম হিসেবে। মাত্র ৫২ বছরের ব্যবধানে এই শহরতলি এখন আধুনিকতার আইকন। ৭১৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের সিঙ্গাপুরের পুরোটাই পর্যটন দেশ। সিঙ্গাপুরের রাস্তাগুলো পরিণত হয় অ্যাভিনিউতে এবং প্রাকৃতিক সংরক্ষণের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছিল। এই ছোট্ট দ্বীপটিতে গাছের সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখেরও বেশি। সিঙ্গাপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেন ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। এই দেশটির বাণিজ্যিক হোটেলও সবুজ স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। সুউচ্চ ভবনগুলো কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে প্রকৃতির সঙ্গে বসবাস করতে পারে, স্থপতিরা সেটার একটা সাহসী চেষ্টা করেছেন পিকারিং রোডের পার্ক রয়্যাল হোটেলের ভবনশৈলীতে। টাওয়ারের উচ্চতাজুডে বহিরাঙ্গন তৈরি করেছে, যাতে মানুষ এবং প্রকৃতি মিলেমিশে এক সুতোয় সহাবস্থান করে। সিঙ্গাপুরের মেরিনা বে স্যান্ডসে রয়েছে ‘গার্ডেন বাই দ্য বে’ প্রাকৃতিক উদ্যান। জল ফুল আর বৃক্ষে ভরা উদ্যান। ২৫০ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। উদ্যানটি বে সাউথ গার্ডেন, বে ইস্ট গার্ডেন ও বে সেন্ট্রাল গার্ডেন এ তিনটি ওয়াটার ফ্রন্টে বিভক্ত। এখানে রয়েছে ফ্লাওয়ার ডোম, ক্লাউড ফরেস্ট, সুপার ট্রি গ্রোভ, ফ্লাওয়ার মার্কেট, শিশুপার্ক, মন মাতানো ক্যাকটাস গার্ডেনসহ প্রকৃতি সংরক্ষণ ইউনিট। ‘গার্ডেন বাই দ্য বে’ প্রকৃতি উদ্যানটি বিশ্বের ভ্রমণপ্রিয় মানুষের কাছে খুবই প্রিয়। বাগানটির পরিকল্পনা করা হয় ২০০৫ সালে। ২০১৪ সাল নাগাদ এর দর্শনার্থী ছিল প্রায় ৭ মিলিয়ন, যা ২০১৬ সালে প্রায় অর্ধশত মিলিয়ন হয়। সবুজ স্থাপত্যের চর্চার পাশাপাশি নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও সিঙ্গাপুর সিটি এখন বিশ্বে রোল মডেল, এই মনোরম দ্বীপটিতে ঘুরে বেড়ালে তাদের উদ্ভাবনগুলো ঋদ্ধ করে পর্যটক, স্থপতি বা প্রকৌশলীদেরও।
তথ্যঋণ : অন্তর্জাল ও লেখকের নিজস্ব গবেষণা
অক্সফোর্ডের অংশটুকু স্থপতি ও লেখক শাকুর মজিদের
‘অষ্টভ্রমণ’ বই থেকে অনুসারিত।