Home বাজার দর

ঢাকা (১ম পর্ব)


ঢাকা এবং নদীবিধৌত পার্শ্ববর্তী অঞ্চলই ছিল মুঘল শাসকদের বিরুদ্ধাচারী দুর্বিনীত বিদ্রোহীদের আশ্রয়স্থল। সুতরাং ঢাকা নিয়ন্ত্রণে আনার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতো ১৬১০ সালে ইসলাম খান চিশতি সুবাহ বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করলেন। সুবাহদার ইসলাম খান ঢাকা দুর্গকে তার আবাসস্থলের জন্য বেছে নিলেন। এর আগেই বুড়িগঙ্গা নদী ঘেঁষে একটি বাণিজ্যিক শহর গড়ে উঠেছিল। এবার দুর্গকে কেন্দ্রে রেখে আরো আবাসন ও কার্যালয় নির্মিত হতে শুরু করে। আরো ৩০ বছর পর ১৬৪০ সালের ঢাকা শহরের সীমানা সম্পর্কে গেবাস্টিয়ান ম্যানরিক যে ধারণা দেন তাতে এটা স্পষ্ট হয় শহর পশ্চিমে মানেশ্বর, পূর্বে নারিন্দা এবং উত্তরে ফুলবাড়িয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। দক্ষিণ সীমানায় বুড়িগঙ্গা নদী।
জন টেইলরের বর্ণনায় ১৮০০ সালের ঢাকার সীমানা আরো বিস্তৃত পশ্চিমে জাফরাবাদ, পূর্বে পোস্তগোলা এবং উত্তরে টঙ্গী, দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা।
শতবর্ষ ঢাকা সুবাহ বাংলার রাজধানী হিসেবে অধিষ্ঠিত থাকার পর শাহজাদা সুজার আমলে রাজধানী রাজমহলে আবার ফিরিয়ে নেওয়া হয়। ঢাকার গুরুত্ব হ্রাস পেতে থাকে। মীর জুমলা ও শায়েস্তা খানের শাসনামলে শহরে আরো ভৌত কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়। বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে ঢাকা সুপরিচিত হয়ে ওঠে। ঢাকা জেলার সোনারগাঁ বন্দর থেকে মসলিন রফতানি হতে থাকে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমলে নগর শাসন সংস্কার হয়। ১৮২৯-এ দেশ বিভাগীয় সদর দফতর হওয়ায় এর প্রশাসনিক গুরুত্ব বাড়তে থাকে। কিন্তু অধিভুক্ত বাংলার রাজধানী কলকাতা থেকে যাওয়ায় ঢাকা সিটির উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন ঘটেনি। ১৯৪৭-এর পর ঢাকা পরিচালিত হয় পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান শহর ও পরে সেকেন্ড ক্যাপিটাল হিসেবে। ১৯৭১-এ স্বাধীনতা অর্জনের পর ঢাকা হয়ে ওঠে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী।

কংক্রিটের মহাকাব্য : সেকেন্ড ক্যাপিটাল
১৯৫৯-এর ১২ ও ১৩ জুন অ্যাবোটাবাদ জেলার নাথিয়া গলিতে গভর্নরদের সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানের সেকেন্ড ক্যাপিটাল স্থাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৬২-এর পাকিস্তান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয় যে, ঢাকাতেই হবে সেকেন্ড ক্যাপিটাল। এখানে হবে জাতীয় সংসদ ভবন।
পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরকে প্রধান করে গঠিত হয় সেকেন্ড ক্যাপিটাল বাস্তবায়ন কমিটি। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে উঠল সেকেন্ড ক্যাপিটাল বিলপাস হল। তেজগাঁও কৃষি খামারের ২০০ একর জমির বরাদ্দ নিশ্চিত করলেন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় কৃষি ও পূর্তমন্ত্রী রানা আবদুল হামিদ। কিন্তু এ জমি পর্যাপ্ত নয়। অনেক দেন দরবার করে জমির পরিমাণ বাড়ানো হলো। সেকেন্ড ক্যাপিটাল স্থাপনের জন্য গণপূর্ত বিভাগের কাছে প্রথম দফায় ২৩৫ একর, দ্বিতীয় দফায় ১৭৩ একর এবং তৃতীয় দফায় ১১৪ একর জমি মোট ৫২২ একর জমি হস্তান্তর করা হলো। কিন্তু কৃষি কলেজ, হোস্টেল ১ প্রদর্শনী খামার সরাতে না পারায় ১০১.৪ একর জমি তখনই দখল বুঝে নেওয়া সম্ভব হয়নি। কৃষির আওতাধীন স্থাপনাগুলো স্থানান্তরের জন্য গাজীপুরে ৭০০ একর জায়গা হুকুম দখল করা হল।
দ্বিতীয় রাজধানীর জন্য স্থপতি নির্বাচিত হলেন লুই আই কান। এই স্থপতি চাইলেন ১০০০ একর জমি। কিন্তু তা দেওয়া সম্ভব নয়। ১৯৬৩ সালে লুই আই কান ঢাকায় এলেন এবং সরেজমিন দেখে নকশা তৈরিতে হাত দিলেন। ১৯৬৪ সালে নকশা দাখিল করেন। শুরু হয় নির্মাণ কাজ, কলামহীন, লাল ইট ও কংক্রিটের জ্যামিতিক অবয়বে তৈরি হলো পৃথিবীর একটি বিস্ময়কর স্থাপনা জাতীয় সংসদ ভবন। একে ঘিরে আরো কিছু স্থাপনার নির্মাণ কাজ শেষ হয় ১৯৭৪ সালে। ততদিনে সেকেন্ড ক্যাপিটাল নির্মাণের প্রায়োজন ফুরিয়ে গেছে। ঢাকাই হলো স্বাধীন বাংলাদেশের একমাত্র রাজধানী। এ এক কংক্রিটের মহাকাব্য।
আবেদিন সাহেব ঢাকায় আর্ট স্কুল খুলেছেন। প্রথম ব্যাচের ১২-১৩ জনের একজন শিল্পী ইমদাদ হোসেন প্রতিদিন ছয় মাইল হেঁটে জিঞ্জিরা আসতেন খেয়া নৌকায় বুড়িগঙ্গা পেরিয়ে আবার দুই মাইল হেঁটে কলতাবাজারে সেই স্কুল। ইমদাদ হোসেনের বর্ণনা :
এই পাড়ে এলে প্রথমে সামনে পড়ে চকবাজার। চকবাজার থেকে বাঁ দিকে গেলে লালবাগ, আরও বাঁ দিকে গেলে আমলিগোলা। এটা মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা। এই আমলিগোলায় ছিল বোতাম-চিরুনি তৈরির কারখানা। প্রতি বাড়িতে মোষের সিংহের বোতাম তৈরি হতো। মেয়েরা কাজ করে, ছেলেরা কাজ কর। আর লোকজন খুব উদার,  গ্রামের ছেলেরা যারা ঢাকায় গিয়ে পড়ে তাদের লজিংও দেয়। তাদের বাড়িতে খেয়েদেয়ে অনেকে লেখাপড়া করত। তখন সিনেমা হল ছিল পিকচার হাউস, লায়ন সিনেমা, আজাদ, রূপমহল মুকুল। আরেকটা ছিল গুলিস্তানের কাছে ইংলিশ ছবি চলত। আমরা লায়ন সিনেমা হলে ছবি দেখতাম। তবে বাঙালি হিন্দুরা তুলনামূলকভাবে ইংরেজি ছবি দেখত খুবই কম। ওরা পরিবারের সবাইকে নিয়ে রূপমহল বা মুকুলে ছবি দেখত। এসব সিনেমা হলে বাংলা ছবি বেশি চলত।
১৯৪৫ সালে কথাসাহিত্যিক আবদুশ শাকুর নোয়াখালীর সোনাপুর থেকে ট্রেনে লাকসাম হয়ে চাঁদপুর পৌঁছলেন। সেখান থেকে স্টিমারে নারায়ণগঞ্জ, তারপর : ‘দুটি লোহার লাইনের উপর দিয়ে বিচিত্র শব্দ তুলে গড়িয়ে গড়িয়ে যে গাড়িতে আমি নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকার ফুলবাড়িয়া স্টেশনে পৌঁছলাম, সেই বিস্ময়কর রেলগাড়িটি নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসে পৌঁছেছে আমার বাপের জন্মেরও আগে ১৮৮৫ সালে।’
রেলগাড়ি থেকে নেমে ‘রূপকথার ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে চলে এলেন লালবাগের আমলিগোলাতে। যে বাড়িতে ক’দিন থাকবেন বলে এলেন এটা যেন বান্দরেরই বাড়ি, মানুষের নয়। বারান্দায় বান্দর, জানালায় বান্দর, কার্নিশে বান্দর, দেয়ালে বান্দর, ছাদে বান্দর, গাছে বান্দর। যেদিকে তাকাই যেখানে যাই দেখি কেবল বান্দর আর বান্দর।’
পুরনো ঢাকার সেই বান্দর এখন কেবল স্মৃতি।
প্রয়াত প্রফেসর এমিরেটাস সিরাজুল হক লিখেছেন যখন আহমদ ফজলুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম হলের প্রভোস্ট তখন চালের মন ২ টাকা, খাসির মাংস প্রতিসের চারখানা, গরু দুই আনা, ডিমের কুড়ি দশ পয়সা আর ঘি প্রতি সের এক টাকা চার আনা।
‘ঐ সময় যাতায়াতের জন্য ছিল ঘোড়ার গাড়ি। তাতে চারজন বসতে পারত। শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে হলে দিতে হতো মাত্র আট আনা। মোটর গাড়ি ছিল না বললেই চলে। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো গাড়ি ছিল না। এ এফ রহমান (পরে স্যার) সাহেবকেও আমি ঘোড়ার গাড়িতে চড়তে দেখেছি এবং টাকায় কম দিতেন না বলে গাড়োয়ানরা তাঁর বাড়ির আশপাশে ঘুরত, কী করে তাঁকে ধরা যায়।’
ঢাকা শহরে পানির ট্যাপ (রানিং ওয়াটার) আসে নওয়াব আবদুল গনির হাত ধরে আর তাঁর পুত্র নওয়াব আহসান উল্লাহ বিজলি আনার ঘোষণা দেন। পুরনো ঢাকার ব্যবসায়ী পুষ্পরাজ সাহা নিজ খরচে আমলিগোলার প্রধান সড়কে বিজলি বাতির ব্যবস্থা করেন, সেই রাস্তার নামকরণ করা হয় তার বাবার নামে ‘জগন্নাথ সাহা রোড’ আর ঢাকা পৌরসভাকে বড় অংকের অনুদান প্রদান করায় পাশের গোয়ালটুলির রাস্তার নামকরণ করা হয় পুষ্পরাজ সাহা লেন। (নজির হোসেনের কিংবদন্তি ঢাকা)।
নগরবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম জনমিতিক বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, ১৯০১ সালে বাংলাদেশের নগরে বসবাস ছিল ২ দশমিক ৪৩ ভাগ মানুষের, ১৯৭৪-এ তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ দশমিক ৩ ভাগ, ১৯৮১-তে ১৫ দশমিক ৫ ভাগ এবং ২০১১-তে শহরের পুরনো সংজ্ঞা অনুযায়ী তা ২৮-এ পৌঁছে। ৫ মিলিয়ন বা ৫০ লাখের অধিক জনঅধ্যুষিত হলে মহানগর হয়ে ওঠে মেগাসিটি। ঢাকার জনসংখ্যা এর প্রায় তিনগুণ। ঢাকায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির বর্তমান হার অপরিবর্তিত থাকলে ২০৩৫ এই মেগাসিটির জনসংখ্যা বাঁড়বে ২ কোটি ৬০ লাখ এবং ২০৫০ সালে সাড়ে ৩ কোটি।
পৃথিবীর সবচেয়ে আবাসযোগ্য শহরের শীর্ষ তিনটির একটি ঢাকা। বায়ান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলির শহর ঢাকা। এ রকম বহু টাইটেল ঢাকার সঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে, প্রি-ম্যাচুর মেগাসিটি হিসেবে তিনি ঢাকাকে দেখছেন, আবার তার কাছে এটাও মনে হয়েছে ঢাকা একটি পরাবাস্তব শহর। ঢাকার উন্নয়নে ২০১৬-২০৩৫ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ২০ দফা খসড়া পরিকল্পনায় আর্থ-সামাজিক কাঠামোর বাস্তবতা তেমন গুরুত্ব পায়নি বলে তিনি মনে করেন।

প্রকৃতিকে ধরে রেখে তৈরি ভবন


স্থপতি বায়েজিদ মাহবুব খন্দকার। যিনি স্থাপত্যের অন্তর্নিহিত অর্থ খুঁজে পেয়েছিলেন অন্যভাবে। সরকারি স্থপতি হয়েও স্বাধীনভাবে কাজ করার জন্য চাকরি ছেড়েছিলেন। ২০০০ সালে গড়ে তোলেন নিজের প্রতিষ্ঠান ‘নকশাবিদ আর্কিটেক্টস’। বর্তমানে বনানীতে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটি থেকেই তার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিনিয়ত চেষ্টা করছেন কংক্রিটের সঙ্গে সবুজের মেলবন্ধন ঘটানোর। সম্প্রতি তার এক প্রিয় সবুজ স্থাপনার গল্প শুনিয়েছেন কারিকাকে।

প্রথম যখন শিল্প-বিপ্লব হয় তখন লন্ডনের শ্রমিকরা বস্তিতে থাকতো, যেখানকার পরিবেশ ছিল আমাদের দেশের তুলনায় দশ গুণ খারাপ। এখনো আমাদের দেশের অনেক ফ্যাক্টরি-কর্মীদের বাসাবাড়ির অবস্থা অনেক খারাপ। আমার-আপনার যাওয়ার মতো পরিবেশ নাই। কিন্তু রংপুর শহরের রবার্টসনগঞ্জে স্থাপিত রংপুর লিমিটেডের কারখানা ভবন সবাইকে বেশ অবাকই করে। সাততলা কারখানাটি সব মিলিয়ে তিন লাখ বর্গফুটের ওপর। ৪০ হাজার বর্গফুট আয়তনের একেকটা ফ্লোর। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, এর কোথাও এসি কিংবা ফ্যান নেই। কিন্তু তা নিয়ে শ্রমিকদের কোনো অভিযোগও নেই। শ্রমিকেরা এখানে বাড়ির চেয়েও সাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। কারণ স্থাপত্যকৌশলের কারণে কারখানার ভেতরটা বাইরের তুলনায় কয়েক ডিগ্রি ঠান্ডা রাখা সম্ভব হয়।

একসময় এই এলাকার কর্মীদের সামাজিক অবস্থান বলে কিছুই ছিল না। এই ফ্যাক্টরির মাধ্যমেই তারা নানা ধরনের সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ বড় ফ্যাক্টরি ঢাকায় কিন্তু এটি ঢাকার বাইরে হওয়ায় এখানকার কর্মীরা নিজের বাড়িতে থেকে কাজ করতে পারছে। আশেপাশের গ্রামের মেয়েরা তাদের নিজের ঘর গুছিয়ে রেখে সাইকেলে করে অফিসে যাওয়া-আসা করছে। এতে করে তারা সংসারের পাশাপাশি নিজের ঘরের উন্নয়নেও বিনিয়োগ করতে পারছে। ফলে সংসারে স্বচ্ছলতার পাশাপাশি তাদের নিজেদের ঘরের পরিবেশও উন্নত হচ্ছে।
ভবনটি নির্মাণের সময় কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য ছিল বিদ্যুৎ সাশ্রয় কওে এটাকে একটি আদর্শ সবুজ কারাখানায় রূপান্তরিত করা। আদর্শ সবুজ কারখানা হয়েছে কি না সেটা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। তবে বিদ্যুতের ব্যবহার কমানো গেছে প্রায় ৮০ ভাগ। তাতে ব্যবসায়িক দিক দিয়ে চিন্তা করলেও লাভবান হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

কারখানার ভেতর দিয়ে যাতে বাতাস চলাচল করতে পারে সেজন্য স্থাপত্য-নকশায় বিশেষ কিছু কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে। নিচতলায় লবিতে নির্মাণ করা হয়েছে পুকুরের মতো বৃহদাকার চারটি জলাধার। ১৫ হাজার বর্গফুটের এ জলাধারগুলো মোট পাঁচ লাখ লিটার পানি ধারণ করতে পারে। আয়রণমুক্ত এই পানি কারখানায় শতরঞ্জি ডাইংয়ের কাজে ব্যবহৃত হয়ে এই জলাধারে আসে।
সবুজ গাছপালা আর এই পানির ওপর দিয়ে উড়ে আসা বাতাস ৩৭ ফুট ব্যসের চারটি পিলারের মধ্য দিয়ে কারখানার ভেতরে ঢোকে। তারপর বিভিন্ন তলায় উঠে যায়। তাই এসি বা ফ্যান ছাড়া প্রাকৃতিকভাবেই কারখানার বাইরের চেয়ে ভেতরের তাপমাত্রা কমে যায় ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।প্রকৃতিকে ব্যবহার করে কারখানার ভেতরের তাপমাত্রাকে কম রাখা স্থাপত্যবিদ্যার নতুন কোনো ধারণা নয়। এখানে গ্রামবাংলার লোকজ জ্ঞানই প্রয়োগ করা হয়েছে। গ্রামের বাড়িগুলোর সাধারণত দক্ষিণ দিকটি খোলা রাখা হয় এবং সেদিকে একটি পুকুর থাকে। গরমকালে পুকুরের ওপর দিয়ে বাতাস ঠান্ডা হয়ে বাড়িতে প্রবেশ করে এবং বেরিয়ে যায়।
প্রাকৃতিক নিয়ম অনুযায়ী গরম বাতাস উপরে ওঠে। আর শীতল বাতাস নিচে পড়ে থাকে। এই গরম বাতাস ছাদের ওপর চিমনির ভেতর দিয়ে বেরিয়ে যায়। ফলে পুরো ভবন শীতল হয়ে আসে। কারও জ্বর হলে যেমন কপালে জলপট্টি দেওয়া হয়, কারখানাটিতেও সে-রকম জলপট্টি দেওয়া হয়েছে বলা চলে।

ব্যাপারটাকে জলপট্টির মতো সহজ উদাহরণ দিয়ে বোঝালেও কাজটা মোটেও অত সহজ ছিল না। পুরো কারখানাকে সাজাতে হয়েছে অনেকটা বাগানবাড়ির আদলে। মূল গেটের ভেতরে আট লাখ বর্গফুটের ওপর সাততলা কারখানা ভবন। কংক্রিটের দেয়ালগুলো যেন সবুজ কার্পেটে রূপ নিয়েছে। আর ভবনের চারপাশে গাছের বেষ্টনি তো আছেই।
এমন সবুজের আধিক্যও কিন্তু ভবনকে ঠাণ্ডা রাখার একটা কৌশল। এর দক্ষিণ দিকে সকাল থেকেই রোদ পড়তে শুরু করে। তাই প্রতি তলায় সাড়ে চার ফুট দূরত্ব রেখে বারান্দা ও জানালা রাখা হয়েছে। সেই সঙ্গে বাইরের দেয়ালে লাগানো হয়েছে সবুজ লতাপাতা-গাছ। এ কারণে রোদের তাপ ভেতরে ঢুকতে পারে না। তাছাড়া দক্ষিণে থাকা সবুজ গাছের কারণে দক্ষিণের গরম বাতাস বাধা পায়। ঘুরতে ঘুরতে সেটা কারখানার দেয়ালে গিয়ে ঠাণ্ডা হয়ে যায়।

সাধারণত ভবনের মেঝে থেকে ছাদের উচ্চতা ১০ ফুট হয়। এখানে সেটা দুই ফুট বেশি রাখা হয়েছে। তাতে গরম কিছুটা কম অনুভব হয়। সেই সঙ্গে প্রতিটি তলায় অনবরত চলতে থাকা যন্ত্রপাতি থেকে উৎপন্ন তাপের ব্যাপারেও ভাবতে হয়েছে আলাদাভাবে। মেঝের মধ্যে প্রতিটি যন্ত্রের নিচে ছিদ্র রাখা হয়েছে। এসব ছিদ্র দিয়ে গরম বাতাস জানালার ওপরের ভেন্টিলেশন সিস্টেমের মধ্য দিয়ে বের হয়ে যায়।

এ তো গেল রংপুর লিমিটেড কারখানার গরম কমানোর মন্ত্র। কিন্তু শীতে? বছরের বেশিরভাগ সময় গরমকাল হলেও মাস তিনেক কিন্তু শীতও পড়ে। আর উত্তরবঙ্গ হওয়ায় শীতের প্রকোপ খানিকটা বেশিই হয়। তাই শীতকালে শ্রমিকদের অতিরিক্ত ঠাণ্ডা থেকে রেহাই দিতেও ভাবতে হয়েছে আলাদাভাবে। কারখানার দক্ষিণ দিক খোলা রাখা হয়েছে। কিন্তু শীতে বাতাস প্রবাহিত হয় উত্তর দিক থেকে। সেটা মাথায় রেখেই কারখানার জানালা এই সময় বন্ধ রাখা হয়।

তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের দিকটি বাদেও এই কারখানার রয়েছে আরও কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য। কারখানার প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিকের মধ্যে ৯০ ভাগই নারী। তারা আশপাশের গ্রামগুলো থেকে সাইকেল চালিয়ে আসেন। কারখানার বিভিন্ন তলায় র‌্যাম্প ব্যবহার করে সাইকেল চালিয়েই উঠে যেতে পারেন।
সেবা বিভাগের একতলা ভবনের ছাদে গড়ে তোলা হয়েছে বাগান। নাম দেওয়া হয়েছে নন্দিনী পার্ক। ছাদের মধ্যে গাছের ফাঁকে ফাঁকে বসার জন্য রয়েছে ছোট ছোট অনেক বেঞ্চ আর পানির ফোয়ারা। সেখানে ভাসছে পদ্মফুল। এখানেই দুপুরের খাবার খান শ্রমিকরা। সামনে মূল ভবনের ছাদেও বাগান গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের। আর সেটা হলে কারখানার ভেতরটা আরও শীতল করে তোলা সম্ভব হবে।

রংপুর লিমিটেড মূলত শতরঞ্জি তৈরি করে থাকে। রংপুরের সংস্কৃতির অন্যতম এই উপাদান একসময় হারিয়ে যেতে বসলেও সেটা জনপ্রিয়তা ফিরে পাচ্ছে আবারও। আর চাহিদা বাড়ার কারণে বড় আঙ্গিকে উৎপাদনেও যেতে পারছেন ব্যবসায়ীরা।
এই ফ্যাক্টরির কোনো ম্যাটেরিয়াল আমদানিকৃত নয়। স্থানীয় ইটের সঙ্গে শুধু সিমেন্ট ঢাকা থেকে নেয়া হয়েছে। আমাদের পছন্দের সঙ্গে শ্রমিকদের পছন্দ মিলবে না। তাই ইন্টেরিয়র ডিজাইন করা হয়েছে সম্পূর্ণভাবে তাদের পছন্দের কথা মাথায় রেখে। চায়ের দোকানে যেমন সাদামাটা বেঞ্চ থাকে ঠিক তেমনি তাদের মিটিং রুমেও লম্বা লম্বা বেঞ্চ, চাটাই ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়েছে। ওরা যে ধরনের আসবাবের সঙ্গে পরিচিত সে ধরনের আসবাব দিয়েই ডিজাইন করা হয়েছে।

এখানে যতটা সম্ভব লো-কস্ট করেই করা হয়েছে। এছাড়া যে ম্যাটেরিয়েল ব্যবহার করা হয়েছে সেটাকে সেভাবেই রাখা হয়েছে। যেমন ইট ব্যবহারের পর সেখানে আলাদা কোনো ফিনিশিং করা হয়নি। আমাদের লক্ষ্যই ছিল এটাকে কার্যক্ষম করে তোলা।
এই জমিটা ছিল তিন একরের। এর আগেও এখানে ফ্যাক্টরি ছিল। তবে তারও আগে এখানে মাঠ ছিল। মাঠে ছিল অনেক গাছ-পালা। এরপর যখন আমরা এখানে কাজ শুরু করি তখন সিদ্ধান্ত নিলাম এখানে এক একরের ওপর একটা ফ্যাক্টরি ভবন করব। তার মানে এক একরের সবুজ আমরা নষ্ট করলাম। এরপর সম্পূর্ণ ডিজাইন শেষে দেখা গেল ভার্টিক্যাল গ্রিনের মাধ্যমে আমরা যে এক একর সবুজ নষ্ট করেছিলাম সেখানে দেড় একর সবুজ আমরা ফিরিয়ে দিয়েছি।
নব্বইয়ের দশকে অল্প কয়েকজন কারিগরকে নিয়ে নতুন করে উৎপাদন শুরু হয় শতরঞ্জির। প্রায় ৩০ বছরের নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে রংপুরের শতরঞ্জি এখন ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও এশিয়া মহাদেশের ৫৫টি দেশে রপ্তানি করছেন বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা। এদিক থেকে এগিয়ে আছে রংপুর লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি ২০০৯ সাল থেকে প্রতিবছরই জাতীয় রপ্তানিতে স্বর্ণপদক পেয়ে আসছে।

শতরঞ্জি তৈরিতে এই কারখানায় ব্যবহার করা হয় নবায়নকৃত কাঁচামাল। সুতা তৈরি হয় কটনমিলের তুলার বর্জ্য থেকে। বছরে প্রায় তিন হাজার টন এমন বর্জ্য ব্যবহার করে তারা। সেই সঙ্গে ১ হাজার ২০০ টন গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির বর্জ্য ঝুট কাপড় এবং সাড়ে ৪ হাজার টন পাটের আঁশ দরকার হয় তাদের। এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্য নবায়ন করে পরিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষায়ও বেশ বড় অবদান রাখছে কারখানাটি।

প্যারিস


প্যারিস শুনলেই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাদুঘর ল্যুভ এর কথা মনে হবেই। ল্যুভ মিউজিয়ামে ওল্ড মাস্টারদের আঁকা শ্রেষ্ঠ চিত্রকর্মগুলো দেখতে দেখতে আপনি মোনালিসার সামনে দাঁড়িয়ে থ’ হয়ে আছেন। কিন্তু এমন চিত্রকল্প কি মনে করতে পারেন, ল্যুভ মিউজিয়ামের চারপাশের রাস্তায় মানুষ সমান পানি গড়িয়ে চলাচলের প্রশ্নই আসে না, সাঁতার কেটে গিয়ে পৌঁছাবেন তাতেও লাভ নেই ল্যুভ-এ তালা লাগিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বন্যা নাস্তানাবুদ করে দিয়েছে প্যারিসকে। পৃথিবীর অন্যতম আবাসযোগ্য ঢাকা মহানগর কিংবা ঢাকা মেগাসিটিতে এ তো নিত্যকার ঘটনা। এমনকি  সচিবালয়ের ভেতরেও হাঁটুপানি। তাই বলে প্যারিসে!
প্যারিসের এই বন্যা এবং জলাবদ্ধতার ঘটনাটি এ বছরেরই সেইন নদীর পানি বেড়ে যায়, নদীর কাছাকাছি বাড়িঘরের বেজমেন্ট পানিতে তলিয়ে যায়, রাস্তায় পানি ওঠে, পানির উচ্চতা ক্রমাগত বাড়তে থাকে।
শহরের ভেতরে আছে ক্রিমিয়ান সৈনিকের একটি ভাস্কর্য। এটি এখন বন্যার পানি মাপার নির্দেশক। ১৯৯০ সালের সেইন নদীর বন্যার পানি ভাস্কর্যের গলা পর্যন্ত পৌঁছেছিল, প্যারিস শহর দু’মাস বন্যায় তলিয়ে ছিল। এবার হাঁটুও ছুঁয়েছে আর তাতেই ল্যুভ মিউজিয়ামের একাংশ। শহরের কমিউটার ট্রেন সার্ভিস আগেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল।
সুতরাং স্বপ্নের শহর প্যারিসের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ সেইন নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং শহর রক্ষা।
প্যারিস মানে আইফেল টাওয়ার। যে পর্যটক প্যারিস গিয়েছেন তিনি ল্যুভ-এ নাও যেতে পারেন, মোনালিসা তার দেখা নাও হতে পারে, কিন্তু প্যারিসে গেছেন কিন্তু আইফেল টাওয়ার দেখেননি তিনি আসলে প্যারিসের নাম করে অন্য কোথাও গিয়েছেন কিংবা মিথ্যা কথা বলছেন। ফ্রান্সে বছরে সাড়ে চার কোটি পর্যটক ভিড় জমান। এ পর্যটক ব্যবস্থাপনাই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পর্যটক আইফেল টাওয়ারে উঠতে চাইলেন। শুনলেন বন্ধ। দূর থেকে টাওয়ার দেখে চলে যান। বিস্ময়কর মনে হতে পারে, ৮ ডিসেম্বর ২০১৬ ইঁদুরের উৎপাতের কারণে আইফেল টাওয়ার বন্ধ করে দেয়া হয়।
ইউরোপে এমনিতেই ইঁদুরভীতি রয়েছে প্লেগমৃত্যু, যা ব্ল্যাক ডেথ নামে পরিচিত। ইউরোপের কোনো কোনো শহরের অর্ধেকের বেশি জনসংখ্যা নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে।
প্লেগ, কলেরা, বহিঃশত্রুর আক্রমণ, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ এসবের মধ্য দিয়ে প্যারিস পরিণত হয়েছে ইউরোপ প্রধান দুটি শহরের একটি, অন্যটি অবশ্যই লন্ডন।

রবীন্দ্রনাথ প্যারিসে পা রেখেছেন ১৮৭৮ সালে, পুনরায় ১৮৯০-তে, তারপর আবারো ১৮৭৮-এর প্যারিস বর্ণনা : ‘সেই অভ্রভেদী প্রাসাদ অরণ্যের মধ্যে গিয়ে পড়লে অভিভূত হতে হয়।’
‘যে জাতির ২৪০ ধরনের পনির আছে সে জাতিকে কেউ কেমন করে শাসন করবে?’ প্রেসিডেন্ট চার্লস দ্য গল মজা করেই নিজের জাতির বৈচিত্র্য সম্পর্কে এ কথা বলেছিলেন।
আর এ বৈচিত্র্যের প্রায় পুরোটাই ধারণ করছে প্যারিস। লন্ডনের চেয়ে অনেক বেশি অভিজাত ও পুরনো খান্দান হচ্ছে প্যারিস। খ্রিস্টজন্মের প্রায় আট হাজার বছর আগের শিকার সন্ধানী মানুষের জীবাস্ম আবিষ্কৃত হয়েছে এ অঞ্চলেই।
খ্রিস্টপূর্ব ৫২ অব্দে রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারের উদ্যোগে সেইন নদীর বাম তীরে গল-রোমান গ্যারিসন শহর প্রতিষ্ঠিত হয়, শহরের নাম ল্যুটেশিয়া। এ সময় বিভিন্ন ধরনের নির্মাণকাজ অ্যাম্পিথিয়েটার, স্নানাগার তৈরি হয়। শহরটি নতুন করে পরিচিত হয় সিটি অব প্যারিসি বা প্যারিস নামে। প্যারিসিরা সেলটিক উপজাতি। ক্রমাগত আক্রমণ ও অবরোধে জার্মান ও রোমান শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। তারপর ফ্রাঙ্কদের টানা ১০ বছরের অবরোধ। ১৬ বছর বয়সী রাজা প্রথম ক্লোভিসের সেনাবাহিনীর কাছে রোমানরা পরাজিত হয়।
নবম শতকে ভাইকিং জলদস্যুরা প্যারিস অবরোধ ও লুটপাট করে। দ্বাদশ শতকের শুরুতে প্রতিষ্ঠিত হয় প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়। ত্রয়োদশ শতকে নগরীর লোকসংখ্যা ২ লাখ। ১৩৫৭-৫৮ সালে রাজক্ষমতা সীমিত করার লক্ষ্যে ব্যবসায়ীরা মার্শেলের নেতৃত্বে সশস্ত্র বিদ্রোহ করে। শুরুতে বিদ্রোহীরা সফল হলেও দ্বিতীয়বারে রাজকীয় সেনাবাহিনীর হাতে মার্শেল নিহত হন। তার অনুগামীদের অধিকাংশকেই মৃত্যুদন্ডে দেওয়া হয়।

 

১৪২০ সালে ইংরেজরা প্যারিস দখল করে নেয়। ১৪৩৬-এ প্যারিস পুনরুদ্ধার হয়। ১৫৭২-এ প্যারিসের ক্যাথলিকরা প্রটেস্ট্যান্টদের ওপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। সপ্তদশ শতক থেকে ফ্রান্সে শুরু হয় ‘এজ অব এনলাইটেনমেন্ট’ শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে অন্যান্য ইউরোপীয় দেশকে ছাড়িয়ে যেতে থাকে।
১৭৪২-এ লিওন থেকে প্যারিস এসে হতাশ হন জ্যঁ জ্যাক রুশো। তিনি আশা করেছিলেন সুন্দর রাজকীয় একটি শহর দেখবেন কিন্তু তিনি দেখলেন সরু, নোংরা পুঁতিগন্ধময় অলিগলি; দুর্বৃত্ত অধ্যুষিত ঘরবাড়ি অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, ভিক্ষুক, দরিদ্র, ওয়াগন চালক, পুরনো কাপড় সেলাই করার দর্জি, চা ও পুরনো ব্যাট বিক্রেতা। ১৭৮১-১৭৯৯ প্যারিস ছিল ফরাসি বিপ্লবের কেন্দ্রভূমি।
১৮০০-১৮১৫ পর্যন্ত ফ্রান্স শাসন করেছেন নেপোলিয়ন। ১৯৮৯ সালে আইফেল টাওয়ার নির্মিত হলো। ১৯৪০ থেকে ৪ বছরের বেশি সময় প্যারিস জার্মানির দখলে ছিল। মুক্ত হয় ১৯৪৪-এ। নতুন করে গড়ে উঠতে থাকে প্যারিস। হারানো প্যারিস শহর ১০৫ বর্গকিলোমিটার। প্যারিস মেট্রোপলিটন এলাকা ২৩০০ বর্গকিলোমিটার। মপার্নাসে ও মমার্ত শিল্পীদের পাড়া। প্যারিস বিশ্বের সাংস্কৃতিক রাজধানী।
খ্যাতিমান ভাস্কর ও চিত্রশিল্পী চিন্তামনি কর তাঁর স্মৃতিচিহ্নিত গ্রন্থে লিখেছেন পৃথিবীতে যদি সত্যিকার আন্তর্জাতিক ও বিশ্বজনীন শহর থাকে তো সে পারী।
পারীর মধ্যে চলে গেছে অসংখ্য বুলভার বা প্রশস্ত রাজপথ। এগুলো কলকাতার চৌরঙ্গীর প্রায় দু’তিনগুণ চওড়া। বিখ্যাত বুলভার সাঁজেলিজে পৃথিবীর একটি প্রশস্ততম রাজপথ। প্রায় প্রত্যেক বুলভারের দু’পাশে সুন্দর গাছের সারি। রাতে গাছের সারির পাশে আলোর সারি, গাছের ডালপালা পাতার ফাঁক দিয়ে আলোর বন্যা বইয়ে দেয়। পারী শহরের মধ্যে এত গাছপালা থাকার জন্য এর শহরটির চারপাশে বন থাকায় বিমান আক্রমণকারীদের দৃষ্টিবিভ্রম জাগিয়ে দেয়। কালো বনের ফাঁকে কোথায় যে শহরটি আত্মগোপন করে আছে অনেক সময় ওপর থেকে রাতে তারা বুঝতে পারে না। তবুও অমূল্য সংস্কৃতি ও সভ্যতা সম্পদের নিদর্শনে পূর্ণ পারীকে অসভ্য নিপীড়কদের থেকে রক্ষা করার জন্য রাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করেছিলেন। পার্কগুলোর মাঝে ট্রেঞ্চ কেটে বড় বড় কামান বসানো হয়েছিল। (চিন্তামনি করের বর্ণনা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলাকালীন এ কালের তরুণ বাংলাদেশি পর্যটক প্যারিসে পৌঁছার আগে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পঙক্তি স্মরণ করলেন ‘প্রত্যেক শিল্পীরই দুটি মাতৃভূমি, একটি যেখানে সে জন্মেছে, অন্যটি হলো ফ্রান্স। আর ফ্রান্স মানেই শেষ পর্যন্ত প্যারিস।
প্যারিসের এয়ারপোর্টটি সাবেক প্রেসিডেন্ট দ্য গলের নামে। এখন বছরে প্রায় ৫ লাখ উড়োজাহাজ এবং ৭ কোটি মানুষের ওঠানামা ইউরোপের অন্যতম প্রধান এ এয়ারপোর্টে।
‘কেবল বিশালত্বে নয় এ বৈশিষ্ট্যতা মূলত স্থাপত্যকলায়। ফ্রেন্সরা এ ধরনের নকশাকে বলে আভ্যাঁ দার্দে অর্থাৎ নবধারার নকশা। মোট তিনটি টার্মিনাল তার সঙ্গে নানাভাবে নানা কায়দায় সংযুক্ত ছয়-সাতটি করে স্যাটেলাইট টার্মিনাল। কোথাও প্যাঁচানো সিঁড়ি, কোথাও দীর্ঘ সুড়ঙ্গ। এই একতলা গিয়ে মিশেছে তেতলার সঙ্গে। আবার তা পাক খেয়ে নেমে এসেছে দোতলার মেঝেতে যেন বিশাল এক ভুলভুলাইয়া। স্বীকার করতে হবে এর স্থাপত্যশৈলীতে রয়েছে অভাবনীয় অভিনবত্ব। কিন্তু আমার মন টানল না এখনো যেন স্বস্তির চেয়ে চমক বেশি। সৌন্দর্যের চেয়ে বেশি দুর্বোধ্যতা।

 

(ইউরোপ ইউরোপ- কাজী সাইফউদ্দীন বেননূর)।
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ চিত্রশালা ল্যুভ তৈরি হয়েছিল নগর রাজার দুর্গ হিসেবে। ফরাসি রাজারা তাদের রুচি অনুযায়ী প্রত্যেকেই এই দুর্গে কিছু না কিছু পরিবর্তন আনেন। ষোড়শ শতক থেকে এই দুর্গ রূপান্তরিত হয় রাজপ্রাসাদে। রাজা ফ্রাসোয়া ল্যুভ ব্যাপক সংস্কার করে প্রাসাদের একাংশে রেনেসাঁ স্থাপত্য ও ভাস্কর্য সাজাতে থাকেন। তখন প্রটেস্ট্যান্ট আন্দোলন তুঙ্গে। এরই মধ্যে রাজা চতুর্থ আঁরি (হেনরি) প্রটেস্ট্যান্ট ধর্মবিশ্বাস ছেড়ে ক্যাথলিক হয়ে গেলেও ক্যাথলিকদের একজন তার ধর্মবোধ নিয়ে সন্ধিহান হয়ে ল্যুভা প্রাসাদের পাশেই ছুরিকাঘাতে তাকে হত্যা করে।

ভালোবাসার শহরে দ্য প্যারিস সিনড্রোম
প্যারিস হচ্ছে দ্য সিটি অব লাভ ভালোবাসার শহর। পর্যটকদের প্রথম আকর্ষণ ফ্রান্স। অতঃপর যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, চীন, ইতালি, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, মেক্সিকো, থাইল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়া। প্যারিসের আকর্ষণ দুর্নিবার। কিন্তু পর্যটক যে ভালোবাসা ও মুগ্ধতা লাভের প্রত্যাশা নিয়ে আসেন প্যারিসে আসার পর তা না পাওয়ার যন্ত্রণা তাকে কষ্ট দিতে থাকে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ব্যবধান নিয়ে দ্য প্যারিস সিনড্রোম। প্রথম ধাক্কা প্যারিসের ফ্রেঞ্চরা অন্য ভাষা বলেন না, ইংরেজিকে মনে করেন শত্রুর ভাষা; হোস্ট প্যারিসিয়ানদের চেহারা বিষন্ন। প্যারিসেও পকেটমার আছে, ঠক প্রতারক আছে, কফি ও পানীয়ের দাম বেশি, হোটেল ভাড়া আকাশ ছোঁয়া সব মিলিয়ে পর্যটকদের অনেকেই প্যারিস সিনড্রোম এড়াতে পারেন না।
মেগাসিটি প্যারিসের সমস্যাও অতিশয়। সরকারি ও বেসরকারি মালিকানায় ৬০টি নিশিযাপন কেন্দ্র রয়েছে, তাতে ১৫ হাজার মানুষের সংস্থান হয়। প্যারিসের কেন্দ্রেই গৃহহীন মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। প্যারিসবাসী বছরে মাথাপিছু ৪.২৫ টন জ্বালানি তেলের সমপরিমাণ জ্বালানি ভোগ করে। ভবিষ্যতে প্যারিসের জ্বালনি সংকট মোকাবেলার জন্য সৌরশক্তি ব্যবহার অনিবার্য। প্যারিসের ভবনগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পুরনো ধাচের হওয়ায় এগুলো উষ্ণ রাখতে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের প্রয়োজন।
প্যারিসের ভূ-গর্ভস্থ পয়ঃনিষ্কাশন টানেল ২৩০০ কিলোমিটার গার্হস্থ কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চ্যালেঞ্জ প্যারিসকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে। স্কাইস্ক্রেপার বেড়ে যাওয়ায় প্যারিসে আকাশ দেখা কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে। প্যারিসকে ধর্মঘটের শিকার হতে হয় বারবার।

প্যারিস আইকন আইফেল টাওয়ার
১৬৬৫টি ধাপ পেরিয়ে চূড়া। ১৮৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের শতবর্ষপূর্তি সামনে রেখে এবং সে বছর অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বমেলাকে স্মরণীয় করে রাখতে ২৮ জানুয়ারি ১৮৮৭-তে শুরু করে ৩১ মার্চ ১৮৮৯-এ ধাতব টাওয়ারটি যখন স্থাপন করা হয় এটিই ছিল পৃথিবীর সর্বোচ্চ স্থাপনা। ৪০ বছর এই রেকর্ড আইফেল টাওয়ার ধরে রেখেছে ১৯২৯ উদ্বোধিত নিউইয়র্কের উদবোধিত ক্রাইসলার বিল্ডিং প্যারিসের টাওয়ারকে ছাড়িয়ে যায়।
এই ধাতব দানবের নির্মাণ বন্ধ করার জন্য আন্দোলন হয়েছে মোপাসাঁসহ অনেক খ্যাতিমান লেখক এর নির্মাণ বন্ধ করতে চিঠিপত্র লিখেছেন। তারা এটাকে মনে করেছেন কুৎসিত। মোপাসাঁ টাওয়ারের নিচে একটি ক্যাফেতে বসতেন এবং এখানে বসার কারণ হিসেবে উল্লেখ করতেন প্যারিসে একমাত্র এই জায়গাটি থেকে কুৎসিত জিনিসটি চোখে পড়ে না। হিটলারও চেয়েছিলেন এই আইকনটি ধূলিসাৎ করা হোক।
এখনো বেশ বহাল আছে আইফেল টাওয়ার।

 

সাহিত্যে প্যারিস
ভিক্টর হুগোর ‘দ্য হাক্টব্যাক অব নতরদেম’ এমিল জোলার ‘দ্য লেডিস অব ডিলাইট হেনরি জেমসের ‘দ্য অ্যাম্বাসাডর।’ ‘অ্যা মুভেবল ফিস্ট’, সমারসেট মম-এর দ্য রেজর্স এস, গার্টুড স্টেইনের প্যারিস, ফ্রান্স, মার্গারেট ম্যাকমিলানের ‘প্যারিস ১৯১৯; সিক্স মান্থস দ্যাট চেইঞ্জড দ্য ওয়ার্ল্ড, ভ্যুলিয়া চাইল্ড-এর মাই লাইফ ইন ফ্রান্স, আর্নেস্ট হেমিংয়ের ‘দ্য সান অলসো রাইজেস’, অ্যানিস্টোয়ার হোর্ন-এর ‘সেভেন এজেজ অব প্যারিস ফ্রম দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড আপ’ ক্লদ ইজনার-এর ‘মার্ডার অন দ্য আইফেল টাওয়ার’ হেনরি মিলার-এর ‘ট্রপিক অব ক্যান্সার’, জেমস বল্ডউইন এর ‘জিওভানি’জ রুম’ রে ব্র্যাডবারির ‘উই উইল অলওয়েজ হ্যাভ প্যারিসঃ স্টোরিজ’, পাওলা ম্যাকলেইন-এর ‘দ্য প্যারিস ওয়াইফ’ এডমুন্ড হোয়াইট এর ইনসাইড অ্যা পার্ট মাই ইয়ার্স ইন প্যারিস এবং ‘দ্য লেটারস অব সিলভিয়া প্লাথ’।

 

কবিতা, জ্যামিতি , দর্শন ও স্থাপত্য


রফিক আজমের জন্ম পুরান ঢাকার লালবাগে, ১৯৬৩ সালে। স্থাপত্যে অভিনব ভাবনার জন্য তিনি দেশে ও দেশের বাইরে ব্যাপকভাবে পরিচিত। তার নির্মাণে নিসর্গের প্রাধান্য রয়েছে। প্রকৃতির সঙ্গে বিরুদ্ধতা নয়, ঐক্যের মাধ্যমে তিনি তৈরি করেন তার স্থাপনাগুলো। ১৯৯৫ সালে তিনি ‘সাতত্য’ নামে নিজের নির্মাণ প্রতিষ্ঠান দাঁড় করান। প্রতিষ্ঠানটি সবুজবান্ধব কাজের জন্য ইতোমধ্যেই ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। রফিক আজম বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে খ-কালীন শিক্ষকতার পাশাপাশি ভারত, পাকিস্তান ও সিঙ্গাপুরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ান। দেশে ও বিদেশে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মর্যাদাশীল পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। এসবের মধ্যে রয়েছে, সাউথ এশিয়ান আর্কিটেক্ট অব দ্য ইয়ার, ওয়ার্ড আর্কিটেকচারাল কমিউনিটি অ্যাওয়ার্ড, লিডিং ইউরোপিয়ান আর্কিটেক্ট ফোরাম, এ আর অ্যাওয়ার্ড ফর ইমার্জিং আর্কিটেক্ট ইত্যাদি। এ মুহূর্তে রফিক আজম পুরান ঢাকার কিছু পার্ক নতুন করে নির্মাণে কাজ করছেন। তবে নিজের তৈরি ভবন নয়, রফিক আজম কথা বলেছেন তার ভালোলাগা স্থাপনাগুলো নিয়ে। দেশ ও দেশের বাইরে এ স্থপতির প্রিয় স্থাপনাগুলো নিয়ে থাকছে এবারের এ আয়োজন।

প্যানথিয়ান ভবন, রোম

রোমের এ ভবনটা আমার ভালো লাগে প্রধানত এর আলোর খেলার জন্য। সম্রাট হেড্রিয়ান এটি তৈরি করেছিলেন। অবশ্য এটি আরো প্রাচীন। সেই প্রাচীন স্থাপনার কতটা হেড্রিয়ান নিয়েছিলেন, সেটা এখন আর জানা সম্ভব নয়। এর ছাদের মাঝামাঝি সূর্যের আলো প্রবেশের জন্য একটি ছিদ্র বা পথ রয়েছে। সেটা দিয়ে সারাক্ষণই আলো প্রবেশ করতে থাকে এর মধ্যে। আলোর জায়গাটা কোথায়? একদম চূড়ায়, চূড়ান্ত স্থানে। মানুষের মাথা যেমন সবচেয়ে ওপরে থাকে, তেমনি। তো, এ ভবনের সবচেয়ে সুন্দর জায়গাটা তিনি খুলে দিয়েছেন আলো প্রবেশের জন্য। এর মাধ্যমে তিনি একটি কসমিক রিলেশন তৈরি করতে চেয়েছেন। আলো প্রবেশের পথটি একটি সার্কেল। বৃত্তের যেহেতু কোনো শেষ থাকে না, এরও কোনো শেষ নেই। ফলে সারাটা দিনই কোনো না কোনোভাবে এখানে আলো প্রবেশ করছে। সময়ের সঙ্গে সেই আলোর খেলাটা পরিবর্তিত হতে থাকে। ভূমির সঙ্গে এখানে মহাজগতের সম্পর্কটি গভীরভাবে তৈরি হয়েছে। এটি খুব সাধারণ একটি বিল্ডিং। খুব জাঁকজমক নেই। সবচেয়ে কম চেষ্টায় সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্পর্ক এখানে তৈরি হয়েছে। এটা বিস্ময়কর। এটাকে আমার কাছে পুরোপুরি একটা স্বর্গীয় বিল্ডিং মনে হয়। এটা দেখেই কিন্তু আমাদের সংসদ ভবনের স্থপতি লুই আই কান অনুপ্রাণিত হয়েছেন। ওখানকার আলোর খেলার মূল ভাবনাটা কিন্তু এখান থেকে এসেছে। এটা তিনি নিজেই বলেছেন। সংসদের যেটা মূল জায়গা, যেখানে আমাদের সাংসদরা আলোচনায় বসেন, সেখানে কিন্তু আলো আসে।

 

বার্সেলোনা প্যাভিলিয়ন, স্পেন

বার্সেলোনাতে একটা প্যাভিলিয়ন হয়েছিল। ট্রেড ফেয়ার প্যাভিলিয়ন। এটা পরে ওরা ভেঙে ফেলেছিল। সাধারণভাবে মেলার প্যাভিলিয়নগুলো যে রকম মেলা শেষে ভেঙে ফেলে, তেমনি। কিন্তু ওটা এত সুন্দর হয়েছিল যে, লোকে আর ভুলতেই পারেনি। ওটা গাণিতিকভাবে নিখুঁত ছিল এবং সৌন্দর্যের দিক থেকে এতটা অপূর্ব ছিল যে, ওটা ওরা আবার বানিয়েছে। তারা মনে করেছে আর দশটা প্যাভিলিয়নের মতো এটি আসলে মেলা শেষে ভেঙে ফেলা যায় না। ১৯২৯ সালে এটি বানানো হয়েছিল। এর আর্কিটেক্টের নাম মেইস ভ্যান ডের রোহ। আধুনিক স্থাপত্যে যে কয়েকজন স্থপতি সবচেয়ে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, তাদের মধ্যে উনি একজন প্রধান ব্যক্তি। ওনার একটা মজার কথা ছিল ‘লেস ইজ মোর’। আজকাল আমরা অনেকেই এ কথাটা ব্যবহার করি। অর্থাৎ সবচেয়ে কম জিনিস ব্যবহার করে একটা শিল্পকলা তৈরি করা, যেটা আসলে সর্বোচ্চ আবেদন তৈরি করে। বার্সেলোনা প্যাভিলিয়ন কিন্তু এ রকম খুব মিনিমাম জিনিস দিয়ে তৈরি। দেখবেন দুটো দেয়াল, একটা ছাদ, একটা ফ্লোর, সেই ফ্লোরটা আবার কখনো পানি, কখনো ফ্লোর। এত কমসংখ্যক জিনিস দিয়ে তিনি এমন একটা আবহ তৈরি করেছেন যে, মনে হয় যেন এত সহজ, এত কম, কিন্তু এত ভালো লাগে কী করে! তো, এটা ওই সময়ে নতুন। এর আগে ক্ল্যাসিক্যাল যুগের আর্কিটেকচার যদি দেখেন, দেখবেন, এত কারুকাজ, এত জাঁকজমক সেখানে! অনেক নির্মাণ সেখানে, অনেক জিনিস দিয়ে নির্মাণ করা। অনেক বড় ধরনের, অনেক সময় নিয়ে করা সেটা বোঝা যায়। অর্থাৎ মোট কথা ক্ল্যাসিক্যাল যুগে যোগ করা ব্যাপারটা বেশি ছিল। কিন্তু এ স্থাপত্যের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলো, বিয়োগ করাটা বেশি। বাদ দিতে দিতে একদম মিনিমাম জায়গায় পৌঁছে গেলেন তিনি। ইতিহাস দেখল মিনিমাম জিনিস দিয়ে কী করে ম্যাক্সিমাম রেজাল্ট আসে। এ কারণে এটি ঐতিহাসিক এবং দার্শনিকভাবে পৃথিবীর ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সামন্ততান্ত্রিক সময়ের স্থাপত্য, যেমন ধরুন জমিদার বাড়ি বা এ-জাতীয় স্থাপনা থেকে বেরিয়ে এসে একটি মিনিমাম জিনিস দিয়ে নির্মাণ, ঐতিহাসিকভাবে স্থাপত্যের অনেক ধারণাই বদলে দেয়।

কান্ডালামা হেরিটেজ হোটেল, শ্রীলংকা

এটি নির্মাণ করেছিলেন শ্রীলংকান এক স্থপতি জেফ্রি বাওয়া। এটা যখন উনি তৈরি করতে চান, পরিবেশবাদীরা প্রচ রকমের প্রতিবাদ করেছে। এমনকি অনশন পর্যন্ত করেছে। ওরা বলতে চেয়েছেন, এ বনের ভেতর এ রকম একটি স্থাপনা বনটিকে ধ্বংস করে দেবে। জেফ্রি বাওয়া তাদের অনেক বোঝাতে চেয়েছেন। উনি বলেছিলেন, আমি যেটা তৈরি করছি, সেটা বনের একটা অংশ হবে। বনের সঙ্গে কোনো বিরোধ তৈরি করবে না বরং বনের সঙ্গে মিশে যাবে। কিন্তু পরিবেশবাদীরা সেটা বুঝতে রাজি হননি। তারা বিল্ডিং শুনে ভয় পেয়ে এটি করতে দেয়নি। ফলে প্রকল্পটি অনেক দিন বন্ধ ছিল। তারপর ধীরে ধীরে অনেক চেষ্টা করে একসময় করা হলো। করার পর দেখা গেল এটি সত্যিই বনের অংশ হয়ে উঠেছে। আমরা যে আজকাল গ্রিন আর্কিটেকচার নিয়ে এত কথা বলি, যেটা আসলে ক্যাপিট্যালিস্টদের টাকা আয়ের একটা পথ, যেখানে তারা কাচ বিক্রি করে, এসি বিক্রি করে। এর অনেক আগেই জেফ্রি বাওয়া এ হোটেলটি নির্মাণ করেছেন। আসলে স্থাপনায় গ্রিন ব্যাপারটা যদি সবচেয়ে ভালো কেউ বুঝে থাকেন, সেটি জেফ্রি বাওয়া। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত এটি নির্মিত হয়েছে। তখনো কিন্তু পৃথিবীতে গ্রিন বিল্ডিং নিয়ে এত হইচই নেই।
কিন্তু উনি জানতেন উনি কী করছেন। সত্যি সত্যি একটা স্থাপত্য তৈরি করেও একটা বন তো ধ্বংস হয়ইনি বরং বনের সৌন্দর্য বেড়ে গেছে। সাধারণত মানুষ কিন্তু কোনো একটা এলাকায় সেখানকার দর্শনীয় জিনিস দেখতে যায়, গিয়ে কোনো একটা হোটেলে থাকে। কিন্তু এখানে মানুষ শুধু এ হোটেলটিতে থাকতে যায়, দেখতে যায়। এটি নিজেই কিন্তু দর্শনীয় স্থান হয়ে উঠেছে। হাজার হাজার লোক এখানে লাইন ধরে থাকার জন্য। এখানে বুকিং পাওয়াই যায় না। এ জঙ্গলটা আগে কেউ দেখতই না, হোটেলের কারণে এখানে মানুষ আসে এবং এলাকাটি একটি পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। হোটেলটা যে বনটাকে উল্টো সমৃদ্ধ করেছে, এ রকম ইতিহাস কিন্তু আমরা কম দেখি। বরং সমসময় এর উল্টোটা হয়ে এসেছে।

 

সল্ক ইনস্টিটিউট, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

ইউনিভার্সিটি অব সান ডিয়েগোর একটা বিল্ডিং এটি, ল্যাব বিল্ডিং। এখানকার পরিচালক ছিলেন একজন নোবেল প্রাইজ বিজয়ী। তিনি লুই আই কানকে বলেছিলেন, এ রকম একটা স্থাপনা বানাতে হবে যেন পিকাসো এসে দেখে পছন্দ করেন। আপনি দেখেন একজন ক্লায়েন্টের চিন্তাটা কোন লেভেলের! আর্কিটেক্টকে বলছেন এমন বিল্ডিং বানাতে হবে যাতে পিকাসো এসে প্রশংসা করেন! লুই আই কান দার্শনিক ধরনের ছিলেন। উনি জালালুদ্দিন রুমির ভক্ত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও ভক্ত ছিলেন। এ কারণে ওনার কাজের মধ্যে দেখবেন এক ধরনের মিস্টিসিজম আছে।
যদিও উনি অনেক জ্যামিতিক কাজ করতেন, কিন্তু ওনার কাজের মধ্যে কবিতা থাকত। অন্যরা জ্যামিতিক কাজ করেছেন কিন্তু কবিতা আসেনি সেসব কাজের মধ্যে। উনার এসেছে, কেননা উনি ভাবনাচিন্তায় কবি। সল্ক ইনস্টিটিউট বিল্ডিংয়ের মাঝখানে একটা উঠান তৈরি করেছেন তিনি। উঠানটার মাঝখানে একটা পানির নালা আছে। যেখান থেকে একটা জায়গায় সশব্দে পানি পড়ে। কিন্তু ওই জায়গাটার শেষ মাথা হলো প্রশান্ত মহাসাগর, সেটা অনেক দূরে, কিন্তু দৃষ্টিসীমানার ভেতরে, তাকালে দেখা যায়। ফলে এমন একটা বিভ্রম তৈরি হয়েছে যে, মনে হয় আপনি যেন ওখান থেকেই প্রশান্ত মহাসাগরের পানির শব্দ শুনছেন। যদিও শব্দটা ওই নালা থেকে পড়া পানির। পানির শব্দটাকে আপনি বলতে পারেন সাইলেন্স। দুটি শব্দ কোয়াইট আর সাইলেন্স। কোয়াইট মানে হলো কোনো শব্দই নেই, কিন্তু সাইলেন্স হচ্ছে এক ধরনের নিস্তব্ধতার শব্দ। যেমন পাখির কিচির মিচির, পানি পড়ার শব্দ। নিস্তব্ধতার মধ্যে প্রাকৃতিক এক ধরনের শব্দ হচ্ছে, যেটা নিস্তব্ধতাকে আরো প্রকট করে তোলে। উনি ওখানে ওই সাইলেন্সটা তৈরি করেছেন। ফলে জায়গাটা একটা কবিতার মতো হয়ে উঠেছে। এটি যেন এক স্বর্গীয় যোগাযোগ তৈরি করে।

কবিতা, জ্যামিতি, দর্শন ও স্থাপত্য


রফিক আজমের জন্ম পুরান ঢাকার লালবাগে, ১৯৬৩ সালে। স্থাপত্যে অভিনব ভাবনার জন্য তিনি দেশে ও দেশের বাইরে ব্যাপকভাবে পরিচিত। তার নির্মাণে নিসর্গের প্রাধান্য রয়েছে। প্রকৃতির সঙ্গে বিরুদ্ধতা নয়, ঐক্যের মাধ্যমে তিনি তৈরি করেন তার স্থাপনাগুলো। ১৯৯৫ সালে তিনি ‘সাতত্য’ নামে নিজের নির্মাণ প্রতিষ্ঠান দাঁড় করান। প্রতিষ্ঠানটি সবুজবান্ধব কাজের জন্য ইতোমধ্যেই ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। রফিক আজম বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে খন্ডকালীন শিক্ষকতার পাশাপাশি ভারত, পাকিস্তান ও সিঙ্গাপুরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ান। দেশে ও বিদেশে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মর্যাদাশীল পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। এসবের মধ্যে রয়েছে, সাউথ এশিয়ান আর্কিটেক্ট অব দ্য ইয়ার, ওয়ার্ড আর্কিটেকচারাল কমিউনিটি অ্যাওয়ার্ড, লিডিং ইউরোপিয়ান আর্কিটেক্ট ফোরাম, এ আর অ্যাওয়ার্ড ফর ইমার্জিং আর্কিটেক্ট ইত্যাদি। এ মুহূর্তে রফিক আজম পুরান ঢাকার কিছু পার্ক নতুন করে নির্মাণে কাজ করছেন। তবে নিজের তৈরি ভবন নয়, রফিক আজম কথা বলেছেন তার ভালোলাগা স্থাপনাগুলো নিয়ে। দেশ ও দেশের বাইরে এ স্থপতির প্রিয় স্থাপনাগুলো নিয়ে থাকছে এবারের এ আয়োজন।

361bb70ef6967c257217534fdd73394d

চারুকলা ভবন, বাংলাদেশ
ফাইন আর্টস বিল্ডিং বা এখনকার চারুকলা ভবন স্থপতি মাজহারুল ইসলামের একটি চমৎকার কাজ। বাংলাদেশে এটাই প্রথম আধুনিক স্থাপনা, যেখানে আধুনিকতার সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক মিলে একটি ভিন্নতর কাজ হয়েছে। জলবায়ুর সঙ্গে স্থাপনার যে স¤পর্ক, সেটাকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছেন এ স্থপতি। এ ধারাটাও এ দেশে তিনিই তৈরি করেন। দক্ষিণের বাতাস, সূর্য, আলো সবকিছু হিসাব করেই এটি তৈরি করেছেন তিনি। বাতাসটা করিডোর দিয়ে ঢুকে ক্লাসের ভেতর দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। দারুণ একটা ব্যবস্থা! এভাবে একটি জায়গার নিজস্ব যে সৌন্দর্য সেটিকে ব্যবহার করে, তার প্রকৃতিকে ব্যবহার করে এ রকম আধুনিক স্থাপনা বাংলাদেশে এটাই প্রথম। সেদিক দিয়ে এ স্থাপনাটা আমার পছন্দের একটি।

1201875168_466_FT3364_iaa0934

সংসদ ভবন, বাংলাদেশ
সংসদ ভবন হলো আমাদের গর্ব করার মতো একটি স্থাপনা। এর বিশালতার জন্যও এটি অনন্য। যদি আপনি খেয়াল করেন, দেখবেন কংক্রিটের তৈরি এত বড় ওজনদার একটি স্থাপনা কিন্তু দেখলে মনে হবে যেন পানির ওপর ভেসে আছে। এই যে একটা ভারী জিনিসকে হালকা করে ফেলা, এটা কিন্তু দারুণ। আর এর ল্যান্ডস্কেপও আমাদের দেশকে ধারণ করে। আমাদের ল্যান্ডস্কেপ কিন্তু পানি। সেই পানির ওপর নৌকার মতো যেন ভাসছে এ ভবনটি। একটি দেশের শক্তি বোঝাতে কংক্রিটের এই বিশাল স্থাপনা তৈরি করেছেন। এটি একটি ভয়াবহ সৌন্দর্য, জোরালো এর আবেদন। এটিকে পানির সঙ্গে সম্পর্কিত করে দিয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছেন। আবার, শুধু বাইরে থেকে এটির পুরোটা বুঝে ফেলা অসম্ভব। এর ভেতরের আলোছায়ার খেলাটা অসাধারণ। এটি একটি উপন্যাসের মতো। আপনাকে পুরোটা পড়তে হবে বা দেখতে হবে। এটি আধুনিক একটি স্থাপনা এবং সেই সঙ্গে এ দেশের ঐতিহ্য থেকে উঠে আসা। অনেকটা প্রাচীন বৌদ্ধ বিহারেরও মিল পাবেন এর নির্মাণশৈলীতে। মাঝখানে যদি হয় মূল বিহারটা, এর চারপাশে শ্রমণদের থাকার এলাকা। সংসদ ভবন ঘিরে তৈরি হয়েছে সাংসদদের আবাসন। ফলে এটি ইতিহাসে ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিতও বটে। যদি দেখেন, কৃষ্ণচূড়ার সারি এর চারপাশে, সোনালুর সারি। পুরো জগৎটাকে বাংলাদেশের প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে বানানো হয়েছে। এভাবে এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছে।

 

NEW_ATH_ACROPOLIS_MUSEUM_01

অ্যাক্রোপলিস মিউজিয়াম, গ্রিস
গ্রিসের এথেন্সে অ্যাক্রোপলিস মিউজিয়াম বিশ্ববিখ্যাত ঐতিহাসিক পার্থানন বিল্ডিংয়ের খুব কাছে। ২০০৯ সালে এটি দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেয়া হয়। এটার একটা মজার ইতিহাস আছে। ব্রিটিশরা গ্রিকদের অনেক জিনিস চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল। সেগুলো ব্রিটিশ মিউজিয়ামসহ বিভিন্ন জায়গায় রাখা আছে। একসময় গ্রিকরা বলল, আমাদের জিনিস ফেরত দাও। তখন ব্রিটিশরা একটা অজুহাত দাঁড় করল। তারা বলল, তোমরা যে এগুলো ফেরত চাচ্ছো, এগুলো নিয়ে রাখবে কোথায়? তোমাদের তো একটা ভালো মিউজিয়াম নেই। তো, তখন গ্রিকরা বলল, ঠিক আছে তাহলে, আমরা মিউজিয়াম একটা বানাব, তারপর তোমরা ফেরত দেবে আমাদের জিনিস। তখন ব্রিটিশরা রাজি হলো, ওরা বলল, ঠিক আছে, তোমরা যদি রাখার জায়গা বানাতে পার, তাহলে আমরা ফেরত দেব। এরপর তারা প্রায় পনের বছর ধরে চেষ্টা করল। তো এভাবে বার্নাডশুমি নামের একজন আর্কিটেক্ট, খুব নামকরা, দার্শনিক ধরনের আর্কিটেক্ট, তিনিই কাজটা পেলেন। এর পুরো এলাকাটা একটা আর্কিওলজিক্যাল সাইট। তার ওপরে খুব কায়দা করে নতুন বিল্ডিংটা বানানো হলো। ওটা এমনভাবে বানানো হয়েছে যে, পায়ের নিচের কাচের ভেতর দিয়ে হাজার বছরের পুরনো সেই আর্কিওলজিক্যাল সাইটের প্রায় পুরোটাই দেখা যায়। কাচের মেঝের কারণে ওখানে হাঁটতে ভয় লাগে। কিন্তু এর বিশেষত্ব হলো, ওপর দিয়ে হাঁটার সময়ও আমরা কিন্তু নিচের জায়গাটির সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতে থাকি, সম্পর্কিত থাকি। আবার এর চারপাশে তাকালে দৃষ্টিসীমানার মধ্যে অনেক পুরনো জিনিসপত্র দেখা যায়। যেগুলোর অনেকগুলোই ব্রিটিশরা ফেরত দিয়েছে। বিল্ডিংটা এমনভাবে বানানো হয়েছে যে, বিল্ডিংটা ভোজবাজির মতো হাওয়া হয়ে যায়, নাই হয়ে যায়। শুধু হাজার বছরের প্রত্নতাত্তিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে আপনি ঘুরে বেড়াতে থাকেন। পুরনো দিনের অতভুতির মধ্যে আপনি বিচরণ করতে থাকেন ওখানে। তো, এ রকম ধারণা ও দর্শনের স্থাপনা আমি আর দেখিনি কখনো। ফলে এটিও আমার কাছে অভিনব, এবং পৃথিবীর ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য বলে আমার মনে হয়।

Boyd Art Center 2

বয়েড আর্ট সেন্টার, অস্ট্রেলিয়া
বয়েড আর্ট সেন্টার। বয়েড ছিলেন একজন ব্রিটিশ আর্টিস্ট। তিনি অধিকাংশ সময় অস্ট্রেলিয়ার ওই জায়গাটায় গিয়ে ছবি আঁকতেন। ওনার অনেক ছবি এ স্টোরটিতে সংরক্ষিত আছে। এখানে এখন আর্টিস্টরা আসেন, থাকেন, ছবি আঁকেন। এখানে একটা নদী আছে। নদীটার নাম সোল হ্যাভেন রিভার। এখানে গেলে মনে হয় একটা স্বর্গে এসেছি। এটি তৈরি করেছেন গ্লেন মার্কট। উনি আমার গুরু। আমি অনেক কিছু শিখেছি ওনার কাছে। ওনার স্থাপত্যে সুফি দর্শনের একটা প্রভাব রয়েছে। যেমন ধরুন, এর ছাদগুলো খুব চিকন, পাতলা। যদি আপনি গাছের পাতাকে দেখেন, তার যে বৈশিষ্ট্য, সেটাই যেন ধারণ করে এর ছাদগুলো। গাছের পাতা কেমন? খুব হালকা হয়ে বাতাসের সঙ্গে একটা সম্পর্ক স্থাপন করে, যেন দুলে দুলে কথা বলে বাতাসের সঙ্গে। আগার দিকটা চিকন হয়ে মিলিয়ে যায়, এমনই এর বৈশিষ্ট্য। তো, প্রকৃতির সঙ্গে, অনুষঙ্গের সঙ্গে যেন মিশে যায় এ স্থাপনাটি। পাতার মতো এর ছাদগুলো, যেন পুরো স্থাপনাটি ডানা মেলে উড়ে চলে যাবে এক্ষুণি। হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে। আবার এটি মাটিকে যেভাবে স্পর্শ করেছে, সেটা যদি খেয়াল করেন, দেখবেন এর খুঁটিগুলো খুব আলতো করে মাটিতে মিশে আছে। এমন ভঙ্গি, যেন মাটি কোনোরকম ব্যথা না পায়। তিনি বলতেন, মাটি হলো মা। একে এমনভাবে স্পর্শ করতে হবে যেন তার মধ্যে কোমল, পেলব একটা ব্যাপার থাকে। এ স্থাপনাটা এ রকম। এখানে বসলে মনে হবে আপনি ক্ষণিকের অতিথি। আপনার নশ্বরতার বোধ এখানে প্রকট হয়ে ওঠে। অস্ট্রেলিয়ায় এমনিতেই মানুষ কম, এখানে আরো কম। ফলে জায়গাটা নিস্তব্ধ, নিরিবিলি। জালালুদ্দিন রুমির ওই কথাটা মনে পড়ে এখানে এলে। তিনি বলেছিলেন, নীরবতা হলো ঈশ্বরের ভাষা। এর যেকোনো অনুবাদই দুর্বল। ফলে এ স্থাপনার নীরবতা স¤পর্কে আমি যা-ই বলি না কেন, সেটি খুব দুর্বল অনুবাদ হবে।

 

 

 

তাসনুভা রাইসা


সাধারণ মানুষ ‘আকাশ’কে আকাশ বলে কিন্তু একজন স্থপতি আকাশকে বলবে নীলিমা, তাদের দৃষ্টির সুদূরে সেটি শুধু আকাশ না, এটি একটা রঙ, যা বদলায় মেঘে বা রোদে। আর যে আকাশকে নীলিমা বলে, সে যখন কোনো স্থাপনার নকশা করেন, তার ভেতর দিয়েই সেই নীলিমা কীভাবে উপভোগ করা যায়, সেই ভাবনা দিয়ে স্থাপনায় সাহিত্য রচনা করেন। স্থপতি সুদূরের পিয়াসী, তারা কোথাও কোনো স্থাপনা থাকলে সেটাও দেখেন আর না থাকলেও দেখেন, কী হতে পারে শূন্য জায়গায়? ‘They Look up’ স্থপতিদের কাজকে চিহ্নিত করার জন্য আমেরিকা ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্ট ২০১৪ সালের শেষের দিকে আবার একটি ক্যাম্পেইনও চালায় ‘I Look up’ নামে যার মূল উদ্দেশ্য ছিল স্থপতির কাজকে চিহ্নিত করা। জীবনের চারপাশজুড়ে স্থপতিরা বিস্তৃত।
স্থাপত্য এবং ভ্রমণ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যে স্থপতিকে চেনে, সে জানে কেন তিনি সন্ধান করেন, কেন ভ্রমণ করেন। খাঁচার ভেতর অচিন পাখির আসা-যাওয়াটাকে মনবেড়ি দিয়ে পায়ে বেঁধে রাখতে জানে।
স্থপতি ভ্রমণের উদ্দেশ্য ও পছন্দ তা আলাদা, এ লেখায় স্থপতিদের প্রিয় কিছু স্থান নিয়ে আলোচনা করা হলো-

১. ক্ল্যাসিক্যাল এবং অকপট সৌন্দর্যের রোম নগরী
রোমান হলিডে চলচ্চিত্র যারা দেখেছেন, তাদের নিশ্চয়ই মনে আছে একঘেয়ে জীবনযাপনে হাঁপিয়ে ওঠা রাজকুমারী অ্যান ঘর থেকে পালিয়ে যায়, দেখা হয় এক সাংবাদিকের সঙ্গে এবং সব বাধা উপেক্ষা করে সাংবাদিকের সঙ্গে রোম শহরে ঘুরে বেড়ায়। সেই রাজকুমারী রোম শহরকে ঘিরে তার উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিল কয়টি লাইন দিয়ে, ‘Rome. By all means. Rome!’
পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন এবং গুরুত্বপূর্ণ ভবনের আবাসভূমি রোম সারা বিশ্বেরই পর্যটক, স্থপতি, ইতিহাসবিদ, প্রত্নতত্ত্ববিদদের আকর্ষণ করে। প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ এবং রেনেসাঁ চার্চগুলোর সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো, হাজার বছরের পুরনো স্থাপত্য আর ঐতিহ্যকে ধারণ করে রোম সবসময়ই গর্বিত। প্রাচীন শৌর্যবীর্য এবং গরিমার জন্য বিখ্যাত রোমান কলোসিয়াম, প্যালাটাইন হিল। কলোসিয়াম তার বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে বিখ্যাত মূলত সুদীর্ঘ ইতিহাস এবং বিচিত্র স্থাপনাশৈলীর জন্য। এমনকি রোম নগরীর রাস্তাঘাটে শুধু ঘুরে বেড়ালেও চোখে পড়বে অগণিত বারোক স্টাইলের প্রাসাদ এবং জমকালো ফোয়ারা। ২০০০ বছরের প্রাচীন ইঞ্জিনিয়ারিং মাস্টারপিসপ্যানথিওনের মহিমা আলোড়িত করে দর্শনার্থীদের। প্যানথিওন (The Pantheon) ভবন ইতালির অন্যতম একটি প্রাচীন নিদর্শন। ভবনটি রোমান সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তনকারী সম্রাট অগাস্তুসের (Augustus) শাসনামলে তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে ১২৬ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট হাদ্রিয়ান এটিকে পুনর্নির্মাণ করেন। সপ্তম শতক থেকে প্যানথিওন ভবন গির্জা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা যিশুখ্রিস্টের মাতা মেরিকে উৎসর্গ করা হয়। শতকের পর শতক কলোসিয়াম আর প্যানথিওন টিকে আছে খুব সামান্য বা কোনোরকম রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই। এর দীর্ঘস্থায়িত্ব নিয়ে গবেষণা হয়েছে প্রচুর। আসলেও আশ্চর্য ব্যাপার। সপ্তমাশ্চর্যের অন্যতম এক আশ্চর্য।
রোমের ভেতরেই বিশ্বের সবচেয়ে ছোট স্বাধীন রাষ্ট্র ভ্যাটিকান সিটিতে রয়েছে বিশ্বখ্যাত আর্কিটেকচারাল মাস্টারপিস এবং খ্রিস্টীয় ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের জন্য পবিত্র স্থান সেইন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকা। সেইন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকাতে মাইকেলেঞ্জেলো এবং বার্নিনির কাজের নিপুণতা এবং অনিন্দ্য সুন্দর উপস্থাপন সৃষ্টিশীল বা সাধারণ দর্শনার্থীদের মনোজগতে অনুরণন ঘটায়। সেইন্ট পিটার ব্যাসিলিকার ভেতরে রেনেসাঁ এবং বারোক আর্টের বহু মাস্টারপিসের নিদর্শন রয়েছে, যার মাঝে অন্যতম মাইকেলেঞ্জেলোর ‘পিয়েতা’. ইতালির কারারা মার্বেল পাথরের তৈরি অনন্য এ ভাস্কর্যে দেখা যায়, মাতা মেরির কোলে ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার পর যিশুর নিথর দেহ। রোমের পথে-প্রান্তরে প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ দেখতে দেখতে রোমের সেই পাগলাটে রাজার কথা মনে হবে, নিরো, যার খামখেয়ালিপনায় প্রতিপত্তিময় রাজকীয় রোম পতনের মুখে পড়ে।

 

EUBCPREHIGH-2

২. অ্যান্টোনিও গাউদির চোখ ধাঁধানো বার্সেলোনা

But man does not creat… he discovers nothing is art if it does not come form  nature.

-Antonio Gaudi
বার্সেলোনা শহরে গেলে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাওয়া লাগতে পারে, এক দল একে বলবে মেসির শহর, আরেক দল বলবে অ্যান্টোনিও গাউদির শহর। বার্সেলোনার স্থাপত্যের ২০০০ বছরের ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে রোমান ধ্বংসাবশেষ, গথিক ক্যাথেড্রালের সঙ্গে ক্যাটালান মডার্নিস্ট অ্যান্টোনিও গাউদির অনন্যপ্যাটার্নের স্থাপত্য।
একটা দেশের স্থাপত্যের নিদর্শন দেখতেই প্রতি বছর প্রায় ৩০ লাখ লোকের সমাগম ঘটে। কী তাদের এমন আকৃষ্ট করে? ক্যাটালান মডার্নিজম নিয়ে বিভিন্ন বইয়ের লেখক ‘তাতে ক্যাব্রে’ এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘মানুষ মনোমুগ্ধ হয়ে দেখতে আসে ‘লা ফ্যামিলিয়া সাগ্রাদা’ কারণ পুরো বিশ্বে এমন স্থাপনা একটিও নেই, এ চার্চের প্রধান অংশের ছাদ ৬০ মিটার পর্যন্ত উচ্চতা ছুঁয়েছে। এটির সৌন্দর্য দর্শনার্থীদের আচ্ছন্ন করে রাখে। লেখকের গবেষণায় কেউ কেউ এ চার্চ দেখতে ১০ বারেরও বেশি এসেছেন। বিংশ শতাব্দীতে এ ক্যাটালান মডার্নিজমের উত্থান ঘটে, যেখানে অনেক বেশি অর্গানিক কাঠামো যুক্ত করা হয়েছে। স্প্যানিশ স্থপতি গাউদিই এ ধারণার প্রবর্তক। অ্যান্টোনি গাউদি সুবিখ্যাত তার এ অর্গানিক কাঠামো এবং জাঁকালো রঙের ব্যবহারের জন্য। তার অসম্পূর্ণ মাস্টারপিস লা সাগ্রাদা ফ্যামিলিয়া, ১৩০ বছর পরও এখনো বহাল তবিয়তে টিকে আছে, এ বিশাল, বৃহদাকৃতির চার্চের অর্গানিক কাঠামো আগের সব প্যাটার্নকে ছাপিয়ে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এটি ছাড়াও বার্সেলোনা শহরকে তিনি সাজিয়েছেন নানা চোখ ধাঁধানো স্থাপত্যে।

 

৩. ইস্তাম্বুল, যুগে যুগে ইতিহাসে নিদর্শনের মহাসম্মিলন

Either I conquer Istanbul or Istanbul conquers me.

-Mehmed the Conqueror

If the earth were a single state, Istanbul would be its capital.

-Napoleon Bonaparte

উক্তিকারীর মধ্যে একজনের হাতে অটোমান সাম্রাজ্যের সূচনা হয়েছিল এবং আরেকজন জগদ্বিখ্যাত বীরযোদ্ধা নেপোলিয়ন ইস্তাম্বুলের গুরুত্বকে সমীহ করে বলেছেন।
সিল্ক রোডের শেষে দুই মহাদেশের ওপরে আছড়ে থাকা ইস্তাম্বুল হাজার হাজার বছর ধরে বাণিজ্য, শক্তি ও সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু। উত্তরাধিকারবলে এখানে গ্রিক, রোমান, বাইজানটাইন এবং অটোমান শাসনামলের স্মৃতিস্তম্ভ, প্রাসাদ এবং টাওয়ার রয়েছে। পরাক্রমশালী এ অটোমান শাসকদের নানা বিষয়ে উৎকর্ষের মাঝে সবচেয়ে উজ্জ্বলভাবে যা এখনো টিকে আছে, তা হলো অটোমান স্থাপত্যশৈলী। নান্দনিকতা, কারিগরি আর ইসলামী ভাবধারার ভারসাম্যে অটোমান স্থাপত্য শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার। ষষ্ঠ শতকের অসামান্য সৌন্দর্যমন্ডিত আয়া সোফিয়ার বাইজানটাইন ডোম এবং চমকপ্রদ মোজাইকের কারুকাজ ইস্তাম্বুলের ল্যান্ডমার্ক হিসেবে চিহ্নিত, যেটি ছিল বাইজানটাইন সাম্রাজ্যের সময়কার গির্জা; যা তারা পরে রূপান্তর ঘটায় সুন্দর এক মসজিদে। একই সঙ্গে নাম চলে আসে টপক্যাপি প্রাসাদ এবং আহমেদ সুলতান মসজিদ বা ব্লু মস্ক নামে পরিচিত। আয়া সোফিয়ার পাশেই এর অবস্থান। তুর্কি স্থাপত্যের রেনেসাঁর মূল কারিগর ছিলেন সিনান। তার সমসাময়িক মাইকেলেঞ্জেলোর সঙ্গে তাকে তুলনা করা হতো। তুর্কি ইতিহাসে সবচেয়ে সফল সুলতান-সুলতান সুলেমানের সময় মিমার পাশা প্রধান স্থপতি হিসেবে নিয়োগ পান। তার উল্লেখযোগ্য কীর্তির মধ্যে মিহরিমাহ মসজিদ, সুলায়মানিয়া মসজিদ, রুস্তম পাশা মসজিদ, খুররাম (হুররেম) সুলতান হাম্মামখানা এবং হাসপাতাল, সেলিমিয়া মসজিদ উল্লেখযোগ্য। তার নিজের জন্য যে ছোট সমাধি নির্মাণ করেছেন, তাও খুব দৃষ্টিনন্দন। যদিও মিমার সিনান নিজে তার কীর্তির মধ্যে সেলিমিয়া মসজিদকেই এগিয়ে রাখতেন, কিন্তু তার সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ সুলায়মানিয়া মসজিদ। সিনানের স্থাপত্যের অথবা অটোমান স্থাপত্যের একটা বৈশিষ্ট্য বিশালাকৃতির ডোম। যদিও এই ডোমাকৃতির স্থাপত্যের ইতিহাস অনেক পুরনো। জেরুজালেমের ডোম অভ রক বা দামাস্কাসের উমাইয়া মসজিদের গম্বুজের সবই এসেছে বাইজানটাইন চার্চের আর্কিটেকচার থেকে। আয়া সোফিয়ার বিখ্যাত ডোমই সিনানের জন্য অনুপ্রেরণা এবং বিশাল চ্যালেঞ্জ হিসেবে এসেছে। সিনান সার্থকভাবেই বাইজানটাইন আর্কিটেকচারের সঙ্গে ইসলামী আর্কিটেকচারের এক অসাধারণ ফিউশন করেছেন। তারই এক চমৎকার উদাহরণ এ সুলায়মানিয়া মসজিদ।
দৃষ্টিনন্দন এসব স্থাপনা নানা দিক থেকেই স্বতন্ত্র তো বটেই, একটি দিক থেকে একেবারেই আলাদা। তা হলো, স্থাপনাগুলোতে পাখির জন্য আলাদা নিবাসের ব্যবস্থা থাকা। নানা দুর্গ, মসজিদ আর প্রাসাদের দেয়ালের গায়ে ঝুলন্ত আকারে দেখা যাবে অবিকল বড় প্রাসাদের প্রতিরূপ। সেগুলো বানানো হয়েছে পাখপাখালি থাকার জন্য। আকাশে ওড়ার অনন্য ক্ষমতার কারণে সময়ের শুরু থেকেই পাখি ছিল মানুষের জন্য শিল্প ও আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণার উৎস। পাখি সর্বদাই শান্তি, মুক্তি এবং কখনো শক্তিরও প্রতীক। অভিকর্ষকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সদর্পে আকাশে ভেসে বেড়ানোর ক্ষমতার কারণে নানা সংস্কৃতিতে পাখিকে দেখা হয় এক আশ্চর্য সৃষ্টি হিসেবে। যার কারণে বিজ্ঞান আর শিল্পকলা উভয় জায়গাতেই ছিল পাখি নিয়ে মাতামাতি। তুরস্কের সংস্কৃতিতে ঘুঘু হচ্ছে ভালোবাসা এবং বিশ্বস্ততার প্রতীক, কবুতর হলো শান্তি এবং চড়ুইই পাখি ঘরের নিরাপত্তার প্রতীক। তুর্কি বিশ্বাস অনুযায়ী পাখির আবাস নষ্ট করা দুর্ভাগ্য বয়ে আনে। বাসাগুলো বানানো হয়েছে বড় বড় প্রাসাদের ক্ষুদ্র প্রতিকৃতি আকারে। বাইরের দেয়ালে লেগে থাকা বহুতল ভবনের মতো বাসাগুলোতে রয়েছে সূক্ষ্ম কারুকাজ, এমনকি ফোয়ারা পর্যন্ত! প্রাসাদের মতো দেখতে এ ক্ষুদ্র পাখির বাসাগুলো পাখির প্রতি অটোমান শাসকদের ভালোবাসা আর মমতার প্রতীক।

Istanbul-Topkapi-Palace

 

৪. নাগরিক জাদুঘর অক্সফোর্ড, লন্ডন
Our sweetest songs are those the tell of saddest thought.

-Percy Bysshe Shelley
ইংলিশ রোমান্টিক কবি শেলীর স্মৃতিবিজড়িত শহর অক্সফোর্ড। লন্ডন থেকে অক্সফোর্ড ৬০ মাইলের পথ। অক্সফোর্ড মূলত বিশ্ববিদ্যালয় শহরই। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরজুড়েই রয়েছে ইতিহাস ও ঐতিহ্যমন্ডিত সব স্থাপনা এবং দর্শনীয় স্থান। পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যে অক্সফোর্ড ইউরোপের শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা লাভ করে। এ পর্যন্ত অক্সফোর্ডে পৃথিবীর অনেক জ্ঞানী-গুণী, বিখ্যাত মানুষ লেখাপড়া করেছেন। এদের অনেকে বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস স্মরণীয় করে রেখেছেন। রোমান্টিক যুগের বিখ্যাত কবি শেলীর নামে একটি চত্বর হয়েছে। মাত্র ৩০ বছর বয়সে এ প্রতিভাবান কবি নৌকাডুবিতে মারা যান। তার অমর কীর্তি স্মরণ রাখার জন্য অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরটি তার নামে উৎসর্গ করা হয়েছে।
এ অক্সফোর্ডের প্রায় হাজার বছরের স্মৃতি বুকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে সেন্ট মাইকেল টাওয়ার। সেন্ট মাইকেলের সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠলেই চোখের সামনে মূর্ত হয়ে উঠবে হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা শহর অক্সফোর্ড। এখান থেকেই অক্সফোর্ডের সবচেয়ে বেশি চিত্রায়িত দলান রেডক্লিফ ক্যামেরাকে ভালোভাবে দেখা যায়। অক্সফোর্ড এর সবচেয়ে বেশি আইকনিক দালান রেডক্লিফ ক্যামেরাকে অক্সফোর্ডবাসীরা ডাকে রেড ক্যাম্প হিসেবে। ল্যাটিন শব্দ ক্যামেরা মানে ঘর। এই রেডক্লিফ স্কয়ারটিও অক্সফোর্ডের খুব পরিচিত একটি স্থান। তখন নির্মিত হয়েছিল বিজ্ঞান গ্রন্থাগার হিসেবে। এর পাশেই ১৬০২ সালে তৈরি হওয়া বোদলেয়ান লাইব্রেরি। আয়তনের দিক থেকে ব্রিটিশ লাইব্রেরির পরই এ বোদলেয়ান লাইব্রেরির স্থান। এর প্রবেশমুখের টাওয়ারটির ৫টি কলাম ৫টি স্থাপত্য রীতিকে প্রতিনিধিত্ব করে। ডরিক, টাসকান, আইওনিক, করিন্থিয়ান আর কম্পোজিট রীতির স্থাপত্য নকশা টাওয়ারটিতে দেখা যায়। আর পুরো অক্সফোর্ড সিটিতে ছড়িয়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবন এবং স্থাপনা। অক্সফোর্ডের কলেজের ভেতর ক্রাইস্ট চার্চ কলেজ এবং ম্যাগডালেন কলেজ যেমন বিশালাকার, তেমনই জাঁকজমকপূর্ণ। অক্সফোর্ডেই রয়েছে লন্ডনের প্রাচীনতম জাদুঘর অ্যাশমোলান। যারা পায়ে হেঁটে ঘোরাঘুরি করতে চান না, তারা ছাদ খোলা গাড়িতে সিটি ট্যুর দিতে পারেন। কানে লাগানো হেডফোনে চলতে থাকে শহরের বর্ণনা। বিশ্ব পর্যটকের সামনে অক্সফোর্ড সিটিকে নান্দনিক উপস্থাপনে এর ল্যাম্পপোস্টগুলোকে ফুল দিয়ে সাজানো থাকে। অক্সফোর্ডের আরেকটি স্থাপত্য নিদর্শন সেলডোনিয়ান থিয়েটার। ৮০০-১০০০ আসন বিশিষ্ট এ থিয়েটারেই সমাবর্তনের মূল অনুষ্ঠান হয়। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়টির দক্ষিণ ও পশ্চিম দু’দিক থেকে ঘিরে আছে টেমস নদী। টেমস নদীতে নৌকা বাওয়া শিক্ষার্থী ও পর্যটকদের কাছে খুব উপভোগের বিষয়। এ টেমসের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে মডলিন ব্রিজ ও মডলিন কলেজ। মডলিন অক্সফোর্ডের সবচেয়ে মনোরম স্থান। মডলিন কলেজের পাশে বেল টাওয়ার এক সময় অক্সফোর্ডের ল্যান্ড মার্ক হিসেবে পরিচিত ছিল।

Oxford-University-2-1

৫. এস্কেপ টু সাংহাই
” And the moon and the srars are

the same ones you see

it’s the same  old sun up in the sky/

heaven to me

like the breezes here in the old Shanghai.”

-John Denver
জন ডেনভার তার Shanghai breezes গানে প্রেমিকার কণ্ঠ শোনার স্বর্গীয় অনুভূতির সঙ্গে তুলনা করেছেন পুরনো সাংহাই শহরে বয়ে যাওয়া বাতাসের, এ সাংহাই চীনের সবচেয়ে বড় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি সুপরিকল্পিতভাবে ধরে রেখেছে তার প্রাচীন ঐতিহ্যকে আবার নিত্যনতুন ভবন নির্মাণে স্থাপত্য উৎকর্ষের মধ্য দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
‘এস্কেপ টু সাংহাই’ বহুল জনপ্রিয় একটি বাক্য, বলতে ও শুনতে ভালো লাগে, যদি ও এর পেছনের ইতিহাস রক্তাক্ত ও বেদনাক্লিষ্ট, একই সঙ্গে গৌরবের। জার্মানি নাৎসি বাহিনীর ভয়ে পালিয়ে আসা অসংখ্য ইহুদি পরিবারকে আশ্রয় দেয় সাংহাই। দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে এক অভূতপূর্ব বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার নিদর্শন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রক্তাক্ত ইতিহাসের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ব্যাটল অব সাংহাই। সাংহাইয়ের ইহুদি শরণার্থীদের বলা হতো ‘এস্কেপ টু সাংহাই’।
এবার সাংহাইয়ের আইকনিক কিছু স্থান থেকে ঘুরে আসা যাক। প্রথমেই বান্ড এলাকার কথা বলতে হবে। বলা হয়ে থাকে বান্ড দর্শন না করলে সাংহাই দর্শন বৃথা।
এক শতক ধরে ‘সাং হাই বান্ড’ একই সঙ্গে সাংহাই সিটিকে চেনার প্রতীক এবং গর্ব। হুয়াংপু নদীর পশ্চিম তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা বান্ড অঞ্চলজুড়ে রয়েছে পাশ্চাত্য এবং চাইনিজ স্থাপত্যের সমন্বয়ে ৫২টা ভবন। বান্ডের ভবনগুলোর স্থাপত্য তা আঠারো শতকের কলোনিয়াল ইতিহাসের ইতিহাস সমৃদ্ধ এক জীবন্ত জাদুঘর। বিশ্ব স্থাপত্য প্রদর্শনীর জন্য এ এলাকা সাংহাইকে করেছে অনন্য।
যেখানে ৫২টা ভবন অবস্থান করছে, সেখানে একই সঙ্গে গথিক, বারোক এবং নিও ক্ল্যাসিক্যাল ধারার স্থাপত্যের নিদর্শন রয়েছে। পাশ্চাত্যের নিদর্শন ছাড়াও চাইনিজ আর্ট ডেকো সমৃদ্ধ স্থাপত্যের নিদর্শন শুধু সাংহাইতেই দেখা যাবে আর বান্ড এলাকায় পাওয়া যাবে এমন কিছু ভবন।
চাইনিজ আর্ট ডেকো সমৃদ্ধ স্থাপত্য, পল্লবিত প্রশস্ত পথের ফ্রেঞ্চ কনসেশানের পাশাপাশি সাংহাই আকাশসীমায় সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা আধুনিক সব অনুষঙ্গসমৃদ্ধ সুউচ্চ ভবনের জন্য সাংহাই সিটি এক অন্য উচ্চতায় পদার্পণ করেছে।সাংহাইয়ের পুডংয়ে অবস্থিত বিশ্বের দ্বিতীয় সবচেয়ে উঁচু ভবন সাং হাই টাওয়ার, চায়নার বুকে দৃপ্ত এক প্রত্যয় নিতে দাঁড়িয়ে আছে।প্যাঁচানো সাংহাই টাওয়ারের ওপর বিশ্বের সর্বাধিক উচ্চতায় নির্মিত অবজারভেশন ডেস্ক। চমকপ্রদ টাওয়ার ব্লকটি প্রতিটির দিকে ছড়িয়ে পড়ে, সবচেয়ে স্পষ্ট সাংহাই ওয়ার্ল্ড ফাইন্যান্সিয়াল সেন্টার। আবার ৩৭ তলায় আছে গুনাফু মিউজিয়াম, হুয়াংপু নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে মিউজিয়ামের প্রদর্শনী উপভোগ করেন আগত দর্শনার্থীরা।
মাটিতে নেমে এলে আছে হিমালয়াস মিউজিয়াম যার বহির্ভাগের আবরণে মাটির শিকড় সদৃশ নকশা। সাংহাইয়ের পুডং-এ অবস্থিত ফ্যাশনেবল ল্যান্ডমার্ক স্থাপনা ওরিয়েন্টাল আর্ট সেন্টার। ফরাসি স্থপতি পল এন্ড্রুর নকশায় এ স্থাপত্টিকে দেখলে পাপড়ি মেলে থাকা ফুলয়ের মতো মনে হয়, ৫টি পাপড়ি আলাদা কাজের জন্য নির্মিত, একটা এন্ট্রান্স হল, পারফরম্যান্স হল, কনসার্ট হল, এক্সিবিশন গ্যালারি এবং অপেরা হল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

shanghai-china-ritz-carlton-shanghai-pudong-flair.jpg.1200x800_q85_crop

 

 

এম এ মোমেন


হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে শোনা গানটি একসময় শহরবাসীদের নাড়া দিত
শোনো বন্ধু শোনো
প্রাণহীন এই শহরের ইতিকথা
ইটের পাঁজরে লোহার খাঁচায় দারুণ মর্মব্যথা
এখানে আকাশ নেই এখানে বাতাস নেই
এখানে অন্ধগলির নরকে মুক্তির আকুলতা…

এই গানের বাণীতে মিথ্যে কিছু নেই, কিন্তু এটাও তো সত্য সব আকুলতাকে ছাপিয়ে যায় গ্রাম ছেড়ে শহরে আসার আকুলতা। এই আকুলতা কেবল বাংলাদেশে নয়, উন্নয়নশীল বিশ্বে সর্বত্রই। এর কারণ জীবিকার অন্বেষণ।
নগরের জীবন নৈব্যক্তিক, সম্পর্ক চুক্তিভিত্তিক, গতিশীল ও পরিবর্তনশীল এবং যৌক্তিকতাভিত্তিক। আজ বিশ্বায়নের উত্তরোত্তর তাড়না নগর থেকে উদ্ভূত।
নগর পত্তনের ইতিহাস প্রত্নতাত্ত্বিক হিসেবে প্রায় দশ হাজার বছরের। আজ থাকল লন্ডন শহরের গড়ে ওঠার কাহিনি।

রমেশচন্দ্র দত্ত ১৮৬৮’র এপ্রিল থেকে ১৮৬৯’র জুলাই পর্যন্ত লন্ডনে অবস্থান করেছেন। একই বছরের জুনে তিনি সিডেনহেম কাচের প্রাসাদ দেখতে গিয়েছিলেন। তারই বর্ণনা ‘উহা অতি বৃহৎ প্রকাণ্ড অট্টালিকা, পাতলা লৌহখণ্ডের গরাদিয়া দ্বারা সংযুক্ত চিকন কাঁচখণ্ডে নির্মিত। মধ্যদেশে একটা প্রকাণ্ড খিলান ও তাহার উভয় পার্শ্বে দুইটা দালান আছে। সূর্যকিরণে যখন ঝকমক করিতে থাকে তখন উহার দর্শন অতি চমৎকার। উক্ত প্রাসাদের বাহিরে দুর্ব্বাদন আচ্ছাদিত ক্ষেত্র প্রস্তও খণ্ড বিনির্মিত পদবী ও জ্যামিতিক আকারের ন্যায় অতি সুন্দর রূপে নির্মিত ফুলের চৌকা আছে।’
ভবনের স্থাপত্যশৈলী ও নির্মাণ-কুশলতা নিয়ে তিনি অনেক কথা লিখেছেন ‘এটা মনুষ্য-নির্মিত। সাথে আছে প্রকৃতির বৈচিত্র্য। ৮ নভেম্বর প্রাতে (লন্ডনে) শয্যা হইতে গাত্রোত্থান করিয়া দেখি, কি পথ, কি অট্টালিকা, কি উপবন, কি পাদপশ্রেণি সকলই তুষারে আবৃত। বোধ হইল যেন সকল পদার্থ রৌপ্যমণ্ডিত হইয়া রহিয়াছে।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘এক লন্ডন নগরের মধ্যে দরিদ্র্যশালায় প্রায় এক লক্ষ বিশ হাজার লোক প্রতিপালিত হইতেছে। তদতিরিক্ত অগণ্য অনাথ-নিবাস ও চিকিৎসালয় আছে। …এখানে জারজ ও অনাথ সন্তানগণের পালনার্থে একটি গৃহ আছে। আমি তথায় সর্বদায় গিয়া থাকি। এই দুঃখী সন্তানগণ মাতাকর্তৃক পরিত্যক্ত হওয়াতে তাহারা এখানে ভরণপোষণ ও শিক্ষাপ্রাপ্ত হয়।’
বিলেতে তাকে আকৃষ্ট করেছে মানুষের স্বাধীনতা। লন্ডনের মানুষের স্বাধীন জীবন দেখে তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘বঙ্গদেশে মানুষের স্বাধীনতা নাই’।
এই হচ্ছে দেড়শ বছর আগে বাঙালির চোখে লন্ডন।
অপর একজন বাঙালি পরিব্রাজক লন্ডনের আন্ডারগ্রাউন্ড অর্থাৎ মাটির তলায় সুড়ঙ্গপথে ভ্রমণে যেমন মুগ্ধ, তেমনি বিষ্মিত উপরের দৃশ্য দেখে। তার বয়ান, ‘ভূতল ছাড়িয়া নভোমণ্ডলের দিকে একবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করি। দেখিতে পাই আকাশপথ তারজালে আচ্ছন্ন; টেলিগ্রাফ তারের ঠাসবুনানি মাকড়সার জালকে হার মানাইয়াছে।’
বলা আবশ্যক, উপরের দিকে তাকিয়ে বিজ্ঞাপনের বোর্ড দেখা যায়, কিন্তু তার দেখা যায় না, তারও বেছে নিয়েছে ভূগর্ভস্থ পথ। টেলিগ্রাফের যুগ শেষ হয়ে গেছে। তার-নির্ভর প্রযুক্তিও বাতিল হতে চলেছে।’

কারিকা ডেক্স


চলছে বর্ষা-মৌসুম। বৃষ্টির ছোঁয়া পেয়ে নগরীর ধুলিমাখা ধুসর গাছগুলোও নিজেদের ধুয়েমুছে সবুজে সাজাচ্ছে আর চারা-গাছগুলোও নতুন ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। কারণ ঝুমবৃষ্টির এই বর্ষাই গাছের সুসময় আর গাছ লাগানোর উপযুক্ত সময়। ফলে এই বর্ষায় গাছ লাগিয়ে শহরে আমাদের বাড়ির ফাঁকা ছাদগুলোও ভরিয়ে তুলতে পারি সবুজে-সবুজে। পাশাপাশি ছাদের উন্মুক্ত জায়গাগুলো ফাঁকা না রেখে উৎপাদন করতে পারি বিভিন্ন শাক-সবজিও। তৈরি করতে পারি পরিবারের জন্য টাটকা ও বিষমুক্ত শাক-সবজি খাওয়ার একটা সুযোগ।
টব, ট্রে, পরিত্যক্ত বালতি, বস্তা, বোতল বা হাফ ড্রাম অথবা জিও ফেব্রিক ব্যাগ বা অন্য কোনো সুবিধামতো পাত্রে অথবা স্থায়ী বা অস্থায়ী বেড করে মাটির সঙ্গে প্রয়োজনীয় সার মিশিয়ে ছাদে শাক-সবজি চাষ করতে পারি। বর্ষাকালে ছাদে সহজেই শসা, ঝিঙা, চিচিঙ্গা, কাকরোল, চালকুমড়া, বেগুন, বরবটি, ঢেঁড়শ, পুইশাক, লালশাক, ডাঁটা, পাটশাক, গিলকলমি, করলা ইত্যাদি চাষ করা যায়। ছাদে সবজি চাষ করার আগে ভাবতে হবে যে কোথায় কোথায় সারাদিন রোদ পড়ে, কোথায় বা কোন অংশজুড়ে পাশের বিল্ডিংয়ের ছায়া পড়ে। সে অনুযায়ী কোন অংশে কোন সবজি লাগানো যায় তার পরিকল্পনা করতে হবে ও সে অনুযায়ী দরকারী জিনিসপত্র যোগাড় করতে হবে। এরপর ছাদের অবস্থান ও আকার অনুযায়ী একটি নকশা তৈরি করতে হবে। স্থায়ী বা অস্থায়ী বেডে স্বল্প খরচে শাক-সবজি চাষ করতে চাইলে কিছু বিশেষ পদ্ধতি ও পর্যায় অনুসরণ করতে হবে। যেহেতু একটি বেড বেশ বড় হয় এবং সহজে স্থান পরিবর্তন করা যায় না, তাই এটি স্থাপনের আগে ভালোভাবে দেখে-বুঝে স্থাপন করতে হবে। বেডটি একটি কাঠামোর ওপর মূল ছাদ থেকে ৬ থেকে ৮ ইঞ্চি উঁচু করতে হয়। কাঠামোটি কাঠের খুঁটি বা কাঠের ফ্রেম অথবা ইট বা লোহার ফ্রেমের ওপর স্থাপন করতে হয়। জিআই পাতের বড় ট্রে ও বেড তৈরিতে ব্যবহার করা যায়। এমনকি ফেলে দেয়া বাথটাবেও সবজির বেড তৈরি করা যায়।
প্রথমে বেড তৈরির কাঠামোর জন্য কী কী জিনিস লাগবে তার হিসাব বের করুন। সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করুন। কী ধরনের উপকরণ ব্যবহার করা হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এই কাঠামো হালকা যেকোনো কিছু দিয়েই করা যেতে পারে, যা কাঠামোর ভেতরে আলগা মাটিকে ধরে রাখে এবং ওজনে কম হয়। চেরাই কাঠের তক্তা বা প্লাস্টিকের উড ব্যবহার করে বেডের চারপাশের কাঠামো তৈরি করা সহজ। নিচে তক্তা বা টিনও ব্যবহার করা যেতে পারে, যার ওপর পলিথিন বিছিয়ে দেয়া ভালো। এতে বেডে সেচ দেয়া পানিতে তক্তা বা টিন নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে না। তবে ছাদ ড্যাম-প্রুফ বা ওয়াটার-প্রুফ করে নিলে ছাদের ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে না বললেই চলে।
তবে বেডের কাঠামোটি স্থায়ী হিসেবে ইট বা কংক্রিট দিয়ে করতে চাইলে ছাদ ড্যাম-প্রুফ করে তৈরি করতে হবে। তা না-হলে বাতাস চলাচল সহজ হয় না এবং ছাদ আর্দ্র বা স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে পড়ে। স্থায়ী বা অস্থা যে ধরনের বেড হোক-না কেন, অর্ধেক মটি ও অর্ধেক কম্পোস্ট দিয়ে ভরতে হয়। কম্পোস্ট না থাকলে মাটির তিন ভাগের এক ভাগ গোবর দিতে হবে। যে সবজিই লাগাবেন, সেগুলো সারি করে লাগানো ভালো। তাতে ছাদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়।

কারিকা ডেক্স


সবুজ ভবনের ধারণা শুরুতে যতটা মনে করা হয়েছিল, তারচেয়ে বেশি দ্রুততার সঙ্গে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। একেকটা ভবন যেমন মানুষের কাজের জন্য নির্মিত হয়, একইভাবে এটা অবসর আর বিনোদনের কাজেও আসে। দালান-কোঠাকে এড়িয়ে চলা আধুনিক এই নগর জীবনে সম্ভব নয়। যুগের চাহিদা থাকার কারণে ইট-কাঠ-পাথরের ভবনই এখন পরিবেশ রক্ষায় রাখছে ভূমিকা।

কিন্তু পৃথিবীর মোট ব্যবহৃত শক্তির ৪০ শতাংশ এই ভবনগুলোর পেছনে ব্যয় হয়। মোট কার্বন নিঃসরণের ৪০ শতাংশও আসে এসব ভবন থেকে। তাই সম্প্রতি এক হাজার পরিবেশবান্ধব মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে ইন্দোনেশিয়ায়। রেকর্ডসংখ্যক কোম্পানি একত্রিত হয়েছে সারা বিশ্বে অতিমাত্রায় ব্যবহারের কারণে বালির যে সংকট তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করতে।

টেকসই উন্নয়নের পথে হাঁটছে রেকর্ডসংখ্যক রিয়েল স্টেট ফার্ম
রেকর্ডসংখ্যক রিয়েল স্টেট কোম্পানি আগ্রহ প্রকাশ করেছে সবুজ প্রকল্প নিয়ে কাজ করতে এবং তাদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে সামাজিক সেবার মান। শক্তির ব্যবহার, বর্জ্য-ব্যবস্থাপনা ও সেটার পুনর্ব্যবহার, পানির ব্যবহার সবকিছুতে আধুনিকায়নের কারণে এসবের প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক টেকসই রিয়েল স্টেট বেঞ্চমার্ক জরিপে। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের ১২৪টি কোম্পানি নিজেদের পরিবেশবান্ধব টেকসই উন্নয়নে অংশীদার হয়েছে। এর অর্ধেকের বেশি কোম্পানি এসেছে অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ড থেকেও।

৩.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের সুযোগ
দ্রুতগতিতে নগরায়ণের কারণে বর্তমানের চেয়ে ভবনের সংখ্যা ২০১৫ সালে ২৫ শতাংশ বাড়বে। ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশনের জরিপ বলছে, একই সময় সবুজ ভবন নির্মাণে বিনিয়োগ বেড়ে দাঁড়াবে ৩.৪ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত। ফিলিপাইনের আইএফসি কান্ট্রি ম্যানেজার ইউয়ান জু বলেন, ‘সবুজ ভবনের যে বাজার সেখানে আলোড়ন তুলতে পারলে এই খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ আরো বাড়বে।’

 

biophilia-1024x683

ভালো মানের নির্মাণের জন্য ভালো মানের উপকরণ
আগেকার সেই মাটির ঘরের যুগে ফিরে যাওয়া গেলে সেটাই পরিবেশের জন্য সবচেয়ে বেশি ভালো হতো। হতো আর্থিকভাবেও অনেক সাশ্রয়ী। সম্প্রতি শ্রীলংকার এক গবেষণা বলছে এমন কথা। এমআইটির গবেষকরা কংক্রিটকে কীভাবে আরও পরিবেশবান্ধব করে তোলা যায়, সেটা নিয়ে কাজ করছেন। টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানের বাজারও দিন দিন বেড়েই চলেছে। ২০২৬ সাল নাগাদ এটা উঠতে পারে ১২৭ বিলিয়ন ইউএস ডলার পর্যন্ত!
অবশ্য এতকিছুর পরও ভবন নির্মাণে সেই বালুর চাহিদা কিন্তু কমছে না মোটেও। এ ব্যাপারটা পরিবেশকে আরো বেশি হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

সবুজ ভবনের চেয়েও বেশিকিছু
কেবল সবুজ ভবন নির্মাণ করেই কার্বনের পরিমাণ যতটা কমানো দরকার, ততটা সম্ভব নয়। অন্তত জার্মান পরিবেশ প্রকৌশল ফার্ম ট্রান্সসোলারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক থমাস অর তেমনটাই মনে করেন। গেল বছর হংকংয়ে ওয়ার্ল্ড সাসটেইনেবল এনভায়রনমেন্ট কনফারেন্সে ইকো-বিজনেসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় না এই প্রযুক্তি আমাদের যেখানে পৌঁছানো দরকার, সেখানে পৌঁছে দিতে পারবে। তবে এটাও সত্যি, পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে এই সবুজ ভবনের ধারণা। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের আচরণেও পরিবর্তন আনতে হবে। তাহলেই লক্ষ্য অর্জিত হবে।’

পরিবেশবান্ধব মসজিদ
মুসলমানদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হিসেবে এক হাজার পরিবেশবান্ধব মসজিদ নির্মিত হচ্ছে ইন্দোনেশিয়ায়। দেশটির শীর্ষ ধর্মীয় সংগঠন ইন্দোনেশিয়ান উলেমা কাউন্সিলের (এনইউআই) উদ্যোগে নির্মিতব্য এসব মসজিদে ব্যবহার করা হবে নবায়নযোগ্য শক্তি। পানির যাতে সর্বোচ্চ সাশ্রয় করা যায় থাকবে সে ব্যবস্থা। থাকছে উন্নত বর্জ্য-ব্যবস্থাপনাও। একই সঙ্গে এই মসজিদগুলো হবে পরিবেশ-সংক্রান্ত শিক্ষার কেন্দ্র।
এমইউআইয়ের এক মুখপাত্র বলেন, ‘ইন্দোনেশিয়ার মুসলিমরা সরকারের চেয়ে এই ধর্মীয় সংগঠনের সিদ্ধান্তকে বেশি মানেন। তাই তাদের এমন উদ্যোগ নিঃসন্দেহে দেশের জনপ্রিয় প্রজেক্ট হতে যাচ্ছে।’

মুস্তাফা খালিদ পলাশ


স্থাপত্যের সঙ্গে কেটে যাচ্ছে দীর্ঘদিন। ১৯৮১ সালে বুয়েটে ভর্তি হয়েছি। শুরুতে স্থাপত্যকে একভাবে দেখেছি, শিক্ষাজীবনে আরেকভাবে, পেশাগত জীবনে অন্যভাবে। এখন তিন দশকেরও বেশি সময় পর এসে যদি প্রিয় স্থাপনার কথা বলি, তাহলে এক কথায় বলব সংসদ ভবন।
আমার মনে হয় বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের প্রত্যেকেরই প্রিয় স্থাপনা সংসদ ভবন। এমনকি ১৯৬১-৮২ সালে লুই আই কানের ডিজাইনে তৈরি আমাদের এ সংসদ ভবনটি বিশ্ব দরবারেও প্রিয়। কারণ স্থাপত্য বলতে কেবল একটি ভবনকে বোঝায় না, শিল্পকেও বোঝায়। কিন্তু সব স্থাপত্য শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছতে পারে না। সব ভবন কবিতার মতো হয় না। মানে, গদ্য খুব সহজ একটি জিনিস। এটা ভেঙে বলা যায়। কিন্তু কবিতা তা নয়। একটা মোটা বইয়ের উপন্যসের মাধ্যমে যতটা-না বলা যায়, অনেক সময় একটা কবিতায় তার থেকে বেশি বলা সম্ভব। কবিতা আমার কাছে পেইন্টিংয়ের মতো। একটি পেইন্টিংয়ের মাধ্যমে যেমন অনেক কিছু বোঝানো যায়, তেমনি স্থাপত্যেরও কিছু বিশেষ দিক রয়েছে। এটা হলো ব্যবহারিক শিল্প। স্থাপত্য হলো একটা স্থানু বা সেডেন্টারি শিল্প-মাধ্যম। স্থাপত্যে যখন ব্যবহারের বিষয় চলে আসে, তখন তা কতটা শিল্প আর কতটা ব্যবহারিক সে বিষয়ে তুল্য জলাংকে মাপার বিষয়ও চলে আসে।

সংসদ ভবন এসবের মাত্রা অতিক্রম করেছে। এটিকে আমরা স্কাল্পচার বলতে পারি, কবিতা বলতে পারি এমনকি অ্যাবস্ট্রাক্ট পেইন্টিংও বলতে পারি। অ্যাবস্ট্রাক্ট পেইন্টিং বলছি, কারণ আমরা যে রিয়েলিস্টিক পেইন্টিং করি, তা অনেকটা ভেঙে ভেঙে গদ্যের মতোই করি। সেখানে বলে দেয়া থাকে এটা গাছ, এটা নদী, এটা নালা ইত্যাদি। কিন্তু অ্যাবস্ট্রাক্ট পেইন্টিংয়ে বিমূর্ততা আছে। বিমূর্ততা হলো এমন জিনিস, যেখানে একেকজন দর্শক ছবিটি দেখে নিজের মতোই অনুধাবন করে। সেই অর্থে সংসদ ভবন শিল্পমান অর্জন করেছে। বিশ্বব্যাপী তার সমাদরও অনেক বেশি।
দ্বিতীয়ত, আমাদের স্থাপত্যের ধারাবাহিকতা বা ঐতিহ্য কিন্তু খুব প্রাচীন নয়। আমরা কিন্তু নগর-সভ্যতায় অভ্যস্ত জাতি নই। আমরা কৃষক জাতি। মাটির ঘর, বেড়ার ঘর এগুলোই আমাদের ছিল। আমাদের স্থাপত্যের আধুনিক ধারার মূল সূত্রপাত হয়েছে সংসদ ভবন থেকে। লুই আই কান একজন বিদেশি স্থপতি হয়েও আমাদের জলবায়ু, আমাদের ম্যাটেরিয়ালকে কনসিডার করেছেন। তিনি আমাদের এ আবহাওয়ার জন্য অত্যন্ত নতুন, রেজিলিয়ান, ডিউরেবল ও সাসটেইনেবল ম্যাটেরিয়াল উপহার দিয়ে গেছেন, যা আমরা এখন ব্যবহার করছি। সংসদ ভবনে খুব সহজ ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করা হয়েছে। এটির অনেক অ্যান্সিলারি স্ট্রাকচার আছে। যদি বলি একটা মালার কথা, তাহলে লকেট অর্থাৎ মূল ভবন নিরেট কংক্রিটের তৈরি। সেই সময়ে ওই ধরনের একটা স্থাপনা চিন্তা করা, নির্মাণ করা বা সেটা ধারণ করা বেশ কষ্টসাধ্য ছিল। ধরুন আমি অনেক কিছু করলাম কিন্তু যে গ্রাহক, গ্রাহক বলতে আমি এ জাতিকে বোঝাচ্ছি, আমাদের সেটাকে ধারণ করতে প্রথমদিকে কিছুটা কষ্ট হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যখন আমাদের ইন্টেলেকচুয়াল অ্যাবিলিটি বেড়েছে, আমরা স্বাধীন জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছি, তখন আমরা মনে করেছি, এ কংক্রিটের সংসদ ভবন আমাদের নতুন স্থাপত্যের সূচনা। পুনঃসূচনাও বলা যেতে পারে। আমি আগেই বলেছি, আমাদের তো আসলে সেরকমভাবে নগর স্থাপত্য ছিল না। এখান থেকেই সূচনা বা পুনঃসূচনা হয়েছে।

s-01

সংসদ ভবন

স্থপতি মাজহারুল ইসলাম এবং স্থপতি লুই আই কানের মাধ্যমেই আমাদের আধুনিক স্থাপত্যের সূচনা বা সূত্রপাত হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় আমরা এখনো কাজ করে যাচ্ছি। তবে মাঝে কিছুটা বিঘ্নিত হয়েছে। আগেই বলেছি, আমরা ছিলাম কৃষক জনগোষ্ঠী। আর ধনাঢ্য জনগোষ্ঠী ছিল হিন্দু। হিন্দুদের যে জমিদার বাড়ি ছিল সেগুলোর নকশা তারা বাইরে থেকে করে নিয়ে আসত। এরপর আমরা যখন বড়লোক হলাম তখন বিপদটা ঘটল। আশির দশকে এসে আমরা বিপদটা অনুভব করলাম। তখন নব্য বড়লোকেরা সংসদ ভবনকে পাশ কাটিয়ে নতুন ধারা তৈরি করার চেষ্টা করল। ভিক্টোরিয়ান স্টাইল। বড়লোকরা ভাবত আমিও জমিদারদের মতো একটা বাড়ি বানাব, যেখানে আমার গ্রামের লোকেরা এসে স্যান্ডেল খুলে ভেতরে প্রবেশ করবে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, নব্বইয়ের দিকে এসে এ ধারা উবে যেতে থাকল। আবার সেই পিওরিটিতে আমরা ফিরে আসতে থাকলাম। পিওরিটি বলতে বোঝাচ্ছি কসমেটিক ছাড়া। যেমন সংসদ ভবনে কোনো কসমেটিকের কাজ নেই। অর্থাৎ ওটা যে ম্যাটেরিয়াল দিয়ে তৈরি, সেটারই প্রতিফলন দিচ্ছে।
আমরা অনেকেই মনে করি আমাদের স্থাপত্যের মূল উৎস কী হবে। এটা নিয়ে অনেক দ্বন্দ্ব আছে। আমার মতে, আমাদের স্থাপত্যের উৎস হচ্ছে স্বচ্ছতা। আমি মানবিক অর্থে স্বচ্ছতার কথা বলছি, কাচের স্বচ্ছতা না। অর্থাৎ আমি যা, তা-ই। আমরা নব্য বড়লোকের কথা বলতে পারি। যেমন সিঙ্গাপুর। সিঙ্গাপুরের নব্য বড়লোকেরা ছিল মূলত জেলে-গোষ্ঠী। চায়নার নিন্মবর্ণের চাইনিজরা একসময় সিঙ্গাপুরে থাকত। এরপর মালয়েশিয়া যখন সিঙ্গাপুর থেকে আলাদা হয়ে গেল, তখন সিঙ্গাপুরের ওই চাইনিজরা টাই পরে ফিটফাট বাবু হয়ে গেল। আবার মালয়েশিয়াতে গেলে আপনি অরিজিনাল কিছু চাইনিজের দেখা পাবেন। তারা কিন্তু টি-শার্ট পরেই দিব্যি অফিস করছে। যারা মাটির থেকে তৈরি হয়, তারা কিন্তু ওইসব বেশভূষা প্রাধান্য দেয় না। বেশভূষা তারাই প্রাধান্য দেয়, যারা মেকি।

স্থাপত্যে মেকি বিষয়ে আমরা বিশ্বাস করি না। গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, মাজহারুল ইসলামবা সংসদ ভবন থেকে উৎসরিত বিষয়গুলোর ভালো জিনিসগুলো নিয়েই আজ আমরা স্থাপত্যচর্চা করছি। প্রত্যেক স্থপতি এখন কয়েকটি বিষয় নিয়ে খুব সচেতন। কারণ স্থাপত্যের তো অনেক ভাষা থাকে, যেমন ইন্টারন্যাশনাল স্টাইল, রিজিওনাল, ডি-কনস্ট্রাকডিভ ইজম ইত্যাদি থেকে বেছে আমরা কিন্তু আমাদের একটা নিরেট স্থাপত্যধারা বের করতে পেরেছি। যেখানে পাশ্চাত্যের সঙ্গে আমাদের ভাবধারা, আমাদেরর ভ্যালুজ, মূল্যবোধ ইত্যাদির সংমিশ্রণ হয়েছে। এর মধ্যে কিছু কিছু এক্সপেরিমেন্ট হচ্ছে, যেমন আমরা যারা শহরে কাজ করছি তারা এক ধরনের কাজ করছি, কেউ কেউ রি-সাইকেল ম্যাটেরিয়াল নিয়ে কাজ করছে। কেউ গ্রামীণভাবে কাজ করার চেষ্টা করছে। গ্রামীণ স্টাইল নিয়ে কাজ করা যেতেই পারে। তবে ভবন যদি ২০তলা হয়, সেখানে এ স্টাইল সম্ভব না। কারণ এত বড় ভবন বাঁশ, বেত কিংবা মাটি দিয়ে নির্মাণ করা সম্ভব না। মাটি দিয়ে রিসোর্ট করা যেতে পারে।

আমাদের স্থপতিরা এখন খুব ভালো ভালো কাজ করছে। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশ থেকেও পুরস্কার পাচ্ছে। আমি মনে করি, একটি দেশের আর্কিটেকচার-চর্চার যদি এক শতাংশকেও আপনি শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেন, তাহলেই সেটাকে সার্থক বলা যায়। বর্তমানে আমরা সেই অবস্থাতেই আছি।
লুই আই কানকে মাস্টারপ্ল্যানের জন্য দেয়া হয়েছিল ২০০ একর জমি। কিন্তু তিনি কাজ করেছিলেন ৬০০ একর জমির ওপর। সত্যি বলতে কি, যেকোনো ভালো কাজ ধরে রাখাই কঠিন, যদি সামগ্রিক চাপ থাকে। আমাদের সবচেয়ে বড় চাপ হচ্ছে, আমদের জনসংখ্যার চাপ। এ চাপেই ঢাকা শহরের যেখানে একতলা, দুইতলা ভবন ছিল সেখানে বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে। প্রয়োজন থেকেই এটা উৎসরিত হচ্ছে। এত চাপের মধ্যেও আমরা আর্কিটেকচারকে জলাঞ্জলি দিচ্ছি না। যেমন সংসদ ভবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আসলে নিরাপত্তার পরিপ্রেক্ষিত পরিবর্তন হয়েছে। সংসদ ভবনে যেন দেয়াল তুলে দেয়া না হয়, এজন্য আমরা স্থপতিরা নিষেধ করেছি। কিন্তু নিরাপত্তার কিছু অঙ্ক আছে। সে অঙ্কও আপনাকে বুঝতে হবে। কারণ একজন মানুষ যতটাই আবেগ দিয়ে তাড়িত হোক না কেন, মনে রাখতে হবে নিরাপত্তার অঙ্ক, সেটা কেবলই অঙ্ক। সেটা কবিতা নয়, একটা নিরেট বিজ্ঞান। সেই বিজ্ঞানে তাদের মনে হয়েছে তাদের সেটা ঢাকতে হবে। দেয়াল সবসময় দূরত্ব তৈরি করে। তাই আমরা আন্দোলন করে যতটা পারা যায় নিরেট না করে পারফোরেটেড করাতে পেরেছি। ভেতরেও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। তবে আমাদের জন্য আশার কথা হচ্ছে, বর্তমান সরকার সংসদ ভবনকে আগের চেহারায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। সেই অনুসারে কাজও শুরু হয়েছে। যেমন সংসদ ভবনের নির্মাণের অনেক বছর কেটে গেলেও তার ফার্মেও কিছু ফি বাকি ছিল, এ সরকার তার এক্সপার্ট টিম পাঠিয়ে ফি পরিশোধ করে সব ড্রইং নিয়ে এসেছে। সেই ড্রইং অনুসারেই কাজ হবে। সংসদ ভবনকে ফিরিয়ে নেয়া হবে তার অরিজিনাল চেহারায়। আর এ কাজ বাস্তবায়নের জন্য অনেক ভবন ভেঙে ফেলা হবে। জিয়াউর রহমানের কবর সরিয়ে ফেলা হবে। মনে রাখতে হবে, এটা একটা বিশ্ব ঐতিহ্য। ইউনেস্কোর মতো একটা প্রতিষ্ঠান যখন বুঝতে পেরেছে, এটা কেবল ঐতিহ্যই নয় বরং এটি থেকে অনেক কিছুই আহরণ করা সম্ভব, তখনই তারা এটাকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে।

s-02

সংসদ ভবন

সংসদ ভবন কোনো মসজিদ বা মন্দির নয়। এটা এমন একটা জায়গা, যেখান থেকে বাঙালি জাতি পরিচালিত হয়। সেই হিসেবে এটা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং সৌভাগ্যবশত পৃথিবীর অন্যতম ভালো স্থাপত্য। কারণ স্থাপত্য হলো এমন যেন একে ব্যবহার করা যায়। পিরামিড বা তাজমহলকে স্থাপত্য বলা যাবে না, সেগুলো স্কাল্পচার। পিরামিডও একটা স্কাল্পচার কারণ সেখানে একজন মানুষকে কবর দেয়া হয়েছে। সেখানে ভেতরে প্রবেশ করা যায় না। বাইরে থেকে কেবল দেখতে হয়। আমার কাছে তাজমহলও তাই। তাজমহলের শৈল্পিক-মূল্য থাকতে পারে কিন্তু কোনো স্থাপত্য-মূল্য নেই।
যদি মাজহারুল ইসলাম প্রসঙ্গে বলি, তাহলে বলব তিনি মনে হয় স্থপতি হওয়ার জন্যই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি নিয়েছেন, ব্যাচেলর ডিগ্রি নিয়েছেন। এরপর ইয়েলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আর্কিটেকচার ডিগ্রি শেষ করে দেশে ফিরে আসেন। আসলে তিনি না থাকলে হয়তো আমরা লুই আই কানকেও পেতাম না। কারণ প্রথমে তাকেই সংসদ ভবনের কাজ করার জন্য বলা হয়েছিল। কিন্তু তিনি তখন আলবার আল্টো এবং লিকরবুশিওর এই দুজনের নাম প্রপোজ করেন। দেশভাগের পর যখন পাঞ্জাবকে দুই ভাগ করা হলো, পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোর পড়ে গেল পাকিস্তানের দিকে। এরপর চন্দ্রীগড়কে যখন নতুন করে রাজধানী করা হলো, তখন চন্দ্রীগড়ের রাজধানীর মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে লিকরবুশিওর ব্যস্ত ছিলেন। অন্যদিকে আলবার আল্টো ছিলেন অসুস্থ। তখন লুই আই কানের বয়স ছিল পঞ্চান্নর মতো। মাজহারুল ইসলামের স্থাপত্যও আমাদের জন্য অনুকরণীয়। কারণ তারা একই গোষ্ঠীর। মাজহারুল ইসলামের কাজের সঙ্গে লিকরবুশিওরের কাজগুলো মেলে। কিন্তু সেদিক থেকে অনেকটাই আলাদা লুই আই কানের এ কাজ অর্থাৎ আমাদের গর্বের সংসদ ভবন।